Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯৬-২০০) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফির, মুত্তাকি ও আহলে কিতাবী মুমিনদের অবস্থা ও তাদের পরিণাম|

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ (196) مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ (197) لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ (198) وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ (199) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (200)﴾ [سورة آل عمران: 196-200).

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: কাফির, মুত্তাকি ও আহলে কিতাবের মুমিনদের অবস্থা ও তাদের পরিণাম|

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৯৬| হে নবী! কাফিরদের দেশ-দেশান্তরে অবাধ বিচরণ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে|
১৯৭| এগুলো সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র| অতঃপর তাদের আবাস হবে জাহান্নাম| আর তা কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল!
১৯৮| কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত| তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে| এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য সম্মানজনক আপ্যায়ন| আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য অনেক উত্তম|
১৯৯| আর নিশ্চয় আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর প্রতি, তোমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি এবং তাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার প্রতিও ঈমান আনে| তারা আল্লাহর সামনে বিনীত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে না| তাদের জন্য তাদের রবের নিকট প্রতিদান রয়েছে| নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী|
২০০| হে ঈমানদারগণ! তোমরা ˆধর্য ধারণ করো, ˆধর্যে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করো, সতর্ক ও প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো|

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
(১৯৬,১৯৭) আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের দাঈদের তাদের নবী মোহাম্মদের (সা.) ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সতর্ক করে দিচ্ছেন, যেন কাফির, মুশরিক ও বিপর্যয়সৃষ্টিকারীদের ভোগ-বিলাস, উপার্জন, লাভ-লোকসান এবং তাদের ভোজন, পানাহার ও বাহ্যিক সুখ-সম্ভোগ দেখে তারা প্রতারিত না হয়| যেন তারা এমন মনে না করে যে, এরা সত্যপথে আছে, অথবা আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট নয়, বরং সন্তুষ্ট| মোটেই তা নয়| এগুলো দুনিয়ার সামান্য ভোগমাত্র; অতঃপর তাদের প্রত্যাবর্তন হবে নিকৃষ্টতম আশ্রয়ের দিকে| সেটি হলো জাহান্নাম, যেখানে পৌঁছার পথ তারা শিরক ও গুনাহের মাধ্যমে নিজেরাই প্রস্তুত করেছে| কতই না নিকৃষ্ট সেই আবাস, যা তারা নিজেদের জন্য প্রস্তুত করেছে|
(১৯৮) আগের আয়াতে কাফিরদের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছিল- জাহান্নাম, যা নিকৃষ্টতম পরিণতি| আর এই আয়াতে মুমিনদের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে, যা উত্তম পরিণতি| তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত| আল্লাহর নিকট যে চিরস্থায়ী নেয়ামত রয়েছে, তা ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারীদের জন্য দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম| সুতরাং তারা দরিদ্র হলেও কোনো ক্ষতি নেই|
(১৯৯) এই আয়াতে কিছু মুনাফিকের কথার জবাব দেওয়া হয়েছে| তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের নিন্দা করেছিল, যখন তারা নাজ্জাসী-এর মৃত্যুর পর তাঁর জানাযার সালাত আদায় করেন| তারা বলেছিল, “দেখো, মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা এমন এক বিদেশির জানাযা পড়ছে, যে তাদের দেশে মারা যায়নি এবং তাদের ধর্মেরও ছিল না”| এভাবে তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুমিনদের প্রতি কটাক্ষ করতে চেয়েছিল| আল্লাহ তা’আলা তাদের জবাবে বলেন, আহলে কিতাব, অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যেও এমন লোক আছে, যারা আল্লাহর প্রতি, মুমিনদের ওপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি, এবং তাদের নিজেদের ওপর নাযিল হওয়া তাওরাত ও ইনজিলের প্রতিও ঈমান আনে| তারা আল্লাহর সামনে বিনীত, অনুগত ও ইবাদতকারী| তারা অন্য অনেক ইহুদি-খ্রিস্টানের মতো আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্য পার্থিব ¯^ার্থ গ্রহণ করে না; তারা আল্লাহর বাণী বিকৃতি করে না, গোপনও করে না| এই গুণগুলো কিছু কিছু ইহুদী-খ্রিষ্টানদের মধ্যেও পাওয়া যায়| এদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম এবং খ্রিস্টানদের মধ্যে নাজ্জাসী| আহলে কিতাবের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন এবং আল্লাহর সম্মান ও অনুগ্রহের উপযুক্ত| আল্লাহ তা’আলা তাদের সম্পর্কে বলেন: “তাদের জন্য তাদের রবের কাছে প্রতিদান রয়েছে”| কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন| নিশ্চয় আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী| তিনি সমগ্র সৃষ্টির হিসাব দুনিয়ার অর্ধ দিনের সমপরিমাণ সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করবেন|
(২০০) এ আয়াতে উম্মতের জন্য এক মহামূল্যবান উপদেশ রয়েছে| তাদেরকে আহ্বান করা হয়েছে- তারা যেন ইবাদতে ˆধর্যশীল হয়, বিপদ-মুসিবতে অবিচল থাকে, শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ় থাকে, যতক্ষণ না শত্রুরা সত্য গ্রহণ করে অথবা মুসলিমদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়| তাদেরকে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- তারা যেন সীমান্তে সদা প্রস্তুত থাকে, নিজেদের শক্তি ও সামরিক উপকরণ দ্বারা শত্রুকে ভীত রাখে, যাতে তারা মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণের সাহস না পায়| আর সর্বোপরি, আল্লাহভীতি অবল¤^ন করতে বলা হয়েছে; কারণ তাকওয়াই তাদের বিজয় ও সফলতার প্রধান কারণ|
এই মহান রব্বানী দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই সূরাতু আলে-ইসরান সমাপ্ত হয়েছে, যা একটি বরকতময় সূরা এবং হিকমত ও বিধানে পরিপূর্ণ| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩০-৪৩১; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৪-২১৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৬; আল-মুনতাখাব: ১/১২২-১২৩) |

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَا يَغُرَّنَّكَ﴾ “যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে”, এ আয়াতাংশে ‘তোমাকে’ দ্বারা কাকে স¤ে^াধন করা হয়েছে? এ বিষয়ে অধিকাংশ তাফসীরকারকের মত হলো- এখানে বাহ্যত রাসূলুল্লাহকে স¤ে^াধন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে উদ্দেশ্য সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং সমগ্র উম্মত|
সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ হলো- কাফেরদের বাহ্যিক প্রাচুর্য, শক্তি-সামর্থ্য ও জাগতিক সফলতা যেন মুমিনদেরকে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না করে| (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৯৬) |
কারণ তাফসীরশাস্ত্রে সাধারণ নীতি হলো-
“خطابُ النبيِّ ﷺ خطابٌ لأمته ما لم يدلَّ دليلٌ على التخصيص”.
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহকে করা স¤ে^াধন মূলত তাঁর উম্মতের প্রতিও প্রযোজ্য, যতক্ষণ না বিশেষ কোনো দলিল সেটিকে কেবল তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে| (আল-ইতক্বান ফি উলূম আল-কোরআন, সুয়ূতী: ৩/২৩৩-২৩৪) |
﴿تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ﴾ ‘দেশ-বিদেশে কাফেরদের অবাধ বিচরণ’, আয়াতাংশের অর্থ হলো- দেশ-বিদেশে তাদের চলাফেরা ও ব্যবসা-বানিজ্য, কৃষিকাজ, ধনসম্পদের বিস্তার এবং ভোজন ও পানাহারের মাধ্যমে নানরকম ভোগ-বিলাশে মত্ত থাকা| (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১১৭) | সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে- কাফিরদের বিভিন্ন অঞ্চলে অবাধ বিচরণ, অর্থনৈতিক সাফল্য, আরাম-আয়েশ ও বাহ্যিক সমৃদ্ধি দেখে যেন কেউ প্রতারিত না হয়| এগুলো স্থায়ী সাফল্যের প্রমাণ নয়, বরং দুনিয়ার সাময়ীক ভোগমাত্র| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
﴿مَتاعٌ قَلِيلٌ﴾ “সামান্য ভোগ-সামগ্রী”, এর দ্বারা এমন সামান্য ভোগ-সামগ্রীকে বোঝানো হয়েছে, যার দ্বারা মানুষ দুনিয়াতে অল্প সময়ের জন্য উপকৃত ও আনন্দিত হয়; অতঃপর তা ধ্বংস হয়ে যায় ও বিলীন হয়ে পড়ে| এটিকে ‘সামান্য’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে; কারণ এটি ¯^ল্পস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী| আর যা কিছু ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিলীনশীল, তা-ই প্রকৃতপক্ষে অল্প ও তুচ্ছ| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৩) | অর্থাৎ, কাফেরদের ধন-সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস দেখে মুমিনদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়| কারণ এসব নেয়ামত চিরস্থায়ী নয়; বরং খুব অল্প সময়ের জন্য| পরকালের অনন্ত জীবনের তুলনায় দুনিয়ার সমস্ত ভোগ-বিলাসই নগণ্য ও তুচ্ছ| আল্লাহই ভালো জানেন|
﴿وَصَابِرُوا﴾ “এবং ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করো”, আল্লাহর শত্রুদের মোকাবেলায়, বিশেষত জিহাদের ময়দানে তোমরা ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করো| অর্থাৎ, যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের চেয়ে অধিক দৃঢ়তা ও ˆধর্যের পরিচয় দাও; যেন তোমরা তাদের তুলনায় কম ˆধর্যশীল না হও| এখানে সাধারণভাবে ‘সবর’ করার নির্দেশ দেওয়ার পর বিশেষভাবে “وَصَابِرُوا” বলা হয়েছে; কারণ শত্রুর মোকাবেলায় অবিচল থাকা, যুদ্ধের কষ্ট সহ্য করা এবং সত্যের ওপর দৃঢ় থাকা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য বিষয়| (তাফসীর ইবনু কামাল বাশা: ২/৪৬৩) | অর্থাৎ, মুমিনদের শুধু নিজে ˆধর্য ধারণ করলেই চলবে না; বরং বাতিল শক্তির মোকাবেলায় ˆধর্য, সাহস ও দৃঢ়তায় তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও রাখতে হবে| আল্লাহই ভালো জানেন|
﴿وَرَابِطُوا﴾ “এবং শত্রুর বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত থাক”, এর অর্থ হলো- তোমরা সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা চৌকিগুলোতে অবস্থান করো, সেখানে নিজেদের অশ্ব (যুদ্ধের প্রস্তুতি) বেঁধে সদা সতর্ক ও প্রহরারত থাকো এবং শত্রুর মোকাবেলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকো| এখানে “রিবাত” শব্দটি মূলত সীমান্ত পাহারা দেওয়া, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং ইসলামী ভূখণ্ড রক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে| (তাফসীর ইবনু কামাল বাশা: ২/৪৬৩) | অর্থাৎ, মুমিনদের শুধু আভ্যন্তরীণভাবে ˆধর্যশীল হলেই চলবে না; বরং দ্বীনের নিরাপত্তা, মুসলিম সমাজের সুরক্ষা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বদা সজাগ, সংগঠিত ও প্রস্তুত থাকতে হবে| আল্লাহই ভালো জানেন|

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াত তথা ১৯৫ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা যখন মুমিনদের জন্য মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেন, তখন তাদের বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে, তারা দুনিয়াতে অধিকাংশই দরিদ্র ও কষ্টে জীবনযাপন করত; পক্ষান্তরে কাফেররা ভোগ-বিলাস, প্রাচুর্য ও ¯^াচ্ছন্দ্যের মধ্যে ছিল| তাই এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এমন একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যা মুমিনদের সান্তনা দেয় এবং তাদেরকে সেই কষ্ট ও দারিদ্র্যের ওপর ˆধর্য ধারণে সহায়তা করে| আর তা হলো- দুনিয়ার নিয়ামত ও আখিরাতের নিয়ামতের মধ্যে তুলনা করা| কারণ দুনিয়ার সব সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য ক্ষণস্থায়ী, একদিন তা শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আখিরাতের নিয়ামত চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর ও অনন্তকাল স্থায়ী থাকবে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৪) |

১৯৬ এবং ১৯৯ নম্বর আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
১৯৬ নম্বর আয়াত মক্কার মুশরিকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে| তারা তখন সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করত| ব্যবসা-বাণিজ্য করত এবং নানা ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল| তাদের এ অবস্থা দেখে কিছু মুমিন বললেন, “আমরা তো দেখছি আল্লাহর শত্রুরা কত সুখে-¯^াচ্ছন্দ্যে আছে, আর আমরা ক্ষুধা ও কষ্টে জর্জরিত হয়ে পড়েছি”| এর পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে শান্ত¦না প্রদানের জন্য ১৯৬ ন¤^র আয়াত নাযিল করেন| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৩) |
ইমাম নাসাঈ (রহ.) আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন নাজ্জাশী-এর মৃত্যুসংবাদ এলো, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তোমরা তাঁর জানাযার সালাত আদায় করো”| সাহাবিদের কেউ কেউ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি একজন হাবশী (আবিসিনীয়) দাসের জানাযা পড়ব?” তখন আল্লাহ তা‘আলা ১৯৯ ন¤^র আয়াত নাযিল করে মুমিনদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, আহলে কিতাবের মধ্যেও খাটি ঈমানদার থাকতে পারে| একই কথা জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস এবং কাতাদা (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতটি নাজ্জাশী-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল| (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৮) |
উল্লেখ্য যে, নাজ্জাশী ছিলেন আবিসিনিয়ার (হাবশার) ন্যায়পরায়ণ রাজা| তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুসলিম মুহাজিরদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন| তাঁর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অনুপস্থিত (গায়েবানা) জানাযা আদায় করেন| এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করেন যে, আহলে কিতাবের সবাই সমান নয়; তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন যারা সত্যকে গ্রহণ করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন|

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯৬-২০০) নং আয়াতসমূহে মানবজাতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির অবস্থা ও পরিণতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও শিক্ষণীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে| এখানে একদিকে কাফিরদের দুনিয়াব্যাপী প্রভাব, সমৃদ্ধি ও ভোগ-বিলাসের মোহময় চিত্র দেখে বিভ্রান্ত না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে| অপরদিকে মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, চিরস্থায়ী জান্নাত এবং মহাসফলতার সুসংবাদ ঘোষণা করা হয়েছে| একই সঙ্গে আহলে কিতাবের মধ্য থেকে যারা সত্যকে চিনে আন্তরিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তাদের ঈমানদারিত্ব, বিনয় ও আল্লাহভীতির প্রশংসা করে তাদের জন্যও মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে| সর্বশেষ আয়াতে মুমিনদেরকে ˆধর্য, দৃঢ়তা, পারস্পরিক সহযোগিতা, আত্মসংযম এবং তাকওয়া অবল¤^নের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে| এভাবে আয়াতগুলো সত্য ও মিথ্যার অনুসারীদের পরিণতির একটি সুস্পষ্ট তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে এবং মুমিনদের জন্য সফলতার চিরন্তন পথরেখা নির্ধারণ করে|
১| ১৯৬ ন¤^র আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে দুনিয়ায় যে প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন, তা দেখে যেন কোনো মুমিন বিভ্রান্ত না হয়| এ বিভ্রান্তি দুইভাবে সৃষ্টি হতে পারে:
প্রথমত: কেউ ধারণা করতে পারে যে, কাফিররা যেহেতু এত উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে, সুতরাং তাদের পথই সঠিক| সে মনে করতে পারে, যদি তাদের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি ভুল হতো, তবে আল্লাহ তাদেরকে এত সুযোগ ও সফলতা দিতেন না|
দ্বিতীয়ত: কেউ তাদের জীবনধারা, চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করতে পারে| সে মনে করতে পারে যে, তাদের ধর্মহীনতা, অবাধ জীবনযাপন বা ইসলামী বিধান থেকে মুক্ত থাকাই তাদের উন্নতির মূল কারণ|
বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এই ভুল ধারণায় আক্রান্ত হয়েছে| তারা মনে করে, পশ্চিমা জাতিগুলো ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই উন্নত হয়েছে| ফলে তারা ইসলামসহ যে কোনো ধর্মীয় অনুশাসনকে পশ্চাদপদতার কারণ মনে করে| অথচ এটি একটি মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা| (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮২) |
এখানে একটি ¯^াভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে- কাফিররা আল্লাহ তা’আলার অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তারা কীভাবে দুনিয়ায় এত সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বাহ্যিক সুখ-¯^াচ্ছন্দ্যের অধিকারী হয়?
এর উত্তর হলো-
(ক) আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে আখিরাতের মহপাকড়াও-এর পূর্বে সাময়ীক অবকাশ প্রদান করেন| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ ۚ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ﴾ [سورة آل عمران: ১৭৮].
অর্থাৎ- “কাফিররা যেন মনে না করে যে, আমি তাদের যে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্য কল্যাণকর| আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি, যাতে তারা আরও পাপে বৃদ্ধি পায়; আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৭৮) |
তিনি আরও বলেন:
﴿سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ ۝ وَأُمْلِي لَهُمْ ۚ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ﴾
অর্থাৎ- “আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে তারা টেরও পাবে না| আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি; নিশ্চয়ই আমার কৌশল অত্যন্ত শক্তিশালী” (সূরাতু আল-কলম: ৪৫), (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮২)|
(খ) আখিরাতের তুলনায় এ দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ তা’আলার কাছে অত্যন্ত নগণ্য, তাই তিনি কাফেরদেরকেও সাময়িকভাবে এর ভোগ-বিলাস ও প্রাচুর্য দান করেন| এ বিষয়ে সহীহ হাদীসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে| রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ” (سنن الترمذي).
অর্থাৎ- “আল্লাহর কাছে যদি দুনিয়ার মূল্য একটি মশার পাখার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফিরকে এ দুনিয়া থেকে এক চুমুক পানিও পান করাতেন না” (সুনানে তিরমিযী) | অর্থাৎ, আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে দুনিয়ায় সম্পদ, ক্ষমতা, সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য বা সমৃদ্ধি দান করেন বলে এটা তাঁর নিকট তাদের মর্যাদার প্রমাণ নয়| বরং দুনিয়া আল্লাহর কাছে এতই তুচ্ছ যে তিনি তা মুমিন-কাফির সবার মাঝেই বণ্টন করেন|
(গ) দুনিয়া আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি নয়; তাই তিনি তা প্রিয়-অপ্রিয় সকলকেই দান করেন, কিন্তু ঈমান ও হিদায়াত দান করেন শুধু তাঁর প্রিয় বান্দাদের| একটি হাদীসে এসেছে-
“إِنَّ اللَّهَ يُعْطِي الدُّنْيَا مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ، وَلَا يُعْطِي الدِّينَ إِلَّا مَنْ أَحَبَّ” (مسند أحمد:).
অর্থাৎ- “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া তাকে দেন যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন; কিন্তু দ্বীন তিনি কেবল তাকেই দান করেন যাকে ভালোবাসেন” (মুসনাদে আহমাদ: ) |
(ঘ) ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, কাফির যদি কোনো ভালো কাজ করে- যেমন দান-সদকা, মানবসেবা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি, তবে আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেন| কারণ আখিরাতে পুরস্কার পাওয়ার জন্য ঈমান শর্ত| এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مُؤْمِنًا حَسَنَةً، يُعْطَى بِهَا فِي الدُّنْيَا وَيُجْزَى بِهَا فِي الْآخِرَةِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُطْعَمُ بِحَسَنَاتِ مَا عَمِلَ بِهَا لِلَّهِ فِي الدُّنْيَا، حَتَّى إِذَا أَفْضَى إِلَى الْآخِرَةِ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَةٌ يُجْزَى بِهَا” (صحيح مسلم: ).
অর্থাৎ- “আল্লাহ মুমিনের কোনো নেক আমলের প্রতি জুলুম করেন না| তাকে এর বিনিময় দুনিয়াতেও দেন এবং আখিরাতেও প্রতিদান দেন| আর কাফির যে ভালো কাজ করে, তার প্রতিদান তাকে দুনিয়াতেই দেওয়া হয়| অতঃপর যখন সে আখিরাতে পৌঁছবে, তখন তার জন্য এমন কোনো নেকি অবশিষ্ট থাকবে না যার প্রতিদান তাকে দেওয়া হবে” (সহীহ মুসলিম) |
তাই বলা যায়: আল্লাহ কাফিরদেরকে কখনো তাদের কিছু ভালো কাজের প্রতিদান হিসেবে দুনিয়ায় সম্পদ, সুখ, সুনাম, ক্ষমতা বা উন্নতি দান করেন| কিন্তু এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়; বরং তাদের নেক কাজের দুনিয়াবি প্রতিদান| আখিরাতের স্থায়ী প্রতিদান লাভের জন্য ঈমান অপরিহার্য|
সুতরাং মুমিনের জন্য প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হলো ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি; কেবল দুনিয়াবি উন্নতি, সম্পদ বা ক্ষমতা নয়| তাই কাফিরদের বাহ্যিক সমৃদ্ধি দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে, আল্লাহর পথে অবিচল থাকা এবং আখিরাতের সফলতাকেই প্রকৃত সফলতা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত| আল্লাহই ভালো জানেন|
২| ১৯৭ ন¤^র আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) এ আয়াতের প্রথমাংশে কাফিরদের দুনিয়াবি উন্নতি, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মুমিনদেরকে ইর্ষাšি^ত না হওয়ার কারণ বর্ণনা পূর্বক তাদেরকে সান্ত¦না প্রদান করা হয়েছে| এখানে বলা হয়েছে যে তাদের এই দুনিয়াবি সমৃদ্ধি ও সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য প্রকৃতপক্ষে খুবই নগণ্য| এটি সময়গত দিক থেকে সামান্য, কারণ মানুষের জীবন সীমিত; কখন মৃত্যু এসে সবকিছুর অবসান ঘটাবে, তা কেউ জানে না| এটি পরিমাণগত দিক থেকেও সামান্য, কারণ পৃথিবীর সব সম্পদ কোনো একজন মানুষের অধীনে থাকে না| এটি গুণগত দিক থেকেও সামান্য, কারণ মানুষ নানা রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ ও বঞ্চনার কারণে অনেক সময় তার অর্জিত সম্পদ ও ভোগ-বিলাস উপভোগই করতে পারে না| সুতরাং কাফিরদের দুনিয়াবি প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাস যত বড়ই মনে হোক না কেন, আখিরাতের অনন্ত জীবনের তুলনায় তা অতি নগণ্য, ক্ষণস্থায়ী এবং তুচ্ছ| পক্ষান্তরে মুমিনের প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে ঈমান, আল্লাহর স্মরণ এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার মধ্যে| (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮৩) |
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে কাফেরদের শেষ পরিণতির বর্ণনা এসেছে| এখানে বলা হয়েছে- “অতঃপর তাদের আবাস হবে জাহান্নাম”| যাদের চূড়ান্ত আবাস জাহান্নাম, তাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই| কারণ তারা কুফরির উপর মৃত্যুবরণ করেছে| এ আয়াতে আরও ইঙ্গিত রয়েছে যে, কাফিররা দুনিয়ায় যে বিপুল ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য উপভোগ করেছে, জাহান্নামের শাস্তি দেখার পর তারা সেসব সম্পূর্ণ ভুলে যাবে| তাদের দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগের কোনো স্মৃতিই আর অবশিষ্ট থাকবে না| এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কিয়ামতের দিন দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী জাহান্নামিকে আনা হবে| অতঃপর তাকে জাহান্নামে মাত্র একবার ডুবিয়ে তোলা হবে| তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘তুমি কি কখনো কোনো সুখ বা কল্যাণ দেখেছ?’ সে বলবে, ‘না, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো সুখ দেখিনি’”| আবার দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টভোগী জান্নাতিকে আনা হবে| তাকে জান্নাতে একবার ডুবিয়ে তোলা হবে| তারপর জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘তুমি কি কখনো কোনো কষ্ট বা দুঃখ দেখেছ?’ সে বলবে, ‘না, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো দুঃখ-কষ্ট দেখিনি’” (সহীহ মুসলিম: ২৮০৭) | (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮৬) | এগুলো এমন বাস্তব সত্য, যেগুলোর প্রতি আমরা ঈমান রাখি; কিন্তু দুনিয়ার ব্যস্ততা, গাফিলতি ও মোহ অনেক সময় আমাদের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে| তাই মুমিনের উচিত সর্বদা আখিরাতকে স্মরণ রাখা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখে বিভ্রান্ত না হওয়া| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
৩| ১৯৮ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসের বিপরীতে মুত্তাকিদের চিরস্থায়ী ও মহিমাšি^ত পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন| মুত্তাকি হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকে| এমন আল্লাহভীরু বান্দাদের জন্য রয়েছে অসংখ্য জান্নাত, যার নিচে প্রবাহিত হবে নির্মল নদীসমূহ| তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তাদের এ সুখ-সম্ভোগের কোনো শেষ নেই| এ অর্থেই আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র বলেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا﴾
অর্থাৎ- “নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফিরদাউসের জান্নাত” (সূরাতু আল-কাহফ: ১০৭) | এখানে (নুযুলান) শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| আরবি ভাষায় নুযুল বলতে অতিথির জন্য প্রাথমিক আপ্যায়ন ও সম্মানসূচক আতিথেয়তাকে বোঝায়| এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা আল্লাহ তা’আলার বিশেষ মেহমান| তিনি নিজ অনুগ্রহ, দয়া, উদারতা ও সম্মানের মাধ্যমে তাদেরকে আপ্যায়িত করবেন|
এ জান্নাতের নেয়ামতগুলো মূলত শারীরিক ও বাহ্যিক নেয়ামত-সুন্দর বাসস্থান, নদী-নালা, ফল-মূল, খাদ্য-পানীয় এবং সীমাহীন সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য| তবে এর চেয়েও মহান আরেকটি নেয়ামত রয়েছে, যা হলো আত্মিক ও রূহানী নেয়ামত-আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর ˆনকট্য এবং তাঁর দর্শন লাভের সৌভাগ্য| এ দিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ﴾ “আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য আরও উত্তম”| অর্থাৎ, জান্নাতের বাহ্যিক নেয়ামত ছাড়াও আল্লাহ তাআলার নিকট যে সম্মান, সন্তুষ্টি, ˆনকট্য ও চিরস্থায়ী পুরস্কার সংরক্ষিত রয়েছে, তা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ, ক্ষমতা, ভোগ-বিলাস এবং কাফিরদের সাময়িক সমৃদ্ধির তুলনায় অসীমভাবে শ্রেষ্ঠ ও মহত্তর| কারণ দুনিয়ার সুখ ক্ষণস্থায়ী ও নশ্বর; পক্ষান্তরে আল্লাহর নিকট যা রয়েছে তা চিরন্তন, পরিপূর্ণ এবং অবিনশ্বর| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৬৯-১৭০) |
৪| ১৯৯ ন¤^র আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে মুত্তাকিদের জন্য নির্ধারিত মহাপুরস্কার এবং কাফিরদের জন্য প্রস্তুতকৃত শাস্তির বর্ণনার পর আল্লাহ তা’আলা আহলে কিতাবের পাঁচটি গুণের বর্ণনা দিয়েছেন:
প্রথম গুণ: তারা আল্লাহর প্রতি এমন বিশুদ্ধ ঈমান পোষণ করে, যার মধ্যে শিরকের কোনো মিশ্রণ নেই এবং যা শুধু মুখের ¯^ীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আনুগত্য ও আমলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়| তারা তাদের মতো নয়, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ﴾
অর্থাৎ- “তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, কিন্তু শিরক করেই” (সূরাতু ইউসুফ: ১০৬) |
দ্বিতীয় গুণ: তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি অবতীর্ণ কুরআনের ওপর ঈমান আনে এবং তাঁকে আল্লাহর সত্য রাসূল হিসেবে মেনে নেয়|
তৃতীয় গুণ: তারা তাদের নিজেদের নবীদের ওপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাবসমূহের প্রতিও ঈমান রাখে| অর্থাৎ তারা আল্লাহর সকল নবী ও সকল ওহির প্রতি বিশ্বাসী| কুরআন যেসব বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেগুলোও তারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে| তাদের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়া বা বিকৃত হয়ে যাওয়া এ বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়|
চতুর্থ গুণ: তারা আল্লাহর সামনে গভীর বিনয় ও নম্রতা অবল¤^ন করে| এই খুশু‘ (خشوع) হলো বিশুদ্ধ ঈমানের অন্যতম ফল| যখন আল্লাহভীতি হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন তার প্রভাব মানুষের দৃষ্টি, কথা, আচরণ ও অনুভূতির ওপরও প্রতিফলিত হয়| ফলে তার চোখে বিনয়, কণ্ঠে নম্রতা এবং চরিত্রে নমনীয়তা প্রকাশ পায়|
পঞ্চম গুণ: তারা আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে দুনিয়ার সামান্য ¯^ার্থ অর্জন করে না| অর্থাৎ তারা সত্যকে গোপন করে না, বিকৃতি করে না এবং পার্থিব লাভ, পদমর্যাদা বা সম্পদের বিনিময়ে আল্লাহর বিধানকে বিক্রি করে না| এটি তাদের ঈমান, খুশু‘ ও আল্লাহভীতিরই ¯^াভাবিক ফল| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৬৯-১৭০) |
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে- আহলে কিতাবের মধ্য থেকে যারা ঈমান, বিনয়, আল্লাহভীতি, সত্যনিষ্ঠা এবং আল্লাহর আয়াতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো মহৎ গুণাবলিতে ভূষিত হয়েছে, তাদের জন্য তাদের সৎকর্ম ও আনুগত্যের উপযুক্ত প্রতিদান আল্লাহ তা’আলার নিকট সংরক্ষিত রয়েছে| সুতরাং আহলে কিতাবের মধ্যে যারা সত্যকে চিনে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান এনেছে, কুরআন ও পূর্ববর্তী ওহির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আল্লাহর সামনে বিনয়ী হয়েছে এবং দুনিয়ার ¯^ার্থে সত্যকে বিকৃত করেনি-আল্লাহ তাআলা তাদের বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন| এর মাধ্যমে কুরআন শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি বংশ, জাতি বা সম্প্রদায় নয়; বরং বিশুদ্ধ ঈমান, বিনয়, সততা ও সত্যের প্রতি আনুগত্য|(তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৭১) |
৫| ২০০ ন¤^র আয়াত তথা সূরার সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের সফলতার জন্য চারটি মৌলিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন: সবর, মুসাবারা, মুরাবাতা ও তাকওয়া|
(ক) صبر (সবর) – ˆধর্য ধারণ করা, মুফাসসিরগণ এখানে ‘সবর’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা নিয়ে কয়েকটি ব্যাখ্যা করেছেন, যার সারসংক্ষেপ হলো- সবর বলতে আল্লাহর আনুগত্য, বিপদ-আপদ, দ্বীনের দায়িত্ব এবং জিহাদের কষ্টসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অবিচল থাকাকে বুঝানো হয়েছে|
(খ) مصابرة (মুসাবারা) – ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করা, এ নির্দেশেরও দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়-
ইবনু আব্বাস (রা.) ও অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, শত্রুর মোকাবিলায় তাদের চেয়ে অধিক ˆধর্যশীল ও দৃঢ় হওয়া|
আতা ও কুরাযী বলেন, আল্লাহ যে পুরস্কার ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার প্রত্যাশায় ˆধর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করা| অর্থাৎ, শুধু ˆধর্যধারণই নয়; বরং সত্যের পথে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অন্যদের চেয়ে বেশি দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করাই হলো মুসাবারা|
(গ) مرابطة (মুরাবাতা) প্রহরায় অবিচল থাকা, এ বিষয়ে মুফাসসিরদের দুটি মত রয়েছে-
প্রথম মত: সীমান্তে অবস্থান করে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকা এবং ইসলামের নিরাপত্তা রক্ষায় সদা সতর্ক থাকা| ইবনু আব্বাস (রা.), হাসান বসরী, কাতাদা প্রমুখ এ মত পোষণ করেন|
ইবনু কুতাইবা বলেন, রিবাত শব্দের মূল অর্থ হলো সীমান্তে অবস্থান করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকা| অতীতে উভয় পক্ষ তাদের ঘোড়া বেঁধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করত; সেখান থেকেই রিবাত শব্দের উৎপত্তি|
দ্বিতীয় মত: নামাজের প্রতি অবিচল থাকা এবং এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষায় থাকা|এ মতটি আবু সালামা ইবনু আবদুর রহমান (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে|
(ঘ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ ভীতি অবল¤^ন করা|
দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে হলে ˆধর্য, দৃঢ়তা, দায়িত্বশীলতা এবং তাকওয়ার সমš^য় অপরিহার্য| এ চারটি গুণই একজন মুমিনকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং আখিরাতের জীবনে সফলতার শিখরে পৌঁছে দেয়| (যাদুল মাসীর ফি ইলমিত তাফসীর, ইবনুল জাওযী: ১/৩৬৫) |

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) কাফির বা অবাধ্য লোকদের ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি ও বাহ্যিক সফলতা দেখে তাদের পথকে সঠিক মনে করা যাবে না| মুমিনের দৃষ্টি থাকবে আখিরাতের স্থায়ী সফলতার দিকে|
(খ) আল্লাহর সন্তুষ্টি, বিশুদ্ধ ঈমান ও তাকওয়াই প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড| তাই দুনিয়াবি লাভ-ক্ষতির চেয়ে ঈমান রক্ষা ও আল্লাহর আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে|
(গ) আহলে কিতাবের মুমিনদের মতো সত্য যেখানেই পাওয়া যায় তা গ্রহণ করা, আল্লাহর সামনে বিনয়ী থাকা এবং দুনিয়াবি ¯^ার্থে সত্যকে গোপন বা বিকৃত না করা|
(ঘ) ইবাদত, দাওয়াত, শিক্ষা, পরিবার, সমাজ ও বিপদ-মুসিবতের ক্ষেত্রে ˆধর্য ধারণ করা এবং সত্যের পথে প্রতিকূলতার মোকাবিলায় আরও বেশি দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করা|
(ঙ) নিজের ঈমান, পরিবার, সমাজ ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে সচেতন থাকা; ইলম, দাওয়াত, শিক্ষা, সংগঠন ও ইসলামী কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্বীনের খেদমতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহভীতি অবল¤^ন করা|

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯০-১৯৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: প্রকৃত জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ (190) الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (191) رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (192) رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ (193) رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ (194) فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَأُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأُوذُوا فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُوا وَقُتِلُوا لَأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ثَوَابًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ (195)﴾ [سورة آل عمران: 190-195).

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: প্রকৃত জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৯০। নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে বুদ্ধিমানদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।
১৯১। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে। তারা বলে, “হে আমাদের রব, আপনি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। অতএব আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
১৯২। “হে আমাদের রব, আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, অবশ্যই তাকে অপমানিত করবেন। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।”
১৯৩। “হে আমাদের রব, আমরা এক আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডাকছিলেন যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো।’ তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন, আমাদের পাপগুলো মোচন করুন এবং আমাদের নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দিন।”
১৯৪। “হে আমাদের রব, আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি আমাদের দিয়েছেন, তা আমাদের দান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।”
১৯৫। তখন তাদের রব তাদের দোয়ার জবাব দিলেন, “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কর্ম নষ্ট করব না, সে পুরুষ হোক বা নারী; তোমরা একে অপরেরই অংশ। অতঃপর যারা হিজরত করেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, আমার পথে কষ্ট পেয়েছে, যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে—আমি অবশ্যই তাদের গুনাহসমূহ মুছে দেব এবং তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান। আর উত্তম প্রতিদান তো আল্লাহর কাছেই রয়েছে।”

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামনে তাঁর সৃষ্টিজগতের কিছু নিদর্শন তুলে ধরেছেন। এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়- আল্লাহ তা’আলা কারও মুখাপেক্ষী নন, বরং সব সৃষ্টি তাঁরই মুখাপেক্ষী। তিনিই সবকিছুর ¯্রষ্টা, পালনকর্তা ও নিয়ন্ত্রক। মানুষের জীবন, জীবিকা এবং সব বিষয় তাঁরই অধীনে। তিনি ছাড়া আর কোনো রব নেই, আর তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো উপাস্যও নেই। তবে এসব সত্য কেবল সুস্থ বিবেক ও পরিষ্কার অন্তরের মানুষই উপলব্ধি করতে পারে। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা বলেন, আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ, বিশাল আকাশ, বিস্তৃত পৃথিবী, রাতের অন্ধকার, দিনের আলো, কখনো দিন বড়, কখনো রাত বড়- এসবই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে আল্লাহই সর্বশক্তিমান। এগুলো আরও বোঝায়, মানুষ কত অসহায় আর কত বেশি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। এই কথাই ১৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে।
এরপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ সেই জ্ঞানী মানুষের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
(ক) তারা সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে- দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে। অর্থাৎ, শুধু সালাতে নয়; বরং জীবনের সব সময়েই তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে থাকে।
(খ) তারা আকাশ-যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। কী সুন্দরভাবে সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, কী নিখুঁত নিয়মে চলছে, কত অগণিত সৃষ্টি এতে ছড়িয়ে আছে, এসব ভেবে তারা মুগ্ধ হয়ে যায়। তখন তাদের মুখ থেকে বের হয়ে আসে- “হে আমাদের রব, আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি”। অর্থাৎ, এই বিশাল জগত কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে আছে মহান প্রজ্ঞা ও গভীর উদ্দেশ্য। আল্লাহ কখনো খেলাচ্ছলে কিছু করেন না। তাই তারা বলে, “আপনি পবিত্র”। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি সব ধরনের ত্রুটি, অনর্থক কাজ ও উদ্দেশ্যহীনতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
(গ) প্রকৃত জ্ঞানী বুঝতে পারে, আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যারা তা করবে, তারা জান্নাতে সম্মান পাবে। আর যারা অবাধ্য হবে, তারা শাস্তির মুখোমুখি হবে। এ কারণেই তারা দোয়া করে- “হে আমাদের রব, যাকে আপনি জাহান্নামে দেবেন, সে অবশ্যই অপমানিত হবে। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না”। এরপর তারা বলে, “হে আমাদের রব, আমরা একজন আহ্বানকারীর ডাক শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো’। তাই আমরা ঈমান এনেছি”। এই আহ্বানকারী হলেন ‘কোরআন’ এবং মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.)।
(ঘ) একজন প্রকৃত জ্ঞানী হেদায়েত, পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে। ঈমান আনার পর তারা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস প্রার্থনা করে। তারা বলে, “হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহ মাফ করুন, আমাদের পাপগুলো দূর করুন এবং আমাদের নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দিন”। এরপর তারা আরও প্রার্থনা করে- “হে আমাদের রব, আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন। কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না”। অর্থাৎ, একজন জ্ঞানী দুনিয়াতে আল্লাহর সাহায্য ও সফলতা চায়, আর আখিরাতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি কামনা করে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের দোয়ার এভাবে জবাব দেন- “আমি তোমাদের কারও কাজ নষ্ট করব না, সে পুরুষ হোক বা নারী”। অর্থাৎ, আল্লাহ সবার আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন। তাঁর কাছে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো অন্যায় পার্থক্য নেই।
(ঙ) জ্ঞানীদের পাঁচ নম্বর বৈশিষ্ট্য হলো- তারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করে।
যে সকল জ্ঞানী ও গবেষক উল্লেখিত পাঁচটি গুণে গুণান্বিত হবে আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্য দুইটি মহাপুরস্কার রেখেছেন: (ক) আল্লাহ তা’আলা তাদের কৃত সৎকর্ম নষ্ট করবেন না, (খ) তাদের জীবনের ভুল-ত্রুটি ও পাপসমূহ মুছে দিবেন এবং (গ) তাদেরকে মহামূল্যবান জান্নাত দান করবেন।
১৯৫ নম্বর আয়াতের শেষভাগে আল্লাহ তা’আলা বিশেষভাবে সেই সকল জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেন, যারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণ আর গবেষণার ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আল্লাহর পথে ঘরবাড়ি ছেড়েছে, কষ্ট সহ্য করেছে, নির্যাতিত হয়েছে, যুদ্ধ করেছে এবং শহীদ হয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হলো- তিনি তাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে দামী পুরস্কার। তাই মানুষের উচিত সবসময় আল্লাহর কাছেই আশা রাখা, তার কাছেই চাওয়া। কারণ তিনিই সবচেয়ে দয়ালু এবং অনুগ্রহশীল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৬-৪২৭; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২০৭-২০৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৫-৭৬; আল-মুনতাখাব: ১/১২০-১২২) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أُولِي الأَلْبَابِ﴾ ‘জ্ঞানী বা আকলমান’, আয়াতাংশে ‘উলুল আলবাব’ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এ সম্পর্কে আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) বলেন: ‘উলুল আলবাব’ বলতে তাদেরকে বোঝায়- যাদের সুস্থ ও পরিপক্ব বুদ্ধি আছে; যে বুদ্ধি দিয়ে তারা বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে এবং প্রমাণ থেকে সত্যকে চিনে নিতে পারে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৫)। অর্থাৎ, ‘উলুল আলবাব’ সেই মানুষ, যারা দেখে শিক্ষা নেয়, চিন্তা করে সত্যে পৌঁছে, প্রমাণ থেকে আল্লাহর মহিমা চিনে নেয় এবং সবশেষে এর মাধ্যমে হেদায়েতকে গ্রহণ করে। যা উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়।
কুরআনে “উলুল আলবাব” শব্দটি ১৬ জায়গায় এসেছে। এটি কোথায় কী অর্থে এসেছে তার বর্ণনা নিচে কয়েকটি আয়াতের সহজ ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরা হলো-
(ক) ইসলামে ‘কিসাস’ বিধানের হিকমাত ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা বুঝতে পারে, আল্লাহ তা’আলা সূরাতু আল-বাক্বারা-এর ১৭৯ নম্বর আয়াতে কিসাসের বিধান বর্ণনা করে বলেছেন: এতে ‘উলুল আলবাব’-এর জন্য জীবন আছে। অর্থাৎ, গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় ন্যায়বিচার সমাজে নিরাপত্তা আনে। শুধু বাহ্যিক শাস্তি নয়, এর পেছনের হিকমতও তারা বুঝতে পারে। (তাফসীর আল-তবারী: ৩/৩৮৩) ।
(খ) আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান থেকে কেবল বুদ্ধিমানরাই শিক্ষা গ্রহণ করে, সূরাতু আল-বাক্বারা-এর ২৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আল্লাহ যাকে চান হিকমত বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন, আর যাকে হিকমত দেওয়া হয় তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়। আর ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা এ হিকমাত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে”। এখানে ‘উলুল আলবাব’দেরকে বলা হয়েছে: তারা আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। (তাফসীর আল-তবারী: ৫/৫৮০) ।
(গ) আকাশ-যমীনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের পরিবর্তনে উলুল আলবাবের জন্য নিদর্শন আছে, উল্লেখিত আয়াতসমূহে তথা সূরাতু আলে-ইমরান-এর (১৯০-১৯১) এ বলা হয়েছে, আকাশ-যমীনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। এবং তারা দুইটি কাজ করে: (ক) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং (খ) সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করে।
(ঘ) নবীদের ঘটনাবলীতে উলুল আলবাবের জন্য শিক্ষা রয়েছে, অর্থাৎ- তারা শুধু গল্প শোনে না; বরং ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়। (সূরাতু ইউসুফ: ১১১) ।
(ঙ) ‘উলুল আলবাব’ বা জ্ঞানীরা সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে। যেমন সূরাতু রা’দ-এর ১৯ নম্বর আয়াতে এসেছে- “যে জানে রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সত্য, সে কি অন্ধের মতো হতে পারে?”। এখানে বলা হয়েছে: উলুল আলবাব হলো তারা, যারা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে।
(চ) ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তারপর উত্তম কথাটি অনুসরণ করে। সূরাতু আল-যুমার-এর ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾.
অর্থ: “যারা মন দিয়ে কথা শুনে অতঃপর তা ভালভাবে অনুসরণ করে, তাদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দান করেন, এবং তারাই বুদ্ধিমান”। এখানে খুব সুন্দর একটি অর্থ পাওয়া যায়:
‘উলুল আলবাব’ বা জ্ঞানী মানে শুধু বেশি জানা নয়; বরং সত্য কথা শুনে তা গ্রহণ করা।
﴿آيَات﴾ “সুস্পষ্ট নিদর্শন”, আয়াতাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) বলেন: এর দ্বারা আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব, ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং রহমতের সুস্পষ্ট প্রমাণকে বুঝানো হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর: ১/৪২৫)। অর্থাৎ- আকাশ, পৃথিবী, দিন-রাতের পালাবদল, বৃষ্টি, জীবজন্তু ও মানবসৃষ্টি, এসবই এমন সুস্পষ্ট নিদর্শন, যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষ আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব, অসীম ক্ষমতা, পরিপূর্ণ জ্ঞান, সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা ও অবারিত রহমত উপলব্ধি করতে পারে। যেমন: এত সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল সৃষ্টি কখনোই নিজে নিজে অস্তিত্বে আসতে পারে না; এর পেছনে একজন মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে, এটাই আল্লাহর অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যিনি আকাশম-লী, পৃথিবী এবং অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন, এটা আল্লাহর ক্ষমতার প্রমান। সৃষ্টির প্রতিটি জিনিসে যে নিখুঁত সামঞ্জস্য দেখা যায়, তা আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান ও হিকমতের প্রমাণ। অনুরুপভাবে বৃষ্টি, খাদ্য ও জীবনধারণের উপকরণ, এসব আল্লাহর অসীম রহমতের প্রমাণ।
﴿يَذْكُرُونَ اللَّهَ﴾ “তারা আল্লাহকে স্মরণ করে”, এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের দুটি মত রয়েছে:
(ক) এখানে উদ্দেশ্য হলো- মানুষ যেন সর্বদা তার রবের স্মরণে থাকে। কারণ মানুষের অবস্থা মূলত এই তিনটির বাইরে নয়, দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায়। সুতরাং যখন আল্লাহ তাদেরকে এই সব অবস্থায় স্মরণকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তখন তা প্রমাণ করে যে তারা সর্বদা যিকিরে অবিচল থাকে, কখনোই এতে শৈথিল্য করে না।
(খ) এখানে “যিকির” দ্বারা সালাত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তারা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে; যদি দাঁড়িয়ে আদায় করতে অক্ষম হয়, তবে বসে; আর যদি বসেও অক্ষম হয়, তবে শুয়ে। অর্থাৎ তারা কোনো অবস্থাতেই সালাত পরিত্যাগ করে না।
ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযী প্রথম মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহর যিকিরের ফযিলত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَرْتَعَ فِي رِيَاضِ الْجَنَّةِ فَلْيُكْثِرْ ذِكْرَ اللَّهِ”.
অর্থ: “যে ব্যক্তি জান্নাতের উদ্যানসমূহে বিচরণ করতে ভালোবাসে, সে যেন বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করে”। (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ: ৩৫০৬৯) । (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৫৯-৪৬০) ।
﴿مُنَادِيًا﴾ “আহ্বানকারী”, আয়াতাংশ দ্বারা দুইটি উদ্দেশ্য হতে পারে: (ক) মোহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং (খ) আল-কুরআনুল কারীম। অধিকাংশ তাফসীরকারকগণ প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন। তবে ফখরুদ্দীন রাযী (র.) দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, কারণ সকল মানুষ দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহর দেখা পায়নি, কিন্তু কুরআনের দেখা পাবে। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৬৬) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো মূলত সূরাটির উপসংহার। কাফির, মুনাফিক এবং মুমিনদের মধ্যকার গাফিল ও ত্রুটিকারীদের সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের উত্থাপিত সন্দেহ-আপত্তির জবাব দেওয়ার পর, উল্লেখিত আয়াতগুলোর মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি এমন বিষয়গুলোর দিকে ফেরানো হয়েছে, যা আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একাত্ববাদ, তাঁর মহিমা ও মহান গৌরব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২০৬) ।

১৯০ এবং ১৯৫ নম্বর আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, কোরাইশ বংশের লোকেরা ইহুদীদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, মূসা (আ.) তোমাদের কাছে কী কী নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন? তারা বলল: লাঠি এবং এমন উজ্জ্বল হাত, যা দর্শকদের কাছে স্পষ্ট শুভ্র হয়ে উঠত।
তারপর তারা খ্রিষ্টানদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ঈসা (আ.) কেমন ছিলেন? তারা বলল, তিনি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতেন এবং মৃতকে জীবিত করতেন।
অতঃপর তারা মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল, হে মোহাম্মদ তুমি তোমার রবের কাছে দোয়া কর যেন তিনি আমাদের জন্য সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে পরিণত করে দেন। তখন তিনি তাঁর রবের কাছে দোয়া করলেন। এরপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা ১৯০ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ করলেন। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৭) ।
উম্মু সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), হিজরতের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের উল্লেখ আমি শুনি নাই। তখন আল্লাহ তা’আলা ১৯৫ নম্বর আয়াত নাযিল করে জানিয়ে জানিয়ে দিলেন নারী-পুরুষের কোন বৈসম্য নেই। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৮)।

আয়াতসমূহের ফযিলত:
এই আয়াতগুলোর ফযিলত সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো- আতা (রা.) বলেন: আমি, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার এবং ওবাইদ ইবনু উমাইর একসঙ্গে আয়েশার (রা.) কাছে গেলাম। আমরা তাঁর কাছে প্রবেশ করলাম, আর আমাদের ও তাঁর মাঝে একটি পর্দা ছিল। তিনি বললেন: “হে উবাইদ, তুমি আমাদের কাছে আস না কেন?”
তিনি বললেন, “কবির উক্তি আছে- মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ করো, তাহলে ভালোবাসা বাড়ে”।
তখন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার বললেন: “আমাদের বলুন তো, আপনি রাসূলুল্লাহর (সা.) কোন বিষয়টি সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দেখেছেন?” তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “তাঁর প্রতিটি কাজই ছিল আশ্চর্যজনক। এক রাতে তিনি আমার কাছে এলেন, এমনকি তাঁর শরীর আমার শরীর স্পর্শ করল। তারপর তিনি বললেন: “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি আমার মহান রবের ইবাদত করি”। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আপনার সান্নিধ্য আমার খুব প্রিয়, আর এটাও আমার প্রিয় যে আপনি আপনার রবের ইবাদত করুন। এরপর তিনি পানির পাত্রের কাছে গেলেন, ওযু করলেন; বেশি পানি ঢাললেন না। তারপর নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি এত কাঁদলেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তারপর সিজদায় গেলেন, সেখানেও এত কাঁদলেন যে মাটি ভিজে গেল। এরপর কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন, তবুও কাঁদতে থাকলেন।
এমতাবস্থায় বিলাল (রা.) ফজরের নামাজের জন্য তাঁকে ডাকতে এলেন। তিনি বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কাঁদছেন কেন? অথচ আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “হে বিলাল, আমি কেন কাঁদব না? আজ রাতে আমার ওপর এই আয়াতগুলো (সূরাতু আলে-ইমরানের ১৯০-১৯৫) নাযিল হয়েছে। এরপর তিনি বলেন: “ধ্বংস তার জন্য, যে এ আয়াতগুলো পড়ে কিন্তু এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না”।
আউযায়ী (র.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “এই আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনার পরিপূর্ণতা কী?” তিনি বলেছিলেন: “মানুষ যেন এ আয়াতগুলো পাঠ করে, আর পাঠ করার সময় তাদের অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করে”। (তাফসীরে ইবনু কাসীর: ১/৪৪০) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান শব্দটি যেমন অত্যন্ত মূল্যবান, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি দামি হলো সেই ব্যক্তি, যিনি প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান। কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় বুদ্ধিমানদের গভীর প্রশংসা করা হয়েছে, কারণ প্রকৃত বুদ্ধিমানরা শুধু জ্ঞান অর্জন করেন না, সেই জ্ঞানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। বিশেষ করে, সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯০-১৯৫) আয়াতগুলোতে প্রকৃত বুদ্ধিমানদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বর্ণনা করা হয়েছে:
(ক) একজন প্রকৃত জ্ঞানী সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে- দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে।
(খ) তারা আকাশ-যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।
(গ) প্রকৃত জ্ঞানী বুঝতে পারে, আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
(ঘ) তারা হেদায়েত, পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে।
(ঙ) তারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণার ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করে।
২। ১৯৫ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশে আধুনিক যুগে যারা মনে করে ইসলাম নারীদেরকে যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেনি, তাদের জবাব দিয়েছে:
প্রথমত: তারা বলে, ইসলাম নারীকে ঘরের ভিতরে আবদ্ধ রেখেছে, তাদেরকে কাজের স্বাধীনতা দেয়নি। তাদের জবাব হলো- ইসলাম নারীকে পুরুষের অনুসারী বা ছায়া হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সামনে স্বাধীন নৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; তার ঈমান, আমল, ত্যাগ, ধৈর্য, শিক্ষা, সন্তান লালন-পালন, সমাজগঠন- সবকিছুরই পূর্ণ মূল্য আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। আধুনিক যুগে মানুষ সাধারণত কাজের বাহ্যিক দৃশ্যমানতাকে মূল্যায়নের মাপকাঠি বানায়, কিন্তু এই আয়াত শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি লিঙ্গ নয়, বরং ঈমান, ইখলাস ও সৎকর্ম। চাই সে সৎকর্ম দৃশ্যমান হোক বা চোখের আড়ালে হোক। আধুনিক বিশ্বে সাধারণত সমাজ বলতে সেই ক্ষেত্রকেই বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যা চোখে পড়ে: কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান, বাজার, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি। কিন্তু এই দৃশ্যমান জগতের পেছনে নীরবে কাজ করে আরেকটি গভীর ও মৌলিক জগৎ- পরিবার। এই পরিবারই মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে একটি শিশু কথা বলতে শেখে, আদব শেখে, দায়িত্ববোধ শেখে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখে, মানুষ হয়ে উঠতে শেখে। আর এই নির্মাণের কেন্দ্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাকেন মা। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; একটি প্রজন্মের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর। অথচ আধুনিক আলোচনায় অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি করা হয় যেন ঘরের ভেতরের এই অবদান কোনো “বাস্তব কাজ” নয়, যেন মূল্যবান কেবল সেই শ্রমই, যার বিনিময়ে দৃশ্যমান অর্থ, পদ বা সামাজিক পরিচিতি পাওয়া যায়।
এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি হয়। কারণ যে মা বছরের পর বছর একটি শিশুকে এমনভাবে গড়ে তুললেন, যাতে সে ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, আলেম, উদ্যোক্তা বা সমাজনেতা হতে পারে, বাস্তবে তিনি সমাজ নির্মাণের একেবারে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। কিন্তু সমাজ প্রায়ই ফলটিকে দেখে, শিকড়টিকে দেখে না। দৃশ্যমান সাফল্যকে প্রশংসা করা হয়, অথচ সেই সাফল্যের পেছনের নীরব ত্যাগ প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। ইসলাম এই অদৃশ্য অবদানকে অদৃশ্য মনে করেনি। তাই আল্লাহ বলেন- “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কোনো কাজ নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী”। অর্থাৎ কাজের মূল্য নির্ধারণে বাহ্যিক দৃশ্যমানতা নয়, বরং নিয়ত, দায়িত্বপালন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা শ্রমই আসল। একজন নারী যদি পরিবারকে সৎভাবে গড়ে তোলেন, সন্তানকে দ্বীন, চরিত্র ও মানবিকতার শিক্ষা দেন, এ কাজ আল্লাহর কাছে এমনই মূল্যবান, যেমন সমাজের প্রকাশ্য ময়দানে সম্পাদিত কোনো বড় দায়িত্ব।
এ কারণে ইসলামে নারী-পুরুষকে একই রকম দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, কারণ তাদের অঙ্গন, সামর্থ্য, প্রাকৃতিক প্রবণতা ও সামাজিক প্রয়োজন সবক্ষেত্রে এক নয়। কিন্তু এখান থেকে অন্যায় বৈষম্যের ধারণা টানা ভুল। ইসলাম দায়িত্বের ক্ষেত্র ভিন্ন হতে পারে বলে স্বীকার করেছে, কিন্তু মর্যাদা ও প্রতিদানে কাউকে কম মনে করেনি। আধুনিক যুগে অনেক সময় নারী-অধিকারের ভাষ্য এমনভাবে দাঁড়ায় যে, ঘরের ভেতরের দায়িত্ব যেন অবমূল্যায়িত হয়, আর ঘরের বাইরে দৃশ্যমান উপস্থিতিকেই একমাত্র মুক্তি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এ জন্য নারীকে অধিকার প্রদানের নামে ঘরের বাইরে আনা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো- যে সমাজ পরিবারকে দুর্বল করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াতগুলোর শিক্ষা হচ্ছে- ইসলাম নারীকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে অদৃশ্য সত্তা বানায়নি, আবার সমাজের প্রদর্শনীর বস্তু হিসেবেও দেখেনি। বরং নারী-পুরুষ উভয়কেই এমন মর্যাদা দিয়েছে, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে আল্লাহর কাছে পূর্ণ স্বীকৃতি ও প্রতিদানের অধিকারী। মানুষের চোখ অনেক সময় শুধু প্রকাশ্য কাজ দেখে; কিন্তু আল্লাহ অন্তর, নিয়ত এবং নীরব ত্যাগও দেখেন; এবং কোনো আন্তরিক শ্রমই তাঁর কাছে হারিয়ে যায় না। ইমাম তবারী (র.) বলেন: আয়াতাংশের অর্থ হলো- “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কর্ম বাতিল করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী” (তাফসীর আল-তবারী: ৭/৪৮৬)। স্পষ্ট বার্তা এসেছে সূরাতু আত-তাওবাহ এর ৭১ নম্বর আয়াতে:
﴿وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِناتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِياءُ بَعْضٍ﴾.
অর্থাৎ: “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী- তারা একে অপরের অভিভাবক, সহায়ক ও সহযোগী”। তাই যারা বলে ইসলাম নারীকে অধিকার দেয়নি, এই আয়াত তাদের জন্য স্পষ্ট জবাব বহন করে।
এছাড়াও কোরআন-হাদীস ও সীরা গ্রন্থ থেকে স্পষ্ট হয়ে যে ইসলাম নারীকে ঘরের বাইরে যেতে বাধা দেয়নি। পর্দার বিধান রক্ষা করে ঘরের বাইরের যে কোন কাজে অংশ নেয়ার অধিকার ইসলাম তাকে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: তাদের দাবী উত্তারাধীকার সম্পত্তিতেও ইসলাম নারীর অধিকার নষ্ট করেছে। উল্লেখিত আয়াতাংশে ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোন ক্ষেত্রেই ইসলাম নারীর অধিকারকে নষ্ট করেনি, নারী-পুরুষ ঊভয়কে যথার্থ অধিকার দিয়েছে। আসুন এখন বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখি, কোরআনের আলোকে একটি সহজ হিসাব দেখলে বোঝা যায়- ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীকে বঞ্চিত করেনি; বরং নির্দিষ্ট অংশ নিশ্চিত করেছে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা সম্পত্তি রেখে মারা গেলেন। তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে আছেন এক ছেলে ও এক মেয়ে। কুরআনের বিধান অনুযায়ী, ছেলের অংশ হবে দুই মেয়ের সমান। অর্থাৎ মোট অংশ ধরা হবে ৩ ভাগ ছেলে পাবে ২ ভাগ, মেয়ে পাবে ১ ভাগ। তাহলে ১২ লাখ টাকা ভাগ ৩ = প্রতি ভাগ ৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে ছেলে পাবে ৮ লাখ টাকা, আর মেয়ে পাবে ৪ লাখ টাকা। এখানে অনেকে শুধু সংখ্যার পার্থক্যটি দেখেন, কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থার পূর্ণ চিত্রটি দেখেন না। ছেলেকে ভবিষ্যতে মহর দিতে হবে, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বহন করতে হবে, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে; কিন্তু মেয়ের ওপর এমন বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব নেই। সে যে ৪ লাখ টাকা পাবে, তা তার ব্যক্তিগত সম্পদ, স্বামী, ভাই, বাবা বা সন্তানের জন্য তা খরচ করা তার ওপর ফরজ নয়। অর্থাৎ বাহ্যিক অঙ্কে ছেলের অংশ বেশি হলেও, ব্যয়ের দায়ও তার ওপর বেশি; আর মেয়ের অংশ কম হলেও তা তার জন্য সংরক্ষিত অধিকার। এভাবে ইসলাম কেবল সংখ্যাগত সমতা নয়, বরং দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই বলা সঠিক নয় যে ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার থেকে ঠকিয়েছে; বরং এমন এক সমাজে, যেখানে বহু স্থানে নারীকে উত্তরাধিকার থেকেই বঞ্চিত করা হতো, ইসলাম তার নির্ধারিত অংশকে আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আরেকটি উদাহরণ নিন। ধরুন, একজন ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা রেখে ইন্তেকাল করলেন। ওয়ারিশ হিসেবে আছেন স্ত্রী, বাবা, মা, এক ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী বণ্টনে স্ত্রীর অংশ ১ লাখ ৫০ হাজার, বাবার ২ লাখ, মায়ের ২ লাখ। অবশিষ্ট ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ছেলে পায় প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা, আর মেয়ে পায় প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। বাহ্যিকভাবে এখানে মনে হতে পারে ছেলে বেশি পেল। কিন্তু এখন পরের বাস্তব চিত্রটি দেখুন। ধরা যাক, ছেলে বিয়ের সময় ১ লাখ টাকা মহর দিল, বছরে ন্যূনতম ১ লাখ টাকা করে স্ত্রী-সন্তানের প্রয়োজনীয় ভরণপোষণে খরচ করল, মাত্র দুই বছরেই আরও ২ লাখ টাকা ব্যয় হলো। অর্থাৎ তার ৪ লাখ ৩৩ হাজার থেকে মোটামুটি ৩ লাখ টাকা দায়িত্ব পালনে চলে গেল। হাতে অবশিষ্ট থাকল প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে মেয়ে যে ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা পেল, সেই সম্পদের ওপর তার নিজের কোনো বাধ্যতামূলক পারিবারিক ব্যয় নেই; স্বামী, সন্তান, ভাই বা বাবা, কারও জন্য তা খরচ করা তার ওপর ফরজ নয়। ফলে তার পুরো অংশটিই তার ব্যক্তিগত মালিকানায় থেকে যেতে পারে। এখানেই ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ন্যায়বিচারটি স্পষ্ট হয়। শুধু “কে বেশি পেল” তা দেখলে ছবির অর্ধেক দেখা হয়; কিন্তু “কে কত দায়িত্ব বহন করবে” তা যোগ করলে বোঝা যায়, ইসলাম কেবল সংখ্যার হিসাব করেনি, বরং দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যও বিবেচনায় নিয়েছে। এ কারণেই কুরআন উত্তরাধিকারকে নিছক গাণিতিক সমতা নয়, বরং সুবিচারভিত্তিক বণ্টন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। ১৯৫ নম্বর আয়াতের শেষাংশে, যে সকল জ্ঞানীদের মধ্যে উল্লেখিত পাঁচটি গুণ পাওয়া যাবে, তাদের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে:
(ক) আল্লাহ তা’আলা তাদের কৃত সৎআমল নষ্ট করবেন না।
(খ) আল্লাহ তা’আলা তাদের গুনাহ মাফ করবেন।
(গ) তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত।
৪। সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯১-১৯৫) নম্বর আয়াতের আলোকে আল্লাহর কাছে দোয়ার মধ্যে কয়েকটি মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার শিক্ষা পাওয়া যায়। এই আয়াতগুলোতে মুমিনদের দোয়া শুধু চাওয়া নয়; বরং চিন্তা, ঈমান, আত্মসমর্পণ, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আখিরাতের সফলতার পূর্ণ আবেদন। একটি দোয়ায় অন্তর্ভূক্ত বিষয়গুলো নি¤œরুপ:
(ক) আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা স্বীকার করা, ১৯১ নম্বর আয়াতে তারা বলে: “সুবহানাকা” “আপনি পবিত্র”। অর্থাৎ দোয়ার শুরুতে আল্লাহর তাসবীহ, মহিমা ও পরিপূর্ণতা স্বীকার করা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব।
(খ) জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাওয়া, “ফাকিনা আযাবান-নার”, “আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন”। এ থেকে বোঝা যায়, দোয়ার একটি প্রধান বিষয় হওয়া উচিত আখিরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা।
(গ) লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে মুক্তি কামনা, ১৯২ নম্বর আয়াতে জাহান্নামে প্রবেশকে চরম অপমান বলা হয়েছে। অতএব দোয়ায় শুধু কষ্ট দূর করার আবেদন নয়, বরং আল্লাহর কাছে সম্মানজনক পরিণতি চাওয়াও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
(ঘ) ঈমানের উপর অটল থাকার স্বীকারোক্তি, ১৯৩ নম্বর আয়াতে তারা বলে: “আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি এবং ঈমান এনেছি”। দোয়ার মধ্যে নিজের ঈমানের অঙ্গীকার ও হিদায়াতের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।
(ঙ) গুনাহ মাফ ও ত্রুটি মোচনের আবেদন, এই আয়াতে তিনটি বড় আবেদন আছে- “আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন”, “আমাদের পাপ মোচন করুন” এবং “নেককারদের সাথে মৃত্যু দিন”। এখানে দোয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মশুদ্ধি ও উত্তম পরিণতির আবেদন।
(চ) আল্লাহর প্রতিশ্রুত কল্যাণ প্রার্থনা, ১৯৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন”। অর্থাৎ দোয়ার মধ্যে জান্নাত, রহমত, মাগফিরাত ও আল্লাহর ওয়াদাকৃত কল্যাণ চাওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
(ছ) কিয়ামতের দিনের সফলতা কামনা, “কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না”। এ থেকে বোঝা যায়, মুমিনের দোয়া দুনিয়াবিমুখ নয়; তবে তার কেন্দ্রবিন্দু আখিরাত।
(জ) নেক আমল কবুল হওয়ার আশা, ১৯৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ উত্তর দেন যে, তিনি কারও আমল নষ্ট করেন না। অতএব দোয়ার মধ্যে নিজের আমল কবুল হওয়ার আবেদন ও আশা থাকা উচিত। এক কথায়, এই আয়াতগুলো শেখায়- মুমিনের দোয়া শুধু দুনিয়ার প্রয়োজনে নয়; বরং ঈমান, ক্ষমা, হিদায়াত ও আখিরাতের সফলতাকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত।
৫। প্রচলিত ধারায় জ্ঞানী বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়, যার তথ্যভা-ার সমৃদ্ধ, বিশ্লেষণক্ষমতা প্রবল, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা উচ্চ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কখনো কখনো এমন প্রবণতাও দেখা যায় যে, কিছু মানুষের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, কিংবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে হালকা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে পারাকেও এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধুনিকতা বা কৃতিত্ব বলে মনে করা হয়। কিন্তু কুরআনের আলোকে জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যার চিন্তা তাকে ¯্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়, যার জ্ঞান তাকে বিনয়ী করে, এবং যার উপলব্ধি তাকে দোয়ার দরজায় দাঁড় করায়। ইমাম বাগভী (র.) বলেন:
“مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا أَيْ عَبَثًا لَا لِحِكْمَةٍ”.
অর্থ: “আপনি এসব অনর্থক বা হিকমতহীনভাবে সৃষ্টি করেননি”। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানী সৃষ্টিকে দেখে শুধু বাহ্যিক রূপ বা বেজ্ঞানিক তথ্যেই থেমে থাকে না; বরং এর পেছনে আল্লাহর হিকমত, কুদরত ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করে। তাই তাদের চিন্তার শেষ কথা হয়-
“رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ”.
এখানেই প্রচলিত জ্ঞানী ও কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানীর মৌলিক পার্থক্য। প্রচলিত জ্ঞান তথ্য বাড়ায়, আর কুরআনী জ্ঞান ঈমান, তাসবীহ, বিনয় ও আখিরাত-সচেতনতা বাড়ায়।
আজকের বাস্তবতায় মানুষের তথ্য বেড়েছে, বিশ্লেষণ বেড়েছে, কিন্তু তাফাক্কুর, আত্মসমালোচনা ও আল্লহভীতি অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে; ফলে অনেক শিক্ষিত মানুষও কুরআনের ভাষায় প্রকৃত “উলুল আলবাব” হয়ে উঠতে পারে না। এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, জ্ঞান তখনই সত্যিকার জ্ঞান হয় যখন তা যিকিরের সঙ্গে যুক্ত হয়, চিন্তাকে হিদায়াতে রূপ দেয়, গুনাহের জন্য ইস্তিগফারে উদ্বুদ্ধ করে এবং মানুষকে এই দোয়ায় পৌঁছে দেয়- অতএব আমাদের গুনাসমূহকে ক্ষমা করে দাও। অতএব আমাদের করণীয় হলো শুধু তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানকে তাফাক্কুরে, তাফাক্কুরকে যিকিরে, যিকিরকে আমলে এবং আমলকে আখিরাতমুখী দোয়ায় রূপান্তর করা; কারণ কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞানী সেই নয়, যে অনেক জানে, বরং সেই, যে সঠিকভাবে দেখে, গভীরভাবে চিন্তা করে, আল্লাহকে চিনে এবং সেই জ্ঞানকে জীবনের পথনির্দেশে পরিণত করে। (আল্লাহই ভালো জানেন)।
৬। উল্লেখিত আয়াতসমূহ আমাদেরকে তিনটি বিষয়ে বার্তা দিয়েছে:
(ক) প্রকৃত জ্ঞানীর পরিচয় প্রদান করেছে।
(খ) আল্লাহর কাছে দোয়া করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।
(গ) নারী-পুরুষের প্রকৃতি, আকৃতি ও অঙ্গন আলাদা হলেও তারা একে অপরের সহযোগী।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) একজন প্রকৃত জ্ঞানীর উচিৎ সর্বাবস্থায় দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে- জীবনের সব অবস্থায় অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে সচল রাখা। শুধু সালাতের ভেতর নয়; কাজের ফাঁকে, চলার পথে, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করা।
(খ) আকাশ, জমিন, রাত-দিনের পরিবর্তন, জীবন ও প্রকৃতির শৃঙ্খলা দেখে আল্লাহর কুদরত, হিকমত ও রহমত উপলব্ধি করার অভ্যাস গড়ে তোলা; শুধু দেখা নয়, দেখে শিক্ষা নেওয়া।
(গ) গুনাহ মাফ, অন্তরের শুদ্ধি, হিদায়াতে অটল থাকা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং নেককারদের সঙ্গ কামনা, এসবকে নিজের নিয়মিত দোয়ার অংশ করা।
(ঘ) শুধু তথ্য অর্জন নয়; যা জানা হয় তা জীবনচর্চায় প্রয়োগ করা, সত্যকে গ্রহণ করা, ভুল থেকে ফিরে আসা, প্রয়োজনে আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করা, এবং নিজের দায়িত্বের জায়গায় আমানতদার থাকা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮৭-১৮৯) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: সত্য গোপন, নিজের কাজে আত্মতুষ্টি এবং অযথা প্রশংসা চাওয়ার পরিণতি।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ (187) لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (188) وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (189)﴾ [سورة آل عمران: 187-189].

 

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: সত্য গোপন, নিজের কাজে আত্মতুষ্টি এবং অযথা প্রশংসা চাওয়ার পরিণতি।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
যখন আল্লাহ্ সেই ব্যক্তিদের সাথে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, যাদেরকে কিতাব দান করা হয়েছিল, যে তারা তা মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না, কিন্তু তারা সেটিকে পেছনে ফেলে দিয়েছিল এবং তা খুব সামান্য মূল্যে বিক্রি করেছিল; এটি খুবই নিন্দনীয় কাজ যা তারা করেছিল।
যারা যা পেয়েছে তাতে খুশি হয় এবং যা করেনি তার জন্য তারা প্রশংসা পেতে চায়, তাদেরকে মনে করা উচিত না যে তারা নিরাপদ, বরং তাদের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আকাশ ও পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহর, আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশালী।
আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
উল্লেখিত আয়াতসমূহের প্রসঙ্গ এখনো ইহুদিদের নিয়েই অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল মুহাম্মদকে (সা.) নির্দেশ দেন- তিনি যেন তাদের স্মরণ করিয়ে দেন সেই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ তায়ালা ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। অঙ্গীকার ছিল এই যে, তারা তাদের কিতাব তাওরাত ও ইনজিলে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা.) গুণাবলি মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে, তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর অনুসরণ করবে, যিনি হেদায়াত ও সত্য দ্বীন ইসলাম নিয়ে আগমন করেছেন। কিন্তু তারা এ অঙ্গীকার গোপন করে এবং উপেক্ষা করে পেছনে নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা এর বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থ, পদমর্যাদা ও সম্পদ গ্রহণ করেছে।
পরবর্তী আয়াতে তাদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারিত হয়েছে, যারা নিজেদের কৃতকর্মে আনন্দিত হয় এবং যা করেনি, তার জন্যও মানুষের প্রশংসা কামনা করে। যারা আল্লাহর বাণী বিকৃতি করে, বিধান পরিবর্তন করে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তারা কখনোই শাস্তি থেকে নিরাপদ নয়। তারা নিজেদের অন্যায় কাজেই সন্তুষ্ট থাকে। উপরন্তু, তারা চায় মানুষ তাদের অপকর্মেরও প্রশংসা করুক, এমনকি যে কাজ তারা করেনি- তার জন্যও তারা কৃতিত্ব পেতে আগ্রহী। বাস্তবে তারা কল্যাণ নয়, বরং অকল্যাণই বিস্তার করেছে। ফলে তারা কোনোভাবেই শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে না; বরং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সর্বময় সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে বলেন: আকাশম-লী ও পৃথিবীর মালিকানা একমাত্র তাঁরই, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তিনি অপরাধীকে শাস্তি দিতে এবং প্রতিশোধ নিতে সম্পূর্ণ সক্ষম এবং তিনি অবশ্যই তাঁর শাস্তির অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবেন, দুনিয়াতেও এবং আখিরাতেও। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৩; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৫; আল-মুনতাখাব: ১/১২০) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلا تَكْتُمُونَهُ﴾ “তোমরা এটি মানুষের কাছে বর্ণনা করে দাও; সাবধান, তা গোপন করো না”, আয়াতাংশে ‘এটি’ (সর্বনাম) দ্বারা কাকে বোঝায়, এ নিয়ে দুটি মত আছে।
(ক) সাঈদ ইবনু জুবাইর ও আস-সুদ্দী (র.) বলেন: এখানে ‘এটি’ দ্বারা মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহকে (সা.) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর ব্যাপারটি মানুষকে স্পষ্টভাবে জানাতে বলা হয়েছে, যদিও তাঁর নাম আয়াতে সরাসরি উল্লেখ নেই, কিন্তু জানা আছে।
(খ) অন্যদিকে আল-হাসান আল-বাসরী ও কাতাদা ইবনু দিআমাহ (র.) বলেন: এখানে ‘এটি’ বলতে ‘কিতাব’ (তাওরাত ও ইনজিল) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল যে, তারা কিতাবের মধ্যে থাকা সত্যগুলো- বিশেষ করে রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুওয়তের প্রমাণ মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবে এবং তা গোপন করবে না। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: (৯/৪৫৫) । এখানে দুইটি মতের মধ্যে কোন ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না। তবে দ্বিতীয় মতটি অধিকতর সঠিক। (যাহরাতুত তাফাসির, আবু যাহরাহ: ৩/১৫৪১) ।
﴿يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا﴾ “তারা নিজেদের কৃতকর্মে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে এবং যা করে নাই সে বিষয়ে প্রশংসিত হতে ভালোবাসে”, এখানে বক্তব্যটি মূলত ইহুদী-খ্রিষ্টানদের এক ধরনের ভ-ামি ও আত্মপ্রবঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছে। ইহুদী আলেমরা আল্লাহর কিতাব তাওরাতের আসল বক্তব্যকে পরিবর্তন করে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করত। তারা নিজেদের স্বার্থে ভুল ব্যাখ্যা বানিয়ে সাধারণ, অজ্ঞ মানুষদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিত। এতে তারা আনন্দও পেত; কারণ এর মাধ্যমে তারা প্রভাব, সম্মান বা দুনিয়াবি লাভ অর্জন করত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- এই কাজগুলো করার পরও তারা চাইতো মানুষ তাদেরকে ধার্মিক, সৎ, পবিত্র ও সত্যবাদী বলে সম্মান দিক। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: (৯/৪৫৬) ।
বাস্তব দৃষ্টিতে এ স্বভাবটি শুধু সেই বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই এই প্রবণতা দেখা যায়। অনেক মানুষ দুনিয়ার স্বার্থ অর্জনের জন্য বিভিন্ন কৌশল, কখনো অসৎ উপায়ও অবলম্বন করে। তারা যখন তাদের লক্ষ্য অর্জন করে, তখন খুশি হয়। কিন্তু একই সাথে তারা চায় মানুষ তাদেরকে ভালো, সৎ ও দ্বীনদার হিসেবে জানুক এবং প্রশংসা করুক। (আল্লাহই ভালো জানেন)
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আল্লাহ তা’আলা যখন পূর্বে ইহুদিদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুয়াত সম্পর্কে বিভিন্ন সন্দেহ ও আপত্তির কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলোর জবাবও দিয়েছেন, তখন এই আয়াতগুলো উল্লেখ করেছেন তাদের অদ্ভুত অবস্থা ও বিচিত্র আচরণ প্রকাশ করার জন্য। এবং বোঝানোর জন্য যে, তাদের জন্য নবুয়াত নিয়ে আপত্তি তোলা বা ইসলামের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করা মোটেই শোভনীয় নয়। কারণ, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ওপর দায়িত্ব ছিল তাওরাত ও ইনজিলের বর্ণনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং সেগুলোর মধ্যে থাকা সেইসব নিদর্শন প্রকাশ করা, যা রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুয়াত ও তাঁর রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্য বহন করে। (তাফসির আল-মারাগী: ৪/১৫৫-১৫৬) ।
১৮৮ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন যে, হামিদ ইবনু আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, মারওয়ান তার দরোয়ানকে বললেন: হে রাফে! তুমি ইবনু আব্বাসের কাছে গিয়ে বলো: যদি আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মে আনন্দিত হওয়া এবং যা সে করেনি সে বিষয়ে প্রশংসা পছন্দ করার কারণে শাস্তি পায়, তাহলে তো আমরা সবাই শাস্তি পাব। তখন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন: তোমাদের এ কথার সাথে এই আয়াতের কী সম্পর্ক? এই আয়াত তো আহলে কিতাবদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে একটি বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু তারা সেই সত্য বিষয়টি গোপন করল এবং এর বদলে অন্য উত্তর দিল। এরপর তারা এমন ভাব দেখিয়ে বের হলো যেন তারা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সঠিক উত্তর দিয়েছে। এভাবে তারা তাঁর প্রশংসা পাওয়ার আশা করল। আর তারা আনন্দিত হয়েছিল এ কারণে যে, তারা রাসূলুল্লাহর জিজ্ঞাসিত সত্য বিষয়টি গোপন করতে পেরেছে। (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৬) ।
সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে: কিছু মুনাফিক লোক ছিল- যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের জন্য বের হতেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে না গিয়ে পিছনে থেকে যেত এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) বিরোধিতা করে নিজেদের বসে থাকায় আনন্দিত হতো। এরপর তিনি (যুদ্ধ থেকে) ফিরে এলে তারা তাঁর কাছে অজুহাত পেশ করত, শপথ করত এবং এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে চাইত যা তারা করেনি। তখন আল্লাহ তায়ালা ৮৮ নং আয়াত নাযিল করে মুনাফিকদের সেই চরিত্রের নিন্দা করছেন- যারা দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, মিথ্যা অজুহাত দেয়, নিজেদের কুকর্মে সন্তুষ্ট থাকে এবং না করা কাজের জন্যও প্রশংসা কামনা করে। (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৭)।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের ১৮৭-১৮৯ নম্বর আয়াতসমূহে আল্লাহ তা’আলা বিশেষভাবে সত্য গোপন করার ভয়াবহতা, নিজ কুকর্মে আনন্দ প্রকাশ ও মিথ্যা প্রশংসার প্রতি আসক্তির নিন্দা এবং তাঁর সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কথা তুলে ধরেছেন। উল্লেখিত আয়াতসমূহের মৌলিক শিক্ষা নি¤েœ তুলে ধরা হলো-
১। আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) ১৮৭ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষা উল্লেখ করেছেন-
(ক) আহলে কিতাবের আলেমদের ওপর আল্লাহ তা’আলা সত্য কথা প্রকাশ করার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। এই বিধান ইসলামের আলেমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের ওপর ফরজ হলো- সত্যকে প্রচার করা ও প্রকাশ্যে তুলে ধরা। মানুষের সন্তুষ্টির জন্য পার্থিব লাভ (ধন-সম্পদ, মর্যাদা বা ক্ষমতা) অর্জনের উদ্দেশ্যে অথবা কৌশল অবলম্বনের অজুহাত দিয়ে সত্য গোপন করা বা বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করা তাদের জন্য হারাম, যা বর্তমান মুসলিম সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
(খ) কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজের অপকর্ম থেকে তাওবা না করে বরং আত্মতুষ্টিতে ভুগবে এবং সে এমন কাজের জন্য প্রশংসা পেতে ভালোবাসবে যা সে করেনি। বরং পূর্ণতার লক্ষণ হলো- মানুষের প্রশংসার প্রতি আকাক্সক্ষা না রাখা, যদিও সে এমন কাজ করে থাকে যা প্রশংসার যোগ্য। তাহলে যে ব্যক্তি ভালো কাজই করেনি অথচ প্রশংসা চায়, তার অবস্থা কত নিন্দনীয়!। আরো নিকৃষ্ট হলো সেই ব্যক্তি, যে মন্দ ও খারাপ কাজ করে এবং তবুও চায় মানুষ তাকে প্রশংসা করুক, করতালি দিক এবং “জয় হোক অমুকের!” বলে সমর্থন দিক, যা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব বেশী পরিলক্ষিত হচ্ছে।
(গ) আল্লাহ তা’আলার সার্বভৌম মালিকানা ও সর্বশক্তিমান হওয়া, এই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে তাঁর প্রতি ভয় (খশিয়ত) ও তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনের আগ্রহ সৃষ্টি করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ ব্যাপারে গাফেল এবং এ সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে। (আইসার আল-তাফাসির, জাযায়েরী (১/৪২৪)।
২। ইমাম ওহাবা আল-জুহাইলী (র.) বলেন: ১৮৭ নং আয়াত থেকে মুসলিম আলেমদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব স্পষ্ট হয়:
(ক) আল্লাহর কিতাব পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা, যেন মানুষ তা সহজে বুঝতে পারে এবং এর উপদেশ ও বিধানগুলোর গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে।
(খ) মুসলমানদের কাছে দ্বীনকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে তারা এর প্রকৃত রূপ বুঝতে পারে এবং উপলব্ধি করে যে, উম্মাহর পিছিয়ে পড়া, দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ইসলাম ধর্ম।
(গ) অমুসলিমদের কাছেও দ্বীনের শিক্ষা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদেরকে সরল পথে আহ্বান করা, যাতে তারা হিদায়াত লাভ করতে পারে। (তাফসীর আল-মুনীর, আল-জুহাইলী: ৪/২০২-২০২) ।
৩। মুসলিম জাতিকে তুচ্ছজ্ঞান ও অসম্মান করার উদ্দেশ্যে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের একাংশ তাদের কিতাবে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং তার গুণাবলীকে গোপন রাখত। শুধু তাই নয়, তারা কাফিরদেরকে মুসলমানদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করত। এ বিষয়ে কোরআনের একটি আয়াতে উল্লেখ রয়েছে-
﴿أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيباً مِنَ الْكِتابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هؤُلاءِ أَهْدى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا أُولئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَنْ يَلْعَنِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيراً﴾ [سورة النساء: ৫১-৫২].
অর্থ: “তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের একটি অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিবত ও তাগূতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং কাফিরদের সম্পর্কে বলে- এরা মুমিনদের তুলনায় অধিক সঠিক পথে রয়েছে।’ এরা সেই লোক, যাদের ওপর আল্লাহ লা‘নত করেছেন। আর যাকে আল্লাহ লা‘নত করেন, তুমি কখনোই তার জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না” (সূরাতু আন-নিসা: ৫১-৫২) ।
আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
১. দ্বীনের সত্য জ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা এবং কোনো অবস্থাতেই তা গোপন না করা।
২. নিজের আমলে আত্মতুষ্টিতে না ভোগা এবং না করা কাজের জন্য প্রশংসা কামনা থেকে বিরত থাকা।
৩. মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে পৌঁছে দেওয়া।
৪. দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য দ্বীনের বিধান বিকৃতি বা পরিবর্তন না করা।
৫. আল্লাহ সর্বশক্তিমত্তা স্মরণ রেখে তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করা এবং জবাবদিহিতার প্রস্তুতি নেওয়া।

 

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮৫-১৮৬) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মৃত্যু, প্রতিদান ও পরীক্ষা: মানব জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ (185) لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ (186)﴾ [سورة آل عمران: 185-186].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: মৃত্যু, প্রতিদান ও পরীক্ষা: মানব জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(১৮৫) প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই-ই সফল। আর দুনিয়ার জীবন তো কেবল প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী।
(১৮৬) তোমাদেরকে অবশ্যই তোমাদের সম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে পরীক্ষা করা হবে। আর তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয়ই তা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আয়াতের প্রসঙ্গ এখনো রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিদের সান্ত¡না দেওয়ার ধারায় চলছে। আগের আয়াতে ইহুদি ও মুশরিকদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি যে মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেনÑআল্লাহ তা‘আলা সে বিষয়ে তাঁকে সান্ত¡না দেন। আর এই আয়াতে রয়েছে আরও গভীর ও মহৎ সান্ত¡না।
(১৮৫) এখানে আল্লাহ ঘোষণা করছেনÑপ্রত্যেক প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে; সে যত বড় মর্যাদারই হোক বা যত সামান্যই হোক, কারও জন্যই মৃত্যু থেকে রেহাই নেই। এরপর আল্লাহ স্পষ্ট করে দেন যে, দুনিয়া প্রতিদানের জায়গা নয়; এটি কাজ করার জায়গা। তাই দুনিয়ায় অনেক সময় দেখা যায়Ñঅপরাধীরা অপরাধ করে, যালিমরা যুলুম করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কোনো শাস্তি পায় না। আবার সৎকর্মশীলরা ভালো কাজ করে, সংশোধনকারীরা সমাজের কল্যাণে কাজ করে, তবুও তারা দুনিয়ায় কাক্সিক্ষত প্রতিদান পায় না। এতে মুমিনের জন্য রয়েছে বড় সান্ত¡না; কারণ প্রকৃত বিচার ও প্রতিদান হবে আখিরাতে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য এখানে তুলে ধরা হয়েছে- দুনিয়ার জীবন তার সমস্ত জৌলুস ও আকর্ষণসহ কেবলই ক্ষণস্থায়ী ভোগবস্তু। এটি বাহ্যিক সৌন্দর্য ও চাকচিক্যে মানুষকে মোহিত করে, কিন্তু অচিরেই তা মুছে যায় ও বিলীন হয়ে যায়। আসলে এটি এক প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী।
(১৮৬) অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনরা অবশ্যই পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন- তাদের সম্পদে এবং নিজেদের জীবনে। সম্পদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা হবে অভাব-অনটন, প্রয়োজন ও আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ দায়িত্ব (যেমন যাকাত ও অন্যান্য ব্যয়) আদায়ের মাধ্যমে। নিজেদের জীবনে পরীক্ষা হবে রোগব্যাধি, মৃত্যু এবং কঠিন ইবাদত ও দায়িত্ব- যেমন জিহাদ, হজ ও রোজার মাধ্যমে।
এছাড়া তারা অবশ্যই আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কাছ থেকে কষ্টদায়ক কথা ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য শুনবে। কেউ বলবে- “আল্লাহ গরিব, আমরা ধনী।” কেউ বলবেÑ“মসীহ আল্লাহর পুত্র।” আবার কেউ বলবেÑ“লাত, উয্যা ও মানাত আল্লাহর সাথে অন্যান্য উপাস্য।” এই সব কষ্ট ও পরীক্ষার মোকাবিলায় আল্লাহ তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন- “আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে অবশ্যই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ”। অর্থাৎ, ধৈর্য ও তাকওয়া শুধু ভালো গুণ নয়; এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত দায়িত্ব। এগুলো পালন করা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২১-৪২২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৯) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿ذَائِقَةُ الْمَوْتِ﴾ “মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী”-অর্থাৎ, আত্মা তার দেহের মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; কিন্তু আত্মা নিজে ধ্বংস বা বিলীন হয় না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২০) । এই বাক্যে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষের দেহ একসময় মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু আত্মা মরে না। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আত্মা অন্য জগতে (বরযখে) অবস্থান করে এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় দেহের সঙ্গে মিলিত হবে। তাই মৃত্যু মূলত দেহের জন্য; আত্মা ধ্বংস হয় না, বরং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় স্থানান্তরিত হয়। (আল্লাহই ভালো জানেন)
﴿مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾ “প্রতারনার ভোগ-সামগ্রী”, এখানে متاع বলতে এমন বস্তু বা ভোগের উপকরণ বোঝায়, যা মানুষ সাময়িকভাবে ব্যবহার করে বা উপভোগ করে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায় বা বিলীন হয়ে যায়। আর الغرور (প্রতারণা) শব্দটি এর সাথে যুক্ত হওয়ায় বোঝানো হয়েছে যে, দুনিয়ার এই সাময়িক ভোগ-বিলাস মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করতে পারে। এই কারণেই প্রসিদ্ধ তাবেঈ মুফাসসির ক্বাতাদা (র.) বলেছেন:
“الدنيا متاعٌ متروك، يوشك أن تضمحلَّ بأهلها”.
অর্থাৎ, “দুনিয়া এমন এক ভোগ-সামগ্রী, যা একদিন অবশ্যই ছেড়ে যেতে হবে; অচিরেই তা তার অধিবাসীদেরসহ বিলীন হয়ে যাবে”। দুনিয়ার জীবন ও তার ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী এবং প্রতারণাময়। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا كَمَا يَغْمِسُ أَحَدُكُمْ أُصْبُعَهُ فِي الْيَمِّ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا فَيَنْظُرُ بِمَا تَخْرُجُ.
অর্থাৎ- “আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থান এমন, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে তার আঙুল ডুবিয়ে আবার তুলে নেয়; তারপর দেখে- তার আঙুলে কতটুকু পানি ফিরে আসে” (মুসনাদে বায্যার: ৩৪৬০) ।
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ সা.-কে সান্ত¦না দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী এই আয়াতগুলোতেও সেই সান্ত¦নার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে: আপনি তাদের যে একগুঁয়েমি, অবাধ্যতা ও বিরোধিতা দেখছেন, তা স্থায়ী নয়; বরং এরও একদিন শেষ হবে। যা আসন্ন, তা খুবই নিকটবর্তী। সুতরাং আপনি তাদের আচরণে বিরক্ত বা দুঃখিত হবেন না। কারণ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সকল কাজের যথাযথ প্রতিফল পাবে। দুনিয়ার জীবন অতি সংক্ষিপ্ত, আর কিয়ামতের দিনই হলো প্রকৃত প্রতিদানের দিন। একই সঙ্গে এই আয়াতদ্বয় মুমিনদের প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। এতে তাদের শেখানো হয়েছে- তারা যেন নিজেদেরকে সামনে আসা সম্ভাব্য কষ্ট, নির্যাতন ও নানা কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে সহ্য করার জন্য প্রস্তুত করে। যাতে হঠাৎ করে এসব বিপদ এসে উপস্থিত হলেও তারা বিচলিত না হয় এবং দৃঢ়তার সাথে তা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ মুমিন ব্যক্তি আগে থেকেই ধৈর্য ও ঈমানের শক্তিতে নিজেকে প্রস্তুত রাখে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি ঈমান থেকে বঞ্চিত, সে যখন বিপদ ও কষ্টের মুখোমুখি হয়, তখন সহজেই ভেঙে পড়ে। তার মন সংকুচিত হয়ে যায়, সে বিরক্ত ও অস্থির হয়ে ওঠে, এমনকি অনেক সময় জীবনের প্রতিও তার অনীহা তৈরি হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯২) ।

১৮৬ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
﴿وَلَتَسْمَعُنَّ﴾ আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে- এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল এক ঘটনার প্রেক্ষিতে। তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সাথে এক ইহুদি ব্যক্তি ফিনহাস-এর তর্ক হয়। সেই ইহুদি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে বলেছিল: “আল্লাহ তো দরিদ্র, আর আমরা ধনী”। এই ধৃষ্টতাপূর্ণ কথার প্রসঙ্গেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
আরেক বর্ণনায় মুফাসসির আব্দুর রাযযাক সানআনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতটি কাব ইবনুল আশরাফ-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। সে ছিল একজন বিদ্বেষী ব্যক্তি, যে কবিতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সা.-কে ব্যঙ্গ করত এবং তার কবিতার দ্বারা কুরাইশরা কাফিরদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দিত। (লুবাব আল-নুকুল, সুয়ূতী: ৭৬) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
ভূমিকা: সূরাতু আলে-ইমরানের উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনদেরকে সান্ত¦না, সমবেদনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এখানে স্মরণ করানো হয়েছে যে, যারা মুসলমানদেরকে কষ্ট দিচ্ছে তারা এ দুনিয়াতে চিরস্থায়ী নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং মানুষের প্রকৃত প্রতিদান দেওয়া হবে আখিরাতে, তাই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। একই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনদেরকে জানানো হয়েছে যে, দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে ধন-সম্পদ, জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং বিশেষ করে আহলে কিতাব- ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এবং মুশরিকদের কাছ থেকে কষ্টদায়ক কথার সম্মুখীন হতে হবে। এ পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা হলো মুমিনের জন্য উত্তম ও দৃঢ় সংকল্পপূর্ণ পথ।

১। ১৮৫ নং আয়াত থেকে নি¤েœর বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়-
(ক) সকলকেই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহণ করতে হবে, ইমাম কুরতুবি র. তার তাফসির গ্রন্থে মৃত্যু সম্পর্কিত কিছু বিধান উল্লেখ করেছেন:
প্রথম বিধান: মৃত্যুর সময় মৃতকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালেমা শিখিয়ে দেওয়া সুন্নত, যাতে তার শেষ কথা ঈমানের সাক্ষ্য হয়। এ সময় সূরা ইয়াসীন পড়াও উত্তম। মৃত্যুর পর জীবিতদের উপর কিছু দায়িত্ব আসে, যেমন: মৃতের চোখ বন্ধ করা, সৎ লোকদেরকে মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া, দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
দ্বিতীয় বিধান: মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া শরীয়তে প্রতিষ্ঠিত বিধান। অধিকাংশ আলেমের মতে এটি সুন্নত, আবার কেউ কেউ এটিকে ওয়াজিব বলেছেন।
এটি জানাবাতের গোসলের মতোই করা হয় এবং সাধারণত তিন, পাঁচ বা সর্বোচ্চ সাতবার ধোয়া হয়।
তৃতীয় বিধান: কাফন দেওয়া ওয়াজিব। যদি মৃতের সম্পদ থাকে, তবে তা তার সম্পদ থেকেই করা হবে। কাফনের কাপড় সাদা হওয়া উত্তম।
চতূর্থ বিধান: জানাযা নিয়ে দ্রুত চলা সুন্নত। অতিরিক্ত ধীরগতিতে চলা বা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব করা অনুচিত। তবে এমন দ্রুততা নয়, যা অনুসারীদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়।
পঞ্চম বিধান: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা ওয়াজিব। তাকে মাটির মধ্যে সমাহিত করা এবং ঢেকে দেওয়া আবশ্যক। এছাড়া জানাযার নামাজ ফরজে কিফায়া, অর্থাৎ কিছু লোক আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। (তাফসির আল-কুরতুবি: ৪/২৯৯-৩০১)।
(খ) দুনিয়ার জীবন প্রতিদানের স্থান নয়; এটি কর্মের স্থান, এই পৃথিবী মূলত মানুষের জন্য পরীক্ষার ময়দান। এখানে মানুষ তার আমল, চরিত্র ও বিশ্বাসের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করে। কিন্তু সেই কাজের পূর্ণ প্রতিদান দুনিয়াতে নয়; বরং আখিরাতে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেককে তার আমলের যথাযথ প্রতিদান দেবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরাতু গাফির-এর ১৭ এবং সূরাতু আল-যালযালাহ-এর ৭-৮ নং আয়াতে কথা বলেছেন।
আয়াতের প্রথমাংশে সূক্ষ্মভাবে কবর জীবনের (বারযাখের) নেয়ামত ও শাস্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের কর্মের ভিত্তিতে তাকে সেখানে আংশিক প্রতিদান দেওয়া হয় এবং সে তার পূর্বে সম্পাদিত আমলের কিছু নমুনা আগেই পেতে শুরু করে। এ কথা বুঝা যায় আল্লাহর এই বাণী থেকে (وإنما توفون أجوركم يوم القيامة) “তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান তো কিয়ামতের দিনই দেওয়া হবে” অর্থাৎ, আমলের পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত প্রতিদান কেবল কিয়ামতের দিনই দেওয়া হবে। এর আগে যে প্রতিদান দেওয়া হয়, তা আংশিক এবং তা বারযাখের জীবনে হয়ে থাকে। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৫৯) ।
(গ) প্রকৃত সফলতা হলো- জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ করা, মানুষ সাধারণত দুনিয়ার ধন-সম্পদ, পদ-মর্যাদা বা খ্যাতিকে সফলতা মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা হলো আখিরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জান্নাত লাভ করা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতে পারে- তাহলে দুনিয়ার সফলতাকে আমরা কীভাবে দেখবো? এর উত্তরে বলা যায়, দুনিয়াবী সফলতা- যেমন ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বড় ব্যবসায়ী হওয়া- এসব নিজে নিজে চূড়ান্ত সফলতা নয়; বরং এগুলো হলো প্রকৃত সফলতায় পৌঁছার মাধ্যম ও সিঁড়ি। এই সাফল্যগুলো তখনই অর্থবহ হয়, যখন এগুলোকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়। একজন ডাক্তার যদি তার জ্ঞান দিয়ে মানুষের সেবা করে, একজন ব্যবসায়ী যদি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে, আর একজন প্রকৌশলী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার কাজের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখে, তবে তাদের দুনিয়াবী সফলতা আখিরাতের সফলতায় রূপ নেয়। অতএব, আল্লাহর বিধান মেনে এই দুনিয়ার সিঁড়ি বেয়ে চলতে পারলে মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে এবং চিরস্থায়ী জান্নাত অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত ও পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করতে সক্ষম হয়। (আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন)
(ঘ) দুনিয়ার জীবন এক প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী, যা দ্রুত বিলীন হয়ে যায়, পৃথিবীর আনন্দ, সম্পদ ও সৌন্দর্য মানুষের চোখে আকর্ষণীয় মনে হলেও তা স্থায়ী নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো শেষ হয়ে যায়। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে পড়ে না গিয়ে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। (আইসার আল-তাফাসির, জাযায়িরী: ১/৪২২) । একই বিষয়ে আল্লাহ আল-আনকাবুত-এর ৬৪ এবং আল-হাদীদ-এর ২০ নম্বর আয়াতে কথা বলেছেন। এ সম্পর্কে সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
“لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ، مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ” (سنن الترمذي: ২৩২০).
“যদি দুনিয়া আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমান মূল্যবান হতো, তবে তিনি কোনো কাফিরকে এ দুনিয়া থেকে এক চুমুক পানিও পান করতে দিতেন না” (সুনানে তিরমিযী: ২৩২০)।
২। শায়খ আবু যাহরাহ তার তাফসীর গ্রন্থ ‘যাহরাতুত তাফাসীর’-এ লিখেছেন- ১৮৬ নম্বর আয়াতে এমন কিছু সূক্ষ্ম বর্ণনামূলক ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে এর গভীর তাৎপর্য স্পষ্ট হয়:
প্রথমত: এখানে রাসূলুল্লাহর সা. বিরোধীদের এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বুঝায় তারা দুই শ্রেণির, এক শ্রেণি হলো আহলে কিতাব, যারা পূর্ববর্তী নবীদের উপর অবতীর্ণ কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখত; আর দ্বিতীয় শ্রেণি হলো মুশরিক, যারা কোনো কিতাব মানে না এবং কোনো হেদায়েত অনুসরণ করে না। কুরআন এই দুই শ্রেণিকে একটি বিষয়ে একত্র করেছে- তারা সবাই রাসূলুল্লাহর সা. বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতা তাদেরকে সত্য অস্বীকারে প্ররোচিত করেছে। তাদের বিরোধিতা ব্যক্তিগত ছিল না; বরং রাসূলুল্লাহ সা. যা নিয়ে এসেছেন এবং যা প্রচার করেছেন, তার প্রতিই ছিল। এখানে জ্ঞানী ও অজ্ঞ- উভয়কে একত্রে উল্লেখ করার মধ্যে একটি গভীর ইঙ্গিত রয়েছে: যখন হঠকারিতা আসে, তখন জ্ঞানী ও অজ্ঞ সমান হয়ে যায়। অজ্ঞ ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতার অন্ধকারে বিভ্রান্ত থাকে, আর জ্ঞানীর অন্তরে আল্লাহ মোহর করে দেন, ফলে উভয়েই একই অবস্থায় পতিত হয়।
দ্বিতীয়ত: এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুশরিকদের বিরোধিতার কারণ ছিল অজ্ঞতা, আর আহলে কিতাবের বিরোধিতার মূল কারণ ছিল হিংসা। তারা আল্লাহর অনুগ্রহে অন্যদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তা দেখে হিংসা করত। কারণ, তারা মনে করত- যেহেতু তাদের কাছে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাই নবুওয়াত তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কিন্তু আল্লাহ বলেন: “আল্লাহই ভালো জানেন, তিনি কোথায় তাঁর রিসালাত অর্পণ করবেন” (সূরাতু আল-আনয়াম: ১২৪) । এই ভ্রান্ত ধারণার ফলে তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ জন্ম নেয়। আর যেখানে হিংসা থাকে, সেখানে সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
তৃতীয়ত: আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কথা শুনে মুসলমানদের কষ্ট পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও কষ্টটি মূলত কথার মাধ্যমে আসে। কিন্তু সেই কথাকে ‘কষ্ট’ বলা হয়েছে, কারণ তা কষ্টের কারণ, কষ্টের বিষয়বস্তু, এমনকি নিজের মধ্যেই কষ্ট বহন করে। এজন্য কষ্টকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তা শোনার বস্তু। আর “অনেক কষ্ট” বলা হয়েছে, যাতে বোঝানো হয়, এ কষ্ট পরিমাণে, ধরনে ও প্রকৃতিতে, সব দিক থেকেই ব্যাপক ও তীব্র।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে পথনির্দেশনা দিয়েছেন যে তারা যদি আহলে কিতাব ও মুশরিকদের দ্বারা কোন প্রকার কষ্টের স্বীকার হয়, তাহলে তারা তিনটি কাজ করবে:
(ক) ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেদেরকে অস্থিরতা থেকে বিরত রাখবে,
(খ) সৎকর্মে অবিচল থাকবে, এবং
(গ) ঈমানদারদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবে। (যাহরাতুত তাফাসির: ৩/১৫৪০) ।
এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন সূরাতু আল-বাক্বারা এর ১৫৫ নম্বর আয়াতে। এ সম্পর্কে সহীহ মুসলিমে সুহাইব রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
“عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ؛ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ” (صحيح مسلم: ২৯৯৯).
অর্থাৎ: “মুমিনের অবস্থা সত্যিই আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করে, তবে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- এতে তার জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে- এতেও তার জন্য কল্যাণ হয়” (সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
১। সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ রেখে নেক আমল, তওবা ও আখিরাতের প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়া।
২। দুনিয়ার মোহ ও প্রতারণাময় ভোগ-বিলাসে বিভ্রান্ত না হয়ে জান্নাত লাভকেই জীবনের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
৩। জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষা- ধন-সম্পদ, রোগ-ব্যাধি ও কষ্টের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
৪। তাকওয়া অবলম্বন করে হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৫। মানুষের কষ্টদায়ক কথা, বিরোধিতা ও বিদ্বেষের মুখে সংযম, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্র বজায় রাখা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর

﴿لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ (181) ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ (182) الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ عَهِدَ إِلَيْنَا أَلَّا نُؤْمِنَ لِرَسُولٍ حَتَّى يَأْتِيَنَا بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ قُلْ قَدْ جَاءَكُمْ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِي بِالْبَيِّنَاتِ وَبِالَّذِي قُلْتُمْ فَلِمَ قَتَلْتُمُوهُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (183) فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ جَاءُوا بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ وَالْكِتَابِ الْمُنِيرِ (184)﴾ [سورة آل عمران: 181-184].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৮১। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছিল: “আল্লাহ গরিব, আর আমরা ধনী”। তারা যা বলেছে এবং যে অন্যায়ভাবে তারা নবীদের হত্যা করেছে- সবই আমরা লিখে রাখব। আর (কিয়ামতে) আমরা বলব: “জ্বালাময় আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো”।
১৮২। এটি তোমাদের নিজেদের হাতের কামাইয়ের ফল। আর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি কখনোই জুলুমকারী নন।
১৮৩। যারা বলেছিল: “আল্লাহ আমাদের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, কোনো রাসূলের প্রতি আমরা ঈমান আনব না, যতক্ষণ না সে আমাদের কাছে এমন কুরবানি নিয়ে আসে যাকে আগুন এসে ভস্ম করে দিবে”। তাদের বলুন: “আমার আগেও তোমাদের কাছে বহু রাসূল স্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলেন এবং তোমরা যা দাবী করছো তা নিয়েও এসেছিলেন। তাহলে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাদের কেন হত্যা করেছিলে?”।
১৮৪। অতএব তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, যারা স্পষ্ট প্রমাণ, লিখিত কিতাব এবং উজ্জ্বল কিতাব নিয়ে এসেছিলেন।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৮১। আল্লাহ তায়ালাই আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র মালিক। সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছুর উত্তরাধিকার তাঁরই কাছে ফিরে যাবে। অথচ কিছু ইহুদি এই সত্য অস্বীকার করে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের সুরে বলেছিল যে, আল্লাহ গরিব, তাই তিনি মানুষের কাছে দান-খরচকে “ঋণ” বলে চাইছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর মর্যাদা খাটো করা এবং ঈমানদারদের দান-খরচকে তুচ্ছ করা। আসলে আল্লাহ মানুষের দানকে “ঋণ” বলেছেন সম্মান ও উৎসাহ দেওয়ার জন্য, প্রয়োজনের কারণে নয়। মানুষের দেওয়া দান-সদকা তাঁর কোনো উপকার করে না; বরং তা মানুষেরই কল্যাণে আসে এবং তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন। এই অবমাননাকর কথার কারণে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তাদের এই কুফরি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য শুনেছেন এবং তা তাদের আমলনামায় লিখে রাখা হয়েছে। যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তী বড় অপরাধ- নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করার অপরাধও লেখা আছে। এসব গুরুতর অপরাধের ফলস্বরূপ কিয়ামতের দিন তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে বলা হবে।
১৮২। এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা কোনো অবিচার বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি হবে ইহুদীদের নিজেদের কৃতকর্মেরই পরিণাম। দুনিয়ার জীবনে তাদের মুখে যে কুফরি ও অবমাননাকর কথা বলেছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে গুনাহের কাজ করেছে এবং অন্তরে যে ভ্রান্ত ও বাতিল বিশ্বাস লালন করেছে, সবকিছুই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না, বরং প্রত্যেককে তার নিজের আমলের অনুযায়ী প্রতিফল দেন। তাই শাস্তি ভোগকারীরা নিজেরাই নিজেদের জন্য সেই পরিণতি ডেকে এনেছে।
১৮৩। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সেই যুক্তি খন্ডন করছেন, যা তারা নবীদের আগমনের সময় ব্যবহার করত। তারা বলত, তারা কোনো নবীকে তখনই বিশ্বাস করবে, যখন সে আসমান থেকে আগুন নেমে কোনও কুরবানি দাহ করবে। আল্লাহ তায়ালা এখানে স্মরণ করাচ্ছেন- তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে বহু নবী এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শন ও অলৌকিক নিদর্শনসহ। তারা দেখতে পেত যে নবীরা সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত, কিন্তু তাদের অহংকার ও অমর্যাদার কারণে সেই নবীদের হত্যা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ জিজ্ঞেস করছেন- যদি তারা সত্যি ঈমানদার হত, এবং আসমান থেকে আগুন নেমে কুরবানিকে দাহ হওয়াকে নবীর সত্যতার মানদন্ড মনে করত, তাহলে তারা কেন তাদের পূর্বপুরুষদের হত্যা করেছিল।
১৮৪। আল্লাহ এখানে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦ দিচ্ছেন যে, কাফের-মুশরিক ও ইহুদি-খ্রিষ্টনরা রাসূলুল্লাহকে (সা.) মিথ্যা বলে অবজ্ঞা করলেও এটা নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক নবীকে তাদের নিজ স¤প্রদায়ের মানুষ মিথ্যাপবাদ ও বিদ্রƒপের মাধ্যমে নাকচ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে অস্বীকার করা এবং নবীদের আহ্বানকে অবমূল্যায়ন করা। কিন্তু নবীরা শুধু তাদের কথার মাধ্যমে নয়, স্পষ্ট অলৌকিক নিদর্শন, প্রমাণ এবং আসমানি গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষকে ঈমানের পথে আহ্বান করেছিল। আসমানি গ্রন্থ মানুষের জন্য আলোর মতো, যা মানুষকে অন্ধকার, বিভ্রান্তি ও ভুল থেকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই গ্রন্থগুলো স্পষ্ট, পরিষ্কার এবং সঠিক ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝাতে সক্ষম। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮-১১৯) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ﴾ ‘এমন কুরবানী, যাকে আগুন ভস্মীভ‚ত করে দেয়’, আয়াতাংশে কুরবান (القربان) বলতে বোঝায়- আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু বা অন্য কোনো বস্তু। পূর্ববর্তী নবীদের যুগে কুরবানের একটি বিশেষ নিদর্শন ছিল: কুরবান নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়া হতো, এরপর আকাশ থেকে এক প্রকার সাদা আগুন অবতীর্ণ হয়ে তা ভস্মীভূত করলে বুঝা যেত যে আল্লাহ তা কবুল করেছেন। আর আগুন না নামলে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে গণ্য হতো। (তাফসীর গরীব আল-কেরাআন, কাওয়ারী: ৩/১৮৩)।
﴿الْبَيِّنَات﴾ ‘স্পষ্ট প্রমাণ’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নিদর্শন এবং নবী-রাসূলদের উপর প্রেরিত মোযেজা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।
﴿الَّذِي قُلْتُمْ﴾ ‘যা তোমরা বলছো’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কুরবানী, কারণ ইহুদীরা এমন কুরবানীর দাবী তুলেছিল, যা আকাশ থেকে আগুন এসে শেষ করে দিবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে প্রাণ উৎসর্গে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে মুজাহিদদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট যে জান্নাতের মহান সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়ের প্রতিও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; কারণ সম্পদ হলো প্রাণেরই ঘনিষ্ঠ সহচর। এই পথে সম্পদ ব্যয়ে কৃপণতা করলে যে কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতদ্বয়ে আরও বোঝানো হয়েছে যে দুনিয়ার সম্পদ ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। যাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার আসে এবং যারা উত্তরাধিকারী হয়, উভয়ই একদিন মৃত্যুবরণ করবে; আর চিরস্থায়ী মালিকানা থাকবে একমাত্র আল্লাহরই। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে ইহুদিদের একটি বক্তব্য উল্লেখ করে তার অসারতা খন্ডন করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেওয়া হয়েছে যে তাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অস্বীকার ও মিথ্যারোপ নতুন কিছু নয়; পূর্ববর্তী নবীরাও তাদের কাছ থেকে অনুরূপ বিরোধিতা ও অস্বীকৃতির সম্মুখীন হয়েছেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৪৫)।

১৮১ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু ইসহাক ও ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন- একদিন আবু বকর (রা.) ইহুদিদের পাঠশালায় (বায়তুল মিদরাস) প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দেখেন, কয়েকজন ইহুদি তাদের এক ব্যক্তির চারপাশে জড়ো হয়েছে, যার নাম ছিল ‘ফিনহাস’। সে আবু বকর (রা.)-কে বলল: “হে আবু বকর! আমরা আল্লাহর প্রতি মোখাপেখী নয়; বরং তিনি আমাদের প্রতি মোখাপেখী। যদি তিনি আমাদের প্রতি মুখাপেক্ষী না হতেন, তবে তোমাদের নবী আমাদের কাছ থেকে ঋণ চাইতেন না”। এ কথা শুনে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে চপেটাঘাত করেন। এরপর ‘ফিনহাস’ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বলল: হে মুহাম্মদ! দেখুন, আপনার সঙ্গী আমার সাথে কী করেছে!? রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন- হে আবু বকর! তুমি কেন এমন করলে?” তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! সে অত্যন্ত ভয়াবহ কথা বলেছে। সে দাবি করেছে- আল্লাহ দরিদ্র, আর তারা নাকি ধনী!। ফিনহাস এ কথা অস্বীকার করল। তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন।
আরেক বর্ণনায় ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: যখন আল্লাহ তায়ালা সূরাতু আল-বাক্বারার ২৪৫নং আয়াত: “কে আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দেবে” নাযিল করলেন: তখন ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল: হে মুহাম্মদ! তোমার প্রতিপালক কি দরিদ্র হয়ে গেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের কাছে ঋণ চাইছেন?”, তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৫) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সুরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা ইহুদিদের কুৎসিত মানসিকতা ও ভয়ংকর অপরাধসমূহ স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। এখানে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ, নবীদের হত্যা এবং রাসূলুল্লাহকে (সা.) অস্বীকার করার ধারাবাহিক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দেন- তিনি সব কথা শোনেন, সব কাজ জানেন এবং কোনো জুলুমই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়। একই সঙ্গে এই আয়াতসমূহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেয় যে, সত্যের পথের আহ্বানকারীরা অতীতেও একই রকম অবজ্ঞা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।
১। ১৮১ এবং ১৮২ নং আয়াতদ্বয়ে চারটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইহুদীদের প্রথম হটকারিতা হলো- আল্লাহর প্রতি তাদের জঘন্য অপবাদ, এই আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের এক জঘন্য অপবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র আর আমরা ধনী”। এটি ছিল আল্লাহর শানে চরম অবমাননা ও কুফরী বাক্য। দুনিয়াবি সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে আল্লাহর গুণাবলির প্রতি অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিল। অথচ আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত গুণ সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে: তিনি কারো প্রতি মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু বিশ্বের সবকিছুই তার দিকে মুখাপেক্ষী। যেমন সূরাতু আল-ইখলাসে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ফুঠে উঠেছে।
এছাড়া সূরাতু আল-ফাতির এ এসেছে-
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ﴾ [سورة الفاطر: ১৫].
অর্থ: “হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ তো অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত” (সূরাতু আল-ফাতির: ১৫) । এবং সূরাতু মুহাম্মদ এ এসেছে-
﴿وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ﴾ [سورة محمد: ৩৮].
অর্থ: “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আর তোমরাই মুখাপেক্ষী” (সূরাতু মুহাম্মাদ: ৩৮) । হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
“يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ” (صحيح مسلم: ২৫৭৭].
অর্থ: “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, আমি যাকে খাওয়াই সে ছাড়া; অতএব আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাওয়াবো। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন সবাই একত্র হয়ে আমার নিকট কিছু চায় এবং আমি প্রত্যেককে তার চাওয়া দিয়ে দেই, তবুও তা আমার রাজত্ব থেকে সূচের ছিদ্রে প্রবেশ করা পানির সমানও কমাবে না” (সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭) ।
(খ) ইহুদীদেরকে সতর্কীকরণ- তাদের সকল কর্মকান্ড আল্লাহ তায়ালার পর্যবেক্ষণে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন- “আমরা তাদের এ কথা লিখে রাখব”। অর্থাৎ তাদের মুখের কথা, অন্তরের কুফরী মনোভাব এবং কার্যকলাপ, সবই আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত। কোনো অপবাদ, বিদ্রূপ বা অপরাধই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়। এবং অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা তাদের কথা শুনছেন। এ ছাড়াও কোরআনের বিভিন্ন জায়গাতে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। যেমন সূরাতু ক্বফ- এ বলেছেন:
﴿مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴾ [سورة ق: ١٨].
অর্থ: “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা-ই আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা লিখে রাখেন” (সূরাতু ক্বফ: ১৮) । কোরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ﴾ [سورة الملك: ١٤].
অর্থ: “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি তো অতিসূ²দর্শী, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত” (সূরাতু আল-মুলক: ১৪) । আকেটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ﴾ [سورة غافر: ١٩].
অর্থ: “চোখের গোপন বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তর যা গোপন করে, সবই তিনি জানেন” (সূরাতু গাফির: ১৯) ।
এ ব্যাপারে অনেক হাদীস রয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ ثُمَّ بَيَّنَ ذَلِكَ، فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ سَيِّئَةً وَاحِدَةً” [متفق عليه].
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সয়ং তার রব থেকে বর্ণনা করেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নেক আমল ও গুনাহ লিখে রেখেছেন। অতঃপর তিনি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো নেক কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকে একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে নেক কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা সম্পন্ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা দশগুণ থেকে শুরু করে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত, বরং তার চেয়েও বহুগুণ বাড়িয়ে লিখে দেন। আর কেউ যদি কোনো গুনাহ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকেও একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে গুনাহ করার ইচ্ছা করে এবং তা বাস্তবায়ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা একটি মাত্র গুনাহ হিসেবে লিখে দেন” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ” (صحيح مسلم: ২৫৬৪].
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান” (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তিনি তাদের কথাবার্তা শোনেন, তাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন এবং তাদের মুখের কথা, কাজকর্ম ও নিয়ত, সবকিছুই লিপিবদ্ধ করেন। তাদের কুফর, বিদ্রæপ ও অপরাধের কোনো কিছুই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।
(গ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ইহুদীদের হঠকারিতার জবাব ও শাস্তির ঘোষণা, ইহুদীরা আল্লাহ তায়ালার শানে কুফরিমূলক অপবাদ, বিদ্রƒপ ও অবাধ্যতার যে চরম সীমা অতিক্রম করেছিল, তার জবাবে আল্লাহ তায়ালা শুধু সতর্ক করেননি; বরং ১৮১ নং আয়াতের শেষাংশে সুস্পষ্টভাবে কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তোমরা আগুনের শাস্তি আস্বাদন কর”। এটি কোনো আবেগপ্রসূত হুমকি নয়; বরং তাদের বিশ্বাস, কথা ও কর্মের ন্যায়সংগত পরিণতির ঘোষণা, যা আখিরাতে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
(ঘ) ইহুদীরা কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার কারণ, আল্লাহ তায়ালা যখন ইহুদীদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেন, তখন তা কোনো আকস্মিক বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং আল্লাহ তায়ালা ১৮২ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন- এই শাস্তির মূল কারণ হলো তাদের নিজেদের হাতের কামাই করা কৃতকর্ম। অর্থাৎ তারা যা করেছে, তারই ন্যায্য পরিণতি হিসেবে এই শাস্তি অবধারিত হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, ইহুদীদের অপরাধ ছিল সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত এবং সীমালঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ। তাদের কৃতকর্মের মধ্যে কয়েকটি অপরাধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-
প্রথমত, নবী-রাসূলদের অন্যায়ভাবে হত্যা। আল্লাহ তায়ালা যাদের মানুষকে হেদায়েতের আলো দেখানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন, সেই নবী-রাসূলদেরকেই তারা হত্যা করেছে বা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, যেমনটি ১৮৩ নং আয়াতে দেখা যায়। এটি শুধু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তায়ালার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ। এটি ছিল ইহুদীদের অন্যতম মারাত্মক অপরাধ। তারা আল্লাহ তায়ালার শানে এমনসব কথা বলেছে, যা কেবল অবমাননাকরই নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফরিমূলক। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তারা আল্লাহর মহান গুণাবলি, বিশেষত তাঁর অমুখাপেক্ষিতা, পূর্ণতা ও একত্বকে অস্বীকার করেছে। এটি ছিল তাদের চরম ধৃষ্টতা ও অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, তারা কখনো বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র, আর আমরা ধনী” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৮১)। আবার কখনো তারা বলেছে- “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ১৮, সূরাতু আত-তাওবাহ: ৩০)। কোরআন এ ধরনের বক্তব্যকে স্পষ্ট ভাষায় মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। এ ধরনের অপবাদ আল্লাহর সত্তা ও একত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানে এবং তাওহিদের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। এভাবে বারবার আল্লাহর শানে মিথ্যা আরোপ করে তারা শুধু মুখের গুনাহেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অন্তরের কুফরি মানসিকতা প্রকাশ করেছে। এই ধরণের অপবাদ প্রমাণ করে-তারা আল্লাহকে যথার্থভাবে চিনতে অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের জ্ঞান ও সম্পদের অহংকারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তৃতীয়ত, বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘন। ইহুদীদের সামনে সত্য যখন সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল নবী-রাসূলদের মাধ্যমে, কিতাব ও নিদর্শনের মাধ্যমে, তখনও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। সত্য তাদের অজানা ছিল না; বরং তারা তা চিনত, বুঝত এবং জানত যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু জেনেশুনে তারা সেই সত্যকে অস্বীকার করেছে, যা ছিল তাদের চরম হঠকারিতা ও বিদ্রোহী মানসিকতার প্রমাণ। তারা শুধু বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই সীমালঙ্ঘন করেনি; বরং কার্যত আল্লাহর বিধান ভেঙেছে, বারবার অঙ্গীকার ও চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার হোক কিংবা নবীদের মাধ্যমে দেওয়া নির্দেশনা, সবকিছুই তারা নিজেদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কাছে তুচ্ছ করে দিয়েছে। ফলে দ্বীনের বিধানকে অনুসরণের পরিবর্তে তারা প্রবৃত্তি, অহংকার ও দুনিয়াবি লাভকে প্রাধান্য দিয়েছে।
এই আচরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; সমস্যা ছিল হৃদয়ের রোগে, হিংসা, অহংকার ও দুনিয়ামুখিতা। এ কারণেই কোরআন তাদের সম্পর্কে বারবার উল্লেখ করেছে- তারা সত্য জানার পরও তা গোপন করত, বিকৃত করত এবং অমান্য করত। এমন ধারাবাহিক সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘনই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত করে তোলে।
২। ১৮৩ নম্বর আয়াতে ইহুদীদের একটি বিশেষ হঠকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে তার শক্ত জবাব দিয়েছেন এবং তাদের মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
(ক) ইহুদীদের দ্বিতীয় হঠকারিতা: মিথ্যা অজুহাত ও আকিদাগত বিকৃতি, আয়াতের প্রথমাংশে দেখা যায়- ইহুদীরা ঈমান না আনার জন্য একটি কৃত্রিম ও মনগড়া শর্ত দাঁড় করিয়েছিল। তারা আল্লাহর নামে এমন একটি অঙ্গীকারের কথা বলেছে, যার কোনো ওহিভিত্তিক প্রমাণ নেই। এটি ছিল আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ, যা কুফরি ও ধৃষ্টতার অন্তর্ভুক্ত। পূর্ববর্তী কিছু নবীর যুগে কুরবানি গ্রহণের জন্য আসমান থেকে আগুন নেমে আসা ছিল তখনকার একটি বিশেষ পদ্ধতি বা মুজিজা। কিন্তু ইহুদীরা সেই ব্যতিক্রমী ঘটনাকেই নবুয়তের সার্বজনীন শর্তে পরিণত করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সত্য গ্রহণ এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- নিদর্শন দেখানোর পরও তারা ঈমান আনেনি। এখানে স্পষ্ট হয়, তাদের সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; বরং সমস্যা ছিল অন্তরের রোগে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করত এবং নবুয়ত যেন কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এই অহংকারে আক্রান্ত ছিল। ফলে অন্য জাতির মধ্য থেকে রাসূল আসা তারা মানতে পারেনি।
(খ) আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব- ইতিহাসের আয়নায় সত্য উন্মোচন, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের দাবির জবাবে রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেন: “বলুন, আমার আগেও তোমাদের কাছে রাসূলগণ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এবং তোমরা যে নিদর্শনের দাবী তুলছো, তা নিয়েও। তবে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে তাদেরকে হত্যা করলে কেন?”। এই প্রশ্নটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুক্তিনির্ভর। আল্লাহ তায়ালা এখানে আবেগ নয়, বরং ইতিহাসকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ইহুদীদের নিকট বহু নবী এসেছিলেন, যাঁরা সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এমনকি তারা যে নিদর্শনের দাবি করছে, সেটিও কিছু নবীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো- তারা সেই নবীদের প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁদের হত্যা করেছে অথবা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। নবী হত্যা ছিল তাদের সত্যবিমুখতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যারা সত্যকে ভালোবাসে, তারা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না।
(গ) মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা যখন বলেন- “যদি তোমরা সত্যবাদী হও”, তখন এটি কোনো সাধারণ শর্ত নয়; বরং তাদের মিথ্যা দাবি ও ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচনের এক কঠোর ঘোষণা। কারণ তারা দাবি করেছিল- নির্দিষ্ট এক নিদর্শন ছাড়া তারা কোনো রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে না। অথচ বাস্তবতা হলো, তাদের কাছে এমন বহু রাসূল এসেছিলেন, যাঁরা স্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঈমান আনার পরিবর্তে সেই নবীদের হত্যা করেছে বা হত্যার পথ প্রশস্ত করেছে। সুতরাং আল্লাহর এই শর্তমূলক বাক্যটি আসলে একটি তিরস্কার, যা প্রমাণ করে যে তাদের সমস্যা প্রমাণের অভাবে নয়, বরং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ, অহংকার ও অন্তরের বিকৃতির কারণে। কারণ প্রকৃত সত্যবাদীরা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না। আর ঈমানের নামে অজুহাত দাঁড় করিয়ে তারা নিজেদের মিথ্যাচারকেই প্রকাশ করে দিয়েছে।
৩। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সমর্থন ও সান্ত¦না দিয়েছেন। মানুষ যখন তাঁর ওপর অবিশ্বাস ও অপবাদ আরোপ করত, তখন আল্লাহ তাঁকে স্মরণ করাতেন যে এ ঘটনা নতুন নয়, বরং আগের নবীদের সাথেও এমনই ঘটেছে। ১৮৪ নং আয়াতের মাধ্যমেও তার হৃদয়ে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি যোগানো হয়েছে। নিম্নের ব্যাখ্যায় আয়াতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরব:
প্রথমত, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর ওপর আরোপিত মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। সত্যের দাওয়াত সব যুগেই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে কাফিরদের পক্ষ থেকে “মিথ্যাবাদী” বলাকে নবুওয়াতের পথে অস্বাভাবিক কিছু মনে করার কারণ নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) মানসিকভাবে দৃঢ় করেন এবং তাঁর অন্তরের ভার লাঘব করেন। এ সম্পর্কে আরো অনেক আয়াত ও হাদীস এসেছে, যেমন একটি আয়তে এসেছে-
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের উপর ধৈর্য ধারণ করেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।
আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ ۚ مَا يَأْتِيهِم مِّن رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ﴾ [سورة يس: ৩০].
অর্থ: “আফসোস বান্দাদের জন্য! তাদের কাছে যখনই কোনো রাসূল এসেছে, তারা তাকে উপহাস করেছে” (সূরাতু ইয়াসিন: ৩০) । এছাড়াও সূরাতু আল-আনয়াম-এর ১১২ নং আয়াত এবং সূরাতু আল-ফোরক্বান এর ৩১ নং আয়াতে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে একটি প্রশিদ্ধ হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءً الْأَنْبِيَاءُ، ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ” (سنن الكبرى للنسائي: ৭৪৪০).
অর্থ: “মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষায় পড়েন নবীগণ; এরপর যারা তাদের ন্যায়পরায়ণতায় নিকটবর্তী” (সুনান আল-কুবরা লিন-নাসায়ী: ৭৪৪০)।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ পূর্ববর্তী রাসূলদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেন। তাঁর আগেও বহু নবী এসেছেন, যাঁরা সমাজকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছিলেন; অথচ তাঁদেরকেও মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) একা নয়; বরং তিনি নবীদের সেই সম্মানিত ধারাবাহিকতার অন্তর্ভূক্ত, যাঁদের পথ কঠিন হলেও তাঁদের দাওয়াত ছিল নির্ভুল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।
তৃতীয়ত, আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে পূর্ববর্তী রাসূলগণ কেবল সাধারণ আহ্বান নিয়ে আসেননি; তাঁরা এসেছিলেন সুস্পষ্ট নিদর্শন, সহীফা এবং উজ্জ্বল আসমানী কিতাবসহ। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে প্রমাণের কোনো অভাব ছিল না। তবুও ইহুদীরা তা অস্বীকার করেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তাদের কুফর ও প্রত্যাখ্যান দাওয়াতের দুর্বলতার কারণে নয়, বরং তাদের অন্তরের অন্ধত্ব ও অহংকারের ফল।
চতুর্থত, এই আয়াত দাওয়াতের দায়িত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে। রাসূলুল্লাহর (সা.) দায়িত্ব ছিল সত্যের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া; মানুষের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা বা না করা তাঁর দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়। সুতরাং মানুষের ঈমান না আনা কোনোভাবেই নবীর দাওয়াতি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে না। এই উপলব্ধি দাওয়াতদাতার জন্য গভীর প্রশান্তি বয়ে আনে। এ সম্পর্কে কোরআনে অনেক আয়াতে এসেছে, যেমন:
﴿مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ﴾ [سورة المائدة: ৯৯].
অর্থ: “রাসূলের উপর দায়িত্ব কেবল (আল্লাহর বার্তা) পৌঁছে দেওয়া; আর তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর, আল্লাহ তা সবই জানেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ৯৯) । এছাড়াও সূরাতু আন-নাহল এর ৮২, সূরাতু ইয়সিন এর ১৭, সূরাতু আল-ক্বাসাস এর ৫৬, এবং সূরাতু আল-বাক্বারা এর ২৭২ নং আয়াতসমূহে এ সম্পর্কে আলোচন এসেছে।
বিদায়ী হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: ‘আমি কি তোমাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছাতে পেরেছি’, সকলে সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন- ‘হ্যা’, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এটি প্রমাণ করে- রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দায়িত্বের সফলতা মাপতেন বার্তা পৌঁছেছে কি না, তা দিয়ে; মানুষ মানল কি না, তা দিয়ে নয়।
পঞ্চমত, এই আয়াতের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো ধৈর্য ও অবিচলতা। সত্যের পথে চলতে গিয়ে কষ্ট, অপবাদ ও বিরোধিতা অনিবার্য। তবে এগুলোই নবীদের পথের বাস্তবতা। এই উপলব্ধি রাসূলুল্লাহকে (সা.) সবরে জামিলের পথে অটল থাকতে সহায়তা করে এবং তাঁর হৃদয়ে এই দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে যে শেষ পরিণতি সত্য ও হকের পক্ষেই থাকবে। এ সম্পর্কে অন্য একটি আয়াতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّىٰ أَتَاهُمْ نَصْرُنَا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের ওপর ধৈর্য ধারণ করেছে, অবশেষে তাদের কাছে আমার সাহায্য এসে পৌঁছেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কোনো কটুক্তি, অপবাদ বা সন্দেহপূর্ণ কথা থেকে বিরত থেকে বিশুদ্ধ আকিদার ওপর অটল থাকা।
(খ) জুলুম, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণ থেকে নিজেকে দূরে রেখে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।
(গ) আখিরাতের জবাবদিহি ও কঠিন শাস্তির কথা স্মরণ করে নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও তওবার অভ্যাস গড়ে তুলা।
(ঘ) সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে বিরোধিতা ও কষ্ট এলে নবীদের পথ অনুসরণ করে ধৈর্য ও অবিচলতা অবলম্বন করা।
(ঙ) মানুষের প্রতিক্রিয়াকে সাফল্যের মানদন্ড না বানিয়ে দায়িত্ববোধের সঙ্গে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়াকেই নিজের সাফল্য হিসেবে গ্রহণ করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ঈমানের মানদন্ড: পরীক্ষা, তাক্বওয়া এবং আমানত।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর

﴿مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ (179) وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (180)﴾ [سورة آل عمران: 179-180].

 

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: ঈমানের মানদন্ড: পরীক্ষা, তাক্বওয়া এবং আমানত।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(১৭৯) আল্লাহ মুমিনদেরকে যে অবস্থায় তারা আছে, সে অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না, যতক্ষণ না তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে অপবিত্রকে পবিত্র থেকে পৃথক করে দেন। আর আল্লাহ তোমাদেরকে গায়েবের বিষয় জানিয়ে দেন না; তবে তিনি তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান, তাকে বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আনো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
(১৮০) আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ দিয়েছেন, তা নিয়ে কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য ভালো; বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণকর। তারা যে বিষয়ে কৃপণতা করেছে, কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলায় বেড়ি হিসেবে পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
১৭৯। আল্লাহ তায়ালা কখনোই মুমিনদেরকে এভাবে ছেড়ে দেবেন না যে, তাদের মধ্যে প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিক একাকার অবস্থায় থেকে যাবে; যতক্ষণ না তিনি প্রকৃত মুমিনকে মুনাফিক থেকে স্পষ্ট করে দেন। আর আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞার অংশ নয় যে, তিনি মুমিনদেরকে গায়েবের জ্ঞান জানিয়ে দেবেন, যার মাধ্যমে তারা প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিককে চিনে নিবে; বরং তিনি পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমেই তাদের পার্থক্য প্রকাশ করেন। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করেন এবং ওহির মাধ্যমে তাকে গায়েবের কিছু জ্ঞান দান করেন। অতএব তাদের উচিৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আর যদি তারা সত্যিকার ঈমান স্থাপন করে এবং আনুগত্যের মাধ্যমে তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তবে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য রয়েছে মহান প্রতিদান।
১৮০। যারা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ থেকে যে সম্পদ তাদের দান করেছেন, তাতে কৃপণতা করে এবং ফরজ কর্তব্য ও কল্যাণের পথে তা ব্যয় করে না, তারা যেন মনে না করে যে এই কৃপণতা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং এটি তাদের জন্য এক ভয়াবহ অকল্যাণকর, যার পরিণতি অত্যন্ত মন্দ। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে:
(ক) দুনিয়াতে কৃপণতার কারণে লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের ভোগ করতে হয় এবং তার নেতিবাচক প্রভাব মানুষের আত্মার ওপর পড়ে।
(খ) আল্লাহ তাআলা আখিরাতে সেই সম্পদের মাধ্যমেই তাদের শাস্তি দিবেন যে সম্পদকে তিনি তাদের গলায় আগুনের বেড়ি বানিয়ে দিবেন, অথবা তা বিষধর সাপে রুপান্তরিত হয়ে তাদেরকে পেঁচিয়ে ধরবে। সে সাপ তার মালিককে বলবে: “আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন”, যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে যে কৃপণতায় কল্যাণ আছে, তার উচিত এ ধারণা ত্যাগ করা এবং বুঝে নেওয়া যে প্রকৃত কল্যাণ রয়েছে ব্যয় করার মধ্যেই, কৃপণতার মধ্যে নয়। আর যে সম্পদ সে কৃপণতা করে জমা রাখে, তা সহ জগতের সবকিছুই আসলে আল্লাহরই সম্পদ; শেষ পর্যন্ত আল্লাহই তার উত্তরাধিকারী হবেন। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৫-৪১৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮০; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ﴾ ‘যতক্ষণ না তিনি অপবিত্র থেকে পবিত্রকে আলাদা করেন’, এ আয়াতাংশে ‘অপবিত্র’ দ্বারা কাফের-মুনাফিককে বুঝানো হয়েছে এবং ‘পবিত্র’ দ্বারা মুমিনকে বুঝানো হয়েছে। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০৩) । অর্থাৎ- বাহ্যিকভাবে সবাই এক কাতারে থাকলেও, সময়ের পরীক্ষায় অন্তরের অবস্থা প্রকাশ পায়। বিপদ, জিহাদ, ত্যাগ ও আনুগত্যের মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে যায়- কে আল্লাহর জন্য দৃঢ়, আর কে স্বার্থের অনুসারী। এভাবেই আল্লাহ মুমিনদেরকে অপবিত্র দল থেকে আলাদা করে নেন এবং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
﴿سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ﴾ ‘যে সম্পদের ব্যাপারে তারা কৃপণতা করেছে, তাদের গলায় তা বেড়ি হিসেবে পরানো হবে’, অর্থাৎ দুনিয়াতে যে সম্পদ তারা আঁকড়ে ধরে রেখেছিল এবং আল্লাহর নির্ধারিত পথে ব্যয় করেনি, সেই সম্পদই আখেরাতে শাস্তির রূপ ধারণ করবে। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন- এই ‘বেড়ি’ বা (طَوْق) বাস্তবও হতে পারে, আবার শাস্তির ভয়াবহতার রূপকও হতে পারে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বোঝা যায়- এটি বাস্তব শাস্তি হিসেবেই সংঘটিত হবে। অর্থাৎ কৃপণতার দ্বারা জমাকৃত সম্পদকে আল্লাহ আগুনের বেড়ি বা ভয়ংকর সাপের রূপে পরিণত করবেন। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَن آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ له مَالُهُ يَومَ القِيَامَةِ شُجَاعًا أقْرَعَ له زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَومَ القِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بلِهْزِمَتَيْهِ – يَعْنِي بشِدْقَيْهِ – ثُمَّ يقولُ أنَا مَالُكَ أنَا كَنْزُكَ، ثُمَّ تَلَا: ﴿لَا يَحْسِبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ﴾ الآيَةَ”.
অর্থ: “যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সেই সম্পদকে একটি বিষধর টাকওয়ালা সাপের রূপ দেওয়া হবে, যার মাথায় দুটি কালো দাগ থাকবে। কিয়ামতের দিন সেই সাপটিকে তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সে সাপ তার দুই চোয়াল দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে বলবে: ‘আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন’। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: ﴿لَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ﴾ “যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য কল্যাণকর”। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৮০)।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৬-১৭৮) আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা কুফরির পথে দ্রæত অগ্রসরমান লোকদের আচরণ ও তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৭৯ নং আয়াতে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, মুমিনদেরকে তিনি এমন অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না যেখানে খাঁটি মুমিন ও মুনাফিক একাকার হয়ে থাকবে; বরং পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমে অপবিত্র ও পবিত্রকে পৃথক করে দেবেন। আর ১৮০ নং আয়াতে সেই অন্তরের কলুষতার একটি বাস্তব নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে- আল্লাহর দানকৃত সম্পদে কৃপণতা করা ও যাকাত আদায় না করা, যা ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ এবং যার পরিণতি আখেরাতে কঠিন শাস্তি। এভাবে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সমস্যার উল্লেখ, পরবর্তী আয়াতগুলোতে তার ব্যাখ্যা ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট ও অর্থবহ ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছে। (আল্লাহই ভালো জানেন)।

১৭৯ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
সুদ্দী (রহ.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মতকে তাদের অবয়বসহ আমার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেমন আদমের (আ.) সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে আমি জেনে গেছি, কে আমার প্রতি ঈমান আনবে আর কে কুফরি করবে”। এই কথা মুনাফিকদের কাছে পৌঁছলে তারা বিদ্রæপ করে বলল: “মুহাম্মদ দাবি করে যে, সে জানে কে তার ওপর ঈমান আনবে আর কে কুফরি করবে, অথচ আমরা তার সাথেই আছি, কিন্তু সে আমাদের চিনতে পারছে না!”। তখন আল্লাহ তাআলা ১৭৯ নং আয়াত নাজিল করেন।
কালবী (রহ.) বলেন: কুরাইশরা বলেছিল: “হে মুহাম্মদ! তুমি দাবি কর যে, যারা তোমার বিরোধিতা করে তারা জাহান্নামে যাবে এবং আল্লাহ তাদের ওপর অসন্তুষ্ট, আর যারা তোমার দ্বীন অনুসরণ করে তারা জান্নাতি এবং আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাহলে আমাদের বলে দাও কে তোমার ওপর ঈমান আনবে আর কে আনবে না”। এরপর আল্লাহ তাআলা ১৭৯ নং আয়াত অবতীর্ণ করেন।
আবু আলিয়া (রহ.) বলেন: “মুমিনরা চেয়েছিল, যেন তাদের এমন কোনো নিদর্শন দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিককে পৃথক করা যায়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহিদী: ৭৫/৭৬, আল-তাফসীর আল-কাবীর: ৪/২৮৮) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ঈমান ও কুফরের প্রকৃত পার্থক্য, গায়েবী জ্ঞানের সীমা এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর পরীক্ষা ও দয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। এ আয়াতদ্বয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহ মুমিন ও মুনাফিককে আলাদা করে প্রকাশ করার জন্য মানুষকে পরীক্ষার মধ্যে রাখেন এবং গায়েবের পূর্ণ জ্ঞান কেবলমাত্র তাঁরই অধিকার। একই সঙ্গে এতে দুনিয়ার সম্পদ ও আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত নিয়ে অহংকার না করে কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধের সাথে ব্যবহার করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
১। ১৭৯ নং আয়াত থেকে চারটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়-
(ক) মানুষকে তাকলীফ বা দায়িত্ব আরোপের উদ্দেশ্য হলো সত্যিকারের মুমিনকে আলাদা করা, আল্লাহ তায়ালা মানুষের উপর বিভিন্ন ফরজ ও দায়িত্ব আরোপ করেছেন যেমন নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ এবং জিহাদ। এই তাকলীফ কেবল বাহ্যিক বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং অন্তরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের একটি মাধ্যম। ১৭৯ নং আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি মুমিনদের এমন অবস্থায় ছেড়ে দিবেন না যেখানে প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিক একাকার হয়ে থাকবে। বরং পরীক্ষা, বিপদ এবং দায়িত্ব পালন বা ত্যাগের মাধ্যমে আলাদা করা হবে, যা দেখাবে কে সত্যিকারের ঈমানদার এবং সৎকর্মশীল, আর কে বাহ্যিকভাবে নামধারী ঈমানদার। সুতরাং তাকলীফ বা দায়িত্ব আরোপ মানব চরিত্র ও নৈতিক অবস্থার একটি পরীক্ষা, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক পরিচয় প্রকাশ করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) । এ ছাড়াও অন্য আরেকটি আয়াতে আরো স্পষ্টভাবে এসেছে-
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ – وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾ [سورة العنكبوت: ২-৩].
অর্থ: “মানুষ কি মনে করে যে তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? নিশ্চয়ই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি, যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে প্রকাশ করেন এবং মিথ্যাবাদীদেরকে প্রকাশ করেন” (সূরাতু আল-আনকাবুত: ২-৩) । একই কথা বলা হয়েছে- সূরাতু আল-বাক্বারার ২১৪, সূরাতু আলে-ইমরানের ১৪২ এবং সূরাতু মোহাম্মদের ৩১ নং আয়াতসমূহে।
(খ) গায়েবী জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা, আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি নির্দেশ করে যে, গায়েবের জ্ঞান কেবল আল্লাহর অধিকার, এবং মানুষ তা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে জানে না। তবে আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞার অনুযায়ী কিছু অংশ তাঁর রাসূলদের জানাতে পারেন, যা উম্মতকে সঠিক পথ প্রদর্শন ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। এটি মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা ও আধ্যাত্মিক পরীক্ষা নির্দেশ করে। মানুষের বোধ ও জ্ঞান সীমিত; তাই তারা ভবিষ্যত ও অন্তরের জটিলতায় পূর্ণভাবে ধারণা রাখতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, স্বাধীন চিন্তা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আল্লাহ তায়ালা যে অংশ জানাতে চান, তা মানুষের নৈতিক এবং আত্মিক উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) । এ সম্পর্কে সূরাতু আল-আনয়ামে বলা হয়েছে-
﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ﴾ [سورة الأنعام: ৫৯].
অর্থ: “গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে; তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৫৯) । এ ছাড়াও কোরআনের আরো অনেক আয়াতে এ সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে- রাসূলুল্লাহ (সা.) কি গায়েব জানতেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে ওলামায়ে কেরাম বলেন: এ কথা বলা যাবে না যে রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবের বিষয়ে সর্বজ্ঞ; বরং তিনি গায়েব সম্পর্কে ততটুকুই জানতেন, যতটুকু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿عَالِمُ الْغَيْبِ فَلا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً – إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُول﴾ [سورة الجـن:২৬-২৭].
অর্থ: “তিনি গায়েবের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গায়েব কাউকে প্রকাশ করেন না, তবে যাকে তিনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করেন তাকে ছাড়া” (সূরাতু জিন: ২৬-২৭)। অতএব গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্দিষ্ট। যেমন আল্লাহ বলেন-
﴿قُلْ لا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ﴾ [سورة النمل:৬৫].
অর্থ: “বলুন, আসমান ও জমিনে যারা আছে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কেউই গায়েব জানে না; আর তারা জানেও না কখন তাদের পুনরুত্থান করা হবে” (সূরাতু নামল: ৬৫)।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবের কোনো বিষয়ই জানতেন না, আল্লাহ যা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন ও অবহিত করেছেন তা ছাড়া। (ইসলাম ওয়েব, ইবনু বা’য) । রাসূলুল্লাহ (সা.) যে গায়ব জানেন না, এ বিষয়ে কোরআনে তার নিজের স্বীকারোক্তি রয়েছে-
﴿قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ ۚ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ﴾ [سورة الأعراف: ১৮৮].
অর্থ: “বলুন, আমি নিজের জন্যও কোনো উপকার বা ক্ষতির মালিক নই, আল্লাহ যা চান তা ছাড়া। আর যদি আমি গায়েব জানতাম, তবে অবশ্যই আমি প্রচুর কল্যাণ অর্জন করতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা সেই সব মানুষের জন্য যারা ঈমান আনে” (সূরাতু আল-আ‘রাফ: ১৮৮)।
সমাজে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, অনেক ওলামায়ে কেরাম যখন কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে ব্যর্থ অথবা অজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তখন তারা বলে থাকেন: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন”। এ কথাটি শুনতে সঠিক মনে হলেও উল্লেখিত ব্যাখ্যার আলোকে এ কথাটি সঠিক নয়, কারণ অদৃশ্য বিষয় সহ সবকিছুর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর রয়েছে। সুতরাং না জানার অপারগতা প্রকাশের সময় বিষয়টিকে শুধু আল্লাহর দিকেই সোপর্দ করতে হবে।
অতএব, সঠিক এবং নির্ভুল বক্তব্য হবে: “আল্লাহই ভালো জানেন”। এই বাক্যটি আল্লাহর সর্বজ্ঞতা ও পূর্ণ জ্ঞানকে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়াও, এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে আমাদের সকল প্রশ্ন এবং সন্দেহের চূড়ান্ত নির্ভরযোগ্য উৎস শুধুমাত্র আল্লাহ, নবী-রাসূলরা শুধু আল্লাহর শিক্ষা ও নির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। (ইবনু বা’য পেইজ থেকে) ।
(গ) চিরস্থায়ী সফলতার মূল ভিত্তি ঈমান ও তাকওয়া, আয়াতের তৃতীয়াংশ নির্দেশ করে যে, জান্নাত অর্জনের মূল ভিত্তি হলো- ঈমান ও তাকওয়া, অর্থাৎ অন্তরের বিশ্বাস, আল্লাহভীতি, সতর্কতা এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলার মানুষিকতা। এটি মূল্যবোধ ও নৈতিক ক্রমের তত্ত¡ প্রতিফলিত করে, চ‚ড়ান্ত ফলাফল কেবল বাহ্যিক ক্ষমতা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে না। প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের অন্তরের বিশুদ্ধতা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং নৈতিক সচেতনতার ভিত্তিতে। তাই জান্নাতের অর্জন হলো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীর ফসল, যা মানুষের চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও আত্মিক পরিশীলনাকে মূল্যায়ন করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) ।
(ঘ) আল্লাহর খবর রাখার বিষয়টি জ্ঞানত্ত¡ (ঊঢ়রংঃবসড়ষড়মু), সত্তাতত্ত¡ (ঙহঃড়ষড়মু) এবং নৈতিক দর্শন (গড়ৎধষ চযরষড়ংড়ঢ়যু) এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে একত্রে স্পর্শ করে:
প্রথমত, জ্ঞানতত্তে¡র দিক থেকে ‘খবীর’ শব্দটি কেবল বাহ্যিক কাজের জ্ঞান নয়, বরং কাজের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য, নিয়ত, প্রেরণা ও পরিণতি পর্যন্ত বিস্তৃত সর্বজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। মানুষের জ্ঞান আংশিক ও সীমাবদ্ধ; সে শুধু দৃশ্যমান আচরণ বিচার করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী ও গভীর, যেখানে কর্মের দৃশ্য-অদৃশ্য, প্রকাশ-গোপন সবই অন্তর্ভুক্ত। এতে বোঝা যায়, বাস্তবতার পূর্ণ জ্ঞান কেবল ঐশী জ্ঞানের মধ্যেই সম্পূর্ণতা লাভ করে। সূরাতু আল-মুলক এর ১৪ এবং সূরাতু আল-গাফির এর ১৯ নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
দ্বিতীয়ত, সত্তাতত্তে¡র আলোকে এই আয়াত মানুষের অস্তিত্বকে নৈতিকভাবে অর্থবহ সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের প্রতিটি কর্ম শুধু একটি শারীরিক ঘটনা নয়; বরং তা অস্তিত্বের স্তরে একটি নৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে, যা আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ, মানুষের কাজ নিঃশেষ হয়ে যায় না; বরং তা সত্তাগতভাবে মূল্যায়িত হয়। সূরাতু আল-কাহফ এর ৪৯ এবং সূরাতু যিলযাল এর (৭-৮) নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
তৃতীয়ত, নৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে আয়াতাংশটি নৈতিক জবাবদিহিতার (গড়ৎধষ অপপড়ঁহঃধনরষরঃু) ভিত্তি স্থাপন করে। যেহেতু আল্লাহ সব কাজ সম্পর্কে অবগত, তাই নৈতিকতা এখানে আপেক্ষিক নয়; বরং এক সর্বজ্ঞ নৈতিক কর্তৃত্বের সাথে সংযুক্ত। মানুষ সমাজ বা আইনের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু ঐশী জ্ঞান থেকে পালানোর কোনো অস্তিত্বগত সুযোগ নেই। এতে মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতার দিকে ধাবিত হয়। সূরাতু আস-সাফফাত এর ২৪ এবং সূরাতু ইসরা এর ৩৬ নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
(ঙ) গায়েবী বিষয়ে অযথা ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা-ই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। উল্লেখিত আয়াত থেকে জানা যায়, কাফেররা অদৃশ্য বিষয় নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করত, যার পেছনে হিদায়াত গ্রহণের আগ্রহ ছিল না; বরং উদ্দেশ্য ছিল তর্ক, উপহাস ও রাসূলুল্লাহকে (সা.) বিরক্ত করা। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, গায়েবী বিষয়ের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র তাঁরই কাছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ থেকে কিছু জানেন না; বরং আল্লাহ যতটুকু ওহীর মাধ্যমে তাঁকে জানিয়েছেন, ততটুকুই তিনি মানুষকে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং মানুষের করণীয় হলো- গায়েবের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে সময় নষ্ট না করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু জানিয়েছেন, তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করা এবং তাতে ঈমান আনা। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৪/২৯০) ।
২। ১৮০ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়-
(ক) সম্পদের ব্যাপারে কৃপণতা করা কৃপণ ব্যক্তির জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়, যদিও কৃপণরা মনে করে এতে তাদের উপকার হচ্ছে। বাস্তবে কৃপণতা মানুষের অন্তরকে সংকীর্ণ করে, সমাজে ঘৃণার জন্ম দেয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। দুনিয়াতে কৃপণ ব্যক্তি সম্মান হারায় এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়। অতএব কৃপণতা কোনো উপকার নয়; বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে কৃপণের জন্য ক্ষতিকর।
(খ) যাকে আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দিয়েছেন অথচ সে সেই সম্পদের মধ্যে আল্লাহ নির্ধারিত হক আদায় করেনি, তাকে কিয়ামতের দিন সেই সম্পদের মাধ্যমেই শাস্তি দেওয়া হবে। কুরআনের আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, কৃপণরা যে সম্পদ জমা করে রেখেছে, তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বা আগুনের হার হিসেবে পরিণত হবে। এটি প্রমাণ করে যে সম্পদ আমানত, আর সেই আমানতের হক আদায় না করলে তা শাস্তিে কারণ হবে।
(গ) আসমান-যমীন এবং তাতে বিরজমান সকল সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তায়ালা। ১৮০ নং আয়াতের আলোকে প্রতিয়মান হয় যে, আসমান ও যমীন এবং তাতে বিদ্যমান সমস্ত সম্পদের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। মানুষ যে সম্পদকে নিজের বলে ধারণ করে, তা বাস্তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি অস্থায়ী আমানত মাত্র। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা ঘাষণা করেন- “আল্লাহরই জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের মীরাস”, অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সব সম্পদ তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, মানুষের মালিকানা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর মালিকানা চিরস্থায়ী। তাই সম্পদের ব্যাপারে কৃপণতা করা বা আল্লাহর নির্ধারিত হক আদায় না করা চরম ভ্রান্তি; কারণ যে সম্পদ নিয়ে মানুষ অহংকার করে, তা একদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে এবং সেই সম্পদের ব্যবহারের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই আয়াত মুমিনকে সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল, আমানতদার ও আল্লাহভীরু করে তোলে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত মালিকের নির্দেশ অমান্য করে কোনো সম্পদই কল্যাণের কারণ হতে পারে না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) পরীক্ষা ও বিপদে ধৈর্য ধারণ করা, কারণ এর মাধ্যমে প্রকৃত মুমিনকে প্রকাশ করা হয়।
(খ) ঈমান ও তাকওয়াকে দৃঢ় করা, কারণ চিরস্থায়ী সফলতা এর উপরই নির্ভরশীল।
(গ) গায়েবী বিষয়ে আল্লাহর হিকমতের উপর ভরসা রাখা, এবং অজানা বিষয়ে “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন” এর পরিবর্তে “আল্লাহই ভালো জানেন” বলা।
(ঘ) সম্পদের মধ্যে আল্লাহর নির্ধারিত হক যথাযথভাবে আদায় করা।
(ঙ) কৃপণতা ও লোভ পরিহার করে দানশীলতা অবলম্বন করা, কারণ কৃপণতা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের জন্য জন্য ক্ষতিকর।
(চ) আখিরাতে জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে জীবন পরিচালনা করা, কারণ প্রত্যেক আমলের হিসাব আল্লাহ নেবেন।

সূরাতু আলে-ইমারনের (১৭৬-১৭৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদের পর রাসূলুল্লাহকে (সা.) আল্লাহ কর্তৃক সান্তনা প্রদান।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَلا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسارِعُونَ فِي الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئاً يُرِيدُ اللَّهُ أَلاَّ يَجْعَلَ لَهُمْ حَظًّا فِي الْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذابٌ عَظِيمٌ (176) إِنَّ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْكُفْرَ بِالْإِيْمانِ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئاً وَلَهُمْ عَذابٌ أَلِيمٌ (177) وَلا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّما نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّما نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدادُوا إِثْماً وَلَهُمْ عَذابٌ مُهِينٌ (178)﴾ [سورة آل عمران: 176-177].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: উহুদের পর রাসূলুল্লাহকে (সা.) আল্লাহ কর্তৃক সান্তনা প্রদান।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৭৬। যারা দ্রুত কুফরের পথে ধাবিত হয়, তাদের কারণে আপনি হতাশ বা দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। তারা কখনও আল্লাহকে ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ চান না যে তারা আখেরাতে কোনো অংশ লাভ করুক, আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
১৭৭। যারা ঈমানকে বিক্রি করে কুফর গ্রহণ করে, তারা কখনও আল্লাহকে কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
১৭৮। কাফেরেরা যেন ভুল ধারণা না করে যে, আল্লাহ তাদের অবকাশ দিচ্ছেন এবং এটি তাদের জন্য কল্যাণ। বরং আল্লাহ তাদের অবকাশ দেন, যাতে তারা আরও পাপে ডুবে যায়। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্চনাদায়ক ও অপমানজনক আযাব।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৭৬। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্তনা দিয়ে বলেন: কাফিররা জেদ ও ভ্রান্তির পথে যতই এগিয়ে যাক না কেন, এতে আপনার মন যেন দুঃখিত না হয়। তাদের এসব আচরণ আপনার কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম নয়; বরং তারাই বঞ্চিত হয় ঈমানের মাধুর্য ও আখিরাতের মহাপুরস্কার থেকে। আল্লাহ চান- যেহেতু তারা সত্যের আহ্বান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাই আখিরাতে তাদের জন্য কোনো পুরস্কার থাকবে না। আর পরিণতিতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠোর শাস্তি।
১৭৭। যারা ঈমান ছেড়ে কুফরকে বেছে নিয়েছে, তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারে না; কারণ মানুষের অবিশ্বাস আল্লাহর মহিমাকে ছুঁতে পারে না। আসলে তারা ক্ষতি করে নিজেদেরই সত্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে, অন্তরের প্রশান্তি হারিয়ে এবং আখিরাতের মুক্তি নষ্ট করে। দুনিয়ায় তারা হয়তো নিজেদের পথকে সফল ভেবে আনন্দিত থাকে, কিন্তু পরিণামে তাদের জন্য অপেক্ষা করে এমন শাস্তি, যার যন্ত্রণা কল্পনার অতীত। আল্লাহর পথ ত্যাগ করে তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে।
১৭৮। অবিশ্বাসীরা যেন কখনোই ভুল ধারণায় না পড়ে- যখন আল্লাহ তাদেরকে দীর্ঘ আয়ু দেন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস উপভোগের সুযোগ দেন এবং তাদের পাপ-অপরাধের কারণে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না, তখন যেন তারা না ভাবে যে এটি তাদের জন্য কোনো সম্মান বা কল্যাণ। বাস্তবে তা মোটেও কল্যাণ নয়, বরং আল্লাহ তাদের শাস্তি বিলম্বিত করছেন একটি গভীর উদ্দেশ্যে; যাতে এই অবকাশের সময় তারা আরও বেশি অন্যায়, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনে ডুবে যায়, ফলে তাদের অপরাধের বোঝা ভারী হয়। পরিণামে আখিরাতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এমন কঠিন শাস্তি, যা শুধু কষ্টদায়কই নয়, বরং অপমানজনক ও লাঞ্ছনাপূর্ণ হবে, যেন তাদের দুনিয়ার সমস্ত অহংকার ও উচ্ছৃঙ্খলতা ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। সুতরাং কাফিরদের জন্য দুনিয়ায় সুযোগ পাওয়া কোনো মর্যাদা নয়; বরং তা তাদের জন্য শাস্তির আগাম ভূমিকা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৭-৭৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৭-১১৮) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿نُمْلِي لَهُمْ﴾ ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দেই’, এ আয়াতাংশে আল্লাহ তায়ালার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় কাফির, অবাধ্য ও পাপাচারীদেরকে তাদের অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না। বরং তাদেরকে সময় দেন, তাদের পাপের পরিসর বাড়তে দেন, তাদের চক্রান্ত অব্যাহত রাখতে সুযোগ দেন এবং দুনিয়ার কিছু ভোগ-বিলাসও উপভোগ করতে দেন। বাহ্যত এগুলো সফলতা বা সুযোগ মনে হলেও বাস্তবে তা একটি কঠোর পরীক্ষা; কারণ এই অবকাশই তাদের ভবিষ্যতের শাস্তি আরও ভারী ও নিশ্চিত করার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। সূরাতু মারইয়ামে এ শব্দটির অর্থ আরও পরিষ্কারভাবে এসেছে:
﴿وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا﴾ [سورة مريم: ৪৬].
অর্থাৎ- “কিছু সময়ের জন্য আমাকে ছেড়ে দাও” (সূরাতু মারইয়াম: ৪৬) । এভাবে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের যে সময় বৃদ্ধি করেন, তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের চূড়ান্ত পরিণতিকে আরও ন্যায্য, সুস্পষ্ট এবং কঠিন করে তোলার জন্যই এ অবকাশ দেওয়া হয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০৩) ।
﴿اشْتَرَوُا الْكُفْرَ بِالْإِيْمانِ﴾ ‘তারা কুফরীকে ঈমানের বিনিময়ে ক্রয় করেছে’, আয়াতাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- তারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরিকে বেছে নিল। যেমন একজন ক্রেতা কোনো পণ্য কেনার সময় মূল্য দিয়ে বিনিময় করে, ঠিক তেমনভাবেই তারা সত্য ঈমানকে ত্যাগ করে তার বদলে কুফরিকে গ্রহণ করল। সুতরাং এখানে “কেনা” শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বোঝায়: সচেতনভাবে, জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তারা কুফরিকে নিজেদের জন্য লাভজনক মনে করে গ্রহণ করল; যদিও বাস্তবে এটি তাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৫) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে অন্যান্য আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের সাময়িক জয় এবং মুসলমানদের ওপর নেমে আসা বিপুল কষ্টকে পুঁজি করে মুনাফিকরা তাদের স্বভাবসিদ্ধ সুযোগসন্ধানী চরিত্র প্রকাশ করে। তারা বলতে শুরু করল: “যদি মুহাম্মাদ সত্যিকারের নবি হতেন, তাহলে তিনি পরাজিত হতেন না, আহত হতেন না; বরং তিনি শুধু রাজত্বের লোভে এগোচ্ছেন; কখনো জয় পান, আবার কখনো হারেন”। এভাবে তারা কুফরিকে সমর্থন দিল আর মুমিনদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করল, যেন তারা জিহাদ থেকে বিরত থাকে। এই অপপ্রচার ও বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা রাসূলুল্লাহর (সা.) হৃদয়ে বেদনা সৃষ্টি করল। কিন্তু তখন আল্লাহ তায়ালা সান্তনা হিসেবে এসব আয়াত নাজিল করলেন, যা রাসূলুল্লাহর মন থেকে দুঃখ ও কষ্ট দূর করে দিল, যেমন আগেও তিনি সান্তনা দিয়েছেন যখন কাফিররা ঈমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত, কুরআনের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ ছড়াত বা স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা.) মর্যাদার বিরুদ্ধে কথা বলত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূলকে আগে এভাবেও বলেছিলেন:
﴿وَلَا يَحْزُنكَ قَوْلُهُمْ إِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا﴾ [سورة يونس: ৬৫].
অর্থ- “তাদের কথায় আপনি দুঃখিত হবেন না; সমস্ত মর্যাদা তো আল্লাহর নিকটই” (সূরাতু ইউনুস: ৬৫) । আরেক জায়গায় বলেছিলেন:
﴿فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَـٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا﴾ [سورة الكهف: ৬].
অর্থ: “হয়তো আপনি দুঃখে নিজের জীবনই নষ্ট করে ফেলবেন, যদি তারা এ কুরআনে ঈমান না আনে” (সূরাতু আল-কাহ্ফ: ৬) ।
এভাবে আসমানী সান্তনা রাসূলুল্লাহকে (সা.) দৃঢ়তা ফিরিয়ে দিল, মন থেকে দুঃখ দূর করল এবং বুঝিয়ে দিল মুনাফিকদের ফোঁড়ন কিংবা কাফিরদের বিদ্বেষ আল্লাহর পরিকল্পনা ও নবীর সত্যতার ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে না। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৬)।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৬-১৭৮) আয়াতগুলো উহুদ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হয়ে মুমিনদের অন্তরে দৃঢ়তা ও প্রশান্তি সঞ্চার করে। এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা একদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামকে কাফেরদের শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র দেখে হতাশ না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যদিকে অবিশ্বাসীদের প্রকৃত অবস্থান ও পরিণতি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। এখানে ঈমান ত্যাগের ভয়াবহতা, কাফেরদেরকে আল্লাহর অবকাশের বাস্তব অর্থ এবং অহংকারীদের চ‚ড়ান্ত শাস্তির চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই আয়াতগুলো মুমিনদের জন্য একদিকে সান্তনা, অন্যদিকে গভীর সতর্কবার্তা এবং সর্বোপরি ঈমানকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার এক সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
১। ১৭৬ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা যায়:
(ক) উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের কর্মকান্ডে রাসূলুল্লাহকে মানসিক প্রশান্তি প্রদান, আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সকল মুসলিমদেরকে আশ্বস্ত করেছেন। উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের শত্রুতার কারণে যদি কেউ দুঃখিত বা হতাশ হয়, তাহলে এটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। কারণ কাফেররা আল্লাহর পরিকল্পনা বা শক্তিকে কোনোভাবেই ক্ষতি করতে পারবে না। এ সম্পর্কে অন্য আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا﴾ [سورة النساء: ৭৬].
অর্থ: “শয়তানের চক্রান্ত বড়ই দুর্বল” (সূরাতু আন-নিসা: ৭৬) । এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ولو اجتَمَعوا على أن يضرُّوكَ بشَيءٍ لم يَضرُّوكَ إلَّا بشيءٍ قد كتبَهُ اللَّهُ عليكَ” (سنن الترمذي: ২৫১৬).
অর্থ: “আর যদি তারা সবাই একত্রিত হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবুও তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, সেটুকু ছাড়া যা আল্লাহ তোমার জন্য পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন” (সুনান আল-তিরমিযী: ২৫১৬)। মুসলিমদের উচিত এই শিক্ষা গ্রহণ করা যে, জীবন বা যেকোনো প্রতিকূলতা আমাদের বিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারবে না, যদি আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি এবং ধৈর্যশীল থাকি।
(খ) পার্থিব জীবনের ক্ষণিক আনন্দ উপভোগ ছাড়া কাফেরদের জন্য আখরাতে কোনো অংশ নেই, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে অবিশ্বাসীরা আখেরাতে কোনো অংশ লাভ করতে পারবে না। তারা শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণিক আনন্দ উপভোগ করতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী সাফল্য বা শান্তি পাবে না। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ﴾ [سورة هود: ১৬].
অর্থ: “তাদের জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই” (সূরাতু হুদ: ১৬) । এটি মুসলিমদেরকে শক্তি দেয় যে, কাফেরদের কর্মকান্ডের জন্য কখনো মনোবল হারানো উচিত নয়। আখেরাতের প্রকৃত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এবং যারা অবিশ্বাসে তাড়াহুড়া করে চলে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তি নিশ্চিত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪)।
২। ১৭৭ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় প্রতিফলিত হয়:
(ক) ঈমান ত্যাগ করে কুফরের পথে ফিরে যাওয়ার ভয়াবহতা, আয়াতটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যারা একবার ঈমান আনে কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করে কুফরের পথে ফিরে যায়। তাদের আচরণকে আল্লাহ খুবই গুরুতর মনে করেন। তারা ঈমানকে ত্যাগ করে কুফরের সঙ্গে বিনিময় করে এবং সত্যপথের পরিবর্তে ভ্রান্ত পথ গ্রহণ করে। এটি শুধুই তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং আখেরাতেও তাদের জন্য কঠিন ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং ঈমানকে কখনো হালকা ভাবে নেওয়া বা তুচ্ছভাবে ত্যাগ করা ঠিক নয়।
(খ) মুরতাদরা আল্লাহকে ক্ষতি করতে পারবে না, আয়াতে বলা হয়েছে, “لَنْ يَضُرُّوا اللهَ شَيْئاً”, অর্থাৎ এই ধরনের অবিশ্বাসীরা আল্লাহকে কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের অবিশ্বাস, প্রতারণা বা বিদ্বেষ আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে। মুসলিমদের জন্য এর অর্থ হলো, আমাদের জীবনের কোনো প্রতিকূলতা বা শত্রুদের শত্রুতার কারণে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং যিনি ইচ্ছা করেন, তিনি তার সৃষ্টির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
(গ) মুরতাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা, আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, এই ধরনের মানুষদের জন্য “عَذَابٌ أَلِيمٌ”, অর্থাৎ কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্ধারিত। এখানে ‘আলিম’ বোঝায় এমন শাস্তি, যা সবচেয়ে তীব্র বেধনাদায়ক। এটি তাদের অবিশ্বাস এবং ঈমানের সঙ্গে প্রতারণার প্রতিফলন। সুতরাং ঈমান ত্যাগ করে কুফর গ্রহণ করা শুধু দুনিয়ার জীবনের জন্যই বিপদজনক নয়, বরং আখেরাতেও চরম শাস্তি নিয়ে আসে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪)। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ﴾ [سورة البقرة: ২১৭].
অর্থ: “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন থেকে ফিরে যায়, অতঃপর সে কুফর অবস্থায় মারা যায়, তাদের সব আমলই নষ্ট হয়ে যাবে” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২১৭) । আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَن بدَّلَ دينَه فاقتُلوهُ” (صحيح البخاري: ৩০১৭).
অর্থ: “যে দ¦ীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো” (সহীহ আল-বুখারী: ৩০১৭) । সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস পর্যালোচনা করে মুরতাদের জন্য তিনটি শাস্তি পাই: (ক) তাদের জন্য জাহান্নামের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে, (খ) তাদের সকল সৎআমল নষ্ট হয়ে যাবে, এবং (গ) তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।
৩। ১৭৮ নং আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে,
(ক) পার্থিব জীবনে কাফেরদের অবকাশ দেওয়া তাদের জন্য কল্যাণকর নয়, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। কাফের সহ সাধারণ মানুষের ধারণা যে, আল্লাহ তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন, জীবন দীর্ঘ করছেন এবং দ্রæত শাস্তি দিচ্ছেন না, এটা বুঝি তাদের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতের প্রথমাংশে স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি মোটেও তাদের জন্য ভালো নয়, বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণ ও ধ্বংসের কারণ। দুনিয়ায় শাস্তি বিলম্বিত হওয়া কখনোই আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়।
(খ) কাফেরদেরকে দুনিয়াতে অবকাশের প্রকৃত উদ্দেশ্য- তাদের গুনাহ বৃদ্ধি করা, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ বলেন: “আমি তাদেরকে সময় দেই এজন্য নয় যে তারা ভালো হয়ে যাবে, বরং এজন্য যে তারা আরও বেশি গুনাহে লিপ্ত হবে”। যত দিন তাদের জীবন দীর্ঘ হচ্ছে, তত দিন তারা নতুন নতুন পাপ অর্জন করছে। ফলে তাদের অপরাধের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। এই অবকাশ শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংসকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
(গ) কাফেরদের দীর্ঘ জীবন ও বড় শাস্তির সম্পর্ক, এই আয়াতের শেষাংশ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা জানা যায়- যত বেশি সময় তারা কুফর ও অবাধ্যতায় কাটায়, তত বড় হয় তাদের শাস্তির কারণ। জীবনের প্রতিটি দিন যদি গুনাহে ভরে যায়, তাহলে সেই দীর্ঘ জীবন তাদের জন্য রহমত নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। শেষপর্যন্ত তারা এমন ধ্বংসে নিপতিত হবে, যার তুলনা নেই। এই শাস্তি শুধু কষ্টদায়কই নয়, বরং চরম লাঞ্ছনাকর। কারণ দুনিয়ায় তারা অহংকার করত, নিজেদের বড় মনে করত, মানুষকে তুচ্ছ করত এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করত। তাই আল্লাহর ন্যায়বিচারের দাবি অনুযায়ী তাদের শাস্তিও হবে এমন, যা তাদের অহংকার চূর্ণ করবে এবং তাদেরকে অপমানিত করবে।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) শত্রুর বিরোধিতা, কষ্ট, ষড়যন্ত্র বা সাময়িক ক্ষতি দেখে হতাশ না হওয়া; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং ধৈর্য অবলম্বন করা।
(খ) ঈমানকে আগলে রাখা, সন্দেহ, চাপ বা লোভের কারণে ঈমান ত্যাগ না করা এবং দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা।
(গ) দুনিয়ায় সময় পাওয়া, জীবন দীর্ঘ হওয়া বা শাস্তি বিলম্বিত হওয়াকে নিরাপত্তা মনে না করে, তার মাধ্যমে তাওবা, সংশোধন ও নেক আমলে ফিরে আসা।

 

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭২-১৭৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: বিপদের পরেও অটুট ঈমান, অদম্য সাহস এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭২-১৭৫) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ (172) الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (173) فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ (174) إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (175)﴾ [سورة آل عمران: 172-175].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: বিপদের পরেও অটুট ঈমান, অদম্য সাহস এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৭২। যারা উহুদে আঘাতের পরও আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার, বিশেষ করে যারা তাদের মধ্যে সৎকর্ম করেছে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে।
১৭৩। যাদেরকে লোকেরা বলেছিল: “নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে লোকেরা জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তাদেরকে ভয় করো”, তাতে তাদের ঈমান দুর্বল হয়নি; বরং তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলল: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই উত্তম হেফাজতকারী”।
১৭৪। অতঃপর তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছে। তাদের কোনো ক্ষতি স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
১৭৫। এটি শয়তানের কৌশল যে সে তার বন্ধুদেরকে ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; বরং আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়ে থাকো।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
এ আলোচনার ধারাবাহিকতা এখনো উহুদ যুদ্ধ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে চলছে। নিচের চারটি আয়াতই সেই মুমিনদের সম্পর্কে, যারা শনিবার উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল এবং রবিবার আবু সুফিয়ানকে অনুসরণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)।
১৭২। যারা উহুদ যুদ্ধে আহত ও ক্লান্ত অবস্থাতেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে মুশরিকদের পিছু ধরে ‘হামরাউল আসাদ’-এর দিকে রওনা হয়েছিল, তারা নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রয়াস ব্যয় করেছিল এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশনা পূর্ণভাবে মেনে চলেছিল। তাদের মধ্যে যারা উত্তম আমল করেছে ও আল্লাহকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহামূল্যবান প্রতিদান।
১৭৩। তাদের মধ্যেই সেই মানুষরা রয়েছে যারা শত্রুদের ভয় দেখানোর চেষ্টা সত্তে¡ও দমে যায়নি। আব্দুল কায়েস গোত্রের কিছু লোক এসে বলেছিল, “আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা তোমাদের বিরুদ্ধে আবার সম্পূর্ণ পস্তুত; তাই তাদের ভয় করো, কারণ তোমাদের শক্তি তাদের মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত নয়”। কিন্তু এই ভীতি তাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করল এবং তারা আল্লাহর প্রতিশ্রæতিতে আরও বিশ্বাসী হলো। এতে তারা মোটেও নিরুৎসাহিত হয়নি; বরং অটল সংকল্প নিয়ে আল্লাহ যেদিকে ইচ্ছা করেছেন, সেদিকেই অগ্রসর হয়ে বলেছিল: “আমাদের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট, আর তিনি-ই সেরা অভিভাবক ও রক্ষাকারী”।
১৭৪। তারা ‘হামরাউল আসাদ’ থেকে আল্লাহ প্রদত্ত বিশাল প্রতিদান ও উচ্চ মর্যাদার নিয়ামত নিয়ে নিরাপদে মদিনায় ফিরে এলো; কারণ আবু সুফিয়ান তার দলবল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা তাদের ঈমান ও দৃঢ়তাকে আরও গভীর করল, আল্লাহর শত্রুদের দুর্বল করল এবং কোনো ক্ষতি বা আঘাত ছাড়াই তারা শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে এল। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য বজায় রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করল। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, দয়াশীল ও তাঁর উদারতার এই অনুগ্রহ সকলের জন্য বিস্তৃত।
১৭৫। আল্লাহ তাআলা বিশ্বাসীদের সচেতন করছেন যে, আব্দুল কায়েস গেত্রের যে সকল লোক তোমাদের শত্রুদের দ্বারা ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল, যাতে তোমরা তাদের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাক, তারা কেবল শয়তানের সহযোগী, যারা নিজের অনুসারীদের দুর্বল করার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকারের ঈমানদাররা তাদের মতো নয়। তাই মুমিনরা শত্রুর ভয় দেখানো নিয়ে চিন্তা না করে কেবল আল্লাহকে ভয় করবে, যদি তারা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে ঈমানের দায়িত্ব পালন করে থাকে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১১-৪১২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৭-১৬৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭২-৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৭) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ﴾ ‘তাদেরকে যখম স্পর্শ করার পর’, আয়াতাংশে যখম দ্বারা উহুদ যুদ্ধে প্রাপ্ত আঘাতকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩০) ।
﴿الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ﴾ ‘মানুষরা যাদেরকে বলেছিল: মানুষরা তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে”, আয়াতাংশে প্রথম ‘মানুষর’ দ্বারা আব্দে কায়েস গোত্রের লোকজনকে বোঝানো হয়েছে, যারা আবু সুফিয়ান থেকে টাকা খেয়ে তার পক্ষ হয়ে মুসলমানদেরকে ভয় দেখিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ‘মানুষরা’ দ্বারা আবু সুফিয়ান ও তার দলবলকে বোঝানো হয়েছে, যারা উহুদ যুদ্ধের পরে মক্কায় ফেরার পথে মুসলমানদের সমূলে শেষ করে দেওয়ার জন্য পূণরায় জড়ো হতে চেয়েছিল। কিন্তু অবশেষে তারা ভয়ে পালিয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১১) ।
﴿فَانْقَلَبُوا﴾ ‘অতঃপর তারা ফিরে এসেছে’, অর্থাৎ- মুসলমানরা ‘হামরাউল আসাদ’ থেকে ‘মদীনায়’ ফিরে এসেছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১০) ।
﴿بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ﴾ ‘আল্লাহর নেয়ামত এবং অনুগ্রহ’, এখানে ‘নেয়ামত’ বলতে বোঝানো হয়েছে- উহুদ যুদ্ধের পর আহত ও ক্লান্ত থাকা সত্তে¡ও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশে সাড়া দিয়ে ‘হামরাউল আসাদ’ এর দিকে যাত্রা করা সাহাবিদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। সেই অনুগ্রহ ছিল- তাদের নিরাপদ রাখা, তাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করা, এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি তাদের আনুগত্য অটুট রাখা। অর্থাৎ, তারা দুনিয়াবি কষ্টের মাঝেও ঈমান, সাহস ও আনুগত্যের ওপর স্থির থাকতে সক্ষম হয়েছে, এটাই তাদের জন্য ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। আর ‘ফজল’ বা অনুগ্রহ বলতে বোঝানো হয়েছে সেই অভিযানে বের হওয়ার ফলে তারা পথে যে বাণিজ্যিক লাভ বা সম্পদের উপকার পেয়েছিল, সেটিও ছিল আল্লাহর অতিরিক্ত অনুগ্রহ। অর্থাৎ, শুধু আধ্যাত্মিক পুরস্কারই নয়, অর্জিত হয়েছে দুনিয়াবি কল্যাণও। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩১) ।
﴿الشَّيْطَانُ﴾ ‘শয়তান’, এখানে ‘শয়তান’ বলতে শয়তানে জিন নয়, বরং শয়তান স্বভাবের মানুষ, বিশেষভাবে নাঈম ইবন মাসউদ, যে চতুরতার সাথে মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে তাদের মনোবল ভাঙতে চেয়েছিল। সে মুশরিকদের পক্ষে কাজ করে মুসলমানদের মনে ভয় সঞ্চার করছিল, যাতে তারা মনে করে যে, শত্রুরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের মোকাবিলা করা অসম্ভব। আল্লাহ তা’আলা এ আয়াতে মুমিনদেরকে আশ্বস্ত করেছেন- মুশরিকদের পক্ষে যারা ভয় দেখায় তারা শুধু শয়তানের সহযোগী; তাদের ভয় মানুষের মন দুর্বল করার কৌশল মাত্র। মুমিনদের উচিত নয় তাদের ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া, বরং আল্লাহকেই ভয় করা উচিত, যদি তারা সত্যিই ঈমানদার হয়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩১) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো আগের প্রসঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদ ও গাজীদের মর্যাদা, তাদের আখেরাতের জীবন্ত অবস্থা এবং মহান পুরস্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আর বর্তমান আয়াতগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে সেই সাহাবা সম্পর্কে, যারা উহুদের কঠিন বিপর্যয়, আঘাত ও আহত অবস্থার মধ্য দিয়েও রাসূলুল্লাহর (সা.) আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছিল। তারা ঈমানকে অটুট রেখে, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে এবং অদম্য সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের সাথে ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে তাদের উচ্চ মর্যাদা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং তাদের জন্য নির্ধারিত মহান প্রতিদানের কথা তুলে ধরেছেন।

আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
প্রথম ঘটনা- হামরাউল আসাদ অভিযানের ইতিহাস:
উহুদ যুদ্ধ থেকে আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা যখন ফিরে গেল এবং ‘রওহা’ নামক স্থানে (যা মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি অবস্থিত) পৌঁছাল, তখন তারা অনুতপ্ত হলো এবং ভাবতে লাগল- আমরা কেন মুমিনদের পুরোপুরি শেষ করে আসলাম না? তাই তারা আবার মদিনার দিকে ফিরে এসে অবশিষ্ট মুসলমানদের ধ্বংস করার ইচ্ছা করল। এই খবর রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে পৌঁছালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শত্রুদের মনে ভয় সৃষ্টি করবেন এবং তাঁর ও সাহাবিদের শক্তি তাদের সামনে প্রদর্শন করবেন। তাই তিনি সাহাবিদেরকে আহ্বান করলেন এবং বললেন: গতকাল যারা উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল, শুধু তারাই আমার সাথে বের হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে বের হলেন এবং ‘হামরাউল আসাদ’-এর কাছে পৌঁছালেন, যা মদিনা থেকে আট মাইল দূরে অবস্থিত। সেই সময় সাহাবিদের দেহে ছিল যুদ্ধের ক্ষত ও ব্যথা; তবুও তারা নিজেদের ওপর জোর করে দাঁড়ালেন, যাতে সওয়াব ও পুরস্কার লাভে পিছিয়ে না পড়েন।
অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদের অন্তরে ভয় ঢেলে দিলেন। তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গ্রæতগতিতে মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। এই ঘটনার পর উক্ত আয়াত নাজিল হয়। এ অভিযানের নামই হলো ‘গযওয়াতু হামরাউল আসাদ’, যা উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী ও সংশ্লিষ্ট একটি অভিযান হিসেবে গণ্য করা হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬২-১৬৩) ।

দ্বিতীয় ঘটনা- ছোট বদর অভিযানের ইতিহাস:
আবু সুফিয়ান উহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে যাওয়ার সময় বলেছিল: হে মুহাম্মদ! চাইলে আমাদের সাক্ষাতের স্থান হোক আগামী বছরের বদরের মেলা। রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: এটা আমাদের ও তোমাদের মাঝে নির্ধারিত রইল, ইনশাআল্লাহ। পরের বছর নির্ধারিত সময় এলে আবু সুফিয়ান মক্কার লোকদের নিয়ে রওনা হলো এবং ‘মাররে জাহরান’ এর পাশের ‘মজন্নাহ’ এলাকায় পৌঁছল। কিন্তু আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। ফলে তার মনে যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ার চিন্তা উদয় হলো।
এ সময় সে ‘উমরা’ করতে আসা ‘নুয়াইম ইবন মাসউদ’-এর সঙ্গে দেখা করল। আবু সুফিয়ান তাকে বলল: আমি মুহাম্মদ ও তার সাহাবিদের সাথে বদরের মৌসুমে সাক্ষাতের প্রতিশ্রæতি দিয়েছি। কিন্তু এ বছর খুবই খরা, গাছ-গাছালির কোনো খাবার নেই, দুগ্ধও কম। এই অবস্থায় যুদ্ধ করা আমাদের জন্য উপযোগী নয়। আমার ইচ্ছা হয়েছে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু আমি চাই না যে মুহাম্মদ বের হয়ে আসুক আর আমি না যাই, এতে তাদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। তুমি শহরে গিয়ে তাদের মন ভেঙে দাও। এটা করতে পারলে আমি তোমাকে দশ উট দেব, যা ‘সুহাইল ইবন আমর’-এর কাছে জমা থাকবে।
নুয়াইম মদিনায় গিয়ে দেখল মুসলিমরা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন সে তাদের বলল: এটা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। তারা গত বছর তোমাদের ঘরের কাছে এসে তোমাদের ক্ষতি করতে পারেনি, আর এখন তোমরা নিজে থেকেই তাদের দিকে যাচ্ছো? তারা মেলায় তোমাদের বিরুদ্ধে বিপুল বাহিনী জড়ো করেছে। আল্লাহর কসম! কেউই তাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। তার কথায় কিছু মুসলিমের মনে ভীতি সৃষ্টি হলো। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “যার হাতে আমার প্রাণ, আমি অবশ্যই বের হব, একা হলেও”।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সত্তর জন সাহাবিকে নিয়ে ‘বদর সুগরা’ (বদরুল মাওয়ািদ)-এর জন্য রওনা হলেন। তাঁরা সেখানে আটদিন অবস্থান করলেন এবং আবু সুফিয়ানের অপেক্ষা করলেন। কিন্তু কেউই আসেনি, কারণ আবু সুফিয়ান তার দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কায় ফিরে গিয়েছিল। মক্কার লোকেরা তাদেরকে উপহাস করে বলত: “তোমরা তো শুধু সাওইক (পোড়া গমের খাবার) খেতে বের হয়েছিলে”। তাই তারা পরিচিত হলো “জাইশুস-সাওইক” বা ‘সাওইক বাহিনী’ নামে। অন্যদিকে মুসলিমরা বদরের বাজারে পৌঁছে ব্যবসা-বাণিজ্য করলেন, চামড়া ও কিশমিশ বেচাকেনা করলেন এবং এক দিরহামে দুই দিরহাম লাভও করলেন। পরে তারা নিরাপদে ও সম্পূর্ণ সুস্থভাবে মদিনায় ফিরে এলেন, লাভবান ও সম্মানিত অবস্থায়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৩-১৬৪) ।

১৭২ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু জারির আত-তাবারী (র.) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন: উহুদ যুদ্ধের দিনে যা ঘটেছিল তার পর আল্লাহ তাআলা আবু সুফিয়ানের হৃদয়ে ভয় নিক্ষেপ করেন। ফলে সে মক্কার দিকে ফিরে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আবু সুফিয়ান তোমাদের কিছুটা ক্ষতি করেছে, কিন্তু সে ফিরে গেছে, আর আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন”। উহুদের যুদ্ধ হয়েছিল শাওয়াল মাসে। আর ব্যবসায়ীরা সাধারণত জিলক্বদ মাসে মদিনায় আসত এবং ‘বদর সুগরা’ বা ‘ছোট বদর’ নামক স্থানে অবস্থান করত। উহুদের ঘটনার পর যখন তারা মদিনায় আসে, তখন মুসলমানরা আঘাতপ্রাপ্ত ও ক্লান্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকজনকে আহ্বান করলেন তার সঙ্গে বের হওয়ার জন্য। এ সময় কিছু মানুষরুপী শয়তান তার সহযোগীদের ভয় দেখাতে লাগল এবং বলল: “মানুষ তোমাদের বিরুদ্ধে বড় বাহিনী জড়ো করেছে”। এতে অনেকেই রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে যেতে দ্বিধা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আমি অবশ্যই রওনা হব, কেউ না গেলেও আমি একাই যাব”।
অবশেষে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, যুবাইর, সাদ, তলহা, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, হুযাইফাহ ইবন ইয়ামান এবং আবু উবাইদাহ (রাঃ) সহ প্রায় সত্তরজন সাহাবি তাঁর সঙ্গে বের হলেন। তারা আবু সুফিয়ানের পিছু নিলেন এবং সফরা নামক জায়গা পর্যন্ত পৌঁছালেন। তখন আল্লাহ ১৭২ নং আয়াত নাযিল করেন।
তাবারানী একটি সহীহ সনদে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন- উহুদ থেকে ফিরে মুশরিকরা একে অপরকে বলল: “তোমরা না মুহাম্মদকে হত্যা করতে পেরেছ, না তার সঙ্গীদের নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছ। তোমরা খুবই খারাপ কাজ করেছ! চল ফিরে গিয়ে তাদেরকে শেষ করে আসি!”। এ কথা রাসূলুল্লাহর (সা.) কানে পৌঁছলে তিনি মুসলমানদের আহ্বান করলেন। সাহাবিরা প্রস্তুত হলেন এবং ‘হামরাউল আসাদ’ বা ‘আবি উতবা’ কূপ পর্যন্ত গেলেন। তখনই ১৭২ নং আয়াত নাযিল হয়েছে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৪) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৭২ নং আয়াত থেকে বুঝা যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপুরস্কার প্রাপ্তির জন্য বান্দাকে তিনটি শর্ত পূর্ণ করতে হবে:
(ক) বিপদ ও যন্ত্রণার মধ্যেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশকে মান্য করে তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া, যেমন উহুদ যুদ্ধে সাহাবারা আহত, গুরুতর জখমপ্রাপ্ত, ক্লান্ত ও ব্যথায় জর্জরিত হওয়ার পরেও রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করেননি। উহুদ যুদ্ধের পরপরই যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) শত্রুদের ধাওয়া করার জন্য ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানের ডাক দেন, তখন তারা নিজেদের কষ্ট, রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে আবার জিহাদের জন্য বের হয়েছিলেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭১) ।
(খ) ত্যাগের পরে সৎআমলের উপর অটুট থাকা, কারণ আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে: “যারা আন্তরিকতার সাথে ভালোকাজ করেছে”।
(গ) ত্যাগের পরে তাক্বওয়া ভিত্তিক জীবন গঠনে সচেতন থাকা, কারণ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: “এবং যারা আল্লাহভীতি অবলম্বন করেছে”।
আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে মহাপুরস্কারের জন্য প্রথম শর্তটিই যথেষ্ঠ নয়, বরং তার সাথে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শর্ত থাকা অপরিহার্য।
২। ১৭৩ নং আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে,
(ক) প্রকৃত মুমিন কখনো কাপুরুষ হয় না, কারণ কাপুরুষতা ঈমানের সঙ্গে একসাথে থাকতে পারে না। এর মূল কারণ হলো- মৃত্যুর ভয় ও দুনিয়ার জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। আর এগুলো একজন সত্যিকারের মুমিনের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাহাবায়ে কেরাম এই বিশ্বাসের বাস্তব উদাহরণ ছিলেন। তারা কষ্ট, বিপদ ও শত্রুর ভয়কে উপেক্ষা করে আল্লাহর পথে অগ্রসর হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ তায়ালা কোরআনে তাদের প্রশংসা করেছেন।
(খ) বিপদের মুখে প্রকৃত মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি পায়, এজন্য আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে: ‘এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়’। এ সম্পর্কে সূরাতু আল-আহযাবের একটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزابَ قالُوا: هذا ما وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَما زادَهُمْ إِلَّا إِيماناً وَتَسْلِيماً﴾ [سورة الأحزاب: ২২].
অর্থ: “মুমিনরা যখন সম্মিলিত শত্রুবাহিনী (আহযাব) দেখল, তখন তারা বলল: ‘এটাই তো সেই বিষয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদেরকে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সত্য বলেছেন’। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্য আরও বেড়ে গেল” (সূরাতু আল-আহযাব: ২২) ।
(খ) বিপদকালে পড়ার জন্য মুমিনকে একটি দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, দোয়াটি হলো-
“حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ”.
অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতইনা উত্তম কর্মবিধায়ক”, যা আয়াতের শেষাংশে উল্লেখিত হয়েছে।
হযরত ইবরাহীমকে (আ.) যখন আগুনে নিক্ষেপ করার প্রস্তুতি চ‚ড়ান্ত করা হলো, তখন তিনি জানতেন যে মানবিক দিক থেকে আর কোনো পথ খোলা নেই। চারপাশে মানুষ, কাঠের বিশাল স্তুপ ও জ্বলন্ত আগুন- সবকিছুই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি কারো কাছে সাহায্য চাননি; বরং সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে সমর্পণ করেন। এবং তাঁর মুখে যে শেষ দোয়াটি উচ্চারিত হয়েছিল-“হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। সহীহ আল-বুখারীর একটি হাদীসে এসেছে:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: “كَانَ آخِرَ قَوْلِ إِبْرَاهِيمَ حِينَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ: حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الوَكِيلُ” (صحح البخاري: ৪৫৬৪).
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: ইব্রাহীম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মুহুর্তে সর্বশেষ কথা ছিল: “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। (সহীহ আল-বুখারী: ৪৫৬৪) ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কঠিন সময় পাড় করতেন, তখন এ দোয়াটি পাঠ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে:
أن النبي -صلعم- كان إذا اشتد غمّه، مسح بيده على رأسه ولحيته، ثم تنفس الصّعداء، وقال: حسبي الله ونعم الوكيل”.
অর্থ: “যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) দুশ্চিন্ত খুব বেড়ে যেত, তখন তিনি নিজের মাথা ও দাড়িতে হাত বুলাতেন, তারপর গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেন এবং বলতেন: ‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক”। (আল-দুররু আল-মানছুর, সুয়ূতী: ২/৩৯০) ।
সাহাবায়ে কেরামকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিপদের সময়ে এ দোয়াটি পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إذا وقعتم فى الأمر العظيم فقولوا: حسبنا الله ونعم الوكيل” (تفسير ابن كثير).
অর্থ: যখন তোমরা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হবে, তখন পড়বে- “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল” (ইবনু কাছীর) ।
শেষের দুইটি হাদীস নিয়ে কথা থাকলেও, বিপদে উক্ত দোয়া পড়া কোরআন দ্বারা সাব্যস্ত হওয়ার কারণে হাদীস যয়ীফ হওয়ার প্রভাব এর আমলে পড়বে না।
(গ) ঈমানদারের ঈমান বাড়ে এবং কমে, আল্লাহ তায়ালার বাণী- “মানুষের কথাবার্তা ও হুমকি তাদের ঈমানকে কমায়নি; বরং তা তাদের ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে”। অর্থাৎ- তা তাদের দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি করেছে, হৃদয়ে আরও দৃঢ় ইয়াকিন সৃষ্টি করেছে, এবং তাদের মধ্যে সাহস, শক্তি ও আত্মবিশ্বাস এবং প্রস্তুতি গড়ে তুলেছে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, নেক আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়।
আলেমগণ ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস বিষয়ে বলেন: ঈমানের মূল ভিত্তি ও প্রকৃত সত্তা, অর্থাৎ অন্তরের বিশ্বাস (তাসদীক) যখন একবার স্থির হয়ে যায়, তখন তার মাঝে মূলত বৃদ্ধি বা ঘাটতি আসে না; আর যখন তা চলে যায়, তখন ঈমানের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তবে বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটে ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে, মূল সত্তার মধ্যে নয়।
তবে অধিকাংশ আলেমের মত হলো: ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায় মানুষের আমলের দিক থেকে, অর্থাৎ ঈমান থেকে যে কাজগুলো জন্ম নেয়, সেসব কাজের মাধ্যমে ঈমান শক্তিশালী বা দুর্বল হয়। এর দলীল হিসেবে সুনানে তিরমিযীর হাদিসে এসেছে:
“الإيمان بضع وسبعون بابا، فأعلاها قول: لا إله إلا الله، وأدناها إماطة الأذى عن الطريق، والحياء شعبة من الإيمان” (سنن الترمذي).
অর্থ: “ঈমানের অনেকগুলো শাখা আছে, সবচেয়ে উঁচু হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলা, আর সবচেয়ে নিচের স্তর হলো- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, এবং লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা”। এই বর্ণনায় ঈমানের “শাখা” থাকার কথাই প্রমাণ করে যে ঈমানের মধ্যে বৃদ্ধি ও স্তরভেদ রয়েছে। এছাড়াও সূরাতু আল-আনফাল এর দ্বিতীয় আয়াতে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: প্রকৃত ঈমানদার কোরআন তেলাওয়াত করলে বা শুনলে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।
৩। ১৭৪ নং আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়- সাহাবাগণ যখন নিজেদের সব বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন এবং সম্পূর্ণ অন্তর দিয়ে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করলেন, তখন আল্লাহ তাদের বিশেষ অনুগ্রহে ভূষিত করেন। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে চার ধরনের প্রতিদান দিলেন:
(ক) নেয়ামত, অর্থাৎ মানসিক শান্তি, অন্তরের প্রশান্তি, সাহস এবং ঈমানের দৃঢ়তা। তারা ভয় বা আতঙ্ক নিয়ে ফিরে আসেনি, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের মানসিক শক্তি লাভ করেছিল।
(খ) ফযল বা অনুগ্রহ, নেয়ামতের চেয়েও বেশি কল্যাণ ও অতিরিক্ত অনুগ্রহ। অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে শুধু নিরাপদই রাখেননি, বরং মর্যাদা ও সওয়াবের দিক থেকেও অনেক উঁচু স্তর দান করেছেন এবং অর্থনীতিতে সাবলম্ভী দান করেছেন।
(গ) সকল অকল্যাণ থেকে হেফাজত, আল্লাহ তাদেরকে শত্রুদের ষড়যন্ত্র, হামলা ও ক্ষতি থেকেও নিরাপদ রেখেছেন। তারা বড় বিপদের আশঙ্কা নিয়ে বের হয়েছিল, কিন্তু কোনো ক্ষতি ছাড়াই ফিরে এসেছিল।
(ঘ) আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালনা, আল্লাহ তাদের অন্তরকে এমন পথে পরিচালিত করলেন, যা তাঁর সন্তুষ্টির কারণ হয়। এর ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর তাকদীর ও ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭২) ।
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি বিপদের সময় নিজের শক্তির ওপর নয়, বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে, তখন আল্লাহ শুধু তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন না; বরং তার অন্তরে শান্তি দেন, মর্যাদা বাড়ান এবং নিজের সন্তুষ্টি দান করেন।
৪। ১৭৫ নং আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইসলাম বিরোধী কুচক্রী মহলকে শয়তান আখ্যা দেওয়া হয়েছে, আয়াতের প্রথমাংশে এসেছে যে, আব্দুল কায়েস গেত্রের কিছু লোক মুশরিকদের থেকে ঘুষের বিনিময়ে মুসলমানদেরকে তাদের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করেছিল, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শয়তান আখ্যা দিয়েছেন। সূরাতু আন-নাস এবং সূরাতু আল-মুজাদালাহ এর ১৯ নং আয়াতেও ইসলাম বিদ্বেষী কুচক্রী মহলকে শয়তান বলা হয়েছে।
(খ) একজন মুমিনের অন্তরে ভয়ের কেন্দ্র হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, একজন মুমিনের অন্তরে ভয়ের মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, কারণ তিনিই সর্বক্ষমতাবান এবং সব কিছুর পরিণতির মালিক। বাহ্যিক শক্তি, শত্রু বা কঠিন পরিস্থিতির ভয় যদি মানুষের অন্তরে এমনভাবে স্থান করে নেয় যে তা তাকে সত্যের পথে অটল থাকতে বাধা দেয়, তবে তা প্রকৃত তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী হয়ে যায়। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি দুনিয়ার ভয়কে নিজের ঈমানের ওপর প্রভাব ফেলতে দেয় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখে এবং তাঁর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রেখে সাহস ও ধৈর্যের সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে।
(গ) শয়তান ঈমানদারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, সে তাদের সহযোগীদের- বিশেষ করে মুনাফিকদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়, যাতে তারা দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় হতে না পারে।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) কষ্ট, ভয় বা ক্ষতির পরও আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মানতে প্রস্তুত থাকা এবং কঠিন অবস্থাতেও দ্বীনের পথ থেকে পিছিয়ে না আসা।
(খ) সমস্যা ও বিপদের সময় বারবার অন্তর থেকে নি¤েœর দোয়া পাঠ করা:
“حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ”.
অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতইনা উত্তম কর্মবিধায়ক”।
(গ) মানুষের ভয় বা হুমকিকে ঈমান দুর্বল হওয়ার কারণ না বানিয়ে, বরং এটাকে আল্লাহর দিকে আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
(ঘ) মানুষ বা শত্রুর ভয় নয়, বরং আল্লাহকে ভয় করাকে জীবনের মূলনীতি বানানো।
(ঙ) গুজব, আতঙ্ক, হুমকি ও মিথ্যা খবর দ্বারা যেন মনোবল ভেঙে না পড়ে, বরং এসবকে শয়তানের কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে দৃঢ় থাকা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৯-১৭১) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: আল্লাহর পথে শহীদদের পুরস্কার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৯-১৭১) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ (169) فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (170) يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ (171)﴾ [سورة آل عمران: 169-171].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: আল্লাহর পথে শহীদদের পুরস্কার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬৯। তুমি কখনো ভাবিও না যে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া মানুষরা মৃত; বরং তারা জীবিত, তাদের রবের নিকটে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় আছে, এবং আল্লাহ তাদেরকে নিয়মিত রিজিক দান করছেন।
১৭০। তারা আনন্দিত, আল্লাহ তাদের যে নিয়ামত ও অনুগ্রহ দিয়েছেন, তাতে পরিপূর্ণ খুশি, এবং যারা এখনও দুনিয়ায় আছে তাদের জন্যও তারা উৎফুল্ল; কারণ তাদেও কোনো ভয় নেই, এবং তারা কখনো দুঃখিত হবে না।
১৭১। তারা খুশি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত ও করুণায়, এবং তারা দৃঢ়ভাবে জানে- আল্লাহ কখনো মুমিনের আমল বা প্রতিদান নষ্ট করেন না।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৬৯। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সম্বোধন করে বলেছেন: তিনি যেন আল্লাহর পথে প্রাণ উৎসর্গকারীদেরকে মৃত্যু মনে না করেন। বরং তারা আল্লাহর কাছে এক বিশেষ জীবনে জীবিত থাকে, যা দুনিয়ার সাধারণ জীবন নয়, বরং বারযাখের সম্মানিত জীবন। যার জন্য তারা সংগ্রাম করেছেন, যে মহান রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা জীবন দিয়েছেন, সেই রবের সান্নিধ্যে তারা আনন্দে বসবাস করছেন। আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের রিজিক দান করেন; তারা সেখানে পরম শান্তি, নিরাপত্তা ও এক বিশেষ সুখ-সম্মান উপভোগ করেন। তারা সেখানে সবুজ পাখি হয়ে সর্বত্র উড়ে বেড়াচ্ছে এবং জান্নাতের চির সুখ উপভোগ করছে। দুনিয়ার চোখে তারা মৃত মনে হলেও, বাস্তবে তারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত সম্মানিত জীবন্ত আত্মা, যারা জান্নাতের আনন্দ ও পুরস্কার উপভোগ করছেন।
১৭০। আল্লাহ তায়ালা শহীদদের প্রতি যখন নিজের বিশাল দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেন, তারা তখন পরিপূর্ণ আনন্দে ভরে ওঠে। জান্নাতের নানান নেয়ামত, শান্তি ও সন্তুষ্টি তাদের চোখে সুখের দীপ্তি জ্বালিয়ে দেয়। তারা তাদের মুসলিম ভাইদের জন্যও খুশি হয়, যারা এখনও দুনিয়ায় আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছে। কারণ তারা জানে, যদি তারা আল্লাহর পথে আন্তরিকভাবে লড়াই করে শহীদ হয়, তবে সেই সম্মান, শান্তি ও আনন্দ তাদেরও নসীব হবে, যেমনটি তারা পেয়েছে। শহীদরা নিশ্চিত থাকে যে, আখিরাতে তাদের কোনো ভয় নেই এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখ যা তারা পিছনে ফেলে এসেছে, তাতেও তারা দুঃখ পাবে না। এভাবে আল্লাহর পথে আত্মত্যাগ করা শহীদদের জন্য রয়েছে চিরন্তন সম্মান, আনন্দ ও অনন্য নিরাপত্তা, যা কেবল আল্লাহর নিকটেই উপলব্ধ।
১৭১। তারা জান্নাতে পরিপূর্ণ আনন্দে ও প্রশান্তিতে ভরে থাকে। এই আনন্দ আসে আল্লাহ প্রদত্ত নানান নেয়ামত ও বিশাল দয়া-অনুগ্রহ থেকে। তারা জানে তাদের ত্যাগ, তাদের কষ্ট, এবং আল্লাহর পথে করা প্রতিটি কার্য কখনো বৃথা যাবে না। আল্লাহ এই আধ্যাত্মিক সার্থকতা বৃদ্ধি করেন, এবং তাঁর অনুগ্রহ ও বরকতের মাধ্যমে তা আরও সমৃদ্ধ করেন। তাই শহীদরা চিরন্তন আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করে, কারণ তারা নিশ্চিত যে, যারা আল্লাহর পথে প্রাণ দিয়েছে, তাদের পুরস্কার চিরকাল ধরে আল্লাহর নিকটে অটুট এবং অনন্ত। এটি শুধু তাদের জন্যই নয়, এটি অন্যান্য মুমিনদেরও উদ্দীপনা দেয়, যাতে তারা জানে, সত্যিকারের ত্যাগ ও ভক্তি কখনো বৃথা যায় না; বরং আল্লাহ তা গুণিত করে তাদের নিকটে ফেরান। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৯; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭২; আল-মুনতাখাব: ১/১১৬) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَحْيَاءٌ﴾ ‘জীবিত’, এ জীবিত থাকার অর্থ দুনিয়ার সাধারণ জীবন নয়; বরং শহীদরা তাদের রবের কাছে এমন এক সম্মানিত জীবন লাভ করে যেখানে তারা জান্নাতের নেয়ামত অনুভব করে, স্বাদ গ্রহণ করে, শান্তি উপভোগ করে। তারা সেখানে খাদ্য-পানীয়ের বরকতময় রিজিক পায়, জান্নাতের সুখ-শান্তিতে পরিপূর্ণ থাকে, আর দুনিয়ার প্রাণহীন মৃতদের মতো নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই তারা জীবনের স্বাদ ও সুখ উপভোগ করছে। এই “জীবন” তাদের সম্মান, মর্যাদা ও আল্লাহর নৈকট্যের ফল, যা শুধু শহীদদের জন্যই বিশেষভাবে সংরক্ষিত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৮) ।
﴿وَيَسْتَبْشِرُونَ﴾ ‘এবং তারা উৎফুল্ল হয়’, الاستبشار বলতে সেই বিশেষ আনন্দ ও হৃদয়-উল্লাসকে বোঝায়, যা একজন মুমিনের অন্তরে জন্মায় যখন সে ঈমানের সঠিক পথে অবিচল থাকে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদের ময়দানে নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা প্রদান করে। এ আনন্দ নিছক দুনিয়াবি সুখ নয়; বরং তা হলো এক গভীর, নিরাপদ, ঈমান-সঞ্জাত প্রশান্তি, যা মানুষকে বুঝিয়ে দেয় যে সে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য পথে অগ্রসর হচ্ছে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৭০) ।
﴿أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ ‘তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং নেই কোন পেরেশানি’, আয়াতাংশে কাদেরকে বলা হয়েছে তাদের কোনো ভয় এবং পেরেশানি নেই? বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ থেকে আয়াতাংশের দুইটি উদ্দেশ্য পাওয়া যায়:
(ক) যে সকল যোদ্ধারা এখনো শহীদদের সাথে মিলিত হয়নি, দুনিয়াতে রয়ে গেছে গাজি বেশে ঈমানের পথে, তাদের জন্যও আখেরাতে ভয় এবং পেরেশানি মুক্ত জীবনের সুসংবাদ অপেক্ষা করছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ১৬০) ।
(খ) যারা শহীদ হয়েছে, তাদের জন্য আখেরাতে কোন ভয় নেই এবং তারা দুনিয়ায় যা কিছু পেছনে রেখে এসেছে, তার জন্য তাদের কোনো দুঃখও নেই; কেননা জান্নাতের মহিমান্বিত সম্মান, অনুপম কৃপা এবং আল্লাহর নৈকট্য তাদের হৃদয়কে এমনভাবে পরিপূর্ণ করে দেয় যে দুনিয়ার সব অনুশোচনা সেখানে ¤øান হয়ে যায়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৯) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো আগের প্রসঙ্গের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পূর্বের আয়াতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন- মুনাফিকরা কীভাবে জিহাদে আগ্রহীদের নিরুৎসাহিত করত এবং বলত: “তারা যদি মদিনায় বসে থাকত, তবে নিহত হতো না”। এরপর আল্লাহ তাদের এই কথার জবাব দেন যে মৃত্যু আল্লাহর সিদ্ধান্তে ও নির্ধারিত সময়ে ঘটে, পালিয়ে কেউ রক্ষা পেতে পারে না। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ শহীদদের মহিমান্বিত মর্যাদা তুলে ধরেছেন, যাতে মুনাফিকদের কথায় কেউ দুর্বল হয়ে না পড়ে, এবং যাতে মুমিনরা আরও দৃঢ়ভাবে আল্লাহর পথে জিহাদে অগ্রসর হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৪) ।

১৬৯ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: উহুদ যুদ্ধে যখন আপনার ভাইরা শহীদ হয়, আল্লাহ তাদের আত্মাকে জান্নাতের সবুজ পাখির ভিতরে রাখেন। সেখানে তারা জান্নাতের নদীগুলোতে ঘুরে, ফলের স্বাদ গ্রহণ করে এবং আরশের ছায়ায় অবস্থিত স্বর্ণের দীপে বিশ্রাম নেয়। তাদের খাদ্য, পানীয় ও বিশ্রাম এতই আনন্দদায়ক যে তারা বলে: হায়! আমাদের ভাইরা যদি জানতেন আল্লাহ আমাদের জন্য কী প্রস্তুত করেছেন, তারা কখনো জিহাদ থেকে বিরত হতেন না। জবাবে আল্লাহ বলেন: “আমি তাদেরকে খবর দেব”। আর এজন্যই তিনি ১৬৯ নং আয়াত নাজিল করেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৯-১৭১) আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা শহীদদের এমন সব সম্মান ও পুরস্কারের কথা জানিয়েছেন, যা মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। দুনিয়াবাসীর চোখে তারা মৃত বলে মনে হলেও, আল্লাহর নিকট তারা জীবন্ত-সম্মানিত, প্রশান্ত এবং অপরূপ নিয়ামতে সিক্ত। এ আয়াতগুলো শুধু শহীদদের মর্যাদাই প্রকাশ করে না, বরং মুমিনদের হৃদয়ে সাহস, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির নতুন আলো জ্বালিয়ে দেয়; জানিয়ে দেয়- আল্লাহর পথে যেকোনো ত্যাগ কখনোই ব্যর্থ হয় না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ শহীদদের যেসব বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, সেগুলো নিচে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলো-
(ক) প্রকৃতপক্ষে শহীদেরা মৃত নন, বরং জীবিত, শহীদদের সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেন যে তারা মোটেও মৃত নন, এটি শুধু বিশ্বাসের কথা নয়, বরং এক চিরন্তন বাস্তবতা। মানুষ মনে করে তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু আল্লাহর নিকট তাদের জীবন আরও সজীব, আরও পরিপূর্ণ। তারা দুঃখ-কষ্ট, ভয়-আতঙ্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এমন এক জগতে অবস্থান করেন, যেখানে মৃত্যুর সীমাবদ্ধতা নেই, দেহের ক্লান্তি নেই, আর নেই পৃথিবীর অস্থিরতা। শহীদের এই উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করে- আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করা আসলে চিরজীবন লাভের সর্বোচ্চ উপায়। এ সম্পর্কে কোরআনের একটি আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ﴾ [سورة البقرة: ১৫৪].
অর্থ: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের মৃত বলো না; তারা তো জীবিত, তবে তোমরা উপলব্ধি কর না” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ১৫৪) ।
(খ) আল্লাহ তায়ালা শহীদদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে রিজিক দান করেন, আল্লাহ তায়ালা শহীদদের শুধু জীবনই দান করেন না, বরং তাঁর জান্নাতি অনুগ্রহ থেকে তাদের বিশেষ রিজিকও প্রদান করেন। এই রিজিক কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়; এটি সম্মান, আদর এবং আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তির প্রতীক- এক এমন খাবার, যা তাদের অন্তরকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে, এমন পানীয় যা তাদের আত্মাকে সজীব করে তোলে। জান্নাতের খাবার-পানীয় এর গুণ বর্ণনায় অসংখ্য আয়াত রয়েছে, এ সম্পর্কে আলোচনা যথাস্থানে করা হবে, ইনশাআল্লাহ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শহীদের পুরস্কার কেবল ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত প্রতিশ্রæতি নয়, বরং মৃত্যুর মুহূর্তের পর থেকেই শুরু হওয়া আল্লাহর সরাসরি দয়া।
(গ) শহীদরা জান্নাতে আনন্দে উচ্ছাসিত হয় এবং গাজীদের জন্য সুখবর দেয়, শহীদরা জান্নাতে অবস্থান করে তাদের পরবর্তী মুমিন ভাইদের কথা স্মরণ করে। তারা দেখেন- যারা গাজী হয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করছে এবং যারা এখনও পৃথিবীতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, যদি আল্লাহর পথে অটল থাকে, তবে তাদের জন্যও একই মর্যাদা অপেক্ষা করছে। এই উপলব্ধি শহীদদের হৃদয় আনন্দে ভরে দেয়; তারা যেন আপনজনের জন্য বার্তা পাঠিয়ে বলেন: “আমাদের পথ ধরলে তোমারও কোনো ভয় থাকবে না, কোনো দুঃখ থাকবে না”। এটি মুমিন সমাজের জন্য অপার প্রেরণা, যা তাদেরকে সাহস ও দৃঢ়তা দেয়।
(ঘ) শহীদগণ এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদের কোন ভয় নেই, শহীদগণ জান্নাতে পরম সুখে থাকেন এবং তারা আনন্দিত হন এ জেনে যে আল্লাহ তাঁর পথে দৃঢ় থাকা বান্দাদের জন্য ভয়মুক্তির প্রতিশ্রতি দিয়েছেন। দুনিয়ার পরীক্ষায় যারা ভীত হয় না, আল্লাহ তাদের বদলে এমন প্রশান্তি দান করেন যা সব ভয়কে নিভিয়ে দেয়। এ যেন শহীদদের পক্ষ থেকে জীবিতদের জন্য এক অমূল্য বার্তা- “আল্লাহর প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকো, তোমার জীবনে অস্থিরতার কোনো স্থান থাকবে না”।
(ঙ) তাদের কোনো দুঃখ নেই, দুনিয়ায় রেখে আসা সব বোঝা আল্লাহ লাঘব করেছেন, শহীদরা জান্নাতে গিয়ে উপলব্ধি করেন- দুনিয়ার সব দুঃচিন্তা, পরিবার-পরিজনের চিন্তা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সবই তাদের কাছ থেকে দূর হয়ে গেছে। আল্লাহর অতিথি হিসেবে তারা এমন মর্যাদা পান যে পেছনে রেখে আসা কোনো বিষয় তাদের মনে সামান্যতম দুঃখও সৃষ্টি করে না। তাদের অন্তর পূর্ণ হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহে। তাই শহীদের জন্য মৃত্যু কোনো ক্ষতি নয়; বরং দুনিয়ার শৃঙ্খল ভেঙে চ‚ড়ান্ত মুক্তির দ্বার উন্মোচন।
(চ) শহীদরা আল্লাহর অনন্য নিয়ামতের সুখ অনুভব করেন, শহীদরা জান্নাতে গিয়ে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও অতুলনীয় নিয়ামত অনুভব করেন- এক এমন সুখ যা দুনিয়ার কোনো ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আল্লাহর নৈকট্য, তাঁর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দয়ার ছায়া তাদের হৃদয়ে এমন আনন্দ এনে দেয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই নিয়ামত শুধু বাহ্যিক ভোগ নয়, বরং অন্তরের প্রশান্তি, আত্মার উচ্ছ¡াস এবং রূহানিয়াতের পরিপূর্ণ তৃপ্তি। আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহ শহীদদের মর্যাদাকে আকাশচুম্বী করে তোলে।
(ছ) আল্লাহ তাদের প্রতি বিশেষ ফজল এবং অতিরিক্ত সম্মান ও মর্যাদা দান করেন, শহীদরা জান্নাতে শুধু পুরস্কারই পান না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘ফজল’ বা বাড়তি সম্মান, বিশেষ মর্যাদা, অতিরিক্ত অনুগ্রহ পান। এটি এমন এক সম্মান, যা কোনো আমল বা পরিশ্রমের বিনিময় নয়; এটি খাঁটি আল্লাহর প্রেম ও দয়ায় প্রদত্ত। এ ফজলের মাধ্যমেই শহীদদের জান্নাতে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হয়, যেখানে তারা আল্লাহর বিশেষ প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান। তাদের মাথার উপর দয়া ও সম্মানের বরকত ধারা নেমে আসে।
২। সবশেষে ১৭১ নং আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট না করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ ঘোষণা করেন- তিনি কখনো ঈমানদারদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। শহীদরা আনন্দিত হন এ সত্য শুনে- আল্লাহ কোনও ঈমানদারের ত্যাগকে অবহেলা করেন না, কোনো নেক কাজে প্রতিদান কমিয়ে দেন না। একটি ভালো পদক্ষেপ, একটি আন্তরিক নিয়ত, একটি চোখের অশ্রæ- সবই আল্লাহর কাছে অমূল্য। শহীদরা উপলব্ধি করেন, তারা যে পথে প্রাণ বিলিয়েছেন, তা কখনোই বৃথা যায়নি। আল্লাহ তাদের প্রতিটি ত্যাগের বিনিময়ে পুরস্কার দিয়েছেন। এ ঘোষণা তাদের অন্তরকে আরও উৎফুল্ল করে এবং পৃথিবীতে থাকা মুমিনদের জন্য শক্তিশালী প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহর পথে দৃঢ় থেকে নির্ভিকভাবে জিহাদে অংশ নেওয়া।
(খ) জান্নাত অর্জনের জন্য ত্যাগ ও পরিশ্রমকে জীবনের মুল্যবান সোপান হিসেবে গ্রহণ করা।
(গ) মৃত্যু বা বিপদকে ভয় না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে মূল লক্ষ্য বানানো।
(ঘ) আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা চাওয়া; কারণ সব কৃতকর্মের পরিপূর্ণ প্রতিদান শুধ্ ুতাঁই হাতে।
(ঙ) সকলকে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করা।
(চ) বিপদ, পরীক্ষা বা সংগ্রামের সময়ে ধৈর্য, স্থিরতা ও দৃঢ়তা বজায় রেখে আল্লাহর প্রতিশ্রæত পুরস্কারকে দৃঢ় বিশ্বাসে গ্রহণ করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৫-১৬৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধ: মুমিনদের ভুল পদক্ষেপ এবং মুনাফিকদের কুটচাল।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৫-১৬৮) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (165) وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ (166) وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَاتَّبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ (167) الَّذِينَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا قُلْ فَادْرَءُوا عَنْ أَنْفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (168)﴾ [سورة آل عمران: 165-168].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধ: মুমিনদের ভুল পদক্ষেপ এবং মুনাফিকদের কুটচাল।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬৫। উহুদে যখন তোমরা বিপদের সম্মুখীন হলে, যদিও বদরের দিনে তোমরাই তাদের ওপর দ্বিগুণ আঘাত হেনেছিলে; তখন তোমরা প্রশ্ন করলে, “এ বিপদ এলো কোথা থেকে?” বলুন: এটা তোমাদের নিজেদেরই ভুলের কারণে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
১৬৬। দুই দল মুখোমুখি হওয়ার সেই দিনে যে বিপদ তোমাদের ওপর নেমে এসেছিল, তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই হয়েছিল, যাতে তিনি স্পষ্ট করে প্রকাশ করেন প্রকৃত মুমিনদের।
১৬৭। এবং যাতে তিনি প্রকাশ করেন মুনাফিকদেরও। আর যখন তাদেরকে বলা হয়েছিল, “এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা অন্তত প্রতিরোধে অংশ নাও,” তারা বলেছিল: “যদি আমরা জানতাম সত্যিই যুদ্ধ হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম”। সেই দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরীরই বেশি নিকটে ছিল। তারা মুখে এমন অনেক কথা বলত যা তাদের অন্তরে ছিল না, আর তারা যা গোপন করে আল্লাহ তা ভালোভাবেই জানেন।
১৬৮। যারা ঘরে বসে থেকে তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলত, “যদি তারা আমাদের কথা মেনে চলত, তাহলে নিহত হতো না”, হে নবী, আপনি বলে দিন: তোমরা সত্যবাদী হলে নিজেদেও থেকে মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে দাও তো!।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৬৫। উহুদের ঘটনার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তারা মুশরিকদের দ্বিগুণ ক্ষতি করেছিলে, কিন্তু উহুদের যুদ্ধে যখন নিজেরা বিপর্যয়ের মুখে পড়লো, তখন অবাক হয়ে বলতে লাগলো: “এটা কীভাবে হলো? আমরা তো মুসলমান, আমাদের মাঝে রাসুলুল্লাহ (সা.) আছেন, আর ওরা মুশরিক!”। তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, এ বিপদ তাদের নিজেদের কারণেই এসেছে; কারণ তাদের একাংশ রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় থেকে নেমে গনীমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহর সিদ্ধান্ত সর্বদা তাঁর প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তিনি যা চান তাই করেন, তাঁর ফয়সালাকে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।
১৬৬। উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ওপর যে কষ্ট নেমে এসেছিল, যেমন আহত হওয়া, শহীদ হওয়া বা যুদ্ধের পরিস্থিতি হঠাৎ বদলানো- সবই আল্লাহর নিয়তি অনুযায়ী ঘটেছিল। শুরুতে মুমিনরা শত্রুকে পরাজিত করলেও পরে কিছু ভুল ও অবাধ্যতার কারণে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এ ঘটনা আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ, যা প্রকৃত ঈমানদারকে প্রকাশ করেছিল। বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ দেখালেন কে সত্যিকারের ঈমানদার আর কে কেবল মুখে দাবি করে।
১৬৭। এ পরীক্ষার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল- মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের অন্তরের গোপন বিষয়গুলো খুলে দিলেন। যখন মুমিনরা তাদের বলেছিল: “এসো, আমাদের সঙ্গে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। না পারলে অন্ত আমাদের সংখ্যায় শক্তি যোগাও, পাশে দাঁড়িয়ে মনোবল বাড়াও”। তখন তারা হটকারিতা বশত বলেছিল: “আমরা যদি জানতাম যে তোমরা সত্যিই যুদ্ধ করবে, তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু আমরা জানতাম তোমরা যুদ্ধ করবে না!”। এই কথা প্রমাণ করে সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরের বেশি নিকটবর্তী ছিল; কারণ তারা মুখে যা বলছিল, হৃদয়ে তা ছিল না। তারা শুধু কথা দিয়ে নিজেকে মুসলমান দেখাচ্ছিল, অন্তরে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তো খুব ভালোভাবেই জানেন- তাদের বুকে কী গোপন আছে, কী তারা লুকিয়ে রাখে।
১৬৮। ঐ সকল মুনাফিক যুদ্ধের সময় ঘরে বসে ছিল, তারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত বা শহীদ মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে লাগলো- “যদি তারা আমাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যেত, তবে কখনো মারা পড়ত না”। তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিলেন: “যদি তার সত্যি কথা বলে থাকে যে যুদ্ধ এড়িয়ে চললে মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়, তাহলে তারা নিজেদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেখাক!”। অর্থাৎ, যুদ্ধ হোক বা অন্য সময়, কেউই নিজের সিদ্ধান্ত বা সতর্কতার মাধ্যমে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ীই আসে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৭-৪০৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৪-১৫৬; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১-৭২; আল-মুনতাখাব: ১/১১৫-১১৬) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مُصِيبَةٌ﴾ ‘বিপদ’, এখানে ‘বিপদ’ বা ‘মুসিবত’ দ্বারা উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ওপর যে কষ্ট ও হতাশা নেমে এসেছিল, তা বুঝানো হয়েছে। সেদিন মুশরিকরা মুমিনদের ওপর চড়াও হয় এবং সত্তর জন সাহাবি শহীদ হন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৫) ।
﴿مِثْلَيْهَا﴾ ‘তার দ্বিগুণ’, আয়াতে ‘তার দ্বিগুণ’ বা مثليها বলতে বোঝানো হয়েছে যে বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সত্তর জন নিহত ও সত্তর জন বন্দী হয়েছিল, যা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষতির তুলনায় দ্বিগুণ ছিল। অর্থাৎ- উভয় ঘটনার তুলনায় কষ্ট ও ক্ষতির হিসাব আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়েছে, যাতে ইতিহাসে সত্যিকারের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৫) ।
﴿هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ﴾ ‘উহুদের বিপদ তোমাদের নিজেদের কারণে হয়েছিল’ এটা মুসলিম যোদ্ধাদের অমান্য ও পাপের হল। বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধে কিছু তিরন্দাজ বাহিনী রাসুলুল্লাহর (সা.) আদেশ অমান্য করে যুদ্ধস্থান ত্যাগ করে গনীমত সংগ্রহের জন্য ছুটে গিয়েছিল। ফলে, মুশরিকরা সুযোগ পেয়ে মুসলমানদের উপর পুণরায় আক্রমণ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০২) । এখানে আমরা দেখতে পাই- মানুষের নিজস্ব কর্ম ও অনুশাসনের ফলেই বিপদ আসে। বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই ভয়ঙ্কও হোক, মূল কারণ হলো মানুষের নিজের ভুল সিদ্ধান্ত ও অনুশাসন ভঙ্গ করা। এটি আমাদেও শেখায়- জীবনে অসুবিধা বা বিপদ প্রায়ই বাহ্যিক শক্তি নয়, বরং মানুষের নিজের চেতনা, পদক্ষেপ এবং নৈতিক দায়িত্বহীনতার ফল। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
﴿فَادْرَءُوا﴾ ‘তাহলে তোমরা ঠেকিয়ে দেখাও’, , অর্থাৎ, যদি তোমাদের দাবিই সত্য হয়, তবে মৃত্যুকে প্রতিহত করো। আরবিতে বলা হয়: “”دَرَأَ الله عنك الشَّرَّ, অর্থ: আল্লাহ তোমার থেকে অনিষ্ট দূর করুন বা ঠেকিয়ে দিন। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০৩) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে মুনাফিকরা রাসুলুল্লাহর (সা.) গনীমত আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহকে (সা.) সম্পূর্ণভাবে সেই অভিযোগ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতগুলোতে যুদ্ধের আগে ও পরে মুসলিম যোদ্ধাদের বাস্তবতা-বিরোধী ধারণা, ভুল মন্তব্য, ভুল কাজগুলো এবং মুনাফেকদের অপপ্রচারগুলোকে শিক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৪) ।

১৬৫ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আবি হাতিম, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বদরের যুদ্ধে যেসব কাজ তারা করেছিল, বিশেষ করে যুদ্ধবন্দীদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়ার কারণে উহুদের দিনে তাদেরকে সেই কাজের ফল ভোগ করতে হলো। ফলে উহুদের যুদ্ধে তাদের সত্তরজন শহীদ হন, মুসলিম যোদ্ধারা কিছুক্ষণের জন্য পিছু হটে যান, রাসূলুল্লাহর (সা.) সামনের দাঁত ভেঙে যায়, তাঁর হেলমেট মাথায় চূর্ণ হয়ে যায় এবং রক্ত তার মুখ বেয়ে পড়ে। এসবের পর আল্লাহ তায়ালা ১৬৫ নং আয়াত অবতীর্ণ করে জানিয়ে দিলেন যে এ বিপর্জয় তাদের ভুলের কারণেই হয়েছে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৩) ।
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন: এর অর্থ হলো- মুক্তিপণ গ্রহণের কারণেই এই শাস্তি এসেছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ইমাম ওয়হাবা জুহাইলী তার তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৬৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন:
(ক) বদর ও উহুদের ফলাফলের তুলনা, আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে: বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা বিশাল বিজয় পেয়েছিল। তারা মুশরিকদের ৭০ জনকে হত্যা করে এবং ৭০ জনকে বন্দী করে, যা মূলত উহুদের তুলনায় দ্বিগুণ সাফল্য। এমনকি উহুদের যুদ্ধের শুরুতেও মুসলমানরা এগিয়ে ছিল এবং দুই দিনে প্রায় ২০ জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু শেষে উহুদে তারা পরাজিত হয় এবং ৭০ জন সাহাবি শহীদ হন। দুটি যুদ্ধের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সুতরাং বদরে মুসলমানদের মধ্যে সম্পূর্ণ আনুগত্য ও ঐক্য ছিল। উহুদে সেই স্থিরতা ছিল না। তাই দুই যুদ্ধের ফল ভিন্ন হয়েছে।
(খ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে ভুল ধারণা, আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে: উহুদের পর মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে বলেছিল: “আমরা তো আল্লাহর পথে লড়েছি! আমরা মুসলমান, আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা) আছেন, আর শত্রুরা তো মুশরিক। তাহলে কীভাবে আমরা পরাজিত হলাম?”। এই ধারণাটি ভুল ছিল। কারণ বাহ্যিক পরিচয় বা উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়- আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও নির্দেশ মানা হল প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। সুতরাং শুধু “আমরা সঠিক পথে আছি” বলা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মানার উপর শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করে।
(গ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ ছিল নিজেদের ভুল, আয়াতের তৃতীয়াংশে বলা হয়েছে: পরাজয়ের মূল কারণ ছিল তাদের নিজেদের ভুল, বিশেষ করে উহুদের তীরন্দাজদের একটি দল রাসুলুল্লাহর (সা.) সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করেছিল। ফলে শত্রুরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সুযোগ পায় এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। সুতরাং আনুগত্য ছাড়া বিজয় নেই। যারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মেনে যুদ্ধ করে, আল্লাহ তাদের বিজয় দেন; কারণ তারা হলো “আল্লাহর দল”, আর আল্লাহর দল কখনো পরাজিত হয় না।
২। ১৬৬, ১৬৭ ও ১৬৮ নং আয়াতসমূহ থেকে নি¤েœর দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) উহুদের মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে আল্লাহর প্রজ্ঞা, উহুদের কষ্ট, আঘাত এবং সাময়িক পরাজয় ছিল আল্লাহর জ্ঞান-প্রজ্ঞা, পরিকল্পনা ও ফয়সালার অংশ, আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এ ঘটনার পেছনে আল্লাহ তায়ালার কয়েকটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল:
প্রথমত: ভুল ও অবাধ্যতার পরিণতি দেখিয়ে মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রগঠন করা।
দ্বিতীয়ত: দায়িত্বে অবহেলা বা নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা।
তৃতীয়ত: প্রকৃত মুমিনদেরকে সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
চত‚র্থত: মুনাফিকদেরকে প্রকৃত অবস্থা সকলের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া।
ফলে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের এই সাময়িক পরাজয় শুধুমাত্র ক্ষতি নয়; বরং শিক্ষা, পরিশুদ্ধি এবং পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অমূল্য উপকার বহন করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৫)।
(খ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে মুনাফেকদের হটকারিতা, ১৬৭ ও ১৬৮ নং আয়াতে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে মুনাফেকের দুইটি হটকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
প্রথমত: যখন মুমিনরা তাদের বলেছিল: “এসো, আমাদের সঙ্গে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। না পারলে অন্তত আমাদের সংখ্যায় শক্তি যোগাও, পাশে দাঁড়িয়ে মনোবল বাড়াও”। তখন তারা হটকারিতা ও তামাশা বশত বলেছিল: “আমরা যদি জানতাম যে তোমরা সত্যিই যুদ্ধ করবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু আমরা জানতাম তোমরা যুদ্ধ করবে না!”। এই কথা প্রমাণ করে সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরের বেশি নিকটবর্তী ছিল।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এ হটকারিতার জবাবে বলেন: তারা মুখে যা বলে অন্তরে তার তিল মাত্র নেই। তারা অন্তরের কপটতাকে আড়াল করতে চাইছে, অথচ আমি আল্লাহ তাদের অন্তরের গোপন ভেদ সম্পর্কে বেশী জানি। (তাফসীর আল-মারাগী: ১২৭) ।
দ্বিতীয়ত: তারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত বা শহীদ মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে লাগলো- “যদি তারা আমাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যেত, তবে কখনো মারা পড়ত না”।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এ হটকারিতার জবাব রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন: যদি তারা সত্যি কথা বলে থাকে যে যুদ্ধ এড়িয়ে চললে মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়, তাহলে তারা নিজেদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেখাক!। মূলকথা হলো- যুদ্ধ হোক বা অন্য সময়, কেউই নিজের সিদ্ধান্ত বা সতর্কতার মাধ্যমে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ীই আসে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৮)।
(গ) মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ, আর নিয়তির ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বোধের পথ, ১৬৮ নং আয়াতের শেষাংশটি মানুষের সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর নিয়তির অমোঘতার গভীর দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরেছে। এটি জানিয়ে দিয়েছে যে মানব-ইচ্ছা, কৌশল বা নিরাপত্তা, কোনো কিছুই মৃত্যুর মতো নিশ্চিত বাস্তবতাকে প্রতিহত করতে পারে না। মৃত্যু এমন একটি অস্তিত্বগত সত্য, যা মানুষের সকল পরিকল্পনা অতিক্রম করে; দর্শনের ভাষায় এটি মানবজীবনের অনিবার্য বীরংঃবহঃরধষ ৎবধষরঃু। মুনাফিকদের দাবি ছিল- “যুদ্ধে না গেলে মৃত্যু হতো না”, কোরআন সেই যুক্তিকে দার্শনিকভাবে ভেঙে দিয়েছে ৎবফঁপঃরড় ধফ ধনংঁৎফঁস পদ্ধতিতে: যদি ঘরে থাকা সত্যিই মৃত্যু ঠেকাতে পারত, তবে তোমরাই মৃত্যুকে ঠেকিয়ে দেখাও! এতে প্রমাণ হয়- জীবন-মৃত্যু বাহ্যিক অবস্থানে নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে নির্ভরশীল। এই আয়াত আমাদের শেখায়: মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ, আর নিয়তির ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বোধের পথ। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে বুঝা যায় উহুদের যুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ স্পষ্টভাবে দুইটি সত্য উন্মোচন করেছে:
(ক) তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে, মুনাফিকরা আগে মুসলমানদের ভিড়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখত। অনেকেই ভাবত তারা সত্যিই মুসলমান। কিন্তু উহুদের মুহূর্তে, যখন মুসলমানদের সাহায্য করা জরুরি ছিল, তখন তারা পিছিয়ে গেল, অজুহাত দাঁড় করাল, ভয় দেখাল, মনোবল ভাঙল। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে গেল- তাদের অন্তর ঈমানের দিকে নয়; বরং কুফরের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। অর্থাৎ, তারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও তাদের মন-মানসিকতা, সিদ্ধান্ত, আচরণ সবকিছুই প্রমাণ করে যে তারা ঈমান থেকে অনেক দূরে। এ সম্পর্কে ১৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ﴾ [سورة آل عمران: ১৬৭].
অর্থ: “তারা সেদিন তাদের ঈমানের চেয়ে কুফরীর বেশী কাছাকাছি ছিল” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৬৭) ।
(খ) তাদের চরিত্র ও মিথ্যাচারিতা উন্মোচিত হয়েছে, তারা মুখে বলত: “আমরা মুসলমান, তোমাদের সঙ্গে আছি”, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অবিশ্বাস ও কুফর। উহুদের মাঠে তারা একথা বলেও ফেলে, যা ১৬৮ নং আয়াতে এসেছে এভাবে: “তাদের ভাইরা যদি ঘরে বসে থাকত, তবে মারা যেত না”। এ বক্তব্যই দেখিয়ে দেয়: তারা শহীদদেরকে “ভাই” বললেও তা ছিল শুধু বংশগত বা প্রতিবেশী সম্পর্ক, ধর্মীয় নয়। তারা আল্লাহর কদর, মৃত্যুর নির্ধারিত সময়, এসব কোনো কিছুকেই মানত না। তারা মনে করত যুদ্ধের ফলাফল শুধু বাহ্যিক কারণে ঘটে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের কোনো ভূমিকা নেই। এভাবে তাদের কথায় তিনটি বড় দুর্বলতা ধরা পড়ে: এক. ঈমানের অভাব, দুই: তাকদীরের প্রতি অবিশ্বাস, এবং তিন: মিথ্যাচারে নির্লজ্জতা। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৮) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) দৈনন্দিন জীবনে যে কোনো সমস্যায় আত্মসমালোচনা করা এবং নিজের কর্ম সংশোধনের চেষ্টা করা।
(খ) সংকট ও কষ্টের সময় সালাত ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভরসা করা।
(গ) ইসলামি নেতৃত্ব, শিক্ষক, অভিভাবকদের আনুগত্য করা।
(ঘ) দ্বিমুখিতা, ভয়ভীতি ছড়ানো, নেতিবাচক প্রচরণা পরিহার করে সত্যবাদী ও সাহসী হওয়া।
(ঙ) জীবনের বিপদাপদে আল্লাহর ফয়সালা উত্তম, এ বিশ্বাস দৃঢ় করা এবং অভিযোগ না করা।
(চ) দ্বীনের পথে প্রয়োজনীয় ত্যাগ, সময়, শ্রম, দান, সাহস নিবেদন করা।
(ছ) কাউকে হতাশ করা, ভয় দেখানো, নেতিবাচক প্রচার, এসব থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।

error: Content is protected !!