Skip to main content

সূরাতু আন-নিসা-এর (৫-৬) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের বিধান|

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَلا تُؤْتُوا السُّفَهاءَ أَمْوالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِياماً وَاُرْزُقُوهُمْ فِيها وَاُكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَعْرُوفاً (5) وَاِبْتَلُوا الْيَتامى حَتّى إِذا بَلَغُوا النِّكاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْداً فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوالَهُمْ وَلا تَأْكُلُوها إِسْرافاً وَبِداراً أَنْ يَكْبَرُوا وَمَنْ كانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَنْ كانَ فَقِيراً فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ فَإِذا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ وَكَفى بِاللهِ حَسِيباً (6)﴾ [سورة النساء: 5-6].

আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের বিধান|
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(৫) আর তোমরা তোমাদের সেই সম্পদ, যা আল্লাহ তোমাদের জীবন-জীবিকার অবল¤^ন করেছেন, তা নির্বুদ্ধি ও আর্থিকভাবে অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিও না| তবে সেই সম্পদ থেকেই তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাকের ব্যবস্থা করো এবং তাদের সঙ্গে উত্তম ও সান্ত্বনামূলক কথা বলো|
(৬) আর তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করতে থাকো, যতক্ষণ না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছে| এরপর যদি তাদের মধ্যে আর্থিক বিচক্ষণতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা দেখতে পাও, তবে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও| তারা বড় হয়ে যাবে—এই আশঙ্কায় তাড়াহুড়া করে অপচয় বা অন্যায়ভাবে তাদের সম্পদ ভোগ করো না| যে অভিভাবক সচ্ছল, সে যেন (এতিমের সম্পদ থেকে) বিরত থাকে; আর যে অভাবগ্রস্ত, সে যেন ন্যায়সংগতভাবে (প্রয়োজন অনুযায়ী) গ্রহণ করে| অতঃপর যখন তাদের কাছে তাদের সম্পদ হস্তান্তর করবে, তখন এ বিষয়ে সাক্ষী রাখবে| আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট|
আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা‘আলা ধারাবাহিকভাবে তাঁর মুমিন বান্দাদের এমন সব বিধান শিক্ষা দিচ্ছেন, যা তাদের দুনিয়ার জীবনকে সুশৃঙ্খল ও কল্যাণময় এবং আখিরাতের জীবনকে সফল ও মুক্তির উপযোগী করে তোলে|
সূরা আন-নিসার ৫ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, নির্বোধ ও আর্থিক বিষয়ে অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া যাবে না| কারণ, সম্পদ মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম প্রধান অবল¤^ন| এখানে নির্বোধ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিচক্ষণ নয়| সে নারী, পুরুষ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক—যেই হোক না কেন| আশঙ্কা থাকে, তারা সম্পদ অপচয় করবে বা অন্যায়ভাবে নষ্ট করবে| তবে তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাকের ব্যবস্থা অভিভাবকদেরই করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সদয়, সান্ত্বনামূলক ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে| এখানে সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সম্পদকে ব্যবসা, কৃষি, শিল্প বা অন্য কোনো ˆবধ উপায়ে বিনিয়োগ করে মূলধন অক্ষুণ্ন রেখে তার লাভ থেকে ইয়াতিমের ব্যয় নির্বাহ করা অধিক উত্তম ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক|
৬ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতিমদের সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালা বর্ণনা করেছেন| তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ইয়াতিমরা বয়ঃপ্রাপ্তির নিকটবর্তী হলে তাদের বিচক্ষণতা ও সম্পদ পরিচালনার যোগ্যতা পরীক্ষা করতে হবে| এজন্য তাদের কিছু সম্পদ দিয়ে লেনদেন বা ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ দেওয়া হবে| যদি দেখা যায়, তারা দায়িত্বশীলভাবে সম্পদ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের নিকট ফিরিয়ে দিতে হবে| সম্পদ হস্তান্তরের সময় সাক্ষী রাখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ বা অভিযোগের অবকাশ না থাকে| আর সর্বশেষ হিসাব গ্রহণকারী ও সর্বদ্রষ্টা তো আল্লাহই| এরপর আল্লাহ অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেছেন, তারা যেন এতিমের সম্পদ অপচয় না করে এবং এতিম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে তা আত্মসাৎ না করে| সবশেষে অভিভাবকদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে| যে অভিভাবক সচ্ছল, তার উচিত এতিমের সম্পদ থেকে কোনো পারিশ্রমিক বা সুবিধা গ্রহণ না করা| আর যে অভিভাবক অভাবগ্রস্ত, সে প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়সংগতভাবে তা থেকে গ্রহণ করতে পারবে| অর্থাৎ, প্রয়োজন হলে সে তা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে পরে সামর্থ্য হলে পরিশোধ করবে, অথবা ইয়াতিমের সম্পদ পরিচালনার বিনিময়ে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যুক্তিসংগত পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারবে| তবে সচ্ছল অভিভাবকের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে ইয়াতিমের সেবা করা অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ| আর আল্লাহ তা‘আলা কখনো সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৭-৪৩৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৪৮-২৪৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১০৬-১০৭) |
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তাআলার বাণী ﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾-এ স¤ে^াধন কার প্রতি—এ বিষয়ে মুফাসসিরগণের দুটি মত রয়েছে|
প্রথম মত: এ আয়াতে ইয়াতিমদের অভিভাবকদের স¤ে^াধন করা হয়েছে| অর্থাৎ, “হে অভিভাবকগণ! তোমাদের তত্ত্বাবধানে থাকা অবিবেচক ইয়াতিমদের সম্পদ তাদের হাতে তুলে দিও না”| এ মতের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো, পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে—﴿وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ﴾ ‘তোমরা তাদেরকে এ সম্পদ থেকেই জীবিকা দাও এবং পোশাক দাও’| এ দায়িত্ব মূলত অভিভাবকদের ওপরই বর্তায়| তাছাড়া এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর সঙ্গে এ আয়াতের বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতাও অক্ষুণ্ন থাকে|
দ্বিতীয় মত: কিছু আলেমের মতে, এখানে পিতাদের স¤ে^াধন করা হয়েছে| অর্থাৎ, যদি তাদের সন্তানরা সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে অদক্ষ হয়, তবে তারা যেন তাদের হাতে সম্পদ তুলে না দেন| এতে সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে|
আল-রাযী (রহ.) প্রথম মতকে অধিক শক্তিশালী বলে অভিহিত করেছেন| তাঁর যুক্তি হলো—
(ক) আয়াতের নিষেধাজ্ঞা মূলত অভিভাবকদের জন্য প্রযোজ্য| কারণ, উম্মতের ঐকমত্য (ইজমা) হলো—অভিভাবকের জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ ব্যক্তির হাতে তার সম্পদ তুলে দেওয়া হারাম| পক্ষান্তরে, নিজের সম্পদ থেকে পিতা চাইলে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে বা পরিবারের সদস্যদের দান করতে পারেন; এটি হারাম নয়| সুতরাং আয়াতটি পিতার নিজের সম্পদের বিষয়ে নয়, বরং অভিভাবকের অধীনস্থ ব্যক্তির সম্পদের বিষয়ে|
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে—﴿وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ ‘তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম কথা বলো’| এ নির্দেশ ইয়াতিমদের ক্ষেত্রেই অধিক উপযোগী| কারণ, মানুষ ¯^ভাবতই নিজের সন্তানের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলে; এ বিষয়ে আলাদা নির্দেশের প্রয়োজন হয় না| কিন্তু এতিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও কোমল ভাষায় কথা বলার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন| তবে ইমাম রাযী (রহ.) এটিও উল্লেখ করেছেন যে, আয়াতের অর্থ উভয় ক্ষেত্রেই (অভিভাবক ও পিতা) প্রযোজ্য হতে পারে| (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী, ৯/৪৯৪-৪৯৫) |
﴿السُّفَهاءَ﴾ ‘নির্বোধগণ’, আয়াতে ‘সুফাহা’ শব্দ দ্বারা কাদেরকে বোঝানো হয়েছে—এ বিষয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে দুটি মত পাওয়া যায়|
(ক) অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে এমন সব ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা আর্থিক বিষয়ে অপরিপক্ব, অবিবেচক বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ| ফলে তারা সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে সক্ষম নয়| তাই তাদের হাতে সরাসরি সম্পদ তুলে না দিয়ে তাদের প্রয়োজন পূরণ এবং সম্পদ নিরাপদে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে|
(খ) অপরদিকে, কিছু মুফাসসিরের মতে, এখানে বিশেষভাবে এতিমদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে| অর্থাৎ, যতদিন তারা পরিপক্বতা ও আর্থিক বিচক্ষণতা অর্জন না করবে, ততদিন তাদের সম্পদ অভিভাবকের তত্ত্বাবধানেই থাকবে| (তাফসীর গরীব আল-আল-কুরআন, আল-কাওয়ারী, ৪/৫)|
তবে এখানে দ্বিতীয় মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য| কারণ, এ আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ইয়াতিমদের অধিকার, তাদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং অভিভাবকের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে| তাই প্রসঙ্গগত দিক থেকে এখানে ‘السفهاء’ শব্দ দ্বারা ইয়াতিমদের উদ্দেশ্য করাই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়| (আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন) |
﴿أَمْوالَكُم﴾ “তোমাদের সম্পদ”, আয়াতে অভিভাবকদের স¤ে^াধন করে বলা হয়েছে ‘তোমাদের সম্পদ’, অথচ সম্পদের মালিক হলো ইয়াতিম ব্যক্তি| তাহলে আল্লাহ তা’আলা কেন ﴿أموالكم﴾ (তোমাদের সম্পদ) বলেছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মুফাসসিরগণ দুটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন—
(ক) এখানে সম্পদকে অভিভাবকদের দিকে স¤^ন্ধযুক্ত করা হয়েছে মালিকানার কারণে নয়, বরং তাদের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার অধিকার থাকার কারণে| অর্থাৎ, সম্পদের ওপর ˆবধভাবে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব থাকলেই এ ধরনের স¤^ন্ধ আরোপ ভাষাগতভাবে শুদ্ধ|
(খ) এখানে একই মানবসমাজের ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় সম্পদকে অভিভাবকদের দিকে স¤^ন্ধযুক্ত করা হয়েছে| অর্থাৎ, একজনের কল্যাণ অন্যজনের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত| কুরআনে এ ধরনের ব্যবহার আরও রয়েছে| যেমন—
﴿فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ﴾ — “তোমরা নিজেদের হত্যা করো” (সূরা আল-বাকারা: ৫৪)|
﴿ثُمَّ أَنْتُمْ هَؤُلَاءِ تَقْتُلُونَ أَنْفُسَكُمْ﴾ — “অতঃপর তোমরাই একে অপরকে হত্যা করছ” (সূরা আল-বাকারা: ৮৫)|
এখানে কেউ নিজেকে হত্যা করেনি; বরং একই জাতির মানুষ পরস্পরকে হত্যা করেছে| তবুও পারস্পরিক সম্পর্ক ও একত্বের কারণে ‘নিজেদের’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে| অনুরূপভাবে, এতিমদের সম্পদও সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ; এর সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অভিভাবকদের ওপর অর্পিত| এ কারণেই কুরআন তাদের সম্পদকে ﴿أموالكم﴾—“তোমাদের সম্পদ” বলে উল্লেখ করেছে| (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী, ৯/৪৯৪-৪৯৫)|

পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে অত্র আয়াতদ্বয়ের সম্পর্ক:
আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং নারীদের তাদের মোহর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন| আর এ আয়াতে তিনি উভয় ক্ষেত্রেই সম্পদ হস্তান্তরের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নির্ধারণ করেছেন: (ক) সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা (সাফাহ বা সম্পদ সংরক্ষণে অদক্ষ না হওয়া) এবং (খ) পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের বিচক্ষণতা ও সক্ষমতা যাচাই করা| এ দুটি শর্তের উদ্দেশ্য হলো, তাদের সম্পদ যেন নিরাপদ থাকে এবং অপচয় বা ক্ষতির হাত থেকে সংরক্ষিত হয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৪৮) |
ছয় ন¤^র আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
এ আয়াতটি সাবিত ইবনু রিফাআহ (রা.) এবং তাঁর চাচাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে| ঘটনার বিবরণ হলো, রিফাআহ ইন্তিকাল করলে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে সাবিত এতিম হয়ে যায়| তাঁর চাচা সাবিতের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন| এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাতিজা একজন এতিম এবং সে আমার তত্ত্বাবধানে রয়েছে| তার সম্পদ থেকে আমার জন্য কী পরিমাণ গ্রহণ করা ˆবধ? আর কখন আমি তার সম্পদ তার কাছে হস্তান্তর করব?” তখন আল্লাহ তা’আলা ত্র আয়াত নাযিল করে ইয়াতিমের সম্পদ সংরক্ষণ, অভিভাবকের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তা থেকে গ্রহণের সীমা এবং কখন এতিমের কাছে তার সম্পদ হস্তান্তর করতে হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিধান মানবজাতির জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন| (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১৪৭) |
আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
এ আয়াতদ্বয় ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত| এতে একদিকে এতিম ও দুর্বলদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে অভিভাবকদের আমানতদারিতা, ¯^চ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহভীতির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| এর মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| বিশেষত, এতিমদের সম্পদ সংরক্ষণ ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ আয়াতদ্বয়ে অভিভাবকদের জন্য নয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রদান করা হয়েছে, যা নিম্নে আলোচনা করা হলো|
(ক) আর্থিক বিষয়ে অপরিপক্ব, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ কিংবা প্রতিবন্ধির হাতে সম্পদ অর্পণ করা যাবে না| আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾ অর্থাৎ, যারা সম্পদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার যোগ্যতা রাখে না, তাদের হাতে সম্পদ তুলে দিও না| এর উদ্দেশ্য হলো সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১৮৭; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/২৯)|
(খ) ইয়াতিমদের আর্থিক অযোগ্যতার কারণে তাদের হাতে সম্পদ অর্পণ না করা গেলেও তাদের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা অভিভাবকের দায়িত্ব| ইসলাম একদিকে যেমন ইয়াতিমদের সম্পদ অপচয় ও অপব্যবহার থেকে রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের মৌলিক অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| তাই কোনো ইয়াতিম সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ হওয়ার কারণে তার হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া না হলেও, তার খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের দায়িত্ব অভিভাবককে যথাযথভাবে পালন করতে হবে| এসব ব্যয় তার সম্পদ থেকেই বহন করা হবে, যাতে তার সম্পদ সংরক্ষিত থাকার পাশাপাশি তার ¯^াভাবিক জীবনযাপনও নিশ্চিত হয়| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ﴾ “তোমরা তাদের ওই সম্পদ থেকেই জীবিকার ব্যবস্থা করো এবং তাদেরকে পোশাক প্রদান করো”|
আয়াতে ﴿فِيهَا﴾ (তাতে/ওই সম্পদে) শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইয়াতিমের মূলধন অক্ষুণ্ন রেখে তা ব্যবসা, কৃষি বা অন্য কোনো ˆবধ উপায়ে বিনিয়োগ করে অর্জিত আয় থেকে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা উচিত| এতে একদিকে মূল সম্পদ সংরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে এতিমের প্রয়োজনও পূরণ হয়| (তাফসীর আল-বাগাভী: ২/১৬৪; তাফসীর ইবন কাসীর: ২/২১৫; আল-তাফসীর আল-মুনীর, ৪/২৪৯) | অতএব, এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সম্পদ হস্তান্তর সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যেতে পারে; কিন্তু ইয়াতিমের মৌলিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ থেকে তাকে কখনোই বঞ্চিত করা যাবে না| বরং তার সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ ও কল্যাণকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তার সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব|
(গ) এতিম ও দুর্বলদের সঙ্গে সদাচরণ ও উত্তম ভাষায় কথা বলতে হবে| ইয়াতিমদের সম্পদ সাময়িকভাবে তাদের হাতে অর্পণ না করা হলেও তাদের প্রতি কঠোর, অবজ্ঞাসূচক বা কষ্টদায়ক আচরণ করা ˆবধ নয়| বরং অভিভাবকের কর্তব্য হলো তাদের সঙ্গে সদয়, সম্মানজনক ও আশ্বাসমূলক ভাষায় কথা বলা, যাতে তারা নিজেদের অবহেলিত বা বঞ্চিত মনে না করে| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ “আর তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম ও শালীন কথা বলো”| এ আয়াতাংশ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম কেবল ইয়তিমের আর্থিক অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশই দেয়নি; বরং তাদের মানসিক, সামাজিক ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার প্রতিও সমান গুরুত্বারোপ করেছে| তাই সম্পদ তাদের হাতে তুলে দিতে বিল¤^ হলে তার কারণ নম্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে, ভবিষ্যতে সম্পদ হস্তান্তরের আশ্বাস দিতে হবে এবং সর্বদা তাদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করতে হবে| এতে তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং অভিভাবকের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৩; তাফসীর আস-সা‘দী: ১১৬৪; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৫)|
(ঘ) এতিমদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা পরীক্ষা করা আবশ্যক| এতিম বালেগ হলেই তার সম্পদ তার হাতে তুলে দেওয়া যাবে না; বরং তার মধ্যে সম্পদ সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনার যোগ্যতা বা রুশদ সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা আগে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে| এ উদ্দেশ্যে অভিভাবক তার হাতে সামান্য পরিমাণ সম্পদ দিয়ে ক্রয়-বিক্রয়, আয়-ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তার বিচক্ষণতা ও দক্ষতা যাচাই করবেন| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَابْتَلُوا الْيَتَامَى﴾ “তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করো”|
এ আয়াতাংশ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এতিমের সম্পদ হস্তান্তরের পূর্বে তার আর্থিক প্রজ্ঞা, দায়িত্বশীলতা এবং সম্পদ রক্ষার সক্ষমতা যাচাই করা অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব| কারণ, সম্পদ পরিচালনায় অদক্ষ ব্যক্তির হাতে সম্পদ তুলে দিলে তা অপচয়, ক্ষয় বা আত্মবিনষ্টির আশঙ্কা থাকে| তাই ইসলাম এতিমের অধিকার সংরক্ষণের ¯^ার্থে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াকে যথেষ্ট মনে করেনি; বরং আর্থিক বিচক্ষণতা ও বাস্তব দক্ষতার পরীক্ষাকেও সম্পদ হস্তান্তরের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৫; আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৯/৪৯৮; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৪-৩৫)|
(ঙ) এতিমের নিকট সম্পদ হস্তান্তরের জন্য দুটি মৌলিক শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক| ইসলাম এতিমের সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবল¤^ন করেছে| তাই কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তার হাতে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি; বরং তার মধ্যে সম্পদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার যোগ্যতা ও বিচক্ষণতা সৃষ্টি হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে| আল্লাহ তা’আলা বলেন— ﴿حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ﴾ “অতঃপর তারা যখন বিবাহযোগ্য বয়সে উপনীত হবে এবং তোমরা তাদের মধ্যে বিচক্ষণতা উপলব্ধি করবে, তখন তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করে দাও”|
এ আয়াতাংশ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এতিমের নিকট সম্পদ হস্তান্তরের জন্য দুটি শর্ত অপরিহার্য—
(ক) বুলূগ (প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া): অর্থাৎ, সে এমন বয়সে উপনীত হবে, যখন সাধারণত বিবাহযোগ্যতা এবং শারীরিক পরিপক্বতা অর্জিত হয়|
(খ) রুশদ (আর্থিক বিচক্ষণতা): অর্থাৎ, সম্পদ সংরক্ষণ, আয়-ব্যয় ও আর্থিক লেনদেন সঠিকভাবে পরিচালনার সক্ষমতা ও প্রজ্ঞা তার মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে|
অতএব, এ দুটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিভাবক এতিমের সম্পদ তার হাতে অর্পণ করবেন না| আর উভয় শর্ত পূরণ হওয়ার পর সম্পদ আটকে রাখাও ˆবধ নয়; বরং দ্রুত তার নিকট তা হস্তান্তর করা অভিভাবকের দায়িত্ব| চার মাজহাবের ফকীহগণ মূলত এ নীতির ওপর একমত হয়েছেন, যদিও ‘রুশদ’ নির্ধারণের কিছু উপবিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৬-৩৯; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৬)|
(চ) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, অপচয় বা অন্যায়ভাবে ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে হারাম| ইসলাম এতিমের সম্পদকে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করেছে| তাই অভিভাবক বা অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা, অপচয় করা বা আত্মসাৎ করা ˆবধ নয়| বিশেষ করে এতিম প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের সম্পদের অধিকারী হওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে তার সম্পদ ব্যয় বা আত্মসাৎ করার প্রবণতাকে আল্লাহ তা‘আলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন| তিনি বলেন— ﴿وَلَا تَأْكُلُوهَا إِسْرَافًا وَبِدَارًا أَنْ يَكْبَرُوا﴾ “তোমরা অপচয় করে এবং তারা বড় হওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে তাদের সম্পদ গ্রাস করো না”| এ আয়াতে ﴿إِسْرَافًا﴾ শব্দ দ্বারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়, অপচয় এবং সীমালঙ্ঘনকে বোঝানো হয়েছে| আর পরের শব্দ ﴿بِدَارًا أَنْ يَكْبَرُوا﴾ দ্বারা বোঝানো হয়েছে, এতিম সাবালক হওয়ার আগেই তার সম্পদ দ্রুত ভোগ বা আত্মসাৎ করার মানসিকতা| এ ধরনের আচরণ কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং এটি গুরুতর খিয়ানত, কবিরা গুনাহ এবং আল্লাহর কঠোর শাস্তির কারণ| তাই অত্র সূরার ১০ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন—
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ গ্রাস করে, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের উদরে আগুনই ভরে; আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে” (সূরাতু আন-নিসা: ১০)| তাই অভিভাবকের দায়িত্ব হলো এতিমের সম্পদ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা, প্রয়োজন ছাড়া তা ব্যবহার না করা এবং এতিম বালেগ ও বিচক্ষণ হলে বিল¤^ না করে তার সম্পদ তার নিকট ফিরিয়ে দেওয়া| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৬; তাফসীর আল-বাগাভী: ২/১৬৫-১৬৭; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৯-৪১)|
(ছ) ধনী ও দরিদ্র অভিভাবকের জন্য পৃথক বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে| এতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনকারী অভিভাবকের আর্থিক অবস্থার প্রতি ইসলাম বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে| তাই অভিভাবক যদি ধনী হন, তবে তিনি এতিমের সম্পদ থেকে কোনো প্রকার পারিশ্রমিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করবেন না| বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ আমানতদারিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন| পক্ষান্তরে, যদি অভিভাবক দরিদ্র হন এবং এতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়, তবে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী এবং শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে তা থেকে গ্রহণ করতে পারবেন| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ﴾ “যে অভিভাবক সচ্ছল, সে যেন (এতিমের সম্পদ থেকে) বিরত থাকে| আর যে অভিভাবক অভাবগ্রস্ত, সে যেন ন্যায়সংগতভাবে (প্রয়োজন অনুযায়ী) গ্রহণ করে”|
এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অভিভাবকের জন্য এতিমের সম্পদ ভোগের মূলনীতি হলো আমানতদারিতা, সংযম ও ন্যায়পরায়ণতা| দরিদ্র অভিভাবকের জন্য যে ভোগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা লাভ অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়; বরং প্রয়োজন পূরণের সীমার মধ্যে| অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, তিনি কেবল প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্রহণ করবেন এবং কোনো অবস্থাতেই অপচয়, আত্মসাৎ বা ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে এতিমের সম্পদ ব্যবহার করবেন না| এ বিধানের মাধ্যমে ইসলাম একদিকে এতিমের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে অভিভাবকের বাস্তব প্রয়োজনের প্রতিও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি দিয়েছে| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৪২-৪৫; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৬; তাফসীর আল-বাগাভী: ২/১৬৭)|
(জ) ইয়াতিমের নিকট সম্পদ হস্তান্তরের সময় সাক্ষী রাখা আবশ্যক| ইসলাম আর্থিক লেনদেনে ¯^চ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ প্রতিরোধের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| তাই এতিম যখন বালেগ ও আর্থিকভাবে বিচক্ষণ প্রমাণিত হবে এবং তার সম্পদ তার নিকট হস্তান্তর করা হবে, তখন এ সময় সাক্ষী রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿فَإِذَا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ﴾ “অতঃপর যখন তোমরা তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করবে, তখন এ বিষয়ে সাক্ষী রাখবে”| এ নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়টি সুস্পষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষ করা, যাতে ভবিষ্যতে এতিম বা অভিভাবক—কোনো পক্ষই সম্পদ হস্তান্তর অ¯^ীকার করতে না পারে এবং এ নিয়ে কোনো বিরোধ, অভিযোগ বা মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি না হয়| সাক্ষী রাখার মাধ্যমে লেনদেনের ¯^চ্ছতা নিশ্চিত হয়, উভয় পক্ষের অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়|
তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এ নির্দেশের উদ্দেশ্য এতিমের সম্পদ সুরক্ষা এবং অভিভাবককে ভবিষ্যতের অভিযোগ থেকে রক্ষা করা| তাই সাক্ষী রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম ব্যবস্থা; বিশেষত যখন সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হয়| এর মাধ্যমে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি—আমানত রক্ষা, ¯^চ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিরোধ প্রতিরোধ করা—বাস্তবায়িত হয়|
উল্লেখ্য, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَكَفَىٰ بِاللَّهِ حَسِيبًا﴾ “আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট”| অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে সাক্ষী রাখা হলেও সর্বোচ্চ সাক্ষী ও প্রকৃত হিসাবগ্রহণকারী আল্লাহ তা‘আলাই| তাই একজন মুমিনের উচিত মানুষের কাছে যেমন জবাবদিহিতার মনোভাব রাখা, তেমনি সর্বদা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়েও দায়িত্ব পালন করা| (আল-তাফসীর আল-মুনীর: ৪/২৫২-২৫৩; আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৯/৫০২; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৪৪-৪৫; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৮-২১৯)|
আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) নিজের বা অন্যের তত্ত্বাবধানে থাকা সম্পদ, বিশেষত এতিম ও দুর্বলদের সম্পদ, সর্বোচ্চ সতর্কতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে রক্ষা করা|
(খ) এতিম ও দুর্বলদের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা, সম্মানজনক ও কোমল ভাষায় কথা বলা এবং উপযুক্ত সময় ও যোগ্যতা অর্জনের পর তাদের সম্পদ তাদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া|
(গ) গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনের সময় সাক্ষী রাখা, প্রয়োজনীয় দলিল-প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে ¯^চ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা|
(ঘ) সর্বদা স্মরণ রাখা যে, সকল কাজের প্রকৃত হিসাবগ্রহণকারী আল্লাহ তা‘আলা| তাই অন্যের সম্পদে খিয়ানত, আত্মসাৎ ও অন্যায় ভোগ থেকে বিরত থেকে ন্যায় ও তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করা|

সূরাতু আন-নিসা এর (৩-৪) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিম নারীদের অধিকার সংরক্ষণ, বহুবিবাহ ও মোহর প্রদানের বিধান|

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَإِنْ خِفْتُمْ أَلاّ تُقْسِطُوا فِي الْيَتامى فَانْكِحُوا ما طابَ لَكُمْ مِنَ النِّساءِ مَثْنى وَثُلاثَ وَرُباعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلاّ تَعْدِلُوا فَواحِدَةً أَوْ ما مَلَكَتْ أَيْمانُكُمْ ذلِكَ أَدْنى أَلاّ تَعُولُوا (3) وَآتُوا النِّساءَ صَدُقاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْساً فَكُلُوهُ هَنِيئاً مَرِيئاً (4)﴾ [سورة النساء: 3-4].

আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিম নারীদের অধিকার সংরক্ষণ, বহুবিবাহ ও মোহর প্রদানের বিধান|

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(৩) আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, এতিম কন্যাদের (বিবাহের ক্ষেত্রে) ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে তোমাদের পছন্দের অন্য নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিবাহ করো| আর যদি আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই (বিবাহ করো) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকেই গ্রহণ করো| এটাই অবিচার থেকে নিরাপদ থাকার অধিক উপযোগী|
(৪) আর নারীদের তাদের মোহর আন্তরিক উপহার হিসেবে প্রদান করো| অতঃপর তারা যদি ¯^তঃস্ফূর্তভাবে সেই মোহরের কোনো অংশ তোমাদের ছেড়ে দেয়, তবে তা আনন্দের সঙ্গে ও তৃপ্তিসহকারে গ্রহণ করো|

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতিম কন্যাদের অভিভাবকদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন| জাহিলিয়াত যুগে অনেক অভিভাবক ইয়াতিম কন্যাদের সৌন্দর্য বা সম্পদের লোভে তাদের বিয়ে করতেন; কিন্তু তাদের প্রাপ্য মোহর ও অন্যান্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতেন না| এ অন্যায়ের অবসান ঘটাতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা আশঙ্কা করো, এতিম কন্যাকে বিয়ে করলে তার প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে তাকে বিয়ে না করে অন্য নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের পছন্দ অনুযায়ী দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিয়ে করো| কারণ, এতিমের অধিকার ক্ষুণ্ন করার চেয়ে অন্য নারীকে বিয়ে করাই উত্তম| তবে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সবার প্রতি ন্যায়বিচার করা অপরিহার্য| যদি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নিম্নের যে কোন একটি পথ অবল¤^ন করতে হবে:
(ক) একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে|
(খ) ˆবধভাবে তার অধিকারভুক্ত কোনো দাসী থাকলে, তার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করবে| তবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় বর্তমানে এ বিধানের বাস্তব প্রয়োগ আর নেই| এ নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন অন্যায় ও অবিচার থেকে দূরে থাকে এবং পারিবারিক জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে|
এরপর চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ¯^ামীদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের স্ত্রীদের মোহর আন্তরিকতার সঙ্গে আদায় করে| মোহর স্ত্রীর একটি ¯^ীকৃত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার; তাই স্ত্রীর ¯^তঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া এর কোনো অংশ গ্রহণ করা ¯^ামীর জন্য ˆবধ নয়| তবে স্ত্রী যদি ¯ে^চ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে মোহরের কোনো অংশ ¯^ামীকে প্রদান করেন, তাহলে ¯^ামী তা ˆবধভাবে গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবেন| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৫-৪৩৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩৪-২৩৫; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১২৫-১২৬) |

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ﴾ শব্দগুলো সংখ্যা নির্দেশক বিশেষ রূপ, যা মূলত “দুই দুই”, “তিন তিন” এবং “চার চার” অর্থ প্রকাশ করে| এর উদ্দেশ্য হলো, একজন ব্যক্তি একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুই, তিন বা চারজন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে; এর বেশি নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) | অর্থাৎ, আয়াতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, দুই, তিন ও চারকে একত্রে যোগ করে নয়জন বা তারও বেশি স্ত্রী গ্রহণ করা যাবে| বরং যার সামর্থ্য ও ন্যায়বিচার করার সক্ষমতা আছে, সে সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে| এভাবে কুরআন বহুবিবাহের একটি সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে এবং একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে|
﴿صَدُقاتِهِنَّ﴾ “তাদের নির্ধারিত মোহর”, এখানে “صَدُقَات” শব্দ দ্বারা স্ত্রীদের সেই মোহরকে বোঝানো হয়েছে, যা বিবাহের মাধ্যমে ¯^ামীর ওপর ফরজ ও অপরিহার্য হয়ে যায়| এটি স্ত্রীর একটি ¯^ীকৃত, অবিচ্ছেদ্য ও একচ্ছত্র আর্থিক অধিকার| তাই মোহর প্রদানে অবহেলা করা, তা অ¯^ীকার করা কিংবা অন্যায়ভাবে তা থেকে কিছু কর্তন করা ˆবধ নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) |
﴿نِحْلَةً﴾ “আন্তরিকতার সঙ্গে”, সন্তুষ্টচিত্তে এবং ¯^তঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করা| অর্থাৎ, মোহর এমনভাবে আদায় করতে হবে যেন তা কোনো অনুগ্রহ, দয়া বা সামাজিক প্রথার অংশ নয়; বরং আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ও স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার| তাই ¯^ামীর উচিত কোনো ধরনের অনীহা, কৃপণতা বা চাপ সৃষ্টি না করে খুশিমনে মোহর পরিশোধ করা| এ শব্দটি আরও ইঙ্গিত করে যে, মোহর কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়; বরং এটি স্ত্রীর প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, মর্যাদা ও দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রকাশ| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) |
﴿هَنِيئًا مَرِيئًا﴾ “আনন্দের সঙ্গে তৃপ্তিসহকারে”, ﴿هَنِيئًا﴾ অর্থ এমন বস্তু, যা গ্রহণকারী আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং তা তার কাছে সু¯^াদু, সুখকর ও তৃপ্তিদায়ক মনে হয়| আর ﴿مَرِيئًا﴾ অর্থ এমন বস্তু, যার পরিণাম কল্যাণকর; যা সহজে হজম হয়, দেহের জন্য উপকারী হয় এবং কোনো ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে না| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩১) | অর্থাৎ, স্ত্রী যদি ¯^তঃস্ফূর্তভাবে ও সন্তুষ্টচিত্তে মোহরের কোনো অংশ ¯^ামীকে ছেড়ে দেন, তাহলে ¯^ামী তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবেন| এ সম্পদ ভোগ করার কারণে তার কোনো পাপ হবে না এবং আখিরাতেও এর জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে না| বরং এটি তার জন্য ˆবধ, কল্যাণকর এবং শুভ পরিণামবাহী হবে| (আল্লাহই ভালো জানেন) |

পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে অত্র আয়াতদ্বয়ের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এতিমদের সম্পদের ব্যাপারে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন| যেহেতু অভিভাবকদের তত্ত্বাবধানে অনেক এতিম কন্যাও থাকত, তাই তারা কখনো কখনো তাদের অভিভাবকত্বে থাকা এতিম কন্যাদেরই বিয়ে করতেন| কিন্তু এ আশঙ্কা ছিল যে, তাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে মোহর, ভরণ-পোষণ বা অন্যান্য ˆববাহিক অধিকারের ক্ষেত্রে তারা সুবিচার করতে পারবেন না| তাই উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, এতিম কন্যাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে তাদের বিয়ে না করে অন্য নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের পছন্দমতো বিয়ে করো| (নাযম আদ-দুরার, বাক্বায়ী: ৫/১৭৯) |

আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
৩ ন¤^র আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, নাসাঈ, বায়হাকী প্রমুখ হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত আছে, উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহ.) তাঁর খালা উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: “হে আমার ভাগ্নে! এ আয়াতে সেই এতিম কন্যার কথা বলা হয়েছে, যে তার অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়| অনেক সময় সে অভিভাবকের সম্পদে অংশীদারও হয়| তার সম্পদ ও সৌন্দর্যের কারণে অভিভাবক তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হতো; কিন্তু অন্যান্য নারীর মতো উপযুক্ত মোহর দিতে চাইত না| তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এ অন্যায় থেকে নিষেধ করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন, যদি এতিম কন্যার প্রতি সুবিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাকে বিয়ে না করে অন্য নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিয়ে কর”| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩২-২৩৩) |
অপরদিকে সাঈদ ইবনু জুবাইর, কাতাদাহ, রাবী‘ ইবন আনাস, দাহহাক ও সুদ্দী (রহ.) বলেন, লোকেরা এতিমদের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকত; কিন্তু নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে ততটা সতর্ক ছিল না| তারা ইচ্ছামতো একাধিক বিয়ে করত| ফলে কখনো স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করত, আবার কখনো অবিচার করত| যখন এতিমদের সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা ﴿وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ﴾ “এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দাও”— এ আয়াত নাযিল করলেন, তখন এর সঙ্গে তিন ন¤^র আয়াতও নাযিল করে জানিয়ে দিলেন- যেমন তোমরা এতিমদের প্রতি অবিচার করার ব্যাপারে ভয় করো, তেমনি স্ত্রীদের প্রতিও অবিচার করার ভয় করো| তাই তোমরা ততজন নারীকে বিয়ে করো, যাদের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম হবে| কারণ, দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের দিক থেকে নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে এতিমদের মতো সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের মুখাপেক্ষী| (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১৪৭) |
৪ ন¤^র আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট: ইবনু আবী হাতিম আবূ সালিহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: জাহিলিয়াত যুগে কোনো ব্যক্তি যখন তার মেয়েকে বিয়ে দিত, তখন মেয়ের মোহর সে নিজেই নিয়ে নিত এবং কন্যাকে তা দিত না| এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা এ অন্যায় প্রথা নিষিদ্ধ করেন এবং এ ৪ ন¤^র আয়াত নাযিল করেন| (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ৭৯) |

আয়াতের শিক্ষা:
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতিমদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং তাদের ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন| এরই ধারাবাহিকতায় আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে ইয়াতিম কন্যাদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিধান, বহুবিবাহের সীমা ও শর্ত এবং স্ত্রীদের মোহর যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশ বর্ণনা করা হয়েছে| এর মাধ্যমে ইসলাম পারিবারিক জীবনে ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা এবং নারীর আর্থিক অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের মৌলিক শিক্ষা নিম্নে পেশ করা হলো-
১| তিন ন¤^র আয়াত থেকে চারটি বিষয় প্রতিফলিত হয়…
(ক) এতিম কন্যাদের অধিকার সংরক্ষণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, এ আয়াতের প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হলো, এতিম কন্যাদের প্রতি কোনো ধরনের অবিচার করা যাবে না| জাহিলিয়াত যুগে অনেক অভিভাবক তাদের সম্পদ বা সৌন্দর্যের লোভে এতিম কন্যাদের বিয়ে করতেন; কিন্তু তাদের প্রাপ্য মোহর ও অন্যান্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতেন না| ইসলাম এ অন্যায়ের পথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং নির্দেশ দিয়েছে, যদি তাদের প্রতি সুবিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাদের বিয়ে না করে অন্য নারীকে বিয়ে করতে হবে| এর মাধ্যমে ইসলাম দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে|
(খ) বহুবিবাহের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা, এ আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ তা‘আলা একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন; তবে তা সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করেছেন| এর মাধ্যমে জাহিলিয়াত যুগের সীমাহীন বহুবিবাহ প্রথার অবসান ঘটানো হয়েছে| ফলে বহুবিবাহকে একটি দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিত পারিবারিক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে|
(গ) বহুবিবাহের মৌলিক শর্ত হলো ন্যায়বিচার, আয়াতের তৃতীয়াংশে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি ন্যায়বিচারের শর্তসাপেক্ষ| তাই যে ব্যক্তি স্ত্রীদের ভরণ-পোষণ, বাসস্থান, সময় বণ্টন এবং অন্যান্য ˆববাহিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করে, তার জন্য একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক| অর্থাৎ, ইসলামে বহুবিবাহ কোনো অবাধ অধিকার নয়; বরং এটি দায়িত্ব, সামর্থ্য ও ন্যায়বিচারের ওপর নির্ভরশীল একটি বিধান| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩৭) | তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, স্ত্রীদের মধ্যে শতভাগ সমতা, বিশেষত অন্তরের ভালোবাসা ও আবেগের ক্ষেত্রে, কোনো মানুষের পক্ষেই সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়| কারণ মানুষের হৃদয় আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণে, এবং ভালোবাসার প্রবণতা মানুষের ইচ্ছার বাইরে অনেকাংশেই নির্ধারিত হয়| তবে যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—যেমন ভরণ-পোষণ, বাসস্থান, পোশাক, সময় বণ্টন, উপহার এবং অন্যান্য ˆবষয়িক অধিকার—সেসব ক্ষেত্রে অবশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ফরজ| রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্যে যথাসাধ্য পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন| এরপরও যেহেতু অন্তরের ভালোবাসার ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই তিনি বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছে সোপর্দ করতেন| এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসে এসেছে যে, তিনি দোয়া করতেন:
“اللَّهُمَّ هَذَا قَسْمِي فِيمَا أَمْلِكُ، فَلَا تَلُمْنِي فِيمَا تَمْلِكُ وَلَا أَمْلِكُ” (سنن أبي داود: ২১৩৪).
অর্থ: “হে আল্লাহ! যা আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সে বিষয়ে এটাই আমার ন্যায়সংগত বণ্টন| আর যা আপনার নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু আমার নিয়ন্ত্রণে নয় (অর্থাৎ হৃদয়ের ভালোবাসা), সে বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করবেন না” (সুনানে আবি দাউদ: ২১৩৪) | এ বিষয়েই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
﴿وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ﴾ [سورة النساء: ১২৯].
অর্থ: “তোমরা যতই আগ্রহী হও না কেন, স্ত্রীদের মধ্যে (অন্তরের ভালোবাসায়) কখনোই পুরোপুরি সমতা রক্ষা করতে পারবে না| তবে এমনভাবে এক স্ত্রীর দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না যে, অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় (না বিবাহিতা, না পরিত্যক্তা) রেখে দাও” (সূরাতু আন-নিসা, ১২৯) |
অতএব, ইসলাম বহুবিবাহের অনুমতি দিলেও তা কঠোরভাবে ন্যায়বিচারের শর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে| যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা রয়েছে, সেখানে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য; আর যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা নেই, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দায়ী করেন না| তবে ভালোবাসার পার্থক্যের অজুহাতে কোনো স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা বা তার প্রতি অবিচার করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ| (আল্লাহই ভালো জানেন)|
(ঘ) পারিবারিক জীবনে অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধ করা, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা‘আলা এমন পথ অবল¤^ন করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা মানুষকে জুলুম ও অন্যায় থেকে দূরে রাখে| কারণ, পরিবারে অবিচার শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষতিই করে না; বরং সমাজেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে| তাই ইসলাম এমন পারিবারিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা ন্যায়, দায়িত্বশীলতা এবং পারস্পরিক অধিকার সংরক্ষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
২| চার ন¤^র আয়াত থেকে পাঁচটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়…
(ক) মোহর স্ত্রীর একটি বাধ্যতামূলক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার, এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ¯^ামীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন স্ত্রীদের মোহর যথাযথভাবে আদায় করে| মোহর কোনো উপহার, অনুগ্রহ বা সামাজিক রীতি নয়; বরং এটি আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত স্ত্রীর একটি অপরিহার্য আর্থিক অধিকার| তাই বিবাহের মাধ্যমে ¯^ামীর ওপর মোহর পরিশোধ করা আবশ্যক হয়ে যায়| মোহর আদায়ে গড়িমসি করা, তা অ¯^ীকার করা বা অন্যায়ভাবে কমিয়ে দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৮৪) |
(খ) মোহর আন্তরিকতা ও সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করতে হবে, আয়াতে ﴿نِحْلَةً﴾ শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহ তা‘আলা শিক্ষা দিয়েছেন যে, মোহর অনিচ্ছাকৃতভাবে বা বোঝা মনে করে নয়; বরং আন্তরিকতা, উদারতা ও সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করতে হবে| এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মোহর স্ত্রীর প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং ˆববাহিক দায়িত্ববোধের প্রতীক| তাই একজন মুমিন ¯^ামীর উচিত খুশিমনে স্ত্রীর এ অধিকার আদায় করা| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৮৪) |
(গ) মোহরের মালিক একমাত্র স্ত্রী, এ আয়াত প্রমাণ করে যে, মোহরের প্রকৃত মালিক স্ত্রী নিজেই| তাই তার সম্মতি ছাড়া ¯^ামী, পিতা, অভিভাবক বা অন্য কোনো ব্যক্তি মোহরের কোনো অংশ গ্রহণ বা ভোগ করতে পারে না| এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের সময় ¯^ামীর পক্ষকে নারী থেকে মোহর ফেরত নিতে নিষেধ করা হয়েছে| আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
“وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدالَ زَوْجٍ مَكانَ زَوْجٍ، وَآتَيْتُمْ إِحْداهُنَّ قِنْطاراً، فَلا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئاً” [سورة النساء: ২০].
অর্থাৎ: “আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও এবং তোমরা তাদের একজনকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ (মোহর) প্রদান করে থাকো, তবুও তা থেকে কোনো কিছুই ফিরিয়ে নিয়ো না” (সূরাতু আন-নিসা: ২০) | ইসলাম এ বিধানের মাধ্যমে নারীর ¯^তন্ত্র সম্পত্তির অধিকারকে ¯^ীকৃতি দিয়েছে এবং জাহিলিয়াত যুগের সেই অন্যায় প্রথার অবসান ঘটিয়েছে, যেখানে অভিভাবকরা কন্যার মোহর নিজেদের সম্পদ মনে করত| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৮৪) |
(ঘ) স্ত্রীর ¯ে^চ্ছায় দেওয়া অংশ গ্রহণ করা ˆবধ, যদি স্ত্রী কোনো প্রকার চাপ, ভয় বা প্রতারণা ছাড়া সম্পূর্ণ ¯^তঃস্ফূর্তভাবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে মোহরের কোনো অংশ ¯^ামীকে ছেড়ে দেন, তাহলে ¯^ামী তা ˆবধভাবে গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবেন| এ ক্ষেত্রে তা ¯^ামীর জন্য হালাল এবং এতে কোনো পাপ নেই| তবে স্ত্রীর সম্মতি অবশ্যই প্রকৃত ও ¯^াধীন হতে হবে; কোনো ধরনের মানসিক বা পারিবারিক চাপের ফলে হওয়া উচিত নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩৬) |
(ঙ) পারিবারিক জীবনে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা, এ আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম কেবল একটি আর্থিক বিধানই প্রদান করেনি; বরং ¯^ামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছে| যখন ¯^ামী স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে এবং স্ত্রীও ¯^তঃস্ফূর্তভাবে উদারতার পরিচয় দেয়, তখন পরিবারে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় হয়| এভাবেই ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী পারিবারিক জীবন প্রতিষ্ঠা করতে চায়| (আল্লাহই ভালো জানেন) |

আয়াতসংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়েল:
মাসয়ালা-১:
আয়াতে উল্লেখিত ‘ইয়াতিম নারী’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে এবং তাদের বিবাহের অভিভাবক কারা হতে পারে?
এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে|
প্রথম মত, এখানে অপ্রাপ্তবয়স্কা এতিম কন্যা উদ্দেশ্য| এ মতেরও দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে—
(ক) একদল ফকীহের মতে, পিতা ও দাদা ছাড়াও অন্যান্য ˆবধ অভিভাবক তার বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন; প্রয়োজনে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নিজেরাও তাকে বিবাহ করতে পারেন| তাঁরা হযরত আয়িশা (রা.)-এর তাফসীরকে দলিল হিসেবে পেশ করেন| তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয়াতটি এমন এক এতিম কন্যাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে, যে তার অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে ছিল| অভিভাবক তার সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ন্যায্য মোহর না দিয়েই তাকে বিবাহ করতে চাইত| এ থেকে তাঁরা প্রমাণ করেন যে, চাচাতো ভাইয়ের মতো ˆবধ অভিভাবকও অপ্রাপ্তবয়স্কা এতিম কন্যার বিবাহের অভিভাবক হতে পারে|
(খ) অপরদিকে, অন্য একদল ফকীহের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কা কন্যার বিবাহদানের অধিকার কেবল পিতা বা দাদার| তাঁদের মতে, এ আয়াতে মূলত ন্যায্য মোহর প্রদান, অথবা এতিমদের অভিভাবকত্ব গ্রহণে সংকোচের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে; অপ্রাপ্তবয়স্কার বিবাহ-অভিভাবকত্বের বিধান নয়|
দ্বিতীয় মত, আরেক দল ফকীহের মতে, আয়াতে ‘ইয়াতামা’ বলতে অপ্রাপ্তবয়স্কা নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক এতিম নারী বোঝানো হয়েছে| এটি মাজায মুরসাল-এর একটি উদাহরণ| অর্থাৎ, ˆশশবে এতিম ছিল—এ বিবেচনায় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাদেরকে ‘এতিম’ বলা হয়েছে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী, ৪/২৩৭)|
মাসয়ালা-২:
অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহের হুকুম|
অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহ ˆবধ কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে|
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহ ˆবধ| তিনি এ আয়াত দ্বারা দলিল গ্রহণ করে বলেন, ‘ইয়াতিম’ শব্দটি কেবল বালেগ হওয়ার পূর্বেই প্রযোজ্য; বালেগ হওয়ার পর তাকে আর ‘ইয়াতিম’ বলা হয় না, বরং ‘নারী’ বলা হয়| সুতরাং, আয়াতে ‘ইয়াতিম’ শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় এখানে অপ্রাপ্তবয়স্কা কন্যাই উদ্দেশ্য| তিনি আরও বলেন, যদি আয়াতে প্রাপ্তবয়স্কা নারীকে বোঝানো হতো, তাহলে তার মোহর কম দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা অর্থবহ হতো না| কারণ, প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজ সম্মতিতে ¯^াভাবিক মোহরের চেয়ে কম মোহরে বিবাহে রাজি হতে পারেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে ˆবধ|
অপরদিকে, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ এবং অধিকাংশ ফকীহের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কা ইয়াতিম কন্যার বিবাহ দেওয়া ˆবধ নয়| সে বালেগ হওয়ার পর তার সুস্পষ্ট সম্মতি নিয়েই কেবল বিবাহ দেওয়া যাবে| তাঁদের অন্যতম দলিল আল্লাহ তাআলার বাণী: ﴿وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ﴾ “তারা আপনার কাছে নারীদের সম্পর্কে ফতোয়া জানতে চায়”| তাঁদের মতে, এখানে ‘নিসা’ বা নারী শব্দটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বোঝায়, যেমন ‘রিজাল’ শব্দটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের বোঝায়| তাই ﴿فِي يَتَامَى النِّسَاءِ﴾-এর অর্থও প্রাপ্তবয়স্ক এতিম নারী, যেমনটি হযরত আয়িশা (রা.) ব্যাখ্যা করেছেন| এ মতের সমর্থনে তাঁরা একটি হাদীসও পেশ করেন| হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বর্ণনা করেন, তাঁর মামা কুদামাহ ইবনু মাজঊন তাঁর পিতার অসিয়ত অনুযায়ী তাঁর ভাইঝির বিবাহ সম্পন্ন করেন| পরে মুগীরা ইবনু শু’বা (রা.) কন্যাটিকে বিবাহের প্রস্তাব দেন| বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উত্থাপিত হলে কুদামাহ (রা.) বলেন, তিনি কন্যাটির পিতার অসিয়াতকৃত অভিভাবক এবং তার কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এ বিবাহ দিয়েছেন| তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ্রإِنَّهَا يَتِيمَةٌ، وَالْيَتِيمَةُ أَوْلَى بِأَمْرِهَاগ্ধ অর্থ: “সে একজন এতিম; আর এতিম কন্যা তার নিজের বিষয়ে অধিক হকদার”| এরপর পূর্বের বিবাহটি বাতিল করা হয় এবং কন্যাটির সম্মতিক্রমে তার বিবাহ সম্পন্ন করা হয়|
এ হাদীসের আলোকে অধিকাংশ ফকীহের সিদ্ধান্ত হলো, বালেগ হওয়ার পর কোনো এতিম কন্যার স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া তার বিবাহ সম্পন্ন করা ˆবধ নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, ওহাবা আয-যুহাইলী, ৪/২৩৮)|
মাসয়ালা-৩:
বিবাহের সময় মোহর নির্ধারণ না করা হলে, অথবা মোহর নির্ধারণে নারীর প্রতি অবিচার করা হলে ইসলামী বিধান কী?
এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কিছু শাখাগত মতভেদ থাকলেও মূলনীতির ক্ষেত্রে হানাফী, মালিকী, শাফিঈ ও হা¤^লী, চার মাজহাবই নিম্নোক্ত বিষয়ের ওপর একমত—
(ক) মোহর স্ত্রীর শরিয়তপ্রদত্ত আর্থিক অধিকার| তাই বিবাহে মোহর নির্ধারণ করা শরিয়তসম্মত ও ¯^ীকৃত বিধান|
(খ) বিবাহের সময় মোহর নির্ধারণ না করা হলে, অথবা নির্ধারিত মোহর অবৈধ বা অন্যায্যভাবে কম হওয়ায় নারীর প্রতি অবিচার সংঘটিত হলে, প্রয়োজন অনুযায়ী মোহরে মিসল (مهر المثل) প্রযোজ্য হবে|
(গ) মোহরে মিসল নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর পারিবারিক মর্যাদা, বংশ, সামাজিক অবস্থান, বয়স, সৌন্দর্য, দ্বীনদারিতা, শিক্ষা, কুমারী বা বিধবা হওয়া, দেশ-কাল এবং প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি বিবেচনায় নেওয়া হবে|
(ঘ) বিশেষ করে এতিম ও দুর্বল অবস্থানে থাকা নারীর অধিকার সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হবে, যাতে তাদের প্রতি কোনো ধরনের আর্থিক অবিচার না ঘটে| (আল-ফিকহুল ইসলাম ওয়া আদিল্লাতুহ, ওহাবা জুহাইলী/ বাদায়িউস সানায়ি’, কাসানী/ তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/১৪) |
অধিকাংশ ফকীহের মতে, প্রথমে নারীর পিতৃবংশের (যেমন বোন, ফুফু, চাচাতো বোন ইত্যাদি) সমপর্যায়ের নারীদের মোহরকে মানদণ্ড ধরা হয়| তাদের মধ্যে উপযুক্ত দৃষ্টান্ত না পাওয়া গেলে একই সামাজিক মর্যাদার অন্যান্য নারীদের প্রচলিত মোহর বিবেচনা করা হয়| (আল-মুগনী, ইবনু কুদামাহ) |
মাসয়ালা-৪:
অভিভাবক কি তার তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম কন্যাকে নিজেই বিবাহ করতে পারেন?
হযরত আয়িশা (রা.)-এর তাফসীর অনুযায়ী, যদি এতিম কন্যা বালেগ হয় এবং তার অভিভাবক মোহরের ক্ষেত্রে পূর্ণ ন্যায়বিচার করেন, তাহলে তিনি তাকে নিজেই বিবাহ করতে পারেন| এ ক্ষেত্রে তিনিই একদিকে বর, অন্যদিকে অভিভাবক (বিবাহ-সম্পাদনকারী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন|
ইমাম আবু হানীফা, আওযাঈ, সাওরী ও আবু সাওর (রহ.)-এর মতে, এ ধরনের বিবাহ ˆবধ| অর্থাৎ, একই ব্যক্তি বর এবং অভিভাবক—উভয় ভূমিকায় থেকে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন|
অপরদিকে, ইমাম শাফিঈ ও যুফার (রহ.)-এর মতে, এটি ˆবধ নয়| তাঁদের মতে, যেহেতু অভিভাবক (ওলী) বিবাহের একটি মৌলিক শর্ত, তাই একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বর ও অভিভাবক হতে পারেন না| এ অবস্থায় হয় শাসক (কাজী) তার পক্ষ থেকে বিবাহ সম্পন্ন করবেন, অথবা অন্য কোনো ˆবধ অভিভাবক তার সঙ্গে ওই নারীর বিবাহ সম্পন্ন করবেন|
তাঁদের দলিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: “لا نكاح إلا بولي وشاهدي عدل অর্থ: “অভিভাবক এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ ˆবধ নয়”|

অতএব, শাফিঈ মাজহাবের মতে, এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, বর, অভিভাবক এবং সাক্ষীগণ পৃথক ব্যক্তি হওয়া আবশ্যক; একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বর ও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/১৪) |

আয়াতের করণীয় (আমল):
(ক) যে ব্যক্তি স্ত্রীদের ভরণ-পোষণ, বাসস্থান, সময় বণ্টন ও অন্যান্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করেন, তিনি এক স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন| এটি আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ|
(খ) বিবাহের সময় মোহর নির্ধারণ ও তা যথাসময়ে পরিশোধ করা ¯^ামীর দায়িত্ব| কোনো অবস্থাতেই মোহরের ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা যাবে না|
(গ) স্ত্রী যদি মোহরের সব বা কিছু অংশ ¯ে^চ্ছায় ছেড়ে দেন, তবেই তা গ্রহণ করা ˆবধ| কোনো ধরনের চাপ, ভয়ভীতি, প্রতারণা বা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে মোহর আদায় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ|
(ঘ) ¯^ামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত পরস্পরের অধিকার রক্ষা করা এবং ˆবধ শর্ত ও অঙ্গীকার যথাসম্ভব পালন করা| দাম্পত্য জীবনের স্থিতি ও সৌহার্দ্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ|

সূরাতু আন-নিসা এর দ্বিতীয় আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইসলামে এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা|

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَآتُوا الْيَتامى أَمْوالَهُمْ وَلا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلا تَأْكُلُوا أَمْوالَهُمْ إِلى أَمْوالِكُمْ إِنَّهُ كانَ حُوباً كَبِيراً (2)﴾ [سورة النساء: 2].

আলোচ্যবিষয়: ইসলামে এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা|

আয়াতের সরল অনুবাদ:
তোমরা এতিমদের তাদের প্রাপ্য সম্পদ যথাযথভাবে ফিরিয়ে দাও| নিজেদের নিম্নমানের সম্পদের পরিবর্তে তাদের উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ করো না এবং তাদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে অন্যায়ভাবে ভোগ করো না| নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বড় গুনাহ|
আয়াতের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী আয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়ার পর এ আয়াতে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ সমাজের আরেকটি দুর্বল ও অসহায় শ্রেণি—এতিমদের অধিকার সংরক্ষণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন| কারণ পিতৃহীন হওয়ার ফলে এতিম শিশুরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হয় না| তাই অনেক সময় তাদের অভিভাবক যেমন চাচা, দাদা কিংবা নিকটাত্মীয়রা তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সম্পদ আত্মসাৎ করে বা নানা কৌশলে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে| আল্লাহ তা‘আলা এ ধরনের অন্যায় আচরণের কঠোর নিন্দা করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন যে, এতিমরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সক্ষম হবে, তখন তাদের সম্পদ পূর্ণরূপে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে| এছাড়া আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অভিভাবকরা যেন নিজেদের নিম্নমানের বা কম মূল্যবান সম্পদের বিনিময়ে এতিমদের উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান সম্পদ গ্রহণ না করে| জাহিলিয়াত যুগে অনেকেই এমন প্রতারণামূলক কাজ করত; তারা এতিমের ভালো সম্পদ নিয়ে নিজেদের খারাপ সম্পদ তার স্থলে রেখে দিত| ইসলাম এ ধরনের সকল অন্যায় লেনদেন নিষিদ্ধ করেছে|
একইভাবে আল্লাহ তা‘আলা এতিমদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে অন্যায়ভাবে ভোগ করতেও নিষেধ করেছেন| কারণ এতে ধীরে ধীরে এতিমের সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার এবং তার হক বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে| ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমের সম্পদ আমানত¯^রূপ; তাই তা রক্ষা করা এবং যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অভিভাবকের দায়িত্ব|
এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা আয়াতের শেষাংশে এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করেছেন| কেননা এটি শুধু আর্থিক অন্যায় নয়; বরং একজন অসহায় ও অধিকারহীন মানুষের ওপর জুলুম| তাই একজন সত্যিকার মুমিন অভিভাবকের কর্তব্য হলো এতিমের সম্পদকে নিজের সম্পদের চেয়েও বেশি সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা এবং যথাসময়ে তা তার প্রকৃত মালিকের নিকট হস্তান্তর করা| (আল্লাহই সর্বাধিক অবগত)| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৫; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৮-২২৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১২৫) |

আয়াতের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿الْيَتامى﴾ “এতিমগণ”| এটি ‘ইয়াতিম’ (يتيم)-এর বহুবচন এবং ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য| ‘ইয়াতিম’ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যার পিতা তার বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন (আইসার আল-তাফাসীর, আল-জাযায়েরী, ১/৪৩৪)| এ সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির পিতা যদি তার বালেগ বা প্রপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন, অথবা কোনো ইয়াতিম বালেগ হয়ে যায়, তবে তাকে আর ‘ইয়াতিম’ বলা হয় না|
এখন প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে কীভাবে অভিভাবকদেরকে এতিমদের ধন-সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ অপ্রাপ্তবয়স্ক এতিম শিশুর হাতে তো সম্পদ হস্তান্তর করা যায় না? এর উত্তর হলো, এখানে বালেগ ও সম্পদ পরিচালনায় সক্ষম হওয়ার পর তাদের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে| বিষয়টি পরবর্তী পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতের আলোচনায় আরও স্পষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ| মূলত এখানে ‘এতিমগণ’ শব্দটি তাদের পূর্ববর্তী অবস্থার বিবেচনায় ব্যবহার করা হয়েছে| অর্থাৎ, যারা একসময় এতিম ছিল এবং বর্তমানে বালেগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সক্ষম হয়েছে, তাদেরকে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| বালাগাতের পরিভাষায় এটিকে ্রمجاز مرسل باعتبار ما كانগ্ধ বলা হয় (তাফসীর আল-মুনীর, ওয়াহবা আয-যুহাইলী, ৪/২২৭)| অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির বর্তমান অবস্থাকে তার পূর্ববর্তী পরিচয়ের মাধ্যমে উল্লেখ করা| এর একটি সহজ উদাহরণ হলো— কোনো ব্যক্তি আগে ছাত্র ছিল, পরে শিক্ষক হয়েছে; কিন্তু কখনো কখনো তাকে তার পূর্ব পরিচয়ের কারণে ‘ছাত্র’ বলেই উল্লেখ করা হয়| তেমনি এ আয়াতে ‘এতিম’ বলা হলেও উদ্দেশ্য হলো সেই সব ব্যক্তি, যারা একসময় এতিম ছিল এবং বর্তমানে বালেগ হয়েছে| সুতরাং আয়াতটির মূল শিক্ষা হলো, কোনো এতিম বালেগ ও বিচক্ষণ হয়ে গেলে তার সম্পদ আর অভিভাবকের কাছে রেখে দেওয়া ˆবধ নয়; বরং যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের পর তার সম্পদ তার নিকট হস্তান্তর করা আবশ্যক| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
﴿وَلا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ﴾ ‘তোমরা হারামকে হালাল দ্বারা পরিবর্তন করো না’, আয়াতাংশে দুইটি আরবী শব্দ “الخبيث” অর্থ হারাম এবং “الطيب” অর্থ হালাল| তবে এখানে এ দু’টি শব্দ দ্বারা যথাক্রমে নিকৃষ্ট ও উৎকৃষ্ট সম্পদ বোঝানো হয়েছে| অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের নিম্নমানের সম্পদের পরিবর্তে এতিমদের উত্তম সম্পদ গ্রহণ করো না| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৪) |

পূর্বাপর আয়াতের পারস্পরিক সম্পর্ক:
আল্লাহ তা‘আলা এ সূরার শুরুতে বান্দার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও বিধানসমূহের কথা উল্লেখ করেছেন, যাতে সে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর অসন্তোষ ও শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে| এরপর তিনি এসব বিধানের বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা করতে শুরু করেছেন| এর মধ্যে প্রথমটি হলো— এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া| দ্বিতীয়টি হলো— কতজন স্ত্রী পর্যন্ত বিবাহ করা ˆবধ এবং কখন একজন স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক, সে বিধান| আর তৃতীয়টি হলো— স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর যথাযথভাবে প্রদান করা| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৭৯)|

আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
মুকাতিল ও কালবী (রহ.) বলেন, এ আয়াতটি গাতাফান গোত্রের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়েছিল| তার কাছে তার এক এতিম ভাতিজার বিপুল পরিমাণ সম্পদ আমানত হিসেবে ছিল| যখন এতিমটি বালেগ হলো, তখন সে তার সম্পদ ফেরত চাইলো| কিন্তু তার চাচা তা দিতে অ¯^ীকার করল| এরপর তারা বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিচার প্রার্থনা করল| তখন এ আয়াত নাযিল হলো| আয়াতটি শুনে চাচা বলল, “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলাম| আমরা মহাপাপ থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি”| এরপর সে ভাতিজার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দিল| তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “যে ব্যক্তি নিজের কৃপণতা থেকে আত্মরক্ষা করে এবং এভাবে হকদারের হক ফিরিয়ে দিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে তাঁর আবাসস্থলে প্রবেশ করাবেন”| অর্থাৎ, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন| অতঃপর যুবকটি তার সম্পদ বুঝে পেয়ে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে শুরু করল| তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “সওয়াব নিশ্চিত হয়ে গেছে, কিন্তু গুনাহ রয়ে গেছে”| সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বুঝলাম যে সওয়াব নিশ্চিত হয়েছে; কিন্তু গুনাহ কীভাবে রয়ে গেল, অথচ সে তো আল্লাহর পথে ব্যয় করছে?” রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “সওয়াবটি ছেলেটির জন্য নিশ্চিত হয়েছে, আর গুনাহটি তার পিতার ওপর রয়ে গেছে” (আসবাবুন নুযূল, ওয়াহেদী: ৮১) | অর্থাৎ, পিতা জীবদ্দশায় সম্পদ এমনভাবে উপার্জন বা রেখে গিয়েছিলেন, যাতে তার ওপর দায় ও গুনাহ ছিল| কিন্তু ছেলে যখন সেই সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেছে, তখন সে তার নেকির অধিকারী হয়েছে; তবে পিতার গুনাহ ¯^য়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়নি| (আল্লাহই ভালো জানেন) |

আয়াতের শিক্ষা:
১| এ আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করলে তাদের অভিভাবক, যেমন চাচা, দাদা কিংবা অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন এতিমদের সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেন এবং তাদের সম্পদের ব্যাপারে সব ধরনের অন্যায়, প্রতারণা ও আত্মসাৎ থেকে বিরত থাকেন| এর মাধ্যমে ইসলাম এতিমদের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| এখানে ইয়াতিমের ধন-সম্পদের ব্যাপারে অভিভাবকদের তিনটি নির্দেশনা এবং একটি সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে-
(ক) এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, আল্লাহ তা‘আলা অভিভাবকদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, এতিমরা যখন বালেগ হবে এবং নিজেদের সম্পদ সঠিকভাবে পরিচালনা করার যোগ্যতা অর্জন করবে, তখন তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে| এতিমের সম্পদ অভিভাবকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; বরং তা একটি আমানত| তাই কোনো অজুহাতে তাদের সম্পদ আটকে রাখা বা হস্তান্তরে গড়িমসি করা ˆবধ নয়| এ নির্দেশনার মাধ্যমে ইসলাম এতিমদের আর্থিক অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে|
(খ) নিকৃষ্ট সম্পদের বিনিময়ে উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ না করা, জাহিলিয়াত যুগে কিছু অভিভাবক এতিমদের মূল্যবান সম্পদের পরিবর্তে নিজেদের নিম্নমানের বা কম মূল্যবান সম্পদ দিয়ে দিত| ফলে এতিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং অভিভাবকরা অন্যায়ভাবে লাভবান হতো| আল্লাহ তা‘আলা এ ধরনের প্রতারণামূলক লেনদেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন| এর মাধ্যমে তিনি শিখিয়েছেন যে, দুর্বল ও অসহায় মানুষের সম্পদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সততা ও ন্যায়পরায়ণতা অবল¤^ন করতে হবে|
(গ) এতিমদের সম্পদ নিজের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে অন্যায়ভাবে ভোগ না করা, অভিভাবকদেরকে এতিমদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে আত্মসাৎ করা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে| যদিও শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ও হিসাবের ভিত্তিতে এতিমের সম্পদ পরিচালনা করা যেতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম হতে পারে না| কারণ এতিমের সম্পদ একটি আমানত, আর আমানতের খিয়ানত ইসলামে গুরুতর অপরাধ|
(ঘ) সতর্কবাণী— এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা মহাপাপ, আয়াতের শেষে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন যে, এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা “حُوبًا كَبِيرًا” অর্থাৎ এক মহাপাপ| এটি শুধু মানুষের অধিকার নষ্ট করার অপরাধই নয়; বরং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনেরও শামিল| তাই একজন মুমিনের উচিত এতিমদের সম্পদের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা, তাদের হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় রাখা| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
২| আয়াত সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়েল:
প্রশ্ন-(ক): অত্র আয়াতে অভিভাবকদেরকে এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; তবে কখন তা হস্তান্তর করতে হবে, সে বিষয়ে এখানে কোনো বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি| অনুরূপভাবে, পঞ্চম আয়াতে যেসব এতিম সম্পদ পরিচালনায় অদক্ষ বা বিচক্ষণতা অর্জন করেনি, তাদের ভরণ-পোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তাদের হাতে সম্পদ হস্তান্তর করতে নিষেধ করা হয়েছে| এখন প্রশ্ন হলো— এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত সময় কখন?
এর উত্তরে অত্র সূরার ৬ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, এতিমদের মধ্যে সম্পদ পরিচালনার যোগ্যতা (রুশদ) দেখা গেলে তবেই তাদের সম্পদ তাদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে| অর্থাৎ, যখন অভিভাবকগণ নিশ্চিত হবেন যে, তারা বালেগ হয়েছে, সম্পদ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং ভালো-মন্দের বিচার-বিবেচনা করতে পারে, তখন তাদের সম্পদ যথাযথভাবে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩০) |
প্রশ্ন-(খ): আর ইয়াতিম যদি এমন হয় তার বয়স বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু সম্পদ পরিচালনার দক্ষতা আসছে না, অথবা ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারছে না| সে ক্ষেত্রে করণীয় কি?
এর জবাব অত্র সূরার ছয় ন¤^র আয়াতের প্রথমাংশে রয়েছে| সেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা ইয়াতিমদেরকে বিয়ের বয়েসে উপনীত হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা করতে থাকবে| অতঃপর তাদের মধ্যে সম্পদ পরিচর্যার যোগ্যতা পরিলক্ষিত হলে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবে| এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত হলো-
ইমাম জাসসাস (রহ.) ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতামত উল্লেখ করেছেন| তাঁর মতে, কোনো এতিম ব্যক্তি যদি পঁচিশ বছর বয়সে উপনীত হয়, তবে সে বিচক্ষণতার প্রমাণ না দিলেও তার সম্পদ তার কাছে হস্তান্তর করতে হবে| কারণ, এ বয়সে পৌঁছার পর “তোমরা ইয়াতিমদেরকে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও” আয়াতের সাধারণ নির্দেশ কার্যকর হবে| তবে পঁচিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেবল তখনই সম্পদ দেওয়া যাবে, যখন তার মধ্যে বিচক্ষণতা ও সম্পদ পরিচালনার যোগ্যতা দেখা যাবে| এ বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে| (আহকাম আল-কোরআন, জাচ্ছাছ: ২/৪৯) | ইমাম আবু হানীফা (রহ.) আরও বলেন, পঁচিশ বছর বয়সে একজন ব্যক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সে দাদা হওয়ারও উপযুক্ত হতে পারে| সুতরাং এ বয়সে পৌঁছার পরও তাকে ‘এতিম’ বলে সম্পদ আটকে রাখা যুক্তিসঙ্গত নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩০) |
ইমাম আবু হানিফার (রহ) এ মতের জবাবে ইবনুল আরাবী (রহ.) বলেন, পঁচিশ বছর বয়স নির্ধারণ করার পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল নেই| বিশেষ করে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নিজেই মনে করেন যে, শরীয়তের নির্ধারিত সীমা (মুকাদ্দারাত) কিয়াসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না; বরং কেবল কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়| অথচ এ বিষয়ে এমন কোনো স্পষ্ট দলিল নেই, আর অর্থগত দিক থেকেও এ মতকে সমর্থন করার মতো শক্তিশালী ভিত্তি পাওয়া যায় না| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩০) |
ড. ওয়াহবাহ আয-যুহাইলী (রহ.) সকল ফকীহ-এর মতের সমš^য় করে বলেন:
(ক) এতিম যখন সম্পদ পরিচালনার উপযুক্ত যোগ্যতা (রুশদ) অর্জন করবে, তখন তার সম্পদ তার কাছে হস্তান্তর করা আবশ্যক| এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়স নয়; বরং সম্পদ পরিচালনায় সক্ষমতা ও বিচক্ষণতাই মূল বিবেচ্য|
(খ) প্রয়োজন ছাড়া এতিমের সম্পদ ভোগ করা বা অন্য কোনোভাবে তা থেকে উপকৃত হওয়া হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ| তবে অভিভাবক যদি দরিদ্র হন, তাহলে অত্র সূরার ৬ ন¤^র আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী এতিমের সম্পদ পরিচালনা ও পরিচর্যার বিনিময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত পরিমাণে তা থেকে গ্রহণ করতে পারবেন| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَنْ كانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ، وَمَنْ كانَ فَقِيراً فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ﴾ [سورة النساء: ৬].
অর্থ- “যে ধনী, সে যেন বিরত থাকে; আর যে দরিদ্র, সে যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে (প্রয়োজন অনুযায়ী) ভোগ করে|” (সূরাতু আন-নিসা: ৬)| (তাফসীর আল-মুনীর, আয-যুহাইলী, ৪/২৩০)|
৩| আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এতিমদের অধিকার, তাদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং তাদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন| এ বিষয়ে বিশেষভাবে সূরা আন-নিসার ৬ ও ১০ ন¤^র আয়াত, সূরা আল-আন‘আমের ১৫২ ন¤^র আয়াত, সূরা আল-ইসরার ৩৪ ন¤^র আয়াত এবং সূরা আল-বাকারার ২২০ ন¤^র আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে|

আয়াতের করণীয় (আমল):
(ক) অভিভাবকদের উচিৎ এতিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের জান-মাল ও ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবল¤^ন করা এবং তাদের সম্পদের ব্যাপারে কোনো প্রকার অন্যায়, প্রতারণা বা আত্মসাৎ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা|
(খ) এতিমদের সম্পদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত হিসেবে গণ্য করা| তারা বালেগ ও সম্পদ পরিচালনায় সক্ষম হলে কোনো প্রকার বিল¤^ না করে তাদের সম্পদ যথাযথভাবে তাদের কাছে হস্তান্তর করা|
(গ) এতিমের সম্পদ পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে তা কেবল তাদের কল্যাণ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য ব্যবহার করা| ব্যক্তিগত ¯^ার্থে বা অবৈধভাবে তাদের সম্পদ থেকে কোনো ধরনের সুবিধা গ্রহণ না করা|
(ঘ) সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে, এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা কবীরা গুনাহ| তাই এ বিষয়ে আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখা, তাঁর বিধান মেনে চলা এবং কিয়ামতের জবাবদিহির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা|

 

সূরাতু আন-নিসা-এর প্রথম আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: তাকওয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও জীবন গঠনের শিক্ষা|

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿يا أَيُّهَا النّاسُ اِتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ واحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْها زَوْجَها وَبَثَّ مِنْهُما رِجالاً كَثِيراً وَنِساءً وَاِتَّقُوا اللهَ الَّذِي تَسائَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحامَ إِنَّ اللهَ كانَ عَلَيْكُمْ رَقِيباً (1)﴾ [سورة النساء: 1].

আলোচ্যবিষয়: তাকওয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও জীবন গঠনের শিক্ষা|

আয়াতের সরল অনুবাদ:
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর থেকেই তাঁর স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন| তারপর তাদের দু’জন থেকে অসংখ্য পুরুষ ও নারী পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন| আর তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার নামের মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো, এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকো| নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা-সর্বদা পর্যবেক্ষক|

আয়াতের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা’আলা তাঁর সকল বান্দাকে —মুমিন ও কাফির সবাইকে— একটি সাধারণ স¤ে^াধনের মাধ্যমে ডেকে বলেন: “হে মানুষ!”| অতঃপর তিনি তাদের তাকওয়া অবল¤^নের নির্দেশ দেন| তাকওয়া হলো- প্রকাশ্যে ও গোপনে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর আনুগত্য ও ইসলামের অনুসরণ করার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা|
এরপর আল্লাহ নিজের পরিচয় দেন এভাবে যে, তিনিই তাদের প্রতিপালক| তিনি সমগ্র মানবজাতিকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তা হলো আদম (আ.), যাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল| তারপর সেই এক প্রাণ থেকেই তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন| এরপর এ দু’জনের মাধ্যমে পৃথিবীতে অসংখ্য পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন|
এরপর আল্লাহ আবারও তাকওয়ার নির্দেশ দেন| কারণ তাকওয়াই সব কল্যাণের মূলভিত্তি; এটি ছাড়া প্রকৃত সফলতা ও সৌভাগ্য অর্জন সম্ভব নয়| তিনি বলেন: “তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর প্রতি তোমাদের অন্তর বিশ্বাস স্থাপন করেছে| তোমাদের কেউ যখন অন্য কারও কাছে কোনো প্রয়োজন পূরণের অনুরোধ করত, তখন বলত, “আল্লাহর দোহাই, আমাকে এ কাজটি করে দাও”| আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকেও বিরত থাকো| কারণ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে বড় ধরনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও ক্ষতি সৃষ্টি হয়|
অবশেষে আল্লাহ তাদের সতর্ক করে বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা পর্যবেক্ষক”, অর্থাৎ, তিনি তোমাদের সব কাজ লক্ষ্য করছেন, সবকিছু হিসাব করে রাখছেন এবং সেসব কাজের যথাযথ প্রতিদান দেবেন| সুতরাং, হে মানুষ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলো| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৩; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৩-২২৪; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১২৪) |

আয়াতের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿نَفْسٍ وَاحِدَةٍ﴾ “একটি প্রাণ থেকে”, সকল মুসলিম একমত যে, আয়াতাংশে ‘একটি প্রাণ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আদম (আ.) | (আত-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৭৭) |
﴿زَوْجَهَا﴾ ‘তার স্ত্রী’, সকল তাফসীরকারক এক মত যে, এখানে ‘তার স্ত্রী’ দ্বারা আদম (আ.)-এর স্ত্রী হাওয়াকে (আ.) বুঝানো হয়েছে| (আত-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৭৭) |
﴿وَالأَرْحَامَ﴾ “এবং আত্মীয়গণ”, এখানে আয়াতাংশের দুইটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
(ক) শব্দটিকে ‘নসব’ বা যবর দিয়ে পড়লে এর অর্থ হবে- তোমরা আল্লাহকে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর|
(খ) শব্দটিকে ‘যর’ বা ‘যের’ দিয়ে পড়লে এর অর্থ হবে- তোমরা আল্লাহ এবং আত্মীয়তাকে মাধ্যম বানিয়ে আবেদন করে থাক| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১৮১, আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩২) |

আয়াতের আলোকে হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টির ঘটনা:
তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তা’আলা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে জান্নাতে বসবাসের ব্যবস্থা করেন| পরে তাঁর একাকীত্ব দূর করা এবং তাঁর জন্য শান্তি ও সঙ্গের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে আদম (আ.)-এর বাম পাশের একটি পাঁজরের হাড় থেকে হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন| আদম (আ.) ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন| যখন তিনি জেগে উঠলেন, তখন তাঁর পাশে হাওয়া (আ.)-কে দেখতে পেলেন| এরপর আল্লাহ তাদের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং জান্নাতে একত্রে বসবাসের অনুমতি দেন| এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
“إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ أَعْوَجَ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهَا كَسَرْتَهَا، وَإِنْ تَرَكْتَهَا وَفِيهَا عِوَجٌ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا”.
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই নারীকে একটি বাঁকা পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে| তুমি যদি সেটিকে একেবারে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে| আর যদি তার ¯^ভাবগত বাঁকাভাবসহ তাকে গ্রহণ কর, তবে তার সঙ্গে জীবন উপভোগ করতে পারবে” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)| তবে হাওয়ার (আ.) সৃষ্টির বিস্তারিত সময়, পদ্ধতি ও ঘটনার অনেক বিবরণ ইসরাইলি বর্ণনা থেকে এসেছে| তাই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে শুধু কুরআন ও সহীহ হাদিসে যা এসেছে, সেটুকুই গ্রহণ করা উচিত|

আয়াতের শিক্ষা:
সূরাতু আন-নিসা ইসলামী সমাজ ও পারিবারিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূরা| এ সূরায় পরিবার, বিবাহ, নারী-পুরুষের অধিকার, উত্তরাধিকার, এতিমের হক এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কিত নানা বিধান আলোচনা করা হয়েছে| তাই সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা’আলা সমগ্র মানবজাতিকে তাকওয়া অবল¤^নের আহ্বান জানিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সকল মানুষ একই পিতা-মাতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে| এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে| এ আয়াত মানবজাতির ঐক্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক চমৎকার ভিত্তি স্থাপন করে| এ আয়াতের মৌলিক শিক্ষা গুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
(ক) আয়াত শুরু হয়েছে ‘হে মানবজাতি’ দিয়ে, তাফসিরবিদ উসূলবিদ আলেমগণ একমত যে, “হে মানবজাতি!”—এই স¤ে^াধন সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষের জন্য সাধারণভাবে প্রযোজ্য| এ মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ| এর পক্ষে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
প্রথমত, ‘আন-নাস’ (মানুষ) শব্দটি এমন একটি বহুবচন শব্দ যার সঙ্গে ‘আলিফ-লাম’ যুক্ত হয়েছে| আর আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের শব্দ সাধারণত সকল মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে|
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা’আলা তাকওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সবাইকে একক সত্তা তথা আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি করেছেন| এই কারণটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নয়; বরং সকল মানুষের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য| যেহেতু কারণটি সর্বজনীন, তাই এর ওপর ভিত্তি করে প্রদত্ত বিধানও সর্বজনীন হবে|
তৃতীয়ত, তাকওয়া অবল¤^নের নির্দেশ কেবল মক্কার অধিবাসীদের জন্য নয়; বরং পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য| অতএব, ‘মানুষ’ শব্দটি যখন সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাকওয়ার নির্দেশও যখন সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, এবং এ নির্দেশের ভিত্তি—অর্থাৎ সকল মানুষের এক পিতা আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি হওয়াও যখন সর্বজনীন সত্য, তখন এ আয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সার্বজনীন আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করাই যথার্থ| (তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৭৫)|
সাধারণত মাক্কী সূরাগুলোতে ‘হে মানবজাতি’ স¤ে^াধন থাকে, আর মাদানী সূরাতে থাকে ‘হে মুমিনগণ’| তবে এ সূরাটি মাদানী হওয়া সত্ত্বেও “হে মানবজাতি!” স¤ে^াধনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে| এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সূরাটিতে বিবাহ, উত্তরাধিকার, দাম্পত্য অধিকার, আত্মীয়তার সম্পর্ক, দুধ-সম্পর্কসহ মানবজীবনের বহু সামাজিক বিধান আলোচনা করা হয়েছে, যা সকল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৫) |
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে তাক্বওয়া বা আল্লাহ ভীতি অবল¤^নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| আলী (রা.)-এর ভাষ্যমতে তাক্বওয়া হলো-
“الخوف من الجليل، والعمل بالتنزيل، والرضا بالقليل، والاستعداد ليوم الرحيل”.
অর্থাৎ: “মহামহিম আল্লাহকে ভয় করা, অবতীর্ণ বিধান (কুরআন) অনুযায়ী আমল করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রস্থান দিবস (মৃত্যু ও আখিরাত)-এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা”| তাক্বওয়ার এ সংজ্ঞাকে আরো স্পষ্ট করার জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব ও উবাই ইবনু কা’ব-এর মধ্যকার ঘটনাটি বর্ণনা করা যায়- “উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার উবাই ইবনু কা‘ব (রা.)-কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে চলেছেন?” উমর (রা.) বললেন, “হ্যাঁ”| তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তখন আপনি কী করেছিলেন?” উমর (রা.) বললেন, “আমি কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলেছিলাম, যাতে কাঁটা না লাগে”| তখন উবাই ইবনু কা‘ব (রা.) বললেন, “এটাই হলো তাকওয়া”| (তাফসীর ইবনু কাছীর: ১/৭৫) | অর্থাৎ, তাকওয়া হলো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা নিয়ে চলা; এমনভাবে নিজেকে গুনাহ, অবাধ্যতা ও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণসমূহ থেকে রক্ষা করা, যেমন একজন পথিক কাঁটাযুক্ত পথে চলার সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে কাঁটার আঘাত থেকে বাঁচিয়ে চলে| তাই তাকওয়া শুধু আল্লাহকে ভয়ের ভান করার নাম নয়; বরং সচেতনতা, আত্মসংযম, সতর্কতা এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করার নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম| (আল্লাহই ভালো জানেন)|
আয়াতাংশে রবকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে| রুবুবিয়্যাত ও তাকওয়া-এর মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
(১) রবুবিয়্যাতের ¯^ীকৃতি তাকওয়ার ভিত্তি, যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে আল্লাহই তার স্রষ্টা, প্রতিপালক, রিযিকদাতা, জীবনদাতা ও পরিচালনাকারী, তখন ¯^াভাবিকভাবেই তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভয় সৃষ্টি হয়| এই অনুভূতির বাস্তব প্রকাশই হলো তাকওয়া| অর্থাৎ- রুবুবিয়্যাতের জ্ঞান → আল্লাহর মহত্বের উপলব্ধি → তাকওয়ার জন্ম|
(২) সৃষ্টির ঋণ ¯^ীকার থেকে আনুগত্যের জন্ম, যে সত্তা আমাকে অস্তিত্ব দিয়েছে, লালন-পালন করেছে এবং প্রতিনিয়ত আমার জীবন পরিচালনা করছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা ˆনতিকভাবে অপরিহার্য| তাই রবুবিয়্যাতের ¯^ীকৃতি মানুষকে তাকওয়ার দিকে পরিচালিত করে| ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর রবুবিয়্যাত সম্পর্কে যত বেশি জ্ঞান লাভ করে, তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি তত বেশি ভয়, ভালোবাসা ও আনুগত্য সৃষ্টি হয়”| (তারিখ আল-হিজরাতাইন: ২৮৩) |
সুতরাং রুবুবিয়্যাত মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টি করে যে, আমি ¯^াধীন ও ¯^য়ংসম্পূর্ণ নই; বরং একজন মহান রবের সৃষ্টি ও অধীন| আর এই উপলব্ধি থেকে যে বিনয়, আনুগত্য, সতর্কতা ও জবাবদিহিতাবোধ জন্ম নেয়, তারই নাম তাকওয়া|
(গ) আয়াতের তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রবুবিয়্যাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তুলে ধরেছেন| তিনি মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সকল মানুষের মূল উৎস এক| আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে আমাদের আদি পিতা আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন| এরপর আদম (আ.)-এর দেহ থেকে তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন, যাতে তারা একে অপরের সঙ্গী ও শান্তির কারণ হতে পারেন| তারপর এই প্রথম মানবদম্পতির মাধ্যমে মানবজাতির বংশধারা বিস্তার লাভ করে| পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির অসংখ্য পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে পড়লেও তাদের সবার মূল উৎস এক এবং স্রষ্টাও এক| অত্র আয়াতাংশে তাদের দাবির জোরালো ও অকাট্য জবাব নিহিত রয়েছে, যারা মনে করে যে মানুষ বানর থেকে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান মানবজাতিতে পরিণত হয়েছে| আল্লাহ তা‘আলা এখানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সমগ্র মানবজাতিকে “একক প্রাণ” অর্থাৎ আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি করেছেন| এ আয়াতের ভাষা মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে কোনো ধরনের সংশয় বা অনুমানের অবকাশ রাখে না; বরং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, সকল মানুষের আদি পিতা হলেন আদম (আ.) এবং সকল নারী-পুরুষ তাঁরই বংশধর|
সুতরাং যারা দাবি করে যে মানুষের মূল উৎস বানর, তাদের উত্তরে আমরা বলি: আমরা মুসলিম হিসেবে মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান গ্রহণ করি আল্লাহর ওহী থেকে, যিনি সর্বজ্ঞ এবং সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত| তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, আদম (আ.)-ই প্রথম মানব এবং তাঁর থেকেই মানববংশের বিস্তার ঘটেছে| অতএব, মানুষের উৎপত্তিকে বানরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা আল্লাহর সুস্পষ্ট বাণীর পরিপন্থী|
এ কারণে যারা নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষকে বানরের বংশধর মনে করে, তা তাদের নিজ¯^ ধারণা ও মতবাদ| কিন্তু সেই ধারণাকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আমাদেরকেও সেই দাবির অন্তর্ভুক্ত করার কোনো অধিকার তাদের নেই| আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের পরিচয় কোনো প্রাণীজগতের বিবর্তিত রূপ হিসেবে নয়; বরং আমরা সেই সম্মানিত মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত, যার সূচনা হয়েছে আল্লাহর হাতে সৃষ্ট প্রথম মানব আদম (আ.)-এর মাধ্যমে| এই বিশ্বাস মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও ¯^তন্ত্র সৃষ্টিগত ˆবশিষ্ট্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং মানবজাতির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আল্লাহপ্রদত্ত সত্যের প্রতি আমাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করে| (আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন) |
(ঘ) আয়াতের চতূর্থাংশে আল্লাহ ভীতির গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপশি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে| মানুষের ¯^ভাব হলো, তারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য একে অপরের কাছে আল্লাহর নামের মাধ্যমে আবেদন করে| যেমন কেউ বলে, “আল্লাহর ওয়াস্তে আমার এই কাজটি করে দিন” বা “আল্লাহর দোহাই, আমাকে সাহায্য করুন|” এ ধরনের আবেদন প্রমাণ করে যে মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও মহত্ত্বের ¯^ীকৃতি রয়েছে| কারণ মানুষ সাধারণত এমন সত্তার নামে আবেদন করে, যাকে সে মহান ও সম্মানিত মনে করে| অতএব, যখন মানুষ আল্লাহর নামকে এত সম্মান ও মর্যাদা দেয় যে তাঁর নামের মাধ্যমে অন্যের কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের আবেদন করে, তখন তার উচিত আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতিও সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল হওয়া| আল্লাহর নির্দেশ পালন করা, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিহার করাই প্রকৃত তাকওয়ার দাবি|
এরপর আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন| যেমন আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য, তেমনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাও ভয়ংকর গুনাহ, যা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক| তাই আয়াতের অর্থ হলো—তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামের মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে প্রার্থনা কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককেও সম্মান কর| আত্মীয়-¯^জনের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, তাদের খোঁজখবর নাও, তাদের উপকার কর এবং সম্পর্ক অটুট রাখ| কখনো আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করো না; কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এমন একটি অপরাধ, যা থেকে প্রত্যেক মুমিনের সতর্ক থাকা উচিত| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৪) | এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحامَكُمْ﴾ [سورة محمد: ৪৭].
অর্থাৎ: তোমরা যদি আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভ কর, তবে কি তোমাদের দ্বারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া আর কিছু প্রত্যাশিত আছে? (সূরাতু মোহাম্মদ: ৪৭) |
এ ব্যাপারে অনেক হাদীস এসেছে, যেমন একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إنَّ الرَّحِمَ شِجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ، فقالَ اللَّهُ: مَن وصَلَكِ وصَلْتُهُ، ومَن قَطَعَكِ قَطَعْتُهُ” (صحيح البخاري: ৫৯৮৮).
অর্থাৎ- “আত্মীয়তার সম্পর্ক (রহিম) রহমানের (আল্লাহর) সঙ্গে বিশেষভাবে সংযুক্ত| তাই আল্লাহ বলেছেন: ‘যে তোমাকে (আত্মীয়তার সম্পর্ককে) বজায় রাখবে, আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক (রহমত ও অনুগ্রহ) বজায় রাখব; আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমিও তাকে আমার রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করব” (সহীহ আল-বুখারী: ৫৯৮৮)| সুতরাং এ আয়াত আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
১. আল্লাহর প্রতি যথাযথ তাকওয়া ও আনুগত্য অবল¤^ন করা|
২. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা এবং কোনো অবস্থাতেই সম্পর্ক ছিন্ন না করা| এ দু’টি গুণই একজন মুমিনের ঈমানের পূর্ণতা ও উত্তম চরিত্রের অন্যতম নিদর্শন| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
(ঙ) আল্লাহর সর্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের অনুভূতি| আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা পর্যবেক্ষক”| এই আয়াতাংশ মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপন—সব অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করতে এবং তাঁর নজরদারির কথা স্মরণ রাখতে শিক্ষা দেয়| তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি সকল কিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবগত, প্রত্যেক মানুষের কাজকর্ম, কথা, অবস্থা ও অন্তরের গোপন বিষয়সমূহও তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়| তিনি সর্বদা তাঁর বান্দাদের ওপর পর্যবেক্ষক, রক্ষক ও হিসাবগ্রহণকারী| তাই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য এমন কোনো বিধান প্রণয়ন করেন না, যাতে তাদের ক্ষতি রয়েছে; বরং তাঁর সকল আদেশ-নিষেধ মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ইহকাল-পরকালের সফলতার জন্যই নির্ধারিত| তিনি আমাদের অবস্থা, প্রয়োজন ও দুর্বলতা সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত| ফলে তাঁর নির্দেশনাই মানুষের জন্য সর্বোত্তম পথনির্দেশনা| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৪) |
আয়াতের এই সমাপ্তি অংশ মূলত তাকওয়া অবল¤^ন ও আল্লাহর আদেশ পালনের প্রতি একটি শক্তিশালী প্রেরণা এবং অবাধ্যতা থেকে সতর্কবাণী| কারণ যখন মানুষ বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তার প্রতিটি কাজ, কথা ও চিন্তা সম্পর্কে অবগত, তখন সে আল্লাহকে ভয় করবে, তাঁর আদেশ মেনে চলবে এবং তাঁর নিষেধকৃত বিষয় থেকে দূরে থাকবে| এ সমাপ্তি অংশটি অর্থ ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে আল্লাহর এ বাণীর অনুরূপ:
﴿وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ﴾ [سورة المجادلة: ৬، وسورة البروج: ৯].
অর্থাৎ: “আর আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর ওপর সাক্ষী” (সূরাতু আল-মুজাদালাহ: ৬, সূরাতু আল-বুরুজ: ৯)|

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবল¤^ন করে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা|
(খ) সমগ্র মানবজাতিকে একই পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে বিবেচনা করে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা|
(গ) আত্মীয়-¯^জনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সিলাতুর রাহিমের হক আদায় করা|
(ঘ) মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) প্রদত্ত সত্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং আকীদাগত বিভ্রান্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা|
(ঙ) সর্বদা এই বিশ্বাস ও অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখা যে আল্লাহ আমাদের সকল কথা, কাজ ও অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে অবগত; তাই প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর আনুগত্যে অবিচল থাকা|

সূরাতু আন-নিসা এর পরিচয়, নামকরণ ও ফযিলত

By দৈনিক তাফসীর No Comments

(سُوْرَةُ النِّسَاء)

সূরাতু আন-নিসা এর পরিচয়:
সূরার নাম:
এ সূরার একমাত্র প্রসিদ্ধ নাম ‘সূরাতু আন-নিসা’ (سورة النساء), যার অর্থ ‘নারীগণ’| এ নামে নামকরণের দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে—
প্রথমত: সূরার প্রথম আয়াতে ‘নিসা’ (নারী) শব্দটি উল্লেখ রয়েছে| (বিতাকাতুত তা‘রীফ, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ: ৩০)|
দ্বিতীয়ত: নারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান, অধিকার ও পারিবারিক বিষয়াবলি এ সূরায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে| এজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরাতু আন-নিসা’| (আত-তাফসীরুল মাওদূঈ, মুস্তফা মুসলিম: ২/১) |
এ নামকরণ ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপের একটি উজ্জ্বল প্রমাণ|
সূরার আলোচ্য বিষয়:
সূরাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো— ঈমানের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম সমাজকে প্রস্তুত করা|
আরও বিস্তৃতভাবে বললে, এ সূরায় পারিবারিক জীবন, উত্তরাধিকার আইন, নারীর অধিকার, বিবাহ ও তালাক, এতিমের হক, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালা, জিহাদ, মুনাফিকদের চরিত্র এবং ঈমান ও তাকওয়া-সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে|
সূরার ফযিলত:
সূরাতু আন-নিসার বহু ফযিলত রয়েছে| সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীসের আলোকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ফযিলত নিম্নে তুলে ধরা হলো—
১| পাঁচটি মহামূল্যবান আয়াত
ইমাম হাকিম (রহ.) তাঁর আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন—

“সূরা আন-নিসার পাঁচটি আয়াত আমার কাছে দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়েও অধিক প্রিয়, যা তেলাওয়াত করে আমি অত্যাধিক আনন্দ পাই|” আয়াতগুলো হলো—
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ﴾ (৪:৪০), ﴿إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ﴾ (৪:৩১),
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ﴾ (৪:১১৬), ﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ﴾ (৪:৬৪),
﴿وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ﴾ (৪:১১০). (আল-মুস্তাদরাক: ২/৩০৫) |
২| সাবউ আত-তিওয়াল (দীর্ঘ সাত সূরা)-এর অন্তর্ভুক্ত
সূরাতু আন-নিসা কুরআনের সাবউ আত-তিওয়াল বা দীর্ঘ সাতটি সূরার অন্যতম| হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
্রمَنْ أَخَذَ السَّبْعَ الأُوَلَ مِنَ الْقُرْآنِ فَهُوَ حَبْرٌগ্ধ
অর্থ: “যে ব্যক্তি কুরআনের প্রথম সাতটি সূরা আয়ত্ত করবে, সে একজন আলেম হিসেবে গণ্য হবে” (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৫৭৫) | মুহাক্কিক শুয়াইব আরনাউত (রহ.) হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন| দীর্ঘ সাতটি সূরা হলো— সূরা আল-বাকারা, আলে ইমরান, আন-নিসা, আল-মায়িদাহ, আল-আন‘আম, আল-আ‘রাফ এবং আত-তাওবাহ|
৩. তাহাজ্জুদের সালাতে এ সূরা তিলাওয়াত, হুযাইফা (রা.) বলেন—
্রقُمْتُ إِلَى جَنْبِ رَسُولِ اللهِ ﷺ ذَاتَ لَيْلَةٍ، فَقَرَأَ السَّبْعَ الطِّوَلَ فِي سَبْعِ رَكَعَاتٍগ্ধ
অর্থ: “এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে সালাতে দাঁড়িয়েছিলাম| তিনি সাত রাকাতে সাতটি দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করেছিলেন” (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪১১) | মুহাক্কিক শুয়াইব আরনাউত (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, সনদের একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত হওয়ায় হাদীসটি হালকা দুর্বল (ضعيف يسير)|
পূর্ববর্তী সূরার সঙ্গে সম্পর্ক:
সূরাতু আন-নিসার সঙ্গে সূরাতু আলে ইমরানের বিষয়গত সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও সুস্পষ্ট| উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলো—
প্রথমত: সূরাতু আলে ইমরান তাকওয়ার নির্দেশনার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে, আর সূরাতু আন-নিসা শুরু হয়েছে তাকওয়ার আহ্বানের মাধ্যমে| ফলে দুই সূরার মধ্যে সুন্দর বিষয়গত ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়|
দ্বিতীয়ত: সূরাতু আলে ইমরানে উহুদ যুদ্ধের ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে| সূরাতু আন-নিসাতেও উহুদ-পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনা ও মুনাফিকদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে| আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ﴾
“মুনাফিকদের ব্যাপারে তোমাদের দুই দলে বিভক্ত হওয়ার কারণ কী?”(আন-নিসা: ৮৮)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এ আয়াতও উহুদ-পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত|

তৃতীয়ত: সূরাতু আলে ইমরানে উহুদের পর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে—
﴿الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ﴾ [سورة النساء: ১৭২-১৭৫].
অন্যদিকে সূরাতু আন-নিসায় মুমিনদের শত্রুর মোকাবিলায় দুর্বলতা প্রদর্শন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
﴿وَلَا تَهِنُوا فِي ابْتِغَاءِ الْقَوْمِ﴾ [سورة النساء: ১০৪].
এভাবে সূরাতু আন-নিসা পূর্ববর্তী সূরার আলোচনাকে বিস্তৃত ও পরিপূর্ণ করেছে| গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আলে ইমরানে সংক্ষেপে উল্লেখিত বহু বিষয় এ সূরায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে| ফলে উভয় সূরার মধ্যে গভীর সম্পর্ক, সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়|
মুসহাফে সূরার অবস্থান:
মুসহাফের বিন্যাস অনুযায়ী সূরাতু আন-নিসা কুরআনের চতুর্থ সূরা| (আত-তাফসীরুল মাওদূঈ, মুস্তফা মুসলিম: ২/২) |
নুযূলের ক্রম:
নাযিল হওয়ার ক্রম অনুসারে এটি বিরানব্বইতম (৯২তম) সূরা| এটি সূরাতুল মুমতাহিনার পরে এবং সূরাতুয যিলযালের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে|
অবতীর্ণের স্থান:
সকল মুফাসসিরের মতে সূরাতু আন-নিসা একটি মাদানী সূরা|
হযরত আয়িশা (রা.) থেকে ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেন— “সূরা আন-নিসা তখন অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট অবস্থান করছিলাম”|

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে| কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে হযরত আয়িশা (রা.)-এর ˆববাহিক জীবন মদীনাতেই শুরু হয়েছিল| (আত-তাফসীরুল মাওদূঈ, মুস্তফা মুসলিম: ২/১)
আয়াত সংখ্যা:
সূরাতু আন-নিসায় মোট ১৭৬টি আয়াত রয়েছে|
অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
মুফাসসিরগণের গবেষণা অনুযায়ী, এ সূরায় মোট বিয়াল্লিশটি (৪২) আসবাবুন নুযূল বা অবতীর্ণ-প্রেক্ষাপট উল্লেখিত হয়েছে, যা এ সূরার বিষয়বস্তুর ˆবচিত্র্য ও বাস্তবধর্মিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক|

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯৬-২০০) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফির, মুত্তাকি ও আহলে কিতাবী মুমিনদের অবস্থা ও তাদের পরিণাম|

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ (196) مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ (197) لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ (198) وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ (199) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (200)﴾ [سورة آل عمران: 196-200).

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: কাফির, মুত্তাকি ও আহলে কিতাবের মুমিনদের অবস্থা ও তাদের পরিণাম|

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৯৬| হে নবী! কাফিরদের দেশ-দেশান্তরে অবাধ বিচরণ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে|
১৯৭| এগুলো সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র| অতঃপর তাদের আবাস হবে জাহান্নাম| আর তা কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল!
১৯৮| কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত| তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে| এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য সম্মানজনক আপ্যায়ন| আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য অনেক উত্তম|
১৯৯| আর নিশ্চয় আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর প্রতি, তোমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি এবং তাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার প্রতিও ঈমান আনে| তারা আল্লাহর সামনে বিনীত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে না| তাদের জন্য তাদের রবের নিকট প্রতিদান রয়েছে| নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী|
২০০| হে ঈমানদারগণ! তোমরা ˆধর্য ধারণ করো, ˆধর্যে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করো, সতর্ক ও প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো|

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
(১৯৬,১৯৭) আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের দাঈদের তাদের নবী মোহাম্মদের (সা.) ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সতর্ক করে দিচ্ছেন, যেন কাফির, মুশরিক ও বিপর্যয়সৃষ্টিকারীদের ভোগ-বিলাস, উপার্জন, লাভ-লোকসান এবং তাদের ভোজন, পানাহার ও বাহ্যিক সুখ-সম্ভোগ দেখে তারা প্রতারিত না হয়| যেন তারা এমন মনে না করে যে, এরা সত্যপথে আছে, অথবা আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট নয়, বরং সন্তুষ্ট| মোটেই তা নয়| এগুলো দুনিয়ার সামান্য ভোগমাত্র; অতঃপর তাদের প্রত্যাবর্তন হবে নিকৃষ্টতম আশ্রয়ের দিকে| সেটি হলো জাহান্নাম, যেখানে পৌঁছার পথ তারা শিরক ও গুনাহের মাধ্যমে নিজেরাই প্রস্তুত করেছে| কতই না নিকৃষ্ট সেই আবাস, যা তারা নিজেদের জন্য প্রস্তুত করেছে|
(১৯৮) আগের আয়াতে কাফিরদের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছিল- জাহান্নাম, যা নিকৃষ্টতম পরিণতি| আর এই আয়াতে মুমিনদের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে, যা উত্তম পরিণতি| তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত| আল্লাহর নিকট যে চিরস্থায়ী নেয়ামত রয়েছে, তা ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারীদের জন্য দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম| সুতরাং তারা দরিদ্র হলেও কোনো ক্ষতি নেই|
(১৯৯) এই আয়াতে কিছু মুনাফিকের কথার জবাব দেওয়া হয়েছে| তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের নিন্দা করেছিল, যখন তারা নাজ্জাসী-এর মৃত্যুর পর তাঁর জানাযার সালাত আদায় করেন| তারা বলেছিল, “দেখো, মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা এমন এক বিদেশির জানাযা পড়ছে, যে তাদের দেশে মারা যায়নি এবং তাদের ধর্মেরও ছিল না”| এভাবে তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুমিনদের প্রতি কটাক্ষ করতে চেয়েছিল| আল্লাহ তা’আলা তাদের জবাবে বলেন, আহলে কিতাব, অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যেও এমন লোক আছে, যারা আল্লাহর প্রতি, মুমিনদের ওপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি, এবং তাদের নিজেদের ওপর নাযিল হওয়া তাওরাত ও ইনজিলের প্রতিও ঈমান আনে| তারা আল্লাহর সামনে বিনীত, অনুগত ও ইবাদতকারী| তারা অন্য অনেক ইহুদি-খ্রিস্টানের মতো আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্য পার্থিব ¯^ার্থ গ্রহণ করে না; তারা আল্লাহর বাণী বিকৃতি করে না, গোপনও করে না| এই গুণগুলো কিছু কিছু ইহুদী-খ্রিষ্টানদের মধ্যেও পাওয়া যায়| এদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম এবং খ্রিস্টানদের মধ্যে নাজ্জাসী| আহলে কিতাবের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন এবং আল্লাহর সম্মান ও অনুগ্রহের উপযুক্ত| আল্লাহ তা’আলা তাদের সম্পর্কে বলেন: “তাদের জন্য তাদের রবের কাছে প্রতিদান রয়েছে”| কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন| নিশ্চয় আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী| তিনি সমগ্র সৃষ্টির হিসাব দুনিয়ার অর্ধ দিনের সমপরিমাণ সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করবেন|
(২০০) এ আয়াতে উম্মতের জন্য এক মহামূল্যবান উপদেশ রয়েছে| তাদেরকে আহ্বান করা হয়েছে- তারা যেন ইবাদতে ˆধর্যশীল হয়, বিপদ-মুসিবতে অবিচল থাকে, শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ় থাকে, যতক্ষণ না শত্রুরা সত্য গ্রহণ করে অথবা মুসলিমদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়| তাদেরকে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- তারা যেন সীমান্তে সদা প্রস্তুত থাকে, নিজেদের শক্তি ও সামরিক উপকরণ দ্বারা শত্রুকে ভীত রাখে, যাতে তারা মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণের সাহস না পায়| আর সর্বোপরি, আল্লাহভীতি অবল¤^ন করতে বলা হয়েছে; কারণ তাকওয়াই তাদের বিজয় ও সফলতার প্রধান কারণ|
এই মহান রব্বানী দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই সূরাতু আলে-ইসরান সমাপ্ত হয়েছে, যা একটি বরকতময় সূরা এবং হিকমত ও বিধানে পরিপূর্ণ| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩০-৪৩১; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৪-২১৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৬; আল-মুনতাখাব: ১/১২২-১২৩) |

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَا يَغُرَّنَّكَ﴾ “যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে”, এ আয়াতাংশে ‘তোমাকে’ দ্বারা কাকে স¤ে^াধন করা হয়েছে? এ বিষয়ে অধিকাংশ তাফসীরকারকের মত হলো- এখানে বাহ্যত রাসূলুল্লাহকে স¤ে^াধন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে উদ্দেশ্য সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং সমগ্র উম্মত|
সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ হলো- কাফেরদের বাহ্যিক প্রাচুর্য, শক্তি-সামর্থ্য ও জাগতিক সফলতা যেন মুমিনদেরকে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না করে| (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৯৬) |
কারণ তাফসীরশাস্ত্রে সাধারণ নীতি হলো-
“خطابُ النبيِّ ﷺ خطابٌ لأمته ما لم يدلَّ دليلٌ على التخصيص”.
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহকে করা স¤ে^াধন মূলত তাঁর উম্মতের প্রতিও প্রযোজ্য, যতক্ষণ না বিশেষ কোনো দলিল সেটিকে কেবল তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে| (আল-ইতক্বান ফি উলূম আল-কোরআন, সুয়ূতী: ৩/২৩৩-২৩৪) |
﴿تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ﴾ ‘দেশ-বিদেশে কাফেরদের অবাধ বিচরণ’, আয়াতাংশের অর্থ হলো- দেশ-বিদেশে তাদের চলাফেরা ও ব্যবসা-বানিজ্য, কৃষিকাজ, ধনসম্পদের বিস্তার এবং ভোজন ও পানাহারের মাধ্যমে নানরকম ভোগ-বিলাশে মত্ত থাকা| (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১১৭) | সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে- কাফিরদের বিভিন্ন অঞ্চলে অবাধ বিচরণ, অর্থনৈতিক সাফল্য, আরাম-আয়েশ ও বাহ্যিক সমৃদ্ধি দেখে যেন কেউ প্রতারিত না হয়| এগুলো স্থায়ী সাফল্যের প্রমাণ নয়, বরং দুনিয়ার সাময়ীক ভোগমাত্র| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
﴿مَتاعٌ قَلِيلٌ﴾ “সামান্য ভোগ-সামগ্রী”, এর দ্বারা এমন সামান্য ভোগ-সামগ্রীকে বোঝানো হয়েছে, যার দ্বারা মানুষ দুনিয়াতে অল্প সময়ের জন্য উপকৃত ও আনন্দিত হয়; অতঃপর তা ধ্বংস হয়ে যায় ও বিলীন হয়ে পড়ে| এটিকে ‘সামান্য’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে; কারণ এটি ¯^ল্পস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী| আর যা কিছু ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিলীনশীল, তা-ই প্রকৃতপক্ষে অল্প ও তুচ্ছ| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৩) | অর্থাৎ, কাফেরদের ধন-সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস দেখে মুমিনদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়| কারণ এসব নেয়ামত চিরস্থায়ী নয়; বরং খুব অল্প সময়ের জন্য| পরকালের অনন্ত জীবনের তুলনায় দুনিয়ার সমস্ত ভোগ-বিলাসই নগণ্য ও তুচ্ছ| আল্লাহই ভালো জানেন|
﴿وَصَابِرُوا﴾ “এবং ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করো”, আল্লাহর শত্রুদের মোকাবেলায়, বিশেষত জিহাদের ময়দানে তোমরা ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করো| অর্থাৎ, যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের চেয়ে অধিক দৃঢ়তা ও ˆধর্যের পরিচয় দাও; যেন তোমরা তাদের তুলনায় কম ˆধর্যশীল না হও| এখানে সাধারণভাবে ‘সবর’ করার নির্দেশ দেওয়ার পর বিশেষভাবে “وَصَابِرُوا” বলা হয়েছে; কারণ শত্রুর মোকাবেলায় অবিচল থাকা, যুদ্ধের কষ্ট সহ্য করা এবং সত্যের ওপর দৃঢ় থাকা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য বিষয়| (তাফসীর ইবনু কামাল বাশা: ২/৪৬৩) | অর্থাৎ, মুমিনদের শুধু নিজে ˆধর্য ধারণ করলেই চলবে না; বরং বাতিল শক্তির মোকাবেলায় ˆধর্য, সাহস ও দৃঢ়তায় তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও রাখতে হবে| আল্লাহই ভালো জানেন|
﴿وَرَابِطُوا﴾ “এবং শত্রুর বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত থাক”, এর অর্থ হলো- তোমরা সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা চৌকিগুলোতে অবস্থান করো, সেখানে নিজেদের অশ্ব (যুদ্ধের প্রস্তুতি) বেঁধে সদা সতর্ক ও প্রহরারত থাকো এবং শত্রুর মোকাবেলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকো| এখানে “রিবাত” শব্দটি মূলত সীমান্ত পাহারা দেওয়া, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং ইসলামী ভূখণ্ড রক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে| (তাফসীর ইবনু কামাল বাশা: ২/৪৬৩) | অর্থাৎ, মুমিনদের শুধু আভ্যন্তরীণভাবে ˆধর্যশীল হলেই চলবে না; বরং দ্বীনের নিরাপত্তা, মুসলিম সমাজের সুরক্ষা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বদা সজাগ, সংগঠিত ও প্রস্তুত থাকতে হবে| আল্লাহই ভালো জানেন|

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াত তথা ১৯৫ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা যখন মুমিনদের জন্য মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেন, তখন তাদের বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে, তারা দুনিয়াতে অধিকাংশই দরিদ্র ও কষ্টে জীবনযাপন করত; পক্ষান্তরে কাফেররা ভোগ-বিলাস, প্রাচুর্য ও ¯^াচ্ছন্দ্যের মধ্যে ছিল| তাই এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এমন একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যা মুমিনদের সান্তনা দেয় এবং তাদেরকে সেই কষ্ট ও দারিদ্র্যের ওপর ˆধর্য ধারণে সহায়তা করে| আর তা হলো- দুনিয়ার নিয়ামত ও আখিরাতের নিয়ামতের মধ্যে তুলনা করা| কারণ দুনিয়ার সব সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য ক্ষণস্থায়ী, একদিন তা শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আখিরাতের নিয়ামত চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর ও অনন্তকাল স্থায়ী থাকবে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৪) |

১৯৬ এবং ১৯৯ নম্বর আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
১৯৬ নম্বর আয়াত মক্কার মুশরিকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে| তারা তখন সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করত| ব্যবসা-বাণিজ্য করত এবং নানা ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল| তাদের এ অবস্থা দেখে কিছু মুমিন বললেন, “আমরা তো দেখছি আল্লাহর শত্রুরা কত সুখে-¯^াচ্ছন্দ্যে আছে, আর আমরা ক্ষুধা ও কষ্টে জর্জরিত হয়ে পড়েছি”| এর পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে শান্ত¦না প্রদানের জন্য ১৯৬ ন¤^র আয়াত নাযিল করেন| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৩) |
ইমাম নাসাঈ (রহ.) আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন নাজ্জাশী-এর মৃত্যুসংবাদ এলো, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তোমরা তাঁর জানাযার সালাত আদায় করো”| সাহাবিদের কেউ কেউ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি একজন হাবশী (আবিসিনীয়) দাসের জানাযা পড়ব?” তখন আল্লাহ তা‘আলা ১৯৯ ন¤^র আয়াত নাযিল করে মুমিনদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, আহলে কিতাবের মধ্যেও খাটি ঈমানদার থাকতে পারে| একই কথা জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস এবং কাতাদা (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতটি নাজ্জাশী-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল| (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৮) |
উল্লেখ্য যে, নাজ্জাশী ছিলেন আবিসিনিয়ার (হাবশার) ন্যায়পরায়ণ রাজা| তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুসলিম মুহাজিরদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন| তাঁর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অনুপস্থিত (গায়েবানা) জানাযা আদায় করেন| এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করেন যে, আহলে কিতাবের সবাই সমান নয়; তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন যারা সত্যকে গ্রহণ করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন|

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯৬-২০০) নং আয়াতসমূহে মানবজাতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির অবস্থা ও পরিণতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও শিক্ষণীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে| এখানে একদিকে কাফিরদের দুনিয়াব্যাপী প্রভাব, সমৃদ্ধি ও ভোগ-বিলাসের মোহময় চিত্র দেখে বিভ্রান্ত না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে| অপরদিকে মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, চিরস্থায়ী জান্নাত এবং মহাসফলতার সুসংবাদ ঘোষণা করা হয়েছে| একই সঙ্গে আহলে কিতাবের মধ্য থেকে যারা সত্যকে চিনে আন্তরিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তাদের ঈমানদারিত্ব, বিনয় ও আল্লাহভীতির প্রশংসা করে তাদের জন্যও মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে| সর্বশেষ আয়াতে মুমিনদেরকে ˆধর্য, দৃঢ়তা, পারস্পরিক সহযোগিতা, আত্মসংযম এবং তাকওয়া অবল¤^নের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে| এভাবে আয়াতগুলো সত্য ও মিথ্যার অনুসারীদের পরিণতির একটি সুস্পষ্ট তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে এবং মুমিনদের জন্য সফলতার চিরন্তন পথরেখা নির্ধারণ করে|
১| ১৯৬ ন¤^র আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে দুনিয়ায় যে প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন, তা দেখে যেন কোনো মুমিন বিভ্রান্ত না হয়| এ বিভ্রান্তি দুইভাবে সৃষ্টি হতে পারে:
প্রথমত: কেউ ধারণা করতে পারে যে, কাফিররা যেহেতু এত উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে, সুতরাং তাদের পথই সঠিক| সে মনে করতে পারে, যদি তাদের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি ভুল হতো, তবে আল্লাহ তাদেরকে এত সুযোগ ও সফলতা দিতেন না|
দ্বিতীয়ত: কেউ তাদের জীবনধারা, চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করতে পারে| সে মনে করতে পারে যে, তাদের ধর্মহীনতা, অবাধ জীবনযাপন বা ইসলামী বিধান থেকে মুক্ত থাকাই তাদের উন্নতির মূল কারণ|
বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এই ভুল ধারণায় আক্রান্ত হয়েছে| তারা মনে করে, পশ্চিমা জাতিগুলো ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই উন্নত হয়েছে| ফলে তারা ইসলামসহ যে কোনো ধর্মীয় অনুশাসনকে পশ্চাদপদতার কারণ মনে করে| অথচ এটি একটি মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা| (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮২) |
এখানে একটি ¯^াভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে- কাফিররা আল্লাহ তা’আলার অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তারা কীভাবে দুনিয়ায় এত সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বাহ্যিক সুখ-¯^াচ্ছন্দ্যের অধিকারী হয়?
এর উত্তর হলো-
(ক) আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে আখিরাতের মহপাকড়াও-এর পূর্বে সাময়ীক অবকাশ প্রদান করেন| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ ۚ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ﴾ [سورة آل عمران: ১৭৮].
অর্থাৎ- “কাফিররা যেন মনে না করে যে, আমি তাদের যে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্য কল্যাণকর| আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি, যাতে তারা আরও পাপে বৃদ্ধি পায়; আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৭৮) |
তিনি আরও বলেন:
﴿سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ ۝ وَأُمْلِي لَهُمْ ۚ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ﴾
অর্থাৎ- “আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে তারা টেরও পাবে না| আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি; নিশ্চয়ই আমার কৌশল অত্যন্ত শক্তিশালী” (সূরাতু আল-কলম: ৪৫), (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮২)|
(খ) আখিরাতের তুলনায় এ দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ তা’আলার কাছে অত্যন্ত নগণ্য, তাই তিনি কাফেরদেরকেও সাময়িকভাবে এর ভোগ-বিলাস ও প্রাচুর্য দান করেন| এ বিষয়ে সহীহ হাদীসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে| রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ” (سنن الترمذي).
অর্থাৎ- “আল্লাহর কাছে যদি দুনিয়ার মূল্য একটি মশার পাখার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফিরকে এ দুনিয়া থেকে এক চুমুক পানিও পান করাতেন না” (সুনানে তিরমিযী) | অর্থাৎ, আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে দুনিয়ায় সম্পদ, ক্ষমতা, সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য বা সমৃদ্ধি দান করেন বলে এটা তাঁর নিকট তাদের মর্যাদার প্রমাণ নয়| বরং দুনিয়া আল্লাহর কাছে এতই তুচ্ছ যে তিনি তা মুমিন-কাফির সবার মাঝেই বণ্টন করেন|
(গ) দুনিয়া আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি নয়; তাই তিনি তা প্রিয়-অপ্রিয় সকলকেই দান করেন, কিন্তু ঈমান ও হিদায়াত দান করেন শুধু তাঁর প্রিয় বান্দাদের| একটি হাদীসে এসেছে-
“إِنَّ اللَّهَ يُعْطِي الدُّنْيَا مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ، وَلَا يُعْطِي الدِّينَ إِلَّا مَنْ أَحَبَّ” (مسند أحمد:).
অর্থাৎ- “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া তাকে দেন যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন; কিন্তু দ্বীন তিনি কেবল তাকেই দান করেন যাকে ভালোবাসেন” (মুসনাদে আহমাদ: ) |
(ঘ) ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, কাফির যদি কোনো ভালো কাজ করে- যেমন দান-সদকা, মানবসেবা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি, তবে আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেন| কারণ আখিরাতে পুরস্কার পাওয়ার জন্য ঈমান শর্ত| এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مُؤْمِنًا حَسَنَةً، يُعْطَى بِهَا فِي الدُّنْيَا وَيُجْزَى بِهَا فِي الْآخِرَةِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُطْعَمُ بِحَسَنَاتِ مَا عَمِلَ بِهَا لِلَّهِ فِي الدُّنْيَا، حَتَّى إِذَا أَفْضَى إِلَى الْآخِرَةِ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَةٌ يُجْزَى بِهَا” (صحيح مسلم: ).
অর্থাৎ- “আল্লাহ মুমিনের কোনো নেক আমলের প্রতি জুলুম করেন না| তাকে এর বিনিময় দুনিয়াতেও দেন এবং আখিরাতেও প্রতিদান দেন| আর কাফির যে ভালো কাজ করে, তার প্রতিদান তাকে দুনিয়াতেই দেওয়া হয়| অতঃপর যখন সে আখিরাতে পৌঁছবে, তখন তার জন্য এমন কোনো নেকি অবশিষ্ট থাকবে না যার প্রতিদান তাকে দেওয়া হবে” (সহীহ মুসলিম) |
তাই বলা যায়: আল্লাহ কাফিরদেরকে কখনো তাদের কিছু ভালো কাজের প্রতিদান হিসেবে দুনিয়ায় সম্পদ, সুখ, সুনাম, ক্ষমতা বা উন্নতি দান করেন| কিন্তু এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়; বরং তাদের নেক কাজের দুনিয়াবি প্রতিদান| আখিরাতের স্থায়ী প্রতিদান লাভের জন্য ঈমান অপরিহার্য|
সুতরাং মুমিনের জন্য প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হলো ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি; কেবল দুনিয়াবি উন্নতি, সম্পদ বা ক্ষমতা নয়| তাই কাফিরদের বাহ্যিক সমৃদ্ধি দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে, আল্লাহর পথে অবিচল থাকা এবং আখিরাতের সফলতাকেই প্রকৃত সফলতা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত| আল্লাহই ভালো জানেন|
২| ১৯৭ ন¤^র আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) এ আয়াতের প্রথমাংশে কাফিরদের দুনিয়াবি উন্নতি, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মুমিনদেরকে ইর্ষাšি^ত না হওয়ার কারণ বর্ণনা পূর্বক তাদেরকে সান্ত¦না প্রদান করা হয়েছে| এখানে বলা হয়েছে যে তাদের এই দুনিয়াবি সমৃদ্ধি ও সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য প্রকৃতপক্ষে খুবই নগণ্য| এটি সময়গত দিক থেকে সামান্য, কারণ মানুষের জীবন সীমিত; কখন মৃত্যু এসে সবকিছুর অবসান ঘটাবে, তা কেউ জানে না| এটি পরিমাণগত দিক থেকেও সামান্য, কারণ পৃথিবীর সব সম্পদ কোনো একজন মানুষের অধীনে থাকে না| এটি গুণগত দিক থেকেও সামান্য, কারণ মানুষ নানা রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ ও বঞ্চনার কারণে অনেক সময় তার অর্জিত সম্পদ ও ভোগ-বিলাস উপভোগই করতে পারে না| সুতরাং কাফিরদের দুনিয়াবি প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাস যত বড়ই মনে হোক না কেন, আখিরাতের অনন্ত জীবনের তুলনায় তা অতি নগণ্য, ক্ষণস্থায়ী এবং তুচ্ছ| পক্ষান্তরে মুমিনের প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে ঈমান, আল্লাহর স্মরণ এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার মধ্যে| (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮৩) |
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে কাফেরদের শেষ পরিণতির বর্ণনা এসেছে| এখানে বলা হয়েছে- “অতঃপর তাদের আবাস হবে জাহান্নাম”| যাদের চূড়ান্ত আবাস জাহান্নাম, তাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই| কারণ তারা কুফরির উপর মৃত্যুবরণ করেছে| এ আয়াতে আরও ইঙ্গিত রয়েছে যে, কাফিররা দুনিয়ায় যে বিপুল ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য উপভোগ করেছে, জাহান্নামের শাস্তি দেখার পর তারা সেসব সম্পূর্ণ ভুলে যাবে| তাদের দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগের কোনো স্মৃতিই আর অবশিষ্ট থাকবে না| এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কিয়ামতের দিন দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী জাহান্নামিকে আনা হবে| অতঃপর তাকে জাহান্নামে মাত্র একবার ডুবিয়ে তোলা হবে| তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘তুমি কি কখনো কোনো সুখ বা কল্যাণ দেখেছ?’ সে বলবে, ‘না, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো সুখ দেখিনি’”| আবার দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টভোগী জান্নাতিকে আনা হবে| তাকে জান্নাতে একবার ডুবিয়ে তোলা হবে| তারপর জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘তুমি কি কখনো কোনো কষ্ট বা দুঃখ দেখেছ?’ সে বলবে, ‘না, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো দুঃখ-কষ্ট দেখিনি’” (সহীহ মুসলিম: ২৮০৭) | (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮৬) | এগুলো এমন বাস্তব সত্য, যেগুলোর প্রতি আমরা ঈমান রাখি; কিন্তু দুনিয়ার ব্যস্ততা, গাফিলতি ও মোহ অনেক সময় আমাদের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে| তাই মুমিনের উচিত সর্বদা আখিরাতকে স্মরণ রাখা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখে বিভ্রান্ত না হওয়া| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
৩| ১৯৮ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসের বিপরীতে মুত্তাকিদের চিরস্থায়ী ও মহিমাšি^ত পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন| মুত্তাকি হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকে| এমন আল্লাহভীরু বান্দাদের জন্য রয়েছে অসংখ্য জান্নাত, যার নিচে প্রবাহিত হবে নির্মল নদীসমূহ| তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তাদের এ সুখ-সম্ভোগের কোনো শেষ নেই| এ অর্থেই আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র বলেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا﴾
অর্থাৎ- “নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফিরদাউসের জান্নাত” (সূরাতু আল-কাহফ: ১০৭) | এখানে (নুযুলান) শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| আরবি ভাষায় নুযুল বলতে অতিথির জন্য প্রাথমিক আপ্যায়ন ও সম্মানসূচক আতিথেয়তাকে বোঝায়| এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা আল্লাহ তা’আলার বিশেষ মেহমান| তিনি নিজ অনুগ্রহ, দয়া, উদারতা ও সম্মানের মাধ্যমে তাদেরকে আপ্যায়িত করবেন|
এ জান্নাতের নেয়ামতগুলো মূলত শারীরিক ও বাহ্যিক নেয়ামত-সুন্দর বাসস্থান, নদী-নালা, ফল-মূল, খাদ্য-পানীয় এবং সীমাহীন সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য| তবে এর চেয়েও মহান আরেকটি নেয়ামত রয়েছে, যা হলো আত্মিক ও রূহানী নেয়ামত-আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর ˆনকট্য এবং তাঁর দর্শন লাভের সৌভাগ্য| এ দিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ﴾ “আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য আরও উত্তম”| অর্থাৎ, জান্নাতের বাহ্যিক নেয়ামত ছাড়াও আল্লাহ তাআলার নিকট যে সম্মান, সন্তুষ্টি, ˆনকট্য ও চিরস্থায়ী পুরস্কার সংরক্ষিত রয়েছে, তা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ, ক্ষমতা, ভোগ-বিলাস এবং কাফিরদের সাময়িক সমৃদ্ধির তুলনায় অসীমভাবে শ্রেষ্ঠ ও মহত্তর| কারণ দুনিয়ার সুখ ক্ষণস্থায়ী ও নশ্বর; পক্ষান্তরে আল্লাহর নিকট যা রয়েছে তা চিরন্তন, পরিপূর্ণ এবং অবিনশ্বর| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৬৯-১৭০) |
৪| ১৯৯ ন¤^র আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে মুত্তাকিদের জন্য নির্ধারিত মহাপুরস্কার এবং কাফিরদের জন্য প্রস্তুতকৃত শাস্তির বর্ণনার পর আল্লাহ তা’আলা আহলে কিতাবের পাঁচটি গুণের বর্ণনা দিয়েছেন:
প্রথম গুণ: তারা আল্লাহর প্রতি এমন বিশুদ্ধ ঈমান পোষণ করে, যার মধ্যে শিরকের কোনো মিশ্রণ নেই এবং যা শুধু মুখের ¯^ীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আনুগত্য ও আমলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়| তারা তাদের মতো নয়, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ﴾
অর্থাৎ- “তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, কিন্তু শিরক করেই” (সূরাতু ইউসুফ: ১০৬) |
দ্বিতীয় গুণ: তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি অবতীর্ণ কুরআনের ওপর ঈমান আনে এবং তাঁকে আল্লাহর সত্য রাসূল হিসেবে মেনে নেয়|
তৃতীয় গুণ: তারা তাদের নিজেদের নবীদের ওপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাবসমূহের প্রতিও ঈমান রাখে| অর্থাৎ তারা আল্লাহর সকল নবী ও সকল ওহির প্রতি বিশ্বাসী| কুরআন যেসব বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেগুলোও তারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে| তাদের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়া বা বিকৃত হয়ে যাওয়া এ বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়|
চতুর্থ গুণ: তারা আল্লাহর সামনে গভীর বিনয় ও নম্রতা অবল¤^ন করে| এই খুশু‘ (خشوع) হলো বিশুদ্ধ ঈমানের অন্যতম ফল| যখন আল্লাহভীতি হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন তার প্রভাব মানুষের দৃষ্টি, কথা, আচরণ ও অনুভূতির ওপরও প্রতিফলিত হয়| ফলে তার চোখে বিনয়, কণ্ঠে নম্রতা এবং চরিত্রে নমনীয়তা প্রকাশ পায়|
পঞ্চম গুণ: তারা আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে দুনিয়ার সামান্য ¯^ার্থ অর্জন করে না| অর্থাৎ তারা সত্যকে গোপন করে না, বিকৃতি করে না এবং পার্থিব লাভ, পদমর্যাদা বা সম্পদের বিনিময়ে আল্লাহর বিধানকে বিক্রি করে না| এটি তাদের ঈমান, খুশু‘ ও আল্লাহভীতিরই ¯^াভাবিক ফল| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৬৯-১৭০) |
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে- আহলে কিতাবের মধ্য থেকে যারা ঈমান, বিনয়, আল্লাহভীতি, সত্যনিষ্ঠা এবং আল্লাহর আয়াতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো মহৎ গুণাবলিতে ভূষিত হয়েছে, তাদের জন্য তাদের সৎকর্ম ও আনুগত্যের উপযুক্ত প্রতিদান আল্লাহ তা’আলার নিকট সংরক্ষিত রয়েছে| সুতরাং আহলে কিতাবের মধ্যে যারা সত্যকে চিনে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান এনেছে, কুরআন ও পূর্ববর্তী ওহির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আল্লাহর সামনে বিনয়ী হয়েছে এবং দুনিয়ার ¯^ার্থে সত্যকে বিকৃত করেনি-আল্লাহ তাআলা তাদের বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন| এর মাধ্যমে কুরআন শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি বংশ, জাতি বা সম্প্রদায় নয়; বরং বিশুদ্ধ ঈমান, বিনয়, সততা ও সত্যের প্রতি আনুগত্য|(তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৭১) |
৫| ২০০ ন¤^র আয়াত তথা সূরার সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের সফলতার জন্য চারটি মৌলিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন: সবর, মুসাবারা, মুরাবাতা ও তাকওয়া|
(ক) صبر (সবর) – ˆধর্য ধারণ করা, মুফাসসিরগণ এখানে ‘সবর’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা নিয়ে কয়েকটি ব্যাখ্যা করেছেন, যার সারসংক্ষেপ হলো- সবর বলতে আল্লাহর আনুগত্য, বিপদ-আপদ, দ্বীনের দায়িত্ব এবং জিহাদের কষ্টসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অবিচল থাকাকে বুঝানো হয়েছে|
(খ) مصابرة (মুসাবারা) – ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করা, এ নির্দেশেরও দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়-
ইবনু আব্বাস (রা.) ও অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, শত্রুর মোকাবিলায় তাদের চেয়ে অধিক ˆধর্যশীল ও দৃঢ় হওয়া|
আতা ও কুরাযী বলেন, আল্লাহ যে পুরস্কার ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার প্রত্যাশায় ˆধর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করা| অর্থাৎ, শুধু ˆধর্যধারণই নয়; বরং সত্যের পথে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অন্যদের চেয়ে বেশি দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করাই হলো মুসাবারা|
(গ) مرابطة (মুরাবাতা) প্রহরায় অবিচল থাকা, এ বিষয়ে মুফাসসিরদের দুটি মত রয়েছে-
প্রথম মত: সীমান্তে অবস্থান করে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকা এবং ইসলামের নিরাপত্তা রক্ষায় সদা সতর্ক থাকা| ইবনু আব্বাস (রা.), হাসান বসরী, কাতাদা প্রমুখ এ মত পোষণ করেন|
ইবনু কুতাইবা বলেন, রিবাত শব্দের মূল অর্থ হলো সীমান্তে অবস্থান করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকা| অতীতে উভয় পক্ষ তাদের ঘোড়া বেঁধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করত; সেখান থেকেই রিবাত শব্দের উৎপত্তি|
দ্বিতীয় মত: নামাজের প্রতি অবিচল থাকা এবং এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষায় থাকা|এ মতটি আবু সালামা ইবনু আবদুর রহমান (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে|
(ঘ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ ভীতি অবল¤^ন করা|
দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে হলে ˆধর্য, দৃঢ়তা, দায়িত্বশীলতা এবং তাকওয়ার সমš^য় অপরিহার্য| এ চারটি গুণই একজন মুমিনকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং আখিরাতের জীবনে সফলতার শিখরে পৌঁছে দেয়| (যাদুল মাসীর ফি ইলমিত তাফসীর, ইবনুল জাওযী: ১/৩৬৫) |

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) কাফির বা অবাধ্য লোকদের ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি ও বাহ্যিক সফলতা দেখে তাদের পথকে সঠিক মনে করা যাবে না| মুমিনের দৃষ্টি থাকবে আখিরাতের স্থায়ী সফলতার দিকে|
(খ) আল্লাহর সন্তুষ্টি, বিশুদ্ধ ঈমান ও তাকওয়াই প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড| তাই দুনিয়াবি লাভ-ক্ষতির চেয়ে ঈমান রক্ষা ও আল্লাহর আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে|
(গ) আহলে কিতাবের মুমিনদের মতো সত্য যেখানেই পাওয়া যায় তা গ্রহণ করা, আল্লাহর সামনে বিনয়ী থাকা এবং দুনিয়াবি ¯^ার্থে সত্যকে গোপন বা বিকৃত না করা|
(ঘ) ইবাদত, দাওয়াত, শিক্ষা, পরিবার, সমাজ ও বিপদ-মুসিবতের ক্ষেত্রে ˆধর্য ধারণ করা এবং সত্যের পথে প্রতিকূলতার মোকাবিলায় আরও বেশি দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করা|
(ঙ) নিজের ঈমান, পরিবার, সমাজ ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে সচেতন থাকা; ইলম, দাওয়াত, শিক্ষা, সংগঠন ও ইসলামী কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্বীনের খেদমতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহভীতি অবল¤^ন করা|

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯০-১৯৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: প্রকৃত জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ (190) الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (191) رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (192) رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ (193) رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ (194) فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَأُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأُوذُوا فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُوا وَقُتِلُوا لَأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ثَوَابًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ (195)﴾ [سورة آل عمران: 190-195).

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: প্রকৃত জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৯০। নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে বুদ্ধিমানদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।
১৯১। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে। তারা বলে, “হে আমাদের রব, আপনি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। অতএব আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
১৯২। “হে আমাদের রব, আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, অবশ্যই তাকে অপমানিত করবেন। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।”
১৯৩। “হে আমাদের রব, আমরা এক আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডাকছিলেন যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো।’ তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন, আমাদের পাপগুলো মোচন করুন এবং আমাদের নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দিন।”
১৯৪। “হে আমাদের রব, আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি আমাদের দিয়েছেন, তা আমাদের দান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।”
১৯৫। তখন তাদের রব তাদের দোয়ার জবাব দিলেন, “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কর্ম নষ্ট করব না, সে পুরুষ হোক বা নারী; তোমরা একে অপরেরই অংশ। অতঃপর যারা হিজরত করেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, আমার পথে কষ্ট পেয়েছে, যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে—আমি অবশ্যই তাদের গুনাহসমূহ মুছে দেব এবং তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান। আর উত্তম প্রতিদান তো আল্লাহর কাছেই রয়েছে।”

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামনে তাঁর সৃষ্টিজগতের কিছু নিদর্শন তুলে ধরেছেন। এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়- আল্লাহ তা’আলা কারও মুখাপেক্ষী নন, বরং সব সৃষ্টি তাঁরই মুখাপেক্ষী। তিনিই সবকিছুর ¯্রষ্টা, পালনকর্তা ও নিয়ন্ত্রক। মানুষের জীবন, জীবিকা এবং সব বিষয় তাঁরই অধীনে। তিনি ছাড়া আর কোনো রব নেই, আর তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো উপাস্যও নেই। তবে এসব সত্য কেবল সুস্থ বিবেক ও পরিষ্কার অন্তরের মানুষই উপলব্ধি করতে পারে। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা বলেন, আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ, বিশাল আকাশ, বিস্তৃত পৃথিবী, রাতের অন্ধকার, দিনের আলো, কখনো দিন বড়, কখনো রাত বড়- এসবই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে আল্লাহই সর্বশক্তিমান। এগুলো আরও বোঝায়, মানুষ কত অসহায় আর কত বেশি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। এই কথাই ১৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে।
এরপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ সেই জ্ঞানী মানুষের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
(ক) তারা সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে- দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে। অর্থাৎ, শুধু সালাতে নয়; বরং জীবনের সব সময়েই তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে থাকে।
(খ) তারা আকাশ-যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। কী সুন্দরভাবে সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, কী নিখুঁত নিয়মে চলছে, কত অগণিত সৃষ্টি এতে ছড়িয়ে আছে, এসব ভেবে তারা মুগ্ধ হয়ে যায়। তখন তাদের মুখ থেকে বের হয়ে আসে- “হে আমাদের রব, আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি”। অর্থাৎ, এই বিশাল জগত কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে আছে মহান প্রজ্ঞা ও গভীর উদ্দেশ্য। আল্লাহ কখনো খেলাচ্ছলে কিছু করেন না। তাই তারা বলে, “আপনি পবিত্র”। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি সব ধরনের ত্রুটি, অনর্থক কাজ ও উদ্দেশ্যহীনতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
(গ) প্রকৃত জ্ঞানী বুঝতে পারে, আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যারা তা করবে, তারা জান্নাতে সম্মান পাবে। আর যারা অবাধ্য হবে, তারা শাস্তির মুখোমুখি হবে। এ কারণেই তারা দোয়া করে- “হে আমাদের রব, যাকে আপনি জাহান্নামে দেবেন, সে অবশ্যই অপমানিত হবে। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না”। এরপর তারা বলে, “হে আমাদের রব, আমরা একজন আহ্বানকারীর ডাক শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো’। তাই আমরা ঈমান এনেছি”। এই আহ্বানকারী হলেন ‘কোরআন’ এবং মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.)।
(ঘ) একজন প্রকৃত জ্ঞানী হেদায়েত, পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে। ঈমান আনার পর তারা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস প্রার্থনা করে। তারা বলে, “হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহ মাফ করুন, আমাদের পাপগুলো দূর করুন এবং আমাদের নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দিন”। এরপর তারা আরও প্রার্থনা করে- “হে আমাদের রব, আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন। কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না”। অর্থাৎ, একজন জ্ঞানী দুনিয়াতে আল্লাহর সাহায্য ও সফলতা চায়, আর আখিরাতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি কামনা করে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের দোয়ার এভাবে জবাব দেন- “আমি তোমাদের কারও কাজ নষ্ট করব না, সে পুরুষ হোক বা নারী”। অর্থাৎ, আল্লাহ সবার আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন। তাঁর কাছে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো অন্যায় পার্থক্য নেই।
(ঙ) জ্ঞানীদের পাঁচ নম্বর বৈশিষ্ট্য হলো- তারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করে।
যে সকল জ্ঞানী ও গবেষক উল্লেখিত পাঁচটি গুণে গুণান্বিত হবে আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্য দুইটি মহাপুরস্কার রেখেছেন: (ক) আল্লাহ তা’আলা তাদের কৃত সৎকর্ম নষ্ট করবেন না, (খ) তাদের জীবনের ভুল-ত্রুটি ও পাপসমূহ মুছে দিবেন এবং (গ) তাদেরকে মহামূল্যবান জান্নাত দান করবেন।
১৯৫ নম্বর আয়াতের শেষভাগে আল্লাহ তা’আলা বিশেষভাবে সেই সকল জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেন, যারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণ আর গবেষণার ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আল্লাহর পথে ঘরবাড়ি ছেড়েছে, কষ্ট সহ্য করেছে, নির্যাতিত হয়েছে, যুদ্ধ করেছে এবং শহীদ হয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হলো- তিনি তাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে দামী পুরস্কার। তাই মানুষের উচিত সবসময় আল্লাহর কাছেই আশা রাখা, তার কাছেই চাওয়া। কারণ তিনিই সবচেয়ে দয়ালু এবং অনুগ্রহশীল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৬-৪২৭; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২০৭-২০৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৫-৭৬; আল-মুনতাখাব: ১/১২০-১২২) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أُولِي الأَلْبَابِ﴾ ‘জ্ঞানী বা আকলমান’, আয়াতাংশে ‘উলুল আলবাব’ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এ সম্পর্কে আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) বলেন: ‘উলুল আলবাব’ বলতে তাদেরকে বোঝায়- যাদের সুস্থ ও পরিপক্ব বুদ্ধি আছে; যে বুদ্ধি দিয়ে তারা বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে এবং প্রমাণ থেকে সত্যকে চিনে নিতে পারে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৫)। অর্থাৎ, ‘উলুল আলবাব’ সেই মানুষ, যারা দেখে শিক্ষা নেয়, চিন্তা করে সত্যে পৌঁছে, প্রমাণ থেকে আল্লাহর মহিমা চিনে নেয় এবং সবশেষে এর মাধ্যমে হেদায়েতকে গ্রহণ করে। যা উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়।
কুরআনে “উলুল আলবাব” শব্দটি ১৬ জায়গায় এসেছে। এটি কোথায় কী অর্থে এসেছে তার বর্ণনা নিচে কয়েকটি আয়াতের সহজ ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরা হলো-
(ক) ইসলামে ‘কিসাস’ বিধানের হিকমাত ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা বুঝতে পারে, আল্লাহ তা’আলা সূরাতু আল-বাক্বারা-এর ১৭৯ নম্বর আয়াতে কিসাসের বিধান বর্ণনা করে বলেছেন: এতে ‘উলুল আলবাব’-এর জন্য জীবন আছে। অর্থাৎ, গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় ন্যায়বিচার সমাজে নিরাপত্তা আনে। শুধু বাহ্যিক শাস্তি নয়, এর পেছনের হিকমতও তারা বুঝতে পারে। (তাফসীর আল-তবারী: ৩/৩৮৩) ।
(খ) আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান থেকে কেবল বুদ্ধিমানরাই শিক্ষা গ্রহণ করে, সূরাতু আল-বাক্বারা-এর ২৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আল্লাহ যাকে চান হিকমত বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন, আর যাকে হিকমত দেওয়া হয় তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়। আর ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা এ হিকমাত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে”। এখানে ‘উলুল আলবাব’দেরকে বলা হয়েছে: তারা আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। (তাফসীর আল-তবারী: ৫/৫৮০) ।
(গ) আকাশ-যমীনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের পরিবর্তনে উলুল আলবাবের জন্য নিদর্শন আছে, উল্লেখিত আয়াতসমূহে তথা সূরাতু আলে-ইমরান-এর (১৯০-১৯১) এ বলা হয়েছে, আকাশ-যমীনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। এবং তারা দুইটি কাজ করে: (ক) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং (খ) সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করে।
(ঘ) নবীদের ঘটনাবলীতে উলুল আলবাবের জন্য শিক্ষা রয়েছে, অর্থাৎ- তারা শুধু গল্প শোনে না; বরং ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়। (সূরাতু ইউসুফ: ১১১) ।
(ঙ) ‘উলুল আলবাব’ বা জ্ঞানীরা সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে। যেমন সূরাতু রা’দ-এর ১৯ নম্বর আয়াতে এসেছে- “যে জানে রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সত্য, সে কি অন্ধের মতো হতে পারে?”। এখানে বলা হয়েছে: উলুল আলবাব হলো তারা, যারা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে।
(চ) ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তারপর উত্তম কথাটি অনুসরণ করে। সূরাতু আল-যুমার-এর ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾.
অর্থ: “যারা মন দিয়ে কথা শুনে অতঃপর তা ভালভাবে অনুসরণ করে, তাদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দান করেন, এবং তারাই বুদ্ধিমান”। এখানে খুব সুন্দর একটি অর্থ পাওয়া যায়:
‘উলুল আলবাব’ বা জ্ঞানী মানে শুধু বেশি জানা নয়; বরং সত্য কথা শুনে তা গ্রহণ করা।
﴿آيَات﴾ “সুস্পষ্ট নিদর্শন”, আয়াতাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) বলেন: এর দ্বারা আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব, ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং রহমতের সুস্পষ্ট প্রমাণকে বুঝানো হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর: ১/৪২৫)। অর্থাৎ- আকাশ, পৃথিবী, দিন-রাতের পালাবদল, বৃষ্টি, জীবজন্তু ও মানবসৃষ্টি, এসবই এমন সুস্পষ্ট নিদর্শন, যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষ আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব, অসীম ক্ষমতা, পরিপূর্ণ জ্ঞান, সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা ও অবারিত রহমত উপলব্ধি করতে পারে। যেমন: এত সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল সৃষ্টি কখনোই নিজে নিজে অস্তিত্বে আসতে পারে না; এর পেছনে একজন মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে, এটাই আল্লাহর অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যিনি আকাশম-লী, পৃথিবী এবং অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন, এটা আল্লাহর ক্ষমতার প্রমান। সৃষ্টির প্রতিটি জিনিসে যে নিখুঁত সামঞ্জস্য দেখা যায়, তা আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান ও হিকমতের প্রমাণ। অনুরুপভাবে বৃষ্টি, খাদ্য ও জীবনধারণের উপকরণ, এসব আল্লাহর অসীম রহমতের প্রমাণ।
﴿يَذْكُرُونَ اللَّهَ﴾ “তারা আল্লাহকে স্মরণ করে”, এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের দুটি মত রয়েছে:
(ক) এখানে উদ্দেশ্য হলো- মানুষ যেন সর্বদা তার রবের স্মরণে থাকে। কারণ মানুষের অবস্থা মূলত এই তিনটির বাইরে নয়, দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায়। সুতরাং যখন আল্লাহ তাদেরকে এই সব অবস্থায় স্মরণকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তখন তা প্রমাণ করে যে তারা সর্বদা যিকিরে অবিচল থাকে, কখনোই এতে শৈথিল্য করে না।
(খ) এখানে “যিকির” দ্বারা সালাত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তারা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে; যদি দাঁড়িয়ে আদায় করতে অক্ষম হয়, তবে বসে; আর যদি বসেও অক্ষম হয়, তবে শুয়ে। অর্থাৎ তারা কোনো অবস্থাতেই সালাত পরিত্যাগ করে না।
ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযী প্রথম মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহর যিকিরের ফযিলত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَرْتَعَ فِي رِيَاضِ الْجَنَّةِ فَلْيُكْثِرْ ذِكْرَ اللَّهِ”.
অর্থ: “যে ব্যক্তি জান্নাতের উদ্যানসমূহে বিচরণ করতে ভালোবাসে, সে যেন বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করে”। (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ: ৩৫০৬৯) । (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৫৯-৪৬০) ।
﴿مُنَادِيًا﴾ “আহ্বানকারী”, আয়াতাংশ দ্বারা দুইটি উদ্দেশ্য হতে পারে: (ক) মোহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং (খ) আল-কুরআনুল কারীম। অধিকাংশ তাফসীরকারকগণ প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন। তবে ফখরুদ্দীন রাযী (র.) দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, কারণ সকল মানুষ দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহর দেখা পায়নি, কিন্তু কুরআনের দেখা পাবে। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৬৬) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো মূলত সূরাটির উপসংহার। কাফির, মুনাফিক এবং মুমিনদের মধ্যকার গাফিল ও ত্রুটিকারীদের সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের উত্থাপিত সন্দেহ-আপত্তির জবাব দেওয়ার পর, উল্লেখিত আয়াতগুলোর মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি এমন বিষয়গুলোর দিকে ফেরানো হয়েছে, যা আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একাত্ববাদ, তাঁর মহিমা ও মহান গৌরব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২০৬) ।

১৯০ এবং ১৯৫ নম্বর আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, কোরাইশ বংশের লোকেরা ইহুদীদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, মূসা (আ.) তোমাদের কাছে কী কী নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন? তারা বলল: লাঠি এবং এমন উজ্জ্বল হাত, যা দর্শকদের কাছে স্পষ্ট শুভ্র হয়ে উঠত।
তারপর তারা খ্রিষ্টানদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ঈসা (আ.) কেমন ছিলেন? তারা বলল, তিনি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতেন এবং মৃতকে জীবিত করতেন।
অতঃপর তারা মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল, হে মোহাম্মদ তুমি তোমার রবের কাছে দোয়া কর যেন তিনি আমাদের জন্য সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে পরিণত করে দেন। তখন তিনি তাঁর রবের কাছে দোয়া করলেন। এরপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা ১৯০ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ করলেন। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৭) ।
উম্মু সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), হিজরতের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের উল্লেখ আমি শুনি নাই। তখন আল্লাহ তা’আলা ১৯৫ নম্বর আয়াত নাযিল করে জানিয়ে জানিয়ে দিলেন নারী-পুরুষের কোন বৈসম্য নেই। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৮)।

আয়াতসমূহের ফযিলত:
এই আয়াতগুলোর ফযিলত সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো- আতা (রা.) বলেন: আমি, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার এবং ওবাইদ ইবনু উমাইর একসঙ্গে আয়েশার (রা.) কাছে গেলাম। আমরা তাঁর কাছে প্রবেশ করলাম, আর আমাদের ও তাঁর মাঝে একটি পর্দা ছিল। তিনি বললেন: “হে উবাইদ, তুমি আমাদের কাছে আস না কেন?”
তিনি বললেন, “কবির উক্তি আছে- মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ করো, তাহলে ভালোবাসা বাড়ে”।
তখন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার বললেন: “আমাদের বলুন তো, আপনি রাসূলুল্লাহর (সা.) কোন বিষয়টি সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দেখেছেন?” তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “তাঁর প্রতিটি কাজই ছিল আশ্চর্যজনক। এক রাতে তিনি আমার কাছে এলেন, এমনকি তাঁর শরীর আমার শরীর স্পর্শ করল। তারপর তিনি বললেন: “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি আমার মহান রবের ইবাদত করি”। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আপনার সান্নিধ্য আমার খুব প্রিয়, আর এটাও আমার প্রিয় যে আপনি আপনার রবের ইবাদত করুন। এরপর তিনি পানির পাত্রের কাছে গেলেন, ওযু করলেন; বেশি পানি ঢাললেন না। তারপর নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি এত কাঁদলেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তারপর সিজদায় গেলেন, সেখানেও এত কাঁদলেন যে মাটি ভিজে গেল। এরপর কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন, তবুও কাঁদতে থাকলেন।
এমতাবস্থায় বিলাল (রা.) ফজরের নামাজের জন্য তাঁকে ডাকতে এলেন। তিনি বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কাঁদছেন কেন? অথচ আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “হে বিলাল, আমি কেন কাঁদব না? আজ রাতে আমার ওপর এই আয়াতগুলো (সূরাতু আলে-ইমরানের ১৯০-১৯৫) নাযিল হয়েছে। এরপর তিনি বলেন: “ধ্বংস তার জন্য, যে এ আয়াতগুলো পড়ে কিন্তু এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না”।
আউযায়ী (র.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “এই আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনার পরিপূর্ণতা কী?” তিনি বলেছিলেন: “মানুষ যেন এ আয়াতগুলো পাঠ করে, আর পাঠ করার সময় তাদের অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করে”। (তাফসীরে ইবনু কাসীর: ১/৪৪০) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান শব্দটি যেমন অত্যন্ত মূল্যবান, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি দামি হলো সেই ব্যক্তি, যিনি প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান। কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় বুদ্ধিমানদের গভীর প্রশংসা করা হয়েছে, কারণ প্রকৃত বুদ্ধিমানরা শুধু জ্ঞান অর্জন করেন না, সেই জ্ঞানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। বিশেষ করে, সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯০-১৯৫) আয়াতগুলোতে প্রকৃত বুদ্ধিমানদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বর্ণনা করা হয়েছে:
(ক) একজন প্রকৃত জ্ঞানী সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে- দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে।
(খ) তারা আকাশ-যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।
(গ) প্রকৃত জ্ঞানী বুঝতে পারে, আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
(ঘ) তারা হেদায়েত, পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে।
(ঙ) তারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণার ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করে।
২। ১৯৫ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশে আধুনিক যুগে যারা মনে করে ইসলাম নারীদেরকে যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেনি, তাদের জবাব দিয়েছে:
প্রথমত: তারা বলে, ইসলাম নারীকে ঘরের ভিতরে আবদ্ধ রেখেছে, তাদেরকে কাজের স্বাধীনতা দেয়নি। তাদের জবাব হলো- ইসলাম নারীকে পুরুষের অনুসারী বা ছায়া হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সামনে স্বাধীন নৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; তার ঈমান, আমল, ত্যাগ, ধৈর্য, শিক্ষা, সন্তান লালন-পালন, সমাজগঠন- সবকিছুরই পূর্ণ মূল্য আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। আধুনিক যুগে মানুষ সাধারণত কাজের বাহ্যিক দৃশ্যমানতাকে মূল্যায়নের মাপকাঠি বানায়, কিন্তু এই আয়াত শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি লিঙ্গ নয়, বরং ঈমান, ইখলাস ও সৎকর্ম। চাই সে সৎকর্ম দৃশ্যমান হোক বা চোখের আড়ালে হোক। আধুনিক বিশ্বে সাধারণত সমাজ বলতে সেই ক্ষেত্রকেই বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যা চোখে পড়ে: কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান, বাজার, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি। কিন্তু এই দৃশ্যমান জগতের পেছনে নীরবে কাজ করে আরেকটি গভীর ও মৌলিক জগৎ- পরিবার। এই পরিবারই মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে একটি শিশু কথা বলতে শেখে, আদব শেখে, দায়িত্ববোধ শেখে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখে, মানুষ হয়ে উঠতে শেখে। আর এই নির্মাণের কেন্দ্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাকেন মা। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; একটি প্রজন্মের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর। অথচ আধুনিক আলোচনায় অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি করা হয় যেন ঘরের ভেতরের এই অবদান কোনো “বাস্তব কাজ” নয়, যেন মূল্যবান কেবল সেই শ্রমই, যার বিনিময়ে দৃশ্যমান অর্থ, পদ বা সামাজিক পরিচিতি পাওয়া যায়।
এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি হয়। কারণ যে মা বছরের পর বছর একটি শিশুকে এমনভাবে গড়ে তুললেন, যাতে সে ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, আলেম, উদ্যোক্তা বা সমাজনেতা হতে পারে, বাস্তবে তিনি সমাজ নির্মাণের একেবারে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। কিন্তু সমাজ প্রায়ই ফলটিকে দেখে, শিকড়টিকে দেখে না। দৃশ্যমান সাফল্যকে প্রশংসা করা হয়, অথচ সেই সাফল্যের পেছনের নীরব ত্যাগ প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। ইসলাম এই অদৃশ্য অবদানকে অদৃশ্য মনে করেনি। তাই আল্লাহ বলেন- “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কোনো কাজ নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী”। অর্থাৎ কাজের মূল্য নির্ধারণে বাহ্যিক দৃশ্যমানতা নয়, বরং নিয়ত, দায়িত্বপালন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা শ্রমই আসল। একজন নারী যদি পরিবারকে সৎভাবে গড়ে তোলেন, সন্তানকে দ্বীন, চরিত্র ও মানবিকতার শিক্ষা দেন, এ কাজ আল্লাহর কাছে এমনই মূল্যবান, যেমন সমাজের প্রকাশ্য ময়দানে সম্পাদিত কোনো বড় দায়িত্ব।
এ কারণে ইসলামে নারী-পুরুষকে একই রকম দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, কারণ তাদের অঙ্গন, সামর্থ্য, প্রাকৃতিক প্রবণতা ও সামাজিক প্রয়োজন সবক্ষেত্রে এক নয়। কিন্তু এখান থেকে অন্যায় বৈষম্যের ধারণা টানা ভুল। ইসলাম দায়িত্বের ক্ষেত্র ভিন্ন হতে পারে বলে স্বীকার করেছে, কিন্তু মর্যাদা ও প্রতিদানে কাউকে কম মনে করেনি। আধুনিক যুগে অনেক সময় নারী-অধিকারের ভাষ্য এমনভাবে দাঁড়ায় যে, ঘরের ভেতরের দায়িত্ব যেন অবমূল্যায়িত হয়, আর ঘরের বাইরে দৃশ্যমান উপস্থিতিকেই একমাত্র মুক্তি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এ জন্য নারীকে অধিকার প্রদানের নামে ঘরের বাইরে আনা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো- যে সমাজ পরিবারকে দুর্বল করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াতগুলোর শিক্ষা হচ্ছে- ইসলাম নারীকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে অদৃশ্য সত্তা বানায়নি, আবার সমাজের প্রদর্শনীর বস্তু হিসেবেও দেখেনি। বরং নারী-পুরুষ উভয়কেই এমন মর্যাদা দিয়েছে, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে আল্লাহর কাছে পূর্ণ স্বীকৃতি ও প্রতিদানের অধিকারী। মানুষের চোখ অনেক সময় শুধু প্রকাশ্য কাজ দেখে; কিন্তু আল্লাহ অন্তর, নিয়ত এবং নীরব ত্যাগও দেখেন; এবং কোনো আন্তরিক শ্রমই তাঁর কাছে হারিয়ে যায় না। ইমাম তবারী (র.) বলেন: আয়াতাংশের অর্থ হলো- “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কর্ম বাতিল করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী” (তাফসীর আল-তবারী: ৭/৪৮৬)। স্পষ্ট বার্তা এসেছে সূরাতু আত-তাওবাহ এর ৭১ নম্বর আয়াতে:
﴿وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِناتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِياءُ بَعْضٍ﴾.
অর্থাৎ: “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী- তারা একে অপরের অভিভাবক, সহায়ক ও সহযোগী”। তাই যারা বলে ইসলাম নারীকে অধিকার দেয়নি, এই আয়াত তাদের জন্য স্পষ্ট জবাব বহন করে।
এছাড়াও কোরআন-হাদীস ও সীরা গ্রন্থ থেকে স্পষ্ট হয়ে যে ইসলাম নারীকে ঘরের বাইরে যেতে বাধা দেয়নি। পর্দার বিধান রক্ষা করে ঘরের বাইরের যে কোন কাজে অংশ নেয়ার অধিকার ইসলাম তাকে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: তাদের দাবী উত্তারাধীকার সম্পত্তিতেও ইসলাম নারীর অধিকার নষ্ট করেছে। উল্লেখিত আয়াতাংশে ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোন ক্ষেত্রেই ইসলাম নারীর অধিকারকে নষ্ট করেনি, নারী-পুরুষ ঊভয়কে যথার্থ অধিকার দিয়েছে। আসুন এখন বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখি, কোরআনের আলোকে একটি সহজ হিসাব দেখলে বোঝা যায়- ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীকে বঞ্চিত করেনি; বরং নির্দিষ্ট অংশ নিশ্চিত করেছে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা সম্পত্তি রেখে মারা গেলেন। তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে আছেন এক ছেলে ও এক মেয়ে। কুরআনের বিধান অনুযায়ী, ছেলের অংশ হবে দুই মেয়ের সমান। অর্থাৎ মোট অংশ ধরা হবে ৩ ভাগ ছেলে পাবে ২ ভাগ, মেয়ে পাবে ১ ভাগ। তাহলে ১২ লাখ টাকা ভাগ ৩ = প্রতি ভাগ ৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে ছেলে পাবে ৮ লাখ টাকা, আর মেয়ে পাবে ৪ লাখ টাকা। এখানে অনেকে শুধু সংখ্যার পার্থক্যটি দেখেন, কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থার পূর্ণ চিত্রটি দেখেন না। ছেলেকে ভবিষ্যতে মহর দিতে হবে, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বহন করতে হবে, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে; কিন্তু মেয়ের ওপর এমন বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব নেই। সে যে ৪ লাখ টাকা পাবে, তা তার ব্যক্তিগত সম্পদ, স্বামী, ভাই, বাবা বা সন্তানের জন্য তা খরচ করা তার ওপর ফরজ নয়। অর্থাৎ বাহ্যিক অঙ্কে ছেলের অংশ বেশি হলেও, ব্যয়ের দায়ও তার ওপর বেশি; আর মেয়ের অংশ কম হলেও তা তার জন্য সংরক্ষিত অধিকার। এভাবে ইসলাম কেবল সংখ্যাগত সমতা নয়, বরং দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই বলা সঠিক নয় যে ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার থেকে ঠকিয়েছে; বরং এমন এক সমাজে, যেখানে বহু স্থানে নারীকে উত্তরাধিকার থেকেই বঞ্চিত করা হতো, ইসলাম তার নির্ধারিত অংশকে আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আরেকটি উদাহরণ নিন। ধরুন, একজন ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা রেখে ইন্তেকাল করলেন। ওয়ারিশ হিসেবে আছেন স্ত্রী, বাবা, মা, এক ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী বণ্টনে স্ত্রীর অংশ ১ লাখ ৫০ হাজার, বাবার ২ লাখ, মায়ের ২ লাখ। অবশিষ্ট ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ছেলে পায় প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা, আর মেয়ে পায় প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। বাহ্যিকভাবে এখানে মনে হতে পারে ছেলে বেশি পেল। কিন্তু এখন পরের বাস্তব চিত্রটি দেখুন। ধরা যাক, ছেলে বিয়ের সময় ১ লাখ টাকা মহর দিল, বছরে ন্যূনতম ১ লাখ টাকা করে স্ত্রী-সন্তানের প্রয়োজনীয় ভরণপোষণে খরচ করল, মাত্র দুই বছরেই আরও ২ লাখ টাকা ব্যয় হলো। অর্থাৎ তার ৪ লাখ ৩৩ হাজার থেকে মোটামুটি ৩ লাখ টাকা দায়িত্ব পালনে চলে গেল। হাতে অবশিষ্ট থাকল প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে মেয়ে যে ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা পেল, সেই সম্পদের ওপর তার নিজের কোনো বাধ্যতামূলক পারিবারিক ব্যয় নেই; স্বামী, সন্তান, ভাই বা বাবা, কারও জন্য তা খরচ করা তার ওপর ফরজ নয়। ফলে তার পুরো অংশটিই তার ব্যক্তিগত মালিকানায় থেকে যেতে পারে। এখানেই ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ন্যায়বিচারটি স্পষ্ট হয়। শুধু “কে বেশি পেল” তা দেখলে ছবির অর্ধেক দেখা হয়; কিন্তু “কে কত দায়িত্ব বহন করবে” তা যোগ করলে বোঝা যায়, ইসলাম কেবল সংখ্যার হিসাব করেনি, বরং দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যও বিবেচনায় নিয়েছে। এ কারণেই কুরআন উত্তরাধিকারকে নিছক গাণিতিক সমতা নয়, বরং সুবিচারভিত্তিক বণ্টন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। ১৯৫ নম্বর আয়াতের শেষাংশে, যে সকল জ্ঞানীদের মধ্যে উল্লেখিত পাঁচটি গুণ পাওয়া যাবে, তাদের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে:
(ক) আল্লাহ তা’আলা তাদের কৃত সৎআমল নষ্ট করবেন না।
(খ) আল্লাহ তা’আলা তাদের গুনাহ মাফ করবেন।
(গ) তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত।
৪। সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯১-১৯৫) নম্বর আয়াতের আলোকে আল্লাহর কাছে দোয়ার মধ্যে কয়েকটি মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার শিক্ষা পাওয়া যায়। এই আয়াতগুলোতে মুমিনদের দোয়া শুধু চাওয়া নয়; বরং চিন্তা, ঈমান, আত্মসমর্পণ, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আখিরাতের সফলতার পূর্ণ আবেদন। একটি দোয়ায় অন্তর্ভূক্ত বিষয়গুলো নি¤œরুপ:
(ক) আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা স্বীকার করা, ১৯১ নম্বর আয়াতে তারা বলে: “সুবহানাকা” “আপনি পবিত্র”। অর্থাৎ দোয়ার শুরুতে আল্লাহর তাসবীহ, মহিমা ও পরিপূর্ণতা স্বীকার করা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব।
(খ) জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাওয়া, “ফাকিনা আযাবান-নার”, “আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন”। এ থেকে বোঝা যায়, দোয়ার একটি প্রধান বিষয় হওয়া উচিত আখিরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা।
(গ) লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে মুক্তি কামনা, ১৯২ নম্বর আয়াতে জাহান্নামে প্রবেশকে চরম অপমান বলা হয়েছে। অতএব দোয়ায় শুধু কষ্ট দূর করার আবেদন নয়, বরং আল্লাহর কাছে সম্মানজনক পরিণতি চাওয়াও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
(ঘ) ঈমানের উপর অটল থাকার স্বীকারোক্তি, ১৯৩ নম্বর আয়াতে তারা বলে: “আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি এবং ঈমান এনেছি”। দোয়ার মধ্যে নিজের ঈমানের অঙ্গীকার ও হিদায়াতের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।
(ঙ) গুনাহ মাফ ও ত্রুটি মোচনের আবেদন, এই আয়াতে তিনটি বড় আবেদন আছে- “আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন”, “আমাদের পাপ মোচন করুন” এবং “নেককারদের সাথে মৃত্যু দিন”। এখানে দোয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মশুদ্ধি ও উত্তম পরিণতির আবেদন।
(চ) আল্লাহর প্রতিশ্রুত কল্যাণ প্রার্থনা, ১৯৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন”। অর্থাৎ দোয়ার মধ্যে জান্নাত, রহমত, মাগফিরাত ও আল্লাহর ওয়াদাকৃত কল্যাণ চাওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
(ছ) কিয়ামতের দিনের সফলতা কামনা, “কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না”। এ থেকে বোঝা যায়, মুমিনের দোয়া দুনিয়াবিমুখ নয়; তবে তার কেন্দ্রবিন্দু আখিরাত।
(জ) নেক আমল কবুল হওয়ার আশা, ১৯৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ উত্তর দেন যে, তিনি কারও আমল নষ্ট করেন না। অতএব দোয়ার মধ্যে নিজের আমল কবুল হওয়ার আবেদন ও আশা থাকা উচিত। এক কথায়, এই আয়াতগুলো শেখায়- মুমিনের দোয়া শুধু দুনিয়ার প্রয়োজনে নয়; বরং ঈমান, ক্ষমা, হিদায়াত ও আখিরাতের সফলতাকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত।
৫। প্রচলিত ধারায় জ্ঞানী বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়, যার তথ্যভা-ার সমৃদ্ধ, বিশ্লেষণক্ষমতা প্রবল, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা উচ্চ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কখনো কখনো এমন প্রবণতাও দেখা যায় যে, কিছু মানুষের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, কিংবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে হালকা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে পারাকেও এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধুনিকতা বা কৃতিত্ব বলে মনে করা হয়। কিন্তু কুরআনের আলোকে জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যার চিন্তা তাকে ¯্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়, যার জ্ঞান তাকে বিনয়ী করে, এবং যার উপলব্ধি তাকে দোয়ার দরজায় দাঁড় করায়। ইমাম বাগভী (র.) বলেন:
“مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا أَيْ عَبَثًا لَا لِحِكْمَةٍ”.
অর্থ: “আপনি এসব অনর্থক বা হিকমতহীনভাবে সৃষ্টি করেননি”। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানী সৃষ্টিকে দেখে শুধু বাহ্যিক রূপ বা বেজ্ঞানিক তথ্যেই থেমে থাকে না; বরং এর পেছনে আল্লাহর হিকমত, কুদরত ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করে। তাই তাদের চিন্তার শেষ কথা হয়-
“رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ”.
এখানেই প্রচলিত জ্ঞানী ও কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানীর মৌলিক পার্থক্য। প্রচলিত জ্ঞান তথ্য বাড়ায়, আর কুরআনী জ্ঞান ঈমান, তাসবীহ, বিনয় ও আখিরাত-সচেতনতা বাড়ায়।
আজকের বাস্তবতায় মানুষের তথ্য বেড়েছে, বিশ্লেষণ বেড়েছে, কিন্তু তাফাক্কুর, আত্মসমালোচনা ও আল্লহভীতি অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে; ফলে অনেক শিক্ষিত মানুষও কুরআনের ভাষায় প্রকৃত “উলুল আলবাব” হয়ে উঠতে পারে না। এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, জ্ঞান তখনই সত্যিকার জ্ঞান হয় যখন তা যিকিরের সঙ্গে যুক্ত হয়, চিন্তাকে হিদায়াতে রূপ দেয়, গুনাহের জন্য ইস্তিগফারে উদ্বুদ্ধ করে এবং মানুষকে এই দোয়ায় পৌঁছে দেয়- অতএব আমাদের গুনাসমূহকে ক্ষমা করে দাও। অতএব আমাদের করণীয় হলো শুধু তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানকে তাফাক্কুরে, তাফাক্কুরকে যিকিরে, যিকিরকে আমলে এবং আমলকে আখিরাতমুখী দোয়ায় রূপান্তর করা; কারণ কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞানী সেই নয়, যে অনেক জানে, বরং সেই, যে সঠিকভাবে দেখে, গভীরভাবে চিন্তা করে, আল্লাহকে চিনে এবং সেই জ্ঞানকে জীবনের পথনির্দেশে পরিণত করে। (আল্লাহই ভালো জানেন)।
৬। উল্লেখিত আয়াতসমূহ আমাদেরকে তিনটি বিষয়ে বার্তা দিয়েছে:
(ক) প্রকৃত জ্ঞানীর পরিচয় প্রদান করেছে।
(খ) আল্লাহর কাছে দোয়া করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।
(গ) নারী-পুরুষের প্রকৃতি, আকৃতি ও অঙ্গন আলাদা হলেও তারা একে অপরের সহযোগী।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) একজন প্রকৃত জ্ঞানীর উচিৎ সর্বাবস্থায় দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে- জীবনের সব অবস্থায় অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে সচল রাখা। শুধু সালাতের ভেতর নয়; কাজের ফাঁকে, চলার পথে, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করা।
(খ) আকাশ, জমিন, রাত-দিনের পরিবর্তন, জীবন ও প্রকৃতির শৃঙ্খলা দেখে আল্লাহর কুদরত, হিকমত ও রহমত উপলব্ধি করার অভ্যাস গড়ে তোলা; শুধু দেখা নয়, দেখে শিক্ষা নেওয়া।
(গ) গুনাহ মাফ, অন্তরের শুদ্ধি, হিদায়াতে অটল থাকা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং নেককারদের সঙ্গ কামনা, এসবকে নিজের নিয়মিত দোয়ার অংশ করা।
(ঘ) শুধু তথ্য অর্জন নয়; যা জানা হয় তা জীবনচর্চায় প্রয়োগ করা, সত্যকে গ্রহণ করা, ভুল থেকে ফিরে আসা, প্রয়োজনে আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করা, এবং নিজের দায়িত্বের জায়গায় আমানতদার থাকা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮৭-১৮৯) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: সত্য গোপন, নিজের কাজে আত্মতুষ্টি এবং অযথা প্রশংসা চাওয়ার পরিণতি।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ (187) لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (188) وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (189)﴾ [سورة آل عمران: 187-189].

 

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: সত্য গোপন, নিজের কাজে আত্মতুষ্টি এবং অযথা প্রশংসা চাওয়ার পরিণতি।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
যখন আল্লাহ্ সেই ব্যক্তিদের সাথে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, যাদেরকে কিতাব দান করা হয়েছিল, যে তারা তা মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না, কিন্তু তারা সেটিকে পেছনে ফেলে দিয়েছিল এবং তা খুব সামান্য মূল্যে বিক্রি করেছিল; এটি খুবই নিন্দনীয় কাজ যা তারা করেছিল।
যারা যা পেয়েছে তাতে খুশি হয় এবং যা করেনি তার জন্য তারা প্রশংসা পেতে চায়, তাদেরকে মনে করা উচিত না যে তারা নিরাপদ, বরং তাদের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আকাশ ও পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহর, আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশালী।
আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
উল্লেখিত আয়াতসমূহের প্রসঙ্গ এখনো ইহুদিদের নিয়েই অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল মুহাম্মদকে (সা.) নির্দেশ দেন- তিনি যেন তাদের স্মরণ করিয়ে দেন সেই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ তায়ালা ইহুদি-খ্রিষ্টান আলেমদের নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। অঙ্গীকার ছিল এই যে, তারা তাদের কিতাব তাওরাত ও ইনজিলে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা.) গুণাবলি মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে, তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর অনুসরণ করবে, যিনি হেদায়াত ও সত্য দ্বীন ইসলাম নিয়ে আগমন করেছেন। কিন্তু তারা এ অঙ্গীকার গোপন করে এবং উপেক্ষা করে পেছনে নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা এর বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থ, পদমর্যাদা ও সম্পদ গ্রহণ করেছে।
পরবর্তী আয়াতে তাদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারিত হয়েছে, যারা নিজেদের কৃতকর্মে আনন্দিত হয় এবং যা করেনি, তার জন্যও মানুষের প্রশংসা কামনা করে। যারা আল্লাহর বাণী বিকৃতি করে, বিধান পরিবর্তন করে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তারা কখনোই শাস্তি থেকে নিরাপদ নয়। তারা নিজেদের অন্যায় কাজেই সন্তুষ্ট থাকে। উপরন্তু, তারা চায় মানুষ তাদের অপকর্মেরও প্রশংসা করুক, এমনকি যে কাজ তারা করেনি- তার জন্যও তারা কৃতিত্ব পেতে আগ্রহী। বাস্তবে তারা কল্যাণ নয়, বরং অকল্যাণই বিস্তার করেছে। ফলে তারা কোনোভাবেই শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে না; বরং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সর্বময় সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে বলেন: আকাশম-লী ও পৃথিবীর মালিকানা একমাত্র তাঁরই, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তিনি অপরাধীকে শাস্তি দিতে এবং প্রতিশোধ নিতে সম্পূর্ণ সক্ষম এবং তিনি অবশ্যই তাঁর শাস্তির অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবেন, দুনিয়াতেও এবং আখিরাতেও। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৩; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৫; আল-মুনতাখাব: ১/১২০) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلا تَكْتُمُونَهُ﴾ “তোমরা এটি মানুষের কাছে বর্ণনা করে দাও; সাবধান, তা গোপন করো না”, আয়াতাংশে ‘এটি’ (সর্বনাম) দ্বারা কাকে বোঝায়, এ নিয়ে দুটি মত আছে।
(ক) সাঈদ ইবনু জুবাইর ও আস-সুদ্দী (র.) বলেন: এখানে ‘এটি’ দ্বারা মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহকে (সা.) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর ব্যাপারটি মানুষকে স্পষ্টভাবে জানাতে বলা হয়েছে, যদিও তাঁর নাম আয়াতে সরাসরি উল্লেখ নেই, কিন্তু জানা আছে।
(খ) অন্যদিকে আল-হাসান আল-বাসরী ও কাতাদা ইবনু দিআমাহ (র.) বলেন: এখানে ‘এটি’ বলতে ‘কিতাব’ (তাওরাত ও ইনজিল) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল যে, তারা কিতাবের মধ্যে থাকা সত্যগুলো- বিশেষ করে রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুওয়তের প্রমাণ মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবে এবং তা গোপন করবে না। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: (৯/৪৫৫) । এখানে দুইটি মতের মধ্যে কোন ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না। তবে দ্বিতীয় মতটি অধিকতর সঠিক। (যাহরাতুত তাফাসির, আবু যাহরাহ: ৩/১৫৪১) ।
﴿يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا﴾ “তারা নিজেদের কৃতকর্মে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে এবং যা করে নাই সে বিষয়ে প্রশংসিত হতে ভালোবাসে”, এখানে বক্তব্যটি মূলত ইহুদী-খ্রিষ্টানদের এক ধরনের ভ-ামি ও আত্মপ্রবঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছে। ইহুদী আলেমরা আল্লাহর কিতাব তাওরাতের আসল বক্তব্যকে পরিবর্তন করে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করত। তারা নিজেদের স্বার্থে ভুল ব্যাখ্যা বানিয়ে সাধারণ, অজ্ঞ মানুষদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিত। এতে তারা আনন্দও পেত; কারণ এর মাধ্যমে তারা প্রভাব, সম্মান বা দুনিয়াবি লাভ অর্জন করত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- এই কাজগুলো করার পরও তারা চাইতো মানুষ তাদেরকে ধার্মিক, সৎ, পবিত্র ও সত্যবাদী বলে সম্মান দিক। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: (৯/৪৫৬) ।
বাস্তব দৃষ্টিতে এ স্বভাবটি শুধু সেই বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই এই প্রবণতা দেখা যায়। অনেক মানুষ দুনিয়ার স্বার্থ অর্জনের জন্য বিভিন্ন কৌশল, কখনো অসৎ উপায়ও অবলম্বন করে। তারা যখন তাদের লক্ষ্য অর্জন করে, তখন খুশি হয়। কিন্তু একই সাথে তারা চায় মানুষ তাদেরকে ভালো, সৎ ও দ্বীনদার হিসেবে জানুক এবং প্রশংসা করুক। (আল্লাহই ভালো জানেন)
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আল্লাহ তা’আলা যখন পূর্বে ইহুদিদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুয়াত সম্পর্কে বিভিন্ন সন্দেহ ও আপত্তির কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলোর জবাবও দিয়েছেন, তখন এই আয়াতগুলো উল্লেখ করেছেন তাদের অদ্ভুত অবস্থা ও বিচিত্র আচরণ প্রকাশ করার জন্য। এবং বোঝানোর জন্য যে, তাদের জন্য নবুয়াত নিয়ে আপত্তি তোলা বা ইসলামের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করা মোটেই শোভনীয় নয়। কারণ, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ওপর দায়িত্ব ছিল তাওরাত ও ইনজিলের বর্ণনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং সেগুলোর মধ্যে থাকা সেইসব নিদর্শন প্রকাশ করা, যা রাসূলুল্লাহর (সা.) নবুয়াত ও তাঁর রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্য বহন করে। (তাফসির আল-মারাগী: ৪/১৫৫-১৫৬) ।
১৮৮ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন যে, হামিদ ইবনু আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, মারওয়ান তার দরোয়ানকে বললেন: হে রাফে! তুমি ইবনু আব্বাসের কাছে গিয়ে বলো: যদি আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মে আনন্দিত হওয়া এবং যা সে করেনি সে বিষয়ে প্রশংসা পছন্দ করার কারণে শাস্তি পায়, তাহলে তো আমরা সবাই শাস্তি পাব। তখন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন: তোমাদের এ কথার সাথে এই আয়াতের কী সম্পর্ক? এই আয়াত তো আহলে কিতাবদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে একটি বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু তারা সেই সত্য বিষয়টি গোপন করল এবং এর বদলে অন্য উত্তর দিল। এরপর তারা এমন ভাব দেখিয়ে বের হলো যেন তারা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সঠিক উত্তর দিয়েছে। এভাবে তারা তাঁর প্রশংসা পাওয়ার আশা করল। আর তারা আনন্দিত হয়েছিল এ কারণে যে, তারা রাসূলুল্লাহর জিজ্ঞাসিত সত্য বিষয়টি গোপন করতে পেরেছে। (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৬) ।
সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে: কিছু মুনাফিক লোক ছিল- যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের জন্য বের হতেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে না গিয়ে পিছনে থেকে যেত এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) বিরোধিতা করে নিজেদের বসে থাকায় আনন্দিত হতো। এরপর তিনি (যুদ্ধ থেকে) ফিরে এলে তারা তাঁর কাছে অজুহাত পেশ করত, শপথ করত এবং এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে চাইত যা তারা করেনি। তখন আল্লাহ তায়ালা ৮৮ নং আয়াত নাযিল করে মুনাফিকদের সেই চরিত্রের নিন্দা করছেন- যারা দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, মিথ্যা অজুহাত দেয়, নিজেদের কুকর্মে সন্তুষ্ট থাকে এবং না করা কাজের জন্যও প্রশংসা কামনা করে। (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৭)।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের ১৮৭-১৮৯ নম্বর আয়াতসমূহে আল্লাহ তা’আলা বিশেষভাবে সত্য গোপন করার ভয়াবহতা, নিজ কুকর্মে আনন্দ প্রকাশ ও মিথ্যা প্রশংসার প্রতি আসক্তির নিন্দা এবং তাঁর সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কথা তুলে ধরেছেন। উল্লেখিত আয়াতসমূহের মৌলিক শিক্ষা নি¤েœ তুলে ধরা হলো-
১। আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) ১৮৭ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষা উল্লেখ করেছেন-
(ক) আহলে কিতাবের আলেমদের ওপর আল্লাহ তা’আলা সত্য কথা প্রকাশ করার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। এই বিধান ইসলামের আলেমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের ওপর ফরজ হলো- সত্যকে প্রচার করা ও প্রকাশ্যে তুলে ধরা। মানুষের সন্তুষ্টির জন্য পার্থিব লাভ (ধন-সম্পদ, মর্যাদা বা ক্ষমতা) অর্জনের উদ্দেশ্যে অথবা কৌশল অবলম্বনের অজুহাত দিয়ে সত্য গোপন করা বা বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করা তাদের জন্য হারাম, যা বর্তমান মুসলিম সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
(খ) কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজের অপকর্ম থেকে তাওবা না করে বরং আত্মতুষ্টিতে ভুগবে এবং সে এমন কাজের জন্য প্রশংসা পেতে ভালোবাসবে যা সে করেনি। বরং পূর্ণতার লক্ষণ হলো- মানুষের প্রশংসার প্রতি আকাক্সক্ষা না রাখা, যদিও সে এমন কাজ করে থাকে যা প্রশংসার যোগ্য। তাহলে যে ব্যক্তি ভালো কাজই করেনি অথচ প্রশংসা চায়, তার অবস্থা কত নিন্দনীয়!। আরো নিকৃষ্ট হলো সেই ব্যক্তি, যে মন্দ ও খারাপ কাজ করে এবং তবুও চায় মানুষ তাকে প্রশংসা করুক, করতালি দিক এবং “জয় হোক অমুকের!” বলে সমর্থন দিক, যা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব বেশী পরিলক্ষিত হচ্ছে।
(গ) আল্লাহ তা’আলার সার্বভৌম মালিকানা ও সর্বশক্তিমান হওয়া, এই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে তাঁর প্রতি ভয় (খশিয়ত) ও তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনের আগ্রহ সৃষ্টি করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ ব্যাপারে গাফেল এবং এ সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে। (আইসার আল-তাফাসির, জাযায়েরী (১/৪২৪)।
২। ইমাম ওহাবা আল-জুহাইলী (র.) বলেন: ১৮৭ নং আয়াত থেকে মুসলিম আলেমদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব স্পষ্ট হয়:
(ক) আল্লাহর কিতাব পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা, যেন মানুষ তা সহজে বুঝতে পারে এবং এর উপদেশ ও বিধানগুলোর গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে।
(খ) মুসলমানদের কাছে দ্বীনকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে তারা এর প্রকৃত রূপ বুঝতে পারে এবং উপলব্ধি করে যে, উম্মাহর পিছিয়ে পড়া, দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ইসলাম ধর্ম।
(গ) অমুসলিমদের কাছেও দ্বীনের শিক্ষা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদেরকে সরল পথে আহ্বান করা, যাতে তারা হিদায়াত লাভ করতে পারে। (তাফসীর আল-মুনীর, আল-জুহাইলী: ৪/২০২-২০২) ।
৩। মুসলিম জাতিকে তুচ্ছজ্ঞান ও অসম্মান করার উদ্দেশ্যে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের একাংশ তাদের কিতাবে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং তার গুণাবলীকে গোপন রাখত। শুধু তাই নয়, তারা কাফিরদেরকে মুসলমানদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করত। এ বিষয়ে কোরআনের একটি আয়াতে উল্লেখ রয়েছে-
﴿أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيباً مِنَ الْكِتابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هؤُلاءِ أَهْدى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا أُولئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَنْ يَلْعَنِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيراً﴾ [سورة النساء: ৫১-৫২].
অর্থ: “তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের একটি অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিবত ও তাগূতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং কাফিরদের সম্পর্কে বলে- এরা মুমিনদের তুলনায় অধিক সঠিক পথে রয়েছে।’ এরা সেই লোক, যাদের ওপর আল্লাহ লা‘নত করেছেন। আর যাকে আল্লাহ লা‘নত করেন, তুমি কখনোই তার জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না” (সূরাতু আন-নিসা: ৫১-৫২) ।
আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
১. দ্বীনের সত্য জ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা এবং কোনো অবস্থাতেই তা গোপন না করা।
২. নিজের আমলে আত্মতুষ্টিতে না ভোগা এবং না করা কাজের জন্য প্রশংসা কামনা থেকে বিরত থাকা।
৩. মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে পৌঁছে দেওয়া।
৪. দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য দ্বীনের বিধান বিকৃতি বা পরিবর্তন না করা।
৫. আল্লাহ সর্বশক্তিমত্তা স্মরণ রেখে তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করা এবং জবাবদিহিতার প্রস্তুতি নেওয়া।

 

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮৫-১৮৬) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মৃত্যু, প্রতিদান ও পরীক্ষা: মানব জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ (185) لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ (186)﴾ [سورة آل عمران: 185-186].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: মৃত্যু, প্রতিদান ও পরীক্ষা: মানব জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(১৮৫) প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই-ই সফল। আর দুনিয়ার জীবন তো কেবল প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী।
(১৮৬) তোমাদেরকে অবশ্যই তোমাদের সম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে পরীক্ষা করা হবে। আর তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয়ই তা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আয়াতের প্রসঙ্গ এখনো রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিদের সান্ত¡না দেওয়ার ধারায় চলছে। আগের আয়াতে ইহুদি ও মুশরিকদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি যে মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেনÑআল্লাহ তা‘আলা সে বিষয়ে তাঁকে সান্ত¡না দেন। আর এই আয়াতে রয়েছে আরও গভীর ও মহৎ সান্ত¡না।
(১৮৫) এখানে আল্লাহ ঘোষণা করছেনÑপ্রত্যেক প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে; সে যত বড় মর্যাদারই হোক বা যত সামান্যই হোক, কারও জন্যই মৃত্যু থেকে রেহাই নেই। এরপর আল্লাহ স্পষ্ট করে দেন যে, দুনিয়া প্রতিদানের জায়গা নয়; এটি কাজ করার জায়গা। তাই দুনিয়ায় অনেক সময় দেখা যায়Ñঅপরাধীরা অপরাধ করে, যালিমরা যুলুম করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কোনো শাস্তি পায় না। আবার সৎকর্মশীলরা ভালো কাজ করে, সংশোধনকারীরা সমাজের কল্যাণে কাজ করে, তবুও তারা দুনিয়ায় কাক্সিক্ষত প্রতিদান পায় না। এতে মুমিনের জন্য রয়েছে বড় সান্ত¡না; কারণ প্রকৃত বিচার ও প্রতিদান হবে আখিরাতে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য এখানে তুলে ধরা হয়েছে- দুনিয়ার জীবন তার সমস্ত জৌলুস ও আকর্ষণসহ কেবলই ক্ষণস্থায়ী ভোগবস্তু। এটি বাহ্যিক সৌন্দর্য ও চাকচিক্যে মানুষকে মোহিত করে, কিন্তু অচিরেই তা মুছে যায় ও বিলীন হয়ে যায়। আসলে এটি এক প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী।
(১৮৬) অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনরা অবশ্যই পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন- তাদের সম্পদে এবং নিজেদের জীবনে। সম্পদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা হবে অভাব-অনটন, প্রয়োজন ও আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ দায়িত্ব (যেমন যাকাত ও অন্যান্য ব্যয়) আদায়ের মাধ্যমে। নিজেদের জীবনে পরীক্ষা হবে রোগব্যাধি, মৃত্যু এবং কঠিন ইবাদত ও দায়িত্ব- যেমন জিহাদ, হজ ও রোজার মাধ্যমে।
এছাড়া তারা অবশ্যই আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কাছ থেকে কষ্টদায়ক কথা ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য শুনবে। কেউ বলবে- “আল্লাহ গরিব, আমরা ধনী।” কেউ বলবেÑ“মসীহ আল্লাহর পুত্র।” আবার কেউ বলবেÑ“লাত, উয্যা ও মানাত আল্লাহর সাথে অন্যান্য উপাস্য।” এই সব কষ্ট ও পরীক্ষার মোকাবিলায় আল্লাহ তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন- “আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে অবশ্যই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ”। অর্থাৎ, ধৈর্য ও তাকওয়া শুধু ভালো গুণ নয়; এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত দায়িত্ব। এগুলো পালন করা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২১-৪২২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৯) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿ذَائِقَةُ الْمَوْتِ﴾ “মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী”-অর্থাৎ, আত্মা তার দেহের মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; কিন্তু আত্মা নিজে ধ্বংস বা বিলীন হয় না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২০) । এই বাক্যে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষের দেহ একসময় মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু আত্মা মরে না। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আত্মা অন্য জগতে (বরযখে) অবস্থান করে এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় দেহের সঙ্গে মিলিত হবে। তাই মৃত্যু মূলত দেহের জন্য; আত্মা ধ্বংস হয় না, বরং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় স্থানান্তরিত হয়। (আল্লাহই ভালো জানেন)
﴿مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾ “প্রতারনার ভোগ-সামগ্রী”, এখানে متاع বলতে এমন বস্তু বা ভোগের উপকরণ বোঝায়, যা মানুষ সাময়িকভাবে ব্যবহার করে বা উপভোগ করে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায় বা বিলীন হয়ে যায়। আর الغرور (প্রতারণা) শব্দটি এর সাথে যুক্ত হওয়ায় বোঝানো হয়েছে যে, দুনিয়ার এই সাময়িক ভোগ-বিলাস মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করতে পারে। এই কারণেই প্রসিদ্ধ তাবেঈ মুফাসসির ক্বাতাদা (র.) বলেছেন:
“الدنيا متاعٌ متروك، يوشك أن تضمحلَّ بأهلها”.
অর্থাৎ, “দুনিয়া এমন এক ভোগ-সামগ্রী, যা একদিন অবশ্যই ছেড়ে যেতে হবে; অচিরেই তা তার অধিবাসীদেরসহ বিলীন হয়ে যাবে”। দুনিয়ার জীবন ও তার ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী এবং প্রতারণাময়। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا كَمَا يَغْمِسُ أَحَدُكُمْ أُصْبُعَهُ فِي الْيَمِّ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا فَيَنْظُرُ بِمَا تَخْرُجُ.
অর্থাৎ- “আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থান এমন, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে তার আঙুল ডুবিয়ে আবার তুলে নেয়; তারপর দেখে- তার আঙুলে কতটুকু পানি ফিরে আসে” (মুসনাদে বায্যার: ৩৪৬০) ।
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ সা.-কে সান্ত¦না দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী এই আয়াতগুলোতেও সেই সান্ত¦নার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে: আপনি তাদের যে একগুঁয়েমি, অবাধ্যতা ও বিরোধিতা দেখছেন, তা স্থায়ী নয়; বরং এরও একদিন শেষ হবে। যা আসন্ন, তা খুবই নিকটবর্তী। সুতরাং আপনি তাদের আচরণে বিরক্ত বা দুঃখিত হবেন না। কারণ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সকল কাজের যথাযথ প্রতিফল পাবে। দুনিয়ার জীবন অতি সংক্ষিপ্ত, আর কিয়ামতের দিনই হলো প্রকৃত প্রতিদানের দিন। একই সঙ্গে এই আয়াতদ্বয় মুমিনদের প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। এতে তাদের শেখানো হয়েছে- তারা যেন নিজেদেরকে সামনে আসা সম্ভাব্য কষ্ট, নির্যাতন ও নানা কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে সহ্য করার জন্য প্রস্তুত করে। যাতে হঠাৎ করে এসব বিপদ এসে উপস্থিত হলেও তারা বিচলিত না হয় এবং দৃঢ়তার সাথে তা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ মুমিন ব্যক্তি আগে থেকেই ধৈর্য ও ঈমানের শক্তিতে নিজেকে প্রস্তুত রাখে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি ঈমান থেকে বঞ্চিত, সে যখন বিপদ ও কষ্টের মুখোমুখি হয়, তখন সহজেই ভেঙে পড়ে। তার মন সংকুচিত হয়ে যায়, সে বিরক্ত ও অস্থির হয়ে ওঠে, এমনকি অনেক সময় জীবনের প্রতিও তার অনীহা তৈরি হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯২) ।

১৮৬ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
﴿وَلَتَسْمَعُنَّ﴾ আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে- এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল এক ঘটনার প্রেক্ষিতে। তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সাথে এক ইহুদি ব্যক্তি ফিনহাস-এর তর্ক হয়। সেই ইহুদি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে বলেছিল: “আল্লাহ তো দরিদ্র, আর আমরা ধনী”। এই ধৃষ্টতাপূর্ণ কথার প্রসঙ্গেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
আরেক বর্ণনায় মুফাসসির আব্দুর রাযযাক সানআনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতটি কাব ইবনুল আশরাফ-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। সে ছিল একজন বিদ্বেষী ব্যক্তি, যে কবিতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সা.-কে ব্যঙ্গ করত এবং তার কবিতার দ্বারা কুরাইশরা কাফিরদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দিত। (লুবাব আল-নুকুল, সুয়ূতী: ৭৬) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
ভূমিকা: সূরাতু আলে-ইমরানের উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনদেরকে সান্ত¦না, সমবেদনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এখানে স্মরণ করানো হয়েছে যে, যারা মুসলমানদেরকে কষ্ট দিচ্ছে তারা এ দুনিয়াতে চিরস্থায়ী নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং মানুষের প্রকৃত প্রতিদান দেওয়া হবে আখিরাতে, তাই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। একই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনদেরকে জানানো হয়েছে যে, দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে ধন-সম্পদ, জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং বিশেষ করে আহলে কিতাব- ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এবং মুশরিকদের কাছ থেকে কষ্টদায়ক কথার সম্মুখীন হতে হবে। এ পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা হলো মুমিনের জন্য উত্তম ও দৃঢ় সংকল্পপূর্ণ পথ।

১। ১৮৫ নং আয়াত থেকে নি¤েœর বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়-
(ক) সকলকেই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহণ করতে হবে, ইমাম কুরতুবি র. তার তাফসির গ্রন্থে মৃত্যু সম্পর্কিত কিছু বিধান উল্লেখ করেছেন:
প্রথম বিধান: মৃত্যুর সময় মৃতকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালেমা শিখিয়ে দেওয়া সুন্নত, যাতে তার শেষ কথা ঈমানের সাক্ষ্য হয়। এ সময় সূরা ইয়াসীন পড়াও উত্তম। মৃত্যুর পর জীবিতদের উপর কিছু দায়িত্ব আসে, যেমন: মৃতের চোখ বন্ধ করা, সৎ লোকদেরকে মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া, দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
দ্বিতীয় বিধান: মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া শরীয়তে প্রতিষ্ঠিত বিধান। অধিকাংশ আলেমের মতে এটি সুন্নত, আবার কেউ কেউ এটিকে ওয়াজিব বলেছেন।
এটি জানাবাতের গোসলের মতোই করা হয় এবং সাধারণত তিন, পাঁচ বা সর্বোচ্চ সাতবার ধোয়া হয়।
তৃতীয় বিধান: কাফন দেওয়া ওয়াজিব। যদি মৃতের সম্পদ থাকে, তবে তা তার সম্পদ থেকেই করা হবে। কাফনের কাপড় সাদা হওয়া উত্তম।
চতূর্থ বিধান: জানাযা নিয়ে দ্রুত চলা সুন্নত। অতিরিক্ত ধীরগতিতে চলা বা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব করা অনুচিত। তবে এমন দ্রুততা নয়, যা অনুসারীদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়।
পঞ্চম বিধান: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা ওয়াজিব। তাকে মাটির মধ্যে সমাহিত করা এবং ঢেকে দেওয়া আবশ্যক। এছাড়া জানাযার নামাজ ফরজে কিফায়া, অর্থাৎ কিছু লোক আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। (তাফসির আল-কুরতুবি: ৪/২৯৯-৩০১)।
(খ) দুনিয়ার জীবন প্রতিদানের স্থান নয়; এটি কর্মের স্থান, এই পৃথিবী মূলত মানুষের জন্য পরীক্ষার ময়দান। এখানে মানুষ তার আমল, চরিত্র ও বিশ্বাসের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করে। কিন্তু সেই কাজের পূর্ণ প্রতিদান দুনিয়াতে নয়; বরং আখিরাতে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেককে তার আমলের যথাযথ প্রতিদান দেবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরাতু গাফির-এর ১৭ এবং সূরাতু আল-যালযালাহ-এর ৭-৮ নং আয়াতে কথা বলেছেন।
আয়াতের প্রথমাংশে সূক্ষ্মভাবে কবর জীবনের (বারযাখের) নেয়ামত ও শাস্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের কর্মের ভিত্তিতে তাকে সেখানে আংশিক প্রতিদান দেওয়া হয় এবং সে তার পূর্বে সম্পাদিত আমলের কিছু নমুনা আগেই পেতে শুরু করে। এ কথা বুঝা যায় আল্লাহর এই বাণী থেকে (وإنما توفون أجوركم يوم القيامة) “তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান তো কিয়ামতের দিনই দেওয়া হবে” অর্থাৎ, আমলের পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত প্রতিদান কেবল কিয়ামতের দিনই দেওয়া হবে। এর আগে যে প্রতিদান দেওয়া হয়, তা আংশিক এবং তা বারযাখের জীবনে হয়ে থাকে। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৫৯) ।
(গ) প্রকৃত সফলতা হলো- জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ করা, মানুষ সাধারণত দুনিয়ার ধন-সম্পদ, পদ-মর্যাদা বা খ্যাতিকে সফলতা মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা হলো আখিরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জান্নাত লাভ করা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতে পারে- তাহলে দুনিয়ার সফলতাকে আমরা কীভাবে দেখবো? এর উত্তরে বলা যায়, দুনিয়াবী সফলতা- যেমন ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বড় ব্যবসায়ী হওয়া- এসব নিজে নিজে চূড়ান্ত সফলতা নয়; বরং এগুলো হলো প্রকৃত সফলতায় পৌঁছার মাধ্যম ও সিঁড়ি। এই সাফল্যগুলো তখনই অর্থবহ হয়, যখন এগুলোকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়। একজন ডাক্তার যদি তার জ্ঞান দিয়ে মানুষের সেবা করে, একজন ব্যবসায়ী যদি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে, আর একজন প্রকৌশলী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার কাজের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখে, তবে তাদের দুনিয়াবী সফলতা আখিরাতের সফলতায় রূপ নেয়। অতএব, আল্লাহর বিধান মেনে এই দুনিয়ার সিঁড়ি বেয়ে চলতে পারলে মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে এবং চিরস্থায়ী জান্নাত অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত ও পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করতে সক্ষম হয়। (আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন)
(ঘ) দুনিয়ার জীবন এক প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী, যা দ্রুত বিলীন হয়ে যায়, পৃথিবীর আনন্দ, সম্পদ ও সৌন্দর্য মানুষের চোখে আকর্ষণীয় মনে হলেও তা স্থায়ী নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো শেষ হয়ে যায়। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে পড়ে না গিয়ে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। (আইসার আল-তাফাসির, জাযায়িরী: ১/৪২২) । একই বিষয়ে আল্লাহ আল-আনকাবুত-এর ৬৪ এবং আল-হাদীদ-এর ২০ নম্বর আয়াতে কথা বলেছেন। এ সম্পর্কে সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
“لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ، مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ” (سنن الترمذي: ২৩২০).
“যদি দুনিয়া আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমান মূল্যবান হতো, তবে তিনি কোনো কাফিরকে এ দুনিয়া থেকে এক চুমুক পানিও পান করতে দিতেন না” (সুনানে তিরমিযী: ২৩২০)।
২। শায়খ আবু যাহরাহ তার তাফসীর গ্রন্থ ‘যাহরাতুত তাফাসীর’-এ লিখেছেন- ১৮৬ নম্বর আয়াতে এমন কিছু সূক্ষ্ম বর্ণনামূলক ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে এর গভীর তাৎপর্য স্পষ্ট হয়:
প্রথমত: এখানে রাসূলুল্লাহর সা. বিরোধীদের এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বুঝায় তারা দুই শ্রেণির, এক শ্রেণি হলো আহলে কিতাব, যারা পূর্ববর্তী নবীদের উপর অবতীর্ণ কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখত; আর দ্বিতীয় শ্রেণি হলো মুশরিক, যারা কোনো কিতাব মানে না এবং কোনো হেদায়েত অনুসরণ করে না। কুরআন এই দুই শ্রেণিকে একটি বিষয়ে একত্র করেছে- তারা সবাই রাসূলুল্লাহর সা. বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতা তাদেরকে সত্য অস্বীকারে প্ররোচিত করেছে। তাদের বিরোধিতা ব্যক্তিগত ছিল না; বরং রাসূলুল্লাহ সা. যা নিয়ে এসেছেন এবং যা প্রচার করেছেন, তার প্রতিই ছিল। এখানে জ্ঞানী ও অজ্ঞ- উভয়কে একত্রে উল্লেখ করার মধ্যে একটি গভীর ইঙ্গিত রয়েছে: যখন হঠকারিতা আসে, তখন জ্ঞানী ও অজ্ঞ সমান হয়ে যায়। অজ্ঞ ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতার অন্ধকারে বিভ্রান্ত থাকে, আর জ্ঞানীর অন্তরে আল্লাহ মোহর করে দেন, ফলে উভয়েই একই অবস্থায় পতিত হয়।
দ্বিতীয়ত: এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুশরিকদের বিরোধিতার কারণ ছিল অজ্ঞতা, আর আহলে কিতাবের বিরোধিতার মূল কারণ ছিল হিংসা। তারা আল্লাহর অনুগ্রহে অন্যদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তা দেখে হিংসা করত। কারণ, তারা মনে করত- যেহেতু তাদের কাছে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাই নবুওয়াত তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কিন্তু আল্লাহ বলেন: “আল্লাহই ভালো জানেন, তিনি কোথায় তাঁর রিসালাত অর্পণ করবেন” (সূরাতু আল-আনয়াম: ১২৪) । এই ভ্রান্ত ধারণার ফলে তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ জন্ম নেয়। আর যেখানে হিংসা থাকে, সেখানে সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
তৃতীয়ত: আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কথা শুনে মুসলমানদের কষ্ট পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও কষ্টটি মূলত কথার মাধ্যমে আসে। কিন্তু সেই কথাকে ‘কষ্ট’ বলা হয়েছে, কারণ তা কষ্টের কারণ, কষ্টের বিষয়বস্তু, এমনকি নিজের মধ্যেই কষ্ট বহন করে। এজন্য কষ্টকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তা শোনার বস্তু। আর “অনেক কষ্ট” বলা হয়েছে, যাতে বোঝানো হয়, এ কষ্ট পরিমাণে, ধরনে ও প্রকৃতিতে, সব দিক থেকেই ব্যাপক ও তীব্র।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে পথনির্দেশনা দিয়েছেন যে তারা যদি আহলে কিতাব ও মুশরিকদের দ্বারা কোন প্রকার কষ্টের স্বীকার হয়, তাহলে তারা তিনটি কাজ করবে:
(ক) ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেদেরকে অস্থিরতা থেকে বিরত রাখবে,
(খ) সৎকর্মে অবিচল থাকবে, এবং
(গ) ঈমানদারদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবে। (যাহরাতুত তাফাসির: ৩/১৫৪০) ।
এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন সূরাতু আল-বাক্বারা এর ১৫৫ নম্বর আয়াতে। এ সম্পর্কে সহীহ মুসলিমে সুহাইব রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
“عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ؛ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ” (صحيح مسلم: ২৯৯৯).
অর্থাৎ: “মুমিনের অবস্থা সত্যিই আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করে, তবে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- এতে তার জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে- এতেও তার জন্য কল্যাণ হয়” (সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
১। সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ রেখে নেক আমল, তওবা ও আখিরাতের প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়া।
২। দুনিয়ার মোহ ও প্রতারণাময় ভোগ-বিলাসে বিভ্রান্ত না হয়ে জান্নাত লাভকেই জীবনের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
৩। জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষা- ধন-সম্পদ, রোগ-ব্যাধি ও কষ্টের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
৪। তাকওয়া অবলম্বন করে হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৫। মানুষের কষ্টদায়ক কথা, বিরোধিতা ও বিদ্বেষের মুখে সংযম, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্র বজায় রাখা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর

﴿لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ (181) ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ (182) الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ عَهِدَ إِلَيْنَا أَلَّا نُؤْمِنَ لِرَسُولٍ حَتَّى يَأْتِيَنَا بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ قُلْ قَدْ جَاءَكُمْ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِي بِالْبَيِّنَاتِ وَبِالَّذِي قُلْتُمْ فَلِمَ قَتَلْتُمُوهُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (183) فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ جَاءُوا بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ وَالْكِتَابِ الْمُنِيرِ (184)﴾ [سورة آل عمران: 181-184].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৮১। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছিল: “আল্লাহ গরিব, আর আমরা ধনী”। তারা যা বলেছে এবং যে অন্যায়ভাবে তারা নবীদের হত্যা করেছে- সবই আমরা লিখে রাখব। আর (কিয়ামতে) আমরা বলব: “জ্বালাময় আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো”।
১৮২। এটি তোমাদের নিজেদের হাতের কামাইয়ের ফল। আর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি কখনোই জুলুমকারী নন।
১৮৩। যারা বলেছিল: “আল্লাহ আমাদের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, কোনো রাসূলের প্রতি আমরা ঈমান আনব না, যতক্ষণ না সে আমাদের কাছে এমন কুরবানি নিয়ে আসে যাকে আগুন এসে ভস্ম করে দিবে”। তাদের বলুন: “আমার আগেও তোমাদের কাছে বহু রাসূল স্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলেন এবং তোমরা যা দাবী করছো তা নিয়েও এসেছিলেন। তাহলে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাদের কেন হত্যা করেছিলে?”।
১৮৪। অতএব তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, যারা স্পষ্ট প্রমাণ, লিখিত কিতাব এবং উজ্জ্বল কিতাব নিয়ে এসেছিলেন।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৮১। আল্লাহ তায়ালাই আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র মালিক। সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছুর উত্তরাধিকার তাঁরই কাছে ফিরে যাবে। অথচ কিছু ইহুদি এই সত্য অস্বীকার করে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের সুরে বলেছিল যে, আল্লাহ গরিব, তাই তিনি মানুষের কাছে দান-খরচকে “ঋণ” বলে চাইছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর মর্যাদা খাটো করা এবং ঈমানদারদের দান-খরচকে তুচ্ছ করা। আসলে আল্লাহ মানুষের দানকে “ঋণ” বলেছেন সম্মান ও উৎসাহ দেওয়ার জন্য, প্রয়োজনের কারণে নয়। মানুষের দেওয়া দান-সদকা তাঁর কোনো উপকার করে না; বরং তা মানুষেরই কল্যাণে আসে এবং তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন। এই অবমাননাকর কথার কারণে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তাদের এই কুফরি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য শুনেছেন এবং তা তাদের আমলনামায় লিখে রাখা হয়েছে। যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তী বড় অপরাধ- নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করার অপরাধও লেখা আছে। এসব গুরুতর অপরাধের ফলস্বরূপ কিয়ামতের দিন তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে বলা হবে।
১৮২। এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা কোনো অবিচার বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি হবে ইহুদীদের নিজেদের কৃতকর্মেরই পরিণাম। দুনিয়ার জীবনে তাদের মুখে যে কুফরি ও অবমাননাকর কথা বলেছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে গুনাহের কাজ করেছে এবং অন্তরে যে ভ্রান্ত ও বাতিল বিশ্বাস লালন করেছে, সবকিছুই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না, বরং প্রত্যেককে তার নিজের আমলের অনুযায়ী প্রতিফল দেন। তাই শাস্তি ভোগকারীরা নিজেরাই নিজেদের জন্য সেই পরিণতি ডেকে এনেছে।
১৮৩। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সেই যুক্তি খন্ডন করছেন, যা তারা নবীদের আগমনের সময় ব্যবহার করত। তারা বলত, তারা কোনো নবীকে তখনই বিশ্বাস করবে, যখন সে আসমান থেকে আগুন নেমে কোনও কুরবানি দাহ করবে। আল্লাহ তায়ালা এখানে স্মরণ করাচ্ছেন- তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে বহু নবী এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শন ও অলৌকিক নিদর্শনসহ। তারা দেখতে পেত যে নবীরা সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত, কিন্তু তাদের অহংকার ও অমর্যাদার কারণে সেই নবীদের হত্যা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ জিজ্ঞেস করছেন- যদি তারা সত্যি ঈমানদার হত, এবং আসমান থেকে আগুন নেমে কুরবানিকে দাহ হওয়াকে নবীর সত্যতার মানদন্ড মনে করত, তাহলে তারা কেন তাদের পূর্বপুরুষদের হত্যা করেছিল।
১৮৪। আল্লাহ এখানে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦ দিচ্ছেন যে, কাফের-মুশরিক ও ইহুদি-খ্রিষ্টনরা রাসূলুল্লাহকে (সা.) মিথ্যা বলে অবজ্ঞা করলেও এটা নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক নবীকে তাদের নিজ স¤প্রদায়ের মানুষ মিথ্যাপবাদ ও বিদ্রƒপের মাধ্যমে নাকচ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে অস্বীকার করা এবং নবীদের আহ্বানকে অবমূল্যায়ন করা। কিন্তু নবীরা শুধু তাদের কথার মাধ্যমে নয়, স্পষ্ট অলৌকিক নিদর্শন, প্রমাণ এবং আসমানি গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষকে ঈমানের পথে আহ্বান করেছিল। আসমানি গ্রন্থ মানুষের জন্য আলোর মতো, যা মানুষকে অন্ধকার, বিভ্রান্তি ও ভুল থেকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই গ্রন্থগুলো স্পষ্ট, পরিষ্কার এবং সঠিক ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝাতে সক্ষম। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮-১১৯) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ﴾ ‘এমন কুরবানী, যাকে আগুন ভস্মীভ‚ত করে দেয়’, আয়াতাংশে কুরবান (القربان) বলতে বোঝায়- আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু বা অন্য কোনো বস্তু। পূর্ববর্তী নবীদের যুগে কুরবানের একটি বিশেষ নিদর্শন ছিল: কুরবান নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়া হতো, এরপর আকাশ থেকে এক প্রকার সাদা আগুন অবতীর্ণ হয়ে তা ভস্মীভূত করলে বুঝা যেত যে আল্লাহ তা কবুল করেছেন। আর আগুন না নামলে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে গণ্য হতো। (তাফসীর গরীব আল-কেরাআন, কাওয়ারী: ৩/১৮৩)।
﴿الْبَيِّنَات﴾ ‘স্পষ্ট প্রমাণ’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নিদর্শন এবং নবী-রাসূলদের উপর প্রেরিত মোযেজা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।
﴿الَّذِي قُلْتُمْ﴾ ‘যা তোমরা বলছো’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কুরবানী, কারণ ইহুদীরা এমন কুরবানীর দাবী তুলেছিল, যা আকাশ থেকে আগুন এসে শেষ করে দিবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে প্রাণ উৎসর্গে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে মুজাহিদদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট যে জান্নাতের মহান সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়ের প্রতিও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; কারণ সম্পদ হলো প্রাণেরই ঘনিষ্ঠ সহচর। এই পথে সম্পদ ব্যয়ে কৃপণতা করলে যে কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতদ্বয়ে আরও বোঝানো হয়েছে যে দুনিয়ার সম্পদ ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। যাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার আসে এবং যারা উত্তরাধিকারী হয়, উভয়ই একদিন মৃত্যুবরণ করবে; আর চিরস্থায়ী মালিকানা থাকবে একমাত্র আল্লাহরই। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে ইহুদিদের একটি বক্তব্য উল্লেখ করে তার অসারতা খন্ডন করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেওয়া হয়েছে যে তাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অস্বীকার ও মিথ্যারোপ নতুন কিছু নয়; পূর্ববর্তী নবীরাও তাদের কাছ থেকে অনুরূপ বিরোধিতা ও অস্বীকৃতির সম্মুখীন হয়েছেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৪৫)।

১৮১ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু ইসহাক ও ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন- একদিন আবু বকর (রা.) ইহুদিদের পাঠশালায় (বায়তুল মিদরাস) প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দেখেন, কয়েকজন ইহুদি তাদের এক ব্যক্তির চারপাশে জড়ো হয়েছে, যার নাম ছিল ‘ফিনহাস’। সে আবু বকর (রা.)-কে বলল: “হে আবু বকর! আমরা আল্লাহর প্রতি মোখাপেখী নয়; বরং তিনি আমাদের প্রতি মোখাপেখী। যদি তিনি আমাদের প্রতি মুখাপেক্ষী না হতেন, তবে তোমাদের নবী আমাদের কাছ থেকে ঋণ চাইতেন না”। এ কথা শুনে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে চপেটাঘাত করেন। এরপর ‘ফিনহাস’ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বলল: হে মুহাম্মদ! দেখুন, আপনার সঙ্গী আমার সাথে কী করেছে!? রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন- হে আবু বকর! তুমি কেন এমন করলে?” তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! সে অত্যন্ত ভয়াবহ কথা বলেছে। সে দাবি করেছে- আল্লাহ দরিদ্র, আর তারা নাকি ধনী!। ফিনহাস এ কথা অস্বীকার করল। তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন।
আরেক বর্ণনায় ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: যখন আল্লাহ তায়ালা সূরাতু আল-বাক্বারার ২৪৫নং আয়াত: “কে আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দেবে” নাযিল করলেন: তখন ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল: হে মুহাম্মদ! তোমার প্রতিপালক কি দরিদ্র হয়ে গেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের কাছে ঋণ চাইছেন?”, তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৫) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সুরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা ইহুদিদের কুৎসিত মানসিকতা ও ভয়ংকর অপরাধসমূহ স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। এখানে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ, নবীদের হত্যা এবং রাসূলুল্লাহকে (সা.) অস্বীকার করার ধারাবাহিক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দেন- তিনি সব কথা শোনেন, সব কাজ জানেন এবং কোনো জুলুমই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়। একই সঙ্গে এই আয়াতসমূহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেয় যে, সত্যের পথের আহ্বানকারীরা অতীতেও একই রকম অবজ্ঞা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।
১। ১৮১ এবং ১৮২ নং আয়াতদ্বয়ে চারটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইহুদীদের প্রথম হটকারিতা হলো- আল্লাহর প্রতি তাদের জঘন্য অপবাদ, এই আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের এক জঘন্য অপবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র আর আমরা ধনী”। এটি ছিল আল্লাহর শানে চরম অবমাননা ও কুফরী বাক্য। দুনিয়াবি সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে আল্লাহর গুণাবলির প্রতি অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিল। অথচ আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত গুণ সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে: তিনি কারো প্রতি মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু বিশ্বের সবকিছুই তার দিকে মুখাপেক্ষী। যেমন সূরাতু আল-ইখলাসে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ফুঠে উঠেছে।
এছাড়া সূরাতু আল-ফাতির এ এসেছে-
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ﴾ [سورة الفاطر: ১৫].
অর্থ: “হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ তো অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত” (সূরাতু আল-ফাতির: ১৫) । এবং সূরাতু মুহাম্মদ এ এসেছে-
﴿وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ﴾ [سورة محمد: ৩৮].
অর্থ: “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আর তোমরাই মুখাপেক্ষী” (সূরাতু মুহাম্মাদ: ৩৮) । হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
“يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ” (صحيح مسلم: ২৫৭৭].
অর্থ: “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, আমি যাকে খাওয়াই সে ছাড়া; অতএব আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাওয়াবো। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন সবাই একত্র হয়ে আমার নিকট কিছু চায় এবং আমি প্রত্যেককে তার চাওয়া দিয়ে দেই, তবুও তা আমার রাজত্ব থেকে সূচের ছিদ্রে প্রবেশ করা পানির সমানও কমাবে না” (সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭) ।
(খ) ইহুদীদেরকে সতর্কীকরণ- তাদের সকল কর্মকান্ড আল্লাহ তায়ালার পর্যবেক্ষণে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন- “আমরা তাদের এ কথা লিখে রাখব”। অর্থাৎ তাদের মুখের কথা, অন্তরের কুফরী মনোভাব এবং কার্যকলাপ, সবই আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত। কোনো অপবাদ, বিদ্রূপ বা অপরাধই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়। এবং অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা তাদের কথা শুনছেন। এ ছাড়াও কোরআনের বিভিন্ন জায়গাতে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। যেমন সূরাতু ক্বফ- এ বলেছেন:
﴿مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴾ [سورة ق: ١٨].
অর্থ: “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা-ই আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা লিখে রাখেন” (সূরাতু ক্বফ: ১৮) । কোরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ﴾ [سورة الملك: ١٤].
অর্থ: “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি তো অতিসূ²দর্শী, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত” (সূরাতু আল-মুলক: ১৪) । আকেটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ﴾ [سورة غافر: ١٩].
অর্থ: “চোখের গোপন বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তর যা গোপন করে, সবই তিনি জানেন” (সূরাতু গাফির: ১৯) ।
এ ব্যাপারে অনেক হাদীস রয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ ثُمَّ بَيَّنَ ذَلِكَ، فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ سَيِّئَةً وَاحِدَةً” [متفق عليه].
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সয়ং তার রব থেকে বর্ণনা করেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নেক আমল ও গুনাহ লিখে রেখেছেন। অতঃপর তিনি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো নেক কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকে একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে নেক কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা সম্পন্ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা দশগুণ থেকে শুরু করে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত, বরং তার চেয়েও বহুগুণ বাড়িয়ে লিখে দেন। আর কেউ যদি কোনো গুনাহ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকেও একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে গুনাহ করার ইচ্ছা করে এবং তা বাস্তবায়ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা একটি মাত্র গুনাহ হিসেবে লিখে দেন” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ” (صحيح مسلم: ২৫৬৪].
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান” (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তিনি তাদের কথাবার্তা শোনেন, তাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন এবং তাদের মুখের কথা, কাজকর্ম ও নিয়ত, সবকিছুই লিপিবদ্ধ করেন। তাদের কুফর, বিদ্রæপ ও অপরাধের কোনো কিছুই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।
(গ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ইহুদীদের হঠকারিতার জবাব ও শাস্তির ঘোষণা, ইহুদীরা আল্লাহ তায়ালার শানে কুফরিমূলক অপবাদ, বিদ্রƒপ ও অবাধ্যতার যে চরম সীমা অতিক্রম করেছিল, তার জবাবে আল্লাহ তায়ালা শুধু সতর্ক করেননি; বরং ১৮১ নং আয়াতের শেষাংশে সুস্পষ্টভাবে কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তোমরা আগুনের শাস্তি আস্বাদন কর”। এটি কোনো আবেগপ্রসূত হুমকি নয়; বরং তাদের বিশ্বাস, কথা ও কর্মের ন্যায়সংগত পরিণতির ঘোষণা, যা আখিরাতে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
(ঘ) ইহুদীরা কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার কারণ, আল্লাহ তায়ালা যখন ইহুদীদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেন, তখন তা কোনো আকস্মিক বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং আল্লাহ তায়ালা ১৮২ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন- এই শাস্তির মূল কারণ হলো তাদের নিজেদের হাতের কামাই করা কৃতকর্ম। অর্থাৎ তারা যা করেছে, তারই ন্যায্য পরিণতি হিসেবে এই শাস্তি অবধারিত হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, ইহুদীদের অপরাধ ছিল সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত এবং সীমালঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ। তাদের কৃতকর্মের মধ্যে কয়েকটি অপরাধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-
প্রথমত, নবী-রাসূলদের অন্যায়ভাবে হত্যা। আল্লাহ তায়ালা যাদের মানুষকে হেদায়েতের আলো দেখানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন, সেই নবী-রাসূলদেরকেই তারা হত্যা করেছে বা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, যেমনটি ১৮৩ নং আয়াতে দেখা যায়। এটি শুধু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তায়ালার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ। এটি ছিল ইহুদীদের অন্যতম মারাত্মক অপরাধ। তারা আল্লাহ তায়ালার শানে এমনসব কথা বলেছে, যা কেবল অবমাননাকরই নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফরিমূলক। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তারা আল্লাহর মহান গুণাবলি, বিশেষত তাঁর অমুখাপেক্ষিতা, পূর্ণতা ও একত্বকে অস্বীকার করেছে। এটি ছিল তাদের চরম ধৃষ্টতা ও অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, তারা কখনো বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র, আর আমরা ধনী” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৮১)। আবার কখনো তারা বলেছে- “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ১৮, সূরাতু আত-তাওবাহ: ৩০)। কোরআন এ ধরনের বক্তব্যকে স্পষ্ট ভাষায় মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। এ ধরনের অপবাদ আল্লাহর সত্তা ও একত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানে এবং তাওহিদের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। এভাবে বারবার আল্লাহর শানে মিথ্যা আরোপ করে তারা শুধু মুখের গুনাহেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অন্তরের কুফরি মানসিকতা প্রকাশ করেছে। এই ধরণের অপবাদ প্রমাণ করে-তারা আল্লাহকে যথার্থভাবে চিনতে অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের জ্ঞান ও সম্পদের অহংকারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তৃতীয়ত, বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘন। ইহুদীদের সামনে সত্য যখন সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল নবী-রাসূলদের মাধ্যমে, কিতাব ও নিদর্শনের মাধ্যমে, তখনও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। সত্য তাদের অজানা ছিল না; বরং তারা তা চিনত, বুঝত এবং জানত যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু জেনেশুনে তারা সেই সত্যকে অস্বীকার করেছে, যা ছিল তাদের চরম হঠকারিতা ও বিদ্রোহী মানসিকতার প্রমাণ। তারা শুধু বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই সীমালঙ্ঘন করেনি; বরং কার্যত আল্লাহর বিধান ভেঙেছে, বারবার অঙ্গীকার ও চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার হোক কিংবা নবীদের মাধ্যমে দেওয়া নির্দেশনা, সবকিছুই তারা নিজেদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কাছে তুচ্ছ করে দিয়েছে। ফলে দ্বীনের বিধানকে অনুসরণের পরিবর্তে তারা প্রবৃত্তি, অহংকার ও দুনিয়াবি লাভকে প্রাধান্য দিয়েছে।
এই আচরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; সমস্যা ছিল হৃদয়ের রোগে, হিংসা, অহংকার ও দুনিয়ামুখিতা। এ কারণেই কোরআন তাদের সম্পর্কে বারবার উল্লেখ করেছে- তারা সত্য জানার পরও তা গোপন করত, বিকৃত করত এবং অমান্য করত। এমন ধারাবাহিক সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘনই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত করে তোলে।
২। ১৮৩ নম্বর আয়াতে ইহুদীদের একটি বিশেষ হঠকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে তার শক্ত জবাব দিয়েছেন এবং তাদের মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
(ক) ইহুদীদের দ্বিতীয় হঠকারিতা: মিথ্যা অজুহাত ও আকিদাগত বিকৃতি, আয়াতের প্রথমাংশে দেখা যায়- ইহুদীরা ঈমান না আনার জন্য একটি কৃত্রিম ও মনগড়া শর্ত দাঁড় করিয়েছিল। তারা আল্লাহর নামে এমন একটি অঙ্গীকারের কথা বলেছে, যার কোনো ওহিভিত্তিক প্রমাণ নেই। এটি ছিল আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ, যা কুফরি ও ধৃষ্টতার অন্তর্ভুক্ত। পূর্ববর্তী কিছু নবীর যুগে কুরবানি গ্রহণের জন্য আসমান থেকে আগুন নেমে আসা ছিল তখনকার একটি বিশেষ পদ্ধতি বা মুজিজা। কিন্তু ইহুদীরা সেই ব্যতিক্রমী ঘটনাকেই নবুয়তের সার্বজনীন শর্তে পরিণত করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সত্য গ্রহণ এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- নিদর্শন দেখানোর পরও তারা ঈমান আনেনি। এখানে স্পষ্ট হয়, তাদের সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; বরং সমস্যা ছিল অন্তরের রোগে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করত এবং নবুয়ত যেন কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এই অহংকারে আক্রান্ত ছিল। ফলে অন্য জাতির মধ্য থেকে রাসূল আসা তারা মানতে পারেনি।
(খ) আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব- ইতিহাসের আয়নায় সত্য উন্মোচন, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের দাবির জবাবে রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেন: “বলুন, আমার আগেও তোমাদের কাছে রাসূলগণ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এবং তোমরা যে নিদর্শনের দাবী তুলছো, তা নিয়েও। তবে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে তাদেরকে হত্যা করলে কেন?”। এই প্রশ্নটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুক্তিনির্ভর। আল্লাহ তায়ালা এখানে আবেগ নয়, বরং ইতিহাসকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ইহুদীদের নিকট বহু নবী এসেছিলেন, যাঁরা সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এমনকি তারা যে নিদর্শনের দাবি করছে, সেটিও কিছু নবীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো- তারা সেই নবীদের প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁদের হত্যা করেছে অথবা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। নবী হত্যা ছিল তাদের সত্যবিমুখতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যারা সত্যকে ভালোবাসে, তারা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না।
(গ) মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা যখন বলেন- “যদি তোমরা সত্যবাদী হও”, তখন এটি কোনো সাধারণ শর্ত নয়; বরং তাদের মিথ্যা দাবি ও ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচনের এক কঠোর ঘোষণা। কারণ তারা দাবি করেছিল- নির্দিষ্ট এক নিদর্শন ছাড়া তারা কোনো রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে না। অথচ বাস্তবতা হলো, তাদের কাছে এমন বহু রাসূল এসেছিলেন, যাঁরা স্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঈমান আনার পরিবর্তে সেই নবীদের হত্যা করেছে বা হত্যার পথ প্রশস্ত করেছে। সুতরাং আল্লাহর এই শর্তমূলক বাক্যটি আসলে একটি তিরস্কার, যা প্রমাণ করে যে তাদের সমস্যা প্রমাণের অভাবে নয়, বরং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ, অহংকার ও অন্তরের বিকৃতির কারণে। কারণ প্রকৃত সত্যবাদীরা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না। আর ঈমানের নামে অজুহাত দাঁড় করিয়ে তারা নিজেদের মিথ্যাচারকেই প্রকাশ করে দিয়েছে।
৩। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সমর্থন ও সান্ত¦না দিয়েছেন। মানুষ যখন তাঁর ওপর অবিশ্বাস ও অপবাদ আরোপ করত, তখন আল্লাহ তাঁকে স্মরণ করাতেন যে এ ঘটনা নতুন নয়, বরং আগের নবীদের সাথেও এমনই ঘটেছে। ১৮৪ নং আয়াতের মাধ্যমেও তার হৃদয়ে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি যোগানো হয়েছে। নিম্নের ব্যাখ্যায় আয়াতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরব:
প্রথমত, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর ওপর আরোপিত মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। সত্যের দাওয়াত সব যুগেই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে কাফিরদের পক্ষ থেকে “মিথ্যাবাদী” বলাকে নবুওয়াতের পথে অস্বাভাবিক কিছু মনে করার কারণ নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) মানসিকভাবে দৃঢ় করেন এবং তাঁর অন্তরের ভার লাঘব করেন। এ সম্পর্কে আরো অনেক আয়াত ও হাদীস এসেছে, যেমন একটি আয়তে এসেছে-
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের উপর ধৈর্য ধারণ করেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।
আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ ۚ مَا يَأْتِيهِم مِّن رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ﴾ [سورة يس: ৩০].
অর্থ: “আফসোস বান্দাদের জন্য! তাদের কাছে যখনই কোনো রাসূল এসেছে, তারা তাকে উপহাস করেছে” (সূরাতু ইয়াসিন: ৩০) । এছাড়াও সূরাতু আল-আনয়াম-এর ১১২ নং আয়াত এবং সূরাতু আল-ফোরক্বান এর ৩১ নং আয়াতে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে একটি প্রশিদ্ধ হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءً الْأَنْبِيَاءُ، ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ” (سنن الكبرى للنسائي: ৭৪৪০).
অর্থ: “মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষায় পড়েন নবীগণ; এরপর যারা তাদের ন্যায়পরায়ণতায় নিকটবর্তী” (সুনান আল-কুবরা লিন-নাসায়ী: ৭৪৪০)।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ পূর্ববর্তী রাসূলদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেন। তাঁর আগেও বহু নবী এসেছেন, যাঁরা সমাজকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছিলেন; অথচ তাঁদেরকেও মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) একা নয়; বরং তিনি নবীদের সেই সম্মানিত ধারাবাহিকতার অন্তর্ভূক্ত, যাঁদের পথ কঠিন হলেও তাঁদের দাওয়াত ছিল নির্ভুল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।
তৃতীয়ত, আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে পূর্ববর্তী রাসূলগণ কেবল সাধারণ আহ্বান নিয়ে আসেননি; তাঁরা এসেছিলেন সুস্পষ্ট নিদর্শন, সহীফা এবং উজ্জ্বল আসমানী কিতাবসহ। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে প্রমাণের কোনো অভাব ছিল না। তবুও ইহুদীরা তা অস্বীকার করেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তাদের কুফর ও প্রত্যাখ্যান দাওয়াতের দুর্বলতার কারণে নয়, বরং তাদের অন্তরের অন্ধত্ব ও অহংকারের ফল।
চতুর্থত, এই আয়াত দাওয়াতের দায়িত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে। রাসূলুল্লাহর (সা.) দায়িত্ব ছিল সত্যের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া; মানুষের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা বা না করা তাঁর দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়। সুতরাং মানুষের ঈমান না আনা কোনোভাবেই নবীর দাওয়াতি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে না। এই উপলব্ধি দাওয়াতদাতার জন্য গভীর প্রশান্তি বয়ে আনে। এ সম্পর্কে কোরআনে অনেক আয়াতে এসেছে, যেমন:
﴿مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ﴾ [سورة المائدة: ৯৯].
অর্থ: “রাসূলের উপর দায়িত্ব কেবল (আল্লাহর বার্তা) পৌঁছে দেওয়া; আর তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর, আল্লাহ তা সবই জানেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ৯৯) । এছাড়াও সূরাতু আন-নাহল এর ৮২, সূরাতু ইয়সিন এর ১৭, সূরাতু আল-ক্বাসাস এর ৫৬, এবং সূরাতু আল-বাক্বারা এর ২৭২ নং আয়াতসমূহে এ সম্পর্কে আলোচন এসেছে।
বিদায়ী হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: ‘আমি কি তোমাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছাতে পেরেছি’, সকলে সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন- ‘হ্যা’, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এটি প্রমাণ করে- রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দায়িত্বের সফলতা মাপতেন বার্তা পৌঁছেছে কি না, তা দিয়ে; মানুষ মানল কি না, তা দিয়ে নয়।
পঞ্চমত, এই আয়াতের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো ধৈর্য ও অবিচলতা। সত্যের পথে চলতে গিয়ে কষ্ট, অপবাদ ও বিরোধিতা অনিবার্য। তবে এগুলোই নবীদের পথের বাস্তবতা। এই উপলব্ধি রাসূলুল্লাহকে (সা.) সবরে জামিলের পথে অটল থাকতে সহায়তা করে এবং তাঁর হৃদয়ে এই দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে যে শেষ পরিণতি সত্য ও হকের পক্ষেই থাকবে। এ সম্পর্কে অন্য একটি আয়াতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّىٰ أَتَاهُمْ نَصْرُنَا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের ওপর ধৈর্য ধারণ করেছে, অবশেষে তাদের কাছে আমার সাহায্য এসে পৌঁছেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কোনো কটুক্তি, অপবাদ বা সন্দেহপূর্ণ কথা থেকে বিরত থেকে বিশুদ্ধ আকিদার ওপর অটল থাকা।
(খ) জুলুম, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণ থেকে নিজেকে দূরে রেখে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।
(গ) আখিরাতের জবাবদিহি ও কঠিন শাস্তির কথা স্মরণ করে নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও তওবার অভ্যাস গড়ে তুলা।
(ঘ) সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে বিরোধিতা ও কষ্ট এলে নবীদের পথ অনুসরণ করে ধৈর্য ও অবিচলতা অবলম্বন করা।
(ঙ) মানুষের প্রতিক্রিয়াকে সাফল্যের মানদন্ড না বানিয়ে দায়িত্ববোধের সঙ্গে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়াকেই নিজের সাফল্য হিসেবে গ্রহণ করা।

error: Content is protected !!