Skip to main content

সূরাতু আন-নিসা এর পরিচয়, নামকরণ ও ফযিলত

(سُوْرَةُ النِّسَاء)

সূরাতু আন-নিসা এর পরিচয়:
সূরার নাম:
এ সূরার একমাত্র প্রসিদ্ধ নাম ‘সূরাতু আন-নিসা’ (سورة النساء), যার অর্থ ‘নারীগণ’| এ নামে নামকরণের দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে—
প্রথমত: সূরার প্রথম আয়াতে ‘নিসা’ (নারী) শব্দটি উল্লেখ রয়েছে| (বিতাকাতুত তা‘রীফ, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ: ৩০)|
দ্বিতীয়ত: নারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান, অধিকার ও পারিবারিক বিষয়াবলি এ সূরায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে| এজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরাতু আন-নিসা’| (আত-তাফসীরুল মাওদূঈ, মুস্তফা মুসলিম: ২/১) |
এ নামকরণ ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপের একটি উজ্জ্বল প্রমাণ|
সূরার আলোচ্য বিষয়:
সূরাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো— ঈমানের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম সমাজকে প্রস্তুত করা|
আরও বিস্তৃতভাবে বললে, এ সূরায় পারিবারিক জীবন, উত্তরাধিকার আইন, নারীর অধিকার, বিবাহ ও তালাক, এতিমের হক, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালা, জিহাদ, মুনাফিকদের চরিত্র এবং ঈমান ও তাকওয়া-সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে|
সূরার ফযিলত:
সূরাতু আন-নিসার বহু ফযিলত রয়েছে| সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীসের আলোকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ফযিলত নিম্নে তুলে ধরা হলো—
১| পাঁচটি মহামূল্যবান আয়াত
ইমাম হাকিম (রহ.) তাঁর আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন—

“সূরা আন-নিসার পাঁচটি আয়াত আমার কাছে দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়েও অধিক প্রিয়, যা তেলাওয়াত করে আমি অত্যাধিক আনন্দ পাই|” আয়াতগুলো হলো—
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ﴾ (৪:৪০), ﴿إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ﴾ (৪:৩১),
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ﴾ (৪:১১৬), ﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ﴾ (৪:৬৪),
﴿وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ﴾ (৪:১১০). (আল-মুস্তাদরাক: ২/৩০৫) |
২| সাবউ আত-তিওয়াল (দীর্ঘ সাত সূরা)-এর অন্তর্ভুক্ত
সূরাতু আন-নিসা কুরআনের সাবউ আত-তিওয়াল বা দীর্ঘ সাতটি সূরার অন্যতম| হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
্রمَنْ أَخَذَ السَّبْعَ الأُوَلَ مِنَ الْقُرْآنِ فَهُوَ حَبْرٌগ্ধ
অর্থ: “যে ব্যক্তি কুরআনের প্রথম সাতটি সূরা আয়ত্ত করবে, সে একজন আলেম হিসেবে গণ্য হবে” (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৫৭৫) | মুহাক্কিক শুয়াইব আরনাউত (রহ.) হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন| দীর্ঘ সাতটি সূরা হলো— সূরা আল-বাকারা, আলে ইমরান, আন-নিসা, আল-মায়িদাহ, আল-আন‘আম, আল-আ‘রাফ এবং আত-তাওবাহ|
৩. তাহাজ্জুদের সালাতে এ সূরা তিলাওয়াত, হুযাইফা (রা.) বলেন—
্রقُمْتُ إِلَى جَنْبِ رَسُولِ اللهِ ﷺ ذَاتَ لَيْلَةٍ، فَقَرَأَ السَّبْعَ الطِّوَلَ فِي سَبْعِ رَكَعَاتٍগ্ধ
অর্থ: “এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে সালাতে দাঁড়িয়েছিলাম| তিনি সাত রাকাতে সাতটি দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করেছিলেন” (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪১১) | মুহাক্কিক শুয়াইব আরনাউত (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, সনদের একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত হওয়ায় হাদীসটি হালকা দুর্বল (ضعيف يسير)|
পূর্ববর্তী সূরার সঙ্গে সম্পর্ক:
সূরাতু আন-নিসার সঙ্গে সূরাতু আলে ইমরানের বিষয়গত সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও সুস্পষ্ট| উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলো—
প্রথমত: সূরাতু আলে ইমরান তাকওয়ার নির্দেশনার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে, আর সূরাতু আন-নিসা শুরু হয়েছে তাকওয়ার আহ্বানের মাধ্যমে| ফলে দুই সূরার মধ্যে সুন্দর বিষয়গত ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়|
দ্বিতীয়ত: সূরাতু আলে ইমরানে উহুদ যুদ্ধের ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে| সূরাতু আন-নিসাতেও উহুদ-পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনা ও মুনাফিকদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে| আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ﴾
“মুনাফিকদের ব্যাপারে তোমাদের দুই দলে বিভক্ত হওয়ার কারণ কী?”(আন-নিসা: ৮৮)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এ আয়াতও উহুদ-পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত|

তৃতীয়ত: সূরাতু আলে ইমরানে উহুদের পর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে—
﴿الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ﴾ [سورة النساء: ১৭২-১৭৫].
অন্যদিকে সূরাতু আন-নিসায় মুমিনদের শত্রুর মোকাবিলায় দুর্বলতা প্রদর্শন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
﴿وَلَا تَهِنُوا فِي ابْتِغَاءِ الْقَوْمِ﴾ [سورة النساء: ১০৪].
এভাবে সূরাতু আন-নিসা পূর্ববর্তী সূরার আলোচনাকে বিস্তৃত ও পরিপূর্ণ করেছে| গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আলে ইমরানে সংক্ষেপে উল্লেখিত বহু বিষয় এ সূরায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে| ফলে উভয় সূরার মধ্যে গভীর সম্পর্ক, সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়|
মুসহাফে সূরার অবস্থান:
মুসহাফের বিন্যাস অনুযায়ী সূরাতু আন-নিসা কুরআনের চতুর্থ সূরা| (আত-তাফসীরুল মাওদূঈ, মুস্তফা মুসলিম: ২/২) |
নুযূলের ক্রম:
নাযিল হওয়ার ক্রম অনুসারে এটি বিরানব্বইতম (৯২তম) সূরা| এটি সূরাতুল মুমতাহিনার পরে এবং সূরাতুয যিলযালের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে|
অবতীর্ণের স্থান:
সকল মুফাসসিরের মতে সূরাতু আন-নিসা একটি মাদানী সূরা|
হযরত আয়িশা (রা.) থেকে ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেন— “সূরা আন-নিসা তখন অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট অবস্থান করছিলাম”|

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে| কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে হযরত আয়িশা (রা.)-এর ˆববাহিক জীবন মদীনাতেই শুরু হয়েছিল| (আত-তাফসীরুল মাওদূঈ, মুস্তফা মুসলিম: ২/১)
আয়াত সংখ্যা:
সূরাতু আন-নিসায় মোট ১৭৬টি আয়াত রয়েছে|
অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
মুফাসসিরগণের গবেষণা অনুযায়ী, এ সূরায় মোট বিয়াল্লিশটি (৪২) আসবাবুন নুযূল বা অবতীর্ণ-প্রেক্ষাপট উল্লেখিত হয়েছে, যা এ সূরার বিষয়বস্তুর ˆবচিত্র্য ও বাস্তবধর্মিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক|

Leave a Reply

error: Content is protected !!