﴿يا أَيُّهَا النّاسُ اِتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ واحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْها زَوْجَها وَبَثَّ مِنْهُما رِجالاً كَثِيراً وَنِساءً وَاِتَّقُوا اللهَ الَّذِي تَسائَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحامَ إِنَّ اللهَ كانَ عَلَيْكُمْ رَقِيباً (1)﴾ [سورة النساء: 1].
আলোচ্যবিষয়: তাকওয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও জীবন গঠনের শিক্ষা|
আয়াতের সরল অনুবাদ:
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর থেকেই তাঁর স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন| তারপর তাদের দু’জন থেকে অসংখ্য পুরুষ ও নারী পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন| আর তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার নামের মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো, এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকো| নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা-সর্বদা পর্যবেক্ষক|
আয়াতের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা’আলা তাঁর সকল বান্দাকে —মুমিন ও কাফির সবাইকে— একটি সাধারণ স¤ে^াধনের মাধ্যমে ডেকে বলেন: “হে মানুষ!”| অতঃপর তিনি তাদের তাকওয়া অবল¤^নের নির্দেশ দেন| তাকওয়া হলো- প্রকাশ্যে ও গোপনে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর আনুগত্য ও ইসলামের অনুসরণ করার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা|
এরপর আল্লাহ নিজের পরিচয় দেন এভাবে যে, তিনিই তাদের প্রতিপালক| তিনি সমগ্র মানবজাতিকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তা হলো আদম (আ.), যাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল| তারপর সেই এক প্রাণ থেকেই তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন| এরপর এ দু’জনের মাধ্যমে পৃথিবীতে অসংখ্য পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন|
এরপর আল্লাহ আবারও তাকওয়ার নির্দেশ দেন| কারণ তাকওয়াই সব কল্যাণের মূলভিত্তি; এটি ছাড়া প্রকৃত সফলতা ও সৌভাগ্য অর্জন সম্ভব নয়| তিনি বলেন: “তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর প্রতি তোমাদের অন্তর বিশ্বাস স্থাপন করেছে| তোমাদের কেউ যখন অন্য কারও কাছে কোনো প্রয়োজন পূরণের অনুরোধ করত, তখন বলত, “আল্লাহর দোহাই, আমাকে এ কাজটি করে দাও”| আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকেও বিরত থাকো| কারণ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে বড় ধরনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও ক্ষতি সৃষ্টি হয়|
অবশেষে আল্লাহ তাদের সতর্ক করে বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা পর্যবেক্ষক”, অর্থাৎ, তিনি তোমাদের সব কাজ লক্ষ্য করছেন, সবকিছু হিসাব করে রাখছেন এবং সেসব কাজের যথাযথ প্রতিদান দেবেন| সুতরাং, হে মানুষ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলো| (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩৩; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৩-২২৪; আল-তাফসীর আল-মুয়াস&সার: ১/৭৭; আল-মুনতাখাব: ১/১২৪) |
আয়াতের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿نَفْسٍ وَاحِدَةٍ﴾ “একটি প্রাণ থেকে”, সকল মুসলিম একমত যে, আয়াতাংশে ‘একটি প্রাণ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আদম (আ.) | (আত-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৭৭) |
﴿زَوْجَهَا﴾ ‘তার স্ত্রী’, সকল তাফসীরকারক এক মত যে, এখানে ‘তার স্ত্রী’ দ্বারা আদম (আ.)-এর স্ত্রী হাওয়াকে (আ.) বুঝানো হয়েছে| (আত-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৭৭) |
﴿وَالأَرْحَامَ﴾ “এবং আত্মীয়গণ”, এখানে আয়াতাংশের দুইটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
(ক) শব্দটিকে ‘নসব’ বা যবর দিয়ে পড়লে এর অর্থ হবে- তোমরা আল্লাহকে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর|
(খ) শব্দটিকে ‘যর’ বা ‘যের’ দিয়ে পড়লে এর অর্থ হবে- তোমরা আল্লাহ এবং আত্মীয়তাকে মাধ্যম বানিয়ে আবেদন করে থাক| (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১৮১, আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪৩২) |
আয়াতের আলোকে হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টির ঘটনা:
তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তা’আলা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে জান্নাতে বসবাসের ব্যবস্থা করেন| পরে তাঁর একাকীত্ব দূর করা এবং তাঁর জন্য শান্তি ও সঙ্গের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে আদম (আ.)-এর বাম পাশের একটি পাঁজরের হাড় থেকে হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন| আদম (আ.) ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন| যখন তিনি জেগে উঠলেন, তখন তাঁর পাশে হাওয়া (আ.)-কে দেখতে পেলেন| এরপর আল্লাহ তাদের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং জান্নাতে একত্রে বসবাসের অনুমতি দেন| এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
“إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ أَعْوَجَ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهَا كَسَرْتَهَا، وَإِنْ تَرَكْتَهَا وَفِيهَا عِوَجٌ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا”.
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই নারীকে একটি বাঁকা পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে| তুমি যদি সেটিকে একেবারে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে| আর যদি তার ¯^ভাবগত বাঁকাভাবসহ তাকে গ্রহণ কর, তবে তার সঙ্গে জীবন উপভোগ করতে পারবে” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)| তবে হাওয়ার (আ.) সৃষ্টির বিস্তারিত সময়, পদ্ধতি ও ঘটনার অনেক বিবরণ ইসরাইলি বর্ণনা থেকে এসেছে| তাই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে শুধু কুরআন ও সহীহ হাদিসে যা এসেছে, সেটুকুই গ্রহণ করা উচিত|
আয়াতের শিক্ষা:
সূরাতু আন-নিসা ইসলামী সমাজ ও পারিবারিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূরা| এ সূরায় পরিবার, বিবাহ, নারী-পুরুষের অধিকার, উত্তরাধিকার, এতিমের হক এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কিত নানা বিধান আলোচনা করা হয়েছে| তাই সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা’আলা সমগ্র মানবজাতিকে তাকওয়া অবল¤^নের আহ্বান জানিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সকল মানুষ একই পিতা-মাতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে| এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে| এ আয়াত মানবজাতির ঐক্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক চমৎকার ভিত্তি স্থাপন করে| এ আয়াতের মৌলিক শিক্ষা গুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
(ক) আয়াত শুরু হয়েছে ‘হে মানবজাতি’ দিয়ে, তাফসিরবিদ উসূলবিদ আলেমগণ একমত যে, “হে মানবজাতি!”—এই স¤ে^াধন সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষের জন্য সাধারণভাবে প্রযোজ্য| এ মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ| এর পক্ষে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
প্রথমত, ‘আন-নাস’ (মানুষ) শব্দটি এমন একটি বহুবচন শব্দ যার সঙ্গে ‘আলিফ-লাম’ যুক্ত হয়েছে| আর আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের শব্দ সাধারণত সকল মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে|
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা’আলা তাকওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সবাইকে একক সত্তা তথা আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি করেছেন| এই কারণটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নয়; বরং সকল মানুষের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য| যেহেতু কারণটি সর্বজনীন, তাই এর ওপর ভিত্তি করে প্রদত্ত বিধানও সর্বজনীন হবে|
তৃতীয়ত, তাকওয়া অবল¤^নের নির্দেশ কেবল মক্কার অধিবাসীদের জন্য নয়; বরং পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য| অতএব, ‘মানুষ’ শব্দটি যখন সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাকওয়ার নির্দেশও যখন সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, এবং এ নির্দেশের ভিত্তি—অর্থাৎ সকল মানুষের এক পিতা আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি হওয়াও যখন সর্বজনীন সত্য, তখন এ আয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সার্বজনীন আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করাই যথার্থ| (তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৭৫)|
সাধারণত মাক্কী সূরাগুলোতে ‘হে মানবজাতি’ স¤ে^াধন থাকে, আর মাদানী সূরাতে থাকে ‘হে মুমিনগণ’| তবে এ সূরাটি মাদানী হওয়া সত্ত্বেও “হে মানবজাতি!” স¤ে^াধনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে| এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সূরাটিতে বিবাহ, উত্তরাধিকার, দাম্পত্য অধিকার, আত্মীয়তার সম্পর্ক, দুধ-সম্পর্কসহ মানবজীবনের বহু সামাজিক বিধান আলোচনা করা হয়েছে, যা সকল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৫) |
(খ) আয়াতের দ্বিতীয়াংশে তাক্বওয়া বা আল্লাহ ভীতি অবল¤^নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| আলী (রা.)-এর ভাষ্যমতে তাক্বওয়া হলো-
“الخوف من الجليل، والعمل بالتنزيل، والرضا بالقليل، والاستعداد ليوم الرحيل”.
অর্থাৎ: “মহামহিম আল্লাহকে ভয় করা, অবতীর্ণ বিধান (কুরআন) অনুযায়ী আমল করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রস্থান দিবস (মৃত্যু ও আখিরাত)-এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা”| তাক্বওয়ার এ সংজ্ঞাকে আরো স্পষ্ট করার জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব ও উবাই ইবনু কা’ব-এর মধ্যকার ঘটনাটি বর্ণনা করা যায়- “উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার উবাই ইবনু কা‘ব (রা.)-কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে চলেছেন?” উমর (রা.) বললেন, “হ্যাঁ”| তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তখন আপনি কী করেছিলেন?” উমর (রা.) বললেন, “আমি কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলেছিলাম, যাতে কাঁটা না লাগে”| তখন উবাই ইবনু কা‘ব (রা.) বললেন, “এটাই হলো তাকওয়া”| (তাফসীর ইবনু কাছীর: ১/৭৫) | অর্থাৎ, তাকওয়া হলো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা নিয়ে চলা; এমনভাবে নিজেকে গুনাহ, অবাধ্যতা ও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণসমূহ থেকে রক্ষা করা, যেমন একজন পথিক কাঁটাযুক্ত পথে চলার সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে কাঁটার আঘাত থেকে বাঁচিয়ে চলে| তাই তাকওয়া শুধু আল্লাহকে ভয়ের ভান করার নাম নয়; বরং সচেতনতা, আত্মসংযম, সতর্কতা এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করার নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম| (আল্লাহই ভালো জানেন)|
আয়াতাংশে রবকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে| রুবুবিয়্যাত ও তাকওয়া-এর মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
(১) রবুবিয়্যাতের ¯^ীকৃতি তাকওয়ার ভিত্তি, যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে আল্লাহই তার স্রষ্টা, প্রতিপালক, রিযিকদাতা, জীবনদাতা ও পরিচালনাকারী, তখন ¯^াভাবিকভাবেই তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভয় সৃষ্টি হয়| এই অনুভূতির বাস্তব প্রকাশই হলো তাকওয়া| অর্থাৎ- রুবুবিয়্যাতের জ্ঞান → আল্লাহর মহত্বের উপলব্ধি → তাকওয়ার জন্ম|
(২) সৃষ্টির ঋণ ¯^ীকার থেকে আনুগত্যের জন্ম, যে সত্তা আমাকে অস্তিত্ব দিয়েছে, লালন-পালন করেছে এবং প্রতিনিয়ত আমার জীবন পরিচালনা করছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা ˆনতিকভাবে অপরিহার্য| তাই রবুবিয়্যাতের ¯^ীকৃতি মানুষকে তাকওয়ার দিকে পরিচালিত করে| ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর রবুবিয়্যাত সম্পর্কে যত বেশি জ্ঞান লাভ করে, তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি তত বেশি ভয়, ভালোবাসা ও আনুগত্য সৃষ্টি হয়”| (তারিখ আল-হিজরাতাইন: ২৮৩) |
সুতরাং রুবুবিয়্যাত মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টি করে যে, আমি ¯^াধীন ও ¯^য়ংসম্পূর্ণ নই; বরং একজন মহান রবের সৃষ্টি ও অধীন| আর এই উপলব্ধি থেকে যে বিনয়, আনুগত্য, সতর্কতা ও জবাবদিহিতাবোধ জন্ম নেয়, তারই নাম তাকওয়া|
(গ) আয়াতের তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রবুবিয়্যাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তুলে ধরেছেন| তিনি মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সকল মানুষের মূল উৎস এক| আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে আমাদের আদি পিতা আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন| এরপর আদম (আ.)-এর দেহ থেকে তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন, যাতে তারা একে অপরের সঙ্গী ও শান্তির কারণ হতে পারেন| তারপর এই প্রথম মানবদম্পতির মাধ্যমে মানবজাতির বংশধারা বিস্তার লাভ করে| পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির অসংখ্য পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে পড়লেও তাদের সবার মূল উৎস এক এবং স্রষ্টাও এক| অত্র আয়াতাংশে তাদের দাবির জোরালো ও অকাট্য জবাব নিহিত রয়েছে, যারা মনে করে যে মানুষ বানর থেকে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান মানবজাতিতে পরিণত হয়েছে| আল্লাহ তা‘আলা এখানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সমগ্র মানবজাতিকে “একক প্রাণ” অর্থাৎ আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি করেছেন| এ আয়াতের ভাষা মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে কোনো ধরনের সংশয় বা অনুমানের অবকাশ রাখে না; বরং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, সকল মানুষের আদি পিতা হলেন আদম (আ.) এবং সকল নারী-পুরুষ তাঁরই বংশধর|
সুতরাং যারা দাবি করে যে মানুষের মূল উৎস বানর, তাদের উত্তরে আমরা বলি: আমরা মুসলিম হিসেবে মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান গ্রহণ করি আল্লাহর ওহী থেকে, যিনি সর্বজ্ঞ এবং সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত| তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, আদম (আ.)-ই প্রথম মানব এবং তাঁর থেকেই মানববংশের বিস্তার ঘটেছে| অতএব, মানুষের উৎপত্তিকে বানরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা আল্লাহর সুস্পষ্ট বাণীর পরিপন্থী|
এ কারণে যারা নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষকে বানরের বংশধর মনে করে, তা তাদের নিজ¯^ ধারণা ও মতবাদ| কিন্তু সেই ধারণাকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আমাদেরকেও সেই দাবির অন্তর্ভুক্ত করার কোনো অধিকার তাদের নেই| আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের পরিচয় কোনো প্রাণীজগতের বিবর্তিত রূপ হিসেবে নয়; বরং আমরা সেই সম্মানিত মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত, যার সূচনা হয়েছে আল্লাহর হাতে সৃষ্ট প্রথম মানব আদম (আ.)-এর মাধ্যমে| এই বিশ্বাস মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও ¯^তন্ত্র সৃষ্টিগত ˆবশিষ্ট্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং মানবজাতির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আল্লাহপ্রদত্ত সত্যের প্রতি আমাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করে| (আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন) |
(ঘ) আয়াতের চতূর্থাংশে আল্লাহ ভীতির গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপশি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে| মানুষের ¯^ভাব হলো, তারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য একে অপরের কাছে আল্লাহর নামের মাধ্যমে আবেদন করে| যেমন কেউ বলে, “আল্লাহর ওয়াস্তে আমার এই কাজটি করে দিন” বা “আল্লাহর দোহাই, আমাকে সাহায্য করুন|” এ ধরনের আবেদন প্রমাণ করে যে মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও মহত্ত্বের ¯^ীকৃতি রয়েছে| কারণ মানুষ সাধারণত এমন সত্তার নামে আবেদন করে, যাকে সে মহান ও সম্মানিত মনে করে| অতএব, যখন মানুষ আল্লাহর নামকে এত সম্মান ও মর্যাদা দেয় যে তাঁর নামের মাধ্যমে অন্যের কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের আবেদন করে, তখন তার উচিত আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতিও সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল হওয়া| আল্লাহর নির্দেশ পালন করা, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিহার করাই প্রকৃত তাকওয়ার দাবি|
এরপর আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন| যেমন আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য, তেমনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাও ভয়ংকর গুনাহ, যা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক| তাই আয়াতের অর্থ হলো—তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামের মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে প্রার্থনা কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককেও সম্মান কর| আত্মীয়-¯^জনের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, তাদের খোঁজখবর নাও, তাদের উপকার কর এবং সম্পর্ক অটুট রাখ| কখনো আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করো না; কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এমন একটি অপরাধ, যা থেকে প্রত্যেক মুমিনের সতর্ক থাকা উচিত| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৪) | এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحامَكُمْ﴾ [سورة محمد: ৪৭].
অর্থাৎ: তোমরা যদি আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভ কর, তবে কি তোমাদের দ্বারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া আর কিছু প্রত্যাশিত আছে? (সূরাতু মোহাম্মদ: ৪৭) |
এ ব্যাপারে অনেক হাদীস এসেছে, যেমন একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إنَّ الرَّحِمَ شِجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ، فقالَ اللَّهُ: مَن وصَلَكِ وصَلْتُهُ، ومَن قَطَعَكِ قَطَعْتُهُ” (صحيح البخاري: ৫৯৮৮).
অর্থাৎ- “আত্মীয়তার সম্পর্ক (রহিম) রহমানের (আল্লাহর) সঙ্গে বিশেষভাবে সংযুক্ত| তাই আল্লাহ বলেছেন: ‘যে তোমাকে (আত্মীয়তার সম্পর্ককে) বজায় রাখবে, আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক (রহমত ও অনুগ্রহ) বজায় রাখব; আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমিও তাকে আমার রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করব” (সহীহ আল-বুখারী: ৫৯৮৮)| সুতরাং এ আয়াত আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
১. আল্লাহর প্রতি যথাযথ তাকওয়া ও আনুগত্য অবল¤^ন করা|
২. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা এবং কোনো অবস্থাতেই সম্পর্ক ছিন্ন না করা| এ দু’টি গুণই একজন মুমিনের ঈমানের পূর্ণতা ও উত্তম চরিত্রের অন্যতম নিদর্শন| (আল্লাহই ভালো জানেন) |
(ঙ) আল্লাহর সর্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের অনুভূতি| আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা পর্যবেক্ষক”| এই আয়াতাংশ মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপন—সব অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করতে এবং তাঁর নজরদারির কথা স্মরণ রাখতে শিক্ষা দেয়| তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি সকল কিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবগত, প্রত্যেক মানুষের কাজকর্ম, কথা, অবস্থা ও অন্তরের গোপন বিষয়সমূহও তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়| তিনি সর্বদা তাঁর বান্দাদের ওপর পর্যবেক্ষক, রক্ষক ও হিসাবগ্রহণকারী| তাই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য এমন কোনো বিধান প্রণয়ন করেন না, যাতে তাদের ক্ষতি রয়েছে; বরং তাঁর সকল আদেশ-নিষেধ মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ইহকাল-পরকালের সফলতার জন্যই নির্ধারিত| তিনি আমাদের অবস্থা, প্রয়োজন ও দুর্বলতা সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত| ফলে তাঁর নির্দেশনাই মানুষের জন্য সর্বোত্তম পথনির্দেশনা| (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২২৪) |
আয়াতের এই সমাপ্তি অংশ মূলত তাকওয়া অবল¤^ন ও আল্লাহর আদেশ পালনের প্রতি একটি শক্তিশালী প্রেরণা এবং অবাধ্যতা থেকে সতর্কবাণী| কারণ যখন মানুষ বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তার প্রতিটি কাজ, কথা ও চিন্তা সম্পর্কে অবগত, তখন সে আল্লাহকে ভয় করবে, তাঁর আদেশ মেনে চলবে এবং তাঁর নিষেধকৃত বিষয় থেকে দূরে থাকবে| এ সমাপ্তি অংশটি অর্থ ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে আল্লাহর এ বাণীর অনুরূপ:
﴿وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ﴾ [سورة المجادلة: ৬، وسورة البروج: ৯].
অর্থাৎ: “আর আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর ওপর সাক্ষী” (সূরাতু আল-মুজাদালাহ: ৬, সূরাতু আল-বুরুজ: ৯)|
আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবল¤^ন করে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা|
(খ) সমগ্র মানবজাতিকে একই পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে বিবেচনা করে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা|
(গ) আত্মীয়-¯^জনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সিলাতুর রাহিমের হক আদায় করা|
(ঘ) মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) প্রদত্ত সত্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং আকীদাগত বিভ্রান্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা|
(ঙ) সর্বদা এই বিশ্বাস ও অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখা যে আল্লাহ আমাদের সকল কথা, কাজ ও অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে অবগত; তাই প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর আনুগত্যে অবিচল থাকা|
