Skip to main content

সূরাতু আন-নিসা-এর (৫-৬) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের বিধান|

﴿وَلا تُؤْتُوا السُّفَهاءَ أَمْوالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِياماً وَاُرْزُقُوهُمْ فِيها وَاُكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَعْرُوفاً (5) وَاِبْتَلُوا الْيَتامى حَتّى إِذا بَلَغُوا النِّكاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْداً فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوالَهُمْ وَلا تَأْكُلُوها إِسْرافاً وَبِداراً أَنْ يَكْبَرُوا وَمَنْ كانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَنْ كانَ فَقِيراً فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ فَإِذا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ وَكَفى بِاللهِ حَسِيباً (6)﴾ [سورة النساء: 5-6].

আলোচ্যবিষয়: ইয়াতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের বিধান|
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(৫) আর তোমরা তোমাদের সেই সম্পদ, যা আল্লাহ তোমাদের জীবন-জীবিকার অবল¤^ন করেছেন, তা নির্বুদ্ধি ও আর্থিকভাবে অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিও না| তবে সেই সম্পদ থেকেই তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাকের ব্যবস্থা করো এবং তাদের সঙ্গে উত্তম ও সান্ত্বনামূলক কথা বলো|
(৬) আর তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করতে থাকো, যতক্ষণ না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছে| এরপর যদি তাদের মধ্যে আর্থিক বিচক্ষণতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা দেখতে পাও, তবে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও| তারা বড় হয়ে যাবে—এই আশঙ্কায় তাড়াহুড়া করে অপচয় বা অন্যায়ভাবে তাদের সম্পদ ভোগ করো না| যে অভিভাবক সচ্ছল, সে যেন (এতিমের সম্পদ থেকে) বিরত থাকে; আর যে অভাবগ্রস্ত, সে যেন ন্যায়সংগতভাবে (প্রয়োজন অনুযায়ী) গ্রহণ করে| অতঃপর যখন তাদের কাছে তাদের সম্পদ হস্তান্তর করবে, তখন এ বিষয়ে সাক্ষী রাখবে| আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট|
আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা‘আলা ধারাবাহিকভাবে তাঁর মুমিন বান্দাদের এমন সব বিধান শিক্ষা দিচ্ছেন, যা তাদের দুনিয়ার জীবনকে সুশৃঙ্খল ও কল্যাণময় এবং আখিরাতের জীবনকে সফল ও মুক্তির উপযোগী করে তোলে|
সূরা আন-নিসার ৫ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, নির্বোধ ও আর্থিক বিষয়ে অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া যাবে না| কারণ, সম্পদ মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম প্রধান অবল¤^ন| এখানে নির্বোধ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিচক্ষণ নয়| সে নারী, পুরুষ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক—যেই হোক না কেন| আশঙ্কা থাকে, তারা সম্পদ অপচয় করবে বা অন্যায়ভাবে নষ্ট করবে| তবে তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাকের ব্যবস্থা অভিভাবকদেরই করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সদয়, সান্ত্বনামূলক ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে| এখানে সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সম্পদকে ব্যবসা, কৃষি, শিল্প বা অন্য কোনো ˆবধ উপায়ে বিনিয়োগ করে মূলধন অক্ষুণ্ন রেখে তার লাভ থেকে ইয়াতিমের ব্যয় নির্বাহ করা অধিক উত্তম ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক|
৬ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতিমদের সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালা বর্ণনা করেছেন| তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ইয়াতিমরা বয়ঃপ্রাপ্তির নিকটবর্তী হলে তাদের বিচক্ষণতা ও সম্পদ পরিচালনার যোগ্যতা পরীক্ষা করতে হবে| এজন্য তাদের কিছু সম্পদ দিয়ে লেনদেন বা ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ দেওয়া হবে| যদি দেখা যায়, তারা দায়িত্বশীলভাবে সম্পদ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের নিকট ফিরিয়ে দিতে হবে| সম্পদ হস্তান্তরের সময় সাক্ষী রাখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ বা অভিযোগের অবকাশ না থাকে| আর সর্বশেষ হিসাব গ্রহণকারী ও সর্বদ্রষ্টা তো আল্লাহই| এরপর আল্লাহ অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেছেন, তারা যেন এতিমের সম্পদ অপচয় না করে এবং এতিম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে তা আত্মসাৎ না করে| সবশেষে অভিভাবকদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে| যে অভিভাবক সচ্ছল, তার উচিত এতিমের সম্পদ থেকে কোনো পারিশ্রমিক বা সুবিধা গ্রহণ না করা| আর যে অভিভাবক অভাবগ্রস্ত, সে প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়সংগতভাবে তা থেকে গ্রহণ করতে পারবে| অর্থাৎ, প্রয়োজন হলে সে তা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে পরে সামর্থ্য হলে পরিশোধ করবে, অথবা ইয়াতিমের সম্পদ পরিচালনার বিনিময়ে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যুক্তিসংগত পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারবে| তবে সচ্ছল অভিভাবকের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে ইয়াতিমের সেবা করা অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ| আর আল্লাহ তা‘আলা কখনো সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৭-৪৩৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৪৮-২৪৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১০৬-১০৭) |
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তাআলার বাণী ﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾-এ স¤ে^াধন কার প্রতি—এ বিষয়ে মুফাসসিরগণের দুটি মত রয়েছে|
প্রথম মত: এ আয়াতে ইয়াতিমদের অভিভাবকদের স¤ে^াধন করা হয়েছে| অর্থাৎ, “হে অভিভাবকগণ! তোমাদের তত্ত্বাবধানে থাকা অবিবেচক ইয়াতিমদের সম্পদ তাদের হাতে তুলে দিও না”| এ মতের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো, পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে—﴿وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ﴾ ‘তোমরা তাদেরকে এ সম্পদ থেকেই জীবিকা দাও এবং পোশাক দাও’| এ দায়িত্ব মূলত অভিভাবকদের ওপরই বর্তায়| তাছাড়া এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর সঙ্গে এ আয়াতের বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতাও অক্ষুণ্ন থাকে|
দ্বিতীয় মত: কিছু আলেমের মতে, এখানে পিতাদের স¤ে^াধন করা হয়েছে| অর্থাৎ, যদি তাদের সন্তানরা সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে অদক্ষ হয়, তবে তারা যেন তাদের হাতে সম্পদ তুলে না দেন| এতে সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে|
আল-রাযী (রহ.) প্রথম মতকে অধিক শক্তিশালী বলে অভিহিত করেছেন| তাঁর যুক্তি হলো—
(ক) আয়াতের নিষেধাজ্ঞা মূলত অভিভাবকদের জন্য প্রযোজ্য| কারণ, উম্মতের ঐকমত্য (ইজমা) হলো—অভিভাবকের জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ ব্যক্তির হাতে তার সম্পদ তুলে দেওয়া হারাম| পক্ষান্তরে, নিজের সম্পদ থেকে পিতা চাইলে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে বা পরিবারের সদস্যদের দান করতে পারেন; এটি হারাম নয়| সুতরাং আয়াতটি পিতার নিজের সম্পদের বিষয়ে নয়, বরং অভিভাবকের অধীনস্থ ব্যক্তির সম্পদের বিষয়ে|
(খ) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে—﴿وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ ‘তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম কথা বলো’| এ নির্দেশ ইয়াতিমদের ক্ষেত্রেই অধিক উপযোগী| কারণ, মানুষ ¯^ভাবতই নিজের সন্তানের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলে; এ বিষয়ে আলাদা নির্দেশের প্রয়োজন হয় না| কিন্তু এতিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও কোমল ভাষায় কথা বলার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন| তবে ইমাম রাযী (রহ.) এটিও উল্লেখ করেছেন যে, আয়াতের অর্থ উভয় ক্ষেত্রেই (অভিভাবক ও পিতা) প্রযোজ্য হতে পারে| (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী, ৯/৪৯৪-৪৯৫) |
﴿السُّفَهاءَ﴾ ‘নির্বোধগণ’, আয়াতে ‘সুফাহা’ শব্দ দ্বারা কাদেরকে বোঝানো হয়েছে—এ বিষয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে দুটি মত পাওয়া যায়|
(ক) অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে এমন সব ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা আর্থিক বিষয়ে অপরিপক্ব, অবিবেচক বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ| ফলে তারা সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে সক্ষম নয়| তাই তাদের হাতে সরাসরি সম্পদ তুলে না দিয়ে তাদের প্রয়োজন পূরণ এবং সম্পদ নিরাপদে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে|
(খ) অপরদিকে, কিছু মুফাসসিরের মতে, এখানে বিশেষভাবে এতিমদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে| অর্থাৎ, যতদিন তারা পরিপক্বতা ও আর্থিক বিচক্ষণতা অর্জন না করবে, ততদিন তাদের সম্পদ অভিভাবকের তত্ত্বাবধানেই থাকবে| (তাফসীর গরীব আল-আল-কুরআন, আল-কাওয়ারী, ৪/৫)|
তবে এখানে দ্বিতীয় মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য| কারণ, এ আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ইয়াতিমদের অধিকার, তাদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং অভিভাবকের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে| তাই প্রসঙ্গগত দিক থেকে এখানে ‘السفهاء’ শব্দ দ্বারা ইয়াতিমদের উদ্দেশ্য করাই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়| (আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন) |
﴿أَمْوالَكُم﴾ “তোমাদের সম্পদ”, আয়াতে অভিভাবকদের স¤ে^াধন করে বলা হয়েছে ‘তোমাদের সম্পদ’, অথচ সম্পদের মালিক হলো ইয়াতিম ব্যক্তি| তাহলে আল্লাহ তা’আলা কেন ﴿أموالكم﴾ (তোমাদের সম্পদ) বলেছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মুফাসসিরগণ দুটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন—
(ক) এখানে সম্পদকে অভিভাবকদের দিকে স¤^ন্ধযুক্ত করা হয়েছে মালিকানার কারণে নয়, বরং তাদের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার অধিকার থাকার কারণে| অর্থাৎ, সম্পদের ওপর ˆবধভাবে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব থাকলেই এ ধরনের স¤^ন্ধ আরোপ ভাষাগতভাবে শুদ্ধ|
(খ) এখানে একই মানবসমাজের ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় সম্পদকে অভিভাবকদের দিকে স¤^ন্ধযুক্ত করা হয়েছে| অর্থাৎ, একজনের কল্যাণ অন্যজনের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত| কুরআনে এ ধরনের ব্যবহার আরও রয়েছে| যেমন—
﴿فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ﴾ — “তোমরা নিজেদের হত্যা করো” (সূরা আল-বাকারা: ৫৪)|
﴿ثُمَّ أَنْتُمْ هَؤُلَاءِ تَقْتُلُونَ أَنْفُسَكُمْ﴾ — “অতঃপর তোমরাই একে অপরকে হত্যা করছ” (সূরা আল-বাকারা: ৮৫)|
এখানে কেউ নিজেকে হত্যা করেনি; বরং একই জাতির মানুষ পরস্পরকে হত্যা করেছে| তবুও পারস্পরিক সম্পর্ক ও একত্বের কারণে ‘নিজেদের’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে| অনুরূপভাবে, এতিমদের সম্পদও সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ; এর সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অভিভাবকদের ওপর অর্পিত| এ কারণেই কুরআন তাদের সম্পদকে ﴿أموالكم﴾—“তোমাদের সম্পদ” বলে উল্লেখ করেছে| (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী, ৯/৪৯৪-৪৯৫)|

পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে অত্র আয়াতদ্বয়ের সম্পর্ক:
আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে এতিমদের তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং নারীদের তাদের মোহর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন| আর এ আয়াতে তিনি উভয় ক্ষেত্রেই সম্পদ হস্তান্তরের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নির্ধারণ করেছেন: (ক) সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা (সাফাহ বা সম্পদ সংরক্ষণে অদক্ষ না হওয়া) এবং (খ) পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের বিচক্ষণতা ও সক্ষমতা যাচাই করা| এ দুটি শর্তের উদ্দেশ্য হলো, তাদের সম্পদ যেন নিরাপদ থাকে এবং অপচয় বা ক্ষতির হাত থেকে সংরক্ষিত হয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২৪৮) |
ছয় ন¤^র আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
এ আয়াতটি সাবিত ইবনু রিফাআহ (রা.) এবং তাঁর চাচাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে| ঘটনার বিবরণ হলো, রিফাআহ ইন্তিকাল করলে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে সাবিত এতিম হয়ে যায়| তাঁর চাচা সাবিতের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন| এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাতিজা একজন এতিম এবং সে আমার তত্ত্বাবধানে রয়েছে| তার সম্পদ থেকে আমার জন্য কী পরিমাণ গ্রহণ করা ˆবধ? আর কখন আমি তার সম্পদ তার কাছে হস্তান্তর করব?” তখন আল্লাহ তা’আলা ত্র আয়াত নাযিল করে ইয়াতিমের সম্পদ সংরক্ষণ, অভিভাবকের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তা থেকে গ্রহণের সীমা এবং কখন এতিমের কাছে তার সম্পদ হস্তান্তর করতে হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিধান মানবজাতির জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন| (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১৪৭) |
আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
এ আয়াতদ্বয় ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত| এতে একদিকে এতিম ও দুর্বলদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে অভিভাবকদের আমানতদারিতা, ¯^চ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহভীতির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| এর মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| বিশেষত, এতিমদের সম্পদ সংরক্ষণ ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ আয়াতদ্বয়ে অভিভাবকদের জন্য নয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রদান করা হয়েছে, যা নিম্নে আলোচনা করা হলো|
(ক) আর্থিক বিষয়ে অপরিপক্ব, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ কিংবা প্রতিবন্ধির হাতে সম্পদ অর্পণ করা যাবে না| আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾ অর্থাৎ, যারা সম্পদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার যোগ্যতা রাখে না, তাদের হাতে সম্পদ তুলে দিও না| এর উদ্দেশ্য হলো সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১৮৭; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/২৯)|
(খ) ইয়াতিমদের আর্থিক অযোগ্যতার কারণে তাদের হাতে সম্পদ অর্পণ না করা গেলেও তাদের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা অভিভাবকের দায়িত্ব| ইসলাম একদিকে যেমন ইয়াতিমদের সম্পদ অপচয় ও অপব্যবহার থেকে রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের মৌলিক অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| তাই কোনো ইয়াতিম সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ হওয়ার কারণে তার হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া না হলেও, তার খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের দায়িত্ব অভিভাবককে যথাযথভাবে পালন করতে হবে| এসব ব্যয় তার সম্পদ থেকেই বহন করা হবে, যাতে তার সম্পদ সংরক্ষিত থাকার পাশাপাশি তার ¯^াভাবিক জীবনযাপনও নিশ্চিত হয়| এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ﴾ “তোমরা তাদের ওই সম্পদ থেকেই জীবিকার ব্যবস্থা করো এবং তাদেরকে পোশাক প্রদান করো”|
আয়াতে ﴿فِيهَا﴾ (তাতে/ওই সম্পদে) শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইয়াতিমের মূলধন অক্ষুণ্ন রেখে তা ব্যবসা, কৃষি বা অন্য কোনো ˆবধ উপায়ে বিনিয়োগ করে অর্জিত আয় থেকে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা উচিত| এতে একদিকে মূল সম্পদ সংরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে এতিমের প্রয়োজনও পূরণ হয়| (তাফসীর আল-বাগাভী: ২/১৬৪; তাফসীর ইবন কাসীর: ২/২১৫; আল-তাফসীর আল-মুনীর, ৪/২৪৯) | অতএব, এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সম্পদ হস্তান্তর সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যেতে পারে; কিন্তু ইয়াতিমের মৌলিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ থেকে তাকে কখনোই বঞ্চিত করা যাবে না| বরং তার সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ ও কল্যাণকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তার সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব|
(গ) এতিম ও দুর্বলদের সঙ্গে সদাচরণ ও উত্তম ভাষায় কথা বলতে হবে| ইয়াতিমদের সম্পদ সাময়িকভাবে তাদের হাতে অর্পণ না করা হলেও তাদের প্রতি কঠোর, অবজ্ঞাসূচক বা কষ্টদায়ক আচরণ করা ˆবধ নয়| বরং অভিভাবকের কর্তব্য হলো তাদের সঙ্গে সদয়, সম্মানজনক ও আশ্বাসমূলক ভাষায় কথা বলা, যাতে তারা নিজেদের অবহেলিত বা বঞ্চিত মনে না করে| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا﴾ “আর তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম ও শালীন কথা বলো”| এ আয়াতাংশ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম কেবল ইয়তিমের আর্থিক অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশই দেয়নি; বরং তাদের মানসিক, সামাজিক ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার প্রতিও সমান গুরুত্বারোপ করেছে| তাই সম্পদ তাদের হাতে তুলে দিতে বিল¤^ হলে তার কারণ নম্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে, ভবিষ্যতে সম্পদ হস্তান্তরের আশ্বাস দিতে হবে এবং সর্বদা তাদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করতে হবে| এতে তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং অভিভাবকের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৩; তাফসীর আস-সা‘দী: ১১৬৪; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৫)|
(ঘ) এতিমদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা পরীক্ষা করা আবশ্যক| এতিম বালেগ হলেই তার সম্পদ তার হাতে তুলে দেওয়া যাবে না; বরং তার মধ্যে সম্পদ সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনার যোগ্যতা বা রুশদ সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা আগে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে| এ উদ্দেশ্যে অভিভাবক তার হাতে সামান্য পরিমাণ সম্পদ দিয়ে ক্রয়-বিক্রয়, আয়-ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তার বিচক্ষণতা ও দক্ষতা যাচাই করবেন| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَابْتَلُوا الْيَتَامَى﴾ “তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করো”|
এ আয়াতাংশ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এতিমের সম্পদ হস্তান্তরের পূর্বে তার আর্থিক প্রজ্ঞা, দায়িত্বশীলতা এবং সম্পদ রক্ষার সক্ষমতা যাচাই করা অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব| কারণ, সম্পদ পরিচালনায় অদক্ষ ব্যক্তির হাতে সম্পদ তুলে দিলে তা অপচয়, ক্ষয় বা আত্মবিনষ্টির আশঙ্কা থাকে| তাই ইসলাম এতিমের অধিকার সংরক্ষণের ¯^ার্থে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াকে যথেষ্ট মনে করেনি; বরং আর্থিক বিচক্ষণতা ও বাস্তব দক্ষতার পরীক্ষাকেও সম্পদ হস্তান্তরের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৫; আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৯/৪৯৮; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৪-৩৫)|
(ঙ) এতিমের নিকট সম্পদ হস্তান্তরের জন্য দুটি মৌলিক শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক| ইসলাম এতিমের সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবল¤^ন করেছে| তাই কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তার হাতে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি; বরং তার মধ্যে সম্পদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার যোগ্যতা ও বিচক্ষণতা সৃষ্টি হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে| আল্লাহ তা’আলা বলেন— ﴿حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ﴾ “অতঃপর তারা যখন বিবাহযোগ্য বয়সে উপনীত হবে এবং তোমরা তাদের মধ্যে বিচক্ষণতা উপলব্ধি করবে, তখন তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করে দাও”|
এ আয়াতাংশ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এতিমের নিকট সম্পদ হস্তান্তরের জন্য দুটি শর্ত অপরিহার্য—
(ক) বুলূগ (প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া): অর্থাৎ, সে এমন বয়সে উপনীত হবে, যখন সাধারণত বিবাহযোগ্যতা এবং শারীরিক পরিপক্বতা অর্জিত হয়|
(খ) রুশদ (আর্থিক বিচক্ষণতা): অর্থাৎ, সম্পদ সংরক্ষণ, আয়-ব্যয় ও আর্থিক লেনদেন সঠিকভাবে পরিচালনার সক্ষমতা ও প্রজ্ঞা তার মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে|
অতএব, এ দুটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিভাবক এতিমের সম্পদ তার হাতে অর্পণ করবেন না| আর উভয় শর্ত পূরণ হওয়ার পর সম্পদ আটকে রাখাও ˆবধ নয়; বরং দ্রুত তার নিকট তা হস্তান্তর করা অভিভাবকের দায়িত্ব| চার মাজহাবের ফকীহগণ মূলত এ নীতির ওপর একমত হয়েছেন, যদিও ‘রুশদ’ নির্ধারণের কিছু উপবিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৬-৩৯; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৬)|
(চ) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, অপচয় বা অন্যায়ভাবে ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে হারাম| ইসলাম এতিমের সম্পদকে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করেছে| তাই অভিভাবক বা অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা, অপচয় করা বা আত্মসাৎ করা ˆবধ নয়| বিশেষ করে এতিম প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের সম্পদের অধিকারী হওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে তার সম্পদ ব্যয় বা আত্মসাৎ করার প্রবণতাকে আল্লাহ তা‘আলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন| তিনি বলেন— ﴿وَلَا تَأْكُلُوهَا إِسْرَافًا وَبِدَارًا أَنْ يَكْبَرُوا﴾ “তোমরা অপচয় করে এবং তারা বড় হওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে তাদের সম্পদ গ্রাস করো না”| এ আয়াতে ﴿إِسْرَافًا﴾ শব্দ দ্বারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়, অপচয় এবং সীমালঙ্ঘনকে বোঝানো হয়েছে| আর পরের শব্দ ﴿بِدَارًا أَنْ يَكْبَرُوا﴾ দ্বারা বোঝানো হয়েছে, এতিম সাবালক হওয়ার আগেই তার সম্পদ দ্রুত ভোগ বা আত্মসাৎ করার মানসিকতা| এ ধরনের আচরণ কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং এটি গুরুতর খিয়ানত, কবিরা গুনাহ এবং আল্লাহর কঠোর শাস্তির কারণ| তাই অত্র সূরার ১০ ন¤^র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন—
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ গ্রাস করে, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের উদরে আগুনই ভরে; আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে” (সূরাতু আন-নিসা: ১০)| তাই অভিভাবকের দায়িত্ব হলো এতিমের সম্পদ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা, প্রয়োজন ছাড়া তা ব্যবহার না করা এবং এতিম বালেগ ও বিচক্ষণ হলে বিল¤^ না করে তার সম্পদ তার নিকট ফিরিয়ে দেওয়া| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৬; তাফসীর আল-বাগাভী: ২/১৬৫-১৬৭; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৩৯-৪১)|
(ছ) ধনী ও দরিদ্র অভিভাবকের জন্য পৃথক বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে| এতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনকারী অভিভাবকের আর্থিক অবস্থার প্রতি ইসলাম বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে| তাই অভিভাবক যদি ধনী হন, তবে তিনি এতিমের সম্পদ থেকে কোনো প্রকার পারিশ্রমিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করবেন না| বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ আমানতদারিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন| পক্ষান্তরে, যদি অভিভাবক দরিদ্র হন এবং এতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়, তবে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী এবং শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে তা থেকে গ্রহণ করতে পারবেন| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ﴾ “যে অভিভাবক সচ্ছল, সে যেন (এতিমের সম্পদ থেকে) বিরত থাকে| আর যে অভিভাবক অভাবগ্রস্ত, সে যেন ন্যায়সংগতভাবে (প্রয়োজন অনুযায়ী) গ্রহণ করে”|
এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অভিভাবকের জন্য এতিমের সম্পদ ভোগের মূলনীতি হলো আমানতদারিতা, সংযম ও ন্যায়পরায়ণতা| দরিদ্র অভিভাবকের জন্য যে ভোগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা লাভ অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়; বরং প্রয়োজন পূরণের সীমার মধ্যে| অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, তিনি কেবল প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্রহণ করবেন এবং কোনো অবস্থাতেই অপচয়, আত্মসাৎ বা ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে এতিমের সম্পদ ব্যবহার করবেন না| এ বিধানের মাধ্যমে ইসলাম একদিকে এতিমের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে অভিভাবকের বাস্তব প্রয়োজনের প্রতিও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি দিয়েছে| (তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৪২-৪৫; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৬; তাফসীর আল-বাগাভী: ২/১৬৭)|
(জ) ইয়াতিমের নিকট সম্পদ হস্তান্তরের সময় সাক্ষী রাখা আবশ্যক| ইসলাম আর্থিক লেনদেনে ¯^চ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ প্রতিরোধের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে| তাই এতিম যখন বালেগ ও আর্থিকভাবে বিচক্ষণ প্রমাণিত হবে এবং তার সম্পদ তার নিকট হস্তান্তর করা হবে, তখন এ সময় সাক্ষী রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿فَإِذَا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ﴾ “অতঃপর যখন তোমরা তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করবে, তখন এ বিষয়ে সাক্ষী রাখবে”| এ নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়টি সুস্পষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষ করা, যাতে ভবিষ্যতে এতিম বা অভিভাবক—কোনো পক্ষই সম্পদ হস্তান্তর অ¯^ীকার করতে না পারে এবং এ নিয়ে কোনো বিরোধ, অভিযোগ বা মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি না হয়| সাক্ষী রাখার মাধ্যমে লেনদেনের ¯^চ্ছতা নিশ্চিত হয়, উভয় পক্ষের অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়|
তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এ নির্দেশের উদ্দেশ্য এতিমের সম্পদ সুরক্ষা এবং অভিভাবককে ভবিষ্যতের অভিযোগ থেকে রক্ষা করা| তাই সাক্ষী রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম ব্যবস্থা; বিশেষত যখন সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হয়| এর মাধ্যমে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি—আমানত রক্ষা, ¯^চ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিরোধ প্রতিরোধ করা—বাস্তবায়িত হয়|
উল্লেখ্য, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা‘আলা বলেন— ﴿وَكَفَىٰ بِاللَّهِ حَسِيبًا﴾ “আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট”| অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে সাক্ষী রাখা হলেও সর্বোচ্চ সাক্ষী ও প্রকৃত হিসাবগ্রহণকারী আল্লাহ তা‘আলাই| তাই একজন মুমিনের উচিত মানুষের কাছে যেমন জবাবদিহিতার মনোভাব রাখা, তেমনি সর্বদা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়েও দায়িত্ব পালন করা| (আল-তাফসীর আল-মুনীর: ৪/২৫২-২৫৩; আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৯/৫০২; তাফসীর আল-কুরতুবী: ৫/৪৪-৪৫; তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/২১৮-২১৯)|
আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) নিজের বা অন্যের তত্ত্বাবধানে থাকা সম্পদ, বিশেষত এতিম ও দুর্বলদের সম্পদ, সর্বোচ্চ সতর্কতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে রক্ষা করা|
(খ) এতিম ও দুর্বলদের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা, সম্মানজনক ও কোমল ভাষায় কথা বলা এবং উপযুক্ত সময় ও যোগ্যতা অর্জনের পর তাদের সম্পদ তাদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া|
(গ) গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনের সময় সাক্ষী রাখা, প্রয়োজনীয় দলিল-প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে ¯^চ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা|
(ঘ) সর্বদা স্মরণ রাখা যে, সকল কাজের প্রকৃত হিসাবগ্রহণকারী আল্লাহ তা‘আলা| তাই অন্যের সম্পদে খিয়ানত, আত্মসাৎ ও অন্যায় ভোগ থেকে বিরত থেকে ন্যায় ও তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করা|

Leave a Reply

error: Content is protected !!