Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৩০-১৩৩) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মুমিনদের প্রতি নির্দেশনা: সৎকর্ম সম্পাদন ও অসৎকর্ম পরিহার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (130) وَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ (131) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (132) وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (133)﴾ [سورة آل عمران: 130-133].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: মুমিনদের প্রতি নির্দেশনা: সৎকর্ম সম্পাদন ও অসৎকর্ম পরিহার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৩০। হে মুমিনগণ, তোমরা বহুগুণ বৃদ্ধি করে সুদ খাবে না। আর আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তোমরা সফল হতে পারবে।
১৩১। তোমরা জাহান্নামের আগুনকে ভয় করো, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
১৩২। আর তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের ইতায়াত করো, তাহলে তোমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।
১৩৩। তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে দ্রæত অগ্রসর হও, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, তা মোত্তাকীদের জন্যপ্রস্তুত করা হয়েছে।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতগুলোতে মুমিনদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, অন্যায় উপার্জন থেকে বিরত থাকা, আল্লাহভীতি অর্জন করা, পাপ থেকে আত্মরক্ষা করা, রাসূলুল্লাহর (সা.) আনুগত্য করা, এবং আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রæত অগ্রসর হওয়াই সফল জীবনের মূল চাবিকাঠি। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন সুদের মতো জঘন্য অন্যায় থেকে দূরে থাকে, যে অন্যায়ে লিপ্ত ছিল জাহেলিয়াত সমাজ। সুদ এমন এক পাপ যা সমাজে লোভ, শোষণ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। এতে ধনীরা ধনী হয়, গরিবরা আরও গরিব হয়। ইসলাম ন্যায্য লেনদেন ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়, কিন্তু সুদ সেই মানবিকতা ধ্বংস করে। তাই আল্লাহ ভয়ই একমাত্র রক্ষাকবচ, যার অন্তরে তাকওয়া আছে, সে কখনও অন্যায় উপার্জনের পথ বেছে নেয় না। আল্লাহভীতিই দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।
আল্লাহ তায়ালা পুনরায় মুমিনদের সতর্ক করে দিচ্ছেন, তারা যেন এমন কোনো কাজ না করে, যা তাদেরকে অবিশ্বাসীদের পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। জাহান্নামের আগুন কেবল কাফেরদের জন্যই নয়; বরং যারা আল্লাহর নিষেধ অমান্য করে সুদের মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়, তারাও সেই ভয়াবহ আগুনে পতিত হতে পারে। অতএব, আল্লাহভীতি শুধু নামাজ, রোযা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা প্রতিফলিত হবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে- অর্থনৈতিক লেনদেন, কথাবার্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে।
আল্লাহ তায়ালা সুদ গ্রহণের নিষেধাজ্ঞাকে অত্যন্তকঠোরভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে, বিশেষত সে বিষয়ে যেখানে তাঁরা সুদকে সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। কারণ, মুমিনের জীবনে সফলতা ও রহমতের একমাত্র পথ হলো আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহর (সা.) আনুগত্য। এই আনুগত্যের অর্থ কেবল ইবাদতে সীমিত থাকা নয়; বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র- যেমন নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি সর্বত্র কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলা। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান ও রাসূলুল্লাহর (সা.) শিক্ষার আলোকে জীবন গড়ে তোলে, তার জন্য দুনিয়ায় নেমে আসে প্রশান্তি, আর আখিরাতে অপেক্ষা করে জান্নাতের অনন্ত সুখ।
আল্লাহ তায়ালা চারটি দৃঢ় উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে সুদের ভয়াবহতা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন: (১) আল্লাহকে ভয় করো, (২) আগুনকে ভয় করো, (৩) আল্লাহর আনুগত্য করো, এবং (৪) রাসূলের আনুগত্য করো। ভয় প্রদর্শনের পর আল্লাহ তায়ালা উৎসাহিত করেছেন সৎকর্মের দিকে, যেমন দান-সদকা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, ন্যায় ও কল্যাণে সহযোগিতা করা এবং সুদসহ সকল প্রকার অন্যায় থেকে বিরত থাকা। এসব কর্মের মাধ্যমেই একজন বান্দা অর্জন করতে পারে আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের মর্যাদা। এই জান্নাত সীমাহীন ও অনন্ত সুখের আবাস, যা প্রস্তুত করা হয়েছে তাদের জন্য, যারা আল্লাহকে ভয় করে, অন্যায় থেকে দূরে থাকে এবং সৎকর্মে জীবনকে সাজায়। তাকওয়াই জান্নাতপ্রাপ্তির মূল শর্ত; যার হৃদয়ে আল্লাহভীতি রয়েছে, সে পাপের আহ্বান পেলেও ফিরে আসে প্রভুর দিকে।
এই নেক আমলগুলোই একটি ইসলামী সমাজকে পরিণত করে শান্ত, স্নেহময় ও নিরাপদ আবাসে, যেখানে নেই হিংসা বা বিদ্বেষ, নেই ধনী-গরিবের বৈষম্য, নেই অবজ্ঞা বা ক্ষোভ; বরং রয়েছে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭৫-৩৭৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৩-৮৫; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৬-৬৭; আল-মুনতাখাব: ১/১০৮) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً﴾ ‘তোমরা সুদকে বহুগুণে বাড়িয়ে ভক্ষণ করো না’, এটি ছিল জাহেলি যুগের লোকদের অভ্যাস, অথবা তাদের অভ্যাস যারা শরিয়তের আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা করে না। তাদের রীতি ছিল এমন যে, যখন কোনো দরিদ্র ঋণগ্রহীতার ঋণের সময়সীমা পূর্ণ হতো, কিন্তু সে তা পরিশোধ করতে পারত না, তখন ঋণদাতা তাকে বলত: “তুমি তোমার ঋণ পরিশোধ করো, নতুবা আমরা সময় বাড়াব, কিন্তু তোমার দেনার পরিমাণও বাড়িয়ে দেব। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৩০) । সুদ এর পরিচয় ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরাতু আল-বাক্বারা এর ২৭৫ নং আয়াতে করা হয়েছে।
﴿وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا﴾ ‘এমন জান্নাত, যার প্রশস্ত’, আয়াতাংশে ভূমির প্রশস্ততা বা ব্যাপ্তিকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে, দৈর্ঘ্যের বিপরীতে থাকা “প্রস্থ” অর্থটি নয়। আরবরা বলে, “বিলাদুন ‘আরীযাহ”, অর্থাৎ এক বিস্তৃত দেশ। তারা আরো বলে থাকে, “ওয়াফিল আরদি আল্-‘আরীযাতি মাযহাব”, “পৃথিবী তো পশস্ত চলার অনেক পথ আছে”। রাসূলুল্লাহ (সা.) উহুদের দিনে পালিয়ে যাওয়া সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন: “لقد ذهبتم بها عريضة”, “তোমরা তো পালালে বেশ দূর পর্যন্ত!”। অর্থাৎ, তোমাদের পলায়ন ছিল প্রশস্ত পথে, বিস্তৃতভাবে; সামান্য নয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/৯৯-১০০) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
আল্লাহ তায়ালা প্রথমে মুমিনদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন অমুসলিম কাউকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা গোপন পরামর্শদাতা না করে। এরপর তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, যদি তারা ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহভীতি অবলম্বন করে, তবে অবিশ্বাসীদের কোনো ষড়যন্ত্রই তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। এরপর বদর ও উহুদের যুদ্ধের উদাহরণ টেনে আল্লাহ দেখিয়েছেন, কীভাবে ধৈর্য ও তাকওয়ার মাধ্যমে বিজয় আসে, আর কীভাবে মুশরিক ও ইহুদিরা ঈমানের শত্রুতা করেছে। তারপর উল্লেখিত আয়াতসমূহে তিনি মুসলমানদের সতর্ক করেছেন একটি নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত অভ্যাস থেকে, যা ইহুদি ও মুশরিকদের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য, আর তা হলো সুদভক্ষণ। আর এই সতর্কবার্তার পর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দিয়েছেন নানা ধরণের উৎসাহ, ভয়, পরামর্শ ও উপদেশ, যেন তারা জানে, সৎকর্মের ফল সুন্দর, আর অসৎকর্মের পরিণতি ভয়াবহ। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। (১৩০-১৩২) আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ তায়ালা চারটি দিক থেকে সুদের নিষেধ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন:
(ক) সরাসরি নিষেধাজ্ঞা, আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সুদ খেও না”। এতে সুদভক্ষণকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
(খ) আল্লাহভীতির নির্দেশ, আল্লাহর ভয় মনে রেখে অর্থনৈতিক লেনদেনে যেন কেউ সুদের পথে না যায়, সেটি নির্দেশ করা হয়েছে।
(গ) ভয়াবহ পরিণতির সতর্কতা, যে ব্যক্তি সুদকে বৈধ মনে করে, সে জাহান্নামের শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যায়।
(ঘ) আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ, সুদ হারাম করার বিষয়ে আল্লাহর আদেশ মানা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) যা প্রচার করেছেন তা অনুসরণ করা, যাতে মানুষ আল্লাহর দয়া লাভ করতে পারে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৯) ।
২। এখানে সুদকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো- এটি এমন এক পাপ, যার বিষয়ে আল্লাহ নিজেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন: “যদি তোমরা তা না ছাড়ো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও” (সূরাতু আল-বাকারা: ২৭৯) । (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৪/২০২) ।
৩। ১৩১ ও ১৩৩ আয়াতদ্বয়ের শেষাংশে বলা হয়েছে, কেবল ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবেন আর জাহান্নামে যাবে কেবল কাফেররা। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, জান্নাত শুধুমাত্র মুমিনদের জন্য এবং জাহান্নাম কেবল কাফেরদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বহু স্থানে বলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল-মাওয়া, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে” (সূরা আস-সাজদাহ ৩২:১৯)। আবার বলেন, “আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন জান্নাতসমূহের, যার নিচে নদী প্রবাহিত হবে” (সূরা আত-তাওবা ৯:৭২)। অপরদিকে অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “সেই আগুনকে ভয় করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে” (সূরা আল-বাকারা ২:২৪)। এই আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, জান্নাত আল্লাহর রহমতের পুরস্কার, যা কেবল ঈমানদারদের জন্য নির্ধারিত, আর জাহান্নাম হলো অবিশ্বাসীদের শাস্তির স্থান, যা তাদের কুফরি ও অবাধ্যতার পরিণতি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সহীহ মুসলিমে বলেছেন, “لا يدخل الجنة إلا نفس مؤمنة” অর্থ: “জান্নাতে প্রবেশ করবে না কোনো প্রাণ, যা মুমিন নয়।” অর্থাৎ, ঈমান ছাড়া জান্নাতে প্রবেশের পথ বন্ধ। আবার সহীহ বুখারীতে এসেছে, “يقال لأهل الجنة خلود فلا موت، ويقال لأهل النار خلود فلا موت” “জান্নাতবাসীদের বলা হবে: তোমাদের জন্য চিরজীবন, আর মৃত্যু নেই; জাহান্নামবাসীদেরও বলা হবে: তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী আগুন, আর মুক্তি নেই”, এসব দলীল একত্রে প্রমাণ করে যে, জান্নাত হলো ঈমান ও সৎকর্মের পুরস্কার, আর জাহান্নাম হলো কুফরি, শিরক ও অবাধ্যতার পরিণতি। তাই আল্লাহর ন্যায়বিচারের বিধান অনুযায়ী, যারা ঈমানদার ও আল্লাহভীরু, তাদের জন্য জান্নাত অনন্ত সুখের নিবাস; আর যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে ও সত্যের বিরোধিতা করেছে, তাদের জন্য জাহান্নাম স্থায়ী শাস্তির স্থান।
৪। ১৩১ ও ১৩৩ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন যে, জাহান্নাম প্রস্তুত করা হয়েছে এবং জান্নাতও প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এ দুটি আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, জান্নাত ও জাহান্নাম ইতিমধ্যেই সৃষ্টি করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতবাদ, যার ভিত্তি কুরআন ও সহীহ হাদীস উভয়েই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে মু‘তাযিলা স¤প্রদায় মনে করে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো সৃষ্টি করা হয়নি; বরং কিয়ামতের সময় উপযুক্ত সময়ে তা সৃষ্টি করা হবে। (তাফসীর আল-বায়জাভী, ২/৩৮) ।

আয়াতসমূহের আমল:
(ক) তাক্বওয়া অবলম্বন করে সুদের মতো হারাম কাজ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা।
(খ) সৎ ও কল্যাণকর কাজে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা।
(গ) জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে অস্তিত্বশীল, এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১২৩-১২৯) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: বদরের গৌরবময় বিজয়ের স্মৃতিসুধা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (123) إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُنْزَلِينَ (124) بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ (125) وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ (126) لِيَقْطَعَ طَرَفًا مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَوْ يَكْبِتَهُمْ فَيَنْقَلِبُوا خَائِبِينَ (127) لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ (128) وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (129)﴾ [سورة آل عمران: 123-129].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: বদরের গৌরবময় বিজয়ের স্মৃতিসুধা।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১২৩। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরের যুদ্ধে সাহায্য করেছেন, এমতাবস্থায় যে তোমরা হীনবল ছিলে; অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।
১২৪। স্মরণ করো, যখন তুমি মুমিনদেরকে বলেছিলে: তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদেরকে সাহায্য করবেন তোমাদের রব তিন হাজার নাযিলকৃত মালাইকা দিয়ে।
১২৫। হ্যা, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং তাক্বওয়া অবলম্ভন করো, আর তারা আকস্মিকভাবে তোমাদের মুখোমুখি এসে যায়, এ অবস্থায় তোমাদেরকে তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্ণিত মালাইকার দ্বারা সাহায্য করবেন।
১২৬। আর আল্লাহ তাকে করেননি তোমাদের জন্য সুসংবাদ ছাড়া আর কিছু এবং যাতে এর দ্বারা তোমাদের ক্বলব প্রশান্ত হয়; আর আল-আজীজ, আল-হাকীম আল্লাহর নিকট ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে সাহায্য আসে না।
১২৭। যাতে তিনি কাফিরদের একটি অংশকে নিশ্চিহ্ণ করেন, অথবা তাদেরকে লাঞ্চিত করেন; ফলে তারা নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে।
১২৮। এ বিষয়ে তোমার কিছু করণীয় নেই, হয়তো তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন, অথবা তাদেরকে আযাব দিবেন, কারণ তারা যালিম।
১২৯। আর আল্লাহর জন্যই যা আছে আকাশসমূহে এবং যা আছে যমীনে। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা আযাব দেন; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
অহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনার পর আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বদরের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তখন মুসলমানরা ছিল সংখ্যায় অল্প, দুর্বল এবং প্রায় নিরস্ত্র। মদিনা থেকে বের হয়েছিল মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি, হাতে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও সামান্য অস্ত্রশস্ত্র। বিপরীতে মুশরিকরা এসেছিল প্রায় এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে, আধুনিক ও পর্যাপ্ত অস্ত্রসহ। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও মুসলমানরা আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে বিজয় লাভ করেছিল। সুতরাং এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় বিজয় কখনো সংখ্যার আধিক্য বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে তাকওয়া, ধৈর্য ও আল্লাহর সাহায্যের ওপর। তাই আল্লাহকে ভয় করতে হবে, তাঁর বিধান মানতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বিজয়ই তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ।
এরপর আল্লাহ তায়ালা স্মরণ করিয়ে দেন যে, বদরের দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের বলেছিলেন, “তোমাদের কি যথেষ্ট নয় যে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্যে তিন হাজার ফেরেশতা নাযিল করবেন?” সংখ্যায় অল্প ও শত্রুর শক্তি দেখে সাহাবিদের অন্তরে যে দুশ্চিন্তা ও ভয় জন্মেছিল, এই সুসংবাদ তা দূর করে তাদের অন্তরকে সাহসে ভরিয়ে তোলে। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসন্ন বিজয়ের প্রথম সুসংবাদ।
অতঃপর আল্লাহ ঘোষণা করলেন, যদি মুসলমানরা ধৈর্য ধারণ করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং শত্রুর মুখোমুখি হতে দৃঢ়চিত্ত থাকে, তবে তিনি পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করবেন। ফেরেশতারা এমনভাবে অংশ নেবে যাতে মুসলমানরা বুঝতে পারে, তারা একা নয়, আসমান থেকেও সাহায্য নেমে এসেছে। আর আসমানি সাহায্য আসে তখনই, যখন বান্দারা ধৈর্যশীল হয়, ন্যায়পরায়ণ থাকে এবং আল্লাহভীরু হয়ে চলে।
ফেরেশতাদের অবতরণের উদ্দেশ্য ছিল মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি আনা, তাদের মনোবল দৃঢ় করা এবং বিজয়ের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস জাগানো। প্রকৃতপক্ষে বিজয়ের একমাত্র উৎস আল্লাহ, যিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তাই বাহ্যিক শক্তি বা কৌশল নয়, আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনাই শেষ কথা। যে কোনো বিজয়কে তাই নিজের শক্তি বা পরিকল্পনার কৃতিত্ব না ভেবে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করতে হবে।
ফেরেশতাদের অবতরণের আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল অবিশ্বাসীদের একাংশকে ধ্বংস করা এবং বাকিদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের ৭০ জন প্রভাবশালী নেতা নিহত হয়েছিল, যা তাদের শক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এটি মুশরিকদের জন্য সতর্কবার্তা ছিল যে আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে শেষ পরিণতি পরাজয় ও লজ্জা ছাড়া আর কিছু নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বদরের যুদ্ধে কিছু কাফিরের জন্য ধ্বংস কামনা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিলেন, কাউকে শাস্তি দেওয়া বা ক্ষমা করা তাঁর একচ্ছত্র অধিকার। মানুষ কেবল চেষ্টা ও দোয়া করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে। তাই শত্রুর জন্যও হিদায়াত কামনা করা উচিত, কারণ আজকের শত্রুও কাল তওবা করে মুমিন হতে পারে, যেমন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও আবু সুফিয়ান পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
সবশেষে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করলেন, আসমান ও জমিনের মালিকানা কেবল তাঁর। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আর তাঁর দয়া সীমাহীন। এ ঘোষণায় মুমিনদের মনে আশা জন্মায়, তারা যদি তওবা করে, আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তা যে, জুলুম করলে এবং অবিশ্বাসে অটল থাকলে আল্লাহর শাস্তি অনিবার্য। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭২,৩৭৩,৩৭৫, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭০-৭৪, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫-৬৬, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৬-১০৮)।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بَدْرُ﴾ ‘বদর’, একজন মানুষের নাম। তার নামানুসারেই এ স্থানের নামকরণ হয়েছে, কারণ এখানে তার একটি প্রশিদ্ধ ক‚প ছিলো। বর্তমানে এ স্থানটি মদীনা মোনাওরাহ থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি জনপদ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।
﴿أَذِلَّةٌ﴾ ‘দুর্বল’, আয়াতে উদ্দেশ্য হলো- তারা ছিল সংখ্যা ও সামর্থে খুবই অল্প, আর প্রতিরোধ করার মতো শক্তিও ছিল না। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১২৩) ।
﴿وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ﴾ “তারা অল্প সময়ের মধ্যে তোমাদের মুখোমুখি হয়ে যায়”, এ বাক্যের উদ্দেশ্য হলো: শত্রু বাহিনীর সেই অতিরিক্ত অংশ, যাদেরকে কুর্জ ইবনু জাবির নিয়ে আসার কথা ছিল, তারা যদি স্বল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধে যোগ দিত, তাহলে আল্লাহ মুসলমানদেরকে পাঁচ হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য করতেন। (তাফসীর আত-তাবারী: ৭/১৭৩) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
উহুদ যুদ্ধে মোনাফেকদের সরদার আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূলের পরোচনায় যখন দুইটি মুসলিম দল আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয়ের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, কাপুরুষতা ও দুর্বলতায় তারা ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। এবং সর্বশেষে রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করে যখন তিরন্দাজ বাহিণী তাদের জায়গা ছেড়ে গনীমতের সন্ধানে বের হওয়ার কারণে মুসলমানদের সাময়ীক পরাজয় হয়েছিল, তখন উল্লেখিত আয়াতসমূহে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের স্মৃতি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে তাদের মনোবল ফিরিয়ে এনেছিল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৬৫) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের ১২৮ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইমাম আহমাদ ও মুসলিম আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সামনের দাঁত (রুবাইয়া) ভেঙে যায় এবং তাঁর মাথায় আঘাত লাগে, এমনকি রক্ত মুখমন্ডল বেয়ে ঝরে পড়ে। তখন তিনি গভীর ব্যথা ও দুঃখে বললেন: “কীভাবে এমন একটি জাতি সফল হতে পারে, যারা তাদের নবীকে এরকম কষ্ট দিল, অথচ তিনি তাদেরকে তাদের রবের দিকে ডাকছেন?” তখন আল্লাহ তায়ালা ১২৮ নং আয়াত নাজিল করেন।
ইমাম আহমাদ ও বুখারি ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি: “হে আল্লাহ! অমুককে অভিশাপ দাও, হে আল্লাহ! হারিস ইবন হিশামকে অভিশাপ দাও, হে আল্লাহ! সুহাইল ইবন আমরকে অভিশাপ দাও, হে আল্লাহ! সফওয়ান ইবন উমাইয়াকে অভিশাপ দাও।” তখন ১২৮ নং আয়াত নাজিল হয়। পরে আল্লাহ তাদের সবাইকে তাওফিক দিলেন এবং তারা ইসলাম কবুল করলেন। ইমাম বুখারি (রহ.) আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও অনুরূপ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন: এ দুইটি হাদিসের মধ্যে সমন্বয় হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন উহুদে আহত হলেন, তখন তিনি দুঃখবশত তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলেন। আয়াতটি নাজিল হয় উভয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তাঁর আহত হওয়ার ঘটনায় যে ব্যথা জন্মেছিল। সেই দুঃখ থেকেই যে বদদোয়া উচ্চারিত হয়েছিল। অর্থাৎ আল্লাহ নবীকে শিখালেন, হিদায়াত বা ধ্বংসের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত কারও হাতে নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর হাতে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৬৯) ।

বদর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ঘটনা:
বদরের যুদ্ধ হয়েছিল হিজরতের দ্বিতীয় সনের রমযান মাসের ১৭ তারিখে। কারণ ছিল মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের সম্পদ ও বাড়িঘর কেড়ে নিয়েছিল। মুসলমানরা তাদের শামের কাফেলা আক্রমণ করে এই ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চেয়েছিল। এতে কুরাইশরা রাগান্বিত হয়ে এক হাজারেরও বেশি সৈন্য নিয়ে মদিনার মুসলমানদের আক্রমণ করতে বের হয়। এ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ৩১৩ জন সাহাবিকে নিয়ে বদরের দিকে রওনা হন। তাদের সাথে ছিল মাত্র দুইটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট। দুই পক্ষ মুখোমুখি হয় বদরের ময়দানে।
যুদ্ধে মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে সুস্পষ্ট বিজয় লাভ করে। কুরআনে একে “ইয়াওমুল ফুরকান” বা সত্য-মিথ্যার ফয়সালার দিন বলা হয়েছে। এ যুদ্ধে মুসলমানদের ঈমান, সাহস ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার দারুন উদাহরণ দেখা যায়। আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের আগে হাত তুলে দোয়া করেছিলেন:
اللهم، إن تهلك هذه العصابة لا تعبد بعدها في الأرض، اللهم أنجزني ما وعدتني، اللهم نصرك.
“হে আল্লাহ! যদি আজ এ দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে পৃথিবীতে আর তোমার ইবাদত হবে না। হে আল্লাহ! তোমার প্রতিশ্রুত বিজয় আমাদের দাও”।
এই যুদ্ধ মুসলমানদের মনোবল অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং ইসলামকে শক্ত ভিত্তি দেয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৬৫) ।

বদরের যুদ্ধ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
বদরের যুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক বিজয় নয়, এটি আমাদের জন্য এক গভীর শিক্ষার ক্ষেত্র।
– ঐক্যের শক্তি: মুসলমানরা সংখ্যায় কম ছিল, তবু ঐক্যবদ্ধ থেকে বড় বাহিনীকে পরাজিত করেছে।
– আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল): তারা নিজেদের সামর্থ্যের ওপর নয়, বরং আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভর করেছিল।
– দোয়ার গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর দোয়া ছিল বিজয়ের প্রধান মাধ্যম।
– ধৈর্য ও সাহস: মুসলমানরা কষ্ট, ক্ষুধা, দুর্বলতা সত্তে¡ও দৃঢ়ভাবে লড়াই করেছে।
– ইসলামের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব: এ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, ঈমান রক্ষা ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১২৩ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তাঁর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ থেকে বুঝা যায়, মানুষকে আল্লাহর অনুগ্রহ ও বিপদের কথা স্মরণ করানো মোস্তাহাব, যাতে মানুষ তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করে ও শিক্ষা নেয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭১) । এই কথাটির মূল অর্থ হলো- একজন দায়ীর উপর মানুষকে আল্লাহর দান ও রহমতের কথা যেমন মনে করানো উচিত, তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিপদ, পরীক্ষা বা শাস্তির ঘটনাগুলিও স্মরণ করানো প্রয়োজন। এতে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করে, নিজের অবস্থার সংশোধন করে এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে। যেমন কোরআনের আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِينَ﴾ [سورة الذاريات: ৫৫].
অর্থ: “আর স্মরণ করিয়ে দাও, কারণ স্মরণ করানো মুমিনদের উপকারে আসে” (সূরাতু আয-যারিয়াত: ৫৫) । আল্লাহর অনুগ্রহ স¥রণ করানোর অন্যতম উপকারিতা হলো- যখন মানুষ আল্লাহর নিয়ামত, দয়া ও রহমতের কথা স্মরণ করে, তখন তার মনে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগে। সে বুঝতে পারে যে, আমি যে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, সেটিও আল্লাহর দান। আমার স্বাস্থ্য, পরিবার, নিরাপত্তা, জ্ঞান, রিজিক সবই তাঁর অনুগ্রহ। এর ফলে তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের মানসিকতা জন্ম নেয়। এমন স্মরণ মানুষকে ইবাদত ও সৎকাজে উৎসাহী করে তোলে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তার নেয়ামত স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ﴾ [سورة المائدة: ৭].
অর্থ: “তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ৭) ।
অনুরুপভাবে বিপদ ও শাস্তির কথা স্মরণ করানোর উদ্দেশ্য হলো- মানুষ যখন শুধু সুখ ও আরামের মধ্যে থাকে, তখন প্রায়ই ভুলে যায় যে দুনিয়া পরীক্ষার জায়গা। তাই বিপদ, শাস্তি বা অতীত জাতিগুলোর ধ্বংসের ঘটনা স্মরণ করানো মানুষের আত্মসমালোচনা ও সতর্কতা জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ﴾ [سورة الحشر: ২].
অর্থ: “অতএব শিক্ষা গ্রহণ কর, হে চক্ষুমান ব্যক্তিবর্গ” (সূরাতু আল-হাশর: ২) । অতীতের জাতিগুলোর ধ্বংস ও শাস্তি স্মরণ করা মানুষকে শিখায় যে, যদি আমরা তাদের মতো আল্লাহর অবাধ্যতা করি, তাহলে আমরাও শাস্তি থেকে রেহাই পাব না।
নবীদের দাওয়াতেও এই পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল। তারা মানুষকে উপদেশ দিতেন দুইভাবে:
(ক) আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে আহ্বান জানিয়ে।
(খ) বিপদ ও আযাবের কথা স্মরণ করিয়ে পাপ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করে।
যেমন, নবী নূহ (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেন:
﴿يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا – وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا﴾ [سورة نوح: ১১-১২].
অর্থ: “তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পরপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, এবং সম্পদ ও সন্তান দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন” (সূরা নূহ: ১১-১২) । এখানে নিয়ামতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
আবার অন্য জায়গায় তিনি বলেন:
﴿إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ﴾ [سورة الشعراء: ১৩৫].
অর্থ: “আমি তোমাদের জন্য মহান দিনের আযাব আশঙ্কা করছি” (সূরাতু আশ শুয়ারা: ১৫৫)। এ আয়াতে শাস্তির সতর্কতা রয়েছে।
সুতরাং, মানুষের হৃদয় জাগ্রত রাখতে অনুগ্রহের স্মরণ কৃতজ্ঞতা জাগায় আর বিপদের স্মরণ ভয় ও সতর্কতা জাগায়। দুই দিকেরই ভারসাম্য থাকা চাই, যাতে মানুষ কেবল ভয় নয়, ভালোবাসা ও আশা নিয়েও আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, আল্লাহকে ভয় করা তাঁর শুকরিয়া অর্জনের মাধ্যম। আবু বকর আল-জাযায়িরী (রহ.) বলেন: আল্লাহর আদেশ মেনে চলা এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত তাকওয়ার প্রকাশ, আর এই তাকওয়াই হলো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পথ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭১) ।
ইমাম মারাগী (র.) বলেন, আল্লাহর প্রতি প্রকৃত তাকওয়া ও কৃতজ্ঞতা একটি মুমিনের জীবনের ভিত্তি। আল্লাহর ভীতি ধারণ করা মানে হলো তাঁর আজ্ঞা পালন করা এবং তাঁর হারাম বা নিষিদ্ধ থেকে বিরত থাকা। এভাবেই বান্দা নিজেকে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে তিনি আল্লাহর প্রদত্ত নিয়ামত যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন। আল্লাহ যে নিয়ামত দিয়েছেন, যেমন শত্রুদের প্রতি বিজয়, ধর্মের প্রসার এবং সত্যের পথে পরিচালিত হওয়া, সেগুলো বান্দাকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়। কিন্তু যে ব্যক্তি তাকওয়ার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তার ওপর প্রলুব্ধি ও কামনার প্রভাব বেশি থাকে, ফলে সে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের উদ্দেশ্য অনুযাযায়ী ব্যবহার করতে পারে না। সুতরাং আল্লাহর প্রতি প্রকৃত কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করতে হলে নিজের জীবনকে তাকওয়া অনুযায়ী পরিচালনা করা আবশ্যক, কারণ তাকওয়া ছাড়া মানব হৃদয় প্রলুব্ধি ও ইচ্ছায় বন্দী হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর দানকৃত নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে না। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৫৬) ।
২। (১২৪-১২৫) আয়াতদ্বয় থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) এখানে خطاب (সম্বোধন)-এর রুপে একটি অলঙ্কার বা সৌন্দর্য প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহকে (সা.) বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য এবং এ ইঙ্গিত দেওয়ার জন্য যে, বিজয় সংঘটিত হয়েছে তাঁরই সুসংবাদের মাধ্যমে। (তাফসীর আবী- সাঊদ: ২/৭৯) ।
(খ) যখন মুমিনরা যুদ্ধ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করার সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আশ-শা‘বী (রহ.) বলেন: “মুমিনদের কাছে খবর পৌঁছল যে, কুর্জ ইবন জাবির আল-হানাফি মুশরিকদের সাহায্যের জন্য সৈন্য নিয়ে আসতে চাচ্ছে। এ খবর মুমিনদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তখনই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, এবং এখানে আল্লাহ তাআলা সেই ঘটনাটিই বর্ণনা করেছেন। (তাফসীর আবী- সাঊদ: ২/৮০) ।
(গ) ইমাম তাবারী (রহ.) সহ অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে, বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে তিনটি ধাপে প্রথমে এক হাজার, এরপর তিন হাজার, অবশেষে পাঁচ হাজার ফেরেশতা সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ইমাম কাতাদা (রহ.) বলেন: ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছিল বদরের দিনেই। প্রথমে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন, পরে তা তিন হাজারে পরিণত হয়, তারপর পাঁচ হাজারে পৌঁছে যায়। যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী:
﴿إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ، فَاسْتَجابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلائِكَةِ مُرْدِفِينَ﴾ [سورة الأنفال: ৯].
“যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে, তখন তিনি তোমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বললেন: আমি এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করব, যারা একে অপরের পর আসবে” (সূরাতু আল-আনফাল: ৯) ।
উল্লেখিত ১২৪ নং আয়াতও একই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত: “তোমাদের প্রভু যদি তিন হাজার অবতীর্ণ ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কি তা তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?” (সূরাতু আলে ইমরান: ১২৪) ।
আর ১২৫ নং আয়াতও তাই নির্দেশ করে: “অবশ্যই, যদি তোমরা ধৈর্য ধরো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা (শত্রুরা) হঠাৎ তোমাদের আক্রমণ করে, তাহলে তোমাদের প্রভু পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন” (সূরাতু আলে ইমরান, ৩:১২৫) ।
অতএব, বদরের দিনে মুমিনরা ধৈর্য ধরেছিল, তাকওয়া অবলম্বন করেছিল, তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী তাদেরকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন। এই সব ঘটনাই বদরের দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭২) ।
(গ) আয়াত ১২৫-এ আল্লাহ তাআলা বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে পাঁচ হাজার ফেরেশতার সাহায্য পাওয়ার জন্য তিনটি শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন:
(ক) ধৈর্য ধারণ করা,
(খ) আল্লাহকে ভয় করা (তাকওয়া অবলম্বন করা),
(গ) শত্রু বাহিনীর অতিরিক্ত অংশ স্বল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধে যোগদান করা।
৩। (১২৬-১২৭) নং আয়াতদ্বয় থেকে দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) আল্লাহ বদর যুদ্ধে মুসলমানদেরকে তিনটি উদ্দেশ্যে ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করেছেন:
(র) মুসলমানদেরকে উৎসাহ ও সাহস যোগানো।
(রর) তাদের অন্তরে মানুষিক দৃঢ়তা ও স্থিরতা সৃষ্টি করা।
(ররর) কুফর ও শিরকের নেতৃত্বকে ধ্বংস করা বা তাদেরকে অপমানিত করা।
(খ) আল্লাহর সাহায্যই প্রকৃত বিজয়ের উৎস, এই কথাটি আমাদের শেখায় যে, মানুষের বাহ্যিক শক্তি, অস্ত্র বা কৌশল বিজয়ের মূল উপকরণ নয়; বরং বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহর অনুমতি ও সাহায্যের মাধ্যমেই, যা ১২৬ নং আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে। ইতিহাসের উদাহরণে দেখা যায়, বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা ছিল সংখ্যায় অল্প ও সামর্থ্যে দুর্বল, কিন্তু আল্লাহর সাহায্য লাভের ফলে তারা বিশাল শত্রুবাহিনীকেও পরাজিত করেছিল। আল্লাহর সাহায্য মানে কেবল ফেরেশতা প্রেরণ নয়; বরং অন্তরে সাহস, স্থিরতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি এবং মানসিক প্রশান্তি দানও তাঁর সাহায্যের অংশ। তাই প্রকৃত মুমিন বাহ্যিক উপকরণে নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জনের চেষ্টা করে, কারণ বিজয়-পরাজয়ের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর হাতেই। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭৫) ।
৪। (১২৮-১২৯) নং আয়াতদ্বয় থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ তাআলার; এসব বিষয়ে অন্য কারও কোনো হস্তক্ষেপ বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই, সে নবী-রাসূল হোক, ফেরেশতা হোক কিংবা রাজা-বাদশা। বিষয়গুলো হলো: কাউকে বদদোয়া বা লা‘নাত করা, অতিরিক্ত সহানুভূতির কারণে দোষী অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া, এবং আত্মপ্রতিশোধের উদ্দেশ্যে যালিমকে শাস্তি প্রদান করা। (তাফসীর আস-সা‘দী: ১/১৪৬) ।
(খ) আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। এর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই তাঁর সৃষ্টি ও বান্দা। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যথাযথ প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে যাকে চান ক্ষমা করেন, আর যাকে চান শাস্তি দেন।
এ শিক্ষাটি রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য, যেন তারা জানে যে, সবকিছু আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭৭) ।

আয়াতসমূহের আমল:
(ক) আল্লাহকে ভয় ও তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর অনুগ্রহের প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
(খ) বিজয় অর্জনের জন্য ধৈর্য ও তাকওয়ার গুণে নিজেকে সমৃদ্ধ করা।
(গ) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালাই সর্বশক্তিমান, আর তাঁর সাহায্যই প্রকৃত বিজয়ের একমাত্র উৎস।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১২১-১২২) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদের যুদ্ধ: মুসলিম সেনাদলের সুসংগঠিত কৌশল।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَوِّئُ الْمُؤْمِنِينَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (121) إِذْ هَمَّتْ طَائِفَتَانِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلَا وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ (122)﴾ [سورة آل عمران: 121-122]

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদের যুদ্ধ: মুসলিম সেনাদলের সুসংগঠিত কৌশল।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১২১। আর স্মরণ কর, যখন তুমি সকালে তোমার পরিবার-পরিজন থেকে বের হয়ে মুমিনদেরকে কিতালের স্থানসমূহে বিন্যস্ত করেছিলে; আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
১২২। যখন তোমাদের মধ্য থেকে দুইটি দল পিছু হটার ইচ্ছা পোষণ করেছিলো, অথচ আল্লাহ তাদের উভয়ের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিৎ।

আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
১২১ নং আয়াতে উহুদের যুদ্ধের প্রস্তুতির দৃশ্য উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা থেকে বের হয়ে সাহাবাদেরকে উহুদের পাদদেশে বিভিন্ন স্থানে বসাচ্ছিলেন, কোথায় কে থাকবে, কিভাবে যুদ্ধের কৌশল সাজাতে হবে তা নির্ধারণ করছিলেন। এতে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত কৌশলী ও সুসংগঠিত ছিলেন। এখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতিটি কথা ও কাজ শুনছেন এবং জানছেন। অর্থাৎ, তার পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়, বরং এটি আল্লাহরই নির্দেশনা অনুযায়ী হচ্ছে।
অহুদ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বমুহুর্তে আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় মুহূর্তের জন্য ভীত হয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরে দৃঢ়তা দান করেন, ফলে তারা স্থির থাকে। কখনো কখনো ঈমানদারদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু যদি তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে আল্লাহ তাদের দৃঢ়তা ও সাহস দান করেন। তাই প্রকৃত ঈমানদারের উচিত সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭২,৩৭৩,৩৭৫, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭০-৭৪, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫-৬৬, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৬-১০৮)।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿إِذْ غَدَوْتَ﴾ ‘যখন তুমি বের হয়েছিলে’, এ আয়াতাংশে ব্যবহৃত ‘গদাওতা’ শব্দটি আরবি ‘গুদওয়াতুন’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো ভোরবেলা বা প্রত্যুষকাল। আরবরা ফজরের সালাত আদায় থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যবর্তী সময়কে ‘গুদওয়াতুন’ বলে অভিহিত করত। (লিসানুল আরব, ইবনু মানযূর: ১৫/১১৬) । অধিকাংশ মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যখন তিনি শনিবারের প্রভাতে মদীনা থেকে বের হয়ে ‘উহুদ’ প্রান্তরে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা শুধু একটি ঘটনাকে স্মরণ করাননি, বরং ভোরবেলার পবিত্রতা, সতেজতা ও প্রস্তুতির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। কারণ প্রত্যুষকাল হচ্ছে কর্মশীলতা ও দৃঢ় সংকল্পের সময়, যখন মুমিনরা ইবাদতে সঞ্জীবিত হয়ে নতুন দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, ‘উহুদ’ যুদ্ধটি পরবর্তী বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৮/৩৪৫)। এভাবে সকালবেলার সময়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে আয়াতটি মুমিনদের মনে করিয়ে দেয় েেয, সংগ্রাম ও পরীক্ষার ময়দানে নামতে হলে শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি এবং ঈমানি দৃঢ়তা দুটোই অপরিহার্য।
﴿هَمَّتْ﴾ ‘ইচ্ছাপোষণ করেছিল’, যদিও শব্দটির মূল অর্থ কেবল ‘ইচ্ছা করা’, এখানে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তারা মনে মনে যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে মদীনায় ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিল এবং তাদের মন সে দিকেই প্রবণ হয়েছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।
﴿طَائِفَتَانِ﴾ ‘দুইটি পক্ষ’, আয়াতটি বিশেষভাবে উল্লেখ করছে আনসারদের দুটি প্রধান গোত্রকে: বনু সালামা এবং বনু হারিসা। এটি শুধু নাম উল্লেখ নয়, বরং সেই সময়ের সামাজিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটকে চিত্রিত করছে, যেখানে এই দুই গোত্র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের সেবায় অবদান রেখেছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
যখন পূর্বের আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কুচক্রী ও দুষ্টচিন্তাাপোষণকারী লোকদের অন্তরঙ্গ বন্ধু না বানানোর জন্য সতর্ক করলেন, তখন উল্লেখিত আয়াতসমূহে একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরলেন যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা থেকে। দুইটি দলের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, কাপুরুষতা ও দুর্বলতায় তারা ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। এর মূল কারণ ছিল মুনাফিকদের কুমন্ত্রণায় তাদের দুর্বল হয়ে পড়া, যাদের নেতা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৬৫) ।

উহুদ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ঘটনা:
বদরের যুদ্ধে পরাজয়ের পর কুরাইশরা প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। বয়স্করা শহরে থেকে যুদ্ধ করার পরামর্শ দিলেও যুবকেরা ময়দানে বের হওয়ার পক্ষে মত দেয়। নবীজি অবশেষে ময়দানে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং এক হাজার সাহাবি নিয়ে উহুদের পাদদেশে শিবির স্থাপন করেন।
পঞ্চাশ জন তীরন্দাজকে পাহাড়ের ঢালে বসিয়ে তিনি কঠোরভাবে নির্দেশ দেন যুদ্ধে জয় বা পরাজয় যাই হোক, স্থান ত্যাগ করবে না। প্রথমে মুসলমানরা জয়লাভ করতে থাকে, কিন্তু তীরন্দাজদের একটি দল নির্দেশ অমান্য করে গনিমতের জন্য নেমে যায়। এ সুযোগে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে আক্রমণ করেন। পরিস্থিতি পাল্টে যায়, অনেক সাহাবি শহীদ হন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও আহত হন, দাঁত ভেঙে যায়। অবশেষে আল্লাহ মুসলমানদের রক্ষা করেন, তবে এ যুদ্ধ থেকে তারা বড় শিক্ষা লাভ করে:
– রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
– আল্লাহর সাহায্য আসে শুধুমাত্র ধৈর্য ও আনুগত্যের মাধ্যমে।
– পরাজয় মানেই ঈমানের পরাজয় নয়, বরং তা আত্মশুদ্ধি ও ধৈর্যের পরীক্ষা।
– উহুদের যুদ্ধ মুসলিম সমাজকে দৃঢ় করেছিল এবং ভবিষ্যতের জন্য মহান শিক্ষার উৎস হয়েছিল।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। এই আয়াতগুলো উহুদের ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে, যার কাহিনী সীরাত ও ইতিহাসে সুপরিচিত। এ আয়াতগুলো এখানে উল্লেখ করার হিকমত হলো-
(ক) আল্লাহ তায়ালার সাধারণ নিয়ম হলো- মুমিনরা যদি যদি ধৈর্য ধরে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তবে তিনি তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং শত্রুদের কুটচাল ব্যর্থ করে দেবেন। তাই আল্লাহ তায়ালা এই নীতির উদাহরণ হিসেবে বদর ও উহুদের কাহিনী তুলে ধরেছেন। বদরে মুমিনরা ধৈর্যশীল ও মুত্তাকি হওয়ায় তারা বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু উহুদে তাদের কিছু লোক তাকওয়ার শর্ত ভঙ্গ করায় শত্রুরা কিছু সময়ের জন্য প্রাধান্য লাভ করেছিল।
(খ) আল্লাহ তায়ালা চান তাঁর বান্দারা যখন কোনো অপ্রিয় ঘটনায় বিপদগ্রস্ত হয়, তখন তারা পূর্ববর্তী প্রিয় অনুগ্রহগুলো স্মরণ করলে দুঃখ-কষ্ট হালকা মনে হবে এবং তারা আল্লাহর মহান নিয়ামতের জন্য শোকর আদায় করবে। কারণ, অপ্রিয় ঘটনাগুলো আসলে তাদের মঙ্গলের জন্যই, এবং প্রাপ্ত অনুগ্রহের তুলনায় তা খুবই সামান্য। (তাফসীর সা’দী: ১/১৪৫) । এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন আল্লাহ্ তাঁর বাণীতে:
﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَـذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِير﴾ [سورة آل عمران:১৬৫].
“তোমাদের যখন একটি বিপদ এসে পড়ল, যার দ্বিগুণ তোমরা (শত্রুদের ওপর) আরোপ করেছিলে, তখন তোমরা বললে: ‘এটা কোথা থেকে এলো?’ বলে দাও: ‘এটা তোমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে এসেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান”। (সূরাতু আলে ইমরান: আয়াত: ১৬৫)।
২। ১২১ নং আয়াত থেকে পরিলক্ষিত হয় যে,
(ক) ইসলামের শিক্ষা হলো- নেতৃত্ব কোনো ভোগ-বিলাসের আসন নয়; বরং এটি একটি বিশাল আমানত ও দায়িত্ব। একজন প্রকৃত নেতা কখনো শুধু আদেশ দিয়ে বসে থাকেন না। তিনি নিজেই সামনে থেকে কাজের ভার নেন, কষ্ট সহ্য করেন, আর অধীনস্থদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি উহুদ, বদর কিংবা খন্দকের মতো যুদ্ধে শুধু পরামর্শদাতা হয়ে থাকেননি; বরং সাহাবাদের সাথে নিজেই ময়দানে নেমেছেন, কষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামও তাই নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে, উম্মাহর মাঝে দাঁড়িয়ে।
আমাদের সমাজে আজও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতৃবৃন্দকে দেখা যায় এই মহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে। তারা মাঠে কর্মীদের সাথে কাজ করেন, তাদের সাহস জোগান, পথ দেখান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু দরবার-ভিত্তিক সুফীবাদী দল কিংবা অনৈসলামী রাজনৈতিক দলে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। সেখানে সাধারণ কর্মীরা রোদ-বৃষ্টিতে মাঠে খেটে যাচ্ছেন, আর নেতৃবৃন্দ প্রাসাদের ভেতর বিলাসী জীবনে ডুবে আছেন। এটি ইসলামের নেতৃত্ব নয়। ইসলামের প্রকৃত নেতৃত্ব হলো নবী ও সাহাবাদের নেতৃত্ব, যেখানে নেতা আর কর্মীর মাঝে কোনো বিভাজন নেই, পার্থক্য কেবল দায়িত্বের, মর্যাদার নয়।
আল্লাহ যেন আমাদের সমাজে এমন নেতৃত্ব দান করেন যারা সত্যিকার অর্থে উম্মাহকে সামনে থেকে নিয়ে চলবে, ইসলামের পতাকাকে উঁচুতে উড়াবে, আর জনগণের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে থাকবে।
(খ) ১২১ নং আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা হলেন সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞ, যিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সবকিছুই জানেন। মানুষের দেহগত কাজ, মুখের কথা, এমনকি অন্তরের গভীরতম চিন্তা-ভাবনা, সন্দেহ, ঈমান ও কপটতাও তাঁর কাছে গোপন নয়। এ সম্পর্কে কোরআনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যেমন আয়াতুল কুরসীতে বলা হয়েছে:
﴿يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ﴾ [سورة البقرة: ২৫৫].
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই তিনি জানেন যা তাদের সামনে রয়েছে এবং যা তাদের আড়ালে রয়েছে” (সূরাতু আল-বাক্বারাহ: ২৫৫) ।
এ কারণেই অন্তরের ঈমানকে দৃঢ় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিকভাবে কেউ বড় আলেম, দাঈ বা বড় নেতা হিসেবে পরিচিত হতে পারে, কিন্তু যদি অন্তরে দ্বিধা, ভন্ডামি বা দুর্বলতা থাকে, আল্লাহ তা জানেন এবং এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই দেহে একটি টুকরো মাংস আছে, যদি তা ঠিক থাকে তবে সমগ্র দেহ ঠিক থাকে, আর যদি তা নষ্ট হয় তবে সমগ্র দেহ নষ্ট হয়। জেনে রাখ, সেটি হলো অন্তর” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
৩। ১২২ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় প্রতিফলিত হয়:
(ক) মুমিনের দুর্বলতা ও দ্বিধা পরিত্যাজ্য, এ বিষয়টি কোরআন ও হাদীসের আলোকে মুমিনের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলামে মুমিনের জন্য দুর্বলতা (অসাহস, অলসতা, হতাশা) গ্রহণযোগ্য নয়, যা অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অন্য এক আয়াতে বলেছেন:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৩৯].
অর্থাৎ: “তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৩৯) । এখানে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের শক্তি, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিয়েছেন। দুর্বলচিত্ততা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ، خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ، وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجَزْ، وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: “قَدَّرَ اللهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ”، فَإِنَّ “لَوْ” تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ” (صحيح مسلم: ২৬৬৪).
অর্থাৎ: “শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার জন্য উপকারী, তার প্রতি তুমি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং দুর্বল হয়ো না। আর যদি কোনো বিপদ তোমাকে আঘাত করে, তবে বলো না: ‘যদি আমি এমন করতাম, তবে এমন হতো, এমন হতো।’ বরং বলো: ‘আল্লাহর তাকদীর, তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন।’ কারণ, ‘যদি’ বলা শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪) । অর্থাৎ, মুমিনকে সব সময় দৃঢ়চিত্ত হতে হবে, সাহসী হতে হবে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুরুপভাবে মুমিন জীবনে দ্বিধা পরিত্যাজ্য, মুমিন যখন দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তখন সে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখতে পারে না এবং কর্মে দৃঢ় হতে ব্যর্থ হয়। দ্বিধা শয়তানের একটি কৌশল, যা মানুষকে সৎকাজ থেকে বিরত রাখে। এ সম্পর্কে কোরআন কারীমে এসেছে:
﴿وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৫৯].
অর্থাৎ: “আর তুমি তাদের কাজে পরামর্শ গ্রহণ করো; অতঃপর যখন তুমি সংকল্পবদ্ধ হও, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদেরকে ভালোবাসেন” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৫৯) । অর্থাৎ, মুমিন যখন কোনো ভালো কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তখন দ্বিধা না করে দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।
(খ) আল্লাহ যাদের অভিভাবক হন তাদেরকে দুর্বলতা ও দ্বিধা থেকে মুক্তি দেন, যা অত্র আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অন্য একটি আয়াতে বলেছেন:
﴿اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ﴾ [سورة البقرة: ২৫৭].
“আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২৫৭) । অর্থাৎ, যখন আল্লাহ কারো অভিভাবক হন, তখন তিনি তার অন্তরকে ঈমান, হিদায়াত ও সাহসে ভরে দেন। শয়তানের পক্ষ থেকে যে ভয়, সন্দেহ, দ্বিধা, হতাশা আসে, আল্লাহ তা দূর করে দেন।
দুর্বলতা আসে তখন, যখন মানুষ ভাবে সে একা, সে অক্ষম। কিন্তু আল্লাহ যখন তার অভিভাবক, তখন মুমিন বুঝে যায় সে একা নয়, মহান রব তার সঙ্গে আছেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই; এ কারণে সে দুর্বল হয় না। কোরআনে এসেছে:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৩৯].
“তোমরা দুর্বল হয়ো না, শোক করো না, আর যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে তোমরাই উচ্চতর” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৯) ।
অপরদিকে দ্বিধা আসে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও ভয়ের কারণে। কিন্তু আল্লাহর ওলিদের জন্য প্রতিশ্রæতি প্রদান করা হয়েছে:
﴿إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ [سورة الأحقاف: ১৩].
“নিশ্চয়ই, যারা বলে: ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর সে কথায় অটল থাকে, তাদের উপর কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না” (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬:১৩) । এখানে স্পষ্ট, আল্লাহর অভিভাবকত্ব দ্বিধা-ভয়কে দূর করে দেয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إنَّ اللَّهَ إذا أحَبَّ عَبْدًا دَعا جِبْرِيلَ فقالَ: إنِّي أُحِبُّ فُلانًا فأحِبَّهُ، قالَ: فيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنادِي في السَّماءِ فيَقولُ: إنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلانًا فأحِبُّوهُ، فيُحِبُّهُ أهْلُ السَّماءِ، قالَ ثُمَّ يُوضَعُ له القَبُولُ في الأرْضِ..”ِ. (رواه البخاري ومسلم في صحيحيهما).
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে ডাকেন এবং বলেন: “আমি অমুককে ভালোবাসি, সুতরাং তুমি-ও তাকে ভালোবাসো”। তখন জিবরাঈলও তাকে ভালোবাসেন। এরপর জিবরাঈল আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করেন: “আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো”। ফলে আকাশবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে থাকে। তারপর পৃথিবীতে তার জন্য মানুষের অন্তরে গ্রহণযোগ্যতা (ভালোবাসা) সৃষ্টি করে দেওয়া হয়” (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম) ।
সুতরাং যাদের আল্লাহ অভিভাবক হন, আল্লাহ তাদেরকে অন্তরের ভয়, দুর্বলতা ও দ্বিধা থেকে মুক্ত করেন। তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে সাহসী হয়, পরীক্ষায় ধৈর্য ধরে, এবং সত্যের পথে অটল থাকে।
(গ) আয়াতের শেষাংশ থেকে বুঝা যায়, সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য, আল্লাহর ওপর ভরসা করা (তাওয়াক্কুল) হলো ঈমানের মূল ভিত্তি ও মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। মুমিন ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, কারণ সে জানে আল্লাহ ছাড়া কারো হাতে প্রকৃত ক্ষতি বা উপকার নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ [سورة الطلاق: ৩].
“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট” (সূরাতু আত-তালাক: ৩) ।
অতএব, আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা মুমিনের পরিচয়, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ أَنَّكُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا” (رواه الترمذي وابن ماجة).
“যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথার্থ ভরসা করতে, তবে তোমাদেরকে তিনি এমনভাবে রিযিক দিতেন যেভাবে তিনি পাখিদের রিযিক দেন। তারা সকালবেলায় খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) । এ হাদিসে স্পষ্ট বোঝা যায়, তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং চেষ্টা করা এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
এখন একটি প্রশ্ন হতে পারে, তাওয়াক্কুল মুমিনের জীবনে কী প্রভাব ফেলে?
কোরআন-হাদীসের আলোকে এ প্রশ্নের উত্তর হলো-
(ক) আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, সে জানে, আল্লাহর সাহায্য থাকলে কেউ তাকে পরাজিত করতে পারবে না।
(খ) মানসিক প্রশান্তি আনে, বিপদে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ে না, বরং অন্তরে শান্তিঅনুভব করে।
(গ) নেতৃত্বের গুণ তৈরি করে, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করার শক্তি তাকে দৃঢ় নেতা বানায়।
(ঘ) পাপ থেকে দূরে রাখে, কারণ রিজিক, মান-মর্যাদা বা নিরাপত্তা কেবল আল্লাহর হাতে, এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায়ের পথে যেতে দেয় না।
(ঙ) সাহসী করে তোলে: মুমিন জানে, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তাই সে সঠিক পথে চলতে এবং সত্য কথা বলতে ভয় পায় না।

আয়াতদ্বয়ের আমল:
(ক) দৈনন্দিন কাজ, শিক্ষা, দাওয়াত কিংবা জিহাদ, সবকিছুতেই সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি নেওয়া।
(খ) নেতাকে তার দায়িত্বের স্থানে সক্রিয় থাকা এবং অধীনস্থদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।
(গ) বিপদের সময় সাহস ও দৃঢ়তা অর্জন করা এবং আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশা করা।
(ঘ) সকল কাজে প্রস্তুতি শেষে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১৮-১২০) আয়াতাবলীর তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফিরদের প্রতি আস্থা রাখা এবং তাদের কাছে গোপনীয়তা ফাঁস করা মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা বাড়ায়।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ (118) هَا أَنْتُمْ أُولَاءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (119) إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (120)﴾ [سورة آل عمران: 118-120].

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: কাফিরদের প্রতি আস্থা রাখা এবং তাদের কাছে গোপনীয়তা ফাঁস করা মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা বাড়ায়।

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১১৮। হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে বাদ দিয়ে অন্য ধর্মাবলম্ভী কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না; তারা তোমাদেরকে ক্ষতি করতে ত্রুটি করবে না, তারা চায় তোমাদের ক্ষতি, তাদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশ পেয়েছে, আর যা গোপন রেখেছে তাদের অন্তর সমূহ, তা আরো ভয়ঙ্কর; আমি আয়াতসমূহ তোমাদের জন্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি, যাতে তোমরা অনুধাবন করো।
১১৯। ভেবে দেখো, তোমরাই তো তাদেরকে ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না, অথচ তোমরা ঈমান রাখো সম্পূর্ণ কিতাবের প্রতি। আর যখন তারা তোমাদের সাথে সাক্ষাত করে, তখন তারা বলে: আমরা ঈমান এনেছি, কিন্তু যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তখন তারা তোমাদের উপর রাগের কারণে তাদের আঙ্গুল কামড়ায়; বলো: তোমরা মরো তোমাদের রাগ নিয়ে, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পকে পূর্ণ জ্ঞাত।
১২০। যদি কোন কল্যাণ তোমাদেরকে স্পর্শ করে, তখন তারা কষ্ট পায়; আর যদি তোমাদেরকে স্পর্শ করে কোন অমঙ্গল, তখন তারা তাতে খুশি হয়; আর যদি তোমরা ধৈর্য ধরো এবং আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদেরকে কোন ক্ষতি করতে পারবে না, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের কার্যক্রমকে বেষ্টনকারী।

আায়াতাবলীর ভাবার্থ:
১১৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন নিজেদের বাইরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। এখানে “বিতানাহ” বলতে এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরামর্শদাতা বোঝানো হয়েছে, যাদেরকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত পরিকল্পনা, গোপনীয়তা ও দুর্বলতা জানাই। চারটি কারণে তাদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে:
(ক) অবিশ্বাসীরা কখনও মুমিনদের প্রকৃত কল্যাণ কামনা করে না।
(খ) তারা সদা সুযোগ খোঁজে মুমিনদের ক্ষতি করতে এবং বিপদে ফেলতে।
(গ) তাদের মুখ থেকেই মুমিনদের প্রতি তাদের শত্রæতা ও বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে উঠে।
(ঘ) মুমিনদের প্রতি তাদের অন্তরের ঘৃণা ও বিদ্বেষ আরও তীব্র ও ভয়াবহ।
আল্লাহ তায়ালা এসব নিদর্শন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে মুমিনরা কাফিরদের প্রকৃত স্বরুপ বুঝতে পেরে সতর্ক থাকতে পারে।
১১৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফিদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার আরো তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন:
(ক) মুমিনরা তাদের ভালোবাসে, কিন্তু তারা মুমিনদের মোটেও ভালোবাসে না।
(খ) মুমিনরা আল্লাহর কিতাবে ঈমান এনেছে, অথচ তারা সে ঈমান সহ্য করতে পারে না।
(গ) মুমিনদের সাথে তাদের ভন্ডামী ও প্রতারণামূলক আচরণ, মুমিনদের সামনে এসে বলে: “আমরা ঈমান এনেছি”, কিন্তু একা হলে এমন ক্রোধে ফেটে পড়ে যে আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। এটি তাদের প্রবল ঈর্ষা ও শত্রæতার বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের এ ঘৃণা ও শত্রুতা কোন সুফল বয়ে আনবে না, কারণ আল্লাহ তাদের অন্তরের সবকিছু অবগত আছেন।
১২০ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সামনে উল্লেখিত অবস্থার সত্যতা উম্মোচন করেছেন, তাদের জন্য কোনো কল্যান ঘটলে, তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে, শক্তিশালী হয়ে উঠলে এবং বিজয়ী হলে, তা কাফিরদেরকে ভিষণ কষ্ট দেয়, আর তাদের জন্য কোনো বিপদ এলে, তারা নিজেদের মধ্যে অনৈক্যে থাকলে, দুর্বল হয়ে পড়লে এবং পরাজিত হলে কাফিররা তাতে খুশি হয়। অবশেষে আল্লাহ মুমিনদের জন্য শত্রæর অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার দুইটি উপায় দেখিয়েছেন:
(ক) ধৈর্য অবলম্বন করা।
(খ) তাকওয়া ধারণ করা।
যদি মুমিনরা ধৈর্য ও তাকওয়ার পথে অটল থাকে, তবে শত্রæর কোন ষড়যন্ত্র তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা তাদের সকল কর্মকান্ডকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন; কোনো পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। অর্থাৎ: আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে ধৈর্য ও তাকওয়ার সাথে চললে শত্রুর সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে যাবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৭-৩৬৮, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৫৬-৫৮, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৫-১০৬) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بِطَانَةً﴾ ‘বিতানা’, শব্দটি আরবী, যার মূল অর্থ হলো- কাফড়ের ভিতরের আস্তর বা আস্তরণ। এই আস্তরণের সাথে তুলনা করে মানুষের অন্তরঙ্গজনকে ‘বিতানা’ বলা হয়। অর্থাৎ: এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরামর্শদাতা, যাদেরকে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা, গোপনীয়তা ও দুর্বলতা জানানো যায়। আয়াতে কাফির-মুনাফিকদেরকে এমন বন্ধু বানাতে নিষেধ করা হয়েছে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১১৮) ।
﴿خَبَالًا﴾ ‘ক্ষতি’, ‘খাবাল’ আরবী শব্দ, যার অর্থ হলো- নষ্ট হওয়া বা বিপর্যয়। হাদীসে এসেছে, যে রক্তপাত বা খাবালে আক্রান্ত হয়, অর্থাৎ: এমন আঘাত যা অঙ্গকে নষ্ট করে দেয়। আয়াতে দ্বীনি ও দুনিয়াবী বিষয়ের ক্ষতিকে বুঝানো হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৬) ।
﴿حَسَنَةٌ﴾ ‘ভালো’, শব্দটি আরবী, যার মূল অর্থ হলো- ভালো বা সৌন্দর্য। তবে আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নেয়ামত, যেমন: বিজয়, সাহায্য, শক্তি এবং অন্য কোন কল্যাণ। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১২০) ।
﴿سَيِّئَةٌ﴾ ‘খারাপ, শব্দটি আরবী, যার মূল অর্থ হলো- খারাপ বা কদর্য। তবে আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নেয়ামত, যেমন: পরাজয়, মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ, দুর্বলতা এবং যা মানুষের জন্য কষ্টদায়ক। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১২০) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতাবলীর সম্পর্ক:
আগের আয়াতগুলোতে আহলে কিতাব ও মুশরিকদের স্বভাব এবং আখিরাতে তাদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আর মুমিনদের জন্য পুরস্কারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো মুমিনদের সতর্ক করছে, কাফির ও মুনাফিকদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক না করতে। কারণ এতে মুসলমানদের গোপন খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন অনেক বিষয় তারা জেনে যেতে পারে যা গোপন রাখা দরকার। এতে মুসলিম সমাজের জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। তাই এ সতর্কতা খুবই দরকারি ও বুদ্ধিদীপ্ত, যেমন প্রত্যেক জাতি তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবল বিশ্বাসযোগ্য লোকদের কাছেই রাখে। (তাফসীর আল-মুনীল, জুহাইলী: ৪/৫৫) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের ১১৮ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেছেন: কিছু মুসলমান ইহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন, কারণ জাহেলিয়াত যুগে তারা একে অপরের প্রতিবেশী ও মিত্র ছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন, যাতে মুসলমানরা তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা না করে এবং গোপন বিষয় জানাতে সতর্ক থাকে; কারণ এতে ফেতনা ও বিপদের আশঙ্কা ছিল। (লুবাব আল-নুক‚ল, সয়ূতী: ১/৬৫) ।

আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১১৮ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন নিজেদের বাইরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। তদের মধ্যে ঘৃণিত চারটি বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে:
(ক) তারা মুসলমানদেরকে ক্ষতি সাধনে কোন ত্রæটি রাখবে না।
(খ) তারা চায় মুসলমানদের সর্বনাশ হোক।
(গ) তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুখে চরম বিদ্বেষ ও শত্রæতা প্রকাশ করে।
(ঘ) তাদের অন্তরের বিদ্বেষ আরও বড় এবং ভয়াবহ।
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন এগুলো হলো সেই বৈশিষ্ট্য যেগুলো থাকলে মুসলমানদের উচিত নয় এমন কাউকে ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা বানানো। কিন্তু যদি এই বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়, তখন তাদের সাথে সহযোগিতা বৈধ হতে পারে, যেমন ইহুদিরা প্রথম যুগে মুসলিমদের শত্রু ছিল, পরে আন্দালুস জয়ে তারা মুসলিমদের সহযোগিতা করেছিল; মিশরের কপটরাও মুসলিমদের রোমের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিল। এজন্যই হযরত উমর (রাঃ) তার দাপ্তরিক কাজে রোমীয়দের নিয়োগ করেছিলেন, পরে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান দপ্তরকে আরবিতে রূপান্তরিত করেন। আব্বাসী খলিফারা ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ করতেন, এমনকি উসমানীয় খিলাফতেও বহু রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি খ্রিস্টান ছিলেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৪৫) । এ সম্পর্কে সূরাতু আল-মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿لا يَنْهاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ، إِنَّما يَنْهاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيارِكُمْ وَظاهَرُوا عَلى إِخْراجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾ [سورة الممتحنة: ৮].
অর্থাৎ: “যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করেনি বা তোমাদেরকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করেনি, আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ থেকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। কিন্তু তিনি নিষেধ করেন কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব থেকে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদের বহিষ্কারে সহযোগিতা করেছে” (সূরাতু আল-মুমতাহিনা: ৮)।
২। ১১৯ নং আয়াতে তিনটি বিষয়কে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে:
(ক) কাফিদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার আরো তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন:
(১) মুমিনরা তাদের ভালোবাসে, কিন্তু তারা মুমিনদের মোটেও ভালোবাসে না।
(২) মুমিনরা আল্লাহর কিতাবে ঈমান এনেছে, অথচ তারা সে ঈমান সহ্য করতে পারে না।
(৩) মুমিনদের সাথে তাদের ভন্ডামী ও প্রতারণামূলক আচরণ।
(খ) রাসূল্লাহর (সা.) মাধ্যমে কাফিরদের বিরুদ্ধে দোয়া করানো হয়েছে যে, তারা যেন মুসলমানরদের প্রতি ক্রোধে দগ্ধ হতে হতে ধ্বংস হয়ে যায়, আর মুসলমানরা যেন ঈমান ও ঐক্যে আরো শক্তিশালী হয়। (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১০৮) ।
(গ) আয়াতের শেষাংশে ইহুদী-খ্রিস্টান এবং কাফির-মুনাফিকদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তারা যেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রæতা, ক্রোধ ও হিংসা-বিদ্বেষ ছেড়ে ইসলামে পথে ফিরে আসে; কারণ তাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পূর্ণ জ্ঞাত আছেন এবং তার যথাযথ প্রতিফল দিবেন, দুনিয়াতে তাদের আশা-আকাঙ্খার বিপরীত ফল প্রদর্শন করবেন এবং আখেরাতে তাদেরকে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে হবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৫৮) ।
৩। ১২০ নং আয়াত থেকে চারটি মূল বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে (১১৮-১১৯) আয়াতে বর্ণিত ইহুদি-খ্রিস্টান ও কাফির-মুনাফিকদের মানসিকতার সত্যতা উন্মোচিত হয়েছে। মুসলমানদের কল্যাণ সাধিত হলে, তাদের ঐক্য দৃঢ় হলে, শক্তি বৃদ্ধি পেলে এবং তারা বিজয়ী হলে, এটি কাফিরদের জন্য চরম কষ্টের কারণ হয়। বিপরীতে, মুসলমানরা বিপদগ্রস্ত হলে, অনৈক্যে ভুগলে, দুর্বল হলে কিংবা পরাজিত হলে, এতে তারা আনন্দিত হয়।
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে শত্রুর ক্ষতি ও ষড়যন্ত্র থেকে নিরাপদ থাকার দুটি উপায় নির্দেশ করা হয়েছে: ধৈর্য ধারণ এবং তাকওয়া অবলম্বন।
(গ) আয়াতের তৃতীয়াংশে মুমিনদের সান্তনা দেওয়া হয়েছে যে, যদি তারা ধৈর্য ও তাকওয়ার পথে অটল থাকে, শত্রুর কোনো ষড়যন্ত্র তাদের প্রকৃত অর্থে ক্ষতি করতে পারবে না।
(ঘ) আয়াতের শেষাংশে এ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে, কাফিররা মুসলমানদের ক্ষতি করতে পারবে না, কারণ আল্লাহ তায়ালা তাদের সব কর্মকান্ডকে পরিবেষ্টন কওে রেখেছেন; তাদেও কোনো পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।
৪। কোরআন কারীমের বহু আয়াতে, যেমন সূরা আলে-ইমরান (আয়াত ২৮), সূরা আন-নিসা (আয়াত ১৪৪), সূরা আল-মায়িদা (আয়াত ৫১) এবং সূরা আল-মুজাদালাহ (আয়াত ২২), মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। আর সূরা আলে-ইমরানের (১১৮-১২০) আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন না করার সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা হলো: ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের যেকোনো স্তরে কাফেরদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজে এর উল্টো প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যারা এ কাজে লিপ্ত, তাদের জন্য এসব আয়াতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ও পরিণতির আভাস দেওয়া হয়েছে। (আল্লাহ ভালো জানেন)

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) ইহুদি-খ্রিস্টান এবং কাফের-মুনাফিকদেরকে ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে গ্রহণ না করা।
(গ) ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহকে ভয় করার মাধ্যমে শত্রুদের ক্ষতি ও ষড়যন্ত্র থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা।
(ঘ) আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বদর্শী এবং সকল ঘটনা সম্পর্কে অবগত, এটি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১৬-১১৭) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ব্যর্থতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে কাফেরদের সব কর্ম।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَنْ تُغْنِيَ عَنْهُمْ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (116) مَثَلُ مَا يُنْفِقُونَ فِي هَذِهِ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَثَلِ رِيحٍ فِيهَا صِرٌّ أَصَابَتْ حَرْثَ قَوْمٍ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَأَهْلَكَتْهُ وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (117)﴾ [سورة آل عمران: 116-117].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: ব্যর্থতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে কাফেরদের সব কর্ম।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১১৬। নিশ্চয় যারা কুফরী করে, আল্লাহর সামনে তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি তাদের কোন কাজে আসবে না। আর তারাই জাহান্নামের অধিবাসী হবে এবং তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।
১১৭। আর তারা এই পার্থিব জীবনে যা ব্যয় করে তার উপমা ঐ বাতাসের ন্যায় যাতে রয়েছে প্রচন্ড ঠান্ডা, যা পৌঁছে এমন কওমের শষ্যক্ষেতে, যারা যুলম করেছিল নিজেদেরকে, অতঃপর তা তাকে ধংস করে দেয়। আর এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে যুলম করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলম করেছে।

আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
যারা কুফরী করেছে, তাদের কাছে ধন-সম্পদ কিংবা বিপুল সন্তান-সন্ততি থাকলেও কিয়ামতের দিন এগুলো কোনো কাজে আসবে না; কারণ আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে ঈমান ও সৎকর্ম ছাড়া অন্য কিছু কার্যকর নয়। সুতরাং ধন-সম্পদে গর্বিত হওয়া কিংবা সন্তানদের সংখ্যায় শক্তি মনে করা সবই ব্যর্থ। এমন কাফেররা জাহান্নামের বাসিন্দা হবে এবং তারা সেখানে চিরকালীন শাস্তি ভোগ করবে।
যারা কাফের, তারা দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে, যেমন খ্যাতি অর্জন, অহংকার প্রকাশ কিংবা অন্যায় উদ্দেশ্যে, তা কখনো ফলপ্রসূ হয় না। তাদের এই ব্যয়ের দৃষ্টান্ত হলো এমন এক তীব্র শীতল ঝড়, যা পাকা ফসলের উপর আঘাত করে তাকে বিনষ্ট করে দেয়। যেমন কৃষক সারা বছর পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও যদি প্রলয়ঙ্করী শীতল ঝড়ে তা ধ্বংস হয়ে যায়, তার সমস্ত শ্রম নষ্ট হয়, তেমনি কাফেরদের দুনিয়ার ব্যয়-উদ্যোগ আখিরাতে কোনো উপকার দেবে না। আল্লাহ তাদের প্রতি অন্যায় করেন না; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি অন্যায় করছে, কারণ তারা আল্লাহর নির্দেশ মানে না এবং সঠিক উদ্দেশ্যে ব্যয় করে না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৪, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৫২, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৫) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مَا يُنْفِقُونَ﴾ ‘তারা যা ব্যয় করে’ আয়াতাংশের উদ্দেশ্য হলো- তারা গর্ব-অহংকার, সম্মান অর্জন, মানুষের প্রশংসা ও ভালো নাম কামাই করার জন্য যা ব্যয় করে। (তাফসীর আল-নাসাফী: ১/২৮৫)।
﴿صِرٌّ﴾ ‘শীতল বাতাস প্রবাহিত হওয়া’, আয়াতে এমন শীতল বাতাসকে বুঝানো হয়েছে, যাতে থাকে কনকনে ঠান্ডা। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/৯৭) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আল্লাহ পূর্বের আয়াতাবলীতে উল্লেখ করেছেন কাফিরদের অবস্থা ও তাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি, আর মুমিনদের অবস্থা ও তাদের জন্য সঞ্চিত পুরস্কার, যেখানে রয়েছে সতর্কতা ও প্রেরণা, প্রতিশ্রæতি ও হুঁশিয়ারি। এরপর তিনি বর্ণনা করেছেন সেই সব মানুষকে, যারা কুফরের অন্ধকার ছেড়ে ঈমান গ্রহণ করেছে, আর অর্জন করেছে সুন্দর গুণাবলি ও মর্যাদা। অবশেষে উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে তিনি কাফিরদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিলেন কিয়ামতের দিন তারা কোনো রকম আশ্রয় বা রক্ষা খুঁজে পাবে না। তিনি জানালেন, দুনিয়ার জীবনে তারা ভোগ-বিলাস, সম্মান-প্রতিপত্তি ও মতাদর্শের সমর্থনে যে অর্থ ব্যয় করে, তা শেষ পর্যন্ত তাদের কোনো কাজে আসবে না; যেন একটি ক্ষেত, যা শীতল ঝড়ো বাতাসে ধ্বংস হয়ে যায়, আর মালিকেরা সেখান থেকে কিছুই লাভ করতে পারে না। (তাফসীর আল-মারাগী: ৩/৪১) ।

১১৭ নং আয়াতের উপমার ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তায়ালার শিক্ষা প্রদানের একটি নিয়ম হলো- অদৃশ্য বা বিমূর্ত বিষয়কে দৃশ্যমান ও প্রত্যক্ষ উদাহরণের মাধ্যমে মানুষকে সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়া।
বালাগাতের দৃষ্টিকোণ থেকে উপমার চারটি অংশ রয়েছে:
(ক) যাকে উপমা দেওয়া হয়,
(খ) যার সাথে উপমা দেওয়া হয়,
(গ) উপমা প্রদানের হরফ,
(ঘ) উপমা প্রদানের উদ্দেশ্য।
এই আলোকে ১১৭ নং আয়াতে প্রদত্ত উপমাটি এমন:
 যাকে উপমা দেওয়া হয়েছে: ভোগ-বিলাস ও সম্মান-প্রতিপত্তির জন্য সম্পদ ব্যয়।
 যার সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে: একটি ফলবান ক্ষেত, যা শীতল ঝড়ো বাতাসে ধ্বংস হয়ে যায়।
 উপমা প্রদানের হরফ: “كَمَثَل” (কামাছালি) অর্থাৎ ‘মত’।
 উপমা প্রদানের উদ্দেশ্য: কাফেরের আমলের পরিণতি ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে প্রকাশ করা।
অর্থাৎ: আমলের প্রতিদান ধ্বংস হওয়ার দিক থেকে দুনিয়ায় ভোগ-বিলাস ও খ্যাতির পেছনে ব্যয় করা সম্পদ হলো সেই ফলবান ক্ষেতের মতো, যা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শীতল বাতাসে ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে মালিকেরা তার কোনো উপকার লাভ করতে পারে না। (তাফসীর আল-নাসাফী: ১/২৮৫) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১৬-১১৭) আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। ১১৬ নং আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) যারা এই দুনিয়াতে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে অহংকারের সাথে অবৈধ কাজে ব্যবহার করে, কখনও গোপনে, কখনও প্রকাশ্যভাবে ইসলামকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য, তাদের সেই ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি আল্লাহর ক্রোধ থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা এ সত্যকে কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। যেমন:
﴿وَاتَّقُوا يَوْماً لا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئاً﴾ [سورة البقرة: ৪৮].
অর্থাৎ: “সেই দিনের জন্য সতর্ক থাকো, যেদিন একজন অন্য জনের জন্য কোন কাজে আসবে না” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ৪৮) ।
﴿يَوْمَ لا يَنْفَعُ مالٌ وَلا بَنُونَ﴾ [سورة الشعراء: ৮৮].
অর্থাৎ: “যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকার দেবে না” (সূরাতু আশ-শুয়ারা: ৮৮) । এ ছাড়াও সূরাতু আলে-ইমরানের ৯১ এবং সূরাতু সাবা এর ৩৭ নাম্বার আয়াতদ্বয়ে একই বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে।
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, যারা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে অবৈধ কাজে ব্যবহার করে, তারা জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে।
(গ) এই আয়াতে বিশেষভাবে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ মানুষ কখনও নিজের জন্য ধন দিয়ে মুক্তি পেতে চেষ্টা করে, আবার কখনও সন্তানদের সাহায্যের আশা রাখে; তারা প্রিয় আত্মীয়দেরকে সবচেয়ে কাছের মনে করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৫১) ।
অতএব, ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি মানুষের হাতে আল্লাহর অস্থায়ী দান। এগুলো সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তি নিজস্ব অধিকার হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। এই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি অহংকার বা অবৈধ কাজে ব্যবহার করলে তা কোনো উপকারে আসে না এবং কিয়ামতের দিনে কোনো সার্থকতা বয়ে আনে না। সঠিক ব্যবহারে ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করা যায়, যেমন দরিদ্র ও অভাবীদের সাহায্য করা, জাকাত ও সাদাকা প্রদান। সন্তান-সন্ততিকে ন্যায় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করাও গরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে, অহংকার, রিয়া, খ্যাতি অর্জন বা ইসলামের পথে বাধা সৃষ্টির জন্য ধন ও সন্তান ব্যবহার করা বরদস্তযোগ্য নয়।
২। ১১৭ নং আয়াতে দুইটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:
(ক) ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যদি আল্লাহ প্রদত্ব সীমার বাহিরে, সয়তানী ও অবৈধ কাজে ব্যয় করা হয়, তাহলে তার ক্ষতি কিভাবে হয়, তা একটি উপমার মাধ্যম পেশ করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, খ্যাতি ও অহংকারের পিছনে ব্যয়কৃত সম্পদ সেই ফসলি ক্ষেতের মতো, যা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শীতল বাতাসে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে, ক্ষেতের মালিক তার কোনো উপকার পায় না। অনুরুপভাবে, যারা সম্পদের মালিক তারাও সেই ব্যয় থেকে কিয়ামতের দিনে কোন সার্থকতা লাভ করতে পারে না। (আইসার, জাযায়েরী: ১/৩৬৪)।
(খ) কাফেরদের খরচ-অনুদান গ্রহণ না করে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি কোনো অবিচার করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি অবিচার করেছে; কারণ তারা এগুলো এমন সব কারণে পেশ করেছে যা আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হওয়ার যোগ্যতা নষ্ট করে দেয়। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩৩৮) ।

আয়াতদ্বয়ের আমল:
(ক) দুনিয়ার খ্যাতি, দম্ভ বা মানুষের প্রশংসার জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান-সদকা করতে হবে।
(খ) নিয়ত নষ্ট হলে আমল বরবাদ হয়ে যায়, তাই প্রতিটি আমল করার সময় অন্তরে খাঁটি নিয়ত করতে হবে।
(গ) কাফের ও মুনাফিকরা যেমন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির ওপর ভরসা করেছিল, মুসলমানকে সেরূপ ভরসা না করে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।
(ঘ) আল্লাহ তায়ালা কারো প্রতি কখনও যুলম করেন না, এ কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১৩-১১৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ঈমানদার আহলে কিতাব: সৎকর্ম, প্রতিদান ও সম্মান

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿لَيْسُوا سَوَاءً مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَائِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ (113) يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَأُولَئِكَ مِنَ الصَّالِحِينَ (114) وَمَا يَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ يُكْفَرُوهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ (115)﴾ [آل عمران: 113-115].

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: ঈমানদার আহলে কিতাব: সৎকর্ম, প্রতিদান ও সম্মান

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১১৩। আহলে কিতাবের মধ্যে একটি দল ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা অন্যদের সমান নয়। তারা রাত্রিকালে সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর আয়াতাসমূহ তিলাওয়াত করে ।
১১৪। তারা আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে এবং তারা কল্যাণকর কাজে তৎপর থাকে। মূলত তারাই নেক্কারদের অন্তর্ভূক্ত।
১১৫। আর তারা যে ভালো কাজ করে তা কখনও অস্বীকার করা হবে না। আর আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।

আায়াতাবলীর ভাবার্থ:
আহলে কিতাব সবাই সমান নয়। তাদের মধ্যে একটি দল রয়েছে যারা মোহাম্মদের (সা.) প্রতি ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন- আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম, সা’লাবাহ (রা.) প্রমুখ। তারা রাতে ইশা ও তাহাজ্জুদ সালাতে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে, তাঁর সম্মুখে বিন¤্র ও ধ্যানমগ্ন থাকে, এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ ভক্তি প্রদর্শন করে। তারা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যও প্রার্থনা করে।
এই সৎকর্মপরায়ণরা শুধু আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করে না, বরং তারা মানুষের কল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তারা সৎকর্ম প্রচার করে, অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর পথে সকলের জন্য উদাহরণ স্থাপন করে। তাদের জীবন আল্লাহর হেদায়াতের প্রতিফলন।
যে কোনো সৎকর্ম তারা সম্পন্ন করে, তা কখনো বৃথা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতিটি নেক কাজকে স্বীকৃতি দেন এবং তাদের প্রতি অনন্ত পুরস্কার নিশ্চিত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও মুত্তাকীদের প্রতি সর্বদা সদয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬২-৩৬৩, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪৮-৪৯, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৪, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৫) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أُمَّةٌ قَائِمَةٌ﴾ ‘প্রতিষ্ঠিত জাতি’ আয়াতাংশের উদ্দেশ্য কী?
এ প্রসঙ্গে তাফসীরকারকদের অভিমত নিম্নরূপ:
(ক) ইবনু কুতাইবা (রহ.) বলেন: “আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবিচল থাকা একটি দল।” (গরীব আল-কোরআন: ১/৯৭)।
(খ) আবু বকর আল-জাযায়িরী (রহ.) বলেন: “ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি দল।” (আইসার আল-তাফাসীর, ১/৩৬২) ।
যদিও শব্দগতভাবে এ দুই ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, বাস্তবে তাদের মর্মগত দিক থেকে কোনো বিরোধ নেই।
﴿يَسْجُدُونَ﴾ ‘তারা সাজদা করে’ আয়াতাংশের অর্থ কী?
এ বিষয়ে তাফসীরকারকদের কাছ থেকে দুটি অভিমত পাওয়া যায়:
(ক) অধিকাংশ তাফসীরকারক বলেন, এর অর্থ হলো- তারা সালাত আদায় করে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৩৪; আইসার আল-তাফাসীর: ১/৩৬২) ।
(খ) আবার কিছু তাফসীরকারকের মতে, আয়াতাংশটি তার বাহ্যিক অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ- তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনে সাজদায় লিপ্ত হয়। (তাফসীর আল-বায়ান ফাউন্ডেশন: ১৪৬) ।
অতএব, উভয় অর্থ গ্রহণ করলেও আয়াতের মূল উদ্দেশ্যের সাথে কোনো সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি হয় না।
﴿فَلَنْ يُكْفَرُوهُ﴾ ‘তা কখনও অস্বীকার করা হবে না’ আয়াতাংশ দ্বারা কী উদ্দেশ্য?
তাফসীরকারকদের নির্ভরযোগ্য মত হলো: এ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তাদেরকে সৎকর্মের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করা হবে না; বরং তাদের প্রতিটি সৎকর্মের পূর্ণ সাওয়াব ও প্রতিদান তাদেরকে প্রদান করা হবে। (আইসার আল-তাফাসীর, আল-জাযায়িরী: ১/৩৬২) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এর আগে (১১-১২) আয়াতে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের নিন্দনীয় গুণাবলি, কুৎসিত কার্যকলাপ এবং তাদের মন্দ কাজের কারণে প্রাপ্য শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর উল্লেখিত আয়াতসমূহে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা সবাই একরকম নয়; বরং তাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ আছেন, যারা উত্তম চরিত্র ও সুন্দর গুণাবলিতে ভূষিত। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৩৫) ।

(১১৩-১১৫) আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আবি হাতিম, তাবরানী ও ইবনু মুনদাহ সাহাবাদের প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন: যখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম, সা‘লাবাহ ইবনু সা‘না, উসাইদ ইবনু সা‘না, আসাদ ইবনু উবাইদ এবং তাদের সঙ্গে যারা ইয়াহুদিদের মধ্যে থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারা ঈমান আনল, সত্যকে স্বীকার করল এবং ইসলামের প্রতি আগ্রহী হলো, তখন ইয়াহুদিদের আলেম ও কাফেররা বলল: “মুহাম্মদ (সা.)-এ ঈমান এনেছে এবং তাঁকে অনুসরণ করেছে কেবল আমাদের সমাজের নিকৃষ্ট লোকেরা। যদি তারা উত্তম হতো, তবে তারা নিজেদের পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করত না।” এ প্রসঙ্গে আল্লাহ ১১৩ নাম্বার আয়াত অবতীর্ণ করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল: সুয়ূতী: ৬৭) ।
ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে: একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজ আদায় করতে দেরি করে ফেললেন। অতঃপর বের হয়ে মসজিদে গিয়ে দেখলেন, লোকেরা নামাজের অপেক্ষায় বসে আছে। তখন তিনি বললেন: “জেনে রেখো, এই সময়ে তোমাদের ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীরা আল্লাহকে স্মরণ করছে না”। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা (১১৩-১১৫) আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। (লুবাব আল-নুক‚ল: সুয়ূতী: ৬৭) ।

আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১১৩ ও ১১৪ নং আয়াত থেকে নিম্নের বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়:
(ক) ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো- তার দুয়ার সর্বদা সকলের জন্য উন্মুক্ত। জাতি, ধর্ম কিংবা দেশের বিভাজন সেখানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। যে-ই হোক না কেন, আন্তরিক আকাক্সক্ষায় যদি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়, তবে সে হয়ে ওঠে মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতসমূহে আহলে কিতাবের সেইসব সৌভাগ্যবানদের সম্মানিত করেছেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করে সত্যকে বরণ করেছেন, এবং তাঁদেরকে ঘোষিত করেছেন সৎকর্মপরায়ণ হিসেবে। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا ‌وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ [سورة البقرة: ৬২].
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, আর যারা ইহুদি, খ্রিস্টান ও সাবিয়ান, এদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে প্রতিদান। আর তাদের উপর কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ৬২)।
(খ) উল্লেখিত আহলে কিতাব যে ৬টি কাজ করে আল্লাহর কাছে সম্মানিত ও সৎকর্মপরায়ণ হয়েছেন, তা হলো-
ক. সর্বক্ষেত্রে দ্বীনের উপর অটল থাকা।
খ. রাতে কোরআন তেলাওয়াত করা।
গ. রাতের শেষ ভাগে তাহজ্জুদ সালাত আদায় করা।
ঘ. আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আখেরাতের প্রতি ঈমান স্থাপন করা।
ঙ. সৎকর্মের আদেশ করা এবং অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করা।
চ. কোন ধরণের অলসতা ছাড়া আগ্রহের সাথে কল্যাণ কাজে আত্মনিয়োগ করা।
(তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪৮) ।
২। কারো হৃদয়ে এ সন্দেহের অবকাশ রাখে না যে, আহলে কিতাব পূর্বে ভিন্ন ধর্মে থাকার কারণে তাঁদের সৎকর্ম আল্লাহর দরবারে অগ্রহণযোগ্য হবে। বরং সত্য হলো- যেই হোক না কেন, যদি সে অন্য ধর্মের অন্ধকার ত্যাগ করে ইসলামের আলোয় আত্মসমর্পণ করে, এবং ইসলামী বিধানসমূহকে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, তবে তার প্রতিটি সৎকর্ম আল্লাহর নিকট মহিমান্বিতভাবে কবুল হয়। এ সত্যকে সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে কুরআনের অন্য আয়াতে:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ﴾ [سورة التوبة: ১২০].
অর্থাৎ: “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মুহসিন বান্দাদের প্রতিদান নষ্ট করেন না” (তওবাহ: ১২০) ।
৩। কুরআনে বহু জায়গায় আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কথা বলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভুল ও বিরোধিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন দেখিয়েছে- তারা ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি কেমন আচরণ করেছে। সাধারণভাবে তাঁদের মধ্যে ইসলামবিরোধী মনোভাব, ষড়যন্ত্র ও প্রতিহিংসা দেখা যেত।
ইহুদিরা প্রকাশ্যে ও গোপনে ইসলাম এবং নবী করীম (সা.)-এর শত্রুতা করেছে। তারা একজোট হয়ে ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়েছে। অন্যদিকে খ্রিস্টানরা সবাই এক রকম ছিল না। কেউ কেউ সত্যকে মেনে নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কেউ আবার দ্বিধায় ছিল, কখনো কাছাকাছি এসেছে, আবার কখনো দূরে সরে গিয়েছে। তবে তাঁদের অনেকেই ইসলামকে মানেনি, কিন্তু সরাসরি ক্ষতিও করেনি।
এই অবস্থার ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُمْ مَوَدَّةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ (৮২) وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ (৮৩)﴾ [سورة المائدة: ৮২-৮৩].
অর্থাৎ: “ঈমানদারদের প্রতি সবচেয়ে বড় শত্রু তুমি দেখতে পাবে ইহুদি ও মুশরিকদেরকে। আর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেখতে পাবে খ্রিস্টানদেরকে। কারণ, তাদের মধ্যে আছে আলেম ও সাধু-সন্ন্যাসী, এবং তারা অহংকারী নয়। যখন তারা রাসূলের কাছে কুরআন শুনে, তখন সত্যকে চিনে তাদের চোখ অশ্রæসজল হয়ে যায়। তারা বলে- হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ঈমান এনেছি, আমাদেরকে সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও” (সূরাতু আল-মায়িদাহ:৮২-৮৩) । (তাফসীর আল-কোরআন লিল কোরআন, আব্দুল কারীম আল-খাতীব: ২/৫৬০) ।

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) একজন মুসলিমকে ‘সালিহ’ হতে হলে দ্বীনের উপর অটল থেকে রাতে কুরআন তিলাওয়াত ও তাহাজ্জুদ আদায় করা, আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা, সৎকর্মে উৎসাহ দেওয়া ও অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখা এবং অলসতা ছেড়ে দিয়ে আগ্রহভরে কল্যাণকাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
(খ) অন্তরে এ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা কারো সৎকর্ম কখনোই নষ্ট করেন না, যতক্ষণ না সে স্পষ্ট শিরক ও কুফরে নিমজ্জিত হয়।

 

সূরাতু আলে-ইমরানের (১০-১২) আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মুসলিম জাতির শ্রেষ্ঠত্বের উৎস এবং ইহুদী সম্প্রদায়ের লঞ্চনার কারণ।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ (110) لَنْ يَضُرُّوكُمْ إِلَّا أَذًى وَإِنْ يُقَاتِلُوكُمْ يُوَلُّوكُمُ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنْصَرُونَ (111) ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوا إِلَّا بِحَبْلٍ مِنَ اللَّهِ وَحَبْلٍ مِنَ النَّاسِ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الْمَسْكَنَةُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (112) ﴾ [آل عمران: 110-112].

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: মুসলিম জাতির শ্রেষ্ঠত্বের উৎস এবং ইহুদী সম্প্রদায়ের লঞ্চনার কারণ।

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১১০। তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠতম জাতি, যাদেরকে মানবজাতির জন্যে বের করা হয়েছে, তোমরা ভালো কাজের আদেশ দিবে, মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে । আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনতো, তাহলে অবশ্যই তা তাদের জন্য উত্তম হতো । তাদের মধ্যে কিছু ঈমানদার, তবে তাদের অধিকাংশই ফাসিক।
১১১। তারা তোমাদের কোন ক্ষতি কখনও করতে পারবে না সামান্য কষ্ট দেওয়া ছাড়া, আর যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে তারা পিছু হটবে, অতঃপর তাদেরকে কোন ধরণের সাহায্য করা হবে না।
১১২। যেখানেই থাকুক না কেন তাদের উপর লাঞ্চনা অবধারিত করা হয়েছে, তবে তারা আল্লাহর প্রতিশ্রæতি থাকলে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকলে ভিন্ন কথা। আর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহর গযব নিয়ে এবং তাদের উপর দারিদ্র্য অবধারিত করা হয়েছে । এর কারণ তারা আল্লাহর আয়াতাবলীকে অস্বীকার করতো এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতো। এর কারণ হলো তারা নাফরমানী করেছে, আর তারা সীমালঙ্ঘন করেছে।

আায়াতাবলীর ভাবার্থ:
মুসলিম উম্মাহর বিশেষ মর্যাদা হলো: তারা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি যাদেরকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা নিচের চারটি বিষয় যতদিন পালন করবে, ততদিন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে:
(ক) মানুষের কল্যানে কাজ করা।
(খ) তাদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা।
(গ) তাদেরকে অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত রাখা।
(ঘ) একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা।
ইহুদি ও খ্রিস্টানরা যদি আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম ও তার ভাই এবং সালাবা ইবনু সাঈদ ও তার ভাই এর মতো সত্যিকারভাবে রাসূলুল্লাহর (সা.) রিসালাতের প্রতি ঈমান আনতো, তাহলে সেটিই তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। তবে তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু সালামদের মতো সৎ ও বিশ্বাসীর সংখা খুবই কম; তাদের বেশিরভাগই সীমা লঙ্ঘনকারী।
অতঃপর মুসলিমদেরকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, ইহুদিদের বেশীর ভাগ ফাসিক হলেও তারা মুসলমানদেরকে বড় কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের ক্ষতি সীমিত ও সাময়িক হবে। যদি তারা মুসলিমদের বিরদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করতে আসে, তবে তারা পরাজিত হবে এবং কোন সাহায্যও পাবে না। কারণ আল্লাহর সাহায্য মুসলমানদের সঙ্গে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমান, আমল এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে ঐক্য বজায় রাখবে।
ইহুদিদের উপর অপমান, লাঞ্ছনা ও নিঃস্বতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা যেখানেই থাকুক না কেন, এসব থেকে মুক্তি পাবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর সঙ্গে সৎভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলবে বা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। তাদের এই দুরবস্থার কারণ হলো:
(ক) তারা আল্লাহর বিধান অমান্য করেছে।
(খ) তারা নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে।
(গ) তারা সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহে লিপ্ত হয়েছে।
(ঘ) তারা পাপ ও অন্যের প্রতি যুলমে লিপ্ত হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬০-৩৬১, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪১, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৪, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৪) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿كُنْتُمْ﴾ ‘তোমরা ছিলে’, অধিকাংশ তাফসীরকারকদের মতে,
(ক) ‘কুনতুম’ শব্দটি দ্বারা উম্মতে মোহাম্মদী সকলকে সম্বোধন করা হয়েছে। (যাদ আল-মাসীর, ইবনু আল-জাওযী: ১/৩১৪) ।
(খ) অত্র শব্দটি আয়াতে ‘পরিপূর্ণ অর্থবোধক ক্রিয়া’ হিসেবে এসেছে, যার অর্থ সংগঠিত হওয়া ও অস্তিত্ব লাভ করা। আয়াতের অর্থ দাড়ায়, হে উম্মতে মোহাম্মদী! তোমরা সর্বোত্তম জাতি হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করেছ বা সংগঠিত হয়েছ। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৩) ।
﴿بِحَبْلٍ مِنَ اللَّهِ﴾ ‘আল্লাহ রজ্জু’, আয়াতাংশ দারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে তাফসীরকারকদের নির্ভরযোগ্য মত হলো: আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, অর্থাৎ: ইসলাম গ্রহণ করা। আয়াতের অর্থ হবে: তারা ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের উপর থেকে সকল লঞ্চনা ও অপমান দুর করা হবে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১১২) ।

﴿حَبْلٌ مِنَ النَّاسِ﴾ ‘মানুষের রজ্জু’, আয়াতাংশ দারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে তাফসীরকারকদের নির্ভরযোগ্য মত হলো: কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, অর্থাৎ: শান্তি চুক্তি করা। আয়াতের অর্থ হবে: তারা কোন মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হলে তাদের উপর থেকে সকল লাঞ্চনা ও অপমান দুর করা হবে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১১২) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
প্রথমত: পূর্বের আয়াতাবলীতে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করার এবং তাঁর দ্বীনের রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিলেন এবং তারা তা পালন করল। এরপর তিনি তাদেরকে একটি সংগঠিত জামাআত গঠনের নির্দেশ দিলেন, যারা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা এটিও বাস্তবায়ন করল। অতঃপর উল্লেখিত আয়াতাবলীতে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে একটি মহান সুসংবাদ দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে “তোমরা মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছো”। সুতরাং পূর্বের আয়াতাবলীর সাথে উল্লেখিত আয়াতাবলীর সম্পর্ক স্পষ্ট। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৬০) ।
এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) মুমিনদেরকে তাঁদের মর্যাদা ও দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং গোটা মানবতার কল্যাণের জন্য প্রেরিত একটি উত্তম জাতি; যারা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে, অন্যায় দমন করবে এবং মানুষকে আলোর দিকে আহ্বান জানাবে।
দ্বিতীয়ত: ১০৬ নাম্বার আয়াতে কিয়ামতের দিন যাদের মুখ মলিন হবে, তাদের শাস্তির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং ১০৭ নাম্বার আয়াতে ঐ দিন যাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তাদের পুরস্কারের বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আর উল্লেখিত আয়াতাবলীতে তারা যে আমলের কারণে কিয়ামতের দিন লাঞ্চিত ও পুরস্কৃত হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং উল্লেখিত আয়াতের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক স্পষ্ট। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৩) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের ১১০ ও ১১১নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইকরিমাহ ও মুকাতিল (রহ.) বলেন: সূরা আলে ইমরানের ১১০নং আয়াত উবনু মাসউদ, উবাই ইবনু কা‘ব, মু‘আয ইবনু জাবাল এবং সালিম সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। বিস্তারিত ঘটনা হলো: ইহুদি ধর্মাবলম্বী মালিক ইবনু আস-সাইফ এবং ওহাব ইবনু ইয়াহুযা তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেছিল: “তোমরা যে দ্বীনের দিকে আমাদের ডাকছ, আমাদের ধর্ম তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমরাই তোমাদের তুলনায় উত্তম ও মর্যাদাবান”। এই অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের বক্তব্য খন্ডন করে এবং মুমিনদের মর্যাদা তুলে ধরে ১১০নং আয়াত অবতীর্ণ করেন। (আসবাবুন নুযূল, ওয়াহিদী: ১/১২১) ।
মুকাতিল (রহ.) বলেন: ইহুদিদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি, যেমন: কা‘ব, ইয়ুহান্না, নু‘মান, আবূ রাফি‘, আবু ইয়াসির এবং ইবনু সূরাইয়া আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের ওপর চরম আক্রমণ ও অপমানমূলক আচরণ করে বসে। তাঁদের ইসলাম গ্রহণকে কেন্দ্র করে তারা বিদ্বেষ প্রদর্শন করে এবং মানসিক কষ্ট দেয়। তখনই আল্লাহ তা‘আলা ১১১নং আয়াত অবতীর্ণ করেন। (আসবাবুন নুযূল, ওয়াহিদী: ১/১২২) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১০-১১২) আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১১০ নং আয়াত থেকে নিম্নের বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, উম্মতে মোহাম্মদী চারটি বিষয় পালন করলে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে:
(ক) মানুষের কল্যানে কাজ করা।
(খ) তাদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা।
(গ) তাদেরকে অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত রাখা।
(ঘ) একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান গ্রহণ করা। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৪) ।
(খ) আয়াতের দ্বিতীয় অংশে ইহুদী-খ্রিষ্টানদেরকে ইসলামের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারাও যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মোহাম্মদের (সা.) প্রতি ঈমান গ্রহণ পূর্বক উল্লেখিত সকল বিষয়গুলো মেনে চলতো, তবে তারাও আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে স্বীকৃত হতো। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৬) ।
(গ) আয়াতের শেষাংশে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ: তাদের সকলেই কাফির এমন নয়, বরং তাদের মধ্য থেকে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মোহাম্মদের (সা.) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে খাটি ঈমানদারে পরিণত হয়েছে। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম এবং সালাবা ইবনু সাঈদ। কোনো ধর্মই এমন নেই যেখানে চরমপন্থী, মধ্যপন্থী এবং অবাধ্য-অপরাধপ্রবণ মানুষ নেই। সাধারণত কোনো ধর্মের সূচনাকালে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা হয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলে অনেকেই ফিসক ও অবাধ্যতায় জড়িয়ে পড়ে। এ প্রসংগে সূরা হাদীদে বলা হয়েছে:
﴿أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَما نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ، وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتابَ مِنْ قَبْلُ فَطالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ، فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فاسِقُونَ﴾ [سورة الحديد: ১৬].
অর্থাৎ: “মুমিনদের জন্য কি এখনও সময় হয়নি যে, তাদের অন্তরসমূহ আল্লাহর স্মরণে ও নাযিলকৃত সত্যের কারণে বিন¤্র হয়ে যাবে? আর তারা যেন তাদের মতো না হয়ে যায়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল; অতঃপর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গিয়েছিল, আর তাদের অনেকেই ছিল অবাধ্য” (সূরাতু আল-হাদীদ: ১৬) । (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৩১) ।
উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তায়ালার বাণী অনুযায়ী কোন একটি জাতি শ্রেষ্ঠ হওয়ার মূল মানদন্ড হলো চারটি: মানুষের কল্যাণে কাজ করা, তাদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা, অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত রাখা এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান স্থাপন করা। অতএব যে জাতি এই চারটি বিষয়কে মেনে নিবে, তারা শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪৪) ।
২। ১১১নং আয়াত ও ১১২নং আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তাআলা মুসলিম জাতিকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তারা পূর্বোক্ত চারটি গুণে গুণান্বিত হয়, তবে তারা শ্রেষ্ঠ জাতি হওয়ার পাশাপাশি আরও চারটি বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ হবে:
(ক) ইয়াহূদীরা সামান্য কষ্ট দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
(খ) মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে তারা পরাজিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাবে।
(গ) কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের উপর তারা কখনো স্থায়ী বিজয় অর্জন করতে পারবে না।
(ঘ) ইহুদীরা আল্লাহর সাথে সৎভাবে সম্পর্ক গড়ে না তোললে এবং কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ না হলে কিয়ামত পর্যন্ত তারা লাঞ্চিত হবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬০) ।
আল্লাহ তায়ালার চৌদ্দশত বছর পূর্বের ভবিষ্যতবাণী যুগে যুগে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ইহুদী জাতির ষড়যন্ত্র ও অপকর্মের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। ইসরাঈল পৃথিবীর একমাত্র ইহুদী রাষ্ট্র। ইউরোপ থেকে বহিষ্কৃত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদী নিধনযজ্ঞের পর তারা ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে ইউরোপ থেকে পালিয়ে ফিলিস্তিনে ঠাই নেয়। সেখানে নানা অপকর্ম ও মুসলিম ফিলিস্তিনিদের প্রতি যুলম ও অকৃতজ্ঞতার দরুন তারা আজ সারা পৃথিবীর কাছে লাঞ্চিত ও ঘৃণিত জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
৩। ১১২নং আয়াতের শেষাংশে ইহুদিদের অপমান, লাঞ্ছনা ও নিঃস্বতায় পতিত হওয়ার চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:
(ক) আল্লাহর বিধান অমান্য করা।
(খ) নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা।
(গ) সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহে লিপ্ত হওয়া।
(ঘ) পাপ ও মানুষের প্রতি যুলুম করা। (আইসার আল-তাফাসীর: ১/৩৬১) ।

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) মুসলিম জাতি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অটুট রাখতে চাইলে কর্তব্য হলো- মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা, কল্যাণকর কাজে মানুষকে আহ্বান করা, অকল্যাণকর কার্য থেকে নিবৃত করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অকৃত্রিম ঈমানের মজবুত দুর্গ গড়ে তোলা।
(খ) দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে ইসলামবিরোধী শক্তি যতই প্রয়াস চালাক না কেন, তারা মুসলিম জাতির কোনো মৌলিক ক্ষতি করতে সক্ষম নয়; তাদের সাধ্য কেবল অস্থায়ী ও সামান্য জাগতিক বিপত্তি সৃষ্টি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
(গ) ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য করণীয় হলো- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা, অথবা মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। অন্যথায়, তারা কিয়ামত পর্যন্ত মানবসমাজে অপমান ও ঘৃণার বোঝা বয়ে বেড়াতে বাধ্য হবে।

সূরাতু আলে- ইমরানের (১০৪-১০৯) আয়াতাবলীর তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ঐক্যের আলো, অনৈক্যের অন্ধকার: একটি দাওয়াতি প্রতিফলন।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (104) وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ (105) يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ (106) وَأَمَّا الَّذِينَ ابْيَضَّتْ وُجُوهُهُمْ فَفِي رَحْمَةِ اللَّهِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (107) تِلْكَ آيَاتُ اللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِالْحَقِّ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعَالَمِينَ (108) وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِلَى اللَّهِ تُرْجَعُ الْأُمُورُ (109)﴾ [آل عمران: 104-109]

 

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: ঐক্যের আলো, অনৈক্যের অন্ধকার: একটি দাওয়াতি প্রতিফলন।

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১০৪। আর তোমাদের মধ্যে একটি দল থাকা উচিৎ, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে এবং নিষেধ করবে অসৎকাজ থেকে, আর তারাই সফলকাম।
১০৫। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পরে মতবিরোধ করেছে এবং বিভক্ত হয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা আযাব।
১০৬। সেদিন অনেক চেহারা সাদা হবে এবং কালো হবে অনেক চেহারা, আর যাদের চেহারা কালো হবে, তাদেরকে বলা হবে: তোমরা কি তোমাদের ঈমানের পরে কুফরী করেছিলে? অতএব আযাব ভোগ করো, কারণ তোমরা কুফরি করতে।
১০৭। আর যাদের চেহারা সাদা হবে, তারা জান্নাতের মধ্যে থাকবে, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।
১০৯। এগুলো আল্লাহর নিদর্শন, যা আমি যথাযথভাবে তোমার উপর তেলাওয়াত করছি, আল্লাহ সৃষ্টিকুলের প্রতি যুলম করতে চান না।
১০৯। আর যা আছে আকাশে এবং যা আছে যমীনে, সবকিছু আল্লাহরই জন্যে, এবং সকল বিষয় আল্লাহরই দিকে ফিরে যাবে।

আয়াতাবলীর ভাবার্থ:
সত্য ও ঐক্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে তখনই, যখন একটি জাতি মানুষের কল্যাণে কাজ করে, সৎ কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় থেকে বিরত রাখে। এজন্য আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা এমন একটি জাতি হয়, যারা মানুষকে আহ্বান করে এমন সব বিষয়ে যা দীন ও দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং গোনাহ থেকে বিরত রাখে। এমন জাতিই পূর্ণ সফলতা অর্জনকারী।
অতঃপর মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে যেন তারা ইহুদী-খ্রিস্টানদের মতো না হয়, যারা সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব অবহেলা করেছিল। অথচ এই দুটি কাজ মানুষের মধ্যে একতা সৃষ্টি করে এবং সবাইকে সঠিক পথ ও ন্যায়ের ধারায় প্রতিষ্ঠিত রাখে। তারা যখন এই দায়িত্ব পালন বন্ধ করল, তখন তাদের মধ্যে বিভেদ জন্মালো। বিভিন্ন দল ও মতের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়লো, যদিও তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে। তারপরও তারা দ্বীনের ব্যাপারে মতভেদে লিপ্ত হলো। এমন বিভক্ত ও দ্বিধান্বিত লোকদের জন্য রয়েছে এক ভয়ানক শাস্তি।
এই শাস্তি হবে সেই দিন, যে দিনে বিশ্বাসীদের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হবে, আর অবিশ্বাসীদের মুখ দুঃখ ও হতাশায় কালো হয়ে যাবে। সেদিন অবিশ্বাসীদের তিরস্কার করে বলা হবে: “তুমি কি তখনও অবিশ্বাস করেছিলে, যখন তোমার অন্তর ঈমান গ্রহণে স্বাভাবিকভাবেই প্রস্তুত ছিল? অথচ তোমাদের কাছে সত্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে?”
অন্যদিকে, যারা ঈমান এনেছিল এবং সৎ কাজ করেছিল, তাদের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল থাকবে সেই সুখবর শুনে। তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত আছে, আল্লাহর দয়ায় তারা সেখানে চিরকাল থাকবে, কখনো সেখান থেকে বের করা হবে না।
এই সব বিষয়, যেমন: জান্নাত, জাহান্নাম, বিচারের দিন ইত্যাদি, আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠানো আয়াত। তিনি এসব তাঁর রাসূলের মাধ্যমে সত্য ও নিশ্চয়তার সঙ্গে পৌঁছে দেন। আল্লাহ কখনো কারো প্রতি অন্যায় করেন না, নেক আমলের কোনো অংশ হীন করে না,
কারণ তিনি ন্যায় বিচারক, যিনি কখনো অন্যায় করেন না।
আকাশ-পাতালসহ সমস্ত কিছু আল্লাহর মালিকানাধীন। তিনি একমাত্র স্রষ্টা ও সৃষ্টির পরিচালনাকারী। সব সৃষ্টির শেষ গন্তব্য তাঁরই কাছে। সেখানে প্রত্যেকে তার আমলের সঠিক প্রতিদান পাবে, ঠিক যেমন সে প্রাপ্য। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৫৭-৩৫৮, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৩৩-৩৫, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৩-৬৪, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৩-১০৪) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ﴾ ‘তোমাদের হওয়া উচিৎ’, আয়াতাংশের অর্থ কি? এ সম্পর্কে দুইটি মত রয়েছে:
(ক) ‘মিন’ শব্দটি বর্ণনা বুঝাতে এসেছে, আয়াতাংশের অর্থ হবে: “তোমাদের হওয়া উচিৎ”।
(খ) ‘মিন’ শব্দটি অংশ বুঝাতে এসেছে, তখন আয়াতাংশের অর্থ হবে: তোমাদের মধ্যে একটি অংশের হওয়া উচিৎ।
প্রথম মত অনুযায়ী, কল্যাণের দিকে আহ্বান জানানো এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার দাওয়াতি দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরজে আইন (ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য পালনীয়)। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি যতটুকু ভালো-মন্দ জানে এবং বুঝে, সে ততটুকু অনুযায়ী অন্যকে দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব রাখে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় মত অনুসারে এই দাওয়াতি কাজটি ফরজে কিফায়া (সমষ্টিগত দায়িত্ব)। অর্থাৎ, এটি সবার উপর ফরজ নয়; সমাজের কিছু লোক যদি তা পালন করে, তাহলে অন্যদের দায়মুক্তি ঘটে। কারণ, এই কাজের জন্য এমন ব্যক্তির প্রয়োজন, যারা সৎ ও অসৎ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে এবং দাওয়াতি কার্যক্রম কীভাবে ধাপে ধাপে সম্পাদন করতে হয়, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা রাখে। (তাফসীর আল-নাসাফী: ১/২৮০) ।

﴿الْمَعْرُوفِ﴾ ‘ভালো কাজ’, আয়াতে ‘ভালো কাজ’ বলতে বোঝায় সেসব কাজ, যেগুলো শরীয়ত স্বীকৃত এবং যেগুলো করতে আদেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ তা ব্যক্তি বা সমাজের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৫৬) ।

﴿الْمُنْكَرِ﴾ ‘খারাপ কাজ’, ‘ভালো কাজ’ এর বিপরীত, অর্থাৎ: যেসব কাজ শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে, কারণ তা ব্যক্তি বা সমাজের জন্য ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৫৬) ।

﴿الَّذِينَ تَفَرَّقُوا﴾ ‘যারা দলবাজি করে’, আয়াতাংশে ‘যারা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: ইহুদী-খৃষ্টানগণ, কারণ তারা মতবিরোধ করতো এবং এক দল আপর দলকে কাফের বলতো। (তাফসীর আল-নাসাফী: ১/২৮১) ।
﴿رَحْمَةِ اللَّهِ﴾ ‘আল্লাহর রহমত’, এখানে ‘আল্লাহর রহমত’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: জান্নাত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৫৬) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো আল্লাহর বাণী “তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু (ধর্ম) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিভেদে পড়ো না”এর ব্যাখ্যার মতো। এখানে “আল্লাহর রজ্জু আঁকড়ে ধরো” এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে আয়াতে: “তোমাদের মধ্যে এমন এক দল হোক” বলে, আর “বিভেদে পড়ো না” এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে আয়াতে: “তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা পরস্পর বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল”। আল্লাহ আমাদের কুরআন ও দ্বীন মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং মতভেদ ও বিচ্ছিন্নতা থেকে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন ঐক্য রক্ষার পথ হলো কল্যাণের দিকে আহ্বান, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৩২) ।

আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১০৪নং আয়াত থেকে নি¤েœর দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি, মুসলিম জাতির মধ্য থেকে একটি দল থাকা অবশ্যক, যারা জাতি ও জনগোষ্ঠীকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবে, ইসলামের বার্তা তাদের সামনে তুলে ধরবে এবং যদি তারা ইসলামের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করে, তাহলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। এছাড়াও, প্রত্যেক মুসলিম নগর ও গ্রামে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার জন্য নির্দিষ্ট সংস্থা বা দল থাকা আবশ্যক। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৫৮) । এবং এরা হলো এমন জাতি যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কোরআনে এসেছে:
﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ﴾ [سورة آل عمران: ১১০].
অর্থাৎ: “তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য বিশ্বে উপস্থিত করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখো”। (সূরাতু আলে-ইমরান: ১১০) ।
(খ) দুনিয়া ও আখেরাতে সফল জাতি, যে জাতি সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, সে জাতি দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হবে।
২। সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে মুসলিম জাতির মধ্যে দলাদলি ও বিভক্তির ব্যাপারে যেভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তারই একটি জোরালো তাকীদ পাওয়া যায় ১০৫ নম্বর আয়াতে। একটি জাতির ভেতর বিভাজন মারাত্মক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হওয়ার কারণে তা আল্লাহ তায়ালা চারটি ধাপে হারাম করে দিয়েছেন:
প্রথমত: ১০৪ নম্বর আয়াতে তিনি মুসলিমদেরকে ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপনের আদেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত: সরাসরি নিষেধ করেছেন দলাদলি ও বিভাজনে জড়াতে।
তৃতীয়ত: ১০৫ নম্বর আয়াতে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের বিভক্তির ইতিহাস তুলে ধরে মুসলমানদের সতর্ক করেছেন তারা যেন সেই পথ অনুসরণ না করে।
চতুর্থত: যারা বিভাজনের পথে যাবে, তাদেরকে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি প্রদান করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলো শুধু নিষেধই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তা হলো- মুসলিম জাতির ঐক্যই তাদের শক্তি, আর বিভাজনই ধ্বংসের পথ। অতএব, মুসলিম উম্মাহর উচিত দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়া নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে জীবন গঠন করা। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। (১০৬-১০৭) আয়াতদ্বয়ে নিম্নের বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়:
(ক) কিয়ামতের দিন মানবজাতি দুইটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে, একদল কাফের যাদের চেহারা পেরেশানিতে কালো হয়ে যাবে এবং আরকদল মুমিন, যাদের চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল বা সাদা হবে। এ থেকে বুঝা যায় একজন মানুষ হয়তো কাফের হবে, না হয় মুমিন হবে।সুতরাং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত মনে করেন, ঈমান এবং কুফর এই দুই স্তরের মাঝে কোন স্তর নেই, অপর দিকে মু’তাজিলা সম্প্রদায় মনে করে থাকে ঈমান ও কুফরের মাঝে আরেকটি স্তর রয়েছে। যাকে ঈমানদার বলা যায় না এবং কাফিরও বলা যায় না। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩১৮) ।
(খ) আহলে কিতাবের কুফরীর বিষয়টি ছিলো: রাসূলুল্লাহকে (সা.) রাসূল হিসেবে এবং কোরআনকে সংবিধান হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করা।
(গ) কুফরী এবং নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার কারণে তারা জাহান্নামে শাস্তি পাবে।
(ঘ) যারা কুফরী এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকবে, তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তারা জান্নাতে চিরকাল অবস্থান করবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৩৪) ।
৪। (১০৮-১০৯) নং আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) ইহুদী-খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্র ও মুসলমানদের করণীয় বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা যা কিছু কুরআনে বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে সত্য ও নির্ভুল। এই প্রসঙ্গে সূরা আন-নিসার ৮৭ ও ১২২ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
(খ) আল্লাহ তায়ালা বিনা অপরাধে কাউকে শাস্তি দেন না, তা হোক দুনিয়াতে কিংবা আখিরাতে। (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৪/১৬৯)
(গ) তিনি সকল কিছুর উপর পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান এবং সকল শক্তির উৎস, তবুও তিনি কারো প্রতি কখনোই অন্যায় বা জুলুম করেন না।
(ঘ) দুনিয়ার প্রতিটি সত্তা একদিন বিচার দিবসে আল্লাহর দরবারে ফিরে যাবে। এ বিষয়ে কুরআনে বহু আয়াতের মাধ্যমে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে।

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) মানবজাতিকে কল্যাণের পথে আহ্বান জানানো, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখাই একজন মুসলমানের অন্যতম দায়িত্ব।
(খ) ইহুদী-খ্রিস্টানদের মতো নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে মুসলিম সমাজে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা।
(গ) কিয়ামত ও হাশরের ময়দানে প্রত্যাবর্তনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
(ঘ) আল্লাহ তায়ালা কারো প্রতি বিন্দুমাত্রও জুলুম করেন না, এই বিশ্বাস অন্তর থেকে গ্রহণ করা ও দৃঢ়ভাবে ধারণ করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১০০-১০৩) আয়াতাবলীর তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: নিজকে রক্ষা এবং ইসলামের সাথে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকার নির্দেশ।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ (100) وَكَيْفَ تَكْفُرُونَ وَأَنْتُمْ تُتْلَى عَلَيْكُمْ آيَاتُ اللَّهِ وَفِيكُمْ رَسُولُهُ وَمَنْ يَعْتَصِمْ بِاللَّهِ فَقَدْ هُدِيَ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (101) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ (102) وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ (103) [سورة آل عمران: 100-103]

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: নিজকে রক্ষা এবং ইসলামের সাথে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকার নির্দেশ।

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১০০। হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবের থেকে একটি দলের অনুসরণ করো, তাহলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের ঈমানের পরে কাফের অবস্থায় ফিরিয়ে নিবে।
১০১। আর তোমরা কিভাবে কুফরী করবে? অথচ তোমরা এমন যে যাদের কাছে আল্লাহর আয়াতাবলী পাঠ করা হয় এবং তোমাদের কাছে রয়েছে তাঁর রাসূল, আর যে আল্লাহর পথ আকড়ে করবে, সে সৎপথ পাবে।
১০২। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো, আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না।
১০৩। আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো আল্লাহর নেয়ামতকে, যা তোমাদের প্রতি রয়েছে, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন, ফলে তোমরা তার দয়ায় পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা ছিলে জাহান্নামের গর্তের কিনারায়। অতঃপর তিনি তা থেকে রক্ষা করেছেন । এভাবে, আল্লাহ তোমাদের জন্যে তার আয়াতাবলী বর্ণনা করেছেন, যাতে হেদায়েত পাও।

আয়াতাবলীর ভাবার্থ:
আহলে কিতাব মুমিনদেরকে ক্ষতি ও তাদেরকে ইসলাম থেকে বিরত রাখার জন্য সর্বদা উদগ্রীব থাকে, যা পূর্বের আয়াত সহ কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়। এজন্য আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতসমূহে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার জন্য মুমিনদেরকে কয়েকটি করণীয় বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন:
(ক) মুমিনরা যেন ইহুদীদের সকল ষঢ়যন্ত্র ও ইসলাম সম্পর্কে তাদের বানোয়াট বিষয়কে এড়িয়ে চলে, তাদেরকে এড়িয়ে চলতে পারলে ঈমানদারগণ তাদের ঈমান নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারবে। অন্যথায় কুফরে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন মুমিন ঈমান গ্রহণের পর কাফির হয়ে যাওয়া আশ্চর্যজনক ও বিরল ঘটনা; কারণ তার সামনে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনানো হচ্ছে এবং তার কাছে এমন একজন রাসূল (সা.) রয়েছেন যিনি সব সময় তাকে নসিহত ও সতর্ক করছেন। এজন্য তার মনে রাখা উচিৎ আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক রাখলে সরল পথে চলা সহজ হয়।
(খ) মুমিনদের উচিৎ ইহুদীদের চক্রান্তে পা না দিয়ে আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করা এবং আমরণ ইসলামের পথে থাকা। তাহলেই তারা ঈমান ও ইসলাম নিয়ে সারা জীবন নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবে।
(গ) ইহুদীদের ষড়যন্ত্র থেকে বাচার জন্য মুমিনদের তৃতীয় করণীয় হলো: বিচ্ছিন্ন না হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামকে ধারণ করা। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থেকে ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপন আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় নেয়ামত। যে নেয়ামত তিনি মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রকে দিয়েছিলেন। তাদের দীর্ঘ দিনের শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে ভ্রাতৃত্বের প্লাটফর্মে এনে দিয়েছিলেন। এভাবে আল্লাহ তায়ালা তার নেয়ামতের কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন, যাতে তারা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নেয়ামতের মূল্যায়ন করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৫৪-৩৫৫, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৬, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৩, আল-মোন্তাখাব: ১/১০২-১০৩) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿آيَاتُ اللَّهِ﴾ ‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহ’, দ্বারা কোরআনের আয়াতসমূহকে বুঝানো হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৫৩) ।
﴿حَقَّ تُقَاتِهِ﴾ ‘তাঁকে যথার্থ ভয়’, আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করা মানুষের পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব নয়। এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রা.) রাসূলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “আমরা কীভাবে আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করব?” তখন আরেকটি আয়াত নাযিল করে বলা হয়েছে: “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু সম্ভব”। সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহকে ভয় করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- “আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞাগুলো থেকে যথাসাধ্য বেঁচে থাকা”। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৫১) ।
﴿بِحَبْلِ اللَّهِ﴾ ‘আল্লাহর রজ্জুকে’, আয়াতাংশে ‘আল্লাহর রজ্জু’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহর দীন, আর আল্লাহর মনোনিত দীন হলো- ইসলাম। সুতরাং আয়াতে ‘আল্লাহর রজ্জু দ্বারা ‘ইসলাম’ ধর্মকে বুঝানো হয়েছে। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/৯৬) ।
﴿نِعْمَتَ اللَّهِ﴾ ‘আল্লাহর নেয়ামত’, এখানে ‘আল্লাহর নেয়ামত’ দ্বারা আল্লাহ তায়ালা যে ‘আওস’ ও ‘খাযরাজ’ গোত্রদ্বয়ের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শত্রæতাকে ভুলিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করে দিলেন তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ, ভ্রাতৃত্ব হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত। এ সম্পর্কে কোরানের আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ﴾ [سورة الأنفال: ৬৩].
অর্থাৎ: “তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরি করার জন্য যমীনের সবকিছু ব্যয় করলেও তুমি তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরি করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরি করে দিলেন। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (সূরাতু আল-আনফাল: ৬৩) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
অত্র সূরার (৯৮-৯৯) নং আয়াতে মুসলিমদেরকে তাদের ধর্ম থেকে বিমুখ করার জন্য ইহুদীদের চক্রান্তের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আর অত্র আয়াতাবলীতে তাদের চক্রান্ত থেকে মুসলিমদেরকে আত্মরক্ষার জন্য কিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং পূর্বের আয়াতের সাথে অত্র আয়াতাবলীর সম্পর্ক স্পষ্ট। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৫) ।

(১০০-১০৫) নাম্বার আয়াতাবলী অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
যায়েদ ইবনু আসলাম (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন আওস ও খাযরাজ গোত্রের কিছু সাহাবিকে একসঙ্গে বসে গল্প করতে দেখে ‘শাস ইবনু কাইস’ নামক ইহুদী খুবই রাগান্বিত ও ক্ষুদ্ধ হলো। তখন সে তার সাথে থাকা এক যুবক ইহুদিকে নির্দেশ দিল: “যাও, ওদের মাঝে বসো। অতীতের ‘ইয়াওমে বুয়াথ’ এর কথা স্মরণ করিয়ে দাও। সে যুবক তাই করল। সাহাবারা সেই সব পুরনো কথাবার্তায় মেতে উঠলেন। তারা তর্কে জড়িয়ে পড়লেন এবং গর্ব করতে শুরু করলেন। এক পর্যায়ে দুই ব্যক্তি একজন আওসের (আওস ইবন কাইজি) এবং অন্যজন খাযরাজের (জাব্বার ইবন সাখর) উঠে দাঁড়াল এবং উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে লাগল। এই খবর রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে পৌঁছলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাদের মধ্যে সমাধান করে দিলেন।
উভয় পক্ষ বুঝতে পারল এটি ছিল শয়তানের প্ররোচনা এবং তাদের শত্রু ‘শাস ইবন কাইস’ এর ষড়যন্ত্র। তারা লজ্জিত হয়ে হাতের অস্ত্র ফেলে দিল, কেঁদে ফেলল এবং আওস ও খাযরাজের লোকেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। পরে তারা সবাই রাসুলুল্লাহর (সা.) কথা শুনে তার সঙ্গে শান্ত চিত্তে ফিরে গেল। এইভাবে আল্লাহ তাদের উপর থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ‘শাস ইবনু কাইস’ এর চক্রান্ত দূর করে দিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা আওস-খাযরাজ গোত্রের আনসারী সাহাবীদের সম্পর্কে (১০০-১০৫) আয়াতাবলী অবতীর্ণ করেন। (আসবাব আল-নুযূল, সুয়ূতী: ৬৭) ।

আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১০০নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) একজন মুমিন কখনও ইহুদীদের অনুসরণ করবে না।
(খ) ইহুদীদের অনুসরণ করলে সে কাফির হয়ে যাবে; কারণ তারা বিদ্বেষ বশত সর্বদা মুমিনদেরকে কাফের এ রুপান্তরিত করতে চায়।
এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার একটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَدَّ كَثِيرٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتابِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِنْ بَعْدِ إِيمانِكُمْ كُفَّاراً، حَسَداً مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِهِمْ﴾ [سورة البقرة: ১০৯].
অর্থাৎ: “অনেক ইহুদীরা বিদ্বেষের কারণে তোমাদের ঈমান গ্রহণের পর পুনরায় তোমাদেরকে কাফেরে রুপান্তরিত করতে চায়” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ১০৯) ।
এছাড়াও সূরা আলে-ইমরানের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে: মুমিনরা যেন কাফেরদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকে, অন্যথায় তাদের ধোকায় পড়ে তারা জাহিলিয়্যাতের দিকে ফিরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৪৯].
অর্থাৎ: “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি কাফেরদের অনুসরণ করো, তাহলে এরা তোমাদেরকে জাহিলিয়্যাতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, ফলে তোমরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৪৯) ।
সুতরাং একজন মুমিন ইহুদী-খৃষ্টান ও কাফের-মোশরেকদের অনুসরণ না করলে সে নিজেকে ঈমানের সাথে সংরক্ষণ করতে পারবে। অন্যথায় সেও তাদের মতো কাফের হয়ে যাবে।
২। ১০১নং আয়াত থেকে বুঝা যায় কোন মুমিনের মধ্যে দুইটি গুণ পাওয়া গেলে, সে হিদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, জীবনে কখনও কুফরীতে পতিত হবে না:
(ক) আন্তরিকভাবে বুঝে কোরআন তেলাওয়াত করা।
(খ) রাসূলুল্লাহর (সা.) অনুসরণ করা। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৬) । এ সম্পর্কে একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ، لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ” (موطأ مالك: ৩).
অর্থাৎ: “আমি তোমাদের কাছে দুইটি বিষয় রেখে গেলাম, যতক্ষন পর্যন্ত তোমরা তা মজবুতভাবে ধারণ করবে, ততক্ষণে পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাত” (মুয়াত্তা মালিক: ৩)। শরয়ী কোন মাসয়ালা নিয়ে দুই দল আলেমের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে, তা সমাধানের জন্য আল্লাহ তায়ালা কোরআন-সুন্নাহর দিকে ফিরে আসতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে সূরা নিসা এর একটি আয়াতে এসেছে:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا﴾ [سورة النساء: ৫৯].
অর্থাৎ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর অনুসরণ করো এবং তাঁর রাসূলের অনুসরণ করো ও তোমাদের মধ্যকার উলুল আমরের। যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিরোধে লিপ্ত হও, তবে তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি সত্যিকারের ঈমানদার হয়ে থাকলে তা সমাধানের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরে এসো। এটাই হলো উত্তম উপায় এবং সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতি” (সূরা নিসা: ৫৯) ।
৩। ১০২নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) ইহুদীদের চক্রান্ত থেকে বাঁচার জন্য একজন মুমিনের দ্বিতীয় করণীয় বিষয় হলো: আল্লাহর আদেশ মেনে চলা এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করা।
(খ) একজন প্রকৃত মুমিনের উচিত, সে যেন কোনো অবস্থাতেই ধর্মত্যাগ না করে এবং মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করে, এই লক্ষ্যেই জীবন-যাপন করে”। রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি দোয়া শিখিয়েছেন:
“يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِى عَلَى دِينِكَ” [سنن الترمذي: ২২৯০].
অর্থাৎ: ‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার আত্মাকে আপনার দীনের উপর অটল রাখুন” (সুনান আল-তিরমিযী: ২২৯০) ।
সয়ং আল্লাহ তায়ালা একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা কোন মুমিন প্রতিদিন পাঠ করলে সে আমরণ ঈমান থেকে বিচ্যুত হবে না। দোয়াটি হলো-
﴿رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ﴾ [سورة آل عمران: ৮].
অর্থাৎ: “হে আমাদের রব! হেদায়েত দানের পরে আমাদের অন্তরকে বক্র করে দিয়েন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন, নিশ্চয় আপনি দানশীল” (সূরাতু আলে-ইমরান: ৮) ।
৪। ১০৩নং আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) ইহুদীদের চক্রান্ত থেকে বাঁচার জন্য মুমিনদের উচিৎ ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামকে ধারণ করা।
(খ) তারা মুমিনদের সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরানোর জন্য চেষ্টায় কোন ত্রæটি করবে না, সে ক্ষেত্রে মুমিনরা যেন তাদের ষঢ়যন্ত্রে পা দিয়ে বিচ্ছিন্ন না হয়।
(গ) মুমিনদেরকে ভ্রাতৃত্ব নামক বিশাল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে আয়াতের শেষাংশে; যেই ভ্রাতৃত্বকে ভুলে গিয়ে আওস এবং খাযরাজ গোত্রদ্বয় আবারও শত্রæতার দিকে ধাবিত হয়েছিল।
(ঘ) আল্লাহ তায়ালার একটি নিয়ম হলো- মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তিনি শরয়ী বিধানকে তাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। এখানেও নির্দেশ দিয়েছেন যে, মুমিনগণ যেন আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনা ও আয়াতসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
৫। উল্লেখিত আয়াতসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, ইহুদীদের ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে নিজেদের ঈমানকে রক্ষা ও সুরক্ষিত রাখতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের উপর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আরোপ করেছেন:
(ক) ইহুদীদের ষড়যন্ত্র ও ইসলামবিরোধী মনগড়া বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
(খ) আল্লাহকে সর্বোচ্চ ভয় করে আমৃত্যু ইসলামের পথে অটল থাকা।
(গ) ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থেকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকা।
(ঘ) ইহুদীদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে দলাদলি বা বিভাজনে না জড়ানো।
(ঙ) আল্লাহর দেয়া নির্দেশনা ও আয়াতসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সঠিক পথে চলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের মুসলিম উম্মাহ আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত এই পাঁচটি করণীয় থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলেই ইহুদিদের সামনে অত্যন্ত দুর্বল ও অসহায় অবস্থায় পরিণত হয়েছে। এর পরিণতিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ মুসলিম জাতি তা প্রতিরোধ করার মতো শক্তি বা ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
৬। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সূরা আলে ইমরানের ১০২ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযোগ্যরূপে ভয় করো” নাজিল হলে, সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সাধারণ মানুষ; আল্লাহকে তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী যথার্থভাবে ভয় করা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব?”
এ কথা শুনে আল্লাহ তা’আলা সূরা তাগাবুনের ১৬ নম্বর আয়াত “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো” নাজিল করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা জানিয়ে দেন, মানুষকে তাঁর ভয় যথাসাধ্য বা সাধ্যানুযায়ীই করতে হবে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু তাফসীরকারকের মতে, সূরা আলে ইমরানের ১০২ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশ সূরা তাগাবুনের ১৬ নম্বর আয়াত দ্বারা রহিত (নাসখ) হয়ে গেছে।
তবে অধিকাংশ তাফসীরকারক বলেন, এখানে কোনো আয়াত রহিত হয়নি। বরং সূরা তাগাবুনের আয়াতটি সূরা আলে ইমরানের আয়াতের ব্যাখ্যা বা পরিপূরক হিসেবে এসেছে। (আল-তাফসীর আল-কাবীর: ৮/৩১১) ।

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) ইহুদীদের ষড়যন্ত্র ও ইসলামবিরোধী মনগড়া বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
(খ) আল্লাহকে সর্বোচ্চ ভয় করে আমৃত্যু ইসলামের পথে অটল থাকা।
(গ) ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থেকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকা।
(ঘ) ইহুদীদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে দলাদলি বা বিভাজনে না জড়ানো।
(ঙ) আল্লাহর দেয়া নির্দেশনা ও আয়াতসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সঠিক পথে চলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।
(চ) কোরআন-সুন্নাহ কে শক্তভাবে ধারণ করা।

 

সূরাতু আলে ইমরানের (৯৮-৯৯) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: আহলে কিতাবের কুফরে অবিচলতা এবং আল্লাহর পথে বাধা প্রদানের অপচেষ্টা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ شَهِيدٌ عَلَى مَا تَعْمَلُونَ (98) قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ آمَنَ تَبْغُونَهَا عِوَجًا وَأَنْتُمْ شُهَدَاءُ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (99)﴾ [سورة آل عمران: 98-99].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: আহলে কিতাবের কুফরে অবিচলতা এবং আল্লাহর পথে বাধা প্রদানের অপচেষ্টা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
৯৮। হে আল্লাহর রাসূল! বলো: হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন আল্লাহর আয়াতালীর প্রতি কুফরী করছো? অথচ আল্লাহ তোমরা যা করো, তার উপর সাক্ষী ।
৯৯। হে আল্লাহর রাসূল! বলো: হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন মুমিনদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিচ্ছো? তোমরা তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করো, অথচ তোমরা জানো। আর আল্লাহ গাফেল নয় তোমরা যা করো, তা থেকে।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
এখানে আহলে কিতাবদের তিরস্কার করে বলা হচ্ছে তারা মোহাম্মদের (সা.) রিসালাত সম্পর্কে যেসব আলামত ও নিদর্শন নিজেদের কিতাবে পেয়েছে, কোরআনে সেগুলোর যথেষ্ঠ প্রমাণ থাকা সত্তে¡ও তারা নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং কুরআনের সত্যতা অস্বীকার করেছে। আল্লাহ তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে তিনি তাদের কুফর ও ষড়যন্ত্র সব দেখছেন।
আহলে কিতাবদের আরেকটি অপরাধের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: তারা শুধু নিজেরাই হিদায়াত গ্রহণ থেকে বিরত থাকেনি, বরং যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে বা করতে চায়, তাদের পথেও বাধা দিয়েছে। তারা ইসলামের সত্যতা জেনেও সাধারণ মানুষের কাছে তা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। মূলত আল্লাহ তাদের এ ধোঁকা ও ষড়যন্ত্র থেকে গাফিল নন।
উল্লেখিত দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাবদের দুইটি অপরাধ: (ক) মোহাম্মদের (সা.) রিসালাতকে অস্বীকার করা এবং (খ) যারা তার রিসালাতকে মেনে নিতে চায় তাদেরকে বাধা দেওয়া, থেকে তাদেরকে সতর্ক করেছেন এবং রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি যেন তাদের মুখোমুখি হয়ে এই প্রশ্নগুলো করেন যাতে তারা নিজেদের অপরাধ সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সাধারণ জনগণও যেন তাদের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে পারে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৫২, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬২, আল-মোন্তাখাব: ১/১০২) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿آيَاتِ﴾ ‘নিদর্শনসমূহ’, দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? এ বিষয়ে তাফসীরকারকগণ বলেন: এর দ্বারা দুইটি বিষয়কে বুঝানো হয়েছে:
(ক) কোরআনে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুয়াতের সপক্ষে প্রমাণ ও স্পষ্ট দলীলসমূহ।
(খ) তাওরাত-ইনজীল সহ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে উল্লেখিত রাসূলুল্লাহর (সা.) আগমণের সুসংবাদ, তার গুণাবলী এবং বৈশিষ্ট্যসমূহ। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১) ।
﴿شَهِيدٌ عَلَى مَا تَعْمَلُونَ﴾ ‘তাদের কৃতকর্মের উপর তিনি সাক্ষী আছেন’, এ আয়াতাংশের অর্থ হলো: তাদের অনিষ্ঠতা, বিশৃঙ্খলা এবং কুফরী সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা জানেন। (আইসার, জাযায়েরী: ১/৩৫১) ।
﴿عِوَجًا﴾ ‘বিচ্যুতি’, ধর্মীয় বিষয় এবং কথায় সরলতা থেকে বিচ্যুতি হওয়া। তবে এখানে বক্রতা ও বিকৃতিকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১) ।
﴿وَأَنْتُمْ شُهَدَاءُ﴾ ‘এবং তোমরা সাক্ষী’, এখানে আয়াতাংশের অর্থ হলো: ‘তোমরা জানো’, সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো: তোমরা জানো যে, তোমাদের ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে: ইসলামই গ্রহণযোগ্য ও মূল্যবান ধর্ম। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১) ।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
অত্র সূরার শুরু থেকে একের পর এক আল্লাহ তায়ালা তাঁর একাত্ববাদের প্রমাণ দেওয়ার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুয়াত এবং কোরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার স্বপক্ষে প্রমাণ পেশ করার পরও যখন দেখলেন ইহুদী-খৃষ্টানদের মধ্যে কোন ধরণের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সরাসরি কিছু বলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং উল্লেখিত আয়াতে রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। (নাযমুদ দুরার, বাক্বায়ী: ২/১২৯) ।
(৯৮-১০৫) নাম্বার আয়াতাবলী অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
যায়েদ ইবনু আসলাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: প্রবীণ ইহুদী, জাহেলিয়াত যুগের গোর কাফের এবং মুসলমানদের প্রতি চরম বিদ্বেষী ‘শাস ইবনু কাইস’ একদিন আওস ও খাযরাজ গোত্রের রাসুলুল্লাহর (সা.) কিছু সাহাবিকে একসঙ্গে বসে গল্প করতে দেখল। ইসলামের কারণে তারা আগের শত্রুতা ভুলে একতাবদ্ধ হয়েছিল এবং সুন্দরভাবে মিলেমিশে চলছিল। এই দৃশ্য দেখে ‘শাস ইবনু কাইস’ খুবই রাগান্বিত ও ক্ষুদ্ধ হলো। সে বলল: “এই কায়লা গোত্র (আওস ও খাযরাজ) তো একত্রিত হয়ে গেছে! আল্লাহর কসম, যদি এরা এমনিভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে আমাদের (ইহুদিদের) এ দেশে থাকার কোনো নিরাপত্তা থাকবে না!”।
তখন সে তার সাথে থাকা এক যুবক ইহুদিকে নির্দেশ দিল: “যাও, ওদের মাঝে বসো। অতীতের ‘ইয়াওমে বুয়াথ’ (আওস ও খাযরাজের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যাতে আওস গোত্র খাযরাজদেরকে পরাজিত করেছিল) এর কথা স্মরণ করিয়ে দাও, তাদের মধ্যে যেসব কবিতা এবং গর্ব-অহংকারপূর্ণ কথাবার্তা চালাচালি হতো, তা শুনাও”। সে যুবক তাই করল।
সাহাবারা সেই সব পুরনো কথাবার্তায় মেতে উঠলেন। তারা তর্কে জড়িয়ে পড়লেন এবং গর্ব করতে শুরু করলেন। এক পর্যায়ে দুই ব্যক্তি একজন আওসের (আওস ইবন কাইজি) এবং অন্যজন খাযরাজের (জাব্বার ইবন সাখর) উঠে দাঁড়াল এবং উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে লাগল। তাদের একজন বলল, “আসো, চাইলে আবার আগের দিনের মতো যুদ্ধ শুরু করে দিই!”। এরপর দুই পক্ষই উত্তেজিত হয়ে পড়ল এবং বলতে লাগল: “ঠিক আছে, যুদ্ধ হোক! অস্ত্র ধরো, অস্ত্র ধরো!”। তারা বলল: “চল, যুদ্ধের ময়দান ‘হাররা’ তে যাই। তারা নিজেদের গোত্রীয় লোকদের ডেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
এদিকে খাযরাজ গোত্রের লোকেরাও তাদের নিজেদের গোষ্ঠীর দিকে ফিরে গেল সেই পুরনো গোত্রীয় শ্লোগান ও বিভেদ নিয়ে, যেগুলো তারা জাহেলিয়াত যুগে লালন করত।
এই খবর রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে পৌঁছলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর কিছু মুহাজির সাহাবিদেরকে নিয়ে সোজা সেই স্থানটির দিকে রওনা হলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন: “হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে ভয় করো! আমি যখন এখনো তোমাদের মাঝে আছি, তখন তোমরা কি জাহেলিয়াত যুগের বিভেদমূলক আহ্বানে সাড়া দিচ্ছো? অথচ আল্লাহ তোমাদের হেদায়েত দিয়েছেন, তোমাদেরকে সম্মানিত করেছেন, জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মুক্ত করেছেন, কুফরের হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন এবং তোমাদের অন্তরে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছেন তবুও কি তোমরা সেই পুরনো কুফর ও শত্রুতায় ফিরে যাচ্ছো?”।
এই কথা শুনে লোকেরা বুঝতে পারল এটি ছিল শয়তানের প্ররোচনা এবং তাদের শত্রু ‘শাস ইবন কাইস’ এর ষড়যন্ত্র। তারা লজ্জিত হয়ে হাতের অস্ত্র ফেলে দিল, কেঁদে ফেলল এবং আওস ও খাযরাজের লোকেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। পরে তারা সবাই রাসুলুল্লাহর (সা.) কথা শুনে তার সঙ্গে শান্ত চিত্তে ফিরে গেল। এইভাবে আল্লাহ তাদের উপর থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ‘শাস ইবনু কাইস’ এর চক্রান্ত দূর করে দিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা ‘শাস ইবনু কাইস’ এর কার্যকলাপ এবং আওস-খাযরাজ গোত্রের আনসারী সাহাবী সম্পর্কে (৯৮-১০৫) আয়াতাবলী অবতীর্ণ করেন। (তাফসীর আল-ত্ববারী: ৬/৫৫-৫৬) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। ৯৮ এবং ৯৯নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইহুদী-খৃষ্টানদেরকে তাদের দুইটি ভয়াবহ অপরাদের কারণে তিরস্কার করেছেন, অপরাধ দুইটি হলো:
(ক) তারা তাওরাত ও ইনজীলে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা.) আগমণের সুসংবাদ, তার গুণাবলী এবং বৈশিষ্ট্যসমূহকে গোপন রাখে এবং কোরআনে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি নবুয়াতের স্বপক্ষে প্রমাণ ও স্পষ্ট দলীলসমূহকে অস্বীকার করে।
(খ) কেউ রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদেরকে বাধা প্রদান করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩) ।
২। ৯৮নং আয়াতে ইহুদীদেরকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বারণ করা হয়েছে এবং ৯৯নং আয়াতে অন্যকে পথভ্রষ্ট করা থেকে বারণ করা হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩) ।

৩। আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) আয়াতদ্বয়ের তিনটি শিক্ষা উল্লেখ করেছেন:
(ক) সত্য জেনে অস্বীকারই চরম অবিচার, অর্থাৎ: অবিশ্বাস ও অবিচারের চরম কদর্যতা হলো- সত্য জানার পরে বিদ্বেষ, হিংসার বশবর্তী হয়ে অথবা টাকার বিনিময়ে তা প্রত্যাখ্যান করা।
(খ) প্রতারণা ও মিথ্যার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ইসলামে নিষিদ্ধ, অর্থাৎ: বিভিন্ন অপকৌশল, মিথ্যা এবং প্রতারণার মাধ্যমে মানুষকে সত্য ও কল্যাণ থকে বিচ্যুত করা হারাম।
(গ) আল্লাহর দয়া ও ন্যয় বিচার থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না, অর্থাৎ: সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ভালো ও মন্দ সকল কাজ জানেন এবং তাঁর অনুগ্রহ ও ন্যায় বিচার থেকে তাদের প্রতিদান দিবেন। (আইসার, জাযায়েরী: ১/৩৫২) ।
আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরে উল্লেখিত তিনটি বিষয়ের প্রথম দুইটি, যেমন: সত্য জেনে দুনিয়াবী স্বার্থ, আত্মীয়তার সম্পর্ক, দলীয় সম্পর্ক ইত্যাদির কারণে তা প্রত্যাখ্যান করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং এগুলো থেকে বিরত থাকা আয়াতের মৌলিক শিক্ষা। (আল্লাহই ভালো জানেন)
৪। এখন একটি প্রশ্ন হতে পারে, ৯৯নং আয়াতের একটি অংশে বলা হয়েছে: “তোমরা দীনের মধ্যে বক্রতা অনুসন্ধান করো” অথচ প্রকৃতপক্ষে দীনের মধ্যে বক্রতা অনুসন্ধান সম্ভব নয়, তবে এর অর্থ কি? এ ব্যাপারে তাফসীকারকদের মত নি¤েœ:
ইমাম যামাখশারী (র.) এ প্রশ্নের উত্তরে দুইটি মত দিয়েছেন:
(ক) তোমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করো, এমনভাবে যে তারা ভাবতে শুরু করে দ্বীনের মধ্যে সত্যিই কোনো ত্রুটি বা বক্রতা আছে। যেমন তোমরা বলো: “মূসা (আ.)-এর শরীয়ত রহিত হয়নি, কিংবা তোমরা তাওরাতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা.) গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বিকৃতি করে মানুষের সামনে প্রচার করো, ফলে তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে বিভ্রান্তে পরে যায়।
(খ) তোমরা নিজেরাই নিজেদের কষ্ট বাড়াও, সত্যকে গোপন রাখতে এবং এমন কিছু পাওয়ার আশায় যা কখনই সম্ভব নয়। যেমন দীনে ত্রুটি খুঁজে বের করা, যা কখনোই সম্ভব নয়। কেননা ইসলাম এমন এক সহজ-সরল পথ, যা সর্বাপেক্ষা সঠিক ও সরলতম পথ এবং তাতে কোন ত্রæটি নেই। (তাফসীর আল-কাশশাফ: ১/৩৯৩) ।
ইমাম তবারী (র.) বলেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: পথভ্রষ্ট হওয়া। (তাফসীরে তবারী: ৬/৫৩) ।

আয়াতদ্বয়ের আমল:
(ক) সত্যকে জানার পরে সেটাকে প্রত্যাখ্যান না করা।
(খ) অপকৌশল, মিথ্যা ও প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে বিভ্রান্ত না করা।
(গ) আল্লাহর দয়া ও ন্যয়বিচার থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না, এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা।

 

error: Content is protected !!