﴿لِلرِّجالِ نَصِيبٌ مِمّا تَرَكَ الْوالِدانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّساءِ نَصِيبٌ مِمّا تَرَكَ الْوالِدانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيباً مَفْرُوضاً (7) وَإِذا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُوا الْقُرْبى وَالْيَتامى وَالْمَساكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَعْرُوفاً (8) وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعافاً خافُوا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللهَ وَلْيَقُولُوا قَوْلاً سَدِيداً (9) إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوالَ الْيَتامى ظُلْماً إِنَّما يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ ناراً وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيراً (10)﴾ [سورة النساء: 7-10].
আলোচ্যবিষয়: উত্তরাধিকার ও এতিমের অধিকার সংরক্ষণ
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
৭| “পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে যায়, তাতে পুরুষদের জন্য একটি নির্ধারিত অংশ রয়েছে| আর পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে যায়, তাতেও নারীদের জন্য একটি নির্ধারিত অংশ রয়েছে—তা কম হোক বা বেশি হোক; এটি একটি নির্ধারিত অংশ|”
৮| “সম্পদ বণ্টনের সময় যদি আত্মীয়-¯^জন, এতিম ও দরিদ্র লোক উপস্থিত থাকে, তাহলে তাদেরও তা থেকে কিছু দাও এবং তাদের সঙ্গে সুন্দর ও সম্মানজনক কথা বলো|”
৯| “আর যারা এমন সন্তান রেখে যেতে ভয় পায়, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত, তারা যেন অন্যের অসহায় সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং সঠিক ও ন্যায়সংগত কথা বলে|”
১০| “নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা আসলে নিজেদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করছে| আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে|”
আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
(৭) পুরুষদের জন্য পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে যেমন নির্ধারিত অংশ রয়েছে, তেমনি নারীদের জন্যও সেই সম্পদে নির্ধারিত অংশ রয়েছে| সম্পদের পরিমাণ অল্প হোক বা বেশি—আল্লাহ প্রত্যেকের জন্য যে অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা অবশ্যই তাদের প্রদান করতে হবে| কাউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা কম দেওয়া ˆবধ নয়|
(৮) উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় যদি এমন নিকটাত্মীয়, এতিম বা দরিদ্র ব্যক্তি উপস্থিত থাকে, যারা শরীআত অনুযায়ী উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকারী নয়, তবে তাদেরও সামর্থ্য অনুযায়ী সেই সম্পদ থেকে কিছু প্রদান করা উচিত| এতে তাদের মন খুশি হবে, তারা অবহেলিত বোধ করবে না এবং তাদের অন্তরে হিংসা বা কষ্টের সৃষ্টি হবে না| আর যদি কোনো কারণে কিছু দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত তাদের সঙ্গে নম্র, সান্ত্বনামূলক ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে|
(৯) মানুষ যেন কখনো এতিমদের প্রতি অন্যায় না করে| প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত এ কথা চিন্তা করা যে, যদি তাদের মৃত্যুর পর তাদের নিজের দুর্বল সন্তানরা অন্যের তত্ত্বাবধানে থাকত, তাহলে তারা তাদের প্রতি কেমন আচরণ প্রত্যাশা করত| এই অনুভূতি থেকেই এতিমদের অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে| তাই আল্লাহকে ভয় করে তাদের ব্যাপারে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এমন কথা বলতে হবে, যা সত্য, সঠিক ও ইনসাফপূর্ণ; যাতে কোনো এতিমের প্রতি জুলুম বা অবিচার না হয়|
(১০) যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভোগ করে বা আত্মসাৎ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের উদরে আগুনই ভরে| যদিও দুনিয়াতে তা সম্পদ বলে মনে হয়, কিন্তু আল্লাহর কাছে তা জাহান্নামের আগুনের কারণ| তাই কিয়ামতের দিন তারা জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে এবং কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সম্মুখীন হবে| এই আয়াতে এতিমের সম্পদ রক্ষা এবং তাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৪০-৪৪১; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৬২-২৬৫; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৮; আল-মুনতাখাব: ১/১০৭) |
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿وَالأَقْرَبُونَ﴾ ‘নিকটাত্মীয়গণ’, শব্দটি “কারীব”-এর বহুবচন| এখানে এর দ্বারা এমন সকল ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা রক্তের সম্পর্ক (নাসাব), ˆববাহিক সম্পর্ক (মুসাহারাহ) অথবা ওয়ালা (দাসমুক্তির সূত্রে প্রতিষ্ঠিত ˆবধ সম্পর্ক)-এর কারণে মীরাস লাভের যোগ্য হয়েছে| অর্থাৎ, ‘আকরাবূন’ বলতে শুধু রক্তের আত্মীয়কেই বোঝানো হয়নি; বরং শরীআত কর্তৃক ¯^ীকৃত উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পৃক্ত সকল নিকটজনকে বোঝানো হয়েছে| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৯) |
﴿أُولُو الْقُرْبَى﴾ ‘আত্মীয়-¯^জন’, বলতে এমন নিকটাত্মীয়দের বোঝানো হয়েছে, যাদের সঙ্গে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে; কিন্তু তারা উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত শ্রেণিভুক্ত না হওয়ায় বা বংশীয় নিকটতার (যেমন পিতা-মাতা, সন্তান, ভাই-বোন প্রভৃতি) তুলনায় দূরবর্তী আত্মীয় হওয়ার কারণে শরীআত অনুযায়ী উত্তরাধিকার লাভের অধিকারী হন না| তাই সম্পদ বণ্টনের সময় তারা উপস্থিত থাকলে, তাদের প্রতি সদাচরণ ও সৌজন্য প্রদর্শনের জন্য উত্তরাধিকারী সম্পদ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু প্রদান করতে উৎসাহিত করা হয়েছে| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৯)|
﴿الْقِسْمَةَ﴾ ‘বন্টনকাল’, এখানে “القسمة” দ্বারা সাধারণ সম্পদ বণ্টন বোঝানো হয়নি; বরং মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার সম্পদের শরীআতসম্মত বণ্টন বোঝানো হয়েছে| অর্থাৎ, যখন উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মীরাস বণ্টনের কার্যক্রম শুরু হবে এবং সেই সময় এমন কিছু নিকটাত্মীয়, এতিম ও দরিদ্র ব্যক্তি উপস্থিত থাকবে, যারা শরীআত অনুযায়ী উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকারী নয়, তখন তাদের প্রতি অবহেলা না করে সম্পদ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু প্রদান করতে এবং তাদের সঙ্গে কোমল ও সৌজন্যমূলক ভাষায় কথা বলতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন| এতে তাদের অন্তরে কষ্ট, হীনমন্যতা বা হিংসার সৃষ্টি হয় না; বরং সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়| (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৪/৮) |
“القول المعروف” ও “القول السديد”-এর মধ্যে পার্থক্য এবং ভিন্ন শব্দ ব্যবহারের তাৎপর্য:
আল্লাহ তা‘আলা সূরাতু আন-নিসার ৮ ন¤^র আয়াতে ﴿قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ (কওলান মা‘রূফা) এবং ৯ ন¤^র আয়াতে ﴿قَوْلًا سَدِيدًا﴾ (কওলান সাদীদা) শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন| প্রথম দৃষ্টিতে উভয়টিই উত্তম কথা বলার নির্দেশ মনে হলেও, গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়—দুটি শব্দের অর্থ, উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন| এই ভিন্ন শব্দচয়ন কুরআনের ভাষাশৈলীর সূক্ষ্মতা ও অলংকারের এক অনন্য নিদর্শন| ইনশাআল্লাহ, এ বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করছি|
প্রথমত: القول المعروف (সদাচরণপূর্ণ বা উত্তম কথা), القول المعروف বলতে এমন সুন্দর, কোমল, ভদ্র ও হৃদয়গ্রাহী কথা বোঝায়, যা মানুষের মনকে প্রশান্ত করে এবং যাতে কোনো রূঢ়তা, অপমান বা কষ্টের অবকাশ থাকে না| এর মধ্যে রয়েছে সান্ত্বনামূলক ভাষা, দোয়া, বিনয়পূর্ণ আচরণ এবং কোনো কারণে কিছু দিতে না পারলে সম্মানজনকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা| ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, “قولوا لهم قولاً جميلاً معروفاً عند الناس، غير فاحش ولا غليظ” অর্থাৎ, “তাদের সঙ্গে এমন সুন্দর ও ভদ্র ভাষায় কথা বলবে, যা মানুষের কাছে উত্তম হিসেবে পরিচিত এবং যাতে কঠোরতা বা অশালীনতা না থাকে” (তাফসীর আত-তাবারী, ৭/১৮)|
দ্বিতীয়ত: القول السديد (সত্য ও সঠিক কথা), القول السديد বলতে এমন সত্য, ন্যায়সংগত, সোজাসাপ্টা ও দায়িত্বশীল কথা বোঝায়, যা সত্য ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যাতে কোনো অন্যায়, প্রতারণা বা পক্ষপাতের স্থান নেই| বিশেষত এতিমের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এমন কথাই বলা উচিত, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করে| ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, “أي قولاً عدلاً وصواباً” অর্থাৎ, “তারা যেন ন্যায়সংগত ও সঠিক কথা বলে” (তাফসীর আত-তাবারী, ৭/১৮)|
দুই আয়াতে ভিন্ন শব্দ ব্যবহারের তাৎপর্য, ৮ ন¤^র আয়াতে এমন আত্মীয়, এতিম ও দরিদ্রদের কথা বলা হয়েছে, যারা উত্তরাধিকারী নয়| তাদের প্রধান প্রয়োজন হলো মানসিক সান্ত্বনা, সম্মান ও আন্তরিকতা| তাই আল্লাহ ﴿قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ বলার নির্দেশ দিয়েছেন| অর্থাৎ, এমন কথা বলতে হবে যা কোমল, ভদ্র, হৃদয়গ্রাহী এবং তাদের অন্তরের কষ্ট লাঘব করে|
অন্যদিকে, ৯ ন¤^র আয়াতে আলোচ্য বিষয় হলো এতিমের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণ| এখানে কেবল কোমল ভাষা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন সত্য, ন্যায় এবং দায়িত্বশীল বক্তব্য| তাই আল্লাহ ﴿قَوْلًا سَدِيدًا﴾ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যাতে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ন্যায় ও সত্য থেকে বিচ্যুত না হন| ইমাম ইবনু আশূর (রহ.) বলেন,
“القول المعروف يراد به استمالة النفوس، والقول السديد يراد به إصابة الحق.”
অর্থাৎ, “কওলুন মারূফ-এর উদ্দেশ্য মানুষের অন্তরকে প্রফুল্ল ও সন্তুষ্ট করা, আর কওলুন সাদীদ-এর উদ্দেশ্য সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করা” (আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, ইবনু আশুর ৪/২৫১-২৫৩)|
এক কথায় বলা যায়, ﴿قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ মানুষের হৃদয়কে স¤ে^াধন করে, আর ﴿قَوْلًا سَدِيدًا﴾ মানুষের বিবেক ও ন্যায়বোধকে স¤ে^াধন করে| প্রথমটি সামাজিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে; দ্বিতীয়টি সত্য, ন্যায়বিচার এবং অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করে| এভাবে কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কোমল হৃদয় এবং সত্যভিত্তিক ন্যায়বিচার—উভয়ই সমানভাবে অপরিহার্য| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে অত্র আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করার নিষেধাজ্ঞা, তারা প্রাপ্তবয়স্ক ও বিচক্ষণ হলে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ এবং নারীদের মোহর আত্মসাৎ করা বা মোহর নির্ধারণ না করে তাদের বিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ করেছেন| এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষ ও নারী উভয়েরই নির্ধারিত অংশ রয়েছে| জাহিলিয়াত যুগে নারীদের ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো| এরপর আল্লাহ এতিমদের সঙ্গে কোমল ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ তাদের হৃদয় অত্যন্ত সংবেদনশীল| একই সঙ্গে এতিমদের প্রতি সহানুভূতি ও সদাচরণের শিক্ষা দিয়েছেন, যাতে মানুষ নিজের দুর্বল সন্তানদের কথাও স্মরণ রাখে| সবশেষে তিনি এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারীদের কঠোর শাস্তির সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, তারা যেন আগুনই ভক্ষণ করছে| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৯১) |
৭ ও ১০ নম্বর আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, জাহিলিয়াত যুগে কন্যাসন্তান ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের উত্তরাধিকার দেওয়া হতো না| তারা মনে করত, কেবল প্রাপ্তবয়স্ক ও যুদ্ধ করতে সক্ষম পুরুষরাই উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকারী| এমন সময় আনসারদের আওস ইবনু সাবিত নামে এক ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন| তিনি রেখে যান দুই কন্যা, এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে এবং তাঁর স্ত্রী উম্মু কুহলাহ| কিন্তু তাঁর দুই চাচাতো ভাই খালিদ ও আরফাজাহ, যারা তাঁর ‘আসাবাহ’ (নিকটবর্তী পুরুষ আত্মীয়) ছিলেন, মৃত ব্যক্তির সমস্ত সম্পদ নিজেদের দখলে নিয়ে নেন| এতে তাঁর স্ত্রী উম্মু কুহলাহ রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন, “এ বিষয়ে আমি এখনই কী বলব, তা জানি না”| এরপর আল্লাহ তা‘আলা ৭ ন¤^র আয়াত নাযিল করার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের উত্তরাধিকারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে| (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ৭৯) |
মুকাতিল ইবনু হাইয়্যান বলেন, গাতাফান গোত্রের মারছাদ ইবনু যায়দ নামে এক ব্যক্তি তার এতিম ভাতিজার সম্পদের অভিভাবক ছিলেন| কিন্তু তিনি সেই এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করেন| তখন আল্লাহ তা‘আলা তার এ জঘন্য কাজের নিন্দা করে ১০ ন¤^র আয়াত নাযিল করেন| (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১৪৮) |
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আন-নিসার ৭ থেকে ১০ ন¤^র আয়াতসমূহে আল্লাহ তা‘আলা উত্তরাধিকার বণ্টনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নারী-পুরুষের উত্তরাধিকারের অধিকার নিশ্চিতকরণ, বঞ্চিত আত্মীয়, এতিম ও দরিদ্রদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং এতিমদের সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন| একই সঙ্গে তিনি সুন্দর ও দায়িত্বশীল কথাবার্তার শিক্ষা দিয়েছেন এবং এতিমের সম্পদ আত্মসাৎকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা করেছেন| এ আয়াতগুলো ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দুর্বল মানুষের অধিকার সংরক্ষণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত| আয়াতসমূহের মৌলিক শিক্ষাগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
১| ইমাম আবু বকর আল-জাযায়িরী (রহ.) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখিত আয়াতসমূহের আলোকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেছেন| সেগুলো হলো—
(ক) নারী-পুরুষ উভয়েরই উত্তরাধিকারের অধিকার রয়েছে| ইসলাম জাহিলিয়াতের সেই অন্যায় প্রথা বিলুপ্ত করেছে, যেখানে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো| ইসলাম প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অধিকার ¯^ীকার করেছে এবং আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য তাদের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন| তাই কোনো ব্যক্তির জন্য নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই|
(খ) উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় অসহায় ও অনধিকারীদের প্রতিও মানবিক আচরণ করতে হবে| উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় কোনো আত্মীয়, এতিম বা দরিদ্র ব্যক্তি উপস্থিত হলে, তারা উত্তরাধিকারী না হলেও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের কিছু দেওয়া উত্তম| আর তা সম্ভব না হলে অন্তত তাদের সঙ্গে কোমল, ভদ্র ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে| কারণ, সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী কথা মানুষের মনে শান্তি ও ¯^স্তি সৃষ্টি করে| হাদিসে এসেছে, “উত্তম কথা সদকা|
(গ) মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে ন্যায়সংগত অসিয়তের ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া উচিত| কেউ মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করার সময় যেন কারও অধিকার নষ্ট না করে, কোনো উত্তরাধিকারীকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না করে এবং পক্ষপাতমূলক কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়—এ বিষয়ে তাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া জরুরি| এতে মৃত ব্যক্তির দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হয়, উত্তরাধিকারীদের অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধের আশঙ্কাও কমে যায়|
(ঘ) অন্যের সন্তানদের প্রতি সদাচরণ করা নিজের সন্তানদের জন্যও কল্যাণের কারণ| মানুষের উচিত এতিম ও অসহায় শিশুদের সঙ্গে এমন দয়া, মমতা ও সদাচরণ করা, যেমনটি সে নিজের সন্তানদের জন্য কামনা করে| কারণ, মানুষ জানে না—মৃত্যুর পর তার নিজের সন্তানরাও হয়তো দুর্বল ও অসহায় অবস্থায় অন্যের সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হবে| তাই অন্যের সন্তানদের প্রতি ভালো আচরণ করা মূলত নিজের সন্তানদের জন্যও কল্যাণের বীজ বপন করা এবং আল্লাহর রহমত লাভের একটি মাধ্যম|
(ঙ) এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ| এতিম দুর্বল ও অসহায়—এই সুযোগ নিয়ে তার সম্পদ আত্মসাৎ করা শুধু একটি আর্থিক অন্যায় নয়; বরং এটি গুরুতর কবিরা গুনাহ| আল্লাহ তা’আলা এ অপরাধের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন| অন্যায়ভাবে যে ব্যক্তি এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করে, সে যেন প্রকৃতপক্ষে নিজের পেট আগুন দিয়ে পূর্ণ করছে| তাই এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ করা, তার অধিকার যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়া এবং তার প্রতি সদাচরণ করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির অপরিহার্য কর্তব্য| (আইসারুত তাফাসীর, আবু বকর আল-জাযায়িরী: ১/৪৪১)|
২| নারীর উত্তরাধিকার বঞ্চনার মতো সামাজিক ব্যাধির সমাধান, ৭ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান একটি গুরুতর সমস্যার সমাধান দিয়েছেন| আমাদের সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে বোনদের তাদের প্রাপ্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা দেখা যায়| কোনো কোনো ভাই সম্পত্তি বণ্টনে গড়িমসি করেন, কেউ সম্পদের প্রকৃত মূল্য গোপন করেন, আবার কেউ পারিবারিক সম্পর্ক, আবেগ কিংবা সামাজিক চাপকে ব্যবহার করে বোনকে তার অধিকার ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন| অথচ আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন—পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষদের যেমন অংশ রয়েছে, নারীদেরও তেমনি নির্ধারিত অংশ রয়েছে| সুতরাং বোনকে তার প্রাপ্য উত্তরাধিকার দেওয়া কোনো দয়া, অনুগ্রহ বা ভাইয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ সহযোগিতা নয়; বরং এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি অধিকার| এই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক অন্যায় নয়, বরং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের শামিল|
৩| অনধিকারী আত্মীয়, এতিম ও দরিদ্রদের প্রতি অবহেলার সমাধান, ৮ ন¤^র আয়াতে সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাধির প্রতিকার দেওয়া হয়েছে| উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় এমন অনেক আত্মীয়, এতিম ও দরিদ্র ব্যক্তি উপস্থিত হতে পারে, যারা শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকারী নয়| আমাদের সমাজে অনেক সময় তাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না; বরং তারা যেন সম্পত্তি বণ্টনের বিষয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন—এমন আচরণ করা হয়| অথচ ইসলাম তাদের অধিকার আইনগতভাবে নির্ধারিত না থাকলেও তাদের মানবিক মর্যাদা ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে শিক্ষা দিয়েছে| আল্লাহ তাআলা সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের কিছু দেওয়ার এবং তা সম্ভব না হলে অন্তত কোমল, সুন্দর ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন| এর মাধ্যমে ইসলাম আমাদের শেখায়—সম্পদ বণ্টন শুধু কে কতটুকু পাবে, সেই হিসাবের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানবিকতা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক সম্মান ও সামাজিক সম্প্রীতিও গভীরভাবে জড়িত|
৪| এতিমের সম্পদ আত্মসাতের মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির সমাধান, ৯ ও ১০ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তাআলা এতিমের সম্পদ আত্মসাতের মতো ভয়াবহ সামাজিক অপরাধের ব্যাপারে কঠোর সতর্ক করেছেন| আমাদের সমাজে দেখা যায়, চাচা, দাদা বা অন্য কোনো আত্মীয় এতিম শিশুর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে তার সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব নেন; কিন্তু দুঃখজনকভাবে কখনো কখনো সেই আমানতের খেয়ানত করে তার সম্পদ নিজের কাজে ব্যবহার করেন, হিসাব গোপন করেন কিংবা বিভিন্ন কৌশলে সম্পদের মালিকানা নিজের দিকে নিয়ে নেন| অথচ এতিমের সম্পদ তার অভিভাবকের নিজ¯^ সম্পদ নয়; এটি তার কাছে আমানত| সেই সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে সময়মতো এতিমের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া তার দায়িত্ব| আল্লাহ তাআলা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যেন নিজেদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করছে| তাই এতিমের সম্পদ রক্ষা করা শুধু মানবিক বা সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিয়তি ও ঈমানি দায়িত্ব|
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সূরা আন-নিসার ৭-১০ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা’আলা শুধু কিছু ব্যক্তিগত বিধান প্রদান করেননি; বরং একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন| নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, অনধিকারী আত্মীয়-¯^জন ও অসহায়দের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিবারে বঞ্চনা, ক্ষোভ ও বিরোধ অনেকাংশে কমে যাবে| আর এর মাধ্যমে সমাজকে বিশৃঙ্খলা, মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে মুক্ত রেখে পারস্পরিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে একটি শান্তিময় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ তাআলা যাদের জন্য যে অংশ নির্ধারণ করেছেন, তা যথাযথভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে| বিশেষ করে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সম্পদ আটকে রাখা বা আবেগের চাপ সৃষ্টি করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে|
(খ) উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় কোনো আত্মীয়, এতিম বা দরিদ্র ব্যক্তি উপস্থিত হলে তাদের অবহেলা না করে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে হবে| কিছু দেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত তাদের সঙ্গে সুন্দর, কোমল ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে|
(গ) এতিমের সম্পদ নিজের সম্পদ মনে করে ভোগ করা যাবে না| বরং তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, সঠিক হিসাব রাখতে হবে এবং এতিম প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্পদ পরিচালনায় সক্ষম হলে তার সম্পদ তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে|
(ঘ) এতিম ও অসহায় শিশুদের প্রতি দয়া, মমতা ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে| মনে রাখতে হবে—আজ আমি অন্যের অসহায় সন্তানের প্রতি যেমন আচরণ করছি, ভবিষ্যতে আমার সন্তানদের সঙ্গেও মানুষ তেমন আচরণ করতে পারে| তাই তাদের প্রতি সদাচরণ করা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পাশাপাশি একটি সুন্দর ও সহমর্মী সমাজ গঠনের মাধ্যম|
