﴿وَإِنْ خِفْتُمْ أَلاّ تُقْسِطُوا فِي الْيَتامى فَانْكِحُوا ما طابَ لَكُمْ مِنَ النِّساءِ مَثْنى وَثُلاثَ وَرُباعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلاّ تَعْدِلُوا فَواحِدَةً أَوْ ما مَلَكَتْ أَيْمانُكُمْ ذلِكَ أَدْنى أَلاّ تَعُولُوا (3) وَآتُوا النِّساءَ صَدُقاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْساً فَكُلُوهُ هَنِيئاً مَرِيئاً (4)﴾ [سورة النساء: 3-4].
আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিম নারীদের অধিকার সংরক্ষণ, বহুবিবাহ ও মোহর প্রদানের বিধান|
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(৩) আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, এতিম কন্যাদের (বিবাহের ক্ষেত্রে) ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে তোমাদের পছন্দের অন্য নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিবাহ করো| আর যদি আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই (বিবাহ করো) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকেই গ্রহণ করো| এটাই অবিচার থেকে নিরাপদ থাকার অধিক উপযোগী|
(৪) আর নারীদের তাদের মোহর আন্তরিক উপহার হিসেবে প্রদান করো| অতঃপর তারা যদি ¯^তঃস্ফূর্তভাবে সেই মোহরের কোনো অংশ তোমাদের ছেড়ে দেয়, তবে তা আনন্দের সঙ্গে ও তৃপ্তিসহকারে গ্রহণ করো|
আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতিম কন্যাদের অভিভাবকদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন| জাহিলিয়াত যুগে অনেক অভিভাবক ইয়াতিম কন্যাদের সৌন্দর্য বা সম্পদের লোভে তাদের বিয়ে করতেন; কিন্তু তাদের প্রাপ্য মোহর ও অন্যান্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতেন না| এ অন্যায়ের অবসান ঘটাতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা আশঙ্কা করো, এতিম কন্যাকে বিয়ে করলে তার প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে তাকে বিয়ে না করে অন্য নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের পছন্দ অনুযায়ী দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিয়ে করো| কারণ, এতিমের অধিকার ক্ষুণ্ন করার চেয়ে অন্য নারীকে বিয়ে করাই উত্তম| তবে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সবার প্রতি ন্যায়বিচার করা অপরিহার্য| যদি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নিম্নের যে কোন একটি পথ অবল¤^ন করতে হবে:
(ক) একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে|
(খ) ˆবধভাবে তার অধিকারভুক্ত কোনো দাসী থাকলে, তার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করবে| তবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় বর্তমানে এ বিধানের বাস্তব প্রয়োগ আর নেই| এ নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন অন্যায় ও অবিচার থেকে দূরে থাকে এবং পারিবারিক জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে|
এরপর চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ¯^ামীদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের স্ত্রীদের মোহর আন্তরিকতার সঙ্গে আদায় করে| মোহর স্ত্রীর একটি ¯^ীকৃত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার; তাই স্ত্রীর ¯^তঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া এর কোনো অংশ গ্রহণ করা ¯^ামীর জন্য ˆবধ নয়| তবে স্ত্রী যদি ¯ে^চ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে মোহরের কোনো অংশ ¯^ামীকে প্রদান করেন, তাহলে ¯^ামী তা ˆবধভাবে গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবেন| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৫-৪৩৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩৪-২৩৫; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১২৫-১২৬) |
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ﴾ শব্দগুলো সংখ্যা নির্দেশক বিশেষ রূপ, যা মূলত “দুই দুই”, “তিন তিন” এবং “চার চার” অর্থ প্রকাশ করে| এর উদ্দেশ্য হলো, একজন ব্যক্তি একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুই, তিন বা চারজন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে; এর বেশি নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) | অর্থাৎ, আয়াতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, দুই, তিন ও চারকে একত্রে যোগ করে নয়জন বা তারও বেশি স্ত্রী গ্রহণ করা যাবে| বরং যার সামর্থ্য ও ন্যায়বিচার করার সক্ষমতা আছে, সে সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে| এভাবে কুরআন বহুবিবাহের একটি সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে এবং একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে|
﴿صَدُقاتِهِنَّ﴾ “তাদের নির্ধারিত মোহর”, এখানে “صَدُقَات” শব্দ দ্বারা স্ত্রীদের সেই মোহরকে বোঝানো হয়েছে, যা বিবাহের মাধ্যমে ¯^ামীর ওপর ফরজ ও অপরিহার্য হয়ে যায়| এটি স্ত্রীর একটি ¯^ীকৃত, অবিচ্ছেদ্য ও একচ্ছত্র আর্থিক অধিকার| তাই মোহর প্রদানে অবহেলা করা, তা অ¯^ীকার করা কিংবা অন্যায়ভাবে তা থেকে কিছু কর্তন করা ˆবধ নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) |
﴿نِحْلَةً﴾ “আন্তরিকতার সঙ্গে”, সন্তুষ্টচিত্তে এবং ¯^তঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করা| অর্থাৎ, মোহর এমনভাবে আদায় করতে হবে যেন তা কোনো অনুগ্রহ, দয়া বা সামাজিক প্রথার অংশ নয়; বরং আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ও স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার| তাই ¯^ামীর উচিত কোনো ধরনের অনীহা, কৃপণতা বা চাপ সৃষ্টি না করে খুশিমনে মোহর পরিশোধ করা| এ শব্দটি আরও ইঙ্গিত করে যে, মোহর কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়; বরং এটি স্ত্রীর প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, মর্যাদা ও দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রকাশ| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) |
﴿هَنِيئًا مَرِيئًا﴾ “আনন্দের সঙ্গে তৃপ্তিসহকারে”, ﴿هَنِيئًا﴾ অর্থ এমন বস্তু, যা গ্রহণকারী আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং তা তার কাছে সু¯^াদু, সুখকর ও তৃপ্তিদায়ক মনে হয়| আর ﴿مَرِيئًا﴾ অর্থ এমন বস্তু, যার পরিণাম কল্যাণকর; যা সহজে হজম হয়, দেহের জন্য উপকারী হয় এবং কোনো ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে না| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) | অর্থাৎ, স্ত্রী যদি ¯^তঃস্ফূর্তভাবে ও সন্তুষ্টচিত্তে মোহরের কোনো অংশ ¯^ামীকে ছেড়ে দেন, তাহলে ¯^ামী তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবেন| এ সম্পদ ভোগ করার কারণে তার কোনো পাপ হবে না এবং আখিরাতেও এর জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে না| বরং এটি তার জন্য ˆবধ, কল্যাণকর এবং শুভ পরিণামবাহী হবে| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে অত্র আয়াতদ্বয়ের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এতিমদের সম্পদের ব্যাপারে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন| যেহেতু অভিভাবকদের তত্ত্বাবধানে অনেক এতিম কন্যাও থাকত, তাই তারা কখনো কখনো তাদের অভিভাবকত্বে থাকা এতিম কন্যাদেরই বিয়ে করতেন| কিন্তু এ আশঙ্কা ছিল যে, তাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে মোহর, ভরণ-পোষণ বা অন্যান্য ˆববাহিক অধিকারের ক্ষেত্রে তারা সুবিচার করতে পারবেন না| তাই উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, এতিম কন্যাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে তাদের বিয়ে না করে অন্য নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের পছন্দমতো বিয়ে করো| (নাযম আদ-দুরার, বাক্বায়ী: ৫/১৭৯) |
আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
৩ ন¤^র আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, নাসাঈ, বায়হাকী প্রমুখ হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত আছে, উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহ.) তাঁর খালা উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: “হে আমার ভাগ্নে! এ আয়াতে সেই এতিম কন্যার কথা বলা হয়েছে, যে তার অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়| অনেক সময় সে অভিভাবকের সম্পদে অংশীদারও হয়| তার সম্পদ ও সৌন্দর্যের কারণে অভিভাবক তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হতো; কিন্তু অন্যান্য নারীর মতো উপযুক্ত মোহর দিতে চাইত না| তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এ অন্যায় থেকে নিষেধ করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন, যদি এতিম কন্যার প্রতি সুবিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাকে বিয়ে না করে অন্য নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিয়ে কর”| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩২-২৩৩) |
অপরদিকে সাঈদ ইবনু জুবাইর, কাতাদাহ, রাবী‘ ইবন আনাস, দাহহাক ও সুদ্দী (রহ.) বলেন, লোকেরা এতিমদের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকত; কিন্তু নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে ততটা সতর্ক ছিল না| তারা ইচ্ছামতো একাধিক বিয়ে করত| ফলে কখনো স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করত, আবার কখনো অবিচার করত| যখন এতিমদের সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা ﴿وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ﴾ “এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দাও”— এ আয়াত নাযিল করলেন, তখন এর সঙ্গে তিন ন¤^র আয়াতও নাযিল করে জানিয়ে দিলেন- যেমন তোমরা এতিমদের প্রতি অবিচার করার ব্যাপারে ভয় করো, তেমনি স্ত্রীদের প্রতিও অবিচার করার ভয় করো| তাই তোমরা ততজন নারীকে বিয়ে করো, যাদের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম হবে| কারণ, দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের দিক থেকে নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে এতিমদের মতো সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের মুখাপেক্ষী| (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১৪৭) |
৪ ন¤^র আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট: ইবনু আবী হাতিম আবূ সালিহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: জাহিলিয়াত যুগে কোনো ব্যক্তি যখন তার মেয়েকে বিয়ে দিত, তখন মেয়ের মোহর সে নিজেই নিয়ে নিত এবং কন্যাকে তা দিত না| এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা এ অন্যায় প্রথা নিষিদ্ধ করেন এবং এ ৪ ন¤^র আয়াত নাযিল করেন| (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ৭৯) |
আয়াতের শিক্ষা:
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতিমদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং তাদের ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন| এরই ধারাবাহিকতায় আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে ইয়াতিম কন্যাদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিধান, বহুবিবাহের সীমা ও শর্ত এবং স্ত্রীদের মোহর যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশ বর্ণনা করা হয়েছে| এর মাধ্যমে ইসলাম পারিবারিক জীবনে ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা এবং নারীর আর্থিক অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের মৌলিক শিক্ষা নিম্নে পেশ করা হলো-
১| তিন ন¤^র আয়াত থেকে চারটি বিষয় প্রতিফলিত হয়…
(ক) এতিম কন্যাদের অধিকার সংরক্ষণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, এ আয়াতের প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হলো, এতিম কন্যাদের প্রতি কোনো ধরনের অবিচার করা যাবে না| জাহিলিয়াত যুগে অনেক অভিভাবক তাদের সম্পদ বা সৌন্দর্যের লোভে এতিম কন্যাদের বিয়ে করতেন; কিন্তু তাদের প্রাপ্য মোহর ও অন্যান্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতেন না| ইসলাম এ অন্যায়ের পথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং নির্দেশ দিয়েছে, যদি তাদের প্রতি সুবিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাদের বিয়ে না করে অন্য নারীকে বিয়ে করতে হবে| এর মাধ্যমে ইসলাম দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে|
(খ) বহুবিবাহের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা, এ আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ তা‘আলা একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন; তবে তা সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করেছেন| এর মাধ্যমে জাহিলিয়াত যুগের সীমাহীন বহুবিবাহ প্রথার অবসান ঘটানো হয়েছে| ফলে বহুবিবাহকে একটি দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিত পারিবারিক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে|
(গ) বহুবিবাহের মৌলিক শর্ত হলো ন্যায়বিচার, আয়াতের তৃতীয়াংশে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি ন্যায়বিচারের শর্তসাপেক্ষ| তাই যে ব্যক্তি স্ত্রীদের ভরণ-পোষণ, বাসস্থান, সময় বণ্টন এবং অন্যান্য ˆববাহিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করে, তার জন্য একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক| অর্থাৎ, ইসলামে বহুবিবাহ কোনো অবাধ অধিকার নয়; বরং এটি দায়িত্ব, সামর্থ্য ও ন্যায়বিচারের ওপর নির্ভরশীল একটি বিধান| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩৭) | তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, স্ত্রীদের মধ্যে শতভাগ সমতা, বিশেষত অন্তরের ভালোবাসা ও আবেগের ক্ষেত্রে, কোনো মানুষের পক্ষেই সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়| কারণ মানুষের হৃদয় আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণে, এবং ভালোবাসার প্রবণতা মানুষের ইচ্ছার বাইরে অনেকাংশেই নির্ধারিত হয়| তবে যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—যেমন ভরণ-পোষণ, বাসস্থান, পোশাক, সময় বণ্টন, উপহার এবং অন্যান্য ˆবষয়িক অধিকার—সেসব ক্ষেত্রে অবশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ফরজ| রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্যে যথাসাধ্য পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন| এরপরও যেহেতু অন্তরের ভালোবাসার ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই তিনি বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছে সোপর্দ করতেন| এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসে এসেছে যে, তিনি দোয়া করতেন:
“اللَّهُمَّ هَذَا قَسْمِي فِيمَا أَمْلِكُ، فَلَا تَلُمْنِي فِيمَا تَمْلِكُ وَلَا أَمْلِكُ” (سنن أبي داود: ২১৩৪).
অর্থ: “হে আল্লাহ! যা আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সে বিষয়ে এটাই আমার ন্যায়সংগত বণ্টন| আর যা আপনার নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু আমার নিয়ন্ত্রণে নয় (অর্থাৎ হৃদয়ের ভালোবাসা), সে বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করবেন না” (সুনানে আবি দাউদ: ২১৩৪) | এ বিষয়েই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
﴿وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ﴾ [سورة النساء: ১২৯].
অর্থ: “তোমরা যতই আগ্রহী হও না কেন, স্ত্রীদের মধ্যে (অন্তরের ভালোবাসায়) কখনোই পুরোপুরি সমতা রক্ষা করতে পারবে না| তবে এমনভাবে এক স্ত্রীর দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না যে, অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় (না বিবাহিতা, না পরিত্যক্তা) রেখে দাও” (সূরাতু আন-নিসা, ১২৯) |
অতএব, ইসলাম বহুবিবাহের অনুমতি দিলেও তা কঠোরভাবে ন্যায়বিচারের শর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে| যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা রয়েছে, সেখানে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য; আর যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা নেই, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দায়ী করেন না| তবে ভালোবাসার পার্থক্যের অজুহাতে কোনো স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা বা তার প্রতি অবিচার করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ| (আল্লাহই ভালো জানেন)|
(ঘ) পারিবারিক জীবনে অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধ করা, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা‘আলা এমন পথ অবল¤^ন করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা মানুষকে জুলুম ও অন্যায় থেকে দূরে রাখে| কারণ, পরিবারে অবিচার শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষতিই করে না; বরং সমাজেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে| তাই ইসলাম এমন পারিবারিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা ন্যায়, দায়িত্বশীলতা এবং পারস্পরিক অধিকার সংরক্ষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
২| চার ন¤^র আয়াত থেকে পাঁচটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়…
(ক) মোহর স্ত্রীর একটি বাধ্যতামূলক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার, এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ¯^ামীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন স্ত্রীদের মোহর যথাযথভাবে আদায় করে| মোহর কোনো উপহার, অনুগ্রহ বা সামাজিক রীতি নয়; বরং এটি আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত স্ত্রীর একটি অপরিহার্য আর্থিক অধিকার| তাই বিবাহের মাধ্যমে ¯^ামীর ওপর মোহর পরিশোধ করা আবশ্যক হয়ে যায়| মোহর আদায়ে গড়িমসি করা, তা অ¯^ীকার করা বা অন্যায়ভাবে কমিয়ে দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৮৪) |
(খ) মোহর আন্তরিকতা ও সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করতে হবে, আয়াতে ﴿نِحْلَةً﴾ শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহ তা‘আলা শিক্ষা দিয়েছেন যে, মোহর অনিচ্ছাকৃতভাবে বা বোঝা মনে করে নয়; বরং আন্তরিকতা, উদারতা ও সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করতে হবে| এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মোহর স্ত্রীর প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং ˆববাহিক দায়িত্ববোধের প্রতীক| তাই একজন মুমিন ¯^ামীর উচিত খুশিমনে স্ত্রীর এ অধিকার আদায় করা| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৮৪) |
(গ) মোহরের মালিক একমাত্র স্ত্রী, এ আয়াত প্রমাণ করে যে, মোহরের প্রকৃত মালিক স্ত্রী নিজেই| তাই তার সম্মতি ছাড়া ¯^ামী, পিতা, অভিভাবক বা অন্য কোনো ব্যক্তি মোহরের কোনো অংশ গ্রহণ বা ভোগ করতে পারে না| এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের সময় ¯^ামীর পক্ষকে নারী থেকে মোহর ফেরত নিতে নিষেধ করা হয়েছে| আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
“وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدالَ زَوْجٍ مَكانَ زَوْجٍ، وَآتَيْتُمْ إِحْداهُنَّ قِنْطاراً، فَلا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئاً” [سورة النساء: ২০].
অর্থাৎ: “আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও এবং তোমরা তাদের একজনকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ (মোহর) প্রদান করে থাকো, তবুও তা থেকে কোনো কিছুই ফিরিয়ে নিয়ো না” (সূরাতু আন-নিসা: ২০) | ইসলাম এ বিধানের মাধ্যমে নারীর ¯^তন্ত্র সম্পত্তির অধিকারকে ¯^ীকৃতি দিয়েছে এবং জাহিলিয়াত যুগের সেই অন্যায় প্রথার অবসান ঘটিয়েছে, যেখানে অভিভাবকরা কন্যার মোহর নিজেদের সম্পদ মনে করত| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৮৪) |
(ঘ) স্ত্রীর ¯ে^চ্ছায় দেওয়া অংশ গ্রহণ করা ˆবধ, যদি স্ত্রী কোনো প্রকার চাপ, ভয় বা প্রতারণা ছাড়া সম্পূর্ণ ¯^তঃস্ফূর্তভাবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে মোহরের কোনো অংশ ¯^ামীকে ছেড়ে দেন, তাহলে ¯^ামী তা ˆবধভাবে গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবেন| এ ক্ষেত্রে তা ¯^ামীর জন্য হালাল এবং এতে কোনো পাপ নেই| তবে স্ত্রীর সম্মতি অবশ্যই প্রকৃত ও ¯^াধীন হতে হবে; কোনো ধরনের মানসিক বা পারিবারিক চাপের ফলে হওয়া উচিত নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩৬) |
(ঙ) পারিবারিক জীবনে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা, এ আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম কেবল একটি আর্থিক বিধানই প্রদান করেনি; বরং ¯^ামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছে| যখন ¯^ামী স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে এবং স্ত্রীও ¯^তঃস্ফূর্তভাবে উদারতার পরিচয় দেয়, তখন পরিবারে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় হয়| এভাবেই ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী পারিবারিক জীবন প্রতিষ্ঠা করতে চায়| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
আয়াতসংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়েল:
মাসয়ালা-১:
আয়াতে উল্লেখিত ‘ইয়াতিম নারী’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে এবং তাদের বিবাহের অভিভাবক কারা হতে পারে?
এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে|
প্রথম মত, এখানে অপ্রাপ্তবয়স্কা এতিম কন্যা উদ্দেশ্য| এ মতেরও দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে—
(ক) একদল ফকীহের মতে, পিতা ও দাদা ছাড়াও অন্যান্য ˆবধ অভিভাবক তার বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন; প্রয়োজনে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নিজেরাও তাকে বিবাহ করতে পারেন| তাঁরা হযরত আয়িশা (রা.)-এর তাফসীরকে দলিল হিসেবে পেশ করেন| তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয়াতটি এমন এক এতিম কন্যাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে, যে তার অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে ছিল| অভিভাবক তার সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ন্যায্য মোহর না দিয়েই তাকে বিবাহ করতে চাইত| এ থেকে তাঁরা প্রমাণ করেন যে, চাচাতো ভাইয়ের মতো ˆবধ অভিভাবকও অপ্রাপ্তবয়স্কা এতিম কন্যার বিবাহের অভিভাবক হতে পারে|
(খ) অপরদিকে, অন্য একদল ফকীহের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কা কন্যার বিবাহদানের অধিকার কেবল পিতা বা দাদার| তাঁদের মতে, এ আয়াতে মূলত ন্যায্য মোহর প্রদান, অথবা এতিমদের অভিভাবকত্ব গ্রহণে সংকোচের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে; অপ্রাপ্তবয়স্কার বিবাহ-অভিভাবকত্বের বিধান নয়|
দ্বিতীয় মত, আরেক দল ফকীহের মতে, আয়াতে ‘ইয়াতামা’ বলতে অপ্রাপ্তবয়স্কা নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক এতিম নারী বোঝানো হয়েছে| এটি মাজায মুরসাল-এর একটি উদাহরণ| অর্থাৎ, ˆশশবে এতিম ছিল—এ বিবেচনায় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাদেরকে ‘এতিম’ বলা হয়েছে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী, ৪/২৩৭)|
মাসয়ালা-২:
অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহের হুকুম|
অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহ ˆবধ কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে|
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহ ˆবধ| তিনি এ আয়াত দ্বারা দলিল গ্রহণ করে বলেন, ‘ইয়াতিম’ শব্দটি কেবল বালেগ হওয়ার পূর্বেই প্রযোজ্য; বালেগ হওয়ার পর তাকে আর ‘ইয়াতিম’ বলা হয় না, বরং ‘নারী’ বলা হয়| সুতরাং, আয়াতে ‘ইয়াতিম’ শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় এখানে অপ্রাপ্তবয়স্কা কন্যাই উদ্দেশ্য| তিনি আরও বলেন, যদি আয়াতে প্রাপ্তবয়স্কা নারীকে বোঝানো হতো, তাহলে তার মোহর কম দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা অর্থবহ হতো না| কারণ, প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজ সম্মতিতে ¯^াভাবিক মোহরের চেয়ে কম মোহরে বিবাহে রাজি হতে পারেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে ˆবধ|
অপরদিকে, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ এবং অধিকাংশ ফকীহের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহ দেওয়া ˆবধ নয়| সে বালেগ হওয়ার পর তার সুস্পষ্ট সম্মতি নিয়েই কেবল বিবাহ দেওয়া যাবে| তাঁদের অন্যতম দলিল আল্লাহ তাআলার বাণী: ﴿وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ﴾ “তারা আপনার কাছে নারীদের সম্পর্কে ফতোয়া জানতে চায়”| তাঁদের মতে, এখানে ‘নিসা’ বা নারী শব্দটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বোঝায়, যেমন ‘রিজাল’ শব্দটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের বোঝায়| তাই ﴿فِي يَتَامَى النِّسَاءِ﴾-এর অর্থও প্রাপ্তবয়স্ক এতিম নারী, যেমনটি হযরত আয়িশা (রা.) ব্যাখ্যা করেছেন| এ মতের সমর্থনে তাঁরা একটি হাদীসও পেশ করেন| হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বর্ণনা করেন, তাঁর মামা কুদামাহ ইবনু মাজঊন তাঁর পিতার অসিয়ত অনুযায়ী তাঁর ভাইঝির বিবাহ সম্পন্ন করেন| পরে মুগীরা ইবনু শু’বা (রা.) কন্যাটিকে বিবাহের প্রস্তাব দেন| বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উত্থাপিত হলে কুদামাহ (রা.) বলেন, তিনি কন্যাটির পিতার অসিয়াতকৃত অভিভাবক এবং তার কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এ বিবাহ দিয়েছেন| তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ্রإِنَّهَا يَتِيمَةٌ، وَالْيَتِيمَةُ أَوْلَى بِأَمْرِهَاগ্ধ অর্থ: “সে একজন এতিম; আর এতিম কন্যা তার নিজের বিষয়ে অধিক হকদার”| এরপর পূর্বের বিবাহটি বাতিল করা হয় এবং কন্যাটির সম্মতিক্রমে তার বিবাহ সম্পন্ন করা হয়|
এ হাদীসের আলোকে অধিকাংশ ফকীহের সিদ্ধান্ত হলো, বালেগ হওয়ার পর কোনো এতিম কন্যার স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া তার বিবাহ সম্পন্ন করা ˆবধ নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, ওহাবা আয-যুহাইলী, ৪/২৩৮)|
মাসয়ালা-৩:
বিবাহের সময় মোহর নির্ধারণ না করা হলে, অথবা মোহর নির্ধারণে নারীর প্রতি অবিচার করা হলে ইসলামী বিধান কী?
এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কিছু শাখাগত মতভেদ থাকলেও মূলনীতির ক্ষেত্রে হানাফী, মালিকী, শাফিঈ ও হা¤^লী, চার মাজহাবই নিম্নোক্ত বিষয়ের ওপর একমত—
(ক) মোহর স্ত্রীর শরিয়তপ্রদত্ত আর্থিক অধিকার| তাই বিবাহে মোহর নির্ধারণ করা শরিয়তসম্মত ও ¯^ীকৃত বিধান|
(খ) বিবাহের সময় মোহর নির্ধারণ না করা হলে, অথবা নির্ধারিত মোহর অবৈধ বা অন্যায্যভাবে কম হওয়ায় নারীর প্রতি অবিচার সংঘটিত হলে, প্রয়োজন অনুযায়ী মোহরে মিসল (مهر المثل) প্রযোজ্য হবে|
(গ) মোহরে মিসল নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর পারিবারিক মর্যাদা, বংশ, সামাজিক অবস্থান, বয়স, সৌন্দর্য, দ্বীনদারিতা, শিক্ষা, কুমারী বা বিধবা হওয়া, দেশ-কাল এবং প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি বিবেচনায় নেওয়া হবে|
(ঘ) বিশেষ করে এতিম ও দুর্বল অবস্থানে থাকা নারীর অধিকার সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হবে, যাতে তাদের প্রতি কোনো ধরনের আর্থিক অবিচার না ঘটে| (আল-ফিকহুল ইসলাম ওয়া আদিল্লাতুহ, ওহাবা জুহাইলী/ বাদায়িউস সানায়ি’, কাসানী/ তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/১৪) |
অধিকাংশ ফকীহের মতে, প্রথমে নারীর পিতৃবংশের (যেমন বোন, ফুফু, চাচাতো বোন ইত্যাদি) সমপর্যায়ের নারীদের মোহরকে মানদণ্ড ধরা হয়| তাদের মধ্যে উপযুক্ত দৃষ্টান্ত না পাওয়া গেলে একই সামাজিক মর্যাদার অন্যান্য নারীদের প্রচলিত মোহর বিবেচনা করা হয়| (আল-মুগনী, ইবনু কুদামাহ) |
মাসয়ালা-৪:
অভিভাবক কি তার তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম কন্যাকে নিজেই বিবাহ করতে পারেন?
হযরত আয়িশা (রা.)-এর তাফসীর অনুযায়ী, যদি এতিম কন্যা বালেগ হয় এবং তার অভিভাবক মোহরের ক্ষেত্রে পূর্ণ ন্যায়বিচার করেন, তাহলে তিনি তাকে নিজেই বিবাহ করতে পারেন| এ ক্ষেত্রে তিনিই একদিকে বর, অন্যদিকে অভিভাবক (বিবাহ-সম্পাদনকারী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন|
ইমাম আবু হানীফা, আওযাঈ, সাওরী ও আবু সাওর (রহ.)-এর মতে, এ ধরনের বিবাহ ˆবধ| অর্থাৎ, একই ব্যক্তি বর এবং অভিভাবক—উভয় ভূমিকায় থেকে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন|
অপরদিকে, ইমাম শাফিঈ ও যুফার (রহ.)-এর মতে, এটি ˆবধ নয়| তাঁদের মতে, যেহেতু অভিভাবক (ওলী) বিবাহের একটি মৌলিক শর্ত, তাই একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বর ও অভিভাবক হতে পারেন না| এ অবস্থায় হয় শাসক (কাজী) তার পক্ষ থেকে বিবাহ সম্পন্ন করবেন, অথবা অন্য কোনো ˆবধ অভিভাবক তার সঙ্গে ওই নারীর বিবাহ সম্পন্ন করবেন|
তাঁদের দলিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: “لا نكاح إلا بولي وشاهدي عدل অর্থ: “অভিভাবক এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ ˆবধ নয়”|
অতএব, শাফিঈ মাজহাবের মতে, এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, বর, অভিভাবক এবং সাক্ষীগণ পৃথক ব্যক্তি হওয়া আবশ্যক; একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বর ও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/১৪) |
আয়াতের করণীয় (আমল):
(ক) যে ব্যক্তি স্ত্রীদের ভরণ-পোষণ, বাসস্থান, সময় বণ্টন ও অন্যান্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করেন, তিনি এক স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন| এটি আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ|
(খ) বিবাহের সময় মোহর নির্ধারণ ও তা যথাসময়ে পরিশোধ করা ¯^ামীর দায়িত্ব| কোনো অবস্থাতেই মোহরের ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা যাবে না|
(গ) স্ত্রী যদি মোহরের সব বা কিছু অংশ ¯ে^চ্ছায় ছেড়ে দেন, তবেই তা গ্রহণ করা ˆবধ| কোনো ধরনের চাপ, ভয়ভীতি, প্রতারণা বা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে মোহর আদায় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ|
(ঘ) ¯^ামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত পরস্পরের অধিকার রক্ষা করা এবং ˆবধ শর্ত ও অঙ্গীকার যথাসম্ভব পালন করা| দাম্পত্য জীবনের স্থিতি ও সৌহার্দ্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ|
