﴿يُوصِيكُمُ اللهُ فِي أَوْلادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ وَلأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعاً فَرِيضَةً مِنَ اللهِ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلِيماً حَكِيماً (11)﴾ [سورة النساء: 11].
আলোচ্যবিষয়: মীরাসের বিধান (১)।
আয়াতের সরল অনুবাদ:
আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: একজন ছেলের অংশ দুইজন মেয়ের অংশের সমান। আর যদি শুধু মেয়ে সন্তান থাকে এবং তারা দুইজন বা তার বেশি হয়, তাহলে তারা পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি একজন মেয়ে থাকে, তাহলে সে পাবে অর্ধেক। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ পাবে। আর যদি তার কোনো সন্তান না থাকে এবং শুধু পিতা-মাতাই তার উত্তরাধিকারী হয়, তাহলে তার মা পাবে এক-তৃতীয়াংশ। আর যদি মৃত ব্যক্তির ভাই-বোন থাকে, তাহলে তার মা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। এসব বণ্টন হবে মৃত ব্যক্তির অসিয়ত পূরণ এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমরা জানো না, তোমাদের পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে কে উপকারের দিক থেকে তোমাদের নিকটতর। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
আয়াতের ভাবার্থ:
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে মৃত ব্যক্তির সন্তান ও পিতা-মাতার মীরাসের অংশ ও বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করেছেন।
(ক) মৃত ব্যক্তির ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তান থাকলে তাদের অংশ: কেউ ছেলে ও মেয়ে সন্তান রেখে মারা গেলে, অন্যান্য প্রাপ্য উত্তরাধিকারীদের অংশ প্রদানের পর অবশিষ্ট সম্পদ একজন ছেলের অংশ একজন মেয়ের অংশের দ্বিগুণ—এই অনুপাতে তাদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
(খ) মৃত ব্যক্তির শুধু মেয়ে সন্তান থাকলে তাদের অংশ: যদি মৃত ব্যক্তির শুধু মেয়েরাই উত্তরাধিকারী হয়, তাহলে—
ক্স একজন মেয়ে থাকলে সে পাবে অর্ধেক (১/২)।
ক্স দুই বা ততোধিক মেয়ে থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে পাবে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩)।
নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ থাকলে, তা প্রাপ্য ‘আসাবা’ উত্তরাধিকারীর মধ্যে বণ্টন করা হবে।
(গ) মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার জীবিত পিতা-মাতার অংশ: মৃত ব্যক্তির এক বা একাধিক ছেলে বা মেয়ে থাকলে, তাঁর পিতা ও মাতা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) করে পাবেন। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ শরয়ী বিধান অনুযায়ী অন্যান্য প্রাপ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
(ঘ) মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকলে তার জীবিত পিতা-মাতার অংশ: যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকে এবং তাঁর পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হন, তাহলে মা পাবেন এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) এবং বাবা পাবেন অবশিষ্ট সম্পদ।
(ঙ) মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকা অবস্থায় একাধিক ভাই-বোন থাকলে পিতা-মাতার অংশ: যদি মৃত ব্যক্তির দুই বা ততোধিক ভাই-বোন থাকে, তাহলে তাঁর মা এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পাবেন এবং বাবা পাবেন অবশিষ্ট সম্পদ। এ অবস্থায় ভাই-বোনেরা মীরাসের কোনো অংশ পাবে না; পিতার উপস্থিতির কারণে তারা মীরাস থেকে বঞ্চিত হবে।
মীরাস বন্টনে ইলাহী নির্দেশনা: মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ ও বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়নের পর অবশিষ্ট সম্পদ উল্লেখিত নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। মানুষ জানে না—তার বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে কে দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য অধিক উপকারী হবে। তাই নিজের ইচ্ছামতো কারও অংশ কম-বেশি করার সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলা নিজেই প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির বিষয়ে সর্বজ্ঞ এবং তিনি যে বিধান দিয়েছেন, সে বিষয়ে পরম প্রজ্ঞাময়।(আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৪৩-৪৪৪; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৭৪; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৮; আল-মুনতাখাব: ১/১০৮) ।
আয়াতের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿دَيْن﴾ আয়াতাংশে ‘দাইন বা ঋণ দুই প্রকার: (ক) মানুষের পাওনা ঋণ এবং (খ) আল্লাহ তা’আলার হক বা ঋণ। এখানে ‘দাইন’ বলতে কোন প্রকারকে বুঝানো হয়েছে? এ সম্পর্কে ফোকাহায়ে কেরামের অভিমত নিম্নে-
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে এবং তার ওপর যাকাত বা ফরজ হজ আদায় করা বাকি থাকলে, মীরাস বণ্টনের আগে তার সম্পদ থেকে তা আদায় করতে হবে।
আর ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহ.) বলেন, মৃত ব্যক্তি যদি এ বিষয়ে ওসিয়ত করে যান, তাহলে তাঁর ওসিয়ত কার্যকর করা হবে। আর যদি তিনি ওসিয়ত না করে যান, তাহলে সম্পদ উত্তরাধিকারীদের জন্য থাকবে; এ বিষয়ে তাঁর বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছে ন্যস্ত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৪৪২; ইসলাম ওয়েব; ইফতায়ে মিসরিয়্যাহ এর ওয়েবসাইট থেকে) ।
﴿فَرِيضَةً﴾ ‘নির্ধারিত’, এর মাধ্যমে মীরাসের নির্ধারিত মোট ছয়টি অংশকে বোঝানো হয়েছে। এগুলো হলো—অর্ধেক (১/২), এক-চতুর্থাংশ (১/৪), এক-অষ্টমাংশ (১/৮), দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩), এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) এবং এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬)। (আইসারুত তাফাসীর, আল-জাযায়িরী: ১/৪৪২)।
পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে অত্র আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা সংক্ষেপে মীরাসের বিধান বর্ণনা করেছেন— “পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে যায়, তাতে নারী ও পুরুষ সকলের জন্য একটি নির্ধারিত অংশ রয়েছে”। এরপর এ আয়াতে সেই সংক্ষিপ্ত বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ ও মীরাসের বিধান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাহেলি যুগের প্রচলিত উত্তরাধিকারব্যবস্থার বিভিন্ন অন্যায় প্রথা বাতিল করা হয়েছে। সে সময় নারীদের ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। এমনকি ইসলাম যাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, তাদেরও কেউ কেউ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো। আল্লাহ তাআলা এসব জাহেলি প্রথা বাতিল করে ন্যায়সংগত ও সুনির্দিষ্ট মীরাসের বিধান প্রদান করেছেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৯৪) ।
মীরাসের আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ছয়টি প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থে জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একবার আমি অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং আবু বকর (রা.) পায়ে হেঁটে বনু সালামার এলাকায় আমাকে দেখতে আসেন। সেখানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে এমন অবস্থায় পেলেন যে, আমি কোনো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তিনি পানি আনিয়ে অজু করলেন এবং সেই পানির কিছু অংশ আমার ওপর ছিটিয়ে দিলেন। এতে আমার জ্ঞান ফিরে এলো। তখন আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল! আমার সম্পদ সম্পর্কে আপনি আমাকে কী নির্দেশ দিচ্ছেন?” তখন আয়াত নাজিল হলো: “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন…”।
আরেক বর্ণনায় জাবির (রা.) বলেন, সাদ ইবনু রাবি‘ (রা.)-এর স্ত্রী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! এরা সাদ ইবনু রাবি‘-এর দুই মেয়ে। তাদের বাবা উহুদের যুদ্ধে আপনার সঙ্গে থেকে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাদের চাচা তাদের সম্পদ নিয়ে নিয়েছেন এবং তাদের জন্য কোনো সম্পদই রেখে যাননি। অথচ সম্পদ না থাকলে তাদের বিয়েও হচ্ছে না।” রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা ফয়সালা করবেন।” এরপর মীরাসের আয়াত নাজিল হলো: “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন…”। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের চাচার কাছে লোক পাঠিয়ে বললেন, “সাদের দুই মেয়েকে দুই-তৃতীয়াংশ দাও, তাদের মাকে এক-অষ্টমাংশ দাও এবং যা অবশিষ্ট থাকে তা তোমার নাও”।
বর্ণনাকারীরা বলেন, এটিই ছিল ইসলামের যুগে প্রথম বণ্টিত মীরাসের সম্পদ।
হাফিজ ইবনু হাজার (রহ.) বলেন, কেউ কেউ এই বর্ণনার ভিত্তিতে মনে করেছেন যে, মীরাসের আয়াতটি মূলত সাদ ইবনু রাবি‘ (রা.)-এর দুই মেয়ের ঘটনা উপলক্ষে নাজিল হয়েছিল; জাবির (রা.)-এর ঘটনার কারণে নয়। কারণ, তখন জাবির (রা.)-এর কোনো সন্তান ছিল না। এর জবাবে বলা হয়েছে, সম্ভবত উভয় ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আয়াতটি নাজিল হয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে যে, আয়াতের প্রথম অংশটি সাদ ইবনু রাবি‘ (রা.)-এর দুই মেয়ের ঘটনা উপলক্ষে এবং পরবর্তী অংশ—যেখানে ‘কালালাহ’-এর কথা বলা হয়েছে—তা জাবির (রা.)-এর ঘটনা উপলক্ষে নাজিল হয়েছে। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ৮০)।
আয়াতের শিক্ষা:
ইসলাম মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য উত্তরাধিকার-বিধানকে সুস্পষ্ট ও সুশৃঙ্খলভাবে নির্ধারণ করেছে। এই আয়াত, সূরা আন-নিসার ১২ নম্বর আয়াত এবং সূরাটির সর্বশেষ আয়াত—এ তিনটি আয়াত মূলত উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধানসমূহের ভিত্তি। এগুলোতে ইসলামের উত্তরাধিকার-বিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াতগুলোর সঙ্গে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)-এর হাদিসটিও উত্তরাধিকার-বিধানের একটি মৌলিক নীতিকে নির্দেশ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “ألْحِقوا الفرائض بأهلها، فما بقي فلأولى رجل ذكر” অর্থাৎ- “নির্ধারিত অংশগুলো তাদের প্রাপ্য হকদারদের দিয়ে দাও। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকে, তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য”। উল্লিখিত আয়াতসমূহ ও এই হাদিসের সমন্বয়ে উত্তরাধিকার-বিধানের অধিকাংশ বিষয়, বরং প্রায় সমগ্র বিধানই সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। তবে দাদি ও নানির উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধান এ আয়াতগুলোতে সরাসরি উল্লেখিত হয়নি। এ বিষয়ে সুনান গ্রন্থগুলোতে মুগিরা ইবনু শু‘বা (রা.) ও মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) দাদিকে এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) সম্পত্তি প্রদান করেছেন। এ বিধানের ওপর আলেমগণের ইজমাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাফসীরে সাদীর ভাষ্যানুযায়ী আয়াতের মৌলিক শিক্ষাগুলো নিম্নে পেশ করা হলো-
১। সন্তানদের সম্পর্কে পিতামাতার প্রতি বিশেষ নির্দেশনা, আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তাআলা সন্তানদের সম্পর্কে পিতামাতার প্রতি বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সন্তানরা আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতামাতার জন্য এক মূল্যবান আমানত। তাই তাদের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব কেবল ভরণপোষণ ও পার্থিব প্রয়োজন পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও আত্মিক বিকাশ নিশ্চিত করাও এ দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিতামাতার কর্তব্য হলো সন্তানদের সঠিক আকিদা ও ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, উত্তম শিষ্টাচার ও নৈতিক গুণাবলিতে গড়ে তোলা এবং সব ধরনের অন্যায়, অনৈতিকতা ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে তাদের রক্ষা করা। একই সঙ্গে তাদের আল্লাহর আনুগত্য, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ এবং সৎকর্মের প্রতি ভালোবাসা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। আল্লাহ তা’আলা বলেন—
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا﴾
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো” (সূরাতু আত-তাহরিম: ৬)। এই আয়াতের আলোকে পিতামাতার দায়িত্ব হলো নিজেদের পাশাপাশি সন্তানদের ঈমান ও আমলকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা। সন্তানদের লালন-পালন, শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে অবহেলা করলে পিতামাতাকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হতে পারে।
সন্তানদের প্রতি পিতামাতার ভালোবাসা স্বভাবজাত ও গভীর হলেও আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহ পিতামাতার ভালোবাসার চেয়েও ব্যাপক। তিনি সন্তানদের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তাই সন্তানদের পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি পিতামাতার দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন এবং তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। (তাসীরে সা’দী: ১/১৬৬) ।
২। সন্তানদের উত্তরাধিকার লাভের পদ্ধতি, আয়াতের দ্বিতীয় অংশ থেকে আল্লাহ তাআলা সন্তানদের উত্তরাধিকার লাভের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন— “একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান”। এ বিধান মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত সন্তান এবং পুত্রের সন্তান—উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ, নির্ধারিত অংশপ্রাপ্ত কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে, অথবা নির্ধারিত অংশগুলো বণ্টনের পর সম্পদ অবশিষ্ট থাকলে, পুত্র ও কন্যারা অবশিষ্ট সম্পদ ‘একজন পুত্রের জন্য দুই কন্যার সমান’ নীতির ভিত্তিতে বণ্টন করবে। এ বিষয়ে আলেমগণের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত পুত্র ও কন্যা উভয়েই জীবিত থাকলে পুত্রের সন্তানরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আলোচ্য অংশে পুত্র ও কন্যা উভয়ে একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে তাদের উত্তরাধিকার-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। আর সন্তানদের মধ্যে কেবল পুত্র অথবা কেবল কন্যা থাকলে তাদের উত্তরাধিকার লাভের বিধান পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হয়েছে।
৩। কন্যাদের উত্তরাধিকার অংশ, আয়াতের তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা’আলা কন্যাদের উত্তরাধিকার অংশ সম্পর্কে বলেন- “আর যদি শুধু কন্যা থাকে, দুইয়ের অধিক, তবে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ”। অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত কন্যা অথবা পুত্রের কন্যা তিনজন বা তার বেশি হলে তারা সম্মিলিতভাবে পরিত্যক্ত সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি কেবল একজন কন্যা থাকে, তাহলে সে পাবে মোট সম্পত্তির অর্ধেক। এ বিষয়ে আলেমগণের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হতে পারে— দুইজন কন্যা দুই-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি পাবে—এ বিধান কীভাবে জানা যায়? কারণ, আলোচ্য আয়াতে সরাসরি দুইজন কন্যার কথা উল্লেখ করা হয়নি। এর উত্তর হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী— “আর যদি সে একজন কন্যা হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক”। এ বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, কন্যার সংখ্যা একজনের বেশি হলে তাদের নির্ধারিত অংশ আর অর্ধেক থাকবে না। আর অর্ধেকের অতিরিক্ত কন্যাদের জন্য নির্ধারিত অংশ হলো দুই-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা বলেছেন— “একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান”। যদি কোনো ব্যক্তি একজন পুত্র ও একজন কন্যা রেখে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে পুত্র মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ এবং কন্যা এক-তৃতীয়াংশ পাবে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা পুত্রের অংশকে দুই কন্যার অংশের সমতুল্য করেছেন, সেহেতু এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, দুই কন্যার সম্মিলিত অংশ হলো দুই-তৃতীয়াংশ।
এ বিষয়ে আরও একটি যুক্তি হলো—কোনো কন্যা যদি তার ভাইয়ের সঙ্গে সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পেতে পারে, যদিও ভাইয়ের উপস্থিতি তার জন্য বোনের উপস্থিতির তুলনায় অধিক ক্ষতিকর, তাহলে আপন বোনের সঙ্গে থাকলে সে দুই-তৃতীয়াংশ পাওয়ার অধিক উপযুক্ত।
এ ছাড়া সহোদরা দুই বোন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর যদি তারা দুই বোন হয়, তবে তারা তার পরিত্যক্ত সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ পাবে” (সূরাতু আন-নিসা: ১৭৬)। এ আয়াতে দুই বোনের দুই-তৃতীয়াংশ পাওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং, যখন দূরবর্তী সম্পর্কের দুই বোন দুই-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারী হয়, তখন নিকটতর সম্পর্কের দুই কন্যা এ অংশ পাওয়ার অধিক উপযুক্ত। সহিহ হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সৃ.) সা‘দ (রা.)-এর দুই কন্যাকে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ প্রদান করেছিলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তাআলা কেন বলেছেন— “দুইয়ের অধিক কন্যা হলে…” এর মধ্যে কী তাৎপর্য নিহিত রয়েছে? এর উত্তরে বলা যায়— আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। আয়াতে ‘দুইয়ের অধিক’ বলার উদ্দেশ্য হলো, বোঝানো যে, কন্যার সংখ্যা দুইয়ের বেশি হলেও তাদের সম্মিলিত নির্ধারিত অংশ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না। অর্থাৎ, দুইজন বা তার বেশি কন্যার জন্য নির্ধারিত অংশ হলো মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ।
এ আয়াত থেকে আরও জানা যায়, যদি একজন ঔরসজাত কন্যা এবং একজন বা একাধিক পুত্রের কন্যা থাকে, তাহলে ঔরসজাত কন্যা মোট সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। এরপর কন্যাদের জন্য নির্ধারিত দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ণ করার লক্ষ্যে অবশিষ্ট এক-ষষ্ঠাংশ পুত্রের কন্যা বা কন্যারা পাবে। এ এক-ষষ্ঠাংশকে ‘দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ণকারী অংশ’ বলা হয়। এভাবে, একজন পুত্রের কন্যার সঙ্গে তার চেয়ে নিম্নস্তরের একাধিক পুত্রের কন্যা থাকলেও একই বিধান হবে।
আয়াতের এ বিধান থেকে আরও জানা যায়, যখন ঔরসজাত কন্যা অথবা পুত্রের কন্যারা সম্মিলিতভাবে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ণ করে ফেলবে, তখন তাদের নিম্নস্তরের পুত্রের কন্যারা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ, আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্য সর্বোচ্চ দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন, যা ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে। এরপর তাদের নিম্নস্তরের উত্তরাধিকারীদের অংশ দেওয়া হলে নির্ধারিত দুই-তৃতীয়াংশের অতিরিক্ত সম্পদ প্রদান করতে হবে, যা আয়াতের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থী। এ সকল বিধানের ওপর আলেমগণের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৬৬) ।
৪। উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পদের পরিধি, আয়াতের চতূর্থ অংশে আল্লাহ তা’আলা উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পদের পরিধি নিয়ে আলোচনা করেছেন। আল্লাহ তা’আলার বাণী— “সে যা কিছু রেখে গেছে, তার মধ্য থেকে…”। এ বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর পর যে সকল সম্পদ রেখে যান, উত্তরাধিকারীরা সেসব সম্পদের মধ্য থেকেই তাঁদের নির্ধারিত অংশ লাভ করবেন। এর অন্তর্ভুক্ত হলো: স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, আসবাবপত্র, স্বর্ণ, রৌপ্যসহ যাবতীয় সম্পদ।
এমনকি মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রাপ্য কোনো ক্ষতিপূরণের অর্থও তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। একইভাবে, অন্য কোনো ব্যক্তির জিম্মায় থাকা মৃত ব্যক্তির পাওনা ঋণও তাঁর উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৬৬) ।
৫। পিতা-মাতার উত্তরাধিকার, আয়াতের পঞ্চমাংশে আল্লাহ তা’আলা পিতা-মাতার উত্তরাধিকার সম্পর্কে বলেন— “আর তার পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য সে যা রেখে গেছে, তার এক-ষষ্ঠাংশ—যদি তার সন্তান থাকে”। অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত সন্তান অথবা পুত্রের সন্তান থাকলে—সন্তান পুত্র হোক বা কন্যা, একজন হোক বা একাধিক—মৃত ব্যক্তির পিতা ও মাতা প্রত্যেকেই এক-ষষ্ঠাংশ করে উত্তরাধিকার লাভ করবেন।
মৃত ব্যক্তির একজন বা একাধিক সন্তান থাকলে মা এক-ষষ্ঠাংশের বেশি পাবেন না।
পিতার ক্ষেত্রে বিধানটি কিছুটা ভিন্ন। মৃত ব্যক্তির পুত্রসন্তান থাকলে পিতা এক-ষষ্ঠাংশের বেশি পাবেন না। তবে মৃত ব্যক্তির সন্তান কন্যা হলে, নির্ধারিত অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পদের বিধান পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হবে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি পিতা-মাতা ও দুই কন্যা রেখে মৃত্যুবরণ করলে, দুই কন্যা সম্মিলিতভাবে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ এবং পিতা ও মাতা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ করে পাবেন। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশগুলো বণ্টনের পর কোনো সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে পিতা অতিরিক্ত কোনো অংশ ‘আসাবা’ হিসেবে পাবেন না। অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তি যদি একজন কন্যা রেখে যান, তাহলে কন্যা নির্ধারিত অর্ধেক পাওয়ার পর সম্পদের অবশিষ্টাংশ পিতা লাভ করবেন। এ ক্ষেত্রে পিতা এক-ষষ্ঠাংশ নির্ধারিত অংশ হিসেবে এবং অবশিষ্ট সম্পদ ‘আসাবা’ হিসেবে পাবেন। এর কারণ হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “নির্ধারিত অংশগুলো তাদের প্রাপ্য হকদারদের দিয়ে দাও। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকে, তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য”। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির পিতা তাঁর ভাই, চাচা ও অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়ের তুলনায় অধিক নিকটবর্তী। তাই অবশিষ্ট সম্পদের ক্ষেত্রে পিতাই তাঁদের ওপর অগ্রাধিকার লাভ করবেন। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৬৬) ।
৬। সন্তান না থাকলে পিতা-মাতার উত্তরাধিকার, আয়াতের ষষ্ঠ অংশে আল্লাহ তা’আলা বলেন— “আর যদি তার কোনো সন্তান না থাকে এবং তার পিতা-মাতাই তার উত্তরাধিকারী হয়, তবে তার মায়ের জন্য এক-তৃতীয়াংশ”। এবং অবশিষ্ট সম্পদ পিতা পাবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা সম্পদকে পিতা ও উভয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন এবং এরপর মায়ের অংশ নির্ধারণ করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, অবশিষ্ট অংশ পিতার প্রাপ্য। এ থেকে জানা যায়, সন্তান না থাকলে পিতা কোনো নির্ধারিত অংশের অধিকারী হয় না; বরং সে ‘আসাবা’ হিসেবে সম্পূর্ণ সম্পদ অথবা নির্ধারিত অংশ প্রদানের পর অবশিষ্ট সম্পদ লাভ করে।
তবে যদি পিতা-মাতার সঙ্গে স্বামী বা স্ত্রীও থাকে, তাহলে বিধানটি ভিন্ন হবে। এ দুটি পরিস্থিতিকে ‘উমারিয়্যাতাইন’ বলা হয়। এ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী প্রথমে তার নির্ধারিত অংশ পাবে। এরপর মা অবশিষ্ট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পাবে এবং বাকি অংশ পিতা পাবে। এর প্রমাণ হলো আল্লাহ তাআলার বাণী— “এবং তার পিতা-মাতাই তার উত্তরাধিকারী হলে তার মায়ের জন্য এক-তৃতীয়াংশ”। অর্থাৎ, পিতা-মাতা যে সম্পদের উত্তরাধিকারী হচ্ছে, তার এক-তৃতীয়াংশ মায়ের প্রাপ্য। এই দুই পরিস্থিতিতে মায়ের অংশ হয়— মৃত ব্যক্তি স্বামী, মা ও পিতা রেখে গেলে মা অবশিষ্ট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পাবে, যা মোট সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশের সমান। মৃত ব্যক্তি স্ত্রী, মা ও পিতা রেখে গেলে মা অবশিষ্ট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পাবে, যা মোট সম্পদের এক-চতুর্থাংশের সমান।
৭। ভাই-বোন থাকলে মায়ের উত্তরাধিকার, আয়াতের সপ্তম অংশে আল্লাহ তা’আলা ভাই-বোন থাকলে মায়ের উত্তরাধিকার অংশ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন— “আর যদি তার ভাই-বোন থাকে, তবে তার মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ”। এখানে ভাই-বোন বলতে সহোদর ভাই-বোন, বৈমাত্রেয় ভাই-বোন অথবা বৈপিত্রেয় ভাই-বোন—সবাইকে বোঝানো হতে পারে। তারা পুরুষ বা নারী যেকোনো হতে পারে। তারা উত্তরাধিকারী হোক অথবা পিতা কিংবা দাদার কারণে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হোক। তবে কেউ কেউ বলেছেন, “যদি তার ভাই-বোন থাকে”—এ বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ উত্তরাধিকার পাওয়ার যোগ্য ভাই-বোনদের অন্তর্ভুক্ত করে; উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত ভাই-বোনদের নয়। কারণ, যারা অন্য কোনো কারণে বঞ্চিত, তাদের ক্ষেত্রে এ আয়াত প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। দ্বিতীয় মতের পক্ষে একটি যুক্তি হলো—ভাই-বোনদের কারণে মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-ষষ্ঠাংশে নেমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, যাতে ভাই-বোনেরা সম্পদ থেকে কিছু অংশ পেতে পারে। কিন্তু তারা যদি নিজেরাই উত্তরাধিকার না পায়, তাহলে মায়ের অংশ কমানোর কারণ থাকে না। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। তবে মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-ষষ্ঠাংশে নামিয়ে দেওয়ার জন্য ভাই-বোনের সংখ্যা কমপক্ষে দুইজন হতে হবে।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে, আয়াতে তো ‘ভাই-বোন’ শব্দটি বহুবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর উত্তর হলো, এখানে বহুবচন দ্বারা মূলত একাধিক বোঝানো হয়েছে। আর আরবি ভাষায় কখনো কখনো দুইজনকেও বহুবচন শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়। যেমন, আল্লাহ তাআলা দাউদ ও সুলাইমান (আ.) সম্পর্কে বলেছেন— “আমি তাদের বিচারকার্যের সাক্ষী ছিলাম”। এখানে দুজনকে বোঝাতে বহুবচন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
আবার মায়ের দিকের ভাই-বোনদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন— “আর যদি কোনো পুরুষ বা নারী নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় এবং তার একজন ভাই বা একজন বোন থাকে, তবে তাদের প্রত্যেকের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ। আর তারা এর চেয়ে বেশি হলে তারা এক-তৃতীয়াংশে শরিক হবে”। এ আয়াতেও দুইজন বা তার বেশি বোঝাতে বহুবচন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আলেমগণের ঐকমত্য অনুযায়ী, এখানে বহুবচন দ্বারা দুইজন বা তার বেশি বোঝানো হয়েছে।
সুতরাং, যদি কোনো ব্যক্তি মা, পিতা ও একাধিক ভাই-বোন রেখে মারা যায়, তাহলে মায়ের অংশ হবে এক-ষষ্ঠাংশ এবং অবশিষ্ট সম্পদ পিতা পাবে। এ ক্ষেত্রে ভাই-বোনেরা পিতার কারণে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হলেও তারা মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-ষষ্ঠাংশে নামিয়ে দেবে।
অন্য একটি মত অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ হবে এবং অবশিষ্ট অংশ পিতা পাবে। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৬৬) ।
৮। ঋণ ও অসিয়ত পরিশোধের পর উত্তরাধিকার বণ্টন, আয়াতের অষ্টম অংশে আল্লাহ তা’আলা বলেন— “উত্তরাধিকার অংশ বণ্টন করা হবে মৃত ব্যক্তির অসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর”। অর্থাৎ, উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্ধারিত অংশগুলো মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে তখনই প্রদান করা হবে, যখন তার ওপর থাকা ঋণ (তা আল্লাহর হকসংক্রান্ত হোক অথবা মানুষের অধিকারসংক্রান্ত) পরিশোধ করা হবে এবং তার বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা হবে। ঋণ ও অসিয়ত পরিশোধের পর যে সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে, সেটিই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য সম্পদ বা ‘তারিকাহ’ হিসেবে গণ্য হবে।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে, আয়াতে ঋণের আগে অসিয়তের কথা উল্লেখ করার কারণ কি। এর উত্তরে বলা যায়, অসিয়ত বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য। কেননা, অনেক সময় উত্তরাধিকারীদের জন্য অসিয়ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বাস্তব বিধানের দিক থেকে ঋণ অসিয়তের আগে পরিশোধ করতে হবে। ঋণ মৃত ব্যক্তির সম্পদের মূল অংশ থেকেই পরিশোধ করা হবে। আর অসিয়তের বিধান হলো—উত্তরাধিকারী নয় এমন কোনো ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ পর্যন্ত অসিয়ত করা বৈধ। এর বেশি অসিয়ত কার্যকর হবে না। আর কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত করলে তা অন্য উত্তরাধিকারীদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হবে না। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৬৬) ।
৯। উত্তরাধিকার বন্টনে আল্লাহর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, আয়াতের নবম অংশে আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী, তা তোমরা জানো না”। অর্থাৎ, উত্তরাধিকার বণ্টনের বিষয়টি যদি মানুষের বুদ্ধি, পছন্দ ও অনুমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হতো, তাহলে এতে এমন জটিলতা ও ক্ষতি সৃষ্টি হতে পারত, যার প্রকৃত পরিণতি আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কেউ জানে না। কারণ, মানুষের জ্ঞান সীমিত। কোনো ব্যক্তি সব সময়, স্থান ও পরিস্থিতির জন্য কোন ব্যবস্থা অধিক কল্যাণকর—তা পূর্ণাঙ্গভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। মানুষ এটিও জানে না যে, তার সন্তানদের মধ্যে কে ভবিষ্যতে তার জন্য অধিক উপকারী হবে, কিংবা তার পিতা-মাতার মধ্যে কে তার দীন ও দুনিয়ার কল্যাণে অধিক সহায়ক হবে। তাই আল্লাহ তা’আলা নিজ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করেছেন। এতে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে এবং মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে সম্ভাব্য জুলুম ও বৈষম্যের পথ বন্ধ হয়েছে। সুতরাং, উত্তরাধিকার বিধান কেবল সম্পদ বণ্টনের একটি পদ্ধতি নয়; বরং এটি আল্লাহ তা’আলার পরিপূর্ণ জ্ঞান, হিকমাহ ও ন্যায়বিচারের প্রকাশ।
১০। উত্তরাধিকার বন্টন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান, আয়াতের দশম অংশে আল্লাহ তা’আলা বলেন— “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”। অর্থাৎ, এই উত্তরাধিকার-বিধান সেই আল্লাহ তা’আলা নির্ধারণ করেছেন, যাঁর জ্ঞান সমগ্র সৃষ্টিজগতকে পরিবেষ্টন করে আছে। তিনি তাঁর শরিয়তের বিধানসমূহ পূর্ণ জ্ঞান ও পরম প্রজ্ঞার ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক বিধানকে যথাযথ ও সুদৃঢ়ভাবে স্থির করেছেন। মানুষের সীমিত জ্ঞান ও বুদ্ধি এমন একটি বিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম নয়, যা সব সময়, সব স্থান ও সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে কল্যাণকর ও উপযোগী হতে পারে। পক্ষান্তরে, আল্লাহ তা’আলার নির্ধারিত বিধান তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও পরম প্রজ্ঞার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তাই মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহর বিধানের প্রতি আস্থা রাখা, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং এর অন্তর্নিহিত হিকমাহ ও কল্যাণ উপলব্ধি করার চেষ্টা করা।
আয়াতের আমল:
(ক) উত্তরাধিকারীদের অংশ নিজের ইচ্ছামতো কম-বেশি না করে আল্লাহ তা’আলা যেভাবে নির্ধারণ করেছেন, সেভাবেই সম্পদ বণ্টন করা।
(খ) মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ এবং শরিয়তসম্মত ওসিয়ত বাস্তবায়নের পর অবশিষ্ট সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা।
(গ) পিতা-মাতা ও সন্তানদের প্রতি সদাচরণ করা এবং উত্তরাধিকারসহ তাদের শরিয়ত নির্ধারিত অধিকার যথাযথভাবে প্রদান করা।
(ঘ) নিজের জ্ঞান ও পছন্দকে আল্লাহর বিধানের ওপর প্রাধান্য না দিয়ে বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের কল্যাণ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ও পরম প্রজ্ঞাময়।
