Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯৬-২০০) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফির, মুত্তাকি ও আহলে কিতাবী মুমিনদের অবস্থা ও তাদের পরিণাম|

﴿لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ (196) مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ (197) لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ (198) وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ (199) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (200)﴾ [سورة آل عمران: 196-200).

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: কাফির, মুত্তাকি ও আহলে কিতাবের মুমিনদের অবস্থা ও তাদের পরিণাম|

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৯৬| হে নবী! কাফিরদের দেশ-দেশান্তরে অবাধ বিচরণ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে|
১৯৭| এগুলো সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র| অতঃপর তাদের আবাস হবে জাহান্নাম| আর তা কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল!
১৯৮| কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত| তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে| এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য সম্মানজনক আপ্যায়ন| আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য অনেক উত্তম|
১৯৯| আর নিশ্চয় আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর প্রতি, তোমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি এবং তাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার প্রতিও ঈমান আনে| তারা আল্লাহর সামনে বিনীত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে না| তাদের জন্য তাদের রবের নিকট প্রতিদান রয়েছে| নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী|
২০০| হে ঈমানদারগণ! তোমরা ˆধর্য ধারণ করো, ˆধর্যে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করো, সতর্ক ও প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো|

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
(১৯৬,১৯৭) আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের দাঈদের তাদের নবী মোহাম্মদের (সা.) ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সতর্ক করে দিচ্ছেন, যেন কাফির, মুশরিক ও বিপর্যয়সৃষ্টিকারীদের ভোগ-বিলাস, উপার্জন, লাভ-লোকসান এবং তাদের ভোজন, পানাহার ও বাহ্যিক সুখ-সম্ভোগ দেখে তারা প্রতারিত না হয়| যেন তারা এমন মনে না করে যে, এরা সত্যপথে আছে, অথবা আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট নয়, বরং সন্তুষ্ট| মোটেই তা নয়| এগুলো দুনিয়ার সামান্য ভোগমাত্র; অতঃপর তাদের প্রত্যাবর্তন হবে নিকৃষ্টতম আশ্রয়ের দিকে| সেটি হলো জাহান্নাম, যেখানে পৌঁছার পথ তারা শিরক ও গুনাহের মাধ্যমে নিজেরাই প্রস্তুত করেছে| কতই না নিকৃষ্ট সেই আবাস, যা তারা নিজেদের জন্য প্রস্তুত করেছে|
(১৯৮) আগের আয়াতে কাফিরদের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছিল- জাহান্নাম, যা নিকৃষ্টতম পরিণতি| আর এই আয়াতে মুমিনদের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে, যা উত্তম পরিণতি| তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত| আল্লাহর নিকট যে চিরস্থায়ী নেয়ামত রয়েছে, তা ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারীদের জন্য দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম| সুতরাং তারা দরিদ্র হলেও কোনো ক্ষতি নেই|
(১৯৯) এই আয়াতে কিছু মুনাফিকের কথার জবাব দেওয়া হয়েছে| তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের নিন্দা করেছিল, যখন তারা নাজ্জাসী-এর মৃত্যুর পর তাঁর জানাযার সালাত আদায় করেন| তারা বলেছিল, “দেখো, মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা এমন এক বিদেশির জানাযা পড়ছে, যে তাদের দেশে মারা যায়নি এবং তাদের ধর্মেরও ছিল না”| এভাবে তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুমিনদের প্রতি কটাক্ষ করতে চেয়েছিল| আল্লাহ তা’আলা তাদের জবাবে বলেন, আহলে কিতাব, অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যেও এমন লোক আছে, যারা আল্লাহর প্রতি, মুমিনদের ওপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি, এবং তাদের নিজেদের ওপর নাযিল হওয়া তাওরাত ও ইনজিলের প্রতিও ঈমান আনে| তারা আল্লাহর সামনে বিনীত, অনুগত ও ইবাদতকারী| তারা অন্য অনেক ইহুদি-খ্রিস্টানের মতো আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্য পার্থিব ¯^ার্থ গ্রহণ করে না; তারা আল্লাহর বাণী বিকৃতি করে না, গোপনও করে না| এই গুণগুলো কিছু কিছু ইহুদী-খ্রিষ্টানদের মধ্যেও পাওয়া যায়| এদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম এবং খ্রিস্টানদের মধ্যে নাজ্জাসী| আহলে কিতাবের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন এবং আল্লাহর সম্মান ও অনুগ্রহের উপযুক্ত| আল্লাহ তা’আলা তাদের সম্পর্কে বলেন: “তাদের জন্য তাদের রবের কাছে প্রতিদান রয়েছে”| কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন| নিশ্চয় আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী| তিনি সমগ্র সৃষ্টির হিসাব দুনিয়ার অর্ধ দিনের সমপরিমাণ সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করবেন|
(২০০) এ আয়াতে উম্মতের জন্য এক মহামূল্যবান উপদেশ রয়েছে| তাদেরকে আহ্বান করা হয়েছে- তারা যেন ইবাদতে ˆধর্যশীল হয়, বিপদ-মুসিবতে অবিচল থাকে, শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ় থাকে, যতক্ষণ না শত্রুরা সত্য গ্রহণ করে অথবা মুসলিমদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়| তাদেরকে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- তারা যেন সীমান্তে সদা প্রস্তুত থাকে, নিজেদের শক্তি ও সামরিক উপকরণ দ্বারা শত্রুকে ভীত রাখে, যাতে তারা মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণের সাহস না পায়| আর সর্বোপরি, আল্লাহভীতি অবল¤^ন করতে বলা হয়েছে; কারণ তাকওয়াই তাদের বিজয় ও সফলতার প্রধান কারণ|
এই মহান রব্বানী দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই সূরাতু আলে-ইসরান সমাপ্ত হয়েছে, যা একটি বরকতময় সূরা এবং হিকমত ও বিধানে পরিপূর্ণ| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩০-৪৩১; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৪-২১৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৬; আল-মুনতাখাব: ১/১২২-১২৩) |

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَا يَغُرَّنَّكَ﴾ “যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে”, এ আয়াতাংশে ‘তোমাকে’ দ্বারা কাকে স¤ে^াধন করা হয়েছে? এ বিষয়ে অধিকাংশ তাফসীরকারকের মত হলো- এখানে বাহ্যত রাসূলুল্লাহকে স¤ে^াধন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে উদ্দেশ্য সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং সমগ্র উম্মত|
সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ হলো- কাফেরদের বাহ্যিক প্রাচুর্য, শক্তি-সামর্থ্য ও জাগতিক সফলতা যেন মুমিনদেরকে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না করে| (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৯৬) |
কারণ তাফসীরশাস্ত্রে সাধারণ নীতি হলো-
“خطابُ النبيِّ ﷺ خطابٌ لأمته ما لم يدلَّ دليلٌ على التخصيص”.
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহকে করা স¤ে^াধন মূলত তাঁর উম্মতের প্রতিও প্রযোজ্য, যতক্ষণ না বিশেষ কোনো দলিল সেটিকে কেবল তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে| (আল-ইতক্বান ফি উলূম আল-কোরআন, সুয়ূতী: ৩/২৩৩-২৩৪) |
﴿تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ﴾ ‘দেশ-বিদেশে কাফেরদের অবাধ বিচরণ’, আয়াতাংশের অর্থ হলো- দেশ-বিদেশে তাদের চলাফেরা ও ব্যবসা-বানিজ্য, কৃষিকাজ, ধনসম্পদের বিস্তার এবং ভোজন ও পানাহারের মাধ্যমে নানরকম ভোগ-বিলাশে মত্ত থাকা| (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১১৭) | সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে- কাফিরদের বিভিন্ন অঞ্চলে অবাধ বিচরণ, অর্থনৈতিক সাফল্য, আরাম-আয়েশ ও বাহ্যিক সমৃদ্ধি দেখে যেন কেউ প্রতারিত না হয়| এগুলো স্থায়ী সাফল্যের প্রমাণ নয়, বরং দুনিয়ার সাময়ীক ভোগমাত্র| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
﴿مَتاعٌ قَلِيلٌ﴾ “সামান্য ভোগ-সামগ্রী”, এর দ্বারা এমন সামান্য ভোগ-সামগ্রীকে বোঝানো হয়েছে, যার দ্বারা মানুষ দুনিয়াতে অল্প সময়ের জন্য উপকৃত ও আনন্দিত হয়; অতঃপর তা ধ্বংস হয়ে যায় ও বিলীন হয়ে পড়ে| এটিকে ‘সামান্য’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে; কারণ এটি ¯^ল্পস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী| আর যা কিছু ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিলীনশীল, তা-ই প্রকৃতপক্ষে অল্প ও তুচ্ছ| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৩) | অর্থাৎ, কাফেরদের ধন-সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস দেখে মুমিনদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়| কারণ এসব নেয়ামত চিরস্থায়ী নয়; বরং খুব অল্প সময়ের জন্য| পরকালের অনন্ত জীবনের তুলনায় দুনিয়ার সমস্ত ভোগ-বিলাসই নগণ্য ও তুচ্ছ| আল্লাহই ভালো জানেন|
﴿وَصَابِرُوا﴾ “এবং ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করো”, আল্লাহর শত্রুদের মোকাবেলায়, বিশেষত জিহাদের ময়দানে তোমরা ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করো| অর্থাৎ, যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের চেয়ে অধিক দৃঢ়তা ও ˆধর্যের পরিচয় দাও; যেন তোমরা তাদের তুলনায় কম ˆধর্যশীল না হও| এখানে সাধারণভাবে ‘সবর’ করার নির্দেশ দেওয়ার পর বিশেষভাবে “وَصَابِرُوا” বলা হয়েছে; কারণ শত্রুর মোকাবেলায় অবিচল থাকা, যুদ্ধের কষ্ট সহ্য করা এবং সত্যের ওপর দৃঢ় থাকা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য বিষয়| (তাফসীর ইবনু কামাল বাশা: ২/৪৬৩) | অর্থাৎ, মুমিনদের শুধু নিজে ˆধর্য ধারণ করলেই চলবে না; বরং বাতিল শক্তির মোকাবেলায় ˆধর্য, সাহস ও দৃঢ়তায় তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও রাখতে হবে| আল্লাহই ভালো জানেন|
﴿وَرَابِطُوا﴾ “এবং শত্রুর বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত থাক”, এর অর্থ হলো- তোমরা সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা চৌকিগুলোতে অবস্থান করো, সেখানে নিজেদের অশ্ব (যুদ্ধের প্রস্তুতি) বেঁধে সদা সতর্ক ও প্রহরারত থাকো এবং শত্রুর মোকাবেলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকো| এখানে “রিবাত” শব্দটি মূলত সীমান্ত পাহারা দেওয়া, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং ইসলামী ভূখণ্ড রক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে| (তাফসীর ইবনু কামাল বাশা: ২/৪৬৩) | অর্থাৎ, মুমিনদের শুধু আভ্যন্তরীণভাবে ˆধর্যশীল হলেই চলবে না; বরং দ্বীনের নিরাপত্তা, মুসলিম সমাজের সুরক্ষা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বদা সজাগ, সংগঠিত ও প্রস্তুত থাকতে হবে| আল্লাহই ভালো জানেন|

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াত তথা ১৯৫ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা যখন মুমিনদের জন্য মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেন, তখন তাদের বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে, তারা দুনিয়াতে অধিকাংশই দরিদ্র ও কষ্টে জীবনযাপন করত; পক্ষান্তরে কাফেররা ভোগ-বিলাস, প্রাচুর্য ও ¯^াচ্ছন্দ্যের মধ্যে ছিল| তাই এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এমন একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যা মুমিনদের সান্তনা দেয় এবং তাদেরকে সেই কষ্ট ও দারিদ্র্যের ওপর ˆধর্য ধারণে সহায়তা করে| আর তা হলো- দুনিয়ার নিয়ামত ও আখিরাতের নিয়ামতের মধ্যে তুলনা করা| কারণ দুনিয়ার সব সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য ক্ষণস্থায়ী, একদিন তা শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আখিরাতের নিয়ামত চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর ও অনন্তকাল স্থায়ী থাকবে| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৪) |

১৯৬ এবং ১৯৯ নম্বর আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
১৯৬ নম্বর আয়াত মক্কার মুশরিকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে| তারা তখন সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করত| ব্যবসা-বাণিজ্য করত এবং নানা ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল| তাদের এ অবস্থা দেখে কিছু মুমিন বললেন, “আমরা তো দেখছি আল্লাহর শত্রুরা কত সুখে-¯^াচ্ছন্দ্যে আছে, আর আমরা ক্ষুধা ও কষ্টে জর্জরিত হয়ে পড়েছি”| এর পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে শান্ত¦না প্রদানের জন্য ১৯৬ ন¤^র আয়াত নাযিল করেন| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২১৩) |
ইমাম নাসাঈ (রহ.) আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন নাজ্জাশী-এর মৃত্যুসংবাদ এলো, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তোমরা তাঁর জানাযার সালাত আদায় করো”| সাহাবিদের কেউ কেউ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি একজন হাবশী (আবিসিনীয়) দাসের জানাযা পড়ব?” তখন আল্লাহ তা‘আলা ১৯৯ ন¤^র আয়াত নাযিল করে মুমিনদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, আহলে কিতাবের মধ্যেও খাটি ঈমানদার থাকতে পারে| একই কথা জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস এবং কাতাদা (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতটি নাজ্জাশী-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল| (লুবাবুন নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৮) |
উল্লেখ্য যে, নাজ্জাশী ছিলেন আবিসিনিয়ার (হাবশার) ন্যায়পরায়ণ রাজা| তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুসলিম মুহাজিরদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন| তাঁর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অনুপস্থিত (গায়েবানা) জানাযা আদায় করেন| এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করেন যে, আহলে কিতাবের সবাই সমান নয়; তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন যারা সত্যকে গ্রহণ করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন|

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯৬-২০০) নং আয়াতসমূহে মানবজাতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির অবস্থা ও পরিণতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও শিক্ষণীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে| এখানে একদিকে কাফিরদের দুনিয়াব্যাপী প্রভাব, সমৃদ্ধি ও ভোগ-বিলাসের মোহময় চিত্র দেখে বিভ্রান্ত না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে| অপরদিকে মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, চিরস্থায়ী জান্নাত এবং মহাসফলতার সুসংবাদ ঘোষণা করা হয়েছে| একই সঙ্গে আহলে কিতাবের মধ্য থেকে যারা সত্যকে চিনে আন্তরিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তাদের ঈমানদারিত্ব, বিনয় ও আল্লাহভীতির প্রশংসা করে তাদের জন্যও মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে| সর্বশেষ আয়াতে মুমিনদেরকে ˆধর্য, দৃঢ়তা, পারস্পরিক সহযোগিতা, আত্মসংযম এবং তাকওয়া অবল¤^নের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে| এভাবে আয়াতগুলো সত্য ও মিথ্যার অনুসারীদের পরিণতির একটি সুস্পষ্ট তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে এবং মুমিনদের জন্য সফলতার চিরন্তন পথরেখা নির্ধারণ করে|
১| ১৯৬ ন¤^র আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে দুনিয়ায় যে প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন, তা দেখে যেন কোনো মুমিন বিভ্রান্ত না হয়| এ বিভ্রান্তি দুইভাবে সৃষ্টি হতে পারে:
প্রথমত: কেউ ধারণা করতে পারে যে, কাফিররা যেহেতু এত উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে, সুতরাং তাদের পথই সঠিক| সে মনে করতে পারে, যদি তাদের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি ভুল হতো, তবে আল্লাহ তাদেরকে এত সুযোগ ও সফলতা দিতেন না|
দ্বিতীয়ত: কেউ তাদের জীবনধারা, চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করতে পারে| সে মনে করতে পারে যে, তাদের ধর্মহীনতা, অবাধ জীবনযাপন বা ইসলামী বিধান থেকে মুক্ত থাকাই তাদের উন্নতির মূল কারণ|
বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এই ভুল ধারণায় আক্রান্ত হয়েছে| তারা মনে করে, পশ্চিমা জাতিগুলো ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই উন্নত হয়েছে| ফলে তারা ইসলামসহ যে কোনো ধর্মীয় অনুশাসনকে পশ্চাদপদতার কারণ মনে করে| অথচ এটি একটি মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা| (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮২) |
এখানে একটি ¯^াভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে- কাফিররা আল্লাহ তা’আলার অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তারা কীভাবে দুনিয়ায় এত সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বাহ্যিক সুখ-¯^াচ্ছন্দ্যের অধিকারী হয়?
এর উত্তর হলো-
(ক) আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে আখিরাতের মহপাকড়াও-এর পূর্বে সাময়ীক অবকাশ প্রদান করেন| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ ۚ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ﴾ [سورة آل عمران: ১৭৮].
অর্থাৎ- “কাফিররা যেন মনে না করে যে, আমি তাদের যে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্য কল্যাণকর| আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি, যাতে তারা আরও পাপে বৃদ্ধি পায়; আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৭৮) |
তিনি আরও বলেন:
﴿سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ ۝ وَأُمْلِي لَهُمْ ۚ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ﴾
অর্থাৎ- “আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে তারা টেরও পাবে না| আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি; নিশ্চয়ই আমার কৌশল অত্যন্ত শক্তিশালী” (সূরাতু আল-কলম: ৪৫), (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮২)|
(খ) আখিরাতের তুলনায় এ দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ তা’আলার কাছে অত্যন্ত নগণ্য, তাই তিনি কাফেরদেরকেও সাময়িকভাবে এর ভোগ-বিলাস ও প্রাচুর্য দান করেন| এ বিষয়ে সহীহ হাদীসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে| রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ” (سنن الترمذي).
অর্থাৎ- “আল্লাহর কাছে যদি দুনিয়ার মূল্য একটি মশার পাখার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফিরকে এ দুনিয়া থেকে এক চুমুক পানিও পান করাতেন না” (সুনানে তিরমিযী) | অর্থাৎ, আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে দুনিয়ায় সম্পদ, ক্ষমতা, সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য বা সমৃদ্ধি দান করেন বলে এটা তাঁর নিকট তাদের মর্যাদার প্রমাণ নয়| বরং দুনিয়া আল্লাহর কাছে এতই তুচ্ছ যে তিনি তা মুমিন-কাফির সবার মাঝেই বণ্টন করেন|
(গ) দুনিয়া আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি নয়; তাই তিনি তা প্রিয়-অপ্রিয় সকলকেই দান করেন, কিন্তু ঈমান ও হিদায়াত দান করেন শুধু তাঁর প্রিয় বান্দাদের| একটি হাদীসে এসেছে-
“إِنَّ اللَّهَ يُعْطِي الدُّنْيَا مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ، وَلَا يُعْطِي الدِّينَ إِلَّا مَنْ أَحَبَّ” (مسند أحمد:).
অর্থাৎ- “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া তাকে দেন যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন; কিন্তু দ্বীন তিনি কেবল তাকেই দান করেন যাকে ভালোবাসেন” (মুসনাদে আহমাদ: ) |
(ঘ) ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, কাফির যদি কোনো ভালো কাজ করে- যেমন দান-সদকা, মানবসেবা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি, তবে আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেন| কারণ আখিরাতে পুরস্কার পাওয়ার জন্য ঈমান শর্ত| এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مُؤْمِنًا حَسَنَةً، يُعْطَى بِهَا فِي الدُّنْيَا وَيُجْزَى بِهَا فِي الْآخِرَةِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُطْعَمُ بِحَسَنَاتِ مَا عَمِلَ بِهَا لِلَّهِ فِي الدُّنْيَا، حَتَّى إِذَا أَفْضَى إِلَى الْآخِرَةِ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَةٌ يُجْزَى بِهَا” (صحيح مسلم: ).
অর্থাৎ- “আল্লাহ মুমিনের কোনো নেক আমলের প্রতি জুলুম করেন না| তাকে এর বিনিময় দুনিয়াতেও দেন এবং আখিরাতেও প্রতিদান দেন| আর কাফির যে ভালো কাজ করে, তার প্রতিদান তাকে দুনিয়াতেই দেওয়া হয়| অতঃপর যখন সে আখিরাতে পৌঁছবে, তখন তার জন্য এমন কোনো নেকি অবশিষ্ট থাকবে না যার প্রতিদান তাকে দেওয়া হবে” (সহীহ মুসলিম) |
তাই বলা যায়: আল্লাহ কাফিরদেরকে কখনো তাদের কিছু ভালো কাজের প্রতিদান হিসেবে দুনিয়ায় সম্পদ, সুখ, সুনাম, ক্ষমতা বা উন্নতি দান করেন| কিন্তু এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়; বরং তাদের নেক কাজের দুনিয়াবি প্রতিদান| আখিরাতের স্থায়ী প্রতিদান লাভের জন্য ঈমান অপরিহার্য|
সুতরাং মুমিনের জন্য প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হলো ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি; কেবল দুনিয়াবি উন্নতি, সম্পদ বা ক্ষমতা নয়| তাই কাফিরদের বাহ্যিক সমৃদ্ধি দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে, আল্লাহর পথে অবিচল থাকা এবং আখিরাতের সফলতাকেই প্রকৃত সফলতা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত| আল্লাহই ভালো জানেন|
২| ১৯৭ ন¤^র আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) এ আয়াতের প্রথমাংশে কাফিরদের দুনিয়াবি উন্নতি, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মুমিনদেরকে ইর্ষাšি^ত না হওয়ার কারণ বর্ণনা পূর্বক তাদেরকে সান্ত¦না প্রদান করা হয়েছে| এখানে বলা হয়েছে যে তাদের এই দুনিয়াবি সমৃদ্ধি ও সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য প্রকৃতপক্ষে খুবই নগণ্য| এটি সময়গত দিক থেকে সামান্য, কারণ মানুষের জীবন সীমিত; কখন মৃত্যু এসে সবকিছুর অবসান ঘটাবে, তা কেউ জানে না| এটি পরিমাণগত দিক থেকেও সামান্য, কারণ পৃথিবীর সব সম্পদ কোনো একজন মানুষের অধীনে থাকে না| এটি গুণগত দিক থেকেও সামান্য, কারণ মানুষ নানা রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ ও বঞ্চনার কারণে অনেক সময় তার অর্জিত সম্পদ ও ভোগ-বিলাস উপভোগই করতে পারে না| সুতরাং কাফিরদের দুনিয়াবি প্রাচুর্য, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাস যত বড়ই মনে হোক না কেন, আখিরাতের অনন্ত জীবনের তুলনায় তা অতি নগণ্য, ক্ষণস্থায়ী এবং তুচ্ছ| পক্ষান্তরে মুমিনের প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে ঈমান, আল্লাহর স্মরণ এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার মধ্যে| (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮৩) |
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে কাফেরদের শেষ পরিণতির বর্ণনা এসেছে| এখানে বলা হয়েছে- “অতঃপর তাদের আবাস হবে জাহান্নাম”| যাদের চূড়ান্ত আবাস জাহান্নাম, তাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই| কারণ তারা কুফরির উপর মৃত্যুবরণ করেছে| এ আয়াতে আরও ইঙ্গিত রয়েছে যে, কাফিররা দুনিয়ায় যে বিপুল ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য উপভোগ করেছে, জাহান্নামের শাস্তি দেখার পর তারা সেসব সম্পূর্ণ ভুলে যাবে| তাদের দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগের কোনো স্মৃতিই আর অবশিষ্ট থাকবে না| এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কিয়ামতের দিন দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী জাহান্নামিকে আনা হবে| অতঃপর তাকে জাহান্নামে মাত্র একবার ডুবিয়ে তোলা হবে| তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘তুমি কি কখনো কোনো সুখ বা কল্যাণ দেখেছ?’ সে বলবে, ‘না, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো সুখ দেখিনি’”| আবার দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টভোগী জান্নাতিকে আনা হবে| তাকে জান্নাতে একবার ডুবিয়ে তোলা হবে| তারপর জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘তুমি কি কখনো কোনো কষ্ট বা দুঃখ দেখেছ?’ সে বলবে, ‘না, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো দুঃখ-কষ্ট দেখিনি’” (সহীহ মুসলিম: ২৮০৭) | (তাফসীর আল-কুরআনুল কারীম, ইবনু উসাইমিন: ২/৫৮৬) | এগুলো এমন বাস্তব সত্য, যেগুলোর প্রতি আমরা ঈমান রাখি; কিন্তু দুনিয়ার ব্যস্ততা, গাফিলতি ও মোহ অনেক সময় আমাদের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে| তাই মুমিনের উচিত সর্বদা আখিরাতকে স্মরণ রাখা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখে বিভ্রান্ত না হওয়া| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
৩| ১৯৮ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসের বিপরীতে মুত্তাকিদের চিরস্থায়ী ও মহিমাšি^ত পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন| মুত্তাকি হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকে| এমন আল্লাহভীরু বান্দাদের জন্য রয়েছে অসংখ্য জান্নাত, যার নিচে প্রবাহিত হবে নির্মল নদীসমূহ| তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তাদের এ সুখ-সম্ভোগের কোনো শেষ নেই| এ অর্থেই আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র বলেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا﴾
অর্থাৎ- “নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফিরদাউসের জান্নাত” (সূরাতু আল-কাহফ: ১০৭) | এখানে (নুযুলান) শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| আরবি ভাষায় নুযুল বলতে অতিথির জন্য প্রাথমিক আপ্যায়ন ও সম্মানসূচক আতিথেয়তাকে বোঝায়| এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা আল্লাহ তা’আলার বিশেষ মেহমান| তিনি নিজ অনুগ্রহ, দয়া, উদারতা ও সম্মানের মাধ্যমে তাদেরকে আপ্যায়িত করবেন|
এ জান্নাতের নেয়ামতগুলো মূলত শারীরিক ও বাহ্যিক নেয়ামত-সুন্দর বাসস্থান, নদী-নালা, ফল-মূল, খাদ্য-পানীয় এবং সীমাহীন সুখ-¯^াচ্ছন্দ্য| তবে এর চেয়েও মহান আরেকটি নেয়ামত রয়েছে, যা হলো আত্মিক ও রূহানী নেয়ামত-আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর ˆনকট্য এবং তাঁর দর্শন লাভের সৌভাগ্য| এ দিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ﴾ “আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য আরও উত্তম”| অর্থাৎ, জান্নাতের বাহ্যিক নেয়ামত ছাড়াও আল্লাহ তাআলার নিকট যে সম্মান, সন্তুষ্টি, ˆনকট্য ও চিরস্থায়ী পুরস্কার সংরক্ষিত রয়েছে, তা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ, ক্ষমতা, ভোগ-বিলাস এবং কাফিরদের সাময়িক সমৃদ্ধির তুলনায় অসীমভাবে শ্রেষ্ঠ ও মহত্তর| কারণ দুনিয়ার সুখ ক্ষণস্থায়ী ও নশ্বর; পক্ষান্তরে আল্লাহর নিকট যা রয়েছে তা চিরন্তন, পরিপূর্ণ এবং অবিনশ্বর| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৬৯-১৭০) |
৪| ১৯৯ ন¤^র আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে মুত্তাকিদের জন্য নির্ধারিত মহাপুরস্কার এবং কাফিরদের জন্য প্রস্তুতকৃত শাস্তির বর্ণনার পর আল্লাহ তা’আলা আহলে কিতাবের পাঁচটি গুণের বর্ণনা দিয়েছেন:
প্রথম গুণ: তারা আল্লাহর প্রতি এমন বিশুদ্ধ ঈমান পোষণ করে, যার মধ্যে শিরকের কোনো মিশ্রণ নেই এবং যা শুধু মুখের ¯^ীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আনুগত্য ও আমলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়| তারা তাদের মতো নয়, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ﴾
অর্থাৎ- “তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, কিন্তু শিরক করেই” (সূরাতু ইউসুফ: ১০৬) |
দ্বিতীয় গুণ: তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি অবতীর্ণ কুরআনের ওপর ঈমান আনে এবং তাঁকে আল্লাহর সত্য রাসূল হিসেবে মেনে নেয়|
তৃতীয় গুণ: তারা তাদের নিজেদের নবীদের ওপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাবসমূহের প্রতিও ঈমান রাখে| অর্থাৎ তারা আল্লাহর সকল নবী ও সকল ওহির প্রতি বিশ্বাসী| কুরআন যেসব বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেগুলোও তারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে| তাদের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়া বা বিকৃত হয়ে যাওয়া এ বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়|
চতুর্থ গুণ: তারা আল্লাহর সামনে গভীর বিনয় ও নম্রতা অবল¤^ন করে| এই খুশু‘ (خشوع) হলো বিশুদ্ধ ঈমানের অন্যতম ফল| যখন আল্লাহভীতি হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন তার প্রভাব মানুষের দৃষ্টি, কথা, আচরণ ও অনুভূতির ওপরও প্রতিফলিত হয়| ফলে তার চোখে বিনয়, কণ্ঠে নম্রতা এবং চরিত্রে নমনীয়তা প্রকাশ পায়|
পঞ্চম গুণ: তারা আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে দুনিয়ার সামান্য ¯^ার্থ অর্জন করে না| অর্থাৎ তারা সত্যকে গোপন করে না, বিকৃতি করে না এবং পার্থিব লাভ, পদমর্যাদা বা সম্পদের বিনিময়ে আল্লাহর বিধানকে বিক্রি করে না| এটি তাদের ঈমান, খুশু‘ ও আল্লাহভীতিরই ¯^াভাবিক ফল| (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৬৯-১৭০) |
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে- আহলে কিতাবের মধ্য থেকে যারা ঈমান, বিনয়, আল্লাহভীতি, সত্যনিষ্ঠা এবং আল্লাহর আয়াতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো মহৎ গুণাবলিতে ভূষিত হয়েছে, তাদের জন্য তাদের সৎকর্ম ও আনুগত্যের উপযুক্ত প্রতিদান আল্লাহ তা’আলার নিকট সংরক্ষিত রয়েছে| সুতরাং আহলে কিতাবের মধ্যে যারা সত্যকে চিনে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান এনেছে, কুরআন ও পূর্ববর্তী ওহির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আল্লাহর সামনে বিনয়ী হয়েছে এবং দুনিয়ার ¯^ার্থে সত্যকে বিকৃত করেনি-আল্লাহ তাআলা তাদের বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন| এর মাধ্যমে কুরআন শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি বংশ, জাতি বা সম্প্রদায় নয়; বরং বিশুদ্ধ ঈমান, বিনয়, সততা ও সত্যের প্রতি আনুগত্য|(তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৭১) |
৫| ২০০ ন¤^র আয়াত তথা সূরার সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের সফলতার জন্য চারটি মৌলিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন: সবর, মুসাবারা, মুরাবাতা ও তাকওয়া|
(ক) صبر (সবর) – ˆধর্য ধারণ করা, মুফাসসিরগণ এখানে ‘সবর’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা নিয়ে কয়েকটি ব্যাখ্যা করেছেন, যার সারসংক্ষেপ হলো- সবর বলতে আল্লাহর আনুগত্য, বিপদ-আপদ, দ্বীনের দায়িত্ব এবং জিহাদের কষ্টসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অবিচল থাকাকে বুঝানো হয়েছে|
(খ) مصابرة (মুসাবারা) – ˆধর্যের প্রতিযোগিতা করা, এ নির্দেশেরও দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়-
ইবনু আব্বাস (রা.) ও অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, শত্রুর মোকাবিলায় তাদের চেয়ে অধিক ˆধর্যশীল ও দৃঢ় হওয়া|
আতা ও কুরাযী বলেন, আল্লাহ যে পুরস্কার ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার প্রত্যাশায় ˆধর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করা| অর্থাৎ, শুধু ˆধর্যধারণই নয়; বরং সত্যের পথে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অন্যদের চেয়ে বেশি দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করাই হলো মুসাবারা|
(গ) مرابطة (মুরাবাতা) প্রহরায় অবিচল থাকা, এ বিষয়ে মুফাসসিরদের দুটি মত রয়েছে-
প্রথম মত: সীমান্তে অবস্থান করে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকা এবং ইসলামের নিরাপত্তা রক্ষায় সদা সতর্ক থাকা| ইবনু আব্বাস (রা.), হাসান বসরী, কাতাদা প্রমুখ এ মত পোষণ করেন|
ইবনু কুতাইবা বলেন, রিবাত শব্দের মূল অর্থ হলো সীমান্তে অবস্থান করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকা| অতীতে উভয় পক্ষ তাদের ঘোড়া বেঁধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করত; সেখান থেকেই রিবাত শব্দের উৎপত্তি|
দ্বিতীয় মত: নামাজের প্রতি অবিচল থাকা এবং এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষায় থাকা|এ মতটি আবু সালামা ইবনু আবদুর রহমান (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে|
(ঘ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ ভীতি অবল¤^ন করা|
দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে হলে ˆধর্য, দৃঢ়তা, দায়িত্বশীলতা এবং তাকওয়ার সমš^য় অপরিহার্য| এ চারটি গুণই একজন মুমিনকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং আখিরাতের জীবনে সফলতার শিখরে পৌঁছে দেয়| (যাদুল মাসীর ফি ইলমিত তাফসীর, ইবনুল জাওযী: ১/৩৬৫) |

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) কাফির বা অবাধ্য লোকদের ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি ও বাহ্যিক সফলতা দেখে তাদের পথকে সঠিক মনে করা যাবে না| মুমিনের দৃষ্টি থাকবে আখিরাতের স্থায়ী সফলতার দিকে|
(খ) আল্লাহর সন্তুষ্টি, বিশুদ্ধ ঈমান ও তাকওয়াই প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড| তাই দুনিয়াবি লাভ-ক্ষতির চেয়ে ঈমান রক্ষা ও আল্লাহর আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে|
(গ) আহলে কিতাবের মুমিনদের মতো সত্য যেখানেই পাওয়া যায় তা গ্রহণ করা, আল্লাহর সামনে বিনয়ী থাকা এবং দুনিয়াবি ¯^ার্থে সত্যকে গোপন বা বিকৃত না করা|
(ঘ) ইবাদত, দাওয়াত, শিক্ষা, পরিবার, সমাজ ও বিপদ-মুসিবতের ক্ষেত্রে ˆধর্য ধারণ করা এবং সত্যের পথে প্রতিকূলতার মোকাবিলায় আরও বেশি দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করা|
(ঙ) নিজের ঈমান, পরিবার, সমাজ ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে সচেতন থাকা; ইলম, দাওয়াত, শিক্ষা, সংগঠন ও ইসলামী কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্বীনের খেদমতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহভীতি অবল¤^ন করা|

Leave a Reply

error: Content is protected !!