﴿وَآتُوا الْيَتامى أَمْوالَهُمْ وَلا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلا تَأْكُلُوا أَمْوالَهُمْ إِلى أَمْوالِكُمْ إِنَّهُ كانَ حُوباً كَبِيراً (2)﴾ [سورة النساء: 2].
আলোচ্যবিষয়: ইসলামে এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা|
আয়াতের সরল অনুবাদ:
তোমরা এতিমদের তাদের প্রাপ্য সম্পদ যথাযথভাবে ফিরিয়ে দাও| নিজেদের নিম্নমানের সম্পদের পরিবর্তে তাদের উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ করো না এবং তাদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে অন্যায়ভাবে ভোগ করো না| নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বড় গুনাহ|
আয়াতের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী আয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়ার পর এ আয়াতে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ সমাজের আরেকটি দুর্বল ও অসহায় শ্রেণি—এতিমদের অধিকার সংরক্ষণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন| কারণ পিতৃহীন হওয়ার ফলে এতিম শিশুরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হয় না| তাই অনেক সময় তাদের অভিভাবক যেমন চাচা, দাদা কিংবা নিকটাত্মীয়রা তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সম্পদ আত্মসাৎ করে বা নানা কৌশলে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে| আল্লাহ তা‘আলা এ ধরনের অন্যায় আচরণের কঠোর নিন্দা করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন যে, এতিমরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সক্ষম হবে, তখন তাদের সম্পদ পূর্ণরূপে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে| এছাড়া আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অভিভাবকরা যেন নিজেদের নিম্নমানের বা কম মূল্যবান সম্পদের বিনিময়ে এতিমদের উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান সম্পদ গ্রহণ না করে| জাহিলিয়াত যুগে অনেকেই এমন প্রতারণামূলক কাজ করত; তারা এতিমের ভালো সম্পদ নিয়ে নিজেদের খারাপ সম্পদ তার স্থলে রেখে দিত| ইসলাম এ ধরনের সকল অন্যায় লেনদেন নিষিদ্ধ করেছে|
একইভাবে আল্লাহ তা‘আলা এতিমদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে অন্যায়ভাবে ভোগ করতেও নিষেধ করেছেন| কারণ এতে ধীরে ধীরে এতিমের সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার এবং তার হক বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে| ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমের সম্পদ আমানত¯^রূপ; তাই তা রক্ষা করা এবং যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অভিভাবকের দায়িত্ব|
এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা আয়াতের শেষাংশে এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করেছেন| কেননা এটি শুধু আর্থিক অন্যায় নয়; বরং একজন অসহায় ও অধিকারহীন মানুষের ওপর জুলুম| তাই একজন সত্যিকার মুমিন অভিভাবকের কর্তব্য হলো এতিমের সম্পদকে নিজের সম্পদের চেয়েও বেশি সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা এবং যথাসময়ে তা তার প্রকৃত মালিকের নিকট হস্তান্তর করা| (আল্লাহই সর্বাধিক অবগত)| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৫; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৮-২২৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১২৫) |
আয়াতের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿الْيَتامى﴾ “এতিমগণ”| এটি ‘ইয়াতিম’ (يتيم)-এর বহুবচন এবং ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য| ‘ইয়াতিম’ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যার পিতা তার বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন (আইসার আল-তাফাসীর, আল-জাযায়েরী, ১/৪৩৪)| এ সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির পিতা যদি তার বালেগ বা প্রপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন, অথবা কোনো ইয়াতিম বালেগ হয়ে যায়, তবে তাকে আর ‘ইয়াতিম’ বলা হয় না|
এখন প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে কীভাবে অভিভাবকদেরকে এতিমদের ধন-সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ অপ্রাপ্তবয়স্ক এতিম শিশুর হাতে তো সম্পদ হস্তান্তর করা যায় না? এর উত্তর হলো, এখানে বালেগ ও সম্পদ পরিচালনায় সক্ষম হওয়ার পর তাদের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে| বিষয়টি পরবর্তী পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতের আলোচনায় আরও স্পষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ| মূলত এখানে ‘এতিমগণ’ শব্দটি তাদের পূর্ববর্তী অবস্থার বিবেচনায় ব্যবহার করা হয়েছে| অর্থাৎ, যারা একসময় এতিম ছিল এবং বর্তমানে বালেগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সক্ষম হয়েছে, তাদেরকে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| বালাগাতের পরিভাষায় এটিকে ্রمجاز مرسل باعتبار ما كانগ্ধ বলা হয় (তাফসীর আল-মুনীর, ওয়াহবা আয-যুহাইলী, ৪/২২৭)| অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির বর্তমান অবস্থাকে তার পূর্ববর্তী পরিচয়ের মাধ্যমে উল্লেখ করা| এর একটি সহজ উদাহরণ হলো— কোনো ব্যক্তি আগে ছাত্র ছিল, পরে শিক্ষক হয়েছে; কিন্তু কখনো কখনো তাকে তার পূর্ব পরিচয়ের কারণে ‘ছাত্র’ বলেই উল্লেখ করা হয়| তেমনি এ আয়াতে ‘এতিম’ বলা হলেও উদ্দেশ্য হলো সেই সব ব্যক্তি, যারা একসময় এতিম ছিল এবং বর্তমানে বালেগ হয়েছে| সুতরাং আয়াতটির মূল শিক্ষা হলো, কোনো এতিম বালেগ ও বিচক্ষণ হয়ে গেলে তার সম্পদ আর অভিভাবকের কাছে রেখে দেওয়া ˆবধ নয়; বরং যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের পর তার সম্পদ তার নিকট হস্তান্তর করা আবশ্যক| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
﴿وَلا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ﴾ ‘তোমরা হারামকে হালাল দ্বারা পরিবর্তন করো না’, আয়াতাংশে দুইটি আরবী শব্দ “الخبيث” অর্থ হারাম এবং “الطيب” অর্থ হালাল| তবে এখানে এ দু’টি শব্দ দ্বারা যথাক্রমে নিকৃষ্ট ও উৎকৃষ্ট সম্পদ বোঝানো হয়েছে| অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের নিম্নমানের সম্পদের পরিবর্তে এতিমদের উত্তম সম্পদ গ্রহণ করো না| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৪) |
পূর্বাপর আয়াতের পারস্পরিক সম্পর্ক:
আল্লাহ তা‘আলা এ সূরার শুরুতে বান্দার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও বিধানসমূহের কথা উল্লেখ করেছেন, যাতে সে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর অসন্তোষ ও শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে| এরপর তিনি এসব বিধানের বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা করতে শুরু করেছেন| এর মধ্যে প্রথমটি হলো— এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া| দ্বিতীয়টি হলো— কতজন স্ত্রী পর্যন্ত বিবাহ করা ˆবধ এবং কখন একজন স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক, সে বিধান| আর তৃতীয়টি হলো— স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর যথাযথভাবে প্রদান করা| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৭৯)|
আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
মুকাতিল ও কালবী (রহ.) বলেন, এ আয়াতটি গাতাফান গোত্রের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়েছিল| তার কাছে তার এক এতিম ভাতিজার বিপুল পরিমাণ সম্পদ আমানত হিসেবে ছিল| যখন এতিমটি বালেগ হলো, তখন সে তার সম্পদ ফেরত চাইলো| কিন্তু তার চাচা তা দিতে অ¯^ীকার করল| এরপর তারা বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিচার প্রার্থনা করল| তখন এ আয়াত নাযিল হলো| আয়াতটি শুনে চাচা বলল, “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলাম| আমরা মহাপাপ থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি”| এরপর সে ভাতিজার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দিল| তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “যে ব্যক্তি নিজের কৃপণতা থেকে আত্মরক্ষা করে এবং এভাবে হকদারের হক ফিরিয়ে দিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে তাঁর আবাসস্থলে প্রবেশ করাবেন”| অর্থাৎ, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন| অতঃপর যুবকটি তার সম্পদ বুঝে পেয়ে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে শুরু করল| তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “সওয়াব নিশ্চিত হয়ে গেছে, কিন্তু গুনাহ রয়ে গেছে”| সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বুঝলাম যে সওয়াব নিশ্চিত হয়েছে; কিন্তু গুনাহ কীভাবে রয়ে গেল, অথচ সে তো আল্লাহর পথে ব্যয় করছে?” রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “সওয়াবটি ছেলেটির জন্য নিশ্চিত হয়েছে, আর গুনাহটি তার পিতার ওপর রয়ে গেছে” (আসবাবুন নুযূল, ওয়াহেদী: ৮১) | অর্থাৎ, পিতা জীবদ্দশায় সম্পদ এমনভাবে উপার্জন বা রেখে গিয়েছিলেন, যাতে তার ওপর দায় ও গুনাহ ছিল| কিন্তু ছেলে যখন সেই সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেছে, তখন সে তার নেকির অধিকারী হয়েছে; তবে পিতার গুনাহ ¯^য়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়নি| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
আয়াতের শিক্ষা:
১| এ আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করলে তাদের অভিভাবক, যেমন চাচা, দাদা কিংবা অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন এতিমদের সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেন এবং তাদের সম্পদের ব্যাপারে সব ধরনের অন্যায়, প্রতারণা ও আত্মসাৎ থেকে বিরত থাকেন| এর মাধ্যমে ইসলাম এতিমদের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| এখানে ইয়াতিমের ধন-সম্পদের ব্যাপারে অভিভাবকদের তিনটি নির্দেশনা এবং একটি সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে-
(ক) এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, আল্লাহ তা‘আলা অভিভাবকদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, এতিমরা যখন বালেগ হবে এবং নিজেদের সম্পদ সঠিকভাবে পরিচালনা করার যোগ্যতা অর্জন করবে, তখন তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে| এতিমের সম্পদ অভিভাবকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; বরং তা একটি আমানত| তাই কোনো অজুহাতে তাদের সম্পদ আটকে রাখা বা হস্তান্তরে গড়িমসি করা ˆবধ নয়| এ নির্দেশনার মাধ্যমে ইসলাম এতিমদের আর্থিক অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে|
(খ) নিকৃষ্ট সম্পদের বিনিময়ে উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ না করা, জাহিলিয়াত যুগে কিছু অভিভাবক এতিমদের মূল্যবান সম্পদের পরিবর্তে নিজেদের নিম্নমানের বা কম মূল্যবান সম্পদ দিয়ে দিত| ফলে এতিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং অভিভাবকরা অন্যায়ভাবে লাভবান হতো| আল্লাহ তা‘আলা এ ধরনের প্রতারণামূলক লেনদেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন| এর মাধ্যমে তিনি শিখিয়েছেন যে, দুর্বল ও অসহায় মানুষের সম্পদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সততা ও ন্যায়পরায়ণতা অবল¤^ন করতে হবে|
(গ) এতিমদের সম্পদ নিজের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে অন্যায়ভাবে ভোগ না করা, অভিভাবকদেরকে এতিমদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে আত্মসাৎ করা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে| যদিও শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ও হিসাবের ভিত্তিতে এতিমের সম্পদ পরিচালনা করা যেতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম হতে পারে না| কারণ এতিমের সম্পদ একটি আমানত, আর আমানতের খিয়ানত ইসলামে গুরুতর অপরাধ|
(ঘ) সতর্কবাণী— এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা মহাপাপ, আয়াতের শেষে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন যে, এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা “حُوبًا كَبِيرًا” অর্থাৎ এক মহাপাপ| এটি শুধু মানুষের অধিকার নষ্ট করার অপরাধই নয়; বরং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনেরও শামিল| তাই একজন মুমিনের উচিত এতিমদের সম্পদের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা, তাদের হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় রাখা| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
২| আয়াত সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়েল:
প্রশ্ন-(ক): অত্র আয়াতে অভিভাবকদেরকে এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; তবে কখন তা হস্তান্তর করতে হবে, সে বিষয়ে এখানে কোনো বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি| অনুরূপভাবে, পঞ্চম আয়াতে যেসব এতিম সম্পদ পরিচালনায় অদক্ষ বা বিচক্ষণতা অর্জন করেনি, তাদের ভরণ-পোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তাদের হাতে সম্পদ হস্তান্তর করতে নিষেধ করা হয়েছে| এখন প্রশ্ন হলো— এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত সময় কখন?
এর উত্তরে অত্র সূরার ৬ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, এতিমদের মধ্যে সম্পদ পরিচালনার যোগ্যতা (রুশদ) দেখা গেলে তবেই তাদের সম্পদ তাদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে| অর্থাৎ, যখন অভিভাবকগণ নিশ্চিত হবেন যে, তারা বালেগ হয়েছে, সম্পদ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং ভালো-মন্দের বিচার-বিবেচনা করতে পারে, তখন তাদের সম্পদ যথাযথভাবে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩০) |
প্রশ্ন-(খ): আর ইয়াতিম যদি এমন হয় তার বয়স বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু সম্পদ পরিচালনার দক্ষতা আসছে না, অথবা ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারছে না| সে ক্ষেত্রে করণীয় কি?
এর জবাব অত্র সূরার ছয় ন¤^র আয়াতের প্রথমাংশে রয়েছে| সেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা ইয়াতিমদেরকে বিয়ের বয়েসে উপনীত হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা করতে থাকবে| অতঃপর তাদের মধ্যে সম্পদ পরিচর্যার যোগ্যতা পরিলক্ষিত হলে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবে| এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত হলো-
ইমাম জাসসাস (রহ.) ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতামত উল্লেখ করেছেন| তাঁর মতে, কোনো এতিম ব্যক্তি যদি পঁচিশ বছর বয়সে উপনীত হয়, তবে সে বিচক্ষণতার প্রমাণ না দিলেও তার সম্পদ তার কাছে হস্তান্তর করতে হবে| কারণ, এ বয়সে পৌঁছার পর “তোমরা ইয়াতিমদেরকে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও” আয়াতের সাধারণ নির্দেশ কার্যকর হবে| তবে পঁচিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেবল তখনই সম্পদ দেওয়া যাবে, যখন তার মধ্যে বিচক্ষণতা ও সম্পদ পরিচালনার যোগ্যতা দেখা যাবে| এ বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে| (আহকাম আল-কোরআন, জাচ্ছাছ: ২/৪৯) | ইমাম আবু হানীফা (রহ.) আরও বলেন, পঁচিশ বছর বয়সে একজন ব্যক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সে দাদা হওয়ারও উপযুক্ত হতে পারে| সুতরাং এ বয়সে পৌঁছার পরও তাকে ‘এতিম’ বলে সম্পদ আটকে রাখা যুক্তিসঙ্গত নয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩০) |
ইমাম আবু হানিফার (রহ) এ মতের জবাবে ইবনুল আরাবী (রহ.) বলেন, পঁচিশ বছর বয়স নির্ধারণ করার পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল নেই| বিশেষ করে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নিজেই মনে করেন যে, শরীয়তের নির্ধারিত সীমা (মুকাদ্দারাত) কিয়াসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না; বরং কেবল কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়| অথচ এ বিষয়ে এমন কোনো স্পষ্ট দলিল নেই, আর অর্থগত দিক থেকেও এ মতকে সমর্থন করার মতো শক্তিশালী ভিত্তি পাওয়া যায় না| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৩০) |
ড. ওয়াহবাহ আয-যুহাইলী (রহ.) সকল ফকীহ-এর মতের সমš^য় করে বলেন:
(ক) এতিম যখন সম্পদ পরিচালনার উপযুক্ত যোগ্যতা (রুশদ) অর্জন করবে, তখন তার সম্পদ তার কাছে হস্তান্তর করা আবশ্যক| এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়স নয়; বরং সম্পদ পরিচালনায় সক্ষমতা ও বিচক্ষণতাই মূল বিবেচ্য|
(খ) প্রয়োজন ছাড়া এতিমের সম্পদ ভোগ করা বা অন্য কোনোভাবে তা থেকে উপকৃত হওয়া হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ| তবে অভিভাবক যদি দরিদ্র হন, তাহলে অত্র সূরার ৬ ন¤^র আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী এতিমের সম্পদ পরিচালনা ও পরিচর্যার বিনিময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত পরিমাণে তা থেকে গ্রহণ করতে পারবেন| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَنْ كانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ، وَمَنْ كانَ فَقِيراً فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ﴾ [سورة النساء: ৬].
অর্থ- “যে ধনী, সে যেন বিরত থাকে; আর যে দরিদ্র, সে যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে (প্রয়োজন অনুযায়ী) ভোগ করে|” (সূরাতু আন-নিসা: ৬)| (তাফসীর আল-মুনীর, আয-যুহাইলী, ৪/২৩০)|
৩| আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এতিমদের অধিকার, তাদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং তাদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন| এ বিষয়ে বিশেষভাবে সূরা আন-নিসার ৬ ও ১০ ন¤^র আয়াত, সূরা আল-আন‘আমের ১৫২ ন¤^র আয়াত, সূরা আল-ইসরার ৩৪ ন¤^র আয়াত এবং সূরা আল-বাকারার ২২০ ন¤^র আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে|
আয়াতের করণীয় (আমল):
(ক) অভিভাবকদের উচিৎ এতিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের জান-মাল ও ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবল¤^ন করা এবং তাদের সম্পদের ব্যাপারে কোনো প্রকার অন্যায়, প্রতারণা বা আত্মসাৎ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা|
(খ) এতিমদের সম্পদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত হিসেবে গণ্য করা| তারা বালেগ ও সম্পদ পরিচালনায় সক্ষম হলে কোনো প্রকার বিল¤^ না করে তাদের সম্পদ যথাযথভাবে তাদের কাছে হস্তান্তর করা|
(গ) এতিমের সম্পদ পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে তা কেবল তাদের কল্যাণ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য ব্যবহার করা| ব্যক্তিগত ¯^ার্থে বা অবৈধভাবে তাদের সম্পদ থেকে কোনো ধরনের সুবিধা গ্রহণ না করা|
(ঘ) সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে, এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা কবীরা গুনাহ| তাই এ বিষয়ে আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখা, তাঁর বিধান মেনে চলা এবং কিয়ামতের জবাবদিহির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা|
