Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫২-১৫৩) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা: আনুগত্য, ধৈর্য, আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُمْ بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُمْ مِنْ بَعْدِ مَا أَرَاكُمْ مَا تُحِبُّونَ مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنْكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ (152) إِذْ تُصْعِدُونَ وَلَا تَلْوُونَ عَلَى أَحَدٍ وَالرَّسُولُ يَدْعُوكُمْ فِي أُخْرَاكُمْ فَأَثَابَكُمْ غَمًّا بِغَمٍّ لِكَيْلَا تَحْزَنُوا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا مَا أَصَابَكُمْ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ (153)﴾ [سورة آل عمران: 152-153].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা: আনুগত্য, ধৈর্য, আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১৫২। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের সাথে তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছিলেন, যখন তোমরা তাদেরকে তাঁর নির্দেশে হত্যা করেছিলে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়েছিলে এবং রাসূলুল্লাহর নির্দেশকে ঘিরে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলে এবং তোমাদেরকে বিজয় দেখানোর পরে তোমরা অবাধ্য হলে, যা তোমরা ভালোবাসতে। তোমাদের মধ্যে কেউ চেয়েছিলে দুনিয়া এবং তোমাদের কেউ চেয়েছিলে আখেরাত। অতঃপর তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন, তবুও কিন্তু তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন; বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল।
১৫৩। (স্মরণ করো) যখন তোমরা পাহাড়ের উপর দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলে এবং কারো প্রতি ফিরে দেখছিলে না, আর রাসূলুল্লাহ তোমাদেরকে পিছন থেকে ডাকছিলে, ফলে তিনি তোমাদেরকে দিলেন দুঃখের উপর দুঃখ, যাতে তোমরা তোমাদের হারের কারণে দুঃখিত না হও এবং তোমাদের আপদের কারণে দুঃখিত না হও; আর যা তোমরা করছো তা সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত আছেন ।

আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের যে বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন, তা শুরুতেই বাস্তবায়িত হয়েছিল। আল্লাহর অনুমতিতে তারা শত্রুসেনাকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছিল। কিন্তু পরে তারা দুর্বলতা প্রদর্শন করল, মনোবল হারালো এবং পরস্পরের মধ্যে মতভেদে জড়িয়ে পড়ল-নির্ধারিত অবস্থানে অটল থাকবে, না কি গনিমত সংগ্রহে অগ্রসর হবে। এ বিভ্রান্তির ফলে তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) কঠোর নির্দেশ অমান্য করল যে, “কোনো অবস্থাতেই নিজ নিজ স্থান ত্যাগ করা যাবে না”। এরই পরিণতিতে প্রত্যক্ষ বিজয় দেখে নেওয়ার পরও তারা পরাজয়ের মুখোমুখি হলো। তখন পরিষ্কার হয়ে গেল- তাদের একাংশ দুনিয়ার গনিমতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, আর অপরাংশ পরকালীন প্রতিদান কামনা করেছিল। এরপর আল্লাহ তাদেরকে শত্রুর মোকাবিলা থেকে ফিরিয়ে দিলেন, যেন তিনি তাদের পরীক্ষা নিতে পারেন। তাদের অনুতাপ ও তওবা তিনি অবগত আছেন, এবং তিনি তাদের ক্ষমাও করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অশেষ অনুগ্রহশীল।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সেই বিস্ময়কর ও ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, যখন তারা শত্রুভীতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটে উঠছিল এবং পিছনে ফিরে তাকানোর অবকাশও ছিল না। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) তখনো অবিচলভাবে ময়দানে অবস্থান করে পেছন থেকে ডাক দিচ্ছিলেন- “হে আল্লাহর বান্দারা, আমার দিকে ফিরে আসো”। কিন্তু আতঙ্কে তারা তাঁর আহ্বান শুনতেও পারেনি, তাঁর দিকে তাকাতেও সক্ষম হয়নি। এর ফলস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর দুঃখ, কষ্ট ও গভীর বিষাদের বোঝা নাজিল করলেন, যাতে তারা হারানো বিজয়, গনিমত কিংবা পরাজয়ের আঘাতকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত হতাশায় না ভোগে। আর তাদের সকল কার্যকলাপ সম্পর্কে আল্লাহ সবটুকুই অবগত, তাঁর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৩-৩৯৫; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২৬-১২৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৯; আল-মুনতাখাব: ১/১১২) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿وَعْدَهُ﴾ ‘তাঁর প্রতিশ্রæতি’, অর্থাৎ, তিনি তাঁর রাসূলের (সা.) মাধ্যমে যে প্রতিশ্রæতি মুসলমানদেরক দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেছেন, যেমন তিনি তীরন্দাজদের বলেছিলেন: “তোমরা নিজেদের স্থানে অটল থাকো; তোমরা অবস্থান ধরে রাখলে আমরা বিজয়ী হব” (সহীহ আল-বুখারী: ৩০৩৯), (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৫২) । আল্লাহ তায়ালা সেই প্রতিশ্রতিই বাস্তবায়ন করেছিলেন। যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানরা স্পষ্টভাবে জয়ের মুখ দেখতে পেয়েছিল। কারণ তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মেনেছিল এবং নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছিল। অর্থাৎ, আল্লাহর সাহায্য তাদের সঙ্গে ছিল যতক্ষণ তারা আনুগত্য ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিল।
﴿إِذْ تَحُسُّونَهُمْ بِإِذْنِهِ﴾ “যখন তোমরা আল্লাহর অনুমতিতে তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করছিলে”, এখানে تحسّونهم শব্দটি শত্রুকে নির্মূল, নিধন ও শক্তিহীন করে দেওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আরবিতে বলা হয় “سنةٌ حسوس” অর্থাৎ এমন এক ভয়াবহ বছর যা সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে। তেমনি “جرادٌ محسوس” বলতে বোঝায় এমন পঙ্গপাল যা শীতের তীব্রতায় বা বরফে সম্পূর্ণভাবে মারা গেছে। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০১) । এ উভয় উদাহরণ থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আয়াতে ব্যবহৃত تحسّونهم শব্দটি পূর্ণ দমন ও সর্বাত্মক ধ্বংস বোঝাতে এসেছে, অর্থাৎ মুসলমানরা শত্রুকে এমনভাবে আঘাত করছিল যে তারা টিকে থাকার শক্তিই হারিয়ে ফেলছিল।
﴿وَتَنَازَعْتُمْ فِي الأَمْر﴾ “তোমরা সেই বিষয়ে পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে পড়লে”, অর্থাৎ, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে স্থানে তোমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই অবস্থানে থাকবে কি না এ নিয়ে তোমরা নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি করেছিলে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৫২) ।
﴿مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيا﴾ “তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চাইছিল”, এরা সেই তীরন্দাজরা, যারা উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে স্থানে তাদের অবস্থান করতে বলেছিলেন, সেই স্থান ছেড়ে গনিমত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিচে নেমে গিয়েছিল। (তাফসীল আল-মারাগী: ১/১০১) ।
﴿وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ﴾ “আর তোমাদের মধ্যে কেউ আখিরাত কামনা করছিল”, এরা সেই সাহাবীগণ, যারা আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থানে অটল ছিলেন। শুরুতে তীরন্দাজদের সংখ্যা ছিল প্রায় পঞ্চাশ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় দশজন তাঁর সঙ্গে স্থির থেকেছিলেন। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গেও প্রায় ত্রিশজন সাহাবী শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে ময়দানে অবিচল ছিলেন। (তাফসীল আল-মারাগী: ১/১০১) ।
﴿إِذْ تُصْعِدُونَ﴾ “যখন তোমরা উচু স্থানে উঠেছিলে”, আয়াতে বোঝানো হচ্ছে, মুসলমানরা যুদ্ধে পরাজয়ের ভয় বা ভীতির কারণে দ্রæত পাহাড় বা উঁচু স্থানে উঠেছিল। এখানে أصعد শব্দের ব্যবহার নির্দেশ করছে ‘দ্রæত উচ্চ স্থানে ওঠা’ বা ‘পরাজয়ের চাপ থেকে দূরে সরে যাওয়া’। এটি এমন একটি পরিস্থিতি বোঝাচ্ছে যখন তারা শত্রুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। সংক্ষেপে, এটি মুসলিমদের সেই মুহূর্তের দুর্বলতা ও অস্থিরতা প্রদর্শন করছে, যখন তারা আল্লাহর প্রতি স্থির বিশ্বাস না রাখার কারণে আত্মনিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০১) ।
﴿فَأَثابَكُمْ غَمًّا بِغَمٍّ﴾ “আল্লাহ তাদেরকে এক ধরনের দুঃখের সঙ্গে আরেক ধরনের দুঃখ প্রদান করলেন”, এখানে প্রথম দুঃখ দ্বারা বোঝাচ্ছে শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাপ্ত ক্ষতি, যেমন আহত হওয়া বা প্রাণহানি। আর দ্বিতীয় দুঃখ দ্বারা বোঝাচ্ছে সেই খবর যে রাসূলুল্লাহ (সা.) আহত বা নিহত হয়েছেন, যা তাদের প্রথম দুঃখের ভাবকে বিস্মৃত বা আরও জটিল করে তোলে। সংক্ষেপে, এটি মুসলিমদের জন্য এক দুঃখের ক্রমকে প্রকাশ করছে, যা তাদের পরীক্ষার অংশ ছিল এবং আল্লাহর বিচক্ষণ পরিচালনার মাধ্যমে তাদের মনোবল ও ধৈর্যের পরীক্ষা করা হয়েছিল। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০১) ।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের ঘটনার প্রেক্ষাপটেই এই আয়াতদ্বয়। আল্লাহ তায়ালা পূর্বের আয়াতে বিশ্বাসীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তারা কখনো কাফেরদের কাওয়াশ বা পরামর্শের প্রতি আনুগত্য করবে না। পাশাপাশি, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন যে তিনি কাফেরদের হৃদয়ে ভয় সৃষ্টি করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হলো: আবু সফিয়ান মক্কা থেকে মদীনায় আক্রমণ করতে চাইলেও তার ও তার অনুসারীদের হৃদয়ে ভয় নেমে আসায় তারা মক্কায় ফিরে গেল। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুসলমানরা হামরার আসল স্থান থেকে ফিরে আসলেও আবু সফিয়ান ও তার বাহিনী তাদের সামনে আসেনি। আর উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ মুসলমানদেরকে স্মরণ করাচ্ছেন যে তিনি তাদের প্রতিশ্রæতি পূর্ণ করেছেন এবং তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছেন। (আইসার আল-তাফাসীর, আবু বকর আল-জাযায়েরী: ৩৯৩) ।

১৫২ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
মুহাম্মদ ইবন কাব আল-কুরযী বর্ণনা করেছেন, উহুদ যুদ্ধে হারের পর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ফিরলেন, তখন কিছু সাহাবী বললেন: “আমাদের কী হয়েছে? আল্লাহ আমাদের বিজয় প্রদানের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন”। এ সময় আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করে তাদের স্মরণ করালেন যে তিনি তাঁর প্রতিশ্রæতি সত্যি করেছেন।
এই আয়াত বিশেষভাবে তীরন্দাজদের জন্য প্রযোজ্য, যারা উহুদ যুদ্ধে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করেছিল এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে আচরণ করেছিল। এছাড়া, আয়াতের শেষে আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে জানালেন যে, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়ার লাভের জন্য কাজ করতে চায়, আবার কেউ আখিরাতের প্রতিদান কামনা করে। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। ১৫২ নং আয়াত থেকে চারটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) উহুদ যুদ্ধে আল্লাহর প্রতিশ্রæত বিজয়ের আলো দেখতে না দেখতেই নিভে গেল, আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের প্রতিশ্রæতি পূর্ণ করেছিলেন। যুদ্ধের প্রথম ভাগে মুসলমানরা আল্লাহর ইচ্ছায় শত্রুকে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল এবং বিজয় নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই তিনটি কারণে বিজয় থেমে গিয়ে পরাজয় নেমে এসেছিল:
(ক) মুসলিম বাহিনীর কিছু অংশ মনোবল হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
(খ) তাদের কিছু অংশ শত্রæ বাহিনীকে ভয় পেয়েছিল।
(গ) তিরন্দাজদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ নিয়ে মতবিরোধ করেছিল।
(খ) ভীত মুসলিম বাহিনীর প্রতি ভৎসনা প্রকাশ, আয়াতে যে ভঙ্গিতে কথা বলা হয়েছে, তাতে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের প্রতি একটি তিরস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কারণ যুদ্ধের প্রথম অংশে তারা স্পষ্টভাবে বিজয়ের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিল, শত্রু পিছু হটছিল, মুসলমানরা শক্তিশালী অবস্থানে ছিল, এবং বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় তাদের উচিত ছিল দৃঢ়ভাবে স্থির থাকা, রাসূলুল্লাহর (সা.) আদেশ মানা এবং নিজেদের দায়িত্বে অটল থাকা। কিন্তু তারা গনিমতের প্রলোভনে পড়ে স্থিরতা হারিয়ে ফেলেছিল এবং নির্দেশ অমান্য করেছিল। তারা কেমন যেন বিজয় স্বচক্ষে দেখেও তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
(গ) রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ পালনে মতবিরোধের কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) উহুদ যুদ্ধে তিরন্দাজদেরকে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ঐ স্থান ত্যাগ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু যখন তারা মুসলমানদের বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত দেখছিলেন, তখন দুইটি কারণে তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছিল:
(ক) একদল বিজয় নিশ্চিত মনে করে গনীমত সংগ্রহকে প্রধান্য দিয়ে স্থান ত্যাগ করছিল।
(খ) আরেক দল রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মান্য করাকে প্রধান্য দিয়ে অবস্থান করছিল।
(ঘ) মুসলিম বাহিনীকে ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রদানের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করা, আল্লাহ তায়ালা জানান- তিনি তাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন পরীক্ষাস্বরূপ, ঈমান যাচাই করার জন্য। অবশেষে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেছেন, কারণ তারা অনুতপ্ত হয়েছিল। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল; সামান্য সংখ্যায় থাকলেও তিনি তাদের ধ্বংস করেননি, বরং শিক্ষা ও তওবার সুযোগ দিয়েছেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২৭-১২৮) ।
২। ১৫৩ নং আয়াতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়-
(ক) প্রচন্ড আতঙ্কের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে কাফেরদের থেকে রক্ষা করা একটি অনুগ্রহ, উহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা ভয় ও আতঙ্কে পিছু হটে পাহাড়ের দিকে দৌড়াচ্ছিল। আতঙ্ক এতটাই প্রবল ছিল যে তারা কাউকে পিছনে ফিরে দেখছিল না। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ডাকছিলেন: “হে আল্লাহর বান্দারা, আমার দিকে ফিরে আসো! আমি আল্লাহর রাসূল। যে ফিরে আসবে, তার জন্য জান্নাত”। এ অবস্থায় তাদেরকে কাফেরদের হাত থেকে রক্ষা করা তাদের প্রতি একটি বড় অনুগ্রহ ছিল।
(খ) উহুদে যুদ্ধসৃংখলা ভঙ্গকারীদের জন্য আল্লাহর পরীক্ষা ছিল দ্বিমাত্রিক, আল্লাহ তায়ালা দুই ধরণের দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে পরীক্ষা করেছেন:
(ক) ভয়, পরাজয়, গনিমত হারানো, এবং বহু সাহাবীর শাহাদাত বরণ।
(খ) রাসূলুল্লাহর (সা.) আহত হওয়া ওর বিপদের মুখে পড়া, যা তাদের মনে সবচেয়ে গভীর আঘাত হানে।
সয়ং আল্লাহ তায়ালা এই পরীক্ষার দুইটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছেন:
(ক) মুসলমানরা হারানো গনিমত বা যুদ্ধক্ষতির জন্য অতিরিক্ত দুঃখ না করে, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
(খ) যে আঘাত, কষ্ট ও আতঙ্ক তারা পেয়েছে সেগুলো নিয়ে ভেঙ্গে না পড়ে, বরং নতুন শক্তি সঞ্চয় করবে। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৩৯২) । এর বেশী অতীত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হতে থাকলে তাদের মর্যাদা ও মনোবল বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আয়াতদ্বয় থেকে করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য পোষণ করা, মুমিনের প্রথম দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অবিচলভাবে মানা।
(খ) ধৈর্য, স্থিরতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, পরিস্থিতি কঠিন হোক বা বিজয়ের লক্ষণ স্পষ্ট হোক, মুমিনকে ভয়-চাপ-উত্তেজনায় বিচলিত না হয়ে দায়িত্বস্থানে দৃঢ় থেকে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
(গ) দুনিয়ার লোভ থেকে বিরত থাকা, উহুদের শিক্ষায় স্পষ্ট- দুনিয়ার লোভ যেন কখনোই আনুগত্য ও ঈমানদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
(ঘ) পরীক্ষায় ধৈর্য ও ইতিবাচক শিক্ষা নেওয়া, বিপদ ও পরাজয় মুমিনের জন্য হতাশার কারণ নয়; বরং তাকে সংশোধন, আত্মসমালোচনা এবং শক্তিশালী হওয়ার শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা।
(ঙ) আন্তরিক তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর উপর ভরসা, ভুল হলে তৎক্ষণাৎ তওবা করে আল্লাহর দয়া ও সাহায্যের উপর ভরসা রেখে মনোবল অটুট রাখাই মুমিনের প্রকৃত শক্তি।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৪৯-১৫১) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফেরদের আনুগত্য নয়, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাই মূল শক্তি।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ (149) بَلِ اللَّهُ مَوْلَاكُمْ وَهُوَ خَيْرُ النَّاصِرِينَ (150) سَنُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ بِمَا أَشْرَكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَمَأْوَاهُمُ النَّارُ وَبِئْسَ مَثْوَى الظَّالِمِينَ (151)﴾ [سورة آل عمران: 149-151].

আলোচ্যবিষয়: কাফেরদের আনুগত্য নয়, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাই মূল শক্তি।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৪৯। হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা কাফেরদের অনুগত হও, তাহলে তারা তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিবে তোমাদের পূর্বাবস্থায়; ফলে তোমরা হয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্তপড়বে।
১৫০। বরং আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক, এবং তিনিই উত্তম সাহায্যকারী।
১৫১। অচিরেই আমি কাফেরদের ক্বলবে আতঙ্ক ঢেলে দিবো, আল্লাহর সাথে,তাদের শরীক করার কারণে যে বিষয়ে তিনি কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আর তাদের আশ্রয়স্থল হলো জাহান্নাম, এবং যালিমদের আবাসস্থল কতইনা নিকৃষ্ট।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
উহুদের যুদ্ধ ছিল ঈমান ও কুফরের চ‚ড়ান্ত পরীক্ষার ময়দান। যখন মুসলমানরা সাময়িক বিপর্যয়ে পতিত হলো, তখন মুনাফিকদের অন্তরে রোগ প্রকাশ পেল। তারা বিদ্রƒপভরে বলল: “ফিরে যাও তোমাদের পুরনো ধর্মে, যদি মুহাম্মদ (সা.) সত্য নবী হতেন, তবে নিহত হতেন না”। এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উদ্দেশে দৃপ্ত আহ্বান জানালেন- অবিশ্বাসীদের কথায় বা প্রস্তাবে যেন তারা প্রতারিত না হয়; তাদের উপদেশের মুখোশে লুকিয়ে থাকে ধোঁকা ও ঈমানহানির বিষ। মুমিনের মর্যাদা কাফেরের অনুসরণে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশে দৃঢ় থাকার মধ্যেই তার প্রকৃত সাফল্য।
এরপর আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মনে দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করলেন- যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকারী ও সহায়ক, তিনি ছাড়া আর কেউ তাদের জন্য আশ্রয় নয়। সুতরাং কাফেরদের বন্ধুত্ব বা সাহায্যের আশায় তারা যেন নিজেদেরকে ছোট না করে। বিজয়ের পথ তাদের আনুগত্যে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্যে নিহিত। কারণ আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী, আর তাঁর সাহায্যই মুমিনের প্রকৃত শক্তি ও সম্মানের উৎস।
যখন মুমিনরা আল্লাহর আদেশ মেনে কাফেরদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকল, তখন আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সাথে কাফেরদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করার প্রতিশ্রæতি দিলেন। তাদের হৃদয়ে এমন ভীতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হবে যে, তারা মুমিনদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হারাবে। এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয়ের দুয়ার খুলে যাবে। কারণ তারা আল্লাহর সঙ্গে এমন উপাস্যদের শরিক করেছে, যাদের উপাসনার কোনো প্রমাণ বা অনুমতি আল্লাহ দেননি। আর এই শিরকই তাদের ভয়াবহ পরিণতি নির্ধারণ করেছে। তারা অন্যায় ও কুফরে লিপ্ত থাকার কারণে জাহান্নামের অধিবাসী হবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৮৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২০-১২১; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৯; আল-মুনতাখাব: ১/১১১-১১২) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿الَّذِينَ كَفَرُوا﴾ ‘যারা কুফরী করেছে’, আয়াতাংশ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এ বিষয়ে তাফসীরকারকদের কয়েকটি মত পাওয়া যায়:
(ক) “যারা কুফরি করেছে” বলতে আরবের মুশরিকদের বোঝানো হয়েছে। যেমন- আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা।
(খ) এর দ্বারা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বোঝানো হয়েছে।
(গ) আলী (রা.) বলেন- “যারা কুফরী করেছে” দ্বারা মোনাফেকদেরকে বুঝানো হয়েছে। উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় দেখে তারা বলেছিল: “তোমরা ফিরে যাও পিতৃপুরুষদের ধর্মে”। তারা মুসলমানদের ঈমান থেকে ফিরিয়ে কুফরিতে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৯) ।
﴿الرُّعْبَ﴾ ‘আতঙ্ক’, “রু‘ব” বলতে এমন তীব্র ও গভীর ভয়কে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের পুরো হৃদয়কে গ্রাস করে ফেলে। উহুদের যুদ্ধ শেষে মুশরিকরা যখন মক্কার দিকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তারা আবার ফিরে এসে মুসলমানদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের হৃদয়ে এমন প্রবল ভয় ঢেলে দিলেন যে তারা আতঙ্ক এবং ভয়ে আর ফিরতে সাহস পেল না। এই ভয় ও ভীরুতার মূল কারণ ছিল তাদের শিরক ও আল্লাহর নাফরমানি। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৯) ।
﴿مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا﴾ “এমন সব বিশ্বাস, কাজ বা কথাবার্তা, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল, প্রমাণ বা অনুমতি নাজিল করেননি”। এখানে “সুলতান” বলতে বোঝানো হয়েছে শক্তিশালী যুক্তি, স্পষ্ট প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য দলিল। আর হুজ্জত বা প্রমাণকে “সুলতান” বলা হয়; কারণ সত্য দলিলের এমন শক্তি থাকে, যা মিথ্যা, ভ্রান্ত চিন্তা ও বাতিল মতামতকে প্রতিহত করে দুর্বল করে দেয়। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৫১) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আয়াতগুলো উহুদের যুদ্ধের ঘটনাবলী থেকে পাওয়া নসিহত ও শিক্ষা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করছে। পূর্বের আয়াত তথা (১৪৬-১৪৮) আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা আগের যুগের সেই মানুষদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দেন, যারা নবীদের সাহায্য করেছিল, সত্যের জন্য দৃঢ় ছিল এবং ঈমানের পথে অবিচল ছিল। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা ঐ সকল ইহুদী-খ্রিস্টান, মুশরিক ও মুনাফিকদের আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন, যারা সবাই মিলিত হয়ে ইসলামের দাওয়াহকে প্রতিহত করার চেষ্টা করত এবং যুদ্ধের কঠিন সময়ে মুমিনদের মনোবল ভেঙে দিতে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা দিত। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৯৫)।

১৪৯ ও ১৫১ আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
হযরত আলী (রা.) বলেন: ১৪৯ নং আয়াত নাজিল হয়েছে মুনাফিকদের সেই কথার প্রসঙ্গে, যখন উহুদের পরাজয়ের মুহূর্তে তারা মুমিনদের বলেছিল: “তোমরা ফিরে যাও তোমাদের ভাইদের কাছে, তাদের ধর্মে ঢুকে পড়ো”। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।
হাসান বসরি (র.) বলেন: এর অর্থ- তোমরা যদি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পরামর্শ গ্রহণ করো এবং তাদের কথা শুনো, তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ তারা মুসলমানদের পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করত, দীনের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করত এবং বলত: “যদি মুহাম্মদ সত্য নবী হতেন, তবে তিনি কেন পরাজিত হলেন? কেন তাঁর এবং তাঁর সাহাবীদের এমন অবস্থা হলো? তিনি তো অন্য সাধারণ মানুষের মতোই কখনো জেতেন, কখনো হারেন”।
আর সুদ্দি (র.) বলেন: এর অর্থ- তোমরা যদি আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ো, তাদের কাছে নিরাপত্তা চাও, তবে তারা তোমাদের আবার আগের ধর্মে ফিরিয়ে দেবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৯) ।
১৫১ নং আয়াত অবতীর্ণ হওয়া প্রসঙ্গে ইমাম সুদ্দি (র.) বর্ণনা করেছেন: উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের পর আবু সুফিয়ান এবং তার মুশরিক সঙ্গীরা মক্কার দিকে ফিরছিলেন। পথে তারা কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর হঠাৎ অনুশোচনায় ভুগল এবং বলল: “বিপদ! আমরা কী করেছি! আমরা তাদের হত্যা করেছি; এখন তো শুধু কিছু ছোট দল ছাড়া কেউ বেঁচে নেই। ফিরে যাই এবং সব শেষ করি”। তাদের লক্ষ্য ছিল বেঁচে থাকা মুসলিমদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে এমন প্রবল ভয় সৃষ্টি করলেন যে, তারা যা পরিকল্পনা করেছিল তা আর করতে সাহস পেল না এবং ফিরে গেল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৪৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে সতর্ক করেছেন, তারা যদি কাফের, মুশরিক ও ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে পরামর্শদাতা বানিয়ে তাদের পরামর্শকে গ্রহণ করে, তাহলে তাদের জন্য দুইটি ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে:
(ক) তারাও কাফের-মুশরিকদের মতো কাফের হয়ে যাবে, এর অর্থ হলো, যদি কোনো মুসলমান কাফের ও মুশরিকদের পরামর্শ, চিন্তা, জীবনদর্শন ও পথনির্দেশ গ্রহণ করতে থাকে, তবে ধীরে ধীরে তার ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সে তাদের মতোই কুফর ও ভ্রান্তির পথে চলে যেতে পারে। প্রথমে আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে, পরে আমলে দুর্বলতা দেখা দেয়, আর একসময় বিশ্বাসের ভিতই নড়ে যেতে পারে। তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ ও নবীর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, শত্রুর পরামর্শ থেকে দূরে থাকা এবং নিজের বিশ্বাস, পরিচয় ও মর্যাদা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা।
(খ) দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দুনিয়ায় কাফেরদের কর্তৃত্বের কাছে তাদের ক্ষমতা লোপ পাবে, তাদের অনুগত হয়ে থাকবে, অপমান ও পরাজয়ের সম্মুখীন হবে, এবং পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া শান্তি, ক্ষমতা ও স্থিতি হারাবে। আল্লাহ তায়ালা সত্যিকারের মুমিনদের ক্ষেত্রে বলেছেন:
﴿وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضى لَهُمْ، وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْناً﴾ [سورة النور: ৫৫].
অর্থ: “আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস ও সৎকর্ম করবে, তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করবে যেমন পূর্ববর্তী জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এবং তাদের জন্য তাদের ধর্মকে দৃঢ় করবে যা তিনি তাদের জন্য প্রণীত করেছিলেন। এবং তাদের ভয় কাটিয়ে নিরাপত্তা দিবেন” (সূরাতু আন-নূর: ৫৫) ।
এবং আখেরাতে চিরকালীন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৯৬)।
উহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা যখন সাময়িকভাবে পরাজিত হয়, তখন কিছু মুনাফিক তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে মুমিনদের পরামর্শ দেয় মক্কার মুশরিকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এবং তাদের কথায় চলার। এ ধরনের পরামর্শের উদ্দেশ্য ছিল মুমিনদের ঈমান দুর্বল করা, তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং ইসলামের ওপর আঘাত করা। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সতর্ক করেন এবং নির্দেশ দেন যে, কখনোই কাফেরদের পরামর্শ গ্রহণ করবে না। কারণ তারা সর্বদা শত্রুতা, প্রতারণা ও বিদ্বেষে মিশ্রিত থাকে, এবং তাদের পরামর্শ অনুসরণ করলে মুমিনরা সহজেই বিপদে পড়বে। বর্তমান বিশ্বে অনেক মুসলিম সম্প্রদায় পশ্চিমা শক্তি ও কাফির সম্প্রদায়ের প্রভাব ও পরামর্শ অনুসরণ করছে। এর ফলে তারা আত্মনির্ভরতা হারিয়েছে, নিজেদের জাতীয় ও ধর্মীয় মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছে, এবং মেরুদন্ডহীন ভীরু জাতিতে পরিণত হয়েছে। উহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটের মতোই, আজকের পরিস্থিতিতেও এই ধরনের পরামর্শ মুমিনদের জন্য আত্মনাশকর ও বিপজ্জনক। আয়াতটি আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, এ ধরনের শত্রুর প্ররোচনা কেবল দুনিয়ায় ক্ষতি ঘটায় না; বরং আখেরাতে শাস্তি আরও ভয়ানক হবে। কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করে যে, যারা ঈমান থেকে পিছু হটে, শিরক বা কুফরের দলে ফিরবে, তাদের জন্য জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি রয়েছে । (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
২। ১৫০ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন- বিজয় অর্জন করতে হলে তারা যেন কাফেরদের সহায়তা বা পরামর্শের দিকে না তাকিয়ে শুধু আল্লাহকেই অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করে। উহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা যখন সাময়িকভাবে পরাজিত হলো, তখন মুনাফিকরা এবং কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ তাদেরকে নানা দিকে প্রলুব্ধ করতে শুরু করে। কেউ বলল: মক্কার মুশরিকদের সহায়তা নাও; কেউ বলল: মুনাফিকদের দলে এসে নিরাপত্তা খুঁজো। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে মুমিনদের নিষেধ করলেন- তারা যেন আবু সুফিয়ান ও তার মুশরিক দলের দিকে না তাকায়, কিংবা আব্দুল্লাহ ইবন উবাই-এর মতো মুনাফিকদের কাছ থেকেও কোনো নির্দেশ বা সুরক্ষা না চায় এবং তাদের প্ররোচনা, পরামর্শ ও কুমন্ত্রণা যেন উপেক্ষা করে; কারণ তাদের পক্ষে কখনোই মুসলমানদের সাহায্য করা সম্ভব নয়। সত্যিকারের সাহায্য, বিজয় এবং সুরক্ষা শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তিনিই মুমিনদের শক্তি দেন, সমর্থন দেন এবং তাঁর প্রতিশ্রæত সাহায্যের মাধ্যমে বিজয় দান করেন। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
﴿فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلاكُمْ نِعْمَ الْمَوْلى وَنِعْمَ النَّصِيرُ﴾ [سورة الأنفال: ৪০].
অর্থ: “জেনে রাখো আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক। তিনি কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী!” (সূরাতু আল-আনফাল: ৪০) ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহর চিরন্তন নিয়ম হলো তিনি সৎ, ঈমানদার এবং যারা সম্পূর্ণভাবে তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করে, তাদেরকে বিজয় দান করেন। আর কাফের, অত্যাচারী ও দ্বিমুখী লোকদেরকে পরিত্যাগ করেন। আল্লাহ আরো বলেন-
﴿أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كانَ عاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ دَمَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلِلْكافِرِينَ أَمْثالُها، ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ مَوْلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَأَنَّ الْكافِرِينَ لا مَوْلى لَهُمْ﴾ [سورة محمد: ১০].
অর্থ: “তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে দেখে না, তাদের আগের জাতিদের অবস্থা কী হয়েছিল? আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেছিলেন, এবং কাফেরদের জন্যও তেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে। কারণ আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, আর কাফেরদের কোনো অভিভাবক নেই” (সূরাতু মোহাম্মদ: ১০) ।
এই শিক্ষাটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়- মুমিনদের শক্তি, নিরাপত্তা ও বিজয় কোনো বাহ্যিক শক্তি বা শত্রুর সঙ্গে আপস করে আসে না। এটি আসে আল্লাহর উপর নির্ভরতা, তাঁর বিধান পালন এবং তাঁর প্রতিশ্রুত সাহায্যের মাধ্যমে। তাই যে কোনো মুসলিম দল, আন্দোলন বা নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো-
(ক) বিজয় শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
(খ) ইসলামবিদ্বেষী শক্তির কাঁধে ভর করে কোনোদিন ইসলামের বিজয় সম্ভব নয়।
(গ) আল্লাহর বিধানকে কাটছাঁট করে বা শত্রুর নির্দেশনায় চলে ইতিহাসে মুসলিম জাতি কোন দিন বিজয়ী হয়নি। সুতরাং, মুসলিম উম্মাহর করণীয়- আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা, তাঁর বিধানকে বাস্তবায়ন করা, এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর সহায়তা বা পরামর্শ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা।
৩। ১৫১ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) সত্যিকারের মুমিন হলেন এমন একজন যার ঈমান গভীর ও স্থির, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি দৃঢ় আশাবাদী এবং আল্লাহর শক্তি ও সাহায্যের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল; এ কারণেই তার মনোবল অটল, সংকল্প সাহসী এবং সিদ্ধান্ত দৃঢ় থাকে; যদি কাউকে কাফেরদের কথায় ভীত সন্ত্রস্ত দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে তার ঈমান কেবল নামমাত্র বা উত্তরাধিকারসূত্রে, আসল ঈমান নয়। অন্যদিকে মুশরিকদের অন্তর স্বভাবতই অস্থির ও ভীত, কুফর তাদের অন্তরে কখনো স্থায়ী নিরাপত্তা বা আত্মবিশ্বাস বোনা করে না; তারা অন্ধভাবে পুরনো প্রথা ও গোষ্ঠীপরায়ণতা অনুসরণ করে, যা তাদের সত্য দেখায়না। উদাহরণস্বরূপ উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের পরে মুশরিকরা মুসলিমদের দুর্বল দেখেও দ্বিতীয়বার আক্রমণে আগাতে পারেনি; কারণ তাদের অন্তরে সন্দেহ ও ভয় বাসা বেঁধেছিল।
(খ) মুশরিকরা আল্লাহর সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করেছে, যার জন্য আল্লাহ কখনো কোনো প্রমাণ, দলিল বা অনুমতি দেননি। শিরকের পক্ষে কোনো সত্যিকারের যুক্তি বা আসমানী সমর্থন নেই। তারা কেবল পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ করেছে, মূর্তিকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দিয়েছে, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং লোককথাকে ভিত্তিহীনভাবে দলিল মনে করেছে। এ কারণে এগুলো মানুষকে কোনো শক্তি বা নিরাপত্তা দিতে পারে না; বরং শিরক মানুষের অন্তরকে দুর্বল, অস্থির এবং ভীতু করে তোলে। তাই এই আয়াত মুমিনদের শিক্ষা দেয় শিরক কখনো সত্য, শক্তি বা নিরাপত্তার উৎস হতে পারে না; প্রকৃত অভিভাবক ও সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ।
(গ) মুশরিকদের আবাসস্থল জাহান্নাম; কারণ তারা আল্লাহকে না মানা, সত্য অস্বীকার করা, নবীদের প্রতিরোধ করা, এবং মানুষের ওপর জুলুম করার মাধ্যমে নিজেদের প্রতি সর্বোচ্চ অন্যায় করেছে। “মসওয়া” শব্দটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বোঝায়, অর্থাৎ তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। জাহান্নাম হবে তাদের স্থায়ী নিবাস, আর সেটি কতই না ভয়াবহ বাসস্থান!।

আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) মুমিনদের উচিত কাফের-মুশরিক ও ইহুদী-খ্রিস্টানদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা।
(খ) বিজয় অর্জনের জন্য মুসলিম উম্মাহর একমাত্র ভরসা হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলা।
(গ) মুশরিকদের বাহ্যিকভাবে যতই দৃঢ় বা সাহসী মনে হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তর ভয় ও অস্থিরতায় ভরা, এটি মুমিনদের মনে রাখতে হবে।

Verse of ale Imran for today | সূরাতু আলে-ইমরানের (১৪৬-১৪৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও ধৈর্যের শিক্ষা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

Verse of ale Imran for today

﴿وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ (146) وَمَا كَانَ قَوْلَهُمْ إِلَّا أَنْ قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ (147) فَآتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الْآخِرَةِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ (148)﴾ [سورة آل عمران:146-148].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও ধৈর্যের শিক্ষা।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৪৬। আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে লড়াই করেছেন অনেক রাব্বানী লোক। তবে তারা হীনবল হয়নি ঐ বিপর্যায়ের জন্য, যা তাদেরকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে স্পর্শ করেছিল, তারা দুর্বল হয়নি এবং নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন ।
১৪৭। এই কথা বলা ছাড়া তাদের কোন কথা ছিল না যে, হে আমাদের রব! আমাদের পাপ ক্ষমা করুন, আমাদের কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন এবং আমাদের পাসমূহ অবচিল রাখুন; আর আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের উপর বিজয় দিন।
১৪৮। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার প্রতিদান এবং আখেরাতের উত্তম সওয়াব দিলেন। আর আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালোবাসেন।
আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
উহুদের যুদ্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোতে মুসলমানদের শিক্ষা ও উপদেশ দিয়েছেন। প্রথম আয়াতে তিনি অতীতের নবী ও তাঁদের অনুগামীদের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। উহুদের কঠিন মুহূর্তে যখন কিছু মুসলমান ভয় ও বিভ্রান্তিতে রাসূলুল্লাহর (সা.) পাশ থেকে সরে যায়, তখন আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন বহু নবী-রাসূল এমন ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে অসংখ্য আল্লাহভীরু, জ্ঞানী ও নেক লোক যুদ্ধ করেছেন। তারা আল্লাহর পথে বিপদের মুখে কখনো দুর্বল হয়নি, ভয় পায়নি, শত্রুর কাছে মাথাও নত করেনি। বরং নবীদের পাশে থেকে অটল সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেছে, যদিও তাদের অনেকেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বা জীবন দিয়েছে। আল্লাহ তাদের এই অবিচল ধৈর্যের জন্য ভালোবেসেছেন, কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই ঈমানদার যোদ্ধাদের অন্তরের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তারা যুদ্ধের ভয় ও বিপদের মাঝেও হতাশ হয়নি; বরং নিজেদের ভুল ও গুনাহের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছে। তারা বিনীত কণ্ঠে প্রার্থনা করেছে- “হে আমাদের প্রভু, আমাদের গুনাহ ও আমাদের কাজে সীমা অতিক্রমের জন্য ক্ষমা করো, আমাদের পদক্ষেপকে দৃঢ় করো এবং অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো”। এই দোয়ায় ফুটে উঠেছে তাদের বিনয়, আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির আকাক্সক্ষা। সত্যিকারের মুমিন জানে, পরাজয়ের মূল কারণ নিজের গাফিলতি ও গুনাহ। তাই সে সবসময় তওবা করে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করে।
শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, যারা ধৈর্য, দোয়া ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর পথে অবিচল থেকেছে, তিনি তাদের দান করেছেন উভয় জগতের পুরস্কার। দুনিয়ায় তারা পেয়েছে বিজয়, সম্মান ও প্রতিষ্ঠা; আর পরকালে তারা পেয়েছে জান্নাত, চিরসুখ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ এমন মানুষদের ভালোবাসেন, যারা কাজ করে নিষ্ঠার সঙ্গে, সৎ উদ্দেশ্যে এবং সুন্দরভাবে, এদেরই বলা হয় “মুহসিন” বা সৎকর্মশীল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৮৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৩-১১৪; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৮; আল-মুনতাখাব: ১/১১১) ।
এই তিনটি আয়াত একত্রে মুমিনদের শিক্ষা দেয় যে, পরাজয় বা বিপর্যয় কখনোই হতাশার কারণ নয়। বরং তা আত্মসমালোচনা, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান। অতীত নবী ও তাঁদের সাথীদের মতো আমাদেরও উচিত দৃঢ় বিশ্বাসে অবিচল থাকা, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং নৈতিক সাহসকে জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় অবলম্বন করা। তখনই আল্লাহ দুনিয়াতে বিজয় ও মর্যাদা দান করবেন এবং আখিরাতে পরম সফলতার সম্মান দান করবেন।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿رِبِّيُّونَ﴾ ‘আল্লাহওয়ালাগণ’, আয়াতাংশের অর্থ হলো- আল্লাহভীরু মানুষ, জ্ঞানী, সৎ, পরহেজগার ও আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন বান্দাগণ। “رِبِّيُّونَ” শব্দটি এসেছে “رَبّ” (রব/প্রভু) থেকে, যার অর্থ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত বা আল্লাহর প্রতি নিবেদিত। একই অর্থে ‘রাব্বানিয়ুন’ শব্দটি আসে। এ শব্দটি সূরাতু আলে-ইমরানের ৭৯ নাম্বার আয়াতে এসেছে।
সুতরাং রিব্বিয়ুন বলতে বোঝানো হয়েছে এমন একদল মানুষ, যারা আল্লাহর প্রভুত্ব ও দিকনির্দেশনার অধীনে জীবন পরিচালনা করে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৬) ।
﴿وَإِسْرَافَنَا﴾ ‘আর আমাদের অপচয়’, “ইসরাফ” অর্থ হলো- এমন বিষয়গুলোতে সীমা অতিক্রম করা, যেগুলোর একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে এবং যেখানে থেমে যাওয়া উচিত। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৭) । এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায়, “ইসরাফ” কেবল অর্থের অপচয় নয়; বরং জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সংযম হারিয়ে সীমা লঙ্ঘন করাকেই ইসরাফ বলা হয়। যেমন: খাওয়া-দাওয়ায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্রহণ করা, পোশাক বা বাসস্থানে অহেতুক বিলাসিতা করা এবং কথাবার্তায়, কাজকর্মে বা এমনকি ইবাদতে সীমারেখা না মানা, সবই “ইসরাফ”-এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, “ইসরাফ” অর্থের দিক থেকে অতিরিক্ততা বা সংযমহীনতা, আর শরীয়তের দিক থেকে এটি অপছন্দনীয় ও নিন্দনীয় আচরণ, যা মানুষকে ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য থেকে বিচ্যুত করে।
﴿ثَوَابَ الدُّنْيَا﴾ ‘দুনিয়ার প্রতিদান’, আয়াতে “দুনিয়ার পুরস্কার” বলতে বোঝানো হয়েছে- বিজয়, জয়লাভ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৮) । অর্থাৎ- আল্লাহ তাঁর অনুগত ও ধৈর্যশীল বান্দাদেরকে দুনিয়াতেই বিজয়, সম্মান ও সম্পদের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছেন, আর আখিরাতে দিবেন আরও উত্তম প্রতিদান।
﴿حُسْنَ ثَوَابِ الآخِرَةِ﴾ ‘আখেরাতের সওয়াব’, আয়াতে “আখিরাতের উত্তম প্রতিদান” বলতে বোঝানো হয়েছে- তাদের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভ, চিরস্থায়ী জান্নাতের আনন্দ ও সুখ, যা সকল দুঃখ ও অশুভ জিনিস থেকে মুক্ত। আর এই পুরস্কার তারা পেয়েছে এজন্য যে, তারা আল্লাহর জন্য তাদের কাজগুলো সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছিল, তাই আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন সর্বোত্তম প্রতিদান। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৮) । অর্থাৎ, আখিরাতের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো- বিশুদ্ধ নিয়ত ও উত্তম কর্ম, যার বিনিময়ে আল্লাহ দান করেন চিরন্তন প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
ঘটনাপ্রবাহ এখনো উহুদের যুদ্ধের ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা বর্ণনা করছে। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর পরিপূরক হিসেবে মুমিনদের ধৈর্যহীনতা, পশ্চাদপসরণ এবং যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে রাসূলুল্লাহকে (সা.) একা ফেলে যাওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) আহ্বান করেছিলেন: “হে আল্লাহর বান্দারা, আমার দিকে ফিরে আসো! হে আল্লাহর বান্দারা, আমার দিকে ফিরে আসো!”, তখন কিছু সাহাবি সাড়া দিয়ে তাঁর সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হয়েছিলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোতে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের সাহসী সহচরদের দৃঢ়তা, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেন মুসলমানরা তাদের মতো দৃঢ়চিত্ত ও ঈমানদৃঢ় হতে উৎসাহিত হয়। (আইসার আল-তাফাসির, আবু বকর আল-জাযায়েরী, ১/৩৮৮)।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
উল্লিখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার পর তাঁদেরকে সান্তনা ও শিক্ষা দিতে পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীদের সংগ্রামী জীবনের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। মূলত এটি মুসলমানদেরকে পুনরায় দৃঢ় ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহনির্ভরতার দিকে আহ্বান করে।
১। প্রথম দুইটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীদের চারটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
(ক) নবী-রাসূলদের সংগ্রাম ও দৃঢ়তা, তাঁরা কেবল দাওয়াতদাতা ছিলেন না; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণকারী নেতা ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর কালিমা উঁচু করা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ও তাওহিদের পতাকা সুদৃঢ় করা। তাঁরা জানতেন জয়-পরাজয় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সফলতা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মিশনে তারা কখনো ভয় পাননি, ক্লান্ত হননি, কিংবা শত্রুর ভয়ে পিছু হটেননি। বরং তাঁরা তাঁদের মিশনে অবিচল থেকেছেন।
(খ) মুমিন অনুসারীদের অবিচলতা ও ধৈর্য, এই অংশে নবীদের সঙ্গী মুমিনদের চরিত্র ফুটে উঠেছে। তারা বুঝেছিল- আল্লাহর পথে সংগ্রাম মানেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া। তাই বিপদ, পরাজয় বা শহীদ হওয়ার খবরেও তারা ভীত হয়নি। বরং তাদের মনোবল আরও দৃঢ় হয়েছে।
(গ) বিনয়, আত্মসমালোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনা, যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তেও তারা নিজেদের ত্রুটি ও গাফিলতির কথা স্বীকার করেছে। তারা মনে করত জয় বা পরাজয় আল্লাহর হাতে, আর নিজেদের দুর্বলতা তাঁর রহমতের আশায় লুকানো নয়।
(গ) দোয়ার মাধ্যমে দৃঢ়তা ও বিজয়ের আকাক্সক্ষা, এটি ছিল তাঁদের আল্লাহনির্ভরতার প্রকাশ। তারা জানত, বিজয় অস্ত্রে নয়, বরং আল্লাহর সাহায্যে। তাই যুদ্ধের মাঝেও তাঁরা দোয়ার মাধ্যমে আত্মিক শক্তি আহরণ করতেন। যখন মানুষ তার দুর্বলতা উপলব্ধি করে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করে, তখন আল্লাহ তার অন্তরে দৃঢ়তা ও স্থিরতা দান করেন। এটি ইমানের সর্বোচ্চ প্রকাশ।
২। আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী মুসলমানদেরকে তাদের সাহসিকতা, দৃঢ়তা ও বিপদে ধৈর্যের কারণে দুইটি পুরস্কার দিয়েছেন, ১৪৮ নং আয়াতে তার বিবরণ এসেছে:
(ক) দুনিয়া ও আখেরাতে পুরস্কার, আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে- আল্লাহ তাঁদের ধৈর্য ও সৎ আমলের পুরস্কার হিসেবে দুনিয়ায় জয়ের সম্মান, প্রশংসা ও মনোবল দিয়েছেন, আর আখিরাতে দিয়েছেন স্থায়ী জান্নাতের প্রতিশ্রæতি। এটি ইঙ্গিত করে যে, ঈমান ও ইখলাসের সঙ্গে আমল করলে মানুষ দুনিয়ায়ও সফল হয় এবং আখিরাতেও মর্যাদা পায়।
(খ) আল্লাহর ভালোবাসা, নবীদের সঙ্গীরা আল্লাহর ভালোবাসা পেয়েছিলেন; কারণ তাঁরা ইখলাসপূর্ণ, ধৈর্যশীল ও ইহসানপূর্ণ আমলকারী ছিলেন। তাঁদের প্রতিটি কাজের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি; তাই আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর নিজের ভালোবাসায় ভূষিত করেছেন, যা আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে।
আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহর পথে ধৈর্য ও দৃঢ়তা ধারণ করা, আল্লাহর আদেশ পালন ও তাঁর পথে চলার সময় যেকোনো কষ্ট, পরীক্ষা বা বাধার মুখে ধৈর্য ধরে স্থির থাকা এবং দ্বীনের প্রতি অটল থাকা।
(খ) শত্রু বা প্রতিকুলতার ভয়ে পিছপা না হওয়া, সত্যের পথে থাকলে ভয় বা হুমকিতে পিছিয়ে না গিয়ে সাহস ও ঈমানের শক্তিতে টিকে থাকা।
(গ) আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্য কামনা করে কাজ করা, সব কাজ ও চেষ্টা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করা এবং সফলতার জন্য তাঁর সাহায্যের উপর নির্ভর করা।
(ঘ) নবী ও সৎ মানুষদের আদর্শ অনুসরণ করা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবী-রাসূল ও সৎ ব্যক্তিদের ন্যায়নিষ্ঠা, ত্যাগ ও ধৈর্যের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা।
(ঙ) সদকর্ম, ন্যায়পরায়ণতা ও ধৈর্য প্রদর্শন করা, সৎ কাজ করা, ন্যায়বিচার রক্ষা করা এবং বিপদে ধৈর্যশীল থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা।

সূরাতু আলে-েইমরানের (১৪২-১৪৫) আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: প্রত্যাশার রঙিন স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় বাস্তবতার কঠিন আঘাতে।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

Daily Basis Verse Explanation | A Verse in A Day

﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ (142) وَلَقَدْ كُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَلْقَوْهُ فَقَدْ رَأَيْتُمُوهُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ (143) وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ (144) وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُؤَجَّلًا وَمَنْ يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَنْ يُرِدْ ثَوَابَ الْآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا وَسَنَجْزِي الشَّاكِرِينَ (145)﴾ [سورة آل عمران: 142-145].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: প্রত্যাশার রঙিন স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় বাস্তবতার কঠিন আঘাতে।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৪২। তোমরা কি মনে কর যে জান্নাতে তোমরা প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও জানেননি তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকেও।
১৪৩। আর তোমরা উহুদে ভয়ঙ্কর অবস্থার সাক্ষাত পাওয়ার পূবে শাহাদাত কামনা করতে, এখন তোমরা তা স¦চক্ষে তাকিয়ে দেখলে।
১৪৪। আর মোহাম্মদ কেবল একজন রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়ে গিয়েছে। সুতরাং যদি সে মারা যায় অথবা তাকে কতল করা হয়, তাহলে তোমরা কি পিছনের দিকে ফিরবে? আর যে ফিরে যাবে তার পিছনের দিকে, সে আল্লাহকে কখনো কোন ক্ষতি ক্ষতি করতে পারে না; আর অচিরেই আল্লাহ প্রতিদান দিবেন কৃতজ্ঞদের।
১৪৫। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যুহয় না, তা নির্দিষ্টভাবে লিখিত আছে। আর যে দুনিয়ার সওয়াব চায়, আমি তাকে তা দেই; আর যে আখেরাতের সওয়াব চায়, আমি তাকে তা দেই, এবং আমি অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দিব।
আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৪২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের তিরস্কার করেছেন এ কারণে যে, তারা মনে করেছিল শুধু ঈমান আনলেই জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব, কোনো জিহাদ বা কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি না হয়েও! অথচ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পরীক্ষা করেন জিহাদ ও বিপদের মাধ্যমে, যাতে প্রকৃত মুমিন ও মিথ্যা দাবিদারদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়, এবং ধৈর্যশীল, স্থিরচেতা ঈমানদারদেরকে আলাদা করে চেনানো যায়।
পরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাদের ধৈর্যের অভাব ও যুদ্ধক্ষেত্রে পিছু হটার কারণে তিরস্কার করেছেন, এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা সেইসব ব্যক্তিদের কথা, যারা তখন দুঃখ করেছিল যে, বদরে উপস্থিত না থাকার কারণে তারা কত বড় সওয়াব ও গনিমত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তারা প্রতিজ্ঞা করেছিল, ভবিষ্যতে যদি কখনো যুদ্ধের সুযোগ আসে, তারা সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেবে। কিন্তু যখন উহুদের যুদ্ধের সময় সেই সুযোগ এলো, তখন তারা ভীত হয়ে পড়ল, ধৈর্য হারাল এবং পলায়ন করল।
এরপর তৃতীয় আয়াত (১৪৪)-এ আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) সাহাবিদের প্রতি কঠোর ভৎসনা করেন। যুদ্ধ চলাকালে যখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠল এবং মুসলমানদের পেছন থেকে পাহারা দেওয়া তীরন্দাজরা স্থান ত্যাগ করল, তখন শত্রুরা পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে। এই সময় ইবনু কামীআহ নামক মুশরিক একটি পাথর ছুড়ে রাসূলুল্লাহর (সা.) মুখে আঘাত করে, এতে তার দাঁত ভেঙে যায় এবং কপাল ফেটে যায়। তারপর সে ঘোষণা করে- “মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন!”।
এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই মুসলমানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, অনেকে হতাশ হয়ে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়, কেউ কেউ বলে, “রাসূলুল্লাহ মারা গেলে আমরা কেন যুদ্ধ করব?” আবার কিছু মুনাফিক বলে, “চলো, আবদুল্লাহ ইবনু উবাই (মুনাফিকদের নেতা)-কে বলি, সে যেন আবু সুফিয়ান থেকে আমাদের জন্য নিরাপত্তার অঙ্গীকার নেয়, আমরা আগের ধর্মে ফিরে যাই!”। তখন আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন- তিনি একজন মানব ও রাসুল, আর তাঁর মৃত্যুতেই ইসলামের সমাপ্তি নয়। যেহেতু পূর্বের নবীরাও মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই তাঁর মৃত্যুতে কারও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
এরপর আল্লাহ কঠোরভাবে তিরস্কার করেন তাদেরকে, যারা ইবলিসের মুখে “মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন” এই গুজব শুনে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে কপটতা করে ইসলাম ত্যাগের কথাও বলে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন- যারা পলায়ন করেছে বা ধর্মত্যাগ করেছে, তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; আল্লাহ তাদের ঈমান বা সহায়তার মুখাপেক্ষী নন। বরং যারা স্থির থেকেছে, কৃতজ্ঞ থেকেছে এবং নবীর প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রেখেছে, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দেবেন।
অতপর চতুর্থ আয়াত তথা ১৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরেছেন:
(ক) জীবন-মৃত্যুর নির্ধারিত সময় ও আল্লাহর অনুমতি, কানো প্রাণ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মরতে পারে না। মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর কাছে নির্ধারিত, এমনকি মুহূর্ত পর্যন্ত নির্ভুলভাবে তা লিপিবদ্ধ। ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া কারো আত্মা কবজ করতে পারে না।
(খ) দুনিয়া ও আখিরাতের পুরস্কার নির্ভর করে নিয়তের ওপর, যে আল্লাহর নামে যুদ্ধ করে কিন্তু তার লক্ষ্য দুনিয়া লাভ, সে কিছু দুনিয়াবি পুরস্কার পেতে পারে, কিন্তু আখিরাতের কোনো পুরস্কার পাবে না। অপরদিকে যে শুধুমাত্র আখিরাতের পুরস্কার কামনা করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়াতেও যা নির্ধারিত তা দেন, আর আখিরাতে দেন চিরস্থায়ী জান্নাত ও এমন নাজাত যা “কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, কোনো হৃদয়ে কল্পনা হয়নি”। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৮৫-৩৮৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১০৮-১১৪; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৮; আল-মুনতাখাব: ১/১১০-১১১) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَمْ حَسِبْتُمْ﴾ ‘তোমরা কি মনে কর’, আয়াতাংশের অর্থ হলো- বরং তোমরা ভুল ধারণা করেছিলে, অথচ তোমাদের এমন ধারণা করা উচিত ছিল না। এখানে প্রশ্নটি আসলে তিরস্কারমূলক অর্থাৎ ভৎসনাসূচক প্রশ্ন। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪২) ।
﴿وَلَقَدْ كُنتُمْ تَمَنَّوْنَ المَوْتَ مِن قَبْلِ أَن تَلْقَوْهُ﴾ ‘আর তোমরা মৃত্যু কামনা করতে, তার সাক্ষাতের পূর্বে’, আয়াতাংশের উদ্দেশ্য হলো- মুসলিমদের মধ্যে কিছু মানুষ বদরের দিনের মতো একটি দিন কামনা করেছিল যাতে তারা তাতে লড়াই করে শহীদ হতে পারে; আল্লাহ তাদের উহুদ দিবসে সেই সত্য দেখালেন। সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে- তোমরা উহুদের যুদ্ধে মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে বদরের যুদ্ধে শহীদী মরণ প্রত্যাশা করেছিলে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৩) ।
﴿انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ﴾ ‘তোমরা তোমাদের পিছনের দিকে ফিরে যাবে’, অর্থাৎ: তোমরা ইসলাম ছেড়ে কুফরের দিকে ফিরে যাবে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৪) ।
﴿كِتَابًا مُّؤَجَّلًا﴾ ‘নির্দিষ্ট কিতাব’, অর্থাৎ: আল্লাহ তাআলা মানুষের মৃত্যুর সময় নির্ধারিত করেছেন এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে স্থির আছে; এটি এক মুহূর্তও আগাতে বা পিছিয়ে যেতে পারে না। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪৫) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আলোচনার ধারাবাহিকতা এখনো উহুদের বীর মুমিনদের নিয়েই। পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে তাদের উদ্দেশ্যে নির্দেশ এসেছে- দুঃখে ভেঙে পড়ো না, দুর্বল হয়ো না। যে বিপদ ও পরীক্ষা তোমাদের সম্মুখীন হয়েছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং তা এসেছে আল্লাহর চিরন্তন নিয়ম অনুসারে, যেখানে বিজয় ও পরাজয় পালাক্রমে মানুষের জীবনে আবর্তিত হয়, যেন সত্যনিষ্ঠ ও ঈমানদারদের অন্তরকে যাচাই করে পরিশুদ্ধ করা যায়। এই কঠিন পরীক্ষার মাঝেই নিহিত ছিল ঈমানের দৃঢ়তা ও আত্মিক সান্তনার বার্তা। যেন মুমিনরা জিহাদের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়, আর বিজয়ের উপযুক্ত গুণাবলি- সাহস, ত্যাগ, ধৈর্য ও ঐক্য অর্জন করতে শেখে।
আর উল্লেখিত আয়াতগুলো মুমিনদের শিক্ষা দেয় যে, পরকালের চিরসুখ লাভের পথ হলো জিহাদ ও ধৈর্যের মেহনতি যাত্রা, আর দুনিয়ার সাফল্যের চাবিকাঠি হলো আদর্শে অবিচল থাকা, যুদ্ধক্ষেত্রে নবীর পাশে ঐক্যবদ্ধ থাকা, ত্যাগ, ন্যায় ও ইনসাফে অটল থাকা; কারণ সত্য, সাহস ও ত্যাগের যে পথ, সেটিই মুমিনের প্রকৃত জীবনের পথ, যেখানে আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চূড়ান্ত মুক্তি। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১০৭-১০৮) ।
সূরাতু আলে-ইমরানের ১৪৩ ও ১৪৪ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন- সাহাবিদের একদল গভীর আকাক্সক্ষায় বলতেন, “হায়! যদি আমরা বদরের সাহাবিদের মতো শহীদ হতে পারতাম! যদি আমাদেরও বদরের দিনের মতো একটি দিন নসিব হতো, যেখানে আমরা মুশরিকদের মুখোমুখি হয়ে লড়াই করতাম, নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সাহসের পরিচয় দিতাম, আর আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে জান্নাত অর্জন করতাম। অথবা অন্তত জীবিকা ও সম্মান রক্ষা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতাম”। অবশেষে আল্লাহ তাঁদের সেই আকাক্সিক্ষত দিন দেখালেন উহুদের যুদ্ধের রূপে। কিন্তু সত্যিকারের দৃঢ়তা দেখাতে পারল কেবল তারা-ই, যাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা তা চেয়েছিলেন। আর তখনই নাজিল হলো অত্র সূরার ১৪৩ নং আয়াত। এই বাণী যেন স্মরণ করিয়ে দেয়- আকাক্সক্ষা সহজ, কিন্তু বাস্তব পরীক্ষা আসে দৃঢ়তা যাচাই করতে; সত্যিকারের মুমিন সেই, যে পরীক্ষার মুহূর্তে আল্লাহর পথে অবিচল থাকে, ত্যাগে, ধৈর্যে ও ঈমানের দৃঢ়তায় অটল থাকে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭১) ।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন- উহুদের দিনে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। আমি পাহাড়ের দিকে উঠলাম, এমন সময় শুনতে পেলাম কিছু ইহুদি বলছে, “মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন”। আমি তখন দৃঢ়স্বরে বললাম, “আমি যেন কাউকে না শুনি। যে বলে- মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন; সে কথা উচ্চারণকারীকে আমি তার গলা থেকে শিরচ্ছেদ করব!”। এরপর তাকিয়ে দেখি আল্লাহর রাসূল (সা.) জীবিত, আর সাহাবারা তাঁর চারপাশে পুনরায় সমবেত হচ্ছেন। তখনই নাজিল হলো ১৪৪ নং আয়াত:
ইবনু আবি হাতিম রাবি’ থেকে বর্ণনা করেন- উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিমরা গভীর আঘাতে জর্জরিত হলেন, তখন তাঁরা পরস্পর বলাবলি শুরু করলেন- “নবী নিহত হয়েছেন”। কিছু লোক বলল, “যদি তিনি সত্যিই নবী হতেন, তবে মারা যেতেন না”। অন্যরা দৃঢ়চিত্তে বলল, “তোমাদের নবী যাঁর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেছেন, তোমরাও সেই উদ্দেশ্যেই লড়ো, আল্লাহ তোমাদের বিজয় দিন, অথবা তোমরা শহীদ হয়ে তাঁর সঙ্গে মিলিত হও”। তখন আল্লাহ তায়ালা ১৪৪ নং আয়াত অবতীর্ণ করলেন।
আতিয়্যা আল-আউফি (র.) বলেন- উহুদের দিনে যখন অনেকেই পিছু হটলেন, কেউ কেউ বলল, “মুহাম্মদ আহত হয়েছেন, এখন আত্মসমর্পণ করো, এরা তো তোমাদের ভাই!”। অন্যরা বলল, “যদি মুহাম্মদ সত্যিই আহত হন, তবুও তোমরা সেই পথে এগিয়ে চলো, যেই পথে তোমাদের নবী এগিয়েছিলেন, যতক্ষণ না তাঁর সঙ্গে মিলিত হও”। তখন আল্লাহ তায়ালা ১৪৪ নং আয়াত নাযিল করলেন।
ইবনু রাহুয়াইহ (র.) তাঁর মুসনাদে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেন- উহুদের যুদ্ধে শয়তান চিৎকার করে ঘোষণা দিল, “মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন!”। কাব ইবনু মালিক (রা.) বলেন- “আমি ছিলাম প্রথম ব্যক্তি, যিনি রাসূলুল্লাহকে (সা.) চিনতে পেরেছিলাম। আমি তাঁর মুখমন্ডল দেখলাম হেলমেটের ফাঁক দিয়ে চোখদুটি জ্বলজ্বল করছে। আমি উচ্চ কণ্ঠে চিৎকার করে বললাম, ‘এ তো আল্লাহর রাসূল!’”। আর তখনই আল্লাহ তা‘আলা ১৪৪ নং আয়াত নাজিল করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭১-৭২) ।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৪৩ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) জান্নাত লাভ এতটা সহজ নয়, যতটা সহজ আমরা মনে করি। জান্নাত পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এ সম্পর্কে একটি আয়াতে এসেছে:
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا: آمَنَّا، وَهُمْ لا يُفْتَنُونَ﴾ [سور العنكبوت: ২].
অর্থ: “মানুষ কি ধারণা করে যে, তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে, অথচ তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আল-আনকাবুত: ২) । জান্নাত লাভের জন্য আল্লাহ তায়ালা দুইটি শর্ত উল্লেখ করেছেন:
(র) আল্লাহর পথে জিহাদ করা, জিহাদের অনেক ধরণ রয়েছে, (ক) নিজের নফস, প্রবৃত্তি ও শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ, বিশেষত যৌবনের সময়। (খ) আল্লাহর বাণীকে উচ্চে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দেশ ও ধর্ম রক্ষার উদ্দেশ্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপণ জিহাদ। (গ) অর্থের মাধ্যমে জিহাদ, অর্থাৎ দ্বীন, উম্মাহ ও জনকল্যাণে সম্পদ ব্যয় করা। (ঘ) মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১০৮)।
(রর) ধৈর্য ধারণ করা, ধৈর্য ধারণ করার ক্ষেত্রসমূহ হলো- (ক) নিয়মিত ও অস্থায়ী শরীয়তসম্মত দায়িত্ব পালনে, (খ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে, (গ) বিপদ, দুঃসময় ও পরীক্ষার মুহূর্তে, এবং (ঘ) শত্রুর মোকাবেলায় দৃঢ় থাকার সময়।
(খ) আয়াতের শেষের অংশে “আল্লাহ জানেন না” বলা দ্বারা বোঝানো হয়নি যে আল্লাহর জ্ঞান নেই; বরং এর অর্থ হলো- এখনও তা বাস্তবে প্রকাশ পায়নি বা ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তো অনন্ত কাল থেকেই সব জানেন; কিন্তু মানুষের সামনে প্রমাণ ও সাক্ষ্য স্থাপন করা হয় যেন তাদের আমল দ্বারা জান্নাত ও মাগফিরাত পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণিত হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১০৮)।
২। ১৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানবজীবনের একটি চরম বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, মানুষের প্রকৃতিতে একটি স্বাভাবিক প্রবণতা আছে- বড় কিছু অর্জনের আকাক্সক্ষা, সম্মান পাওয়ার ইচ্ছা এবং সাহসিকতার স্বপ্ন দেখা। কিন্তু যখন বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়, তখন অনেকে ভয়, দুর্বলতা ও স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়। এমনই এক শিক্ষা রয়েছে উহুদের যুদ্ধের ঘটনায়, যা আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যারা বদর যুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি, তারা আকাক্সক্ষা করেছিল- “যদি বদরের মত একটি সুযোগ আসতো এবং যুদ্ধে উপস্থিত থাকতে পারতাম, তবে প্রাণপণ লড়তাম, শহীদ হতাম, আল্লাহর পথে নিজেদের উৎসর্গ করতাম। কিন্তু যখন পরবর্তী বছর উহুদের ময়দানে সত্যিকার অর্থে যুদ্ধ উপস্থিত হলো- বর্শার ঝনঝন, তীরের শব্দ, মৃত্যু ও রক্তের বাস্তব চিত্র চোখের সামনে দেখা দিল, তখন তাদের একদল ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন একা দাঁড়িয়ে রইলেন, শত্রুর তীর নিজের উপর নিচ্ছিলেন, আর তাঁর সাথিদের আহ্বান করছিলেন: “এসো! আমার পাশে দাঁড়াও, ধৈর্য ধরো, আল্লাহর পথে দৃঢ় থাকো”। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আল্লাহর পথে সাফল্য, মর্যাদা ও জান্নাত চাওয়া যথেষ্ট নয়; এর জন্য আত্মসংযম, ধৈর্য ও সাহস অপরিহার্য। সুতরাং একজন মুমিনের হওয়া উচিৎ এমন, সে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু বাস্তবতার মুখে ভয় পায় না; সে প্রতিজ্ঞা করে এবং সেই প্রতিজ্ঞার মূল্য দিতে পস্তুত থাকে; বিপদের সময়ও সে রাসুলুল্লাহর (সা.) এর অনুসরণ থেকে পিছ পা হয় না; তার ঈমান কেবল মুখের কথা নয়, বাস্তব পরীক্ষায়ও তা প্রমাণিত হয়। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। ১৪৪ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়-
(ক) রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যান্য নবী-রাসূলদের মতো মানুষ, রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত একজন নবী ও রাসূল, যেমন পূর্বে মুসা, ঈসা, জাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আ.) ছিলেন। তাঁদের কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ শহীদ হয়েছেন; তবুও তাদের দীন অটুট থেকেছে। তেমনি রাসুলুল্লাহ-ও (সা.) মৃত্যুবরণ করবেন, কিন্তু ইসলাম ধর্ম চিরস্থায়ী থাকবে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা) একজন মানুষ, কিন্তু তিনি যে বার্তা এনেছেন, সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১০৯-১১০) ।
(খ) রাসূলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুর পর কেউ দীন ত্যাগ করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হবে না, যে কেউ রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুর পর ঈমান থেকে ফিরে যাবে, দীন ছেড়ে দেবে বা জিহাদ থেকে সরে দাঁড়াবে, সে নিজেরই ক্ষতি করবে; আল্লাহর কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহ স্বয়ং সম্পূর্ণ, তাঁর দীনও তাঁর ইচ্ছায় টিকে থাকবে। মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলেও সত্য ও ন্যায় কখনো নষ্ট হয় না।
(গ) রাসূলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুর পরও যারা দীনের উপর অটল থাকবে, তাদের পুরস্কার, যারা রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবদ্দশায় যেমন তাঁর আনুগত্য করেছে, তাঁর মৃত্যুর পরও তেমনি ইসলামের পথে দৃঢ় থাকবে, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। তাঁদের জন্য থাকবে আল্লাহর বিশেষ রহমত, সন্তুষ্টি ও জান্নাতের প্রতিদান। কারণ দীন আল্লাহর, আর যারা দীনকে রক্ষা করে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
৪। ১৪৫ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়-
(ক) জীবন-মৃত্যু আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, আল্লাহ তায়ালা জানিয়েছেন, কেউই আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে মারা যায় না। প্রত্যেক মানুষের জীবন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে বাঁধা, যেটি “কিতাবান মুঅজ্জালান” (নির্ধারিত সময়) হিসেবে আল্লাহর জ্ঞানে লেখা রয়েছে। তাই দেখা যায় যুদ্ধক্ষেত্রে যে সাহসীভাবে লড়াই করে সে হয়তো বেঁচে যায়, আর যে কাপুরুষ ঘরে লুকিয়ে থাকে, সেও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায় না। আল্লাহ বলেন:
﴿وَمَا يُعَمَّرُ مِنْ مُعَمَّرٍ وَلَا يُنْقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾ [سورة الفاطر: ১১].
অর্থ: “যার আয়ু দীর্ঘ করা হয় বা কমিয়ে দেওয়া হয়, সবই একটি নির্ধারিত কিতাবে লেখা” (সূরাতু আল-ফাতির:১১) । আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ﴾ [سورة النحل: ৬১].
অর্থ: “যখন তাদের নির্ধারিত সময় এসে যায়, তারা এক মুহূর্তও এগিয়ে বা পেছনে যেতে পারে না।” (সূরাতু আন-নাহল:৬১) । অর্থাৎ: মানুষের জীবন ও মৃত্যু সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে; সাহস বা ভয়, যুদ্ধ বা শান্তি, কিছুই তাতে পরিবর্তন আনতে পারে না। সুতরাং কেউ মৃত্যুভয়ে দায়িত্ব থেকে পিছু হটবে না। মৃত্যু নির্দিষ্ট সময়েই আসবে, তাই ভীত না হয়ে দায়িত্ব পালনই উচিত।
(খ) মানুষ দুই দলে বিভক্ত: দুনিয়াপ্রেমী ও আখিরাতপ্রেমী, আল্লাহ তায়ালা মানুষের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: (ক) যারা কেবল দুনিয়া চায় এবং (খ) যারা আখিরাতকে লক্ষ্য করে কাজ করে। যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়ার স্বার্থে কাজ করে, সে কেবল সেইটুকুই পায় যা আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকে না। আর যে ব্যক্তি আখিরাতকে লক্ষ্য করে কাজ করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়েই উত্তম পুরস্কার দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ﴾ [سورة الشورى: ২০].
অর্থ: “যে ব্যক্তি আখিরাতের ফসল চায়, আমি তার ফসল বৃদ্ধি করি; আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার ফসল চায়, আমি তাকে তার কিছু অংশ দিই, কিন্তু আখিরাতে তার কিছুই নেই।” (সূরাতু আশ-শূরা: ২০) ।
﴿مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَدْحُورًا (১৮) وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُورًا (১৯)﴾ [سورة الإسراء: ১৮-১৯].
অর্থ: “যে ব্যক্তি কেবল সাময়িক দুনিয়ার স্বার্থ চায়, আমরা তাকে সেই দুনিয়ার যা ইচ্ছা তা তাড়াহুড়ো করে দিই, তবে পরবর্তী ফলাফলের জন্য তাকে জাহান্নামে পাঠাই, যেখানে সে শাস্তিপ্রাপ্ত ও হেয় হয়। আর যে ব্যক্তি আখিরাতকে চায় এবং বিশ্বাসী হয়ে তার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করে, তাদের চেষ্টা ও পরিশ্রম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসনীয় হয়” (সূরাতু আল-ইসরা: ১৮-১৯) । সুতরাং জীবনের উদ্দেশ্য নির্ভর করে নিয়তের উপর। দুনিয়া সাময়িক, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। তাই জ্ঞানী মানুষ সেই লক্ষ্যই বেছে নেয় যা স্থায়ী-আখিরাত।
(গ) মুমিনের প্রকৃতি আল্লাহর উপর আস্থা ও কৃতজ্ঞতা, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন: “আমরা কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেব”। অর্থাৎ, যারা রাসূলের আদেশ মেনে চলে, পরাজয়ের ভয় বা লোভে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। আর যারা লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে রাসূলুল্লাহর আদেশ অমান্য করেছিল (যেমন উহুদের ঘটনায় হয়েছিল), তারা সামান্য দুনিয়া পেলেও আখিরাতের কল্যাণ হারিয়েছে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) জান্নাত লাভ কেবল মুখের আশা বা কল্পনা নয়; বরং তা অর্জনের জন্য সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ঈমানের সত্যতা যাচাই করেন কঠিন সময় ও বিপদের মধ্য দিয়ে। তাই জান্নাতের প্রত্যাশা যেন কর্মে ও ত্যাগে প্রকাশ পায়।
(খ) রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন দাওয়াত ও নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু তিনি-ও মানুষ, মৃত্যু তাঁর জন্যও অবধারিত। সুতরাং তাঁর মৃত্যুর পরও হতাশ না হয়ে তাঁর দাওয়াত, তাঁর আদর্শ ও তাঁর মিশনে অবিচল থাকা মুমিনদের দায়িত্ব। ইসলামের ধারক হতে হলে নববী দাওয়াতের পথেই অটল থাকতে হবে।

(গ) জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়, কারও সাহসে আয়ু বাড়ে না, ভয়ে আয়ু কমেও না। তাই ভয় বা ঝুঁকি এড়িয়ে নয়, বরং এই বিশ্বাসে কাজ করতে হবে যে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দাওয়াত, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্যে থাকাই প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়।
(ঘ) দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী ও প্রতারণার বস্তু; আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। যে দাওয়াত, জ্ঞান, ত্যাগ ও কর্ম আখিরাতমুখী, আল্লাহ তার প্রতিদান দেন দ্বিগুণভাবে দুনিয়ায় বরকত দিয়ে এবং আখিরাতে অনন্ত পুরস্কারে ভূষিত করে।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৩৭-১৪১) আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: চিরন্তন নিয়ম থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহবান।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ (137) هَذَا بَيَانٌ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِلْمُتَّقِينَ (138) وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (139) إِنْ يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ (140) وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِينَ (141)﴾ [سورة آل عمران: 137-141].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: চিরন্তন নিয়ম থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহবান।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৩৭। তোমাদের পূর্বে অনেক ঘটনা অতিবাহিত হয়েছে, সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো মিথ্যাবাদীদের পরিণতি কেমন ছিল।
১৩৮। এটা মানবজাতির জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়েত এবং উপদেশ মোত্তাকীদের জন্য।
১৩৯। আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না; আর তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো।
১৪০। যদি উহুদের যুদ্ধে কোন আঘাত তোমাদের লেগে থাকে, তবে অবশ্যই ঐ কওমকে বদর যুদ্ধে অনুরুপ আঘাত স্পর্শ করেছে, ঐ দিনগুলো যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করে থাকি, এবং যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে জানতে পারেন, এবং তোমাদের একদলকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন; আর আল্লাহ যালেমদেরকে ভালোবাসেন না।
১৪১। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন এবং কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ণ করতে পারেন।
আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের পূর্বে বহু জাতির ইতিহাস অতিক্রান্ত হয়েছে, যেমন নূহ (আঃ)-এর জাতি, আদ, সামূদ ও অন্যান্য সম্প্রদায়। তাদের প্রতিও আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তারা সেই রাসূলদের অস্বীকার করেছিল। ফলে আল্লাহর সুন্নাহ (নির্ধারিত নীতি) তাদের ওপর কার্যকর হয়, তিনি মিথ্যাবাদীদের ধ্বংস করেন এবং মুমিনদের রক্ষা করেন, যদিও মুমিনরা তাদের হাতে কিছু কষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেছিল।
আজও সেই একই আল্লাহর নীতি বহাল থাকবে, তিনিই মুসলমানদেরকে রক্ষা করবেন, বিজয় দান করবেন, আর তাদের শত্রুদের ধ্বংস করবেন। যদি এ বিষয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকে, তবে সে যেন পৃথিবীতে ভ্রমণ করে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর নিদর্শন দেখে আসে, তারা কী ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল তা নিজ চোখে দেখবে।
এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন: এই আয়াতগুলো মানুষদের জন্য এক স্পষ্ট ব্যাখ্যা, যাতে তারা হক ও বাতিল, হিদায়াত ও গোমরাহির পার্থক্য বুঝতে পারে। এগুলো হিদায়াত ও উপদেশ, যা মোত্তাকীদের অন্তর স্পর্শ করে, কেননা তাদের ঈমান ও তাকওয়ার কারণে তারা শিক্ষা গ্রহণে প্রস্তুত থাকে। ফলে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে সফলতা অর্জন করে।
এর পরে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে শান্তনা দিয়েছেন, উহুদের যুদ্ধে আকস্মিক ও ক্ষাণিক পরাজয়ের কারণে তারা যেন দুর্বল ও দুঃখিত না হয়, বরং তারাই শ্রেষ্ঠ ও বিজয়ী। অর্থাৎ, মুমিনরা যেন জিহাদ ও কর্ম থেকে বিমুখ না হয়, শহীদ ও আহতদের কারণে শোকাহত হয়ে বসে না থাকে। কারণ তারাই প্রকৃত বিজয়ী, অতীতে যেমন ছিলে, ভবিষ্যতেও তেমনই হবে, যদি তারা ঈমান ও তাকওয়ায় দৃঢ় থাকে।
জেনে রেখো, যদি মুমিনরা উহুদের যুদ্ধে কষ্ট পায়, আহত হয় বা শহীদ হয়, তবে তাদের শত্রুরাও বদরের যুদ্ধে একই কষ্ট ভোগ করেছে। যুদ্ধের স্বভাবই হলো- একদিন এক পক্ষের জন্য, আরেকদিন তাদের বিরুদ্ধে। এটি আল্লাহর এক নির্ধারিত নিয়ম (সুন্নাহ)। এ কথাই আল্লাহ বলেন: “আমি এই দিনগুলো মানুষদের মাঝে অদলবদল করি”।
মুমিনদেরকে শান্তনা প্রদান শেষে আল্লাহ তায়ালা উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়ীক পরাজয়ের কয়েকটি উদ্দেশ্য ও রহস্য প্রকাশ করেন।
(ক) এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকৃত মুমিনদের ঈমান প্রকাশ করার মাধ্যমে মুনাফিকদেরকে উলঙ্গ করে ফেলা। যেমন দেখা গেল, মুনাফিকরা তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সলুলের নেতৃত্বে যুদ্ধের আগেই ফিরে যায়, আর প্রকৃত মুমিনরা দৃঢ়ভাবে থেকে যায় এবং যুদ্ধ করে।
(খ) কিছু মুমিনকে শাহাদাতের মর্যাদা লাভে ধন্য করা। যেমন উহুদের যুদ্ধে তাদের মধ্য থেকে শহীদদের বেছে নেন, প্রায় সত্তরজন সাহাবি শহীদ হন, যাদের মধ্যে চারজন ছিলেন মুহাজির, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা.) চাচা হযরত হামযা (রা:) ও মুসআব ইবনু উমায়র (রা:); বাকিরা ছিলেন আনসার।
(গ) মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করা ও কাফিরদেরকে ধ্বংস করা, উহুদের যুদ্ধে সাময়িক পরাজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ মুমিনদের গুনাহ মাফ করেন ও তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কুফরীদের ধ্বংস করেন ও তাদের অস্তিত্ব মুছে দেন।
এই শিক্ষা মুমিনদের জন্য পরবর্তীতে মহাসৌভাগ্য বয়ে আনে, এরপর তারা আর কখনও রাসূলুল্লাহর (সা.) আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। ফলস্বরূপ, একের পর এক বিজয় লাভ করে তারা আরব উপদ্বীপ থেকে কুফর ও অবিশ্বাসের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৮২-৩৮৩; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৯৯-১০১; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৭-৬৮; আল-মুনতাখাব: ১/১০৯-১১০) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿سُنَنٌ﴾ ‘সুনান’, আরবী “সুন্নাহ” শব্দের বহুবচন হলো “সুনান”। এর অর্থ হচ্ছে- কোনো ব্যক্তি বা সমাজের জীবনধারা, আচরণ বা চলার পদ্ধতি; যেভাবে তারা কাজ করে, চিন্তা করে এবং জীবন পরিচালনা করে। “আল্লাহর সুনান” বলতে বোঝায়- সৃষ্টিজগতে আল্লাহ তায়ালা যে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম স্থির করেছেন, তা-ই তাঁর সুনান। এই নিয়ম অনুযায়ী তিনি মানুষকে পরীক্ষা করেন, সৎকর্মশীলদের সাহায্য ও সফলতা দান করেন, আর অন্যায়কারীদের শাস্তি প্রদান করেন। আল্লাহর এই নিয়ম বা আইন কখনো পরিবর্তন হয় না। ইতিহাসের ধারায় দেখা যায়, যে জাতি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছে, তারা সফলতা অর্জন করেছে; আর যারা অবিচার, মিথ্যাচার ও অবাধ্যতার পথে চলেছে, তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৩৭) ।
﴿نُدَاوِلُهَا﴾ ‘আমি তার পালাবদল করি’, আরবী শব্দটি المداولة থেকে এসছে, যার অর্থ হলো- কোনো জিনিস এক ব্যক্তি বা দলের কাছ থেকে অন্যের কাছে স্থানান্তরিত হওয়া। এর ব্যাখ্যা হলো- দুনিয়ার দিন ও সময় এক অবস্থায় স্থির থাকে না; এটি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে ঘুরে বেড়ায়। কখনো জয়-পরাজয়ের পালা এক দলের পক্ষে যায়, আবার অন্য সময়ে তা অন্য দলের পক্ষে আসে। যেমন- বদর যুদ্ধের দিনে আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেছিলেন। তারা কোরায়শদের মধ্যে সত্তরজনকে হত্যা করে এবং আরও সত্তরজনকে বন্দি করেছিল। কিন্তু উহুদ যুদ্ধে পরিস্থিতি পাল্টে যায়; সেখানে মুশরিকরা কিছু সময়ের জন্য প্রাধান্য লাভ করে, মুসলমানদের মধ্যে সত্তরজন আহত হন এবং পঁচাত্তরজন শাহাদত বরণ করেন। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪০) ।
এ থেকেই বোঝা যায়, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পৃথিবীতে সাফল্য ও পরাজয় একে অপরের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে, যেন মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে, ধৈর্য ও ঈমানে দৃঢ় থাকে, এবং পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়। (আল্লাহই ভালো জানেন)
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে উহুদের ঘটনার কথা এবং তার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর তাদেরকে বদরের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে অল্পসংখ্যক ও স্বল্প অস্ত্র-শস্ত্র থাকা সত্তে¡ও আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেছিলেন। আর এই আয়াতগুলো এবং পরবর্তী অংশে আল্লাহ তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সৃষ্টি জগতে প্রচলিত নিয়ম ও বিধান (সুন্নাতুল্লাহ)-এর কথা, যারা এই নিয়ম অনুসরণ করে, তারা সফলতা ও সুখ লাভ করে; আর যারা তা থেকে বিচ্যুত হয়, তারা পথভ্রষ্ট হয় এবং শেষপরিণতিতে ধ্বংস ও হতাশার মুখে পড়ে। সত্যের উপর মিথ্যার প্রাথমিক প্রভাব বা আধিপত্য যতই প্রবল মনে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয়ী হবে, এ প্রতিশ্রæতি আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মাধ্যমে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন: “আর অবশ্যই আমাদের এই বাণী আমাদের প্রেরিত বান্দাদের জন্য পূর্বেই নির্ধারিত হয়ে গেছে, নিশ্চয়ই তারাই বিজয়ী হবে, আর নিশ্চয়ই আমাদের সৈন্যরাই বিজয়ী” (সূরাতু আস-সাফফাত ৩৭: ১৭১-১৭৩) । এবং আরও বলেন: “আমি জিকর (তাওরাত)-এর পর যাবুরে লিখে দিয়েছি যে, পৃথিবী আমার সৎকর্মশীল বান্দারাই উত্তরাধিকারী হবে” (সূরাতু আল-আম্বিয়া ২১: ১০৫) ।
সূরাতু আলে-ইমরানের ১৩৯ ও ১৪০ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবারা পরাজিত হয়ে পিছু হটেছিলেন। তারা সেই অবস্থায় থাকতেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (তখনও মুসলমান হননি) মুশরিকদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) দোয়া করলেন:
“اللهم لا يعلونّ علينا، اللهم لا قوّة لنا إلا بك، اللهم ليس يعبدك بهذه البلدة غير هؤلاء النّفر”.
“হে আল্লাহ! তারা যেন আমাদের ওপর প্রাধান্য না পায়। হে আল্লাহ! আমাদের কোনো শক্তি নেই তোমার সাহায্য ছাড়া। হে আল্লাহ! এই শহরে তোমার ইবাদত করছে শুধু এই অল্পসংখ্যক লোকেরা”। এরপর আল্লাহ তায়ালা ১৩৯ নং আয়াত নাজিল করেন।
রাশিদ ইবনু সা‘দ বলেন, উহুদের যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছিলেন। সেই সময় নারীরা তাদের নিহত স্বামী বা পুত্রদের লাশ দেখে আহাজারি করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: أهكذا يفعل برسولك؟ “এভাবেই কি তোমার রাসুলের সঙ্গে আচরণ করা হয়, হে আল্লাহ?” এ কথার পর আল্লাহ তায়ালা ১৪০ নং আয়াত অবতীর্ণ করে রাসূলুল্লাহকে (সা.) শান্তনা প্রদান করেন। (আসাবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/২৫০) ।
ইকরিমা (র.) বলেন, যখন উহুদের যুদ্ধের খবর বিলম্বে পৌঁছায়, তখন নারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়লেন খবর জানার জন্য। তারা দেখতে পেলেন, দুই ব্যক্তি একটি উটের পিঠে চড়ে আসছেন। এক নারী তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “রাসুলুল্লাহর (সা.) কী অবস্থা?” তারা বললেন, “তিনি জীবিত আছেন”। তখন নারীটি বললেন, “তাহলে আমি কিছু পরোয়া করি না, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে শহীদ বেছে নিন”। এরপর আল্লাহ তায়ালা ঐ নারীর কথারই প্রতিফলন হিসেবে ১৪০ নং আয়াতের শেষাংশ “আর আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে শহীদ বেছে নেবেন” অবতীর্ণ করেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ১/৭১) ।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৩৭ নং আয়াত থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সুস্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়-
(ক) অতীত ইতিহাসে অস্বীকারকারীদের কঠিন পরিণতির বর্ণনা, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকারকারী ও সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের ওপর বহুবার শাস্তি প্রয়োগ করেছেন। যেমন কওমে নূহ (আ.), আদ, সামূদ, লূত ও ফেরাউনের জাতি নিজেদের অবাধ্যতা ও অহংকারের কারণে আল্লাহর কঠোর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
(খ) মানবজাতিকে অতীত ধ্বংসস্তুপ পরিদর্শনের প্রতি উৎসাহ প্রদান, আয়াত মানুষকে আহ্বান জানায়, যালেম ও মিথ্যাবাদীদের প্রতি আল্লাহর শাস্তির নিদর্শনসমূহ পরিদর্শন করে শিক্ষা গ্রহণ করতে। ইতিহাসের সেই ধ্বংসস্তুপগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের পরিণতি কখনোই মঙ্গলজনক হয় না।
(গ) অবিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলোর ভয়াবহ পরিণতির কারণ অনুসন্ধান, আয়াতটি আরও উৎসাহিত করে অনুসন্ধান করতে, যালেম ও অবিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলো কোন কারণেই বা এমন ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল; যেন মানুষ তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, অন্যায়ের পথ ত্যাগ করে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
২। ১৩৮ নং আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল-কোরআনে অতীত জাতিসমূহের ভয়াবহ পরিণতির ঘটনাবলি তিনটি উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে:
(ক) পরবর্তী প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা ও সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য,
(খ) তাদেরকে সত্য ও সৎপথের দিশা প্রদানের জন্য, এবং
(গ) মোত্তাকীদের হৃদয়ে উপদেশ ও অনুপ্রেরণা জাগ্রত করার জন্য।
এ সম্পর্কে সূরাতু আল-বাক্বারার ১৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ﴾ [سورة البقرة: ১৮৫].
অর্থ: “রমাযান মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, হেদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ১৮৫) ।
৩। ১৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানবজীবনের সফলতা ও মর্যাদার মূল ভিত্তি হিসেবে ঈমানকে শর্তারোপ করেছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়:
(ক) মানুষ তখনই জীবনে প্রকৃত শক্তি ও সাহস অর্জন করতে পারে, যখন তার অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা থাকে। ঈমানই মানুষকে দুঃসময়ে অবিচল রাখে এবং হতাশার পরিবর্তে আশা ও আত্মবিশ্বাস জোগায়।
(খ) যাদের অন্তরে ঈমান জাগ্রত থাকে, তারা দুশ্চিন্তা, ভয় ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে; কারণ তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস কওে যে, সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে। এই বিশ্বাস তাদের অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা এনে দেয়।
(গ) সর্বশেষে, প্রকৃত ঈমানদাররাই পৃথিবীতে মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে।
অতএব, জীবনের শক্তি, প্রশান্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব এই তিনটি মহামূল্যবান বিষয় অর্জনের মূলে নিহিত রয়েছে দৃঢ় ও খাঁটি ঈমান।
৪। ১৪০ ও ১৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতে তাঁর নির্ধারিত চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় নিয়মের গভীর চারটি রহস্য উন্মোচন করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থায় তাঁর প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচার প্রতিফলিত করেছেন। সেগুলো হলো:
(ক) মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমাজজীবনে ভারসাম্য ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে কেউ স্থায়ীভাবে বিজয়ী বা পরাজিত না থাকে, বরং উত্থান-পতনের মাধ্যমে জীবন ও ইতিহাসে শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
(খ) পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত ঈমানদারদেরকে কপট ও ভন্ডদের থেকে পৃথক করা, যেন স্পষ্ট হয় কারা আল্লাহর পথে দৃঢ় ও অবিচল, আর কারা সামান্য বিপদে বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়।
(গ) সংগ্রাম ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আল্লাহর পথে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদেরকে বের করে আনা, যাতে তাদের মাধ্যমে ঈমান, সাহস ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
(ঘ) কাফেরদের ধ্বংস সাধন করে ঈমানদারদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী করা, যাতে সত্য ও ন্যায়ের পতাকা বিশ্বময় সমুন্নত থাকে।
অতএব, এই আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বুঝিয়ে দিয়েছেন, দুনিয়ার ঘটনা ও পরিবর্তন কেবল কাকতালীয় নয়; বরং প্রতিটি উত্থান-পতনের পেছনে রয়েছে এক মহান উদ্দেশ্য, যা মানুষের শিক্ষা, পরীক্ষার মাপকাঠি ও ঈমানের পরিশুদ্ধতার প্রক্রিয়া।
আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) অতীতের মিথ্যাবাদী জাতিগুলোর পতনের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ পরিদর্শন করে তাদের পরিণতি থেকে গভীর শিক্ষা ও সতর্কতা গ্রহণ করা।
(খ) কোরআনের উপদেশ ও হিদায়াত থেকে উপকৃত হতে হলে অন্তরে আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করা এবং তাকওয়ার মাধ্যমে হৃদয়কে ন¤্র ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
(গ) আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত চিরন্তন অপরিবর্তনীয় নিয়মকে আন্তরিকভাবে মেনে নিয়ে ঈমানকে পরিশুদ্ধ ও দৃঢ় করা, যেন জীবনে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা যায়।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৩৪-১৩৬) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মোত্তাকীর বৈশিষ্ট্য এবং পুরষ্কার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ (134) وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ (135) أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ (136)﴾ [سورة آل عمران: 134-136].

 

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: মোত্তাকীর বৈশিষ্ট্য এবং পুরষ্কার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৩৪। মোত্তাকী হলো- তারা, যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে, ক্রোধকে সংবরণ করে, এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন ।
১৩৫। এবং যারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নফসের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর ক্ষমা চায় তাদের গুনাহের জন্য। আর কে ক্ষমা করতে পারে পাপকে আল্লাহ ছাড়া? এবং তারা জেনে শুনে কৃত অপরাধের উপর অবিচল থাকে না।
১৩৬। এরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা, এবং জান্নাতসমূহ, যার নিচে নহরসমূহ প্রবাহিত হয়েছে। তারা সেখানে স্থায়ী হবে, আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ থেকে ১৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এক অনন্য হৃদয়স্পর্শী চিত্র এঁকেছেন পরহেজগার বা মোত্তাকী মানুষের জীবনধারার। সেখানে মোত্তাকীর ছয়টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন:
(ক) মোত্তাকীগণ সুখের সময় যেমন উদার হয়, তেমনি কষ্টের সময়ও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। তাদের উদারতা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি অটল বিশ্বাস থেকে উৎসারিত।
(খ) তারা রাগকে সংবরণ করে রাখে; প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্তে¡ও ক্ষমা করে দেয়।
(গ) তারা মানুষের প্রতি হিংসা নয়, বরং দয়া ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
(ঘ) তারা অন্যের প্রতি সর্বদা ইহসান করে। কারো শত্রæতার জবাব দেয় ভালোবাসা দিয়ে, শত্রæতা দিয়ে নয়। এ গুণের অধিকারী মানুষদের আল্লাহ বিশেষভাবে ভালোবাসেন, কারণ এ গুণগুলো আল্লাহরই গুণাবলি- করুণা, ক্ষমা ও দয়ার প্রতিফলন।
(ঙ) তারা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পরই নিজেদের ভুল বুঝে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, কারণ তারা জানে- আল্লাহ ব্যতীত কেউই ক্ষমা করার অধিকারী নন।
(চ) তারা কখনো গুনাহে স্থির থাকে না বা তা অবহেলায় চালিয়ে যায় না; বরং তা থেকে সরে এসে নিজেদের সংশোধন করে।
এইরূপ চরিত্রবান ও আত্মসচেতন মানুষদের জন্য আল্লাহ দুইটি পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন:
(ক) তাদের জীবনের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করা হবে।
(খ) তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে; এমন জান্নাতে, যার নিচ দিয়ে নদী বয়ে যায়, যেখানে নেই কোনো ভয়, নেই কোনো দুঃখ, শুধু শান্তি ও পরম আনন্দ। আর অপরাধের ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া একটি মহা পুরস্কার। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭৯-৩৮০; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৬-৮৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৭; আল-মুনতাখাব: ১/১০৯) ।
এই আয়াতগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে তাকওয়া কেবল ইবাদতের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা প্রকাশ পায় জীবনের প্রতিটি আচরণে, দানশীলতায়, রাগ নিয়ন্ত্রণে, ক্ষমাশীলতায় এবং ভুলের পর দ্রæত তাওবা করে ফেরার মাধ্যমে। যারা এই সুন্দর গুণগুলো ধারণ করে, তারাই প্রকৃত অর্থে আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও জান্নাতের উত্তরাধিকারী।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ﴾ ‘সুসময়ে এবং দুঃসময়ে’, প্রথমত, ‘আস সাররাা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আনন্দের বা সুখের সময়, যা হলো সমৃদ্ধি, স্বচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের অবস্থা। এই সময় মানুষ সাধারণত আনন্দে থাকে, মন প্রশান্ত থাকে, এবং ইচ্ছেমতো ব্যয় বা উপভোগ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ‘আদ দাররাা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কষ্ট বা বিপদের সময়, যা হলো দারিদ্র্য, অভাব বা সংকটের অবস্থা। এ সময় মানুষ বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রয়োজন হয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭৮) ।
﴿الْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ﴾ ‘ক্রোধকে সংবরণকারী’, “غَيْظٌ” বা রাগ হলো এমন এক অন্তরের যন্ত্রণা বা মানসিক কষ্ট, যা তখনই জন্ম নেয় যখন কেউ নিজের দেহে, মান-সম্মানে বা সম্পদে অন্যের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, কারণ কষ্ট পেলে রাগ ওঠা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু “كَظْمُ الْغَيْظِ” মানে হলো সেই রাগকে হৃদয়ের ভেতরে আটকে রাখা, যেন তা কথা বা কাজে প্রকাশ না পায়, যেমন গালাগাল করা, ঝগড়া শুরু করা, বা প্রতিশোধ নেওয়া। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৩৪) ।
﴿الْعَافِينَ﴾ ‘ক্ষমাকারী’, এখানে “العَفْوُ” বা ক্ষমা শব্দের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ক্ষমা মানে শুধু কাউকে শাস্তি না দেওয়া নয়; বরং এমন এক মহৎ গুণ, যেখানে মানুষ প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও মন থেকে দোষারোপ না করে অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়। অর্থাৎ, প্রতিশোধের সুযোগ থাকা অবস্থায় উদার হৃদয়ে ক্ষমা প্রদর্শনই প্রকৃত ‘আফও’। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৩৪) ।
﴿فَاحِشَةً﴾ ‘অশ্লীল কাজ’, এমন কাজ বা আচরণ, যা অত্যন্ত ঘৃণিত ও লজ্জাজনক। এটি এমন কোনো গুরুতর ও অশোভন পাপাচারকে বোঝায়, যা নৈতিকভাবে অত্যন্ত নিন্দনীয়, যেমন ব্যভিচার এবং অন্যান্য বড় বড় গুনাহ। অর্থাৎ, “الفاحشة” বলতে এমন কুকর্মকে বোঝানো হয়, যা মানুষ ও সমাজ উভয়ের কাছেই জঘন্য ও নিন্দনীয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ৩৭৮) ।
﴿لَمْ يُصِرُّوا﴾ ‘তারা অটল থাকে না’, আয়াতাংশ আরবী শব্দ ইসরার থেকে এসেছে, যার অর্থ বারংবার করা। অর্থাৎ তোয়াক্কা না করে খারাপ কাজ বারংবার করা এবং তার উপর অটল থাকা। আর মোত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য হলো- তারা খারাপ কাজের উপর অটল থাকে না। (আল-মুন্তাখাব: ১/৯২) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আল্লাহ তায়ালা পূর্বের আয়াত তথা ১৩৩ নং আয়াতে জান্নাতে কেবল মোত্তাকীগণ প্রবেশ করবেন, বিষয়ে কথা বলেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে মোত্তাকীর কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। সুতরাং উল্লেখিত আয়াতের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক স্পষ্ট।

১৩৫ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন: এই আয়াতটি নাবহান আত-তাম্মার (একজন খেজুর বিক্রেতা), যার উপনাম ছিল আবু মুকবিল, তাকে নিয়ে নাজিল হয়। একদিন এক সুন্দরী মহিলা তার কাছে খেজুর কিনতে আসেন। খেজুর বিক্রির সময় নাবহান তাকে নিজের দিকে টেনে নেয় এবং চুম্বন করে ফেলে। পরে তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত হন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে ঘটনাটি অকপটে বর্ণনা করেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন, যাতে পাপের পর অনুতাপ ও তওবার গুরুত্ব প্রকাশ পায়। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৭)।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। (১৩৪-১৩৫) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ একজন জান্নাতী মোত্তাকীর পাঁচটি গুণ বর্ণনা করেছেন:
(ক) সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থায় আল্লাহর পথে দান করা, সুখে-দুঃখে দান করা মানে- আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর ওপরে স্থান দেওয়া। দুঃখে দান মানুষকে আত্মত্যাগী করে তোলে, সমাজে সহানুভূতির সেতু গড়ে। এতে দাতা-গ্রহীতা উভয়ের হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ (সা.) দানকে ঈমানের প্রমাণ বলেছেন। এ সম্পর্কে প্রশিদ্ধ দুইটি হাদীস রয়েছে, আবু মালিক আল-আশআরী থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“الطُّهُورُ شَطْرُ الإيمانِ، والْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلأُ المِيزانَ، وسُبْحانَ اللهِ والْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلَآنِ -أَوْ تَمْلأُ- ما بيْنَ السَّمَواتِ والأرْضِ، والصَّلاةُ نُورٌ، والصَّدَقَةُ بُرْهانٌ، والصَّبْرُ ضِياءٌ، والْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ، أوْ عَلَيْكَ، كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبايِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُها، أوْ مُوبِقُها” (صحيح مسلم: ২২৩).
অর্থ: “আলহামদুলিল্লাহ” (সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য) উচ্চারণ করলে তা আমলনামার পাল্লা পূর্ণ করে দেয়। আর “সুবহানাল্লাহ” (আল্লাহ পবিত্র) ও “আলহামদুলিল্লাহ”, এই দুটি বাক্য আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে ফেলে। নামায হলো নূর (আলোক), সদকা হলো প্রমাণ (ঈমানের সত্যতার দলিল), ধৈর্য হলো দীপ্তিময় আলো, আর কুরআন হলো তোমার পক্ষে অথবা তোমার বিপক্ষে প্রমাণ। প্রত্যেক মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হয়, কেউ নিজের আত্মাকে বিক্রি করে মুক্তি দেয়, আবার কেউ নিজের আত্মাকে বিক্রি করে ধ্বংস করে ফেলে। (সহীহ মুসলিম: ২২৩) । আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ، وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ، إِلَّا عِزًّا، وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللهُ” (صحيح مسلم: ২৫৮৮).
অর্থ: “কোনো দান-সদকা করার মাধ্যমে সম্পদ কখনো হ্রাস পায় না। আর আল্লাহ যাকে ক্ষমাশীলতা দান করেন, তিনি তার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেন। আর যে কেউ আল্লাহর জন্য বিনয় প্রদর্শন করে, আল্লাহ তাকে সম্মান ও মর্যাদায় উন্নত করেন” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮) ।
(খ) রাগ সংযম রাখা ও প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা, রাগ নিয়ন্ত্রণ ঈমানের চিহ্ন। এটি নবীদের চরিত্র। আল্লাহ তায়ালা ১৩৪ নং আয়াতে রাগ দমনকারীদের প্রশংসা করেছেন, কারণ রাগ হলো শয়তানের অস্ত্র। রাগ সংযম করলে মন শান্ত থাকে, সম্পর্ক টিকে যায়, সমাজে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। প্রতিশোধ নয়, ধৈর্যই প্রকৃত শক্তি। এ সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ” (متفق عليه، البخاري: ৬১১৪].
অর্থ: “শক্তিমান সে নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিমান সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখে” (সহীহ আল-বুখারী: ৬১১৪) ।
(গ) মানুষের প্রতি হিংসা নয়, দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, আল্লাহ নিজেই দয়ালু, তাই তিনি দয়ালু বান্দাদের ভালোবাসেন। অন্যকে ক্ষমা করা আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন। দয়া ও সহমর্মিতা সমাজে শান্তি আনে, হৃদয়ে প্রশান্তি দেয়, শত্রুতাকে বন্ধুত্বে রুপান্তর করে। এ সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে:
قَبَّلَ رَسُولُ اللَّهِ ‘ الحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ وَعِنْدَهُ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا، فَقَالَ الأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ ‘ ثُمَّ قَالَ: “مَنْ لاَ يَرْحَمُ لاَ يُرْحَمُ” (متفق عليه).
অর্থ: রসূলুল্লাহ (সা.) হাসান ইবনু আলী (রা.)-কে চুম্বন করলেন। সেই সময় তাঁর পাশে বসেছিলেন আকরাআ ইবনু হাবিস আত-তামীমী। আকরাআ বললেন, “আমার দশটি সন্তান আছে, তাদের মধ্যে কাউকেই আমি কখনো চুম্বন করিনি”। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দিকে তাকালেন এবং বললেন: “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না”। (সহীহ আল-বুখারী এবং সহীহ মুসলিম) ।
(ঘ) শত্রুতার বদলে ইহসান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা, আল্লাহ ইহসানের মাধ্যমে শত্রুতাকে বন্ধুত্বে রুপান্তর করতে বলেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা.) শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যিনি শত্রুর জন্যও দোয়া করেছেন। ভালো আচরণ মন্দকে নিঃশেষ করে, সম্পর্ক পুনর্গঠিত করে। এতে সমাজে সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কে অন্য একটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَلَا تَسْتَوِي ٱلْحَسَنَةُ وَلَا ٱلسَّيِّئَةُ ۚ ٱدْفَعْ بِٱلَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴾ [سورة فصلت: ৩৪].
অর্থ: “ভালো কাজ ও মন্দ কাজ সমান নয়; তুমি মন্দের জবাব দাও উত্তমভাবে” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪) ।
(ঙ) পাপের পর তার উপর অবিচল না থেকে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে, অর্থাৎ এমন পাপ, যার ক্ষতি অন্যের ওপরও পড়ে; যেমন- ব্যভিচার, সুদ, চুরি, পরনিন্দা ইত্যাদি, অথবা নিজের প্রতি অন্যায় করে, অর্থাৎ এমন কোনো গুনাহ করে যার ক্ষতি কেবল তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; যেমন- মদ্যপান ইত্যাদি। তারা তখনই আল্লাহর ওয়াদা ও সতর্কবাণী ও তাঁর মহিমাকে স্মরণ করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আন্তরিকভাবে তাওবা করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাঁর রহমত প্রার্থনা করে। তাওবা কবুল হওয়ার শর্ত হলো- গুনাহর ওপর স্থায়ীভাবে অটল না থাকা। এ কথাই আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৯) । তাওবার উপর বিস্তারিত আলোচনা সূরাতু আল-বাক্বারার ১৬০ নং আয়াতে করা হয়েছে।
২। ১৩৬ নং আয়াতের বিশ্লেষণ:
এই আয়াতটি মূলত দুইটি অংশে বিভক্ত:
প্রথম অংশে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের জন্য দুইটি মহান পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন:
(ক) তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা নির্ধারিত রয়েছে।
(খ) তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত রয়েছে, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত হবে।
আর আয়াতের দ্বিতীয় অংশে এই পুরস্কারকে “মহা পুরস্কার” বলা হয়েছে, অর্থাৎ এর চেয়ে বড় সফলতা বা প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।
৩। একজন মুমিনের চারটি স্তর, একজন মুমিনের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির চারটি ধাপ রয়েছে:
(ক) ঈমান ও ইসলামের স্তর, এর বৈশিষ্ট্যসমূহ সূরাতুল বাক্বারার প্রথম নয়টি আয়াতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
(খ) তাকওয়ার স্তর, ১৩৪ ও ১৩৫ নং আয়াতে মুত্তাকীদের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন।
(গ) ইহসানের স্তর, যখন কেউ তাকওয়ার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়মিতভাবে চর্চা ও লালন করতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে সে ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়। এর ইঙ্গিত ১৩৪ নং আয়াতের শেষাংশে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে: “আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালোবাসেন”। (আল্লাহই সর্বাধিক অবগত)।

আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
আয়াতে বর্ণিত মুত্তাকীদের গুণাবলি ও চরিত্রসমূহ জীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেকে মুত্তাকি ও মুহসিন হিসেবে গড়ে তোলা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৩০-১৩৩) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মুমিনদের প্রতি নির্দেশনা: সৎকর্ম সম্পাদন ও অসৎকর্ম পরিহার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (130) وَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ (131) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (132) وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (133)﴾ [سورة آل عمران: 130-133].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: মুমিনদের প্রতি নির্দেশনা: সৎকর্ম সম্পাদন ও অসৎকর্ম পরিহার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৩০। হে মুমিনগণ, তোমরা বহুগুণ বৃদ্ধি করে সুদ খাবে না। আর আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তোমরা সফল হতে পারবে।
১৩১। তোমরা জাহান্নামের আগুনকে ভয় করো, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
১৩২। আর তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের ইতায়াত করো, তাহলে তোমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।
১৩৩। তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে দ্রæত অগ্রসর হও, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, তা মোত্তাকীদের জন্যপ্রস্তুত করা হয়েছে।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতগুলোতে মুমিনদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, অন্যায় উপার্জন থেকে বিরত থাকা, আল্লাহভীতি অর্জন করা, পাপ থেকে আত্মরক্ষা করা, রাসূলুল্লাহর (সা.) আনুগত্য করা, এবং আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রæত অগ্রসর হওয়াই সফল জীবনের মূল চাবিকাঠি। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন সুদের মতো জঘন্য অন্যায় থেকে দূরে থাকে, যে অন্যায়ে লিপ্ত ছিল জাহেলিয়াত সমাজ। সুদ এমন এক পাপ যা সমাজে লোভ, শোষণ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। এতে ধনীরা ধনী হয়, গরিবরা আরও গরিব হয়। ইসলাম ন্যায্য লেনদেন ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়, কিন্তু সুদ সেই মানবিকতা ধ্বংস করে। তাই আল্লাহ ভয়ই একমাত্র রক্ষাকবচ, যার অন্তরে তাকওয়া আছে, সে কখনও অন্যায় উপার্জনের পথ বেছে নেয় না। আল্লাহভীতিই দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।
আল্লাহ তায়ালা পুনরায় মুমিনদের সতর্ক করে দিচ্ছেন, তারা যেন এমন কোনো কাজ না করে, যা তাদেরকে অবিশ্বাসীদের পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। জাহান্নামের আগুন কেবল কাফেরদের জন্যই নয়; বরং যারা আল্লাহর নিষেধ অমান্য করে সুদের মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়, তারাও সেই ভয়াবহ আগুনে পতিত হতে পারে। অতএব, আল্লাহভীতি শুধু নামাজ, রোযা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা প্রতিফলিত হবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে- অর্থনৈতিক লেনদেন, কথাবার্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে।
আল্লাহ তায়ালা সুদ গ্রহণের নিষেধাজ্ঞাকে অত্যন্তকঠোরভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে, বিশেষত সে বিষয়ে যেখানে তাঁরা সুদকে সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। কারণ, মুমিনের জীবনে সফলতা ও রহমতের একমাত্র পথ হলো আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহর (সা.) আনুগত্য। এই আনুগত্যের অর্থ কেবল ইবাদতে সীমিত থাকা নয়; বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র- যেমন নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি সর্বত্র কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলা। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান ও রাসূলুল্লাহর (সা.) শিক্ষার আলোকে জীবন গড়ে তোলে, তার জন্য দুনিয়ায় নেমে আসে প্রশান্তি, আর আখিরাতে অপেক্ষা করে জান্নাতের অনন্ত সুখ।
আল্লাহ তায়ালা চারটি দৃঢ় উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে সুদের ভয়াবহতা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন: (১) আল্লাহকে ভয় করো, (২) আগুনকে ভয় করো, (৩) আল্লাহর আনুগত্য করো, এবং (৪) রাসূলের আনুগত্য করো। ভয় প্রদর্শনের পর আল্লাহ তায়ালা উৎসাহিত করেছেন সৎকর্মের দিকে, যেমন দান-সদকা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, ন্যায় ও কল্যাণে সহযোগিতা করা এবং সুদসহ সকল প্রকার অন্যায় থেকে বিরত থাকা। এসব কর্মের মাধ্যমেই একজন বান্দা অর্জন করতে পারে আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের মর্যাদা। এই জান্নাত সীমাহীন ও অনন্ত সুখের আবাস, যা প্রস্তুত করা হয়েছে তাদের জন্য, যারা আল্লাহকে ভয় করে, অন্যায় থেকে দূরে থাকে এবং সৎকর্মে জীবনকে সাজায়। তাকওয়াই জান্নাতপ্রাপ্তির মূল শর্ত; যার হৃদয়ে আল্লাহভীতি রয়েছে, সে পাপের আহ্বান পেলেও ফিরে আসে প্রভুর দিকে।
এই নেক আমলগুলোই একটি ইসলামী সমাজকে পরিণত করে শান্ত, স্নেহময় ও নিরাপদ আবাসে, যেখানে নেই হিংসা বা বিদ্বেষ, নেই ধনী-গরিবের বৈষম্য, নেই অবজ্ঞা বা ক্ষোভ; বরং রয়েছে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭৫-৩৭৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৩-৮৫; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৬-৬৭; আল-মুনতাখাব: ১/১০৮) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً﴾ ‘তোমরা সুদকে বহুগুণে বাড়িয়ে ভক্ষণ করো না’, এটি ছিল জাহেলি যুগের লোকদের অভ্যাস, অথবা তাদের অভ্যাস যারা শরিয়তের আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা করে না। তাদের রীতি ছিল এমন যে, যখন কোনো দরিদ্র ঋণগ্রহীতার ঋণের সময়সীমা পূর্ণ হতো, কিন্তু সে তা পরিশোধ করতে পারত না, তখন ঋণদাতা তাকে বলত: “তুমি তোমার ঋণ পরিশোধ করো, নতুবা আমরা সময় বাড়াব, কিন্তু তোমার দেনার পরিমাণও বাড়িয়ে দেব। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৩০) । সুদ এর পরিচয় ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা সূরাতু আল-বাক্বারা এর ২৭৫ নং আয়াতে করা হয়েছে।
﴿وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا﴾ ‘এমন জান্নাত, যার প্রশস্ত’, আয়াতাংশে ভূমির প্রশস্ততা বা ব্যাপ্তিকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে, দৈর্ঘ্যের বিপরীতে থাকা “প্রস্থ” অর্থটি নয়। আরবরা বলে, “বিলাদুন ‘আরীযাহ”, অর্থাৎ এক বিস্তৃত দেশ। তারা আরো বলে থাকে, “ওয়াফিল আরদি আল্-‘আরীযাতি মাযহাব”, “পৃথিবী তো পশস্ত চলার অনেক পথ আছে”। রাসূলুল্লাহ (সা.) উহুদের দিনে পালিয়ে যাওয়া সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন: “لقد ذهبتم بها عريضة”, “তোমরা তো পালালে বেশ দূর পর্যন্ত!”। অর্থাৎ, তোমাদের পলায়ন ছিল প্রশস্ত পথে, বিস্তৃতভাবে; সামান্য নয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/৯৯-১০০) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
আল্লাহ তায়ালা প্রথমে মুমিনদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন অমুসলিম কাউকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা গোপন পরামর্শদাতা না করে। এরপর তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, যদি তারা ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহভীতি অবলম্বন করে, তবে অবিশ্বাসীদের কোনো ষড়যন্ত্রই তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। এরপর বদর ও উহুদের যুদ্ধের উদাহরণ টেনে আল্লাহ দেখিয়েছেন, কীভাবে ধৈর্য ও তাকওয়ার মাধ্যমে বিজয় আসে, আর কীভাবে মুশরিক ও ইহুদিরা ঈমানের শত্রুতা করেছে। তারপর উল্লেখিত আয়াতসমূহে তিনি মুসলমানদের সতর্ক করেছেন একটি নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত অভ্যাস থেকে, যা ইহুদি ও মুশরিকদের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য, আর তা হলো সুদভক্ষণ। আর এই সতর্কবার্তার পর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দিয়েছেন নানা ধরণের উৎসাহ, ভয়, পরামর্শ ও উপদেশ, যেন তারা জানে, সৎকর্মের ফল সুন্দর, আর অসৎকর্মের পরিণতি ভয়াবহ। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। (১৩০-১৩২) আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ তায়ালা চারটি দিক থেকে সুদের নিষেধ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন:
(ক) সরাসরি নিষেধাজ্ঞা, আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সুদ খেও না”। এতে সুদভক্ষণকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
(খ) আল্লাহভীতির নির্দেশ, আল্লাহর ভয় মনে রেখে অর্থনৈতিক লেনদেনে যেন কেউ সুদের পথে না যায়, সেটি নির্দেশ করা হয়েছে।
(গ) ভয়াবহ পরিণতির সতর্কতা, যে ব্যক্তি সুদকে বৈধ মনে করে, সে জাহান্নামের শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যায়।
(ঘ) আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ, সুদ হারাম করার বিষয়ে আল্লাহর আদেশ মানা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) যা প্রচার করেছেন তা অনুসরণ করা, যাতে মানুষ আল্লাহর দয়া লাভ করতে পারে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৮৯) ।
২। এখানে সুদকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো- এটি এমন এক পাপ, যার বিষয়ে আল্লাহ নিজেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন: “যদি তোমরা তা না ছাড়ো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও” (সূরাতু আল-বাকারা: ২৭৯) । (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৪/২০২) ।
৩। ১৩১ ও ১৩৩ আয়াতদ্বয়ের শেষাংশে বলা হয়েছে, কেবল ঈমানদারগণই জান্নাতে যাবেন আর জাহান্নামে যাবে কেবল কাফেররা। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, জান্নাত শুধুমাত্র মুমিনদের জন্য এবং জাহান্নাম কেবল কাফেরদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বহু স্থানে বলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল-মাওয়া, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে” (সূরা আস-সাজদাহ ৩২:১৯)। আবার বলেন, “আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন জান্নাতসমূহের, যার নিচে নদী প্রবাহিত হবে” (সূরা আত-তাওবা ৯:৭২)। অপরদিকে অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “সেই আগুনকে ভয় করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে” (সূরা আল-বাকারা ২:২৪)। এই আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, জান্নাত আল্লাহর রহমতের পুরস্কার, যা কেবল ঈমানদারদের জন্য নির্ধারিত, আর জাহান্নাম হলো অবিশ্বাসীদের শাস্তির স্থান, যা তাদের কুফরি ও অবাধ্যতার পরিণতি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সহীহ মুসলিমে বলেছেন, “لا يدخل الجنة إلا نفس مؤمنة” অর্থ: “জান্নাতে প্রবেশ করবে না কোনো প্রাণ, যা মুমিন নয়।” অর্থাৎ, ঈমান ছাড়া জান্নাতে প্রবেশের পথ বন্ধ। আবার সহীহ বুখারীতে এসেছে, “يقال لأهل الجنة خلود فلا موت، ويقال لأهل النار خلود فلا موت” “জান্নাতবাসীদের বলা হবে: তোমাদের জন্য চিরজীবন, আর মৃত্যু নেই; জাহান্নামবাসীদেরও বলা হবে: তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী আগুন, আর মুক্তি নেই”, এসব দলীল একত্রে প্রমাণ করে যে, জান্নাত হলো ঈমান ও সৎকর্মের পুরস্কার, আর জাহান্নাম হলো কুফরি, শিরক ও অবাধ্যতার পরিণতি। তাই আল্লাহর ন্যায়বিচারের বিধান অনুযায়ী, যারা ঈমানদার ও আল্লাহভীরু, তাদের জন্য জান্নাত অনন্ত সুখের নিবাস; আর যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে ও সত্যের বিরোধিতা করেছে, তাদের জন্য জাহান্নাম স্থায়ী শাস্তির স্থান।
৪। ১৩১ ও ১৩৩ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন যে, জাহান্নাম প্রস্তুত করা হয়েছে এবং জান্নাতও প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এ দুটি আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, জান্নাত ও জাহান্নাম ইতিমধ্যেই সৃষ্টি করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতবাদ, যার ভিত্তি কুরআন ও সহীহ হাদীস উভয়েই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে মু‘তাযিলা স¤প্রদায় মনে করে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো সৃষ্টি করা হয়নি; বরং কিয়ামতের সময় উপযুক্ত সময়ে তা সৃষ্টি করা হবে। (তাফসীর আল-বায়জাভী, ২/৩৮) ।

আয়াতসমূহের আমল:
(ক) তাক্বওয়া অবলম্বন করে সুদের মতো হারাম কাজ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা।
(খ) সৎ ও কল্যাণকর কাজে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা।
(গ) জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে অস্তিত্বশীল, এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১২৩-১২৯) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: বদরের গৌরবময় বিজয়ের স্মৃতিসুধা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (123) إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُنْزَلِينَ (124) بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ (125) وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ (126) لِيَقْطَعَ طَرَفًا مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَوْ يَكْبِتَهُمْ فَيَنْقَلِبُوا خَائِبِينَ (127) لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ (128) وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (129)﴾ [سورة آل عمران: 123-129].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: বদরের গৌরবময় বিজয়ের স্মৃতিসুধা।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১২৩। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরের যুদ্ধে সাহায্য করেছেন, এমতাবস্থায় যে তোমরা হীনবল ছিলে; অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।
১২৪। স্মরণ করো, যখন তুমি মুমিনদেরকে বলেছিলে: তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদেরকে সাহায্য করবেন তোমাদের রব তিন হাজার নাযিলকৃত মালাইকা দিয়ে।
১২৫। হ্যা, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং তাক্বওয়া অবলম্ভন করো, আর তারা আকস্মিকভাবে তোমাদের মুখোমুখি এসে যায়, এ অবস্থায় তোমাদেরকে তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্ণিত মালাইকার দ্বারা সাহায্য করবেন।
১২৬। আর আল্লাহ তাকে করেননি তোমাদের জন্য সুসংবাদ ছাড়া আর কিছু এবং যাতে এর দ্বারা তোমাদের ক্বলব প্রশান্ত হয়; আর আল-আজীজ, আল-হাকীম আল্লাহর নিকট ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে সাহায্য আসে না।
১২৭। যাতে তিনি কাফিরদের একটি অংশকে নিশ্চিহ্ণ করেন, অথবা তাদেরকে লাঞ্চিত করেন; ফলে তারা নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে।
১২৮। এ বিষয়ে তোমার কিছু করণীয় নেই, হয়তো তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন, অথবা তাদেরকে আযাব দিবেন, কারণ তারা যালিম।
১২৯। আর আল্লাহর জন্যই যা আছে আকাশসমূহে এবং যা আছে যমীনে। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা আযাব দেন; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
অহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনার পর আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বদরের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তখন মুসলমানরা ছিল সংখ্যায় অল্প, দুর্বল এবং প্রায় নিরস্ত্র। মদিনা থেকে বের হয়েছিল মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি, হাতে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও সামান্য অস্ত্রশস্ত্র। বিপরীতে মুশরিকরা এসেছিল প্রায় এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে, আধুনিক ও পর্যাপ্ত অস্ত্রসহ। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও মুসলমানরা আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে বিজয় লাভ করেছিল। সুতরাং এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় বিজয় কখনো সংখ্যার আধিক্য বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে তাকওয়া, ধৈর্য ও আল্লাহর সাহায্যের ওপর। তাই আল্লাহকে ভয় করতে হবে, তাঁর বিধান মানতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বিজয়ই তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ।
এরপর আল্লাহ তায়ালা স্মরণ করিয়ে দেন যে, বদরের দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের বলেছিলেন, “তোমাদের কি যথেষ্ট নয় যে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্যে তিন হাজার ফেরেশতা নাযিল করবেন?” সংখ্যায় অল্প ও শত্রুর শক্তি দেখে সাহাবিদের অন্তরে যে দুশ্চিন্তা ও ভয় জন্মেছিল, এই সুসংবাদ তা দূর করে তাদের অন্তরকে সাহসে ভরিয়ে তোলে। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসন্ন বিজয়ের প্রথম সুসংবাদ।
অতঃপর আল্লাহ ঘোষণা করলেন, যদি মুসলমানরা ধৈর্য ধারণ করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং শত্রুর মুখোমুখি হতে দৃঢ়চিত্ত থাকে, তবে তিনি পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করবেন। ফেরেশতারা এমনভাবে অংশ নেবে যাতে মুসলমানরা বুঝতে পারে, তারা একা নয়, আসমান থেকেও সাহায্য নেমে এসেছে। আর আসমানি সাহায্য আসে তখনই, যখন বান্দারা ধৈর্যশীল হয়, ন্যায়পরায়ণ থাকে এবং আল্লাহভীরু হয়ে চলে।
ফেরেশতাদের অবতরণের উদ্দেশ্য ছিল মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি আনা, তাদের মনোবল দৃঢ় করা এবং বিজয়ের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস জাগানো। প্রকৃতপক্ষে বিজয়ের একমাত্র উৎস আল্লাহ, যিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তাই বাহ্যিক শক্তি বা কৌশল নয়, আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনাই শেষ কথা। যে কোনো বিজয়কে তাই নিজের শক্তি বা পরিকল্পনার কৃতিত্ব না ভেবে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করতে হবে।
ফেরেশতাদের অবতরণের আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল অবিশ্বাসীদের একাংশকে ধ্বংস করা এবং বাকিদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের ৭০ জন প্রভাবশালী নেতা নিহত হয়েছিল, যা তাদের শক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এটি মুশরিকদের জন্য সতর্কবার্তা ছিল যে আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে শেষ পরিণতি পরাজয় ও লজ্জা ছাড়া আর কিছু নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বদরের যুদ্ধে কিছু কাফিরের জন্য ধ্বংস কামনা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিলেন, কাউকে শাস্তি দেওয়া বা ক্ষমা করা তাঁর একচ্ছত্র অধিকার। মানুষ কেবল চেষ্টা ও দোয়া করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে। তাই শত্রুর জন্যও হিদায়াত কামনা করা উচিত, কারণ আজকের শত্রুও কাল তওবা করে মুমিন হতে পারে, যেমন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও আবু সুফিয়ান পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
সবশেষে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করলেন, আসমান ও জমিনের মালিকানা কেবল তাঁর। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আর তাঁর দয়া সীমাহীন। এ ঘোষণায় মুমিনদের মনে আশা জন্মায়, তারা যদি তওবা করে, আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তা যে, জুলুম করলে এবং অবিশ্বাসে অটল থাকলে আল্লাহর শাস্তি অনিবার্য। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭২,৩৭৩,৩৭৫, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭০-৭৪, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫-৬৬, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৬-১০৮)।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بَدْرُ﴾ ‘বদর’, একজন মানুষের নাম। তার নামানুসারেই এ স্থানের নামকরণ হয়েছে, কারণ এখানে তার একটি প্রশিদ্ধ ক‚প ছিলো। বর্তমানে এ স্থানটি মদীনা মোনাওরাহ থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি জনপদ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।
﴿أَذِلَّةٌ﴾ ‘দুর্বল’, আয়াতে উদ্দেশ্য হলো- তারা ছিল সংখ্যা ও সামর্থে খুবই অল্প, আর প্রতিরোধ করার মতো শক্তিও ছিল না। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১২৩) ।
﴿وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ﴾ “তারা অল্প সময়ের মধ্যে তোমাদের মুখোমুখি হয়ে যায়”, এ বাক্যের উদ্দেশ্য হলো: শত্রু বাহিনীর সেই অতিরিক্ত অংশ, যাদেরকে কুর্জ ইবনু জাবির নিয়ে আসার কথা ছিল, তারা যদি স্বল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধে যোগ দিত, তাহলে আল্লাহ মুসলমানদেরকে পাঁচ হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য করতেন। (তাফসীর আত-তাবারী: ৭/১৭৩) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
উহুদ যুদ্ধে মোনাফেকদের সরদার আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূলের পরোচনায় যখন দুইটি মুসলিম দল আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয়ের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, কাপুরুষতা ও দুর্বলতায় তারা ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। এবং সর্বশেষে রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করে যখন তিরন্দাজ বাহিণী তাদের জায়গা ছেড়ে গনীমতের সন্ধানে বের হওয়ার কারণে মুসলমানদের সাময়ীক পরাজয় হয়েছিল, তখন উল্লেখিত আয়াতসমূহে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের স্মৃতি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে তাদের মনোবল ফিরিয়ে এনেছিল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৬৫) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের ১২৮ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইমাম আহমাদ ও মুসলিম আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সামনের দাঁত (রুবাইয়া) ভেঙে যায় এবং তাঁর মাথায় আঘাত লাগে, এমনকি রক্ত মুখমন্ডল বেয়ে ঝরে পড়ে। তখন তিনি গভীর ব্যথা ও দুঃখে বললেন: “কীভাবে এমন একটি জাতি সফল হতে পারে, যারা তাদের নবীকে এরকম কষ্ট দিল, অথচ তিনি তাদেরকে তাদের রবের দিকে ডাকছেন?” তখন আল্লাহ তায়ালা ১২৮ নং আয়াত নাজিল করেন।
ইমাম আহমাদ ও বুখারি ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি: “হে আল্লাহ! অমুককে অভিশাপ দাও, হে আল্লাহ! হারিস ইবন হিশামকে অভিশাপ দাও, হে আল্লাহ! সুহাইল ইবন আমরকে অভিশাপ দাও, হে আল্লাহ! সফওয়ান ইবন উমাইয়াকে অভিশাপ দাও।” তখন ১২৮ নং আয়াত নাজিল হয়। পরে আল্লাহ তাদের সবাইকে তাওফিক দিলেন এবং তারা ইসলাম কবুল করলেন। ইমাম বুখারি (রহ.) আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও অনুরূপ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন: এ দুইটি হাদিসের মধ্যে সমন্বয় হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন উহুদে আহত হলেন, তখন তিনি দুঃখবশত তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলেন। আয়াতটি নাজিল হয় উভয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তাঁর আহত হওয়ার ঘটনায় যে ব্যথা জন্মেছিল। সেই দুঃখ থেকেই যে বদদোয়া উচ্চারিত হয়েছিল। অর্থাৎ আল্লাহ নবীকে শিখালেন, হিদায়াত বা ধ্বংসের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত কারও হাতে নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর হাতে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৬৯) ।

বদর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ঘটনা:
বদরের যুদ্ধ হয়েছিল হিজরতের দ্বিতীয় সনের রমযান মাসের ১৭ তারিখে। কারণ ছিল মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের সম্পদ ও বাড়িঘর কেড়ে নিয়েছিল। মুসলমানরা তাদের শামের কাফেলা আক্রমণ করে এই ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চেয়েছিল। এতে কুরাইশরা রাগান্বিত হয়ে এক হাজারেরও বেশি সৈন্য নিয়ে মদিনার মুসলমানদের আক্রমণ করতে বের হয়। এ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ৩১৩ জন সাহাবিকে নিয়ে বদরের দিকে রওনা হন। তাদের সাথে ছিল মাত্র দুইটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট। দুই পক্ষ মুখোমুখি হয় বদরের ময়দানে।
যুদ্ধে মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে সুস্পষ্ট বিজয় লাভ করে। কুরআনে একে “ইয়াওমুল ফুরকান” বা সত্য-মিথ্যার ফয়সালার দিন বলা হয়েছে। এ যুদ্ধে মুসলমানদের ঈমান, সাহস ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার দারুন উদাহরণ দেখা যায়। আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের আগে হাত তুলে দোয়া করেছিলেন:
اللهم، إن تهلك هذه العصابة لا تعبد بعدها في الأرض، اللهم أنجزني ما وعدتني، اللهم نصرك.
“হে আল্লাহ! যদি আজ এ দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে পৃথিবীতে আর তোমার ইবাদত হবে না। হে আল্লাহ! তোমার প্রতিশ্রুত বিজয় আমাদের দাও”।
এই যুদ্ধ মুসলমানদের মনোবল অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং ইসলামকে শক্ত ভিত্তি দেয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৬৫) ।

বদরের যুদ্ধ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
বদরের যুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক বিজয় নয়, এটি আমাদের জন্য এক গভীর শিক্ষার ক্ষেত্র।
– ঐক্যের শক্তি: মুসলমানরা সংখ্যায় কম ছিল, তবু ঐক্যবদ্ধ থেকে বড় বাহিনীকে পরাজিত করেছে।
– আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল): তারা নিজেদের সামর্থ্যের ওপর নয়, বরং আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভর করেছিল।
– দোয়ার গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর দোয়া ছিল বিজয়ের প্রধান মাধ্যম।
– ধৈর্য ও সাহস: মুসলমানরা কষ্ট, ক্ষুধা, দুর্বলতা সত্তে¡ও দৃঢ়ভাবে লড়াই করেছে।
– ইসলামের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব: এ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, ঈমান রক্ষা ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১২৩ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তাঁর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ থেকে বুঝা যায়, মানুষকে আল্লাহর অনুগ্রহ ও বিপদের কথা স্মরণ করানো মোস্তাহাব, যাতে মানুষ তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করে ও শিক্ষা নেয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭১) । এই কথাটির মূল অর্থ হলো- একজন দায়ীর উপর মানুষকে আল্লাহর দান ও রহমতের কথা যেমন মনে করানো উচিত, তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিপদ, পরীক্ষা বা শাস্তির ঘটনাগুলিও স্মরণ করানো প্রয়োজন। এতে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করে, নিজের অবস্থার সংশোধন করে এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে। যেমন কোরআনের আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِينَ﴾ [سورة الذاريات: ৫৫].
অর্থ: “আর স্মরণ করিয়ে দাও, কারণ স্মরণ করানো মুমিনদের উপকারে আসে” (সূরাতু আয-যারিয়াত: ৫৫) । আল্লাহর অনুগ্রহ স¥রণ করানোর অন্যতম উপকারিতা হলো- যখন মানুষ আল্লাহর নিয়ামত, দয়া ও রহমতের কথা স্মরণ করে, তখন তার মনে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগে। সে বুঝতে পারে যে, আমি যে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, সেটিও আল্লাহর দান। আমার স্বাস্থ্য, পরিবার, নিরাপত্তা, জ্ঞান, রিজিক সবই তাঁর অনুগ্রহ। এর ফলে তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের মানসিকতা জন্ম নেয়। এমন স্মরণ মানুষকে ইবাদত ও সৎকাজে উৎসাহী করে তোলে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তার নেয়ামত স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ﴾ [سورة المائدة: ৭].
অর্থ: “তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ৭) ।
অনুরুপভাবে বিপদ ও শাস্তির কথা স্মরণ করানোর উদ্দেশ্য হলো- মানুষ যখন শুধু সুখ ও আরামের মধ্যে থাকে, তখন প্রায়ই ভুলে যায় যে দুনিয়া পরীক্ষার জায়গা। তাই বিপদ, শাস্তি বা অতীত জাতিগুলোর ধ্বংসের ঘটনা স্মরণ করানো মানুষের আত্মসমালোচনা ও সতর্কতা জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ﴾ [سورة الحشر: ২].
অর্থ: “অতএব শিক্ষা গ্রহণ কর, হে চক্ষুমান ব্যক্তিবর্গ” (সূরাতু আল-হাশর: ২) । অতীতের জাতিগুলোর ধ্বংস ও শাস্তি স্মরণ করা মানুষকে শিখায় যে, যদি আমরা তাদের মতো আল্লাহর অবাধ্যতা করি, তাহলে আমরাও শাস্তি থেকে রেহাই পাব না।
নবীদের দাওয়াতেও এই পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল। তারা মানুষকে উপদেশ দিতেন দুইভাবে:
(ক) আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে আহ্বান জানিয়ে।
(খ) বিপদ ও আযাবের কথা স্মরণ করিয়ে পাপ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করে।
যেমন, নবী নূহ (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেন:
﴿يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا – وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا﴾ [سورة نوح: ১১-১২].
অর্থ: “তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পরপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, এবং সম্পদ ও সন্তান দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন” (সূরা নূহ: ১১-১২) । এখানে নিয়ামতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
আবার অন্য জায়গায় তিনি বলেন:
﴿إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ﴾ [سورة الشعراء: ১৩৫].
অর্থ: “আমি তোমাদের জন্য মহান দিনের আযাব আশঙ্কা করছি” (সূরাতু আশ শুয়ারা: ১৫৫)। এ আয়াতে শাস্তির সতর্কতা রয়েছে।
সুতরাং, মানুষের হৃদয় জাগ্রত রাখতে অনুগ্রহের স্মরণ কৃতজ্ঞতা জাগায় আর বিপদের স্মরণ ভয় ও সতর্কতা জাগায়। দুই দিকেরই ভারসাম্য থাকা চাই, যাতে মানুষ কেবল ভয় নয়, ভালোবাসা ও আশা নিয়েও আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, আল্লাহকে ভয় করা তাঁর শুকরিয়া অর্জনের মাধ্যম। আবু বকর আল-জাযায়িরী (রহ.) বলেন: আল্লাহর আদেশ মেনে চলা এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত তাকওয়ার প্রকাশ, আর এই তাকওয়াই হলো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পথ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭১) ।
ইমাম মারাগী (র.) বলেন, আল্লাহর প্রতি প্রকৃত তাকওয়া ও কৃতজ্ঞতা একটি মুমিনের জীবনের ভিত্তি। আল্লাহর ভীতি ধারণ করা মানে হলো তাঁর আজ্ঞা পালন করা এবং তাঁর হারাম বা নিষিদ্ধ থেকে বিরত থাকা। এভাবেই বান্দা নিজেকে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে তিনি আল্লাহর প্রদত্ত নিয়ামত যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন। আল্লাহ যে নিয়ামত দিয়েছেন, যেমন শত্রুদের প্রতি বিজয়, ধর্মের প্রসার এবং সত্যের পথে পরিচালিত হওয়া, সেগুলো বান্দাকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়। কিন্তু যে ব্যক্তি তাকওয়ার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তার ওপর প্রলুব্ধি ও কামনার প্রভাব বেশি থাকে, ফলে সে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের উদ্দেশ্য অনুযাযায়ী ব্যবহার করতে পারে না। সুতরাং আল্লাহর প্রতি প্রকৃত কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করতে হলে নিজের জীবনকে তাকওয়া অনুযায়ী পরিচালনা করা আবশ্যক, কারণ তাকওয়া ছাড়া মানব হৃদয় প্রলুব্ধি ও ইচ্ছায় বন্দী হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর দানকৃত নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে না। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৫৬) ।
২। (১২৪-১২৫) আয়াতদ্বয় থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) এখানে خطاب (সম্বোধন)-এর রুপে একটি অলঙ্কার বা সৌন্দর্য প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহকে (সা.) বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য এবং এ ইঙ্গিত দেওয়ার জন্য যে, বিজয় সংঘটিত হয়েছে তাঁরই সুসংবাদের মাধ্যমে। (তাফসীর আবী- সাঊদ: ২/৭৯) ।
(খ) যখন মুমিনরা যুদ্ধ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করার সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আশ-শা‘বী (রহ.) বলেন: “মুমিনদের কাছে খবর পৌঁছল যে, কুর্জ ইবন জাবির আল-হানাফি মুশরিকদের সাহায্যের জন্য সৈন্য নিয়ে আসতে চাচ্ছে। এ খবর মুমিনদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তখনই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, এবং এখানে আল্লাহ তাআলা সেই ঘটনাটিই বর্ণনা করেছেন। (তাফসীর আবী- সাঊদ: ২/৮০) ।
(গ) ইমাম তাবারী (রহ.) সহ অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে, বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে তিনটি ধাপে প্রথমে এক হাজার, এরপর তিন হাজার, অবশেষে পাঁচ হাজার ফেরেশতা সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ইমাম কাতাদা (রহ.) বলেন: ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছিল বদরের দিনেই। প্রথমে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন, পরে তা তিন হাজারে পরিণত হয়, তারপর পাঁচ হাজারে পৌঁছে যায়। যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী:
﴿إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ، فَاسْتَجابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلائِكَةِ مُرْدِفِينَ﴾ [سورة الأنفال: ৯].
“যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে, তখন তিনি তোমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বললেন: আমি এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করব, যারা একে অপরের পর আসবে” (সূরাতু আল-আনফাল: ৯) ।
উল্লেখিত ১২৪ নং আয়াতও একই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত: “তোমাদের প্রভু যদি তিন হাজার অবতীর্ণ ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কি তা তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?” (সূরাতু আলে ইমরান: ১২৪) ।
আর ১২৫ নং আয়াতও তাই নির্দেশ করে: “অবশ্যই, যদি তোমরা ধৈর্য ধরো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা (শত্রুরা) হঠাৎ তোমাদের আক্রমণ করে, তাহলে তোমাদের প্রভু পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন” (সূরাতু আলে ইমরান, ৩:১২৫) ।
অতএব, বদরের দিনে মুমিনরা ধৈর্য ধরেছিল, তাকওয়া অবলম্বন করেছিল, তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী তাদেরকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন। এই সব ঘটনাই বদরের দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭২) ।
(গ) আয়াত ১২৫-এ আল্লাহ তাআলা বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে পাঁচ হাজার ফেরেশতার সাহায্য পাওয়ার জন্য তিনটি শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন:
(ক) ধৈর্য ধারণ করা,
(খ) আল্লাহকে ভয় করা (তাকওয়া অবলম্বন করা),
(গ) শত্রু বাহিনীর অতিরিক্ত অংশ স্বল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধে যোগদান করা।
৩। (১২৬-১২৭) নং আয়াতদ্বয় থেকে দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) আল্লাহ বদর যুদ্ধে মুসলমানদেরকে তিনটি উদ্দেশ্যে ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করেছেন:
(র) মুসলমানদেরকে উৎসাহ ও সাহস যোগানো।
(রর) তাদের অন্তরে মানুষিক দৃঢ়তা ও স্থিরতা সৃষ্টি করা।
(ররর) কুফর ও শিরকের নেতৃত্বকে ধ্বংস করা বা তাদেরকে অপমানিত করা।
(খ) আল্লাহর সাহায্যই প্রকৃত বিজয়ের উৎস, এই কথাটি আমাদের শেখায় যে, মানুষের বাহ্যিক শক্তি, অস্ত্র বা কৌশল বিজয়ের মূল উপকরণ নয়; বরং বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহর অনুমতি ও সাহায্যের মাধ্যমেই, যা ১২৬ নং আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে। ইতিহাসের উদাহরণে দেখা যায়, বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা ছিল সংখ্যায় অল্প ও সামর্থ্যে দুর্বল, কিন্তু আল্লাহর সাহায্য লাভের ফলে তারা বিশাল শত্রুবাহিনীকেও পরাজিত করেছিল। আল্লাহর সাহায্য মানে কেবল ফেরেশতা প্রেরণ নয়; বরং অন্তরে সাহস, স্থিরতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি এবং মানসিক প্রশান্তি দানও তাঁর সাহায্যের অংশ। তাই প্রকৃত মুমিন বাহ্যিক উপকরণে নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জনের চেষ্টা করে, কারণ বিজয়-পরাজয়ের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর হাতেই। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭৫) ।
৪। (১২৮-১২৯) নং আয়াতদ্বয় থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ তাআলার; এসব বিষয়ে অন্য কারও কোনো হস্তক্ষেপ বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই, সে নবী-রাসূল হোক, ফেরেশতা হোক কিংবা রাজা-বাদশা। বিষয়গুলো হলো: কাউকে বদদোয়া বা লা‘নাত করা, অতিরিক্ত সহানুভূতির কারণে দোষী অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া, এবং আত্মপ্রতিশোধের উদ্দেশ্যে যালিমকে শাস্তি প্রদান করা। (তাফসীর আস-সা‘দী: ১/১৪৬) ।
(খ) আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। এর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই তাঁর সৃষ্টি ও বান্দা। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যথাযথ প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে যাকে চান ক্ষমা করেন, আর যাকে চান শাস্তি দেন।
এ শিক্ষাটি রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য, যেন তারা জানে যে, সবকিছু আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭৭) ।

আয়াতসমূহের আমল:
(ক) আল্লাহকে ভয় ও তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর অনুগ্রহের প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
(খ) বিজয় অর্জনের জন্য ধৈর্য ও তাকওয়ার গুণে নিজেকে সমৃদ্ধ করা।
(গ) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালাই সর্বশক্তিমান, আর তাঁর সাহায্যই প্রকৃত বিজয়ের একমাত্র উৎস।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১২১-১২২) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদের যুদ্ধ: মুসলিম সেনাদলের সুসংগঠিত কৌশল।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَوِّئُ الْمُؤْمِنِينَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (121) إِذْ هَمَّتْ طَائِفَتَانِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلَا وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ (122)﴾ [سورة آل عمران: 121-122]

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদের যুদ্ধ: মুসলিম সেনাদলের সুসংগঠিত কৌশল।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১২১। আর স্মরণ কর, যখন তুমি সকালে তোমার পরিবার-পরিজন থেকে বের হয়ে মুমিনদেরকে কিতালের স্থানসমূহে বিন্যস্ত করেছিলে; আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
১২২। যখন তোমাদের মধ্য থেকে দুইটি দল পিছু হটার ইচ্ছা পোষণ করেছিলো, অথচ আল্লাহ তাদের উভয়ের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিৎ।

আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
১২১ নং আয়াতে উহুদের যুদ্ধের প্রস্তুতির দৃশ্য উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা থেকে বের হয়ে সাহাবাদেরকে উহুদের পাদদেশে বিভিন্ন স্থানে বসাচ্ছিলেন, কোথায় কে থাকবে, কিভাবে যুদ্ধের কৌশল সাজাতে হবে তা নির্ধারণ করছিলেন। এতে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত কৌশলী ও সুসংগঠিত ছিলেন। এখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতিটি কথা ও কাজ শুনছেন এবং জানছেন। অর্থাৎ, তার পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়, বরং এটি আল্লাহরই নির্দেশনা অনুযায়ী হচ্ছে।
অহুদ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বমুহুর্তে আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় মুহূর্তের জন্য ভীত হয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরে দৃঢ়তা দান করেন, ফলে তারা স্থির থাকে। কখনো কখনো ঈমানদারদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু যদি তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে আল্লাহ তাদের দৃঢ়তা ও সাহস দান করেন। তাই প্রকৃত ঈমানদারের উচিত সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭২,৩৭৩,৩৭৫, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭০-৭৪, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫-৬৬, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৬-১০৮)।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿إِذْ غَدَوْتَ﴾ ‘যখন তুমি বের হয়েছিলে’, এ আয়াতাংশে ব্যবহৃত ‘গদাওতা’ শব্দটি আরবি ‘গুদওয়াতুন’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো ভোরবেলা বা প্রত্যুষকাল। আরবরা ফজরের সালাত আদায় থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যবর্তী সময়কে ‘গুদওয়াতুন’ বলে অভিহিত করত। (লিসানুল আরব, ইবনু মানযূর: ১৫/১১৬) । অধিকাংশ মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যখন তিনি শনিবারের প্রভাতে মদীনা থেকে বের হয়ে ‘উহুদ’ প্রান্তরে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা শুধু একটি ঘটনাকে স্মরণ করাননি, বরং ভোরবেলার পবিত্রতা, সতেজতা ও প্রস্তুতির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। কারণ প্রত্যুষকাল হচ্ছে কর্মশীলতা ও দৃঢ় সংকল্পের সময়, যখন মুমিনরা ইবাদতে সঞ্জীবিত হয়ে নতুন দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, ‘উহুদ’ যুদ্ধটি পরবর্তী বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৮/৩৪৫)। এভাবে সকালবেলার সময়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে আয়াতটি মুমিনদের মনে করিয়ে দেয় েেয, সংগ্রাম ও পরীক্ষার ময়দানে নামতে হলে শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি এবং ঈমানি দৃঢ়তা দুটোই অপরিহার্য।
﴿هَمَّتْ﴾ ‘ইচ্ছাপোষণ করেছিল’, যদিও শব্দটির মূল অর্থ কেবল ‘ইচ্ছা করা’, এখানে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তারা মনে মনে যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে মদীনায় ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিল এবং তাদের মন সে দিকেই প্রবণ হয়েছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।
﴿طَائِفَتَانِ﴾ ‘দুইটি পক্ষ’, আয়াতটি বিশেষভাবে উল্লেখ করছে আনসারদের দুটি প্রধান গোত্রকে: বনু সালামা এবং বনু হারিসা। এটি শুধু নাম উল্লেখ নয়, বরং সেই সময়ের সামাজিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটকে চিত্রিত করছে, যেখানে এই দুই গোত্র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের সেবায় অবদান রেখেছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
যখন পূর্বের আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কুচক্রী ও দুষ্টচিন্তাাপোষণকারী লোকদের অন্তরঙ্গ বন্ধু না বানানোর জন্য সতর্ক করলেন, তখন উল্লেখিত আয়াতসমূহে একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরলেন যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা থেকে। দুইটি দলের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, কাপুরুষতা ও দুর্বলতায় তারা ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। এর মূল কারণ ছিল মুনাফিকদের কুমন্ত্রণায় তাদের দুর্বল হয়ে পড়া, যাদের নেতা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৬৫) ।

উহুদ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ঘটনা:
বদরের যুদ্ধে পরাজয়ের পর কুরাইশরা প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। বয়স্করা শহরে থেকে যুদ্ধ করার পরামর্শ দিলেও যুবকেরা ময়দানে বের হওয়ার পক্ষে মত দেয়। নবীজি অবশেষে ময়দানে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং এক হাজার সাহাবি নিয়ে উহুদের পাদদেশে শিবির স্থাপন করেন।
পঞ্চাশ জন তীরন্দাজকে পাহাড়ের ঢালে বসিয়ে তিনি কঠোরভাবে নির্দেশ দেন যুদ্ধে জয় বা পরাজয় যাই হোক, স্থান ত্যাগ করবে না। প্রথমে মুসলমানরা জয়লাভ করতে থাকে, কিন্তু তীরন্দাজদের একটি দল নির্দেশ অমান্য করে গনিমতের জন্য নেমে যায়। এ সুযোগে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে আক্রমণ করেন। পরিস্থিতি পাল্টে যায়, অনেক সাহাবি শহীদ হন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও আহত হন, দাঁত ভেঙে যায়। অবশেষে আল্লাহ মুসলমানদের রক্ষা করেন, তবে এ যুদ্ধ থেকে তারা বড় শিক্ষা লাভ করে:
– রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
– আল্লাহর সাহায্য আসে শুধুমাত্র ধৈর্য ও আনুগত্যের মাধ্যমে।
– পরাজয় মানেই ঈমানের পরাজয় নয়, বরং তা আত্মশুদ্ধি ও ধৈর্যের পরীক্ষা।
– উহুদের যুদ্ধ মুসলিম সমাজকে দৃঢ় করেছিল এবং ভবিষ্যতের জন্য মহান শিক্ষার উৎস হয়েছিল।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। এই আয়াতগুলো উহুদের ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে, যার কাহিনী সীরাত ও ইতিহাসে সুপরিচিত। এ আয়াতগুলো এখানে উল্লেখ করার হিকমত হলো-
(ক) আল্লাহ তায়ালার সাধারণ নিয়ম হলো- মুমিনরা যদি যদি ধৈর্য ধরে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তবে তিনি তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং শত্রুদের কুটচাল ব্যর্থ করে দেবেন। তাই আল্লাহ তায়ালা এই নীতির উদাহরণ হিসেবে বদর ও উহুদের কাহিনী তুলে ধরেছেন। বদরে মুমিনরা ধৈর্যশীল ও মুত্তাকি হওয়ায় তারা বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু উহুদে তাদের কিছু লোক তাকওয়ার শর্ত ভঙ্গ করায় শত্রুরা কিছু সময়ের জন্য প্রাধান্য লাভ করেছিল।
(খ) আল্লাহ তায়ালা চান তাঁর বান্দারা যখন কোনো অপ্রিয় ঘটনায় বিপদগ্রস্ত হয়, তখন তারা পূর্ববর্তী প্রিয় অনুগ্রহগুলো স্মরণ করলে দুঃখ-কষ্ট হালকা মনে হবে এবং তারা আল্লাহর মহান নিয়ামতের জন্য শোকর আদায় করবে। কারণ, অপ্রিয় ঘটনাগুলো আসলে তাদের মঙ্গলের জন্যই, এবং প্রাপ্ত অনুগ্রহের তুলনায় তা খুবই সামান্য। (তাফসীর সা’দী: ১/১৪৫) । এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন আল্লাহ্ তাঁর বাণীতে:
﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَـذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِير﴾ [سورة آل عمران:১৬৫].
“তোমাদের যখন একটি বিপদ এসে পড়ল, যার দ্বিগুণ তোমরা (শত্রুদের ওপর) আরোপ করেছিলে, তখন তোমরা বললে: ‘এটা কোথা থেকে এলো?’ বলে দাও: ‘এটা তোমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে এসেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান”। (সূরাতু আলে ইমরান: আয়াত: ১৬৫)।
২। ১২১ নং আয়াত থেকে পরিলক্ষিত হয় যে,
(ক) ইসলামের শিক্ষা হলো- নেতৃত্ব কোনো ভোগ-বিলাসের আসন নয়; বরং এটি একটি বিশাল আমানত ও দায়িত্ব। একজন প্রকৃত নেতা কখনো শুধু আদেশ দিয়ে বসে থাকেন না। তিনি নিজেই সামনে থেকে কাজের ভার নেন, কষ্ট সহ্য করেন, আর অধীনস্থদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি উহুদ, বদর কিংবা খন্দকের মতো যুদ্ধে শুধু পরামর্শদাতা হয়ে থাকেননি; বরং সাহাবাদের সাথে নিজেই ময়দানে নেমেছেন, কষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামও তাই নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে, উম্মাহর মাঝে দাঁড়িয়ে।
আমাদের সমাজে আজও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতৃবৃন্দকে দেখা যায় এই মহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে। তারা মাঠে কর্মীদের সাথে কাজ করেন, তাদের সাহস জোগান, পথ দেখান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু দরবার-ভিত্তিক সুফীবাদী দল কিংবা অনৈসলামী রাজনৈতিক দলে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। সেখানে সাধারণ কর্মীরা রোদ-বৃষ্টিতে মাঠে খেটে যাচ্ছেন, আর নেতৃবৃন্দ প্রাসাদের ভেতর বিলাসী জীবনে ডুবে আছেন। এটি ইসলামের নেতৃত্ব নয়। ইসলামের প্রকৃত নেতৃত্ব হলো নবী ও সাহাবাদের নেতৃত্ব, যেখানে নেতা আর কর্মীর মাঝে কোনো বিভাজন নেই, পার্থক্য কেবল দায়িত্বের, মর্যাদার নয়।
আল্লাহ যেন আমাদের সমাজে এমন নেতৃত্ব দান করেন যারা সত্যিকার অর্থে উম্মাহকে সামনে থেকে নিয়ে চলবে, ইসলামের পতাকাকে উঁচুতে উড়াবে, আর জনগণের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে থাকবে।
(খ) ১২১ নং আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা হলেন সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞ, যিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সবকিছুই জানেন। মানুষের দেহগত কাজ, মুখের কথা, এমনকি অন্তরের গভীরতম চিন্তা-ভাবনা, সন্দেহ, ঈমান ও কপটতাও তাঁর কাছে গোপন নয়। এ সম্পর্কে কোরআনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যেমন আয়াতুল কুরসীতে বলা হয়েছে:
﴿يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ﴾ [سورة البقرة: ২৫৫].
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই তিনি জানেন যা তাদের সামনে রয়েছে এবং যা তাদের আড়ালে রয়েছে” (সূরাতু আল-বাক্বারাহ: ২৫৫) ।
এ কারণেই অন্তরের ঈমানকে দৃঢ় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিকভাবে কেউ বড় আলেম, দাঈ বা বড় নেতা হিসেবে পরিচিত হতে পারে, কিন্তু যদি অন্তরে দ্বিধা, ভন্ডামি বা দুর্বলতা থাকে, আল্লাহ তা জানেন এবং এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই দেহে একটি টুকরো মাংস আছে, যদি তা ঠিক থাকে তবে সমগ্র দেহ ঠিক থাকে, আর যদি তা নষ্ট হয় তবে সমগ্র দেহ নষ্ট হয়। জেনে রাখ, সেটি হলো অন্তর” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
৩। ১২২ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় প্রতিফলিত হয়:
(ক) মুমিনের দুর্বলতা ও দ্বিধা পরিত্যাজ্য, এ বিষয়টি কোরআন ও হাদীসের আলোকে মুমিনের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলামে মুমিনের জন্য দুর্বলতা (অসাহস, অলসতা, হতাশা) গ্রহণযোগ্য নয়, যা অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অন্য এক আয়াতে বলেছেন:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৩৯].
অর্থাৎ: “তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৩৯) । এখানে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের শক্তি, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিয়েছেন। দুর্বলচিত্ততা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ، خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ، وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجَزْ، وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: “قَدَّرَ اللهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ”، فَإِنَّ “لَوْ” تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ” (صحيح مسلم: ২৬৬৪).
অর্থাৎ: “শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার জন্য উপকারী, তার প্রতি তুমি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং দুর্বল হয়ো না। আর যদি কোনো বিপদ তোমাকে আঘাত করে, তবে বলো না: ‘যদি আমি এমন করতাম, তবে এমন হতো, এমন হতো।’ বরং বলো: ‘আল্লাহর তাকদীর, তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন।’ কারণ, ‘যদি’ বলা শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪) । অর্থাৎ, মুমিনকে সব সময় দৃঢ়চিত্ত হতে হবে, সাহসী হতে হবে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুরুপভাবে মুমিন জীবনে দ্বিধা পরিত্যাজ্য, মুমিন যখন দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তখন সে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখতে পারে না এবং কর্মে দৃঢ় হতে ব্যর্থ হয়। দ্বিধা শয়তানের একটি কৌশল, যা মানুষকে সৎকাজ থেকে বিরত রাখে। এ সম্পর্কে কোরআন কারীমে এসেছে:
﴿وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৫৯].
অর্থাৎ: “আর তুমি তাদের কাজে পরামর্শ গ্রহণ করো; অতঃপর যখন তুমি সংকল্পবদ্ধ হও, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদেরকে ভালোবাসেন” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৫৯) । অর্থাৎ, মুমিন যখন কোনো ভালো কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তখন দ্বিধা না করে দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।
(খ) আল্লাহ যাদের অভিভাবক হন তাদেরকে দুর্বলতা ও দ্বিধা থেকে মুক্তি দেন, যা অত্র আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অন্য একটি আয়াতে বলেছেন:
﴿اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ﴾ [سورة البقرة: ২৫৭].
“আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২৫৭) । অর্থাৎ, যখন আল্লাহ কারো অভিভাবক হন, তখন তিনি তার অন্তরকে ঈমান, হিদায়াত ও সাহসে ভরে দেন। শয়তানের পক্ষ থেকে যে ভয়, সন্দেহ, দ্বিধা, হতাশা আসে, আল্লাহ তা দূর করে দেন।
দুর্বলতা আসে তখন, যখন মানুষ ভাবে সে একা, সে অক্ষম। কিন্তু আল্লাহ যখন তার অভিভাবক, তখন মুমিন বুঝে যায় সে একা নয়, মহান রব তার সঙ্গে আছেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই; এ কারণে সে দুর্বল হয় না। কোরআনে এসেছে:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৩৯].
“তোমরা দুর্বল হয়ো না, শোক করো না, আর যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে তোমরাই উচ্চতর” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৯) ।
অপরদিকে দ্বিধা আসে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও ভয়ের কারণে। কিন্তু আল্লাহর ওলিদের জন্য প্রতিশ্রæতি প্রদান করা হয়েছে:
﴿إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ [سورة الأحقاف: ১৩].
“নিশ্চয়ই, যারা বলে: ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর সে কথায় অটল থাকে, তাদের উপর কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না” (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬:১৩) । এখানে স্পষ্ট, আল্লাহর অভিভাবকত্ব দ্বিধা-ভয়কে দূর করে দেয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إنَّ اللَّهَ إذا أحَبَّ عَبْدًا دَعا جِبْرِيلَ فقالَ: إنِّي أُحِبُّ فُلانًا فأحِبَّهُ، قالَ: فيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنادِي في السَّماءِ فيَقولُ: إنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلانًا فأحِبُّوهُ، فيُحِبُّهُ أهْلُ السَّماءِ، قالَ ثُمَّ يُوضَعُ له القَبُولُ في الأرْضِ..”ِ. (رواه البخاري ومسلم في صحيحيهما).
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে ডাকেন এবং বলেন: “আমি অমুককে ভালোবাসি, সুতরাং তুমি-ও তাকে ভালোবাসো”। তখন জিবরাঈলও তাকে ভালোবাসেন। এরপর জিবরাঈল আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করেন: “আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো”। ফলে আকাশবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে থাকে। তারপর পৃথিবীতে তার জন্য মানুষের অন্তরে গ্রহণযোগ্যতা (ভালোবাসা) সৃষ্টি করে দেওয়া হয়” (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম) ।
সুতরাং যাদের আল্লাহ অভিভাবক হন, আল্লাহ তাদেরকে অন্তরের ভয়, দুর্বলতা ও দ্বিধা থেকে মুক্ত করেন। তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে সাহসী হয়, পরীক্ষায় ধৈর্য ধরে, এবং সত্যের পথে অটল থাকে।
(গ) আয়াতের শেষাংশ থেকে বুঝা যায়, সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য, আল্লাহর ওপর ভরসা করা (তাওয়াক্কুল) হলো ঈমানের মূল ভিত্তি ও মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। মুমিন ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, কারণ সে জানে আল্লাহ ছাড়া কারো হাতে প্রকৃত ক্ষতি বা উপকার নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ [سورة الطلاق: ৩].
“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট” (সূরাতু আত-তালাক: ৩) ।
অতএব, আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা মুমিনের পরিচয়, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ أَنَّكُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا” (رواه الترمذي وابن ماجة).
“যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথার্থ ভরসা করতে, তবে তোমাদেরকে তিনি এমনভাবে রিযিক দিতেন যেভাবে তিনি পাখিদের রিযিক দেন। তারা সকালবেলায় খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) । এ হাদিসে স্পষ্ট বোঝা যায়, তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং চেষ্টা করা এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
এখন একটি প্রশ্ন হতে পারে, তাওয়াক্কুল মুমিনের জীবনে কী প্রভাব ফেলে?
কোরআন-হাদীসের আলোকে এ প্রশ্নের উত্তর হলো-
(ক) আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, সে জানে, আল্লাহর সাহায্য থাকলে কেউ তাকে পরাজিত করতে পারবে না।
(খ) মানসিক প্রশান্তি আনে, বিপদে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ে না, বরং অন্তরে শান্তিঅনুভব করে।
(গ) নেতৃত্বের গুণ তৈরি করে, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করার শক্তি তাকে দৃঢ় নেতা বানায়।
(ঘ) পাপ থেকে দূরে রাখে, কারণ রিজিক, মান-মর্যাদা বা নিরাপত্তা কেবল আল্লাহর হাতে, এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায়ের পথে যেতে দেয় না।
(ঙ) সাহসী করে তোলে: মুমিন জানে, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তাই সে সঠিক পথে চলতে এবং সত্য কথা বলতে ভয় পায় না।

আয়াতদ্বয়ের আমল:
(ক) দৈনন্দিন কাজ, শিক্ষা, দাওয়াত কিংবা জিহাদ, সবকিছুতেই সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি নেওয়া।
(খ) নেতাকে তার দায়িত্বের স্থানে সক্রিয় থাকা এবং অধীনস্থদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।
(গ) বিপদের সময় সাহস ও দৃঢ়তা অর্জন করা এবং আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশা করা।
(ঘ) সকল কাজে প্রস্তুতি শেষে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১৮-১২০) আয়াতাবলীর তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফিরদের প্রতি আস্থা রাখা এবং তাদের কাছে গোপনীয়তা ফাঁস করা মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা বাড়ায়।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ (118) هَا أَنْتُمْ أُولَاءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (119) إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (120)﴾ [سورة آل عمران: 118-120].

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: কাফিরদের প্রতি আস্থা রাখা এবং তাদের কাছে গোপনীয়তা ফাঁস করা মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা বাড়ায়।

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১১৮। হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে বাদ দিয়ে অন্য ধর্মাবলম্ভী কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না; তারা তোমাদেরকে ক্ষতি করতে ত্রুটি করবে না, তারা চায় তোমাদের ক্ষতি, তাদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশ পেয়েছে, আর যা গোপন রেখেছে তাদের অন্তর সমূহ, তা আরো ভয়ঙ্কর; আমি আয়াতসমূহ তোমাদের জন্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি, যাতে তোমরা অনুধাবন করো।
১১৯। ভেবে দেখো, তোমরাই তো তাদেরকে ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না, অথচ তোমরা ঈমান রাখো সম্পূর্ণ কিতাবের প্রতি। আর যখন তারা তোমাদের সাথে সাক্ষাত করে, তখন তারা বলে: আমরা ঈমান এনেছি, কিন্তু যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তখন তারা তোমাদের উপর রাগের কারণে তাদের আঙ্গুল কামড়ায়; বলো: তোমরা মরো তোমাদের রাগ নিয়ে, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পকে পূর্ণ জ্ঞাত।
১২০। যদি কোন কল্যাণ তোমাদেরকে স্পর্শ করে, তখন তারা কষ্ট পায়; আর যদি তোমাদেরকে স্পর্শ করে কোন অমঙ্গল, তখন তারা তাতে খুশি হয়; আর যদি তোমরা ধৈর্য ধরো এবং আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদেরকে কোন ক্ষতি করতে পারবে না, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের কার্যক্রমকে বেষ্টনকারী।

আায়াতাবলীর ভাবার্থ:
১১৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন নিজেদের বাইরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। এখানে “বিতানাহ” বলতে এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরামর্শদাতা বোঝানো হয়েছে, যাদেরকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত পরিকল্পনা, গোপনীয়তা ও দুর্বলতা জানাই। চারটি কারণে তাদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে:
(ক) অবিশ্বাসীরা কখনও মুমিনদের প্রকৃত কল্যাণ কামনা করে না।
(খ) তারা সদা সুযোগ খোঁজে মুমিনদের ক্ষতি করতে এবং বিপদে ফেলতে।
(গ) তাদের মুখ থেকেই মুমিনদের প্রতি তাদের শত্রæতা ও বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে উঠে।
(ঘ) মুমিনদের প্রতি তাদের অন্তরের ঘৃণা ও বিদ্বেষ আরও তীব্র ও ভয়াবহ।
আল্লাহ তায়ালা এসব নিদর্শন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে মুমিনরা কাফিরদের প্রকৃত স্বরুপ বুঝতে পেরে সতর্ক থাকতে পারে।
১১৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফিদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার আরো তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন:
(ক) মুমিনরা তাদের ভালোবাসে, কিন্তু তারা মুমিনদের মোটেও ভালোবাসে না।
(খ) মুমিনরা আল্লাহর কিতাবে ঈমান এনেছে, অথচ তারা সে ঈমান সহ্য করতে পারে না।
(গ) মুমিনদের সাথে তাদের ভন্ডামী ও প্রতারণামূলক আচরণ, মুমিনদের সামনে এসে বলে: “আমরা ঈমান এনেছি”, কিন্তু একা হলে এমন ক্রোধে ফেটে পড়ে যে আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। এটি তাদের প্রবল ঈর্ষা ও শত্রæতার বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের এ ঘৃণা ও শত্রুতা কোন সুফল বয়ে আনবে না, কারণ আল্লাহ তাদের অন্তরের সবকিছু অবগত আছেন।
১২০ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সামনে উল্লেখিত অবস্থার সত্যতা উম্মোচন করেছেন, তাদের জন্য কোনো কল্যান ঘটলে, তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে, শক্তিশালী হয়ে উঠলে এবং বিজয়ী হলে, তা কাফিরদেরকে ভিষণ কষ্ট দেয়, আর তাদের জন্য কোনো বিপদ এলে, তারা নিজেদের মধ্যে অনৈক্যে থাকলে, দুর্বল হয়ে পড়লে এবং পরাজিত হলে কাফিররা তাতে খুশি হয়। অবশেষে আল্লাহ মুমিনদের জন্য শত্রæর অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার দুইটি উপায় দেখিয়েছেন:
(ক) ধৈর্য অবলম্বন করা।
(খ) তাকওয়া ধারণ করা।
যদি মুমিনরা ধৈর্য ও তাকওয়ার পথে অটল থাকে, তবে শত্রæর কোন ষড়যন্ত্র তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা তাদের সকল কর্মকান্ডকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন; কোনো পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। অর্থাৎ: আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে ধৈর্য ও তাকওয়ার সাথে চললে শত্রুর সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে যাবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৭-৩৬৮, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৫৬-৫৮, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৫-১০৬) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بِطَانَةً﴾ ‘বিতানা’, শব্দটি আরবী, যার মূল অর্থ হলো- কাফড়ের ভিতরের আস্তর বা আস্তরণ। এই আস্তরণের সাথে তুলনা করে মানুষের অন্তরঙ্গজনকে ‘বিতানা’ বলা হয়। অর্থাৎ: এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরামর্শদাতা, যাদেরকে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা, গোপনীয়তা ও দুর্বলতা জানানো যায়। আয়াতে কাফির-মুনাফিকদেরকে এমন বন্ধু বানাতে নিষেধ করা হয়েছে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১১৮) ।
﴿خَبَالًا﴾ ‘ক্ষতি’, ‘খাবাল’ আরবী শব্দ, যার অর্থ হলো- নষ্ট হওয়া বা বিপর্যয়। হাদীসে এসেছে, যে রক্তপাত বা খাবালে আক্রান্ত হয়, অর্থাৎ: এমন আঘাত যা অঙ্গকে নষ্ট করে দেয়। আয়াতে দ্বীনি ও দুনিয়াবী বিষয়ের ক্ষতিকে বুঝানো হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৬) ।
﴿حَسَنَةٌ﴾ ‘ভালো’, শব্দটি আরবী, যার মূল অর্থ হলো- ভালো বা সৌন্দর্য। তবে আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নেয়ামত, যেমন: বিজয়, সাহায্য, শক্তি এবং অন্য কোন কল্যাণ। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১২০) ।
﴿سَيِّئَةٌ﴾ ‘খারাপ, শব্দটি আরবী, যার মূল অর্থ হলো- খারাপ বা কদর্য। তবে আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নেয়ামত, যেমন: পরাজয়, মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ, দুর্বলতা এবং যা মানুষের জন্য কষ্টদায়ক। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১২০) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতাবলীর সম্পর্ক:
আগের আয়াতগুলোতে আহলে কিতাব ও মুশরিকদের স্বভাব এবং আখিরাতে তাদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আর মুমিনদের জন্য পুরস্কারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো মুমিনদের সতর্ক করছে, কাফির ও মুনাফিকদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক না করতে। কারণ এতে মুসলমানদের গোপন খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন অনেক বিষয় তারা জেনে যেতে পারে যা গোপন রাখা দরকার। এতে মুসলিম সমাজের জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। তাই এ সতর্কতা খুবই দরকারি ও বুদ্ধিদীপ্ত, যেমন প্রত্যেক জাতি তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবল বিশ্বাসযোগ্য লোকদের কাছেই রাখে। (তাফসীর আল-মুনীল, জুহাইলী: ৪/৫৫) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের ১১৮ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেছেন: কিছু মুসলমান ইহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন, কারণ জাহেলিয়াত যুগে তারা একে অপরের প্রতিবেশী ও মিত্র ছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন, যাতে মুসলমানরা তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা না করে এবং গোপন বিষয় জানাতে সতর্ক থাকে; কারণ এতে ফেতনা ও বিপদের আশঙ্কা ছিল। (লুবাব আল-নুক‚ল, সয়ূতী: ১/৬৫) ।

আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১১৮ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করেছেন, তারা যেন নিজেদের বাইরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। তদের মধ্যে ঘৃণিত চারটি বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে:
(ক) তারা মুসলমানদেরকে ক্ষতি সাধনে কোন ত্রæটি রাখবে না।
(খ) তারা চায় মুসলমানদের সর্বনাশ হোক।
(গ) তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুখে চরম বিদ্বেষ ও শত্রæতা প্রকাশ করে।
(ঘ) তাদের অন্তরের বিদ্বেষ আরও বড় এবং ভয়াবহ।
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন এগুলো হলো সেই বৈশিষ্ট্য যেগুলো থাকলে মুসলমানদের উচিত নয় এমন কাউকে ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা বানানো। কিন্তু যদি এই বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়, তখন তাদের সাথে সহযোগিতা বৈধ হতে পারে, যেমন ইহুদিরা প্রথম যুগে মুসলিমদের শত্রু ছিল, পরে আন্দালুস জয়ে তারা মুসলিমদের সহযোগিতা করেছিল; মিশরের কপটরাও মুসলিমদের রোমের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিল। এজন্যই হযরত উমর (রাঃ) তার দাপ্তরিক কাজে রোমীয়দের নিয়োগ করেছিলেন, পরে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান দপ্তরকে আরবিতে রূপান্তরিত করেন। আব্বাসী খলিফারা ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ করতেন, এমনকি উসমানীয় খিলাফতেও বহু রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি খ্রিস্টান ছিলেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৪৫) । এ সম্পর্কে সূরাতু আল-মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿لا يَنْهاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ، إِنَّما يَنْهاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيارِكُمْ وَظاهَرُوا عَلى إِخْراجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾ [سورة الممتحنة: ৮].
অর্থাৎ: “যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করেনি বা তোমাদেরকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করেনি, আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ থেকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। কিন্তু তিনি নিষেধ করেন কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব থেকে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদের বহিষ্কারে সহযোগিতা করেছে” (সূরাতু আল-মুমতাহিনা: ৮)।
২। ১১৯ নং আয়াতে তিনটি বিষয়কে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে:
(ক) কাফিদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার আরো তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন:
(১) মুমিনরা তাদের ভালোবাসে, কিন্তু তারা মুমিনদের মোটেও ভালোবাসে না।
(২) মুমিনরা আল্লাহর কিতাবে ঈমান এনেছে, অথচ তারা সে ঈমান সহ্য করতে পারে না।
(৩) মুমিনদের সাথে তাদের ভন্ডামী ও প্রতারণামূলক আচরণ।
(খ) রাসূল্লাহর (সা.) মাধ্যমে কাফিরদের বিরুদ্ধে দোয়া করানো হয়েছে যে, তারা যেন মুসলমানরদের প্রতি ক্রোধে দগ্ধ হতে হতে ধ্বংস হয়ে যায়, আর মুসলমানরা যেন ঈমান ও ঐক্যে আরো শক্তিশালী হয়। (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১০৮) ।
(গ) আয়াতের শেষাংশে ইহুদী-খ্রিস্টান এবং কাফির-মুনাফিকদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তারা যেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রæতা, ক্রোধ ও হিংসা-বিদ্বেষ ছেড়ে ইসলামে পথে ফিরে আসে; কারণ তাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পূর্ণ জ্ঞাত আছেন এবং তার যথাযথ প্রতিফল দিবেন, দুনিয়াতে তাদের আশা-আকাঙ্খার বিপরীত ফল প্রদর্শন করবেন এবং আখেরাতে তাদেরকে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে হবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৫৮) ।
৩। ১২০ নং আয়াত থেকে চারটি মূল বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে (১১৮-১১৯) আয়াতে বর্ণিত ইহুদি-খ্রিস্টান ও কাফির-মুনাফিকদের মানসিকতার সত্যতা উন্মোচিত হয়েছে। মুসলমানদের কল্যাণ সাধিত হলে, তাদের ঐক্য দৃঢ় হলে, শক্তি বৃদ্ধি পেলে এবং তারা বিজয়ী হলে, এটি কাফিরদের জন্য চরম কষ্টের কারণ হয়। বিপরীতে, মুসলমানরা বিপদগ্রস্ত হলে, অনৈক্যে ভুগলে, দুর্বল হলে কিংবা পরাজিত হলে, এতে তারা আনন্দিত হয়।
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে শত্রুর ক্ষতি ও ষড়যন্ত্র থেকে নিরাপদ থাকার দুটি উপায় নির্দেশ করা হয়েছে: ধৈর্য ধারণ এবং তাকওয়া অবলম্বন।
(গ) আয়াতের তৃতীয়াংশে মুমিনদের সান্তনা দেওয়া হয়েছে যে, যদি তারা ধৈর্য ও তাকওয়ার পথে অটল থাকে, শত্রুর কোনো ষড়যন্ত্র তাদের প্রকৃত অর্থে ক্ষতি করতে পারবে না।
(ঘ) আয়াতের শেষাংশে এ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে, কাফিররা মুসলমানদের ক্ষতি করতে পারবে না, কারণ আল্লাহ তায়ালা তাদের সব কর্মকান্ডকে পরিবেষ্টন কওে রেখেছেন; তাদেও কোনো পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।
৪। কোরআন কারীমের বহু আয়াতে, যেমন সূরা আলে-ইমরান (আয়াত ২৮), সূরা আন-নিসা (আয়াত ১৪৪), সূরা আল-মায়িদা (আয়াত ৫১) এবং সূরা আল-মুজাদালাহ (আয়াত ২২), মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। আর সূরা আলে-ইমরানের (১১৮-১২০) আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন না করার সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা হলো: ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের যেকোনো স্তরে কাফেরদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজে এর উল্টো প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যারা এ কাজে লিপ্ত, তাদের জন্য এসব আয়াতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ও পরিণতির আভাস দেওয়া হয়েছে। (আল্লাহ ভালো জানেন)

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) ইহুদি-খ্রিস্টান এবং কাফের-মুনাফিকদেরকে ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে গ্রহণ না করা।
(গ) ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহকে ভয় করার মাধ্যমে শত্রুদের ক্ষতি ও ষড়যন্ত্র থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা।
(ঘ) আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বদর্শী এবং সকল ঘটনা সম্পর্কে অবগত, এটি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।

error: Content is protected !!