Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর

﴿لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ (181) ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ (182) الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ عَهِدَ إِلَيْنَا أَلَّا نُؤْمِنَ لِرَسُولٍ حَتَّى يَأْتِيَنَا بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ قُلْ قَدْ جَاءَكُمْ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِي بِالْبَيِّنَاتِ وَبِالَّذِي قُلْتُمْ فَلِمَ قَتَلْتُمُوهُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (183) فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ جَاءُوا بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ وَالْكِتَابِ الْمُنِيرِ (184)﴾ [سورة آل عمران: 181-184].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৮১। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছিল: “আল্লাহ গরিব, আর আমরা ধনী”। তারা যা বলেছে এবং যে অন্যায়ভাবে তারা নবীদের হত্যা করেছে- সবই আমরা লিখে রাখব। আর (কিয়ামতে) আমরা বলব: “জ্বালাময় আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো”।
১৮২। এটি তোমাদের নিজেদের হাতের কামাইয়ের ফল। আর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি কখনোই জুলুমকারী নন।
১৮৩। যারা বলেছিল: “আল্লাহ আমাদের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, কোনো রাসূলের প্রতি আমরা ঈমান আনব না, যতক্ষণ না সে আমাদের কাছে এমন কুরবানি নিয়ে আসে যাকে আগুন এসে ভস্ম করে দিবে”। তাদের বলুন: “আমার আগেও তোমাদের কাছে বহু রাসূল স্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলেন এবং তোমরা যা দাবী করছো তা নিয়েও এসেছিলেন। তাহলে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাদের কেন হত্যা করেছিলে?”।
১৮৪। অতএব তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, যারা স্পষ্ট প্রমাণ, লিখিত কিতাব এবং উজ্জ্বল কিতাব নিয়ে এসেছিলেন।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৮১। আল্লাহ তায়ালাই আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র মালিক। সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছুর উত্তরাধিকার তাঁরই কাছে ফিরে যাবে। অথচ কিছু ইহুদি এই সত্য অস্বীকার করে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের সুরে বলেছিল যে, আল্লাহ গরিব, তাই তিনি মানুষের কাছে দান-খরচকে “ঋণ” বলে চাইছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর মর্যাদা খাটো করা এবং ঈমানদারদের দান-খরচকে তুচ্ছ করা। আসলে আল্লাহ মানুষের দানকে “ঋণ” বলেছেন সম্মান ও উৎসাহ দেওয়ার জন্য, প্রয়োজনের কারণে নয়। মানুষের দেওয়া দান-সদকা তাঁর কোনো উপকার করে না; বরং তা মানুষেরই কল্যাণে আসে এবং তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন। এই অবমাননাকর কথার কারণে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তাদের এই কুফরি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য শুনেছেন এবং তা তাদের আমলনামায় লিখে রাখা হয়েছে। যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তী বড় অপরাধ- নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করার অপরাধও লেখা আছে। এসব গুরুতর অপরাধের ফলস্বরূপ কিয়ামতের দিন তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে বলা হবে।
১৮২। এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা কোনো অবিচার বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি হবে ইহুদীদের নিজেদের কৃতকর্মেরই পরিণাম। দুনিয়ার জীবনে তাদের মুখে যে কুফরি ও অবমাননাকর কথা বলেছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে গুনাহের কাজ করেছে এবং অন্তরে যে ভ্রান্ত ও বাতিল বিশ্বাস লালন করেছে, সবকিছুই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না, বরং প্রত্যেককে তার নিজের আমলের অনুযায়ী প্রতিফল দেন। তাই শাস্তি ভোগকারীরা নিজেরাই নিজেদের জন্য সেই পরিণতি ডেকে এনেছে।
১৮৩। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সেই যুক্তি খন্ডন করছেন, যা তারা নবীদের আগমনের সময় ব্যবহার করত। তারা বলত, তারা কোনো নবীকে তখনই বিশ্বাস করবে, যখন সে আসমান থেকে আগুন নেমে কোনও কুরবানি দাহ করবে। আল্লাহ তায়ালা এখানে স্মরণ করাচ্ছেন- তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে বহু নবী এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শন ও অলৌকিক নিদর্শনসহ। তারা দেখতে পেত যে নবীরা সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত, কিন্তু তাদের অহংকার ও অমর্যাদার কারণে সেই নবীদের হত্যা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ জিজ্ঞেস করছেন- যদি তারা সত্যি ঈমানদার হত, এবং আসমান থেকে আগুন নেমে কুরবানিকে দাহ হওয়াকে নবীর সত্যতার মানদন্ড মনে করত, তাহলে তারা কেন তাদের পূর্বপুরুষদের হত্যা করেছিল।
১৮৪। আল্লাহ এখানে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦ দিচ্ছেন যে, কাফের-মুশরিক ও ইহুদি-খ্রিষ্টনরা রাসূলুল্লাহকে (সা.) মিথ্যা বলে অবজ্ঞা করলেও এটা নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক নবীকে তাদের নিজ স¤প্রদায়ের মানুষ মিথ্যাপবাদ ও বিদ্রƒপের মাধ্যমে নাকচ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে অস্বীকার করা এবং নবীদের আহ্বানকে অবমূল্যায়ন করা। কিন্তু নবীরা শুধু তাদের কথার মাধ্যমে নয়, স্পষ্ট অলৌকিক নিদর্শন, প্রমাণ এবং আসমানি গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষকে ঈমানের পথে আহ্বান করেছিল। আসমানি গ্রন্থ মানুষের জন্য আলোর মতো, যা মানুষকে অন্ধকার, বিভ্রান্তি ও ভুল থেকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই গ্রন্থগুলো স্পষ্ট, পরিষ্কার এবং সঠিক ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝাতে সক্ষম। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮-১১৯) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ﴾ ‘এমন কুরবানী, যাকে আগুন ভস্মীভ‚ত করে দেয়’, আয়াতাংশে কুরবান (القربان) বলতে বোঝায়- আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু বা অন্য কোনো বস্তু। পূর্ববর্তী নবীদের যুগে কুরবানের একটি বিশেষ নিদর্শন ছিল: কুরবান নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়া হতো, এরপর আকাশ থেকে এক প্রকার সাদা আগুন অবতীর্ণ হয়ে তা ভস্মীভূত করলে বুঝা যেত যে আল্লাহ তা কবুল করেছেন। আর আগুন না নামলে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে গণ্য হতো। (তাফসীর গরীব আল-কেরাআন, কাওয়ারী: ৩/১৮৩)।
﴿الْبَيِّنَات﴾ ‘স্পষ্ট প্রমাণ’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নিদর্শন এবং নবী-রাসূলদের উপর প্রেরিত মোযেজা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।
﴿الَّذِي قُلْتُمْ﴾ ‘যা তোমরা বলছো’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কুরবানী, কারণ ইহুদীরা এমন কুরবানীর দাবী তুলেছিল, যা আকাশ থেকে আগুন এসে শেষ করে দিবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে প্রাণ উৎসর্গে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে মুজাহিদদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট যে জান্নাতের মহান সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়ের প্রতিও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; কারণ সম্পদ হলো প্রাণেরই ঘনিষ্ঠ সহচর। এই পথে সম্পদ ব্যয়ে কৃপণতা করলে যে কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতদ্বয়ে আরও বোঝানো হয়েছে যে দুনিয়ার সম্পদ ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। যাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার আসে এবং যারা উত্তরাধিকারী হয়, উভয়ই একদিন মৃত্যুবরণ করবে; আর চিরস্থায়ী মালিকানা থাকবে একমাত্র আল্লাহরই। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে ইহুদিদের একটি বক্তব্য উল্লেখ করে তার অসারতা খন্ডন করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেওয়া হয়েছে যে তাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অস্বীকার ও মিথ্যারোপ নতুন কিছু নয়; পূর্ববর্তী নবীরাও তাদের কাছ থেকে অনুরূপ বিরোধিতা ও অস্বীকৃতির সম্মুখীন হয়েছেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৪৫)।

১৮১ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু ইসহাক ও ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন- একদিন আবু বকর (রা.) ইহুদিদের পাঠশালায় (বায়তুল মিদরাস) প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দেখেন, কয়েকজন ইহুদি তাদের এক ব্যক্তির চারপাশে জড়ো হয়েছে, যার নাম ছিল ‘ফিনহাস’। সে আবু বকর (রা.)-কে বলল: “হে আবু বকর! আমরা আল্লাহর প্রতি মোখাপেখী নয়; বরং তিনি আমাদের প্রতি মোখাপেখী। যদি তিনি আমাদের প্রতি মুখাপেক্ষী না হতেন, তবে তোমাদের নবী আমাদের কাছ থেকে ঋণ চাইতেন না”। এ কথা শুনে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে চপেটাঘাত করেন। এরপর ‘ফিনহাস’ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বলল: হে মুহাম্মদ! দেখুন, আপনার সঙ্গী আমার সাথে কী করেছে!? রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন- হে আবু বকর! তুমি কেন এমন করলে?” তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! সে অত্যন্ত ভয়াবহ কথা বলেছে। সে দাবি করেছে- আল্লাহ দরিদ্র, আর তারা নাকি ধনী!। ফিনহাস এ কথা অস্বীকার করল। তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন।
আরেক বর্ণনায় ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: যখন আল্লাহ তায়ালা সূরাতু আল-বাক্বারার ২৪৫নং আয়াত: “কে আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দেবে” নাযিল করলেন: তখন ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল: হে মুহাম্মদ! তোমার প্রতিপালক কি দরিদ্র হয়ে গেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের কাছে ঋণ চাইছেন?”, তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৫) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সুরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা ইহুদিদের কুৎসিত মানসিকতা ও ভয়ংকর অপরাধসমূহ স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। এখানে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ, নবীদের হত্যা এবং রাসূলুল্লাহকে (সা.) অস্বীকার করার ধারাবাহিক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দেন- তিনি সব কথা শোনেন, সব কাজ জানেন এবং কোনো জুলুমই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়। একই সঙ্গে এই আয়াতসমূহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেয় যে, সত্যের পথের আহ্বানকারীরা অতীতেও একই রকম অবজ্ঞা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।
১। ১৮১ এবং ১৮২ নং আয়াতদ্বয়ে চারটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইহুদীদের প্রথম হটকারিতা হলো- আল্লাহর প্রতি তাদের জঘন্য অপবাদ, এই আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের এক জঘন্য অপবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র আর আমরা ধনী”। এটি ছিল আল্লাহর শানে চরম অবমাননা ও কুফরী বাক্য। দুনিয়াবি সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে আল্লাহর গুণাবলির প্রতি অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিল। অথচ আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত গুণ সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে: তিনি কারো প্রতি মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু বিশ্বের সবকিছুই তার দিকে মুখাপেক্ষী। যেমন সূরাতু আল-ইখলাসে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ফুঠে উঠেছে।
এছাড়া সূরাতু আল-ফাতির এ এসেছে-
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ﴾ [سورة الفاطر: ১৫].
অর্থ: “হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ তো অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত” (সূরাতু আল-ফাতির: ১৫) । এবং সূরাতু মুহাম্মদ এ এসেছে-
﴿وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ﴾ [سورة محمد: ৩৮].
অর্থ: “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আর তোমরাই মুখাপেক্ষী” (সূরাতু মুহাম্মাদ: ৩৮) । হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
“يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ” (صحيح مسلم: ২৫৭৭].
অর্থ: “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, আমি যাকে খাওয়াই সে ছাড়া; অতএব আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাওয়াবো। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন সবাই একত্র হয়ে আমার নিকট কিছু চায় এবং আমি প্রত্যেককে তার চাওয়া দিয়ে দেই, তবুও তা আমার রাজত্ব থেকে সূচের ছিদ্রে প্রবেশ করা পানির সমানও কমাবে না” (সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭) ।
(খ) ইহুদীদেরকে সতর্কীকরণ- তাদের সকল কর্মকান্ড আল্লাহ তায়ালার পর্যবেক্ষণে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন- “আমরা তাদের এ কথা লিখে রাখব”। অর্থাৎ তাদের মুখের কথা, অন্তরের কুফরী মনোভাব এবং কার্যকলাপ, সবই আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত। কোনো অপবাদ, বিদ্রূপ বা অপরাধই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়। এবং অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা তাদের কথা শুনছেন। এ ছাড়াও কোরআনের বিভিন্ন জায়গাতে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। যেমন সূরাতু ক্বফ- এ বলেছেন:
﴿مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴾ [سورة ق: ١٨].
অর্থ: “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা-ই আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা লিখে রাখেন” (সূরাতু ক্বফ: ১৮) । কোরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ﴾ [سورة الملك: ١٤].
অর্থ: “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি তো অতিসূ²দর্শী, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত” (সূরাতু আল-মুলক: ১৪) । আকেটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ﴾ [سورة غافر: ١٩].
অর্থ: “চোখের গোপন বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তর যা গোপন করে, সবই তিনি জানেন” (সূরাতু গাফির: ১৯) ।
এ ব্যাপারে অনেক হাদীস রয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ ثُمَّ بَيَّنَ ذَلِكَ، فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ سَيِّئَةً وَاحِدَةً” [متفق عليه].
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সয়ং তার রব থেকে বর্ণনা করেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নেক আমল ও গুনাহ লিখে রেখেছেন। অতঃপর তিনি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো নেক কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকে একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে নেক কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা সম্পন্ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা দশগুণ থেকে শুরু করে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত, বরং তার চেয়েও বহুগুণ বাড়িয়ে লিখে দেন। আর কেউ যদি কোনো গুনাহ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকেও একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে গুনাহ করার ইচ্ছা করে এবং তা বাস্তবায়ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা একটি মাত্র গুনাহ হিসেবে লিখে দেন” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ” (صحيح مسلم: ২৫৬৪].
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান” (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তিনি তাদের কথাবার্তা শোনেন, তাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন এবং তাদের মুখের কথা, কাজকর্ম ও নিয়ত, সবকিছুই লিপিবদ্ধ করেন। তাদের কুফর, বিদ্রæপ ও অপরাধের কোনো কিছুই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।
(গ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ইহুদীদের হঠকারিতার জবাব ও শাস্তির ঘোষণা, ইহুদীরা আল্লাহ তায়ালার শানে কুফরিমূলক অপবাদ, বিদ্রƒপ ও অবাধ্যতার যে চরম সীমা অতিক্রম করেছিল, তার জবাবে আল্লাহ তায়ালা শুধু সতর্ক করেননি; বরং ১৮১ নং আয়াতের শেষাংশে সুস্পষ্টভাবে কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তোমরা আগুনের শাস্তি আস্বাদন কর”। এটি কোনো আবেগপ্রসূত হুমকি নয়; বরং তাদের বিশ্বাস, কথা ও কর্মের ন্যায়সংগত পরিণতির ঘোষণা, যা আখিরাতে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
(ঘ) ইহুদীরা কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার কারণ, আল্লাহ তায়ালা যখন ইহুদীদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেন, তখন তা কোনো আকস্মিক বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং আল্লাহ তায়ালা ১৮২ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন- এই শাস্তির মূল কারণ হলো তাদের নিজেদের হাতের কামাই করা কৃতকর্ম। অর্থাৎ তারা যা করেছে, তারই ন্যায্য পরিণতি হিসেবে এই শাস্তি অবধারিত হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, ইহুদীদের অপরাধ ছিল সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত এবং সীমালঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ। তাদের কৃতকর্মের মধ্যে কয়েকটি অপরাধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-
প্রথমত, নবী-রাসূলদের অন্যায়ভাবে হত্যা। আল্লাহ তায়ালা যাদের মানুষকে হেদায়েতের আলো দেখানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন, সেই নবী-রাসূলদেরকেই তারা হত্যা করেছে বা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, যেমনটি ১৮৩ নং আয়াতে দেখা যায়। এটি শুধু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তায়ালার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ। এটি ছিল ইহুদীদের অন্যতম মারাত্মক অপরাধ। তারা আল্লাহ তায়ালার শানে এমনসব কথা বলেছে, যা কেবল অবমাননাকরই নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফরিমূলক। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তারা আল্লাহর মহান গুণাবলি, বিশেষত তাঁর অমুখাপেক্ষিতা, পূর্ণতা ও একত্বকে অস্বীকার করেছে। এটি ছিল তাদের চরম ধৃষ্টতা ও অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, তারা কখনো বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র, আর আমরা ধনী” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৮১)। আবার কখনো তারা বলেছে- “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ১৮, সূরাতু আত-তাওবাহ: ৩০)। কোরআন এ ধরনের বক্তব্যকে স্পষ্ট ভাষায় মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। এ ধরনের অপবাদ আল্লাহর সত্তা ও একত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানে এবং তাওহিদের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। এভাবে বারবার আল্লাহর শানে মিথ্যা আরোপ করে তারা শুধু মুখের গুনাহেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অন্তরের কুফরি মানসিকতা প্রকাশ করেছে। এই ধরণের অপবাদ প্রমাণ করে-তারা আল্লাহকে যথার্থভাবে চিনতে অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের জ্ঞান ও সম্পদের অহংকারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তৃতীয়ত, বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘন। ইহুদীদের সামনে সত্য যখন সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল নবী-রাসূলদের মাধ্যমে, কিতাব ও নিদর্শনের মাধ্যমে, তখনও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। সত্য তাদের অজানা ছিল না; বরং তারা তা চিনত, বুঝত এবং জানত যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু জেনেশুনে তারা সেই সত্যকে অস্বীকার করেছে, যা ছিল তাদের চরম হঠকারিতা ও বিদ্রোহী মানসিকতার প্রমাণ। তারা শুধু বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই সীমালঙ্ঘন করেনি; বরং কার্যত আল্লাহর বিধান ভেঙেছে, বারবার অঙ্গীকার ও চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার হোক কিংবা নবীদের মাধ্যমে দেওয়া নির্দেশনা, সবকিছুই তারা নিজেদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কাছে তুচ্ছ করে দিয়েছে। ফলে দ্বীনের বিধানকে অনুসরণের পরিবর্তে তারা প্রবৃত্তি, অহংকার ও দুনিয়াবি লাভকে প্রাধান্য দিয়েছে।
এই আচরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; সমস্যা ছিল হৃদয়ের রোগে, হিংসা, অহংকার ও দুনিয়ামুখিতা। এ কারণেই কোরআন তাদের সম্পর্কে বারবার উল্লেখ করেছে- তারা সত্য জানার পরও তা গোপন করত, বিকৃত করত এবং অমান্য করত। এমন ধারাবাহিক সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘনই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত করে তোলে।
২। ১৮৩ নম্বর আয়াতে ইহুদীদের একটি বিশেষ হঠকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে তার শক্ত জবাব দিয়েছেন এবং তাদের মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
(ক) ইহুদীদের দ্বিতীয় হঠকারিতা: মিথ্যা অজুহাত ও আকিদাগত বিকৃতি, আয়াতের প্রথমাংশে দেখা যায়- ইহুদীরা ঈমান না আনার জন্য একটি কৃত্রিম ও মনগড়া শর্ত দাঁড় করিয়েছিল। তারা আল্লাহর নামে এমন একটি অঙ্গীকারের কথা বলেছে, যার কোনো ওহিভিত্তিক প্রমাণ নেই। এটি ছিল আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ, যা কুফরি ও ধৃষ্টতার অন্তর্ভুক্ত। পূর্ববর্তী কিছু নবীর যুগে কুরবানি গ্রহণের জন্য আসমান থেকে আগুন নেমে আসা ছিল তখনকার একটি বিশেষ পদ্ধতি বা মুজিজা। কিন্তু ইহুদীরা সেই ব্যতিক্রমী ঘটনাকেই নবুয়তের সার্বজনীন শর্তে পরিণত করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সত্য গ্রহণ এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- নিদর্শন দেখানোর পরও তারা ঈমান আনেনি। এখানে স্পষ্ট হয়, তাদের সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; বরং সমস্যা ছিল অন্তরের রোগে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করত এবং নবুয়ত যেন কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এই অহংকারে আক্রান্ত ছিল। ফলে অন্য জাতির মধ্য থেকে রাসূল আসা তারা মানতে পারেনি।
(খ) আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব- ইতিহাসের আয়নায় সত্য উন্মোচন, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের দাবির জবাবে রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেন: “বলুন, আমার আগেও তোমাদের কাছে রাসূলগণ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এবং তোমরা যে নিদর্শনের দাবী তুলছো, তা নিয়েও। তবে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে তাদেরকে হত্যা করলে কেন?”। এই প্রশ্নটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুক্তিনির্ভর। আল্লাহ তায়ালা এখানে আবেগ নয়, বরং ইতিহাসকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ইহুদীদের নিকট বহু নবী এসেছিলেন, যাঁরা সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এমনকি তারা যে নিদর্শনের দাবি করছে, সেটিও কিছু নবীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো- তারা সেই নবীদের প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁদের হত্যা করেছে অথবা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। নবী হত্যা ছিল তাদের সত্যবিমুখতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যারা সত্যকে ভালোবাসে, তারা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না।
(গ) মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা যখন বলেন- “যদি তোমরা সত্যবাদী হও”, তখন এটি কোনো সাধারণ শর্ত নয়; বরং তাদের মিথ্যা দাবি ও ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচনের এক কঠোর ঘোষণা। কারণ তারা দাবি করেছিল- নির্দিষ্ট এক নিদর্শন ছাড়া তারা কোনো রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে না। অথচ বাস্তবতা হলো, তাদের কাছে এমন বহু রাসূল এসেছিলেন, যাঁরা স্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঈমান আনার পরিবর্তে সেই নবীদের হত্যা করেছে বা হত্যার পথ প্রশস্ত করেছে। সুতরাং আল্লাহর এই শর্তমূলক বাক্যটি আসলে একটি তিরস্কার, যা প্রমাণ করে যে তাদের সমস্যা প্রমাণের অভাবে নয়, বরং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ, অহংকার ও অন্তরের বিকৃতির কারণে। কারণ প্রকৃত সত্যবাদীরা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না। আর ঈমানের নামে অজুহাত দাঁড় করিয়ে তারা নিজেদের মিথ্যাচারকেই প্রকাশ করে দিয়েছে।
৩। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সমর্থন ও সান্ত¦না দিয়েছেন। মানুষ যখন তাঁর ওপর অবিশ্বাস ও অপবাদ আরোপ করত, তখন আল্লাহ তাঁকে স্মরণ করাতেন যে এ ঘটনা নতুন নয়, বরং আগের নবীদের সাথেও এমনই ঘটেছে। ১৮৪ নং আয়াতের মাধ্যমেও তার হৃদয়ে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি যোগানো হয়েছে। নিম্নের ব্যাখ্যায় আয়াতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরব:
প্রথমত, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর ওপর আরোপিত মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। সত্যের দাওয়াত সব যুগেই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে কাফিরদের পক্ষ থেকে “মিথ্যাবাদী” বলাকে নবুওয়াতের পথে অস্বাভাবিক কিছু মনে করার কারণ নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) মানসিকভাবে দৃঢ় করেন এবং তাঁর অন্তরের ভার লাঘব করেন। এ সম্পর্কে আরো অনেক আয়াত ও হাদীস এসেছে, যেমন একটি আয়তে এসেছে-
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের উপর ধৈর্য ধারণ করেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।
আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ ۚ مَا يَأْتِيهِم مِّن رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ﴾ [سورة يس: ৩০].
অর্থ: “আফসোস বান্দাদের জন্য! তাদের কাছে যখনই কোনো রাসূল এসেছে, তারা তাকে উপহাস করেছে” (সূরাতু ইয়াসিন: ৩০) । এছাড়াও সূরাতু আল-আনয়াম-এর ১১২ নং আয়াত এবং সূরাতু আল-ফোরক্বান এর ৩১ নং আয়াতে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে একটি প্রশিদ্ধ হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءً الْأَنْبِيَاءُ، ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ” (سنن الكبرى للنسائي: ৭৪৪০).
অর্থ: “মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষায় পড়েন নবীগণ; এরপর যারা তাদের ন্যায়পরায়ণতায় নিকটবর্তী” (সুনান আল-কুবরা লিন-নাসায়ী: ৭৪৪০)।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ পূর্ববর্তী রাসূলদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেন। তাঁর আগেও বহু নবী এসেছেন, যাঁরা সমাজকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছিলেন; অথচ তাঁদেরকেও মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) একা নয়; বরং তিনি নবীদের সেই সম্মানিত ধারাবাহিকতার অন্তর্ভূক্ত, যাঁদের পথ কঠিন হলেও তাঁদের দাওয়াত ছিল নির্ভুল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।
তৃতীয়ত, আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে পূর্ববর্তী রাসূলগণ কেবল সাধারণ আহ্বান নিয়ে আসেননি; তাঁরা এসেছিলেন সুস্পষ্ট নিদর্শন, সহীফা এবং উজ্জ্বল আসমানী কিতাবসহ। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে প্রমাণের কোনো অভাব ছিল না। তবুও ইহুদীরা তা অস্বীকার করেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তাদের কুফর ও প্রত্যাখ্যান দাওয়াতের দুর্বলতার কারণে নয়, বরং তাদের অন্তরের অন্ধত্ব ও অহংকারের ফল।
চতুর্থত, এই আয়াত দাওয়াতের দায়িত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে। রাসূলুল্লাহর (সা.) দায়িত্ব ছিল সত্যের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া; মানুষের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা বা না করা তাঁর দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়। সুতরাং মানুষের ঈমান না আনা কোনোভাবেই নবীর দাওয়াতি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে না। এই উপলব্ধি দাওয়াতদাতার জন্য গভীর প্রশান্তি বয়ে আনে। এ সম্পর্কে কোরআনে অনেক আয়াতে এসেছে, যেমন:
﴿مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ﴾ [سورة المائدة: ৯৯].
অর্থ: “রাসূলের উপর দায়িত্ব কেবল (আল্লাহর বার্তা) পৌঁছে দেওয়া; আর তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর, আল্লাহ তা সবই জানেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ৯৯) । এছাড়াও সূরাতু আন-নাহল এর ৮২, সূরাতু ইয়সিন এর ১৭, সূরাতু আল-ক্বাসাস এর ৫৬, এবং সূরাতু আল-বাক্বারা এর ২৭২ নং আয়াতসমূহে এ সম্পর্কে আলোচন এসেছে।
বিদায়ী হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: ‘আমি কি তোমাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছাতে পেরেছি’, সকলে সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন- ‘হ্যা’, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এটি প্রমাণ করে- রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দায়িত্বের সফলতা মাপতেন বার্তা পৌঁছেছে কি না, তা দিয়ে; মানুষ মানল কি না, তা দিয়ে নয়।
পঞ্চমত, এই আয়াতের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো ধৈর্য ও অবিচলতা। সত্যের পথে চলতে গিয়ে কষ্ট, অপবাদ ও বিরোধিতা অনিবার্য। তবে এগুলোই নবীদের পথের বাস্তবতা। এই উপলব্ধি রাসূলুল্লাহকে (সা.) সবরে জামিলের পথে অটল থাকতে সহায়তা করে এবং তাঁর হৃদয়ে এই দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে যে শেষ পরিণতি সত্য ও হকের পক্ষেই থাকবে। এ সম্পর্কে অন্য একটি আয়াতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّىٰ أَتَاهُمْ نَصْرُنَا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের ওপর ধৈর্য ধারণ করেছে, অবশেষে তাদের কাছে আমার সাহায্য এসে পৌঁছেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কোনো কটুক্তি, অপবাদ বা সন্দেহপূর্ণ কথা থেকে বিরত থেকে বিশুদ্ধ আকিদার ওপর অটল থাকা।
(খ) জুলুম, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণ থেকে নিজেকে দূরে রেখে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।
(গ) আখিরাতের জবাবদিহি ও কঠিন শাস্তির কথা স্মরণ করে নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও তওবার অভ্যাস গড়ে তুলা।
(ঘ) সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে বিরোধিতা ও কষ্ট এলে নবীদের পথ অনুসরণ করে ধৈর্য ও অবিচলতা অবলম্বন করা।
(ঙ) মানুষের প্রতিক্রিয়াকে সাফল্যের মানদন্ড না বানিয়ে দায়িত্ববোধের সঙ্গে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়াকেই নিজের সাফল্য হিসেবে গ্রহণ করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ঈমানের মানদন্ড: পরীক্ষা, তাক্বওয়া এবং আমানত।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর

﴿مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ (179) وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (180)﴾ [سورة آل عمران: 179-180].

 

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: ঈমানের মানদন্ড: পরীক্ষা, তাক্বওয়া এবং আমানত।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(১৭৯) আল্লাহ মুমিনদেরকে যে অবস্থায় তারা আছে, সে অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না, যতক্ষণ না তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে অপবিত্রকে পবিত্র থেকে পৃথক করে দেন। আর আল্লাহ তোমাদেরকে গায়েবের বিষয় জানিয়ে দেন না; তবে তিনি তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান, তাকে বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আনো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
(১৮০) আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ দিয়েছেন, তা নিয়ে কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য ভালো; বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণকর। তারা যে বিষয়ে কৃপণতা করেছে, কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলায় বেড়ি হিসেবে পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
১৭৯। আল্লাহ তায়ালা কখনোই মুমিনদেরকে এভাবে ছেড়ে দেবেন না যে, তাদের মধ্যে প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিক একাকার অবস্থায় থেকে যাবে; যতক্ষণ না তিনি প্রকৃত মুমিনকে মুনাফিক থেকে স্পষ্ট করে দেন। আর আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞার অংশ নয় যে, তিনি মুমিনদেরকে গায়েবের জ্ঞান জানিয়ে দেবেন, যার মাধ্যমে তারা প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিককে চিনে নিবে; বরং তিনি পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমেই তাদের পার্থক্য প্রকাশ করেন। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করেন এবং ওহির মাধ্যমে তাকে গায়েবের কিছু জ্ঞান দান করেন। অতএব তাদের উচিৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আর যদি তারা সত্যিকার ঈমান স্থাপন করে এবং আনুগত্যের মাধ্যমে তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তবে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য রয়েছে মহান প্রতিদান।
১৮০। যারা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ থেকে যে সম্পদ তাদের দান করেছেন, তাতে কৃপণতা করে এবং ফরজ কর্তব্য ও কল্যাণের পথে তা ব্যয় করে না, তারা যেন মনে না করে যে এই কৃপণতা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং এটি তাদের জন্য এক ভয়াবহ অকল্যাণকর, যার পরিণতি অত্যন্ত মন্দ। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে:
(ক) দুনিয়াতে কৃপণতার কারণে লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের ভোগ করতে হয় এবং তার নেতিবাচক প্রভাব মানুষের আত্মার ওপর পড়ে।
(খ) আল্লাহ তাআলা আখিরাতে সেই সম্পদের মাধ্যমেই তাদের শাস্তি দিবেন যে সম্পদকে তিনি তাদের গলায় আগুনের বেড়ি বানিয়ে দিবেন, অথবা তা বিষধর সাপে রুপান্তরিত হয়ে তাদেরকে পেঁচিয়ে ধরবে। সে সাপ তার মালিককে বলবে: “আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন”, যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে যে কৃপণতায় কল্যাণ আছে, তার উচিত এ ধারণা ত্যাগ করা এবং বুঝে নেওয়া যে প্রকৃত কল্যাণ রয়েছে ব্যয় করার মধ্যেই, কৃপণতার মধ্যে নয়। আর যে সম্পদ সে কৃপণতা করে জমা রাখে, তা সহ জগতের সবকিছুই আসলে আল্লাহরই সম্পদ; শেষ পর্যন্ত আল্লাহই তার উত্তরাধিকারী হবেন। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৫-৪১৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮০; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ﴾ ‘যতক্ষণ না তিনি অপবিত্র থেকে পবিত্রকে আলাদা করেন’, এ আয়াতাংশে ‘অপবিত্র’ দ্বারা কাফের-মুনাফিককে বুঝানো হয়েছে এবং ‘পবিত্র’ দ্বারা মুমিনকে বুঝানো হয়েছে। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০৩) । অর্থাৎ- বাহ্যিকভাবে সবাই এক কাতারে থাকলেও, সময়ের পরীক্ষায় অন্তরের অবস্থা প্রকাশ পায়। বিপদ, জিহাদ, ত্যাগ ও আনুগত্যের মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে যায়- কে আল্লাহর জন্য দৃঢ়, আর কে স্বার্থের অনুসারী। এভাবেই আল্লাহ মুমিনদেরকে অপবিত্র দল থেকে আলাদা করে নেন এবং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
﴿سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ﴾ ‘যে সম্পদের ব্যাপারে তারা কৃপণতা করেছে, তাদের গলায় তা বেড়ি হিসেবে পরানো হবে’, অর্থাৎ দুনিয়াতে যে সম্পদ তারা আঁকড়ে ধরে রেখেছিল এবং আল্লাহর নির্ধারিত পথে ব্যয় করেনি, সেই সম্পদই আখেরাতে শাস্তির রূপ ধারণ করবে। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন- এই ‘বেড়ি’ বা (طَوْق) বাস্তবও হতে পারে, আবার শাস্তির ভয়াবহতার রূপকও হতে পারে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বোঝা যায়- এটি বাস্তব শাস্তি হিসেবেই সংঘটিত হবে। অর্থাৎ কৃপণতার দ্বারা জমাকৃত সম্পদকে আল্লাহ আগুনের বেড়ি বা ভয়ংকর সাপের রূপে পরিণত করবেন। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَن آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ له مَالُهُ يَومَ القِيَامَةِ شُجَاعًا أقْرَعَ له زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَومَ القِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بلِهْزِمَتَيْهِ – يَعْنِي بشِدْقَيْهِ – ثُمَّ يقولُ أنَا مَالُكَ أنَا كَنْزُكَ، ثُمَّ تَلَا: ﴿لَا يَحْسِبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ﴾ الآيَةَ”.
অর্থ: “যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সেই সম্পদকে একটি বিষধর টাকওয়ালা সাপের রূপ দেওয়া হবে, যার মাথায় দুটি কালো দাগ থাকবে। কিয়ামতের দিন সেই সাপটিকে তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সে সাপ তার দুই চোয়াল দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে বলবে: ‘আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন’। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: ﴿لَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ﴾ “যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য কল্যাণকর”। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৮০)।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৬-১৭৮) আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা কুফরির পথে দ্রæত অগ্রসরমান লোকদের আচরণ ও তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৭৯ নং আয়াতে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, মুমিনদেরকে তিনি এমন অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না যেখানে খাঁটি মুমিন ও মুনাফিক একাকার হয়ে থাকবে; বরং পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমে অপবিত্র ও পবিত্রকে পৃথক করে দেবেন। আর ১৮০ নং আয়াতে সেই অন্তরের কলুষতার একটি বাস্তব নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে- আল্লাহর দানকৃত সম্পদে কৃপণতা করা ও যাকাত আদায় না করা, যা ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ এবং যার পরিণতি আখেরাতে কঠিন শাস্তি। এভাবে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সমস্যার উল্লেখ, পরবর্তী আয়াতগুলোতে তার ব্যাখ্যা ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট ও অর্থবহ ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছে। (আল্লাহই ভালো জানেন)।

১৭৯ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
সুদ্দী (রহ.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মতকে তাদের অবয়বসহ আমার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেমন আদমের (আ.) সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে আমি জেনে গেছি, কে আমার প্রতি ঈমান আনবে আর কে কুফরি করবে”। এই কথা মুনাফিকদের কাছে পৌঁছলে তারা বিদ্রæপ করে বলল: “মুহাম্মদ দাবি করে যে, সে জানে কে তার ওপর ঈমান আনবে আর কে কুফরি করবে, অথচ আমরা তার সাথেই আছি, কিন্তু সে আমাদের চিনতে পারছে না!”। তখন আল্লাহ তাআলা ১৭৯ নং আয়াত নাজিল করেন।
কালবী (রহ.) বলেন: কুরাইশরা বলেছিল: “হে মুহাম্মদ! তুমি দাবি কর যে, যারা তোমার বিরোধিতা করে তারা জাহান্নামে যাবে এবং আল্লাহ তাদের ওপর অসন্তুষ্ট, আর যারা তোমার দ্বীন অনুসরণ করে তারা জান্নাতি এবং আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাহলে আমাদের বলে দাও কে তোমার ওপর ঈমান আনবে আর কে আনবে না”। এরপর আল্লাহ তাআলা ১৭৯ নং আয়াত অবতীর্ণ করেন।
আবু আলিয়া (রহ.) বলেন: “মুমিনরা চেয়েছিল, যেন তাদের এমন কোনো নিদর্শন দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিককে পৃথক করা যায়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহিদী: ৭৫/৭৬, আল-তাফসীর আল-কাবীর: ৪/২৮৮) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ঈমান ও কুফরের প্রকৃত পার্থক্য, গায়েবী জ্ঞানের সীমা এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর পরীক্ষা ও দয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। এ আয়াতদ্বয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহ মুমিন ও মুনাফিককে আলাদা করে প্রকাশ করার জন্য মানুষকে পরীক্ষার মধ্যে রাখেন এবং গায়েবের পূর্ণ জ্ঞান কেবলমাত্র তাঁরই অধিকার। একই সঙ্গে এতে দুনিয়ার সম্পদ ও আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত নিয়ে অহংকার না করে কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধের সাথে ব্যবহার করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
১। ১৭৯ নং আয়াত থেকে চারটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়-
(ক) মানুষকে তাকলীফ বা দায়িত্ব আরোপের উদ্দেশ্য হলো সত্যিকারের মুমিনকে আলাদা করা, আল্লাহ তায়ালা মানুষের উপর বিভিন্ন ফরজ ও দায়িত্ব আরোপ করেছেন যেমন নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ এবং জিহাদ। এই তাকলীফ কেবল বাহ্যিক বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং অন্তরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের একটি মাধ্যম। ১৭৯ নং আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি মুমিনদের এমন অবস্থায় ছেড়ে দিবেন না যেখানে প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিক একাকার হয়ে থাকবে। বরং পরীক্ষা, বিপদ এবং দায়িত্ব পালন বা ত্যাগের মাধ্যমে আলাদা করা হবে, যা দেখাবে কে সত্যিকারের ঈমানদার এবং সৎকর্মশীল, আর কে বাহ্যিকভাবে নামধারী ঈমানদার। সুতরাং তাকলীফ বা দায়িত্ব আরোপ মানব চরিত্র ও নৈতিক অবস্থার একটি পরীক্ষা, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক পরিচয় প্রকাশ করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) । এ ছাড়াও অন্য আরেকটি আয়াতে আরো স্পষ্টভাবে এসেছে-
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ – وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾ [سورة العنكبوت: ২-৩].
অর্থ: “মানুষ কি মনে করে যে তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? নিশ্চয়ই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি, যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে প্রকাশ করেন এবং মিথ্যাবাদীদেরকে প্রকাশ করেন” (সূরাতু আল-আনকাবুত: ২-৩) । একই কথা বলা হয়েছে- সূরাতু আল-বাক্বারার ২১৪, সূরাতু আলে-ইমরানের ১৪২ এবং সূরাতু মোহাম্মদের ৩১ নং আয়াতসমূহে।
(খ) গায়েবী জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা, আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি নির্দেশ করে যে, গায়েবের জ্ঞান কেবল আল্লাহর অধিকার, এবং মানুষ তা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে জানে না। তবে আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞার অনুযায়ী কিছু অংশ তাঁর রাসূলদের জানাতে পারেন, যা উম্মতকে সঠিক পথ প্রদর্শন ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। এটি মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা ও আধ্যাত্মিক পরীক্ষা নির্দেশ করে। মানুষের বোধ ও জ্ঞান সীমিত; তাই তারা ভবিষ্যত ও অন্তরের জটিলতায় পূর্ণভাবে ধারণা রাখতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, স্বাধীন চিন্তা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আল্লাহ তায়ালা যে অংশ জানাতে চান, তা মানুষের নৈতিক এবং আত্মিক উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) । এ সম্পর্কে সূরাতু আল-আনয়ামে বলা হয়েছে-
﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ﴾ [سورة الأنعام: ৫৯].
অর্থ: “গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে; তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৫৯) । এ ছাড়াও কোরআনের আরো অনেক আয়াতে এ সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে- রাসূলুল্লাহ (সা.) কি গায়েব জানতেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে ওলামায়ে কেরাম বলেন: এ কথা বলা যাবে না যে রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবের বিষয়ে সর্বজ্ঞ; বরং তিনি গায়েব সম্পর্কে ততটুকুই জানতেন, যতটুকু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿عَالِمُ الْغَيْبِ فَلا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً – إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُول﴾ [سورة الجـن:২৬-২৭].
অর্থ: “তিনি গায়েবের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গায়েব কাউকে প্রকাশ করেন না, তবে যাকে তিনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করেন তাকে ছাড়া” (সূরাতু জিন: ২৬-২৭)। অতএব গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্দিষ্ট। যেমন আল্লাহ বলেন-
﴿قُلْ لا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ﴾ [سورة النمل:৬৫].
অর্থ: “বলুন, আসমান ও জমিনে যারা আছে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কেউই গায়েব জানে না; আর তারা জানেও না কখন তাদের পুনরুত্থান করা হবে” (সূরাতু নামল: ৬৫)।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবের কোনো বিষয়ই জানতেন না, আল্লাহ যা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন ও অবহিত করেছেন তা ছাড়া। (ইসলাম ওয়েব, ইবনু বা’য) । রাসূলুল্লাহ (সা.) যে গায়ব জানেন না, এ বিষয়ে কোরআনে তার নিজের স্বীকারোক্তি রয়েছে-
﴿قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ ۚ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ﴾ [سورة الأعراف: ১৮৮].
অর্থ: “বলুন, আমি নিজের জন্যও কোনো উপকার বা ক্ষতির মালিক নই, আল্লাহ যা চান তা ছাড়া। আর যদি আমি গায়েব জানতাম, তবে অবশ্যই আমি প্রচুর কল্যাণ অর্জন করতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা সেই সব মানুষের জন্য যারা ঈমান আনে” (সূরাতু আল-আ‘রাফ: ১৮৮)।
সমাজে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, অনেক ওলামায়ে কেরাম যখন কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে ব্যর্থ অথবা অজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তখন তারা বলে থাকেন: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন”। এ কথাটি শুনতে সঠিক মনে হলেও উল্লেখিত ব্যাখ্যার আলোকে এ কথাটি সঠিক নয়, কারণ অদৃশ্য বিষয় সহ সবকিছুর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর রয়েছে। সুতরাং না জানার অপারগতা প্রকাশের সময় বিষয়টিকে শুধু আল্লাহর দিকেই সোপর্দ করতে হবে।
অতএব, সঠিক এবং নির্ভুল বক্তব্য হবে: “আল্লাহই ভালো জানেন”। এই বাক্যটি আল্লাহর সর্বজ্ঞতা ও পূর্ণ জ্ঞানকে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়াও, এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে আমাদের সকল প্রশ্ন এবং সন্দেহের চূড়ান্ত নির্ভরযোগ্য উৎস শুধুমাত্র আল্লাহ, নবী-রাসূলরা শুধু আল্লাহর শিক্ষা ও নির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। (ইবনু বা’য পেইজ থেকে) ।
(গ) চিরস্থায়ী সফলতার মূল ভিত্তি ঈমান ও তাকওয়া, আয়াতের তৃতীয়াংশ নির্দেশ করে যে, জান্নাত অর্জনের মূল ভিত্তি হলো- ঈমান ও তাকওয়া, অর্থাৎ অন্তরের বিশ্বাস, আল্লাহভীতি, সতর্কতা এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলার মানুষিকতা। এটি মূল্যবোধ ও নৈতিক ক্রমের তত্ত¡ প্রতিফলিত করে, চ‚ড়ান্ত ফলাফল কেবল বাহ্যিক ক্ষমতা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে না। প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের অন্তরের বিশুদ্ধতা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং নৈতিক সচেতনতার ভিত্তিতে। তাই জান্নাতের অর্জন হলো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীর ফসল, যা মানুষের চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও আত্মিক পরিশীলনাকে মূল্যায়ন করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) ।
(ঘ) আল্লাহর খবর রাখার বিষয়টি জ্ঞানত্ত¡ (ঊঢ়রংঃবসড়ষড়মু), সত্তাতত্ত¡ (ঙহঃড়ষড়মু) এবং নৈতিক দর্শন (গড়ৎধষ চযরষড়ংড়ঢ়যু) এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে একত্রে স্পর্শ করে:
প্রথমত, জ্ঞানতত্তে¡র দিক থেকে ‘খবীর’ শব্দটি কেবল বাহ্যিক কাজের জ্ঞান নয়, বরং কাজের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য, নিয়ত, প্রেরণা ও পরিণতি পর্যন্ত বিস্তৃত সর্বজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। মানুষের জ্ঞান আংশিক ও সীমাবদ্ধ; সে শুধু দৃশ্যমান আচরণ বিচার করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী ও গভীর, যেখানে কর্মের দৃশ্য-অদৃশ্য, প্রকাশ-গোপন সবই অন্তর্ভুক্ত। এতে বোঝা যায়, বাস্তবতার পূর্ণ জ্ঞান কেবল ঐশী জ্ঞানের মধ্যেই সম্পূর্ণতা লাভ করে। সূরাতু আল-মুলক এর ১৪ এবং সূরাতু আল-গাফির এর ১৯ নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
দ্বিতীয়ত, সত্তাতত্তে¡র আলোকে এই আয়াত মানুষের অস্তিত্বকে নৈতিকভাবে অর্থবহ সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের প্রতিটি কর্ম শুধু একটি শারীরিক ঘটনা নয়; বরং তা অস্তিত্বের স্তরে একটি নৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে, যা আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ, মানুষের কাজ নিঃশেষ হয়ে যায় না; বরং তা সত্তাগতভাবে মূল্যায়িত হয়। সূরাতু আল-কাহফ এর ৪৯ এবং সূরাতু যিলযাল এর (৭-৮) নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
তৃতীয়ত, নৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে আয়াতাংশটি নৈতিক জবাবদিহিতার (গড়ৎধষ অপপড়ঁহঃধনরষরঃু) ভিত্তি স্থাপন করে। যেহেতু আল্লাহ সব কাজ সম্পর্কে অবগত, তাই নৈতিকতা এখানে আপেক্ষিক নয়; বরং এক সর্বজ্ঞ নৈতিক কর্তৃত্বের সাথে সংযুক্ত। মানুষ সমাজ বা আইনের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু ঐশী জ্ঞান থেকে পালানোর কোনো অস্তিত্বগত সুযোগ নেই। এতে মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতার দিকে ধাবিত হয়। সূরাতু আস-সাফফাত এর ২৪ এবং সূরাতু ইসরা এর ৩৬ নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
(ঙ) গায়েবী বিষয়ে অযথা ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা-ই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। উল্লেখিত আয়াত থেকে জানা যায়, কাফেররা অদৃশ্য বিষয় নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করত, যার পেছনে হিদায়াত গ্রহণের আগ্রহ ছিল না; বরং উদ্দেশ্য ছিল তর্ক, উপহাস ও রাসূলুল্লাহকে (সা.) বিরক্ত করা। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, গায়েবী বিষয়ের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র তাঁরই কাছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ থেকে কিছু জানেন না; বরং আল্লাহ যতটুকু ওহীর মাধ্যমে তাঁকে জানিয়েছেন, ততটুকুই তিনি মানুষকে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং মানুষের করণীয় হলো- গায়েবের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে সময় নষ্ট না করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু জানিয়েছেন, তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করা এবং তাতে ঈমান আনা। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৪/২৯০) ।
২। ১৮০ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়-
(ক) সম্পদের ব্যাপারে কৃপণতা করা কৃপণ ব্যক্তির জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়, যদিও কৃপণরা মনে করে এতে তাদের উপকার হচ্ছে। বাস্তবে কৃপণতা মানুষের অন্তরকে সংকীর্ণ করে, সমাজে ঘৃণার জন্ম দেয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। দুনিয়াতে কৃপণ ব্যক্তি সম্মান হারায় এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়। অতএব কৃপণতা কোনো উপকার নয়; বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে কৃপণের জন্য ক্ষতিকর।
(খ) যাকে আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দিয়েছেন অথচ সে সেই সম্পদের মধ্যে আল্লাহ নির্ধারিত হক আদায় করেনি, তাকে কিয়ামতের দিন সেই সম্পদের মাধ্যমেই শাস্তি দেওয়া হবে। কুরআনের আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, কৃপণরা যে সম্পদ জমা করে রেখেছে, তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বা আগুনের হার হিসেবে পরিণত হবে। এটি প্রমাণ করে যে সম্পদ আমানত, আর সেই আমানতের হক আদায় না করলে তা শাস্তিে কারণ হবে।
(গ) আসমান-যমীন এবং তাতে বিরজমান সকল সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তায়ালা। ১৮০ নং আয়াতের আলোকে প্রতিয়মান হয় যে, আসমান ও যমীন এবং তাতে বিদ্যমান সমস্ত সম্পদের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। মানুষ যে সম্পদকে নিজের বলে ধারণ করে, তা বাস্তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি অস্থায়ী আমানত মাত্র। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা ঘাষণা করেন- “আল্লাহরই জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের মীরাস”, অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সব সম্পদ তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, মানুষের মালিকানা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর মালিকানা চিরস্থায়ী। তাই সম্পদের ব্যাপারে কৃপণতা করা বা আল্লাহর নির্ধারিত হক আদায় না করা চরম ভ্রান্তি; কারণ যে সম্পদ নিয়ে মানুষ অহংকার করে, তা একদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে এবং সেই সম্পদের ব্যবহারের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই আয়াত মুমিনকে সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল, আমানতদার ও আল্লাহভীরু করে তোলে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত মালিকের নির্দেশ অমান্য করে কোনো সম্পদই কল্যাণের কারণ হতে পারে না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) পরীক্ষা ও বিপদে ধৈর্য ধারণ করা, কারণ এর মাধ্যমে প্রকৃত মুমিনকে প্রকাশ করা হয়।
(খ) ঈমান ও তাকওয়াকে দৃঢ় করা, কারণ চিরস্থায়ী সফলতা এর উপরই নির্ভরশীল।
(গ) গায়েবী বিষয়ে আল্লাহর হিকমতের উপর ভরসা রাখা, এবং অজানা বিষয়ে “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন” এর পরিবর্তে “আল্লাহই ভালো জানেন” বলা।
(ঘ) সম্পদের মধ্যে আল্লাহর নির্ধারিত হক যথাযথভাবে আদায় করা।
(ঙ) কৃপণতা ও লোভ পরিহার করে দানশীলতা অবলম্বন করা, কারণ কৃপণতা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের জন্য জন্য ক্ষতিকর।
(চ) আখিরাতে জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে জীবন পরিচালনা করা, কারণ প্রত্যেক আমলের হিসাব আল্লাহ নেবেন।

সূরাতু আলে-ইমারনের (১৭৬-১৭৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদের পর রাসূলুল্লাহকে (সা.) আল্লাহ কর্তৃক সান্তনা প্রদান।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَلا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسارِعُونَ فِي الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئاً يُرِيدُ اللَّهُ أَلاَّ يَجْعَلَ لَهُمْ حَظًّا فِي الْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذابٌ عَظِيمٌ (176) إِنَّ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْكُفْرَ بِالْإِيْمانِ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئاً وَلَهُمْ عَذابٌ أَلِيمٌ (177) وَلا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّما نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّما نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدادُوا إِثْماً وَلَهُمْ عَذابٌ مُهِينٌ (178)﴾ [سورة آل عمران: 176-177].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: উহুদের পর রাসূলুল্লাহকে (সা.) আল্লাহ কর্তৃক সান্তনা প্রদান।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৭৬। যারা দ্রুত কুফরের পথে ধাবিত হয়, তাদের কারণে আপনি হতাশ বা দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। তারা কখনও আল্লাহকে ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ চান না যে তারা আখেরাতে কোনো অংশ লাভ করুক, আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
১৭৭। যারা ঈমানকে বিক্রি করে কুফর গ্রহণ করে, তারা কখনও আল্লাহকে কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
১৭৮। কাফেরেরা যেন ভুল ধারণা না করে যে, আল্লাহ তাদের অবকাশ দিচ্ছেন এবং এটি তাদের জন্য কল্যাণ। বরং আল্লাহ তাদের অবকাশ দেন, যাতে তারা আরও পাপে ডুবে যায়। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্চনাদায়ক ও অপমানজনক আযাব।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৭৬। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্তনা দিয়ে বলেন: কাফিররা জেদ ও ভ্রান্তির পথে যতই এগিয়ে যাক না কেন, এতে আপনার মন যেন দুঃখিত না হয়। তাদের এসব আচরণ আপনার কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম নয়; বরং তারাই বঞ্চিত হয় ঈমানের মাধুর্য ও আখিরাতের মহাপুরস্কার থেকে। আল্লাহ চান- যেহেতু তারা সত্যের আহ্বান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাই আখিরাতে তাদের জন্য কোনো পুরস্কার থাকবে না। আর পরিণতিতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠোর শাস্তি।
১৭৭। যারা ঈমান ছেড়ে কুফরকে বেছে নিয়েছে, তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারে না; কারণ মানুষের অবিশ্বাস আল্লাহর মহিমাকে ছুঁতে পারে না। আসলে তারা ক্ষতি করে নিজেদেরই সত্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে, অন্তরের প্রশান্তি হারিয়ে এবং আখিরাতের মুক্তি নষ্ট করে। দুনিয়ায় তারা হয়তো নিজেদের পথকে সফল ভেবে আনন্দিত থাকে, কিন্তু পরিণামে তাদের জন্য অপেক্ষা করে এমন শাস্তি, যার যন্ত্রণা কল্পনার অতীত। আল্লাহর পথ ত্যাগ করে তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে।
১৭৮। অবিশ্বাসীরা যেন কখনোই ভুল ধারণায় না পড়ে- যখন আল্লাহ তাদেরকে দীর্ঘ আয়ু দেন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস উপভোগের সুযোগ দেন এবং তাদের পাপ-অপরাধের কারণে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না, তখন যেন তারা না ভাবে যে এটি তাদের জন্য কোনো সম্মান বা কল্যাণ। বাস্তবে তা মোটেও কল্যাণ নয়, বরং আল্লাহ তাদের শাস্তি বিলম্বিত করছেন একটি গভীর উদ্দেশ্যে; যাতে এই অবকাশের সময় তারা আরও বেশি অন্যায়, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনে ডুবে যায়, ফলে তাদের অপরাধের বোঝা ভারী হয়। পরিণামে আখিরাতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এমন কঠিন শাস্তি, যা শুধু কষ্টদায়কই নয়, বরং অপমানজনক ও লাঞ্ছনাপূর্ণ হবে, যেন তাদের দুনিয়ার সমস্ত অহংকার ও উচ্ছৃঙ্খলতা ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। সুতরাং কাফিরদের জন্য দুনিয়ায় সুযোগ পাওয়া কোনো মর্যাদা নয়; বরং তা তাদের জন্য শাস্তির আগাম ভূমিকা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৭-৭৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৭-১১৮) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿نُمْلِي لَهُمْ﴾ ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দেই’, এ আয়াতাংশে আল্লাহ তায়ালার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় কাফির, অবাধ্য ও পাপাচারীদেরকে তাদের অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না। বরং তাদেরকে সময় দেন, তাদের পাপের পরিসর বাড়তে দেন, তাদের চক্রান্ত অব্যাহত রাখতে সুযোগ দেন এবং দুনিয়ার কিছু ভোগ-বিলাসও উপভোগ করতে দেন। বাহ্যত এগুলো সফলতা বা সুযোগ মনে হলেও বাস্তবে তা একটি কঠোর পরীক্ষা; কারণ এই অবকাশই তাদের ভবিষ্যতের শাস্তি আরও ভারী ও নিশ্চিত করার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। সূরাতু মারইয়ামে এ শব্দটির অর্থ আরও পরিষ্কারভাবে এসেছে:
﴿وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا﴾ [سورة مريم: ৪৬].
অর্থাৎ- “কিছু সময়ের জন্য আমাকে ছেড়ে দাও” (সূরাতু মারইয়াম: ৪৬) । এভাবে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের যে সময় বৃদ্ধি করেন, তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের চূড়ান্ত পরিণতিকে আরও ন্যায্য, সুস্পষ্ট এবং কঠিন করে তোলার জন্যই এ অবকাশ দেওয়া হয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০৩) ।
﴿اشْتَرَوُا الْكُفْرَ بِالْإِيْمانِ﴾ ‘তারা কুফরীকে ঈমানের বিনিময়ে ক্রয় করেছে’, আয়াতাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- তারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরিকে বেছে নিল। যেমন একজন ক্রেতা কোনো পণ্য কেনার সময় মূল্য দিয়ে বিনিময় করে, ঠিক তেমনভাবেই তারা সত্য ঈমানকে ত্যাগ করে তার বদলে কুফরিকে গ্রহণ করল। সুতরাং এখানে “কেনা” শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বোঝায়: সচেতনভাবে, জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তারা কুফরিকে নিজেদের জন্য লাভজনক মনে করে গ্রহণ করল; যদিও বাস্তবে এটি তাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৫) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে অন্যান্য আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের সাময়িক জয় এবং মুসলমানদের ওপর নেমে আসা বিপুল কষ্টকে পুঁজি করে মুনাফিকরা তাদের স্বভাবসিদ্ধ সুযোগসন্ধানী চরিত্র প্রকাশ করে। তারা বলতে শুরু করল: “যদি মুহাম্মাদ সত্যিকারের নবি হতেন, তাহলে তিনি পরাজিত হতেন না, আহত হতেন না; বরং তিনি শুধু রাজত্বের লোভে এগোচ্ছেন; কখনো জয় পান, আবার কখনো হারেন”। এভাবে তারা কুফরিকে সমর্থন দিল আর মুমিনদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করল, যেন তারা জিহাদ থেকে বিরত থাকে। এই অপপ্রচার ও বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা রাসূলুল্লাহর (সা.) হৃদয়ে বেদনা সৃষ্টি করল। কিন্তু তখন আল্লাহ তায়ালা সান্তনা হিসেবে এসব আয়াত নাজিল করলেন, যা রাসূলুল্লাহর মন থেকে দুঃখ ও কষ্ট দূর করে দিল, যেমন আগেও তিনি সান্তনা দিয়েছেন যখন কাফিররা ঈমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত, কুরআনের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ ছড়াত বা স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা.) মর্যাদার বিরুদ্ধে কথা বলত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূলকে আগে এভাবেও বলেছিলেন:
﴿وَلَا يَحْزُنكَ قَوْلُهُمْ إِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا﴾ [سورة يونس: ৬৫].
অর্থ- “তাদের কথায় আপনি দুঃখিত হবেন না; সমস্ত মর্যাদা তো আল্লাহর নিকটই” (সূরাতু ইউনুস: ৬৫) । আরেক জায়গায় বলেছিলেন:
﴿فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَـٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا﴾ [سورة الكهف: ৬].
অর্থ: “হয়তো আপনি দুঃখে নিজের জীবনই নষ্ট করে ফেলবেন, যদি তারা এ কুরআনে ঈমান না আনে” (সূরাতু আল-কাহ্ফ: ৬) ।
এভাবে আসমানী সান্তনা রাসূলুল্লাহকে (সা.) দৃঢ়তা ফিরিয়ে দিল, মন থেকে দুঃখ দূর করল এবং বুঝিয়ে দিল মুনাফিকদের ফোঁড়ন কিংবা কাফিরদের বিদ্বেষ আল্লাহর পরিকল্পনা ও নবীর সত্যতার ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে না। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৬)।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৬-১৭৮) আয়াতগুলো উহুদ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হয়ে মুমিনদের অন্তরে দৃঢ়তা ও প্রশান্তি সঞ্চার করে। এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা একদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামকে কাফেরদের শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র দেখে হতাশ না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যদিকে অবিশ্বাসীদের প্রকৃত অবস্থান ও পরিণতি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। এখানে ঈমান ত্যাগের ভয়াবহতা, কাফেরদেরকে আল্লাহর অবকাশের বাস্তব অর্থ এবং অহংকারীদের চ‚ড়ান্ত শাস্তির চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই আয়াতগুলো মুমিনদের জন্য একদিকে সান্তনা, অন্যদিকে গভীর সতর্কবার্তা এবং সর্বোপরি ঈমানকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার এক সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
১। ১৭৬ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা যায়:
(ক) উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের কর্মকান্ডে রাসূলুল্লাহকে মানসিক প্রশান্তি প্রদান, আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সকল মুসলিমদেরকে আশ্বস্ত করেছেন। উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের শত্রুতার কারণে যদি কেউ দুঃখিত বা হতাশ হয়, তাহলে এটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। কারণ কাফেররা আল্লাহর পরিকল্পনা বা শক্তিকে কোনোভাবেই ক্ষতি করতে পারবে না। এ সম্পর্কে অন্য আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا﴾ [سورة النساء: ৭৬].
অর্থ: “শয়তানের চক্রান্ত বড়ই দুর্বল” (সূরাতু আন-নিসা: ৭৬) । এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ولو اجتَمَعوا على أن يضرُّوكَ بشَيءٍ لم يَضرُّوكَ إلَّا بشيءٍ قد كتبَهُ اللَّهُ عليكَ” (سنن الترمذي: ২৫১৬).
অর্থ: “আর যদি তারা সবাই একত্রিত হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবুও তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, সেটুকু ছাড়া যা আল্লাহ তোমার জন্য পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন” (সুনান আল-তিরমিযী: ২৫১৬)। মুসলিমদের উচিত এই শিক্ষা গ্রহণ করা যে, জীবন বা যেকোনো প্রতিকূলতা আমাদের বিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারবে না, যদি আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি এবং ধৈর্যশীল থাকি।
(খ) পার্থিব জীবনের ক্ষণিক আনন্দ উপভোগ ছাড়া কাফেরদের জন্য আখরাতে কোনো অংশ নেই, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে অবিশ্বাসীরা আখেরাতে কোনো অংশ লাভ করতে পারবে না। তারা শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণিক আনন্দ উপভোগ করতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী সাফল্য বা শান্তি পাবে না। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ﴾ [سورة هود: ১৬].
অর্থ: “তাদের জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই” (সূরাতু হুদ: ১৬) । এটি মুসলিমদেরকে শক্তি দেয় যে, কাফেরদের কর্মকান্ডের জন্য কখনো মনোবল হারানো উচিত নয়। আখেরাতের প্রকৃত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এবং যারা অবিশ্বাসে তাড়াহুড়া করে চলে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তি নিশ্চিত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪)।
২। ১৭৭ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় প্রতিফলিত হয়:
(ক) ঈমান ত্যাগ করে কুফরের পথে ফিরে যাওয়ার ভয়াবহতা, আয়াতটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যারা একবার ঈমান আনে কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করে কুফরের পথে ফিরে যায়। তাদের আচরণকে আল্লাহ খুবই গুরুতর মনে করেন। তারা ঈমানকে ত্যাগ করে কুফরের সঙ্গে বিনিময় করে এবং সত্যপথের পরিবর্তে ভ্রান্ত পথ গ্রহণ করে। এটি শুধুই তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং আখেরাতেও তাদের জন্য কঠিন ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং ঈমানকে কখনো হালকা ভাবে নেওয়া বা তুচ্ছভাবে ত্যাগ করা ঠিক নয়।
(খ) মুরতাদরা আল্লাহকে ক্ষতি করতে পারবে না, আয়াতে বলা হয়েছে, “لَنْ يَضُرُّوا اللهَ شَيْئاً”, অর্থাৎ এই ধরনের অবিশ্বাসীরা আল্লাহকে কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের অবিশ্বাস, প্রতারণা বা বিদ্বেষ আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে। মুসলিমদের জন্য এর অর্থ হলো, আমাদের জীবনের কোনো প্রতিকূলতা বা শত্রুদের শত্রুতার কারণে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং যিনি ইচ্ছা করেন, তিনি তার সৃষ্টির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
(গ) মুরতাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা, আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, এই ধরনের মানুষদের জন্য “عَذَابٌ أَلِيمٌ”, অর্থাৎ কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্ধারিত। এখানে ‘আলিম’ বোঝায় এমন শাস্তি, যা সবচেয়ে তীব্র বেধনাদায়ক। এটি তাদের অবিশ্বাস এবং ঈমানের সঙ্গে প্রতারণার প্রতিফলন। সুতরাং ঈমান ত্যাগ করে কুফর গ্রহণ করা শুধু দুনিয়ার জীবনের জন্যই বিপদজনক নয়, বরং আখেরাতেও চরম শাস্তি নিয়ে আসে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪)। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ﴾ [سورة البقرة: ২১৭].
অর্থ: “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন থেকে ফিরে যায়, অতঃপর সে কুফর অবস্থায় মারা যায়, তাদের সব আমলই নষ্ট হয়ে যাবে” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২১৭) । আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَن بدَّلَ دينَه فاقتُلوهُ” (صحيح البخاري: ৩০১৭).
অর্থ: “যে দ¦ীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো” (সহীহ আল-বুখারী: ৩০১৭) । সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস পর্যালোচনা করে মুরতাদের জন্য তিনটি শাস্তি পাই: (ক) তাদের জন্য জাহান্নামের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে, (খ) তাদের সকল সৎআমল নষ্ট হয়ে যাবে, এবং (গ) তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।
৩। ১৭৮ নং আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে,
(ক) পার্থিব জীবনে কাফেরদের অবকাশ দেওয়া তাদের জন্য কল্যাণকর নয়, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। কাফের সহ সাধারণ মানুষের ধারণা যে, আল্লাহ তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন, জীবন দীর্ঘ করছেন এবং দ্রæত শাস্তি দিচ্ছেন না, এটা বুঝি তাদের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতের প্রথমাংশে স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি মোটেও তাদের জন্য ভালো নয়, বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণ ও ধ্বংসের কারণ। দুনিয়ায় শাস্তি বিলম্বিত হওয়া কখনোই আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়।
(খ) কাফেরদেরকে দুনিয়াতে অবকাশের প্রকৃত উদ্দেশ্য- তাদের গুনাহ বৃদ্ধি করা, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ বলেন: “আমি তাদেরকে সময় দেই এজন্য নয় যে তারা ভালো হয়ে যাবে, বরং এজন্য যে তারা আরও বেশি গুনাহে লিপ্ত হবে”। যত দিন তাদের জীবন দীর্ঘ হচ্ছে, তত দিন তারা নতুন নতুন পাপ অর্জন করছে। ফলে তাদের অপরাধের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। এই অবকাশ শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংসকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
(গ) কাফেরদের দীর্ঘ জীবন ও বড় শাস্তির সম্পর্ক, এই আয়াতের শেষাংশ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা জানা যায়- যত বেশি সময় তারা কুফর ও অবাধ্যতায় কাটায়, তত বড় হয় তাদের শাস্তির কারণ। জীবনের প্রতিটি দিন যদি গুনাহে ভরে যায়, তাহলে সেই দীর্ঘ জীবন তাদের জন্য রহমত নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। শেষপর্যন্ত তারা এমন ধ্বংসে নিপতিত হবে, যার তুলনা নেই। এই শাস্তি শুধু কষ্টদায়কই নয়, বরং চরম লাঞ্ছনাকর। কারণ দুনিয়ায় তারা অহংকার করত, নিজেদের বড় মনে করত, মানুষকে তুচ্ছ করত এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করত। তাই আল্লাহর ন্যায়বিচারের দাবি অনুযায়ী তাদের শাস্তিও হবে এমন, যা তাদের অহংকার চূর্ণ করবে এবং তাদেরকে অপমানিত করবে।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) শত্রুর বিরোধিতা, কষ্ট, ষড়যন্ত্র বা সাময়িক ক্ষতি দেখে হতাশ না হওয়া; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং ধৈর্য অবলম্বন করা।
(খ) ঈমানকে আগলে রাখা, সন্দেহ, চাপ বা লোভের কারণে ঈমান ত্যাগ না করা এবং দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা।
(গ) দুনিয়ায় সময় পাওয়া, জীবন দীর্ঘ হওয়া বা শাস্তি বিলম্বিত হওয়াকে নিরাপত্তা মনে না করে, তার মাধ্যমে তাওবা, সংশোধন ও নেক আমলে ফিরে আসা।

 

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭২-১৭৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: বিপদের পরেও অটুট ঈমান, অদম্য সাহস এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭২-১৭৫) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ (172) الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (173) فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ (174) إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (175)﴾ [سورة آل عمران: 172-175].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: বিপদের পরেও অটুট ঈমান, অদম্য সাহস এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৭২। যারা উহুদে আঘাতের পরও আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার, বিশেষ করে যারা তাদের মধ্যে সৎকর্ম করেছে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে।
১৭৩। যাদেরকে লোকেরা বলেছিল: “নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে লোকেরা জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তাদেরকে ভয় করো”, তাতে তাদের ঈমান দুর্বল হয়নি; বরং তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলল: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই উত্তম হেফাজতকারী”।
১৭৪। অতঃপর তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছে। তাদের কোনো ক্ষতি স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
১৭৫। এটি শয়তানের কৌশল যে সে তার বন্ধুদেরকে ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; বরং আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়ে থাকো।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
এ আলোচনার ধারাবাহিকতা এখনো উহুদ যুদ্ধ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে চলছে। নিচের চারটি আয়াতই সেই মুমিনদের সম্পর্কে, যারা শনিবার উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল এবং রবিবার আবু সুফিয়ানকে অনুসরণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)।
১৭২। যারা উহুদ যুদ্ধে আহত ও ক্লান্ত অবস্থাতেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে মুশরিকদের পিছু ধরে ‘হামরাউল আসাদ’-এর দিকে রওনা হয়েছিল, তারা নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রয়াস ব্যয় করেছিল এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশনা পূর্ণভাবে মেনে চলেছিল। তাদের মধ্যে যারা উত্তম আমল করেছে ও আল্লাহকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহামূল্যবান প্রতিদান।
১৭৩। তাদের মধ্যেই সেই মানুষরা রয়েছে যারা শত্রুদের ভয় দেখানোর চেষ্টা সত্তে¡ও দমে যায়নি। আব্দুল কায়েস গোত্রের কিছু লোক এসে বলেছিল, “আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা তোমাদের বিরুদ্ধে আবার সম্পূর্ণ পস্তুত; তাই তাদের ভয় করো, কারণ তোমাদের শক্তি তাদের মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত নয়”। কিন্তু এই ভীতি তাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করল এবং তারা আল্লাহর প্রতিশ্রæতিতে আরও বিশ্বাসী হলো। এতে তারা মোটেও নিরুৎসাহিত হয়নি; বরং অটল সংকল্প নিয়ে আল্লাহ যেদিকে ইচ্ছা করেছেন, সেদিকেই অগ্রসর হয়ে বলেছিল: “আমাদের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট, আর তিনি-ই সেরা অভিভাবক ও রক্ষাকারী”।
১৭৪। তারা ‘হামরাউল আসাদ’ থেকে আল্লাহ প্রদত্ত বিশাল প্রতিদান ও উচ্চ মর্যাদার নিয়ামত নিয়ে নিরাপদে মদিনায় ফিরে এলো; কারণ আবু সুফিয়ান তার দলবল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা তাদের ঈমান ও দৃঢ়তাকে আরও গভীর করল, আল্লাহর শত্রুদের দুর্বল করল এবং কোনো ক্ষতি বা আঘাত ছাড়াই তারা শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে এল। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য বজায় রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করল। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, দয়াশীল ও তাঁর উদারতার এই অনুগ্রহ সকলের জন্য বিস্তৃত।
১৭৫। আল্লাহ তাআলা বিশ্বাসীদের সচেতন করছেন যে, আব্দুল কায়েস গেত্রের যে সকল লোক তোমাদের শত্রুদের দ্বারা ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল, যাতে তোমরা তাদের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাক, তারা কেবল শয়তানের সহযোগী, যারা নিজের অনুসারীদের দুর্বল করার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকারের ঈমানদাররা তাদের মতো নয়। তাই মুমিনরা শত্রুর ভয় দেখানো নিয়ে চিন্তা না করে কেবল আল্লাহকে ভয় করবে, যদি তারা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে ঈমানের দায়িত্ব পালন করে থাকে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১১-৪১২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৭-১৬৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭২-৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৭) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ﴾ ‘তাদেরকে যখম স্পর্শ করার পর’, আয়াতাংশে যখম দ্বারা উহুদ যুদ্ধে প্রাপ্ত আঘাতকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩০) ।
﴿الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ﴾ ‘মানুষরা যাদেরকে বলেছিল: মানুষরা তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে”, আয়াতাংশে প্রথম ‘মানুষর’ দ্বারা আব্দে কায়েস গোত্রের লোকজনকে বোঝানো হয়েছে, যারা আবু সুফিয়ান থেকে টাকা খেয়ে তার পক্ষ হয়ে মুসলমানদেরকে ভয় দেখিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ‘মানুষরা’ দ্বারা আবু সুফিয়ান ও তার দলবলকে বোঝানো হয়েছে, যারা উহুদ যুদ্ধের পরে মক্কায় ফেরার পথে মুসলমানদের সমূলে শেষ করে দেওয়ার জন্য পূণরায় জড়ো হতে চেয়েছিল। কিন্তু অবশেষে তারা ভয়ে পালিয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১১) ।
﴿فَانْقَلَبُوا﴾ ‘অতঃপর তারা ফিরে এসেছে’, অর্থাৎ- মুসলমানরা ‘হামরাউল আসাদ’ থেকে ‘মদীনায়’ ফিরে এসেছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১০) ।
﴿بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ﴾ ‘আল্লাহর নেয়ামত এবং অনুগ্রহ’, এখানে ‘নেয়ামত’ বলতে বোঝানো হয়েছে- উহুদ যুদ্ধের পর আহত ও ক্লান্ত থাকা সত্তে¡ও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশে সাড়া দিয়ে ‘হামরাউল আসাদ’ এর দিকে যাত্রা করা সাহাবিদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। সেই অনুগ্রহ ছিল- তাদের নিরাপদ রাখা, তাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করা, এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি তাদের আনুগত্য অটুট রাখা। অর্থাৎ, তারা দুনিয়াবি কষ্টের মাঝেও ঈমান, সাহস ও আনুগত্যের ওপর স্থির থাকতে সক্ষম হয়েছে, এটাই তাদের জন্য ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। আর ‘ফজল’ বা অনুগ্রহ বলতে বোঝানো হয়েছে সেই অভিযানে বের হওয়ার ফলে তারা পথে যে বাণিজ্যিক লাভ বা সম্পদের উপকার পেয়েছিল, সেটিও ছিল আল্লাহর অতিরিক্ত অনুগ্রহ। অর্থাৎ, শুধু আধ্যাত্মিক পুরস্কারই নয়, অর্জিত হয়েছে দুনিয়াবি কল্যাণও। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩১) ।
﴿الشَّيْطَانُ﴾ ‘শয়তান’, এখানে ‘শয়তান’ বলতে শয়তানে জিন নয়, বরং শয়তান স্বভাবের মানুষ, বিশেষভাবে নাঈম ইবন মাসউদ, যে চতুরতার সাথে মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে তাদের মনোবল ভাঙতে চেয়েছিল। সে মুশরিকদের পক্ষে কাজ করে মুসলমানদের মনে ভয় সঞ্চার করছিল, যাতে তারা মনে করে যে, শত্রুরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের মোকাবিলা করা অসম্ভব। আল্লাহ তা’আলা এ আয়াতে মুমিনদেরকে আশ্বস্ত করেছেন- মুশরিকদের পক্ষে যারা ভয় দেখায় তারা শুধু শয়তানের সহযোগী; তাদের ভয় মানুষের মন দুর্বল করার কৌশল মাত্র। মুমিনদের উচিত নয় তাদের ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া, বরং আল্লাহকেই ভয় করা উচিত, যদি তারা সত্যিই ঈমানদার হয়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩১) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো আগের প্রসঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদ ও গাজীদের মর্যাদা, তাদের আখেরাতের জীবন্ত অবস্থা এবং মহান পুরস্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আর বর্তমান আয়াতগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে সেই সাহাবা সম্পর্কে, যারা উহুদের কঠিন বিপর্যয়, আঘাত ও আহত অবস্থার মধ্য দিয়েও রাসূলুল্লাহর (সা.) আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছিল। তারা ঈমানকে অটুট রেখে, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে এবং অদম্য সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের সাথে ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে তাদের উচ্চ মর্যাদা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং তাদের জন্য নির্ধারিত মহান প্রতিদানের কথা তুলে ধরেছেন।

আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
প্রথম ঘটনা- হামরাউল আসাদ অভিযানের ইতিহাস:
উহুদ যুদ্ধ থেকে আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা যখন ফিরে গেল এবং ‘রওহা’ নামক স্থানে (যা মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি অবস্থিত) পৌঁছাল, তখন তারা অনুতপ্ত হলো এবং ভাবতে লাগল- আমরা কেন মুমিনদের পুরোপুরি শেষ করে আসলাম না? তাই তারা আবার মদিনার দিকে ফিরে এসে অবশিষ্ট মুসলমানদের ধ্বংস করার ইচ্ছা করল। এই খবর রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে পৌঁছালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শত্রুদের মনে ভয় সৃষ্টি করবেন এবং তাঁর ও সাহাবিদের শক্তি তাদের সামনে প্রদর্শন করবেন। তাই তিনি সাহাবিদেরকে আহ্বান করলেন এবং বললেন: গতকাল যারা উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল, শুধু তারাই আমার সাথে বের হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে বের হলেন এবং ‘হামরাউল আসাদ’-এর কাছে পৌঁছালেন, যা মদিনা থেকে আট মাইল দূরে অবস্থিত। সেই সময় সাহাবিদের দেহে ছিল যুদ্ধের ক্ষত ও ব্যথা; তবুও তারা নিজেদের ওপর জোর করে দাঁড়ালেন, যাতে সওয়াব ও পুরস্কার লাভে পিছিয়ে না পড়েন।
অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদের অন্তরে ভয় ঢেলে দিলেন। তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গ্রæতগতিতে মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। এই ঘটনার পর উক্ত আয়াত নাজিল হয়। এ অভিযানের নামই হলো ‘গযওয়াতু হামরাউল আসাদ’, যা উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী ও সংশ্লিষ্ট একটি অভিযান হিসেবে গণ্য করা হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬২-১৬৩) ।

দ্বিতীয় ঘটনা- ছোট বদর অভিযানের ইতিহাস:
আবু সুফিয়ান উহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে যাওয়ার সময় বলেছিল: হে মুহাম্মদ! চাইলে আমাদের সাক্ষাতের স্থান হোক আগামী বছরের বদরের মেলা। রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: এটা আমাদের ও তোমাদের মাঝে নির্ধারিত রইল, ইনশাআল্লাহ। পরের বছর নির্ধারিত সময় এলে আবু সুফিয়ান মক্কার লোকদের নিয়ে রওনা হলো এবং ‘মাররে জাহরান’ এর পাশের ‘মজন্নাহ’ এলাকায় পৌঁছল। কিন্তু আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। ফলে তার মনে যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ার চিন্তা উদয় হলো।
এ সময় সে ‘উমরা’ করতে আসা ‘নুয়াইম ইবন মাসউদ’-এর সঙ্গে দেখা করল। আবু সুফিয়ান তাকে বলল: আমি মুহাম্মদ ও তার সাহাবিদের সাথে বদরের মৌসুমে সাক্ষাতের প্রতিশ্রæতি দিয়েছি। কিন্তু এ বছর খুবই খরা, গাছ-গাছালির কোনো খাবার নেই, দুগ্ধও কম। এই অবস্থায় যুদ্ধ করা আমাদের জন্য উপযোগী নয়। আমার ইচ্ছা হয়েছে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু আমি চাই না যে মুহাম্মদ বের হয়ে আসুক আর আমি না যাই, এতে তাদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। তুমি শহরে গিয়ে তাদের মন ভেঙে দাও। এটা করতে পারলে আমি তোমাকে দশ উট দেব, যা ‘সুহাইল ইবন আমর’-এর কাছে জমা থাকবে।
নুয়াইম মদিনায় গিয়ে দেখল মুসলিমরা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন সে তাদের বলল: এটা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। তারা গত বছর তোমাদের ঘরের কাছে এসে তোমাদের ক্ষতি করতে পারেনি, আর এখন তোমরা নিজে থেকেই তাদের দিকে যাচ্ছো? তারা মেলায় তোমাদের বিরুদ্ধে বিপুল বাহিনী জড়ো করেছে। আল্লাহর কসম! কেউই তাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। তার কথায় কিছু মুসলিমের মনে ভীতি সৃষ্টি হলো। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “যার হাতে আমার প্রাণ, আমি অবশ্যই বের হব, একা হলেও”।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সত্তর জন সাহাবিকে নিয়ে ‘বদর সুগরা’ (বদরুল মাওয়ািদ)-এর জন্য রওনা হলেন। তাঁরা সেখানে আটদিন অবস্থান করলেন এবং আবু সুফিয়ানের অপেক্ষা করলেন। কিন্তু কেউই আসেনি, কারণ আবু সুফিয়ান তার দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কায় ফিরে গিয়েছিল। মক্কার লোকেরা তাদেরকে উপহাস করে বলত: “তোমরা তো শুধু সাওইক (পোড়া গমের খাবার) খেতে বের হয়েছিলে”। তাই তারা পরিচিত হলো “জাইশুস-সাওইক” বা ‘সাওইক বাহিনী’ নামে। অন্যদিকে মুসলিমরা বদরের বাজারে পৌঁছে ব্যবসা-বাণিজ্য করলেন, চামড়া ও কিশমিশ বেচাকেনা করলেন এবং এক দিরহামে দুই দিরহাম লাভও করলেন। পরে তারা নিরাপদে ও সম্পূর্ণ সুস্থভাবে মদিনায় ফিরে এলেন, লাভবান ও সম্মানিত অবস্থায়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৩-১৬৪) ।

১৭২ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু জারির আত-তাবারী (র.) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন: উহুদ যুদ্ধের দিনে যা ঘটেছিল তার পর আল্লাহ তাআলা আবু সুফিয়ানের হৃদয়ে ভয় নিক্ষেপ করেন। ফলে সে মক্কার দিকে ফিরে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আবু সুফিয়ান তোমাদের কিছুটা ক্ষতি করেছে, কিন্তু সে ফিরে গেছে, আর আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন”। উহুদের যুদ্ধ হয়েছিল শাওয়াল মাসে। আর ব্যবসায়ীরা সাধারণত জিলক্বদ মাসে মদিনায় আসত এবং ‘বদর সুগরা’ বা ‘ছোট বদর’ নামক স্থানে অবস্থান করত। উহুদের ঘটনার পর যখন তারা মদিনায় আসে, তখন মুসলমানরা আঘাতপ্রাপ্ত ও ক্লান্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকজনকে আহ্বান করলেন তার সঙ্গে বের হওয়ার জন্য। এ সময় কিছু মানুষরুপী শয়তান তার সহযোগীদের ভয় দেখাতে লাগল এবং বলল: “মানুষ তোমাদের বিরুদ্ধে বড় বাহিনী জড়ো করেছে”। এতে অনেকেই রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে যেতে দ্বিধা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আমি অবশ্যই রওনা হব, কেউ না গেলেও আমি একাই যাব”।
অবশেষে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, যুবাইর, সাদ, তলহা, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, হুযাইফাহ ইবন ইয়ামান এবং আবু উবাইদাহ (রাঃ) সহ প্রায় সত্তরজন সাহাবি তাঁর সঙ্গে বের হলেন। তারা আবু সুফিয়ানের পিছু নিলেন এবং সফরা নামক জায়গা পর্যন্ত পৌঁছালেন। তখন আল্লাহ ১৭২ নং আয়াত নাযিল করেন।
তাবারানী একটি সহীহ সনদে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন- উহুদ থেকে ফিরে মুশরিকরা একে অপরকে বলল: “তোমরা না মুহাম্মদকে হত্যা করতে পেরেছ, না তার সঙ্গীদের নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছ। তোমরা খুবই খারাপ কাজ করেছ! চল ফিরে গিয়ে তাদেরকে শেষ করে আসি!”। এ কথা রাসূলুল্লাহর (সা.) কানে পৌঁছলে তিনি মুসলমানদের আহ্বান করলেন। সাহাবিরা প্রস্তুত হলেন এবং ‘হামরাউল আসাদ’ বা ‘আবি উতবা’ কূপ পর্যন্ত গেলেন। তখনই ১৭২ নং আয়াত নাযিল হয়েছে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৪) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৭২ নং আয়াত থেকে বুঝা যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপুরস্কার প্রাপ্তির জন্য বান্দাকে তিনটি শর্ত পূর্ণ করতে হবে:
(ক) বিপদ ও যন্ত্রণার মধ্যেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশকে মান্য করে তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া, যেমন উহুদ যুদ্ধে সাহাবারা আহত, গুরুতর জখমপ্রাপ্ত, ক্লান্ত ও ব্যথায় জর্জরিত হওয়ার পরেও রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করেননি। উহুদ যুদ্ধের পরপরই যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) শত্রুদের ধাওয়া করার জন্য ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানের ডাক দেন, তখন তারা নিজেদের কষ্ট, রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে আবার জিহাদের জন্য বের হয়েছিলেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭১) ।
(খ) ত্যাগের পরে সৎআমলের উপর অটুট থাকা, কারণ আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে: “যারা আন্তরিকতার সাথে ভালোকাজ করেছে”।
(গ) ত্যাগের পরে তাক্বওয়া ভিত্তিক জীবন গঠনে সচেতন থাকা, কারণ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: “এবং যারা আল্লাহভীতি অবলম্বন করেছে”।
আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে মহাপুরস্কারের জন্য প্রথম শর্তটিই যথেষ্ঠ নয়, বরং তার সাথে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শর্ত থাকা অপরিহার্য।
২। ১৭৩ নং আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে,
(ক) প্রকৃত মুমিন কখনো কাপুরুষ হয় না, কারণ কাপুরুষতা ঈমানের সঙ্গে একসাথে থাকতে পারে না। এর মূল কারণ হলো- মৃত্যুর ভয় ও দুনিয়ার জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। আর এগুলো একজন সত্যিকারের মুমিনের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাহাবায়ে কেরাম এই বিশ্বাসের বাস্তব উদাহরণ ছিলেন। তারা কষ্ট, বিপদ ও শত্রুর ভয়কে উপেক্ষা করে আল্লাহর পথে অগ্রসর হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ তায়ালা কোরআনে তাদের প্রশংসা করেছেন।
(খ) বিপদের মুখে প্রকৃত মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি পায়, এজন্য আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে: ‘এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়’। এ সম্পর্কে সূরাতু আল-আহযাবের একটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزابَ قالُوا: هذا ما وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَما زادَهُمْ إِلَّا إِيماناً وَتَسْلِيماً﴾ [سورة الأحزاب: ২২].
অর্থ: “মুমিনরা যখন সম্মিলিত শত্রুবাহিনী (আহযাব) দেখল, তখন তারা বলল: ‘এটাই তো সেই বিষয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদেরকে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সত্য বলেছেন’। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্য আরও বেড়ে গেল” (সূরাতু আল-আহযাব: ২২) ।
(খ) বিপদকালে পড়ার জন্য মুমিনকে একটি দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, দোয়াটি হলো-
“حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ”.
অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতইনা উত্তম কর্মবিধায়ক”, যা আয়াতের শেষাংশে উল্লেখিত হয়েছে।
হযরত ইবরাহীমকে (আ.) যখন আগুনে নিক্ষেপ করার প্রস্তুতি চ‚ড়ান্ত করা হলো, তখন তিনি জানতেন যে মানবিক দিক থেকে আর কোনো পথ খোলা নেই। চারপাশে মানুষ, কাঠের বিশাল স্তুপ ও জ্বলন্ত আগুন- সবকিছুই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি কারো কাছে সাহায্য চাননি; বরং সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে সমর্পণ করেন। এবং তাঁর মুখে যে শেষ দোয়াটি উচ্চারিত হয়েছিল-“হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। সহীহ আল-বুখারীর একটি হাদীসে এসেছে:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: “كَانَ آخِرَ قَوْلِ إِبْرَاهِيمَ حِينَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ: حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الوَكِيلُ” (صحح البخاري: ৪৫৬৪).
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: ইব্রাহীম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মুহুর্তে সর্বশেষ কথা ছিল: “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। (সহীহ আল-বুখারী: ৪৫৬৪) ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কঠিন সময় পাড় করতেন, তখন এ দোয়াটি পাঠ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে:
أن النبي -صلعم- كان إذا اشتد غمّه، مسح بيده على رأسه ولحيته، ثم تنفس الصّعداء، وقال: حسبي الله ونعم الوكيل”.
অর্থ: “যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) দুশ্চিন্ত খুব বেড়ে যেত, তখন তিনি নিজের মাথা ও দাড়িতে হাত বুলাতেন, তারপর গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেন এবং বলতেন: ‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক”। (আল-দুররু আল-মানছুর, সুয়ূতী: ২/৩৯০) ।
সাহাবায়ে কেরামকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিপদের সময়ে এ দোয়াটি পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إذا وقعتم فى الأمر العظيم فقولوا: حسبنا الله ونعم الوكيل” (تفسير ابن كثير).
অর্থ: যখন তোমরা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হবে, তখন পড়বে- “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল” (ইবনু কাছীর) ।
শেষের দুইটি হাদীস নিয়ে কথা থাকলেও, বিপদে উক্ত দোয়া পড়া কোরআন দ্বারা সাব্যস্ত হওয়ার কারণে হাদীস যয়ীফ হওয়ার প্রভাব এর আমলে পড়বে না।
(গ) ঈমানদারের ঈমান বাড়ে এবং কমে, আল্লাহ তায়ালার বাণী- “মানুষের কথাবার্তা ও হুমকি তাদের ঈমানকে কমায়নি; বরং তা তাদের ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে”। অর্থাৎ- তা তাদের দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি করেছে, হৃদয়ে আরও দৃঢ় ইয়াকিন সৃষ্টি করেছে, এবং তাদের মধ্যে সাহস, শক্তি ও আত্মবিশ্বাস এবং প্রস্তুতি গড়ে তুলেছে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, নেক আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়।
আলেমগণ ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস বিষয়ে বলেন: ঈমানের মূল ভিত্তি ও প্রকৃত সত্তা, অর্থাৎ অন্তরের বিশ্বাস (তাসদীক) যখন একবার স্থির হয়ে যায়, তখন তার মাঝে মূলত বৃদ্ধি বা ঘাটতি আসে না; আর যখন তা চলে যায়, তখন ঈমানের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তবে বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটে ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে, মূল সত্তার মধ্যে নয়।
তবে অধিকাংশ আলেমের মত হলো: ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায় মানুষের আমলের দিক থেকে, অর্থাৎ ঈমান থেকে যে কাজগুলো জন্ম নেয়, সেসব কাজের মাধ্যমে ঈমান শক্তিশালী বা দুর্বল হয়। এর দলীল হিসেবে সুনানে তিরমিযীর হাদিসে এসেছে:
“الإيمان بضع وسبعون بابا، فأعلاها قول: لا إله إلا الله، وأدناها إماطة الأذى عن الطريق، والحياء شعبة من الإيمان” (سنن الترمذي).
অর্থ: “ঈমানের অনেকগুলো শাখা আছে, সবচেয়ে উঁচু হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলা, আর সবচেয়ে নিচের স্তর হলো- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, এবং লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা”। এই বর্ণনায় ঈমানের “শাখা” থাকার কথাই প্রমাণ করে যে ঈমানের মধ্যে বৃদ্ধি ও স্তরভেদ রয়েছে। এছাড়াও সূরাতু আল-আনফাল এর দ্বিতীয় আয়াতে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: প্রকৃত ঈমানদার কোরআন তেলাওয়াত করলে বা শুনলে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।
৩। ১৭৪ নং আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়- সাহাবাগণ যখন নিজেদের সব বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন এবং সম্পূর্ণ অন্তর দিয়ে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করলেন, তখন আল্লাহ তাদের বিশেষ অনুগ্রহে ভূষিত করেন। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে চার ধরনের প্রতিদান দিলেন:
(ক) নেয়ামত, অর্থাৎ মানসিক শান্তি, অন্তরের প্রশান্তি, সাহস এবং ঈমানের দৃঢ়তা। তারা ভয় বা আতঙ্ক নিয়ে ফিরে আসেনি, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের মানসিক শক্তি লাভ করেছিল।
(খ) ফযল বা অনুগ্রহ, নেয়ামতের চেয়েও বেশি কল্যাণ ও অতিরিক্ত অনুগ্রহ। অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে শুধু নিরাপদই রাখেননি, বরং মর্যাদা ও সওয়াবের দিক থেকেও অনেক উঁচু স্তর দান করেছেন এবং অর্থনীতিতে সাবলম্ভী দান করেছেন।
(গ) সকল অকল্যাণ থেকে হেফাজত, আল্লাহ তাদেরকে শত্রুদের ষড়যন্ত্র, হামলা ও ক্ষতি থেকেও নিরাপদ রেখেছেন। তারা বড় বিপদের আশঙ্কা নিয়ে বের হয়েছিল, কিন্তু কোনো ক্ষতি ছাড়াই ফিরে এসেছিল।
(ঘ) আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালনা, আল্লাহ তাদের অন্তরকে এমন পথে পরিচালিত করলেন, যা তাঁর সন্তুষ্টির কারণ হয়। এর ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর তাকদীর ও ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭২) ।
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি বিপদের সময় নিজের শক্তির ওপর নয়, বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে, তখন আল্লাহ শুধু তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন না; বরং তার অন্তরে শান্তি দেন, মর্যাদা বাড়ান এবং নিজের সন্তুষ্টি দান করেন।
৪। ১৭৫ নং আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইসলাম বিরোধী কুচক্রী মহলকে শয়তান আখ্যা দেওয়া হয়েছে, আয়াতের প্রথমাংশে এসেছে যে, আব্দুল কায়েস গেত্রের কিছু লোক মুশরিকদের থেকে ঘুষের বিনিময়ে মুসলমানদেরকে তাদের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করেছিল, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শয়তান আখ্যা দিয়েছেন। সূরাতু আন-নাস এবং সূরাতু আল-মুজাদালাহ এর ১৯ নং আয়াতেও ইসলাম বিদ্বেষী কুচক্রী মহলকে শয়তান বলা হয়েছে।
(খ) একজন মুমিনের অন্তরে ভয়ের কেন্দ্র হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, একজন মুমিনের অন্তরে ভয়ের মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, কারণ তিনিই সর্বক্ষমতাবান এবং সব কিছুর পরিণতির মালিক। বাহ্যিক শক্তি, শত্রু বা কঠিন পরিস্থিতির ভয় যদি মানুষের অন্তরে এমনভাবে স্থান করে নেয় যে তা তাকে সত্যের পথে অটল থাকতে বাধা দেয়, তবে তা প্রকৃত তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী হয়ে যায়। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি দুনিয়ার ভয়কে নিজের ঈমানের ওপর প্রভাব ফেলতে দেয় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখে এবং তাঁর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রেখে সাহস ও ধৈর্যের সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে।
(গ) শয়তান ঈমানদারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, সে তাদের সহযোগীদের- বিশেষ করে মুনাফিকদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়, যাতে তারা দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় হতে না পারে।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) কষ্ট, ভয় বা ক্ষতির পরও আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মানতে প্রস্তুত থাকা এবং কঠিন অবস্থাতেও দ্বীনের পথ থেকে পিছিয়ে না আসা।
(খ) সমস্যা ও বিপদের সময় বারবার অন্তর থেকে নি¤েœর দোয়া পাঠ করা:
“حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ”.
অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতইনা উত্তম কর্মবিধায়ক”।
(গ) মানুষের ভয় বা হুমকিকে ঈমান দুর্বল হওয়ার কারণ না বানিয়ে, বরং এটাকে আল্লাহর দিকে আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
(ঘ) মানুষ বা শত্রুর ভয় নয়, বরং আল্লাহকে ভয় করাকে জীবনের মূলনীতি বানানো।
(ঙ) গুজব, আতঙ্ক, হুমকি ও মিথ্যা খবর দ্বারা যেন মনোবল ভেঙে না পড়ে, বরং এসবকে শয়তানের কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে দৃঢ় থাকা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৯-১৭১) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: আল্লাহর পথে শহীদদের পুরস্কার।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৯-১৭১) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ (169) فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (170) يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ (171)﴾ [سورة آل عمران: 169-171].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: আল্লাহর পথে শহীদদের পুরস্কার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬৯। তুমি কখনো ভাবিও না যে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া মানুষরা মৃত; বরং তারা জীবিত, তাদের রবের নিকটে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় আছে, এবং আল্লাহ তাদেরকে নিয়মিত রিজিক দান করছেন।
১৭০। তারা আনন্দিত, আল্লাহ তাদের যে নিয়ামত ও অনুগ্রহ দিয়েছেন, তাতে পরিপূর্ণ খুশি, এবং যারা এখনও দুনিয়ায় আছে তাদের জন্যও তারা উৎফুল্ল; কারণ তাদেও কোনো ভয় নেই, এবং তারা কখনো দুঃখিত হবে না।
১৭১। তারা খুশি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত ও করুণায়, এবং তারা দৃঢ়ভাবে জানে- আল্লাহ কখনো মুমিনের আমল বা প্রতিদান নষ্ট করেন না।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৬৯। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সম্বোধন করে বলেছেন: তিনি যেন আল্লাহর পথে প্রাণ উৎসর্গকারীদেরকে মৃত্যু মনে না করেন। বরং তারা আল্লাহর কাছে এক বিশেষ জীবনে জীবিত থাকে, যা দুনিয়ার সাধারণ জীবন নয়, বরং বারযাখের সম্মানিত জীবন। যার জন্য তারা সংগ্রাম করেছেন, যে মহান রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা জীবন দিয়েছেন, সেই রবের সান্নিধ্যে তারা আনন্দে বসবাস করছেন। আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের রিজিক দান করেন; তারা সেখানে পরম শান্তি, নিরাপত্তা ও এক বিশেষ সুখ-সম্মান উপভোগ করেন। তারা সেখানে সবুজ পাখি হয়ে সর্বত্র উড়ে বেড়াচ্ছে এবং জান্নাতের চির সুখ উপভোগ করছে। দুনিয়ার চোখে তারা মৃত মনে হলেও, বাস্তবে তারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত সম্মানিত জীবন্ত আত্মা, যারা জান্নাতের আনন্দ ও পুরস্কার উপভোগ করছেন।
১৭০। আল্লাহ তায়ালা শহীদদের প্রতি যখন নিজের বিশাল দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেন, তারা তখন পরিপূর্ণ আনন্দে ভরে ওঠে। জান্নাতের নানান নেয়ামত, শান্তি ও সন্তুষ্টি তাদের চোখে সুখের দীপ্তি জ্বালিয়ে দেয়। তারা তাদের মুসলিম ভাইদের জন্যও খুশি হয়, যারা এখনও দুনিয়ায় আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছে। কারণ তারা জানে, যদি তারা আল্লাহর পথে আন্তরিকভাবে লড়াই করে শহীদ হয়, তবে সেই সম্মান, শান্তি ও আনন্দ তাদেরও নসীব হবে, যেমনটি তারা পেয়েছে। শহীদরা নিশ্চিত থাকে যে, আখিরাতে তাদের কোনো ভয় নেই এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখ যা তারা পিছনে ফেলে এসেছে, তাতেও তারা দুঃখ পাবে না। এভাবে আল্লাহর পথে আত্মত্যাগ করা শহীদদের জন্য রয়েছে চিরন্তন সম্মান, আনন্দ ও অনন্য নিরাপত্তা, যা কেবল আল্লাহর নিকটেই উপলব্ধ।
১৭১। তারা জান্নাতে পরিপূর্ণ আনন্দে ও প্রশান্তিতে ভরে থাকে। এই আনন্দ আসে আল্লাহ প্রদত্ত নানান নেয়ামত ও বিশাল দয়া-অনুগ্রহ থেকে। তারা জানে তাদের ত্যাগ, তাদের কষ্ট, এবং আল্লাহর পথে করা প্রতিটি কার্য কখনো বৃথা যাবে না। আল্লাহ এই আধ্যাত্মিক সার্থকতা বৃদ্ধি করেন, এবং তাঁর অনুগ্রহ ও বরকতের মাধ্যমে তা আরও সমৃদ্ধ করেন। তাই শহীদরা চিরন্তন আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করে, কারণ তারা নিশ্চিত যে, যারা আল্লাহর পথে প্রাণ দিয়েছে, তাদের পুরস্কার চিরকাল ধরে আল্লাহর নিকটে অটুট এবং অনন্ত। এটি শুধু তাদের জন্যই নয়, এটি অন্যান্য মুমিনদেরও উদ্দীপনা দেয়, যাতে তারা জানে, সত্যিকারের ত্যাগ ও ভক্তি কখনো বৃথা যায় না; বরং আল্লাহ তা গুণিত করে তাদের নিকটে ফেরান। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৯; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭২; আল-মুনতাখাব: ১/১১৬) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَحْيَاءٌ﴾ ‘জীবিত’, এ জীবিত থাকার অর্থ দুনিয়ার সাধারণ জীবন নয়; বরং শহীদরা তাদের রবের কাছে এমন এক সম্মানিত জীবন লাভ করে যেখানে তারা জান্নাতের নেয়ামত অনুভব করে, স্বাদ গ্রহণ করে, শান্তি উপভোগ করে। তারা সেখানে খাদ্য-পানীয়ের বরকতময় রিজিক পায়, জান্নাতের সুখ-শান্তিতে পরিপূর্ণ থাকে, আর দুনিয়ার প্রাণহীন মৃতদের মতো নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই তারা জীবনের স্বাদ ও সুখ উপভোগ করছে। এই “জীবন” তাদের সম্মান, মর্যাদা ও আল্লাহর নৈকট্যের ফল, যা শুধু শহীদদের জন্যই বিশেষভাবে সংরক্ষিত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৮) ।
﴿وَيَسْتَبْشِرُونَ﴾ ‘এবং তারা উৎফুল্ল হয়’, الاستبشار বলতে সেই বিশেষ আনন্দ ও হৃদয়-উল্লাসকে বোঝায়, যা একজন মুমিনের অন্তরে জন্মায় যখন সে ঈমানের সঠিক পথে অবিচল থাকে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদের ময়দানে নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা প্রদান করে। এ আনন্দ নিছক দুনিয়াবি সুখ নয়; বরং তা হলো এক গভীর, নিরাপদ, ঈমান-সঞ্জাত প্রশান্তি, যা মানুষকে বুঝিয়ে দেয় যে সে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য পথে অগ্রসর হচ্ছে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৭০) ।
﴿أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ ‘তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং নেই কোন পেরেশানি’, আয়াতাংশে কাদেরকে বলা হয়েছে তাদের কোনো ভয় এবং পেরেশানি নেই? বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ থেকে আয়াতাংশের দুইটি উদ্দেশ্য পাওয়া যায়:
(ক) যে সকল যোদ্ধারা এখনো শহীদদের সাথে মিলিত হয়নি, দুনিয়াতে রয়ে গেছে গাজি বেশে ঈমানের পথে, তাদের জন্যও আখেরাতে ভয় এবং পেরেশানি মুক্ত জীবনের সুসংবাদ অপেক্ষা করছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ১৬০) ।
(খ) যারা শহীদ হয়েছে, তাদের জন্য আখেরাতে কোন ভয় নেই এবং তারা দুনিয়ায় যা কিছু পেছনে রেখে এসেছে, তার জন্য তাদের কোনো দুঃখও নেই; কেননা জান্নাতের মহিমান্বিত সম্মান, অনুপম কৃপা এবং আল্লাহর নৈকট্য তাদের হৃদয়কে এমনভাবে পরিপূর্ণ করে দেয় যে দুনিয়ার সব অনুশোচনা সেখানে ¤øান হয়ে যায়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৯) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো আগের প্রসঙ্গের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পূর্বের আয়াতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন- মুনাফিকরা কীভাবে জিহাদে আগ্রহীদের নিরুৎসাহিত করত এবং বলত: “তারা যদি মদিনায় বসে থাকত, তবে নিহত হতো না”। এরপর আল্লাহ তাদের এই কথার জবাব দেন যে মৃত্যু আল্লাহর সিদ্ধান্তে ও নির্ধারিত সময়ে ঘটে, পালিয়ে কেউ রক্ষা পেতে পারে না। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ শহীদদের মহিমান্বিত মর্যাদা তুলে ধরেছেন, যাতে মুনাফিকদের কথায় কেউ দুর্বল হয়ে না পড়ে, এবং যাতে মুমিনরা আরও দৃঢ়ভাবে আল্লাহর পথে জিহাদে অগ্রসর হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৪) ।

১৬৯ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: উহুদ যুদ্ধে যখন আপনার ভাইরা শহীদ হয়, আল্লাহ তাদের আত্মাকে জান্নাতের সবুজ পাখির ভিতরে রাখেন। সেখানে তারা জান্নাতের নদীগুলোতে ঘুরে, ফলের স্বাদ গ্রহণ করে এবং আরশের ছায়ায় অবস্থিত স্বর্ণের দীপে বিশ্রাম নেয়। তাদের খাদ্য, পানীয় ও বিশ্রাম এতই আনন্দদায়ক যে তারা বলে: হায়! আমাদের ভাইরা যদি জানতেন আল্লাহ আমাদের জন্য কী প্রস্তুত করেছেন, তারা কখনো জিহাদ থেকে বিরত হতেন না। জবাবে আল্লাহ বলেন: “আমি তাদেরকে খবর দেব”। আর এজন্যই তিনি ১৬৯ নং আয়াত নাজিল করেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৯-১৭১) আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা শহীদদের এমন সব সম্মান ও পুরস্কারের কথা জানিয়েছেন, যা মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। দুনিয়াবাসীর চোখে তারা মৃত বলে মনে হলেও, আল্লাহর নিকট তারা জীবন্ত-সম্মানিত, প্রশান্ত এবং অপরূপ নিয়ামতে সিক্ত। এ আয়াতগুলো শুধু শহীদদের মর্যাদাই প্রকাশ করে না, বরং মুমিনদের হৃদয়ে সাহস, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির নতুন আলো জ্বালিয়ে দেয়; জানিয়ে দেয়- আল্লাহর পথে যেকোনো ত্যাগ কখনোই ব্যর্থ হয় না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ শহীদদের যেসব বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, সেগুলো নিচে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলো-
(ক) প্রকৃতপক্ষে শহীদেরা মৃত নন, বরং জীবিত, শহীদদের সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেন যে তারা মোটেও মৃত নন, এটি শুধু বিশ্বাসের কথা নয়, বরং এক চিরন্তন বাস্তবতা। মানুষ মনে করে তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু আল্লাহর নিকট তাদের জীবন আরও সজীব, আরও পরিপূর্ণ। তারা দুঃখ-কষ্ট, ভয়-আতঙ্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এমন এক জগতে অবস্থান করেন, যেখানে মৃত্যুর সীমাবদ্ধতা নেই, দেহের ক্লান্তি নেই, আর নেই পৃথিবীর অস্থিরতা। শহীদের এই উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করে- আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করা আসলে চিরজীবন লাভের সর্বোচ্চ উপায়। এ সম্পর্কে কোরআনের একটি আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ﴾ [سورة البقرة: ১৫৪].
অর্থ: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের মৃত বলো না; তারা তো জীবিত, তবে তোমরা উপলব্ধি কর না” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ১৫৪) ।
(খ) আল্লাহ তায়ালা শহীদদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে রিজিক দান করেন, আল্লাহ তায়ালা শহীদদের শুধু জীবনই দান করেন না, বরং তাঁর জান্নাতি অনুগ্রহ থেকে তাদের বিশেষ রিজিকও প্রদান করেন। এই রিজিক কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়; এটি সম্মান, আদর এবং আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তির প্রতীক- এক এমন খাবার, যা তাদের অন্তরকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে, এমন পানীয় যা তাদের আত্মাকে সজীব করে তোলে। জান্নাতের খাবার-পানীয় এর গুণ বর্ণনায় অসংখ্য আয়াত রয়েছে, এ সম্পর্কে আলোচনা যথাস্থানে করা হবে, ইনশাআল্লাহ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শহীদের পুরস্কার কেবল ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত প্রতিশ্রæতি নয়, বরং মৃত্যুর মুহূর্তের পর থেকেই শুরু হওয়া আল্লাহর সরাসরি দয়া।
(গ) শহীদরা জান্নাতে আনন্দে উচ্ছাসিত হয় এবং গাজীদের জন্য সুখবর দেয়, শহীদরা জান্নাতে অবস্থান করে তাদের পরবর্তী মুমিন ভাইদের কথা স্মরণ করে। তারা দেখেন- যারা গাজী হয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করছে এবং যারা এখনও পৃথিবীতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, যদি আল্লাহর পথে অটল থাকে, তবে তাদের জন্যও একই মর্যাদা অপেক্ষা করছে। এই উপলব্ধি শহীদদের হৃদয় আনন্দে ভরে দেয়; তারা যেন আপনজনের জন্য বার্তা পাঠিয়ে বলেন: “আমাদের পথ ধরলে তোমারও কোনো ভয় থাকবে না, কোনো দুঃখ থাকবে না”। এটি মুমিন সমাজের জন্য অপার প্রেরণা, যা তাদেরকে সাহস ও দৃঢ়তা দেয়।
(ঘ) শহীদগণ এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদের কোন ভয় নেই, শহীদগণ জান্নাতে পরম সুখে থাকেন এবং তারা আনন্দিত হন এ জেনে যে আল্লাহ তাঁর পথে দৃঢ় থাকা বান্দাদের জন্য ভয়মুক্তির প্রতিশ্রতি দিয়েছেন। দুনিয়ার পরীক্ষায় যারা ভীত হয় না, আল্লাহ তাদের বদলে এমন প্রশান্তি দান করেন যা সব ভয়কে নিভিয়ে দেয়। এ যেন শহীদদের পক্ষ থেকে জীবিতদের জন্য এক অমূল্য বার্তা- “আল্লাহর প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকো, তোমার জীবনে অস্থিরতার কোনো স্থান থাকবে না”।
(ঙ) তাদের কোনো দুঃখ নেই, দুনিয়ায় রেখে আসা সব বোঝা আল্লাহ লাঘব করেছেন, শহীদরা জান্নাতে গিয়ে উপলব্ধি করেন- দুনিয়ার সব দুঃচিন্তা, পরিবার-পরিজনের চিন্তা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সবই তাদের কাছ থেকে দূর হয়ে গেছে। আল্লাহর অতিথি হিসেবে তারা এমন মর্যাদা পান যে পেছনে রেখে আসা কোনো বিষয় তাদের মনে সামান্যতম দুঃখও সৃষ্টি করে না। তাদের অন্তর পূর্ণ হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহে। তাই শহীদের জন্য মৃত্যু কোনো ক্ষতি নয়; বরং দুনিয়ার শৃঙ্খল ভেঙে চ‚ড়ান্ত মুক্তির দ্বার উন্মোচন।
(চ) শহীদরা আল্লাহর অনন্য নিয়ামতের সুখ অনুভব করেন, শহীদরা জান্নাতে গিয়ে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও অতুলনীয় নিয়ামত অনুভব করেন- এক এমন সুখ যা দুনিয়ার কোনো ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আল্লাহর নৈকট্য, তাঁর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দয়ার ছায়া তাদের হৃদয়ে এমন আনন্দ এনে দেয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই নিয়ামত শুধু বাহ্যিক ভোগ নয়, বরং অন্তরের প্রশান্তি, আত্মার উচ্ছ¡াস এবং রূহানিয়াতের পরিপূর্ণ তৃপ্তি। আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহ শহীদদের মর্যাদাকে আকাশচুম্বী করে তোলে।
(ছ) আল্লাহ তাদের প্রতি বিশেষ ফজল এবং অতিরিক্ত সম্মান ও মর্যাদা দান করেন, শহীদরা জান্নাতে শুধু পুরস্কারই পান না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘ফজল’ বা বাড়তি সম্মান, বিশেষ মর্যাদা, অতিরিক্ত অনুগ্রহ পান। এটি এমন এক সম্মান, যা কোনো আমল বা পরিশ্রমের বিনিময় নয়; এটি খাঁটি আল্লাহর প্রেম ও দয়ায় প্রদত্ত। এ ফজলের মাধ্যমেই শহীদদের জান্নাতে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হয়, যেখানে তারা আল্লাহর বিশেষ প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান। তাদের মাথার উপর দয়া ও সম্মানের বরকত ধারা নেমে আসে।
২। সবশেষে ১৭১ নং আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট না করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ ঘোষণা করেন- তিনি কখনো ঈমানদারদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। শহীদরা আনন্দিত হন এ সত্য শুনে- আল্লাহ কোনও ঈমানদারের ত্যাগকে অবহেলা করেন না, কোনো নেক কাজে প্রতিদান কমিয়ে দেন না। একটি ভালো পদক্ষেপ, একটি আন্তরিক নিয়ত, একটি চোখের অশ্রæ- সবই আল্লাহর কাছে অমূল্য। শহীদরা উপলব্ধি করেন, তারা যে পথে প্রাণ বিলিয়েছেন, তা কখনোই বৃথা যায়নি। আল্লাহ তাদের প্রতিটি ত্যাগের বিনিময়ে পুরস্কার দিয়েছেন। এ ঘোষণা তাদের অন্তরকে আরও উৎফুল্ল করে এবং পৃথিবীতে থাকা মুমিনদের জন্য শক্তিশালী প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহর পথে দৃঢ় থেকে নির্ভিকভাবে জিহাদে অংশ নেওয়া।
(খ) জান্নাত অর্জনের জন্য ত্যাগ ও পরিশ্রমকে জীবনের মুল্যবান সোপান হিসেবে গ্রহণ করা।
(গ) মৃত্যু বা বিপদকে ভয় না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে মূল লক্ষ্য বানানো।
(ঘ) আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা চাওয়া; কারণ সব কৃতকর্মের পরিপূর্ণ প্রতিদান শুধ্ ুতাঁই হাতে।
(ঙ) সকলকে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করা।
(চ) বিপদ, পরীক্ষা বা সংগ্রামের সময়ে ধৈর্য, স্থিরতা ও দৃঢ়তা বজায় রেখে আল্লাহর প্রতিশ্রæত পুরস্কারকে দৃঢ় বিশ্বাসে গ্রহণ করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৫-১৬৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধ: মুমিনদের ভুল পদক্ষেপ এবং মুনাফিকদের কুটচাল।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৫-১৬৮) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (165) وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ (166) وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَاتَّبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ (167) الَّذِينَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا قُلْ فَادْرَءُوا عَنْ أَنْفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (168)﴾ [سورة آل عمران: 165-168].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধ: মুমিনদের ভুল পদক্ষেপ এবং মুনাফিকদের কুটচাল।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬৫। উহুদে যখন তোমরা বিপদের সম্মুখীন হলে, যদিও বদরের দিনে তোমরাই তাদের ওপর দ্বিগুণ আঘাত হেনেছিলে; তখন তোমরা প্রশ্ন করলে, “এ বিপদ এলো কোথা থেকে?” বলুন: এটা তোমাদের নিজেদেরই ভুলের কারণে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
১৬৬। দুই দল মুখোমুখি হওয়ার সেই দিনে যে বিপদ তোমাদের ওপর নেমে এসেছিল, তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই হয়েছিল, যাতে তিনি স্পষ্ট করে প্রকাশ করেন প্রকৃত মুমিনদের।
১৬৭। এবং যাতে তিনি প্রকাশ করেন মুনাফিকদেরও। আর যখন তাদেরকে বলা হয়েছিল, “এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা অন্তত প্রতিরোধে অংশ নাও,” তারা বলেছিল: “যদি আমরা জানতাম সত্যিই যুদ্ধ হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম”। সেই দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরীরই বেশি নিকটে ছিল। তারা মুখে এমন অনেক কথা বলত যা তাদের অন্তরে ছিল না, আর তারা যা গোপন করে আল্লাহ তা ভালোভাবেই জানেন।
১৬৮। যারা ঘরে বসে থেকে তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলত, “যদি তারা আমাদের কথা মেনে চলত, তাহলে নিহত হতো না”, হে নবী, আপনি বলে দিন: তোমরা সত্যবাদী হলে নিজেদেও থেকে মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে দাও তো!।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৬৫। উহুদের ঘটনার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তারা মুশরিকদের দ্বিগুণ ক্ষতি করেছিলে, কিন্তু উহুদের যুদ্ধে যখন নিজেরা বিপর্যয়ের মুখে পড়লো, তখন অবাক হয়ে বলতে লাগলো: “এটা কীভাবে হলো? আমরা তো মুসলমান, আমাদের মাঝে রাসুলুল্লাহ (সা.) আছেন, আর ওরা মুশরিক!”। তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, এ বিপদ তাদের নিজেদের কারণেই এসেছে; কারণ তাদের একাংশ রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় থেকে নেমে গনীমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহর সিদ্ধান্ত সর্বদা তাঁর প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তিনি যা চান তাই করেন, তাঁর ফয়সালাকে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।
১৬৬। উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ওপর যে কষ্ট নেমে এসেছিল, যেমন আহত হওয়া, শহীদ হওয়া বা যুদ্ধের পরিস্থিতি হঠাৎ বদলানো- সবই আল্লাহর নিয়তি অনুযায়ী ঘটেছিল। শুরুতে মুমিনরা শত্রুকে পরাজিত করলেও পরে কিছু ভুল ও অবাধ্যতার কারণে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এ ঘটনা আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ, যা প্রকৃত ঈমানদারকে প্রকাশ করেছিল। বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ দেখালেন কে সত্যিকারের ঈমানদার আর কে কেবল মুখে দাবি করে।
১৬৭। এ পরীক্ষার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল- মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের অন্তরের গোপন বিষয়গুলো খুলে দিলেন। যখন মুমিনরা তাদের বলেছিল: “এসো, আমাদের সঙ্গে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। না পারলে অন্ত আমাদের সংখ্যায় শক্তি যোগাও, পাশে দাঁড়িয়ে মনোবল বাড়াও”। তখন তারা হটকারিতা বশত বলেছিল: “আমরা যদি জানতাম যে তোমরা সত্যিই যুদ্ধ করবে, তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু আমরা জানতাম তোমরা যুদ্ধ করবে না!”। এই কথা প্রমাণ করে সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরের বেশি নিকটবর্তী ছিল; কারণ তারা মুখে যা বলছিল, হৃদয়ে তা ছিল না। তারা শুধু কথা দিয়ে নিজেকে মুসলমান দেখাচ্ছিল, অন্তরে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তো খুব ভালোভাবেই জানেন- তাদের বুকে কী গোপন আছে, কী তারা লুকিয়ে রাখে।
১৬৮। ঐ সকল মুনাফিক যুদ্ধের সময় ঘরে বসে ছিল, তারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত বা শহীদ মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে লাগলো- “যদি তারা আমাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যেত, তবে কখনো মারা পড়ত না”। তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিলেন: “যদি তার সত্যি কথা বলে থাকে যে যুদ্ধ এড়িয়ে চললে মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়, তাহলে তারা নিজেদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেখাক!”। অর্থাৎ, যুদ্ধ হোক বা অন্য সময়, কেউই নিজের সিদ্ধান্ত বা সতর্কতার মাধ্যমে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ীই আসে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৭-৪০৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৪-১৫৬; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১-৭২; আল-মুনতাখাব: ১/১১৫-১১৬) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مُصِيبَةٌ﴾ ‘বিপদ’, এখানে ‘বিপদ’ বা ‘মুসিবত’ দ্বারা উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ওপর যে কষ্ট ও হতাশা নেমে এসেছিল, তা বুঝানো হয়েছে। সেদিন মুশরিকরা মুমিনদের ওপর চড়াও হয় এবং সত্তর জন সাহাবি শহীদ হন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৫) ।
﴿مِثْلَيْهَا﴾ ‘তার দ্বিগুণ’, আয়াতে ‘তার দ্বিগুণ’ বা مثليها বলতে বোঝানো হয়েছে যে বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সত্তর জন নিহত ও সত্তর জন বন্দী হয়েছিল, যা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষতির তুলনায় দ্বিগুণ ছিল। অর্থাৎ- উভয় ঘটনার তুলনায় কষ্ট ও ক্ষতির হিসাব আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়েছে, যাতে ইতিহাসে সত্যিকারের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৫) ।
﴿هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ﴾ ‘উহুদের বিপদ তোমাদের নিজেদের কারণে হয়েছিল’ এটা মুসলিম যোদ্ধাদের অমান্য ও পাপের হল। বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধে কিছু তিরন্দাজ বাহিনী রাসুলুল্লাহর (সা.) আদেশ অমান্য করে যুদ্ধস্থান ত্যাগ করে গনীমত সংগ্রহের জন্য ছুটে গিয়েছিল। ফলে, মুশরিকরা সুযোগ পেয়ে মুসলমানদের উপর পুণরায় আক্রমণ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০২) । এখানে আমরা দেখতে পাই- মানুষের নিজস্ব কর্ম ও অনুশাসনের ফলেই বিপদ আসে। বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই ভয়ঙ্কও হোক, মূল কারণ হলো মানুষের নিজের ভুল সিদ্ধান্ত ও অনুশাসন ভঙ্গ করা। এটি আমাদেও শেখায়- জীবনে অসুবিধা বা বিপদ প্রায়ই বাহ্যিক শক্তি নয়, বরং মানুষের নিজের চেতনা, পদক্ষেপ এবং নৈতিক দায়িত্বহীনতার ফল। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
﴿فَادْرَءُوا﴾ ‘তাহলে তোমরা ঠেকিয়ে দেখাও’, , অর্থাৎ, যদি তোমাদের দাবিই সত্য হয়, তবে মৃত্যুকে প্রতিহত করো। আরবিতে বলা হয়: “”دَرَأَ الله عنك الشَّرَّ, অর্থ: আল্লাহ তোমার থেকে অনিষ্ট দূর করুন বা ঠেকিয়ে দিন। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০৩) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে মুনাফিকরা রাসুলুল্লাহর (সা.) গনীমত আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহকে (সা.) সম্পূর্ণভাবে সেই অভিযোগ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতগুলোতে যুদ্ধের আগে ও পরে মুসলিম যোদ্ধাদের বাস্তবতা-বিরোধী ধারণা, ভুল মন্তব্য, ভুল কাজগুলো এবং মুনাফেকদের অপপ্রচারগুলোকে শিক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৪) ।

১৬৫ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আবি হাতিম, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বদরের যুদ্ধে যেসব কাজ তারা করেছিল, বিশেষ করে যুদ্ধবন্দীদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়ার কারণে উহুদের দিনে তাদেরকে সেই কাজের ফল ভোগ করতে হলো। ফলে উহুদের যুদ্ধে তাদের সত্তরজন শহীদ হন, মুসলিম যোদ্ধারা কিছুক্ষণের জন্য পিছু হটে যান, রাসূলুল্লাহর (সা.) সামনের দাঁত ভেঙে যায়, তাঁর হেলমেট মাথায় চূর্ণ হয়ে যায় এবং রক্ত তার মুখ বেয়ে পড়ে। এসবের পর আল্লাহ তায়ালা ১৬৫ নং আয়াত অবতীর্ণ করে জানিয়ে দিলেন যে এ বিপর্জয় তাদের ভুলের কারণেই হয়েছে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৩) ।
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন: এর অর্থ হলো- মুক্তিপণ গ্রহণের কারণেই এই শাস্তি এসেছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ইমাম ওয়হাবা জুহাইলী তার তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৬৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন:
(ক) বদর ও উহুদের ফলাফলের তুলনা, আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে: বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা বিশাল বিজয় পেয়েছিল। তারা মুশরিকদের ৭০ জনকে হত্যা করে এবং ৭০ জনকে বন্দী করে, যা মূলত উহুদের তুলনায় দ্বিগুণ সাফল্য। এমনকি উহুদের যুদ্ধের শুরুতেও মুসলমানরা এগিয়ে ছিল এবং দুই দিনে প্রায় ২০ জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু শেষে উহুদে তারা পরাজিত হয় এবং ৭০ জন সাহাবি শহীদ হন। দুটি যুদ্ধের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সুতরাং বদরে মুসলমানদের মধ্যে সম্পূর্ণ আনুগত্য ও ঐক্য ছিল। উহুদে সেই স্থিরতা ছিল না। তাই দুই যুদ্ধের ফল ভিন্ন হয়েছে।
(খ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে ভুল ধারণা, আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে: উহুদের পর মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে বলেছিল: “আমরা তো আল্লাহর পথে লড়েছি! আমরা মুসলমান, আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা) আছেন, আর শত্রুরা তো মুশরিক। তাহলে কীভাবে আমরা পরাজিত হলাম?”। এই ধারণাটি ভুল ছিল। কারণ বাহ্যিক পরিচয় বা উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়- আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও নির্দেশ মানা হল প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। সুতরাং শুধু “আমরা সঠিক পথে আছি” বলা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মানার উপর শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করে।
(গ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ ছিল নিজেদের ভুল, আয়াতের তৃতীয়াংশে বলা হয়েছে: পরাজয়ের মূল কারণ ছিল তাদের নিজেদের ভুল, বিশেষ করে উহুদের তীরন্দাজদের একটি দল রাসুলুল্লাহর (সা.) সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করেছিল। ফলে শত্রুরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সুযোগ পায় এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। সুতরাং আনুগত্য ছাড়া বিজয় নেই। যারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মেনে যুদ্ধ করে, আল্লাহ তাদের বিজয় দেন; কারণ তারা হলো “আল্লাহর দল”, আর আল্লাহর দল কখনো পরাজিত হয় না।
২। ১৬৬, ১৬৭ ও ১৬৮ নং আয়াতসমূহ থেকে নি¤েœর দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) উহুদের মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে আল্লাহর প্রজ্ঞা, উহুদের কষ্ট, আঘাত এবং সাময়িক পরাজয় ছিল আল্লাহর জ্ঞান-প্রজ্ঞা, পরিকল্পনা ও ফয়সালার অংশ, আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এ ঘটনার পেছনে আল্লাহ তায়ালার কয়েকটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল:
প্রথমত: ভুল ও অবাধ্যতার পরিণতি দেখিয়ে মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রগঠন করা।
দ্বিতীয়ত: দায়িত্বে অবহেলা বা নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা।
তৃতীয়ত: প্রকৃত মুমিনদেরকে সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
চত‚র্থত: মুনাফিকদেরকে প্রকৃত অবস্থা সকলের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া।
ফলে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের এই সাময়িক পরাজয় শুধুমাত্র ক্ষতি নয়; বরং শিক্ষা, পরিশুদ্ধি এবং পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অমূল্য উপকার বহন করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৫)।
(খ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে মুনাফেকদের হটকারিতা, ১৬৭ ও ১৬৮ নং আয়াতে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে মুনাফেকের দুইটি হটকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
প্রথমত: যখন মুমিনরা তাদের বলেছিল: “এসো, আমাদের সঙ্গে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। না পারলে অন্তত আমাদের সংখ্যায় শক্তি যোগাও, পাশে দাঁড়িয়ে মনোবল বাড়াও”। তখন তারা হটকারিতা ও তামাশা বশত বলেছিল: “আমরা যদি জানতাম যে তোমরা সত্যিই যুদ্ধ করবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু আমরা জানতাম তোমরা যুদ্ধ করবে না!”। এই কথা প্রমাণ করে সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরের বেশি নিকটবর্তী ছিল।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এ হটকারিতার জবাবে বলেন: তারা মুখে যা বলে অন্তরে তার তিল মাত্র নেই। তারা অন্তরের কপটতাকে আড়াল করতে চাইছে, অথচ আমি আল্লাহ তাদের অন্তরের গোপন ভেদ সম্পর্কে বেশী জানি। (তাফসীর আল-মারাগী: ১২৭) ।
দ্বিতীয়ত: তারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত বা শহীদ মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে লাগলো- “যদি তারা আমাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যেত, তবে কখনো মারা পড়ত না”।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এ হটকারিতার জবাব রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন: যদি তারা সত্যি কথা বলে থাকে যে যুদ্ধ এড়িয়ে চললে মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়, তাহলে তারা নিজেদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেখাক!। মূলকথা হলো- যুদ্ধ হোক বা অন্য সময়, কেউই নিজের সিদ্ধান্ত বা সতর্কতার মাধ্যমে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ীই আসে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৮)।
(গ) মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ, আর নিয়তির ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বোধের পথ, ১৬৮ নং আয়াতের শেষাংশটি মানুষের সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর নিয়তির অমোঘতার গভীর দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরেছে। এটি জানিয়ে দিয়েছে যে মানব-ইচ্ছা, কৌশল বা নিরাপত্তা, কোনো কিছুই মৃত্যুর মতো নিশ্চিত বাস্তবতাকে প্রতিহত করতে পারে না। মৃত্যু এমন একটি অস্তিত্বগত সত্য, যা মানুষের সকল পরিকল্পনা অতিক্রম করে; দর্শনের ভাষায় এটি মানবজীবনের অনিবার্য বীরংঃবহঃরধষ ৎবধষরঃু। মুনাফিকদের দাবি ছিল- “যুদ্ধে না গেলে মৃত্যু হতো না”, কোরআন সেই যুক্তিকে দার্শনিকভাবে ভেঙে দিয়েছে ৎবফঁপঃরড় ধফ ধনংঁৎফঁস পদ্ধতিতে: যদি ঘরে থাকা সত্যিই মৃত্যু ঠেকাতে পারত, তবে তোমরাই মৃত্যুকে ঠেকিয়ে দেখাও! এতে প্রমাণ হয়- জীবন-মৃত্যু বাহ্যিক অবস্থানে নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে নির্ভরশীল। এই আয়াত আমাদের শেখায়: মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ, আর নিয়তির ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বোধের পথ। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে বুঝা যায় উহুদের যুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ স্পষ্টভাবে দুইটি সত্য উন্মোচন করেছে:
(ক) তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে, মুনাফিকরা আগে মুসলমানদের ভিড়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখত। অনেকেই ভাবত তারা সত্যিই মুসলমান। কিন্তু উহুদের মুহূর্তে, যখন মুসলমানদের সাহায্য করা জরুরি ছিল, তখন তারা পিছিয়ে গেল, অজুহাত দাঁড় করাল, ভয় দেখাল, মনোবল ভাঙল। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে গেল- তাদের অন্তর ঈমানের দিকে নয়; বরং কুফরের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। অর্থাৎ, তারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও তাদের মন-মানসিকতা, সিদ্ধান্ত, আচরণ সবকিছুই প্রমাণ করে যে তারা ঈমান থেকে অনেক দূরে। এ সম্পর্কে ১৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ﴾ [سورة آل عمران: ১৬৭].
অর্থ: “তারা সেদিন তাদের ঈমানের চেয়ে কুফরীর বেশী কাছাকাছি ছিল” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৬৭) ।
(খ) তাদের চরিত্র ও মিথ্যাচারিতা উন্মোচিত হয়েছে, তারা মুখে বলত: “আমরা মুসলমান, তোমাদের সঙ্গে আছি”, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অবিশ্বাস ও কুফর। উহুদের মাঠে তারা একথা বলেও ফেলে, যা ১৬৮ নং আয়াতে এসেছে এভাবে: “তাদের ভাইরা যদি ঘরে বসে থাকত, তবে মারা যেত না”। এ বক্তব্যই দেখিয়ে দেয়: তারা শহীদদেরকে “ভাই” বললেও তা ছিল শুধু বংশগত বা প্রতিবেশী সম্পর্ক, ধর্মীয় নয়। তারা আল্লাহর কদর, মৃত্যুর নির্ধারিত সময়, এসব কোনো কিছুকেই মানত না। তারা মনে করত যুদ্ধের ফলাফল শুধু বাহ্যিক কারণে ঘটে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের কোনো ভূমিকা নেই। এভাবে তাদের কথায় তিনটি বড় দুর্বলতা ধরা পড়ে: এক. ঈমানের অভাব, দুই: তাকদীরের প্রতি অবিশ্বাস, এবং তিন: মিথ্যাচারে নির্লজ্জতা। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৮) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) দৈনন্দিন জীবনে যে কোনো সমস্যায় আত্মসমালোচনা করা এবং নিজের কর্ম সংশোধনের চেষ্টা করা।
(খ) সংকট ও কষ্টের সময় সালাত ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভরসা করা।
(গ) ইসলামি নেতৃত্ব, শিক্ষক, অভিভাবকদের আনুগত্য করা।
(ঘ) দ্বিমুখিতা, ভয়ভীতি ছড়ানো, নেতিবাচক প্রচরণা পরিহার করে সত্যবাদী ও সাহসী হওয়া।
(ঙ) জীবনের বিপদাপদে আল্লাহর ফয়সালা উত্তম, এ বিশ্বাস দৃঢ় করা এবং অভিযোগ না করা।
(চ) দ্বীনের পথে প্রয়োজনীয় ত্যাগ, সময়, শ্রম, দান, সাহস নিবেদন করা।
(ছ) কাউকে হতাশ করা, ভয় দেখানো, নেতিবাচক প্রচার, এসব থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬১-১৬৪) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: গনীমত বন্টনে রাসূলুল্লাহর (সা.) ন্যায়পরায়ণতা ও উম্মাহ সংস্কারের দায়িত্ব।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ (161) أَفَمَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَ اللَّهِ كَمَنْ بَاءَ بِسَخَطٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (162) هُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ (163) لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (164)﴾ [سورة آل عمران: 161-164].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: গনীমত বন্টনে রাসূলুল্লাহর (সা.) ন্যায়পরায়ণতা ও উম্মাহ সংস্কারের দায়িত্ব।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬১। কোনো নবীর পক্ষে গনীমত আত্মসাৎ করা কখনোই শোভন নয়। আর যে এটি করবে, সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে ঠিক সেই আত্মসাৎকৃত বস্তু নিয়ে। অতঃপর প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী পুরোপুরি প্রতিফল দেওয়া হবে, এবং তাদের প্রতি সামান্যও যুলম করা হবে না।
১৬২। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অনুসরণ কওে, সে কি তার সমান হতে পারে যে আল্লাহর গজবের পাত্র হয়ে ফিরে আসে? আর যার আশ্রয় জাহান্নাম, সেটি তো কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!
১৬৩। তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদার বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করবে, এবং আল্লাহ তাদের প্রতিটি কাজই পরিপূর্ণভাবে দেখেন।
১৬৪। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি মহান অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন; যিনি তাদের কাছে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে আত্মশুদ্ধি করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাহ; অথচ এর পূর্বে তারা ছিল একেবারে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
কোনো নবী-রাসূলের পক্ষে তার উম্মাহর সঙ্গে সামান্যতম বিশ্বাসঘাতকতা করা কখনোই সম্ভব নয়; কারণ তিনি আল্লাহর নিযুক্ত প্রতিনিধি, আমানতের সর্বোচ্চ বাহক। গনীমতের মাল তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তিনি শুধু সেটুকুই গ্রহণ করেন, এর বাইরে কিছু নেওয়া তাঁর মহিমান্বিত চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ যে ব্যক্তি গোপনে এ ধরনের আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের বিশাল ময়দানে সে নিজেই সেই চুরি করা সম্পদ কাঁধে নিয়ে উপস্থিত হবে, মানুষের সামনে তার লজ্জা, অপরাধ ও অপমান যেন প্রকাশ্য সাক্ষ্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই দিন আর কোনো অজুহাত কাজ দেবে না; প্রত্যেকে তার কর্মের পূর্ণ প্রতিফল পাবে, সততার বিনিময়ে সম্মান ও পুরস্কার, আর বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে নিন্দা ও শাস্তি। আর আল্লাহ কারো উপর বিন্দুমাত্রও অবিচার করবেন না।
আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণকারী ব্যক্তির মর্যাদা সেই ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে না, যে পাপাচারে নিমগ্ন থেকে প্রভুর অসন্তোষ ডাকতে থাকে, এটি কোরআনের মূল্যবোধভিত্তিক নৈতিক বিচারধারার একটি মৌলিক নীতি। কারণ প্রথমজনের জীবন পরিচালিত হয় ইখলাস, তাকওয়া, আনুগত্য ও আখিরাতমুখী উদ্দেশ্যের দ্বারা, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য, সাফল্য ও পরকালীন মর্যাদার উপযুক্ত করে তোলে। বিপরীতে, যে ব্যক্তি গুনাহ ও অবাধ্যতার পথে অটল থাকে, সে কেবল নৈতিক ও আত্মিক পতনেই নিমজ্জিত হয় না, বরং পরিণামে জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে, যা কোরআনের দৃষ্টিতে চ‚ড়ান্ত শাস্তি ও নিকৃষ্টতম পরিণতি। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টিমুখী ও আল্লাহ-অসন্তুষ্টিমুখী জীবনধারার তুলনা কেবল আচরণভিত্তিক নয়; বরং উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ, নৈতিক দর্শন এবং চূড়ান্ত পরিণামের একটি সামগ্রিক দ্বৈততা নির্দেশ করে।
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য করে তাঁর বিধান অনুসরণ করে, তারা সকলেই জান্নাতের অধিবাসী হলেও তাদের মর্যাদা ও অবস্থান সমান নয়; কারণ তাদের ইখলাস, ত্যাগ, আনুগত্য ও আমলের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। অনুরূপভাবে, যারা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে অবাধ্যতার পথে অগ্রসর হয়, তারাও জাহান্নামের অধিবাসী হলেও তাদের শাস্তির স্তর ও তীব্রতা একরূপ নয়; কারো পাপ ব্যক্তিগত সীমায় আবদ্ধ, আবার কারো পাপ মানবসমাজে বিস্তৃত ফেতনা ও অন্যায়ের রূপে ছড়িয়ে পড়ে। তাই জান্নাতের সমৃদ্ধ স্তরসমূহ যেমন পুরস্কারের বৈচিত্র্য নির্দেশ করে, জাহান্নামের গভীর স্তরসমূহ তেমনি শাস্তির ন্যায্যতা ও অপরাধের আনুপাতিকতা প্রমাণ করে। অতএব, আল্লাহর রিজামুখী ও অসন্তুষ্টিমুখী দুই পথ কখনো সমপর্যায়ভুক্ত হতে পারে না; উদ্দেশ্য, কর্ম, নৈতিকতা ও চূড়ান্ত পরিণতি- প্রতিটি মাত্রাতেই তারা বিপরীত। আর আল্লাহ তাঁদের প্রতিটি কাজ গভীরভাবে দেখে থাকেন; দৃশ্যমান কিংবা অন্তরনিহিত কোনো আমলই তাঁর জ্ঞান থেকে আড়াল থাকে না, ফলে তাঁর বিচার সর্বদা পরিপূর্ণ ন্যায় ও প্রজ্ঞার উপর প্রতিষ্ঠিত।
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রতি এক অনুপম অনুগ্রহ করেছেন; তিনি তাদের মধ্য থেকেই এমন এক রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি বংশপরিচয়, ভাষা ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় তাদের অন্তর্ভূক্ত; ফলে তাঁর দাওয়াত ছিল সাধারণ নয়, বরং হৃদয়গম্য ও বাস্তবতা সংশ্লিষ্ট। তিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে সত্যের পরিচয় তুলে ধরেন, শিরক, জাহেলিয়াত ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকার থেকে তাদের অন্তরকে পবিত্র করেন, এবং তাদের কোরআনের মর্মবাণী ও সুন্নাহর পদ্ধতিগত জ্ঞান শিক্ষা দেন; এভাবে তিনি শুধু ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করেননি, বরং জ্ঞানের কাঠামো, নৈতিক চরিত্র ও সভ্যতাগত চেতনা গঠনের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ উম্মাহ নির্মাণ করেছেন। অথচ এই বার্তার পূর্বে তারাই ছিল বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও সামাজিক পশ্চাদপদতার গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত; যেখানে ধর্মবোধ বিবর্জিত, নৈতিক আদর্শ অস্পষ্ট ও মানবিক মূল্যবোধ প্রায় অনুপস্থিত ছিল। সুতরাং নবুওয়াতের এই দান কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৪২-১৪৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১; আল-মুনতাখাব: ১/১১৫) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَنْ يَغُلَّ﴾ ‘আত্মসাৎ করা’, আয়াতাংশটি আরবী শব্দ, যা ‘আল-গুলুল’ থেকে উৎকলিত হয়েছে। এর অর্থ হলো- গনীমত থেকে আত্মসাৎ করা মাল। এ সম্পর্কে একটি হাদীসে এসেছে:
لا تُقْبَلُ صَلاةٌ بغيرِ طُهُورٍ ولا صَدَقَةٌ مِن غُلُولٍ.
অর্থ: “পবিত্রতা ছাড়া সালাত কবুল করা হয় না এবং গনীমত থেকে আত্মসাৎ করা সম্পদের সদাকা কবুল করা হয় না” (সহীহ মুসলিম: ২২৪) । অনুরুপভাবে আয়াতে বলা হয়েছে: কোনো নবীর পক্ষে গনীমতের মাল আত্মসাৎ করা শোভন নয়। আর যে ব্যক্তি খিয়ানত করবে, কিয়ামতের দিন সে যা আত্মসাৎ করেছিল তা-ই বহন করে নিয়ে আসবে। এ কথার অর্থ হলো রাসুলুল্লাহর (সা.) উক্তি: যে ব্যক্তি ভেড়া, গরু, কাপড় বা অন্য যে কোনো কিছু গোপনে আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সে সেটাই নিজের কাঁধে বহন করে হাজির হবে। (গরীবুল কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১০২) ।
﴿رِضْوَانَ اللهِ﴾ ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি’, আয়াতে ‘মুসাব্বাব’ বা অর্জিত বিষয় উল্লেখ করে ‘সাবাব’ যার কারণে অর্জিত হয় উদ্দেশ্য করা হয়েছে। যেমন: ঈমান, সততা, নৈতিকতা এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ইত্যাদি। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৬২) ।
﴿دَرَجَاتٌ﴾ ‘বহুবিধ মর্যাদা’, আয়াতাংশে বুঝানো হয়েছে যে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য করে তাঁর বিধান অনুসরণ করে, তারা সকলেই জান্নাতের অধিবাসী হলেও তাদের মর্যাদা ও অবস্থান সমান নয়; কারণ তাদের ইখলাস, ত্যাগ, আনুগত্য ও আমলের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। তাই জান্নাতের সমৃদ্ধ স্তরসমূহ পুরস্কারের বৈচিত্র্য নির্দেশ করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৪৬) । এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে আটটি দরজা রেখেছেন।
﴿وَيُزَكِّيهِمْ﴾ ‘তিনি তাদেরকে পবিত্র করবেন’, তাদের কি এবং কার থেকে পবিত্র করবেন? তাফসীরকারকগণ বলেন: তাদের অন্তরকে শিরক, বিদয়াত ও কুচরিত্র থেকে পবিত্র করবেন। অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে মুমিনদের অন্তরকে শিরক, বিদয়াত, কুচরিত্র ইত্যাদির কলুষিতা থেকে পবিত্র করবেন। (আল-তাফসীর আল-মোয়াস্সার: ১/৭১) ।
﴿الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ﴾ ‘কিতাব এবং হিকমাহ’, আয়াতে ‘কিতাব’ দ্বারা কোরআন এবং ‘হিকমাহ’ দ্বারা সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে। (আল-তাফসীর আল-মোয়াস্সার: ১/৭১) ।
﴿مِنْ قَبْلُ﴾ ‘ইতঃপূর্বে’, আয়াতে ‘ইতঃপূর্বে’ দ্বারা রাসূলুল্লাহর (সা.) আগমণের পূর্বের সময়কে বুঝানো হয়েছে। (আল-তাফসীর আল-মোয়াস্সার: ১/৭১) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জিহাদের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং তাঁর পথে আত্মনিয়োগকারী যোদ্ধাদের মর্যাদা ও পরিণাম তুলে ধরেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতগুলোতে তিনি জিহাদের বিধানগুলো ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হলো- ‘গুলুল’ বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদে অবৈধ দখল থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ শুধুমাত্র আল্লাহর বিধি ও শরিয়াতের সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে; তা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা বা অন্যায়ভাবে দখল করা যাবে না। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৯) ।

১৬১ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন: আয়াতটি নাজিল হয়েছিল একটি লাল ফিতা প্রসঙ্গে। বিস্তারিত ঘটনা হলো- ফিতাটি বদর যুদ্ধের দিন হারিয়ে গিয়েছিল। কিছু লোক ভেবেছিল হয়তো রাসূলুল্লাহ (সা.) তা নিয়েছেন। তখন আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন, যা নবীর পবিত্র ও ন্যায়পরায়ণ চরিত্রকে নির্দেশ করে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৩) ।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৬১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি বিষয় আলোচনা করেছেন:
(ক) নবীদের চরিত্রে খেয়ানতের অবকাশ নেই, কোনো নবীর পক্ষে খেয়ানত করা সমীচীন নয়। বিশ্বাসঘাতকতা, লুটের মাল থেকে গোপনে কিছু নেওয়া বা ধোঁকা দেওয়ার মতো নীচ ও লোভনীয় কাজ নবীদের স্বভাব, চরিত্র ও দায়িত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তাঁদের এমন সকল হীনতার কাজ থেকে পবিত্র ও নিরাপদ রেখেছেন। কারণ নবুওত মানবসম্মানের সর্বোচ্চ মর্যাদা, যেখানে নৈতিক উৎকর্ষ, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। তাই এ উচ্চ মর্যাদাধারী ব্যক্তির পক্ষে এমন কোনো কাজ কল্পনাও করা যায় না যা চরিত্রহীনতা, স্বার্থপরতা বা পদমর্যাদার অবমাননার পরিচয় বহন করে। সারকথা হলো- নবীদের চরিত্রে খেয়ানতের অবকাশ নেই; তারা মানবতার জন্য আমানতদারিত্বের সর্বোচ্চ আদর্শ। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৯) ।
(খ) খেয়ানতকারী কিয়ামতের দিন খেয়ানতের বোঝা বহণ করে উঠবে, যে ব্যক্তি খেয়ানত করবে, কিয়ামতের দিন সে যে জিনিসে খেয়ানত করেছে ঠিক সেটাই নিজের কাঁধে বহন করে হাজির হবে। অর্থাৎ দুনিয়ায় যে সম্পদ, মাল বা আমানত সে বেআইনিভাবে নিজের জন্য নিয়ে নিয়েছে, পরকালে সেই জিনিসই তার অপরাধের প্রকাশ্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে এবং তা তার লজ্জা, ভয়াবহতা ও শাস্তি বাড়িয়ে দেবে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: কেউ যেন কিয়ামতের দিন তার কাধে উট, ঘোড়া, মূল্যবান কাপড়, বা স্বর্ণ-রুপার বোঝা নিয়ে না আসে এবং সাহায্য প্রার্থনা না করে, কারণ সেই দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) তার পক্ষ্যে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না; যে ব্যাপারে দুনিয়াতেই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৯) ।
(গ) কোন ধরণের যুলম ছাড়া খেয়ানতের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে, আয়াতের শেষাংশে খেয়ানতের ভয়াবহতাকে গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে: খেয়ানতকারী যখন কিয়ামতের দিন তার আত্মসাৎ করা সম্পদ নিজের সামনে প্রতিয়মান দেখবে এবং তা বহন অবস্থায় উপস্থিত হবে, তখন তাকে তার সেই অপরাধের বিনিময়ে সম্পূর্ণ শাস্তি প্রদান করা হবে; তার কর্মের হিসাব থেকে কিছুই কমিয়ে দেওয়া হবে না, আবার বাড়িয়ে অন্যায়ও করা হবে না। এ সম্পর্কে কোরআনের আরেক আয়াতে এসেছে:
﴿وَوُضِعَ الْكِتابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ، وَيَقُولُونَ يا وَيْلَتَنا مالِ هذَا الْكِتابِ لا يُغادِرُ صَغِيرَةً وَلا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصاها؟ وَوَجَدُوا ما عَمِلُوا حاضِراً وَلا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَداً﴾ [سورة الكهف: ৪৯].
অর্থ: “কিয়ামতের দিন কর্মের দলিল বা আমলনামা সামনে রাখা হবে, তখন অপরাধীরা আতঙ্কে কাঁপতে থাকবে এবং বলবে, “হায় আফসোস! এই কিতাব তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; সবই গুনে রেখেছে!” তখন তারা নিজেদের সকল আমল স্পষ্ট অবস্থায় দেখতে পাবে, এবং আল্লাহ কারও প্রতি এক বিন্দুও যুলম করবেন না” (সূরাতু আল-কাহ্ফ: ৪৯) । (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২০) ।
(ঘ) গনীমতের মাল খেয়ানত করার হুকুম, উল্লেখিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের আগে নিজের জন্য গোপনে আত্মসাৎ করা ইসলামের দৃষ্টিতে কবীরা বা বড় গুনাহের অন্তর্ভূক্ত। তাই কেউ যদি গনীমত থেকে চুরি বা আত্মসাৎ করে, তা দেখা মাত্রই তার সম্পর্কে জানানো কর্তব্য; কারণ এই খবর প্রকাশের ফলে যতো ঝুঁকি বা অস্বস্তি কল্পনা করা হয়, তা জনকল্যাণের তুলনায় নগণ্য। যদি গনীমত থেকে খেয়ানতকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে জিহাদের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যাবে এবং লোকেরা আল্লাহর জন্য নয়, বরং সম্পদ লুটের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে অন্যদের দায়িত্ব হলো খেয়ানতকারীকে জানিয়ে দেওয়া, আর শাসকের দায়িত্ব হলো শরীয়ত অনুযায়ী সে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কতিপয় ফকীহ বলেন: খেয়ানতকারী ব্যক্তির সামগ্রী পুড়িয়ে ফেলা যেতে পারে; তবে তার অস্ত্র এতে অন্তর্ভূক্ত নয়। একইভাবে, শাসক চাইলে তাকে গনীমত বণ্টন থেকে বঞ্চিত করতেও পারেন। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু উসাইমিন: ২৫/৩৭৫-৩৭৬) ।
২। ১৬২ নং আয়াত থেকে প্রতিয়মান হয় যে, অবাধ্য ও আনুগত্যশীল মানুষের পরিণতি কখনো সমান হতে পারে না, এ কথা শুধু ধর্মীয় সত্যের প্রতিধ্বনি নয়, এটি ন্যায়ের শাশ্বত দর্শনও। মানুষের প্রতিটি কাজ যেন অদৃশ্য এক ছায়া, যা তার পিছু পিছু চলে এবং শেষ পর্যন্ত নিজ রূপেই তার সামনে উদ্ভাসিত হয়। পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক মানুষ তার কর্মের পূর্ণ প্রতিদান পাবে; আর অত্র আয়াতে এই নীতিটি যেন আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, সৎ ও অসৎ পথ কখনোই একই গন্তব্যে পৌঁছায় না। আনুগত্য যে আলো বেছে নেয়, অবাধ্যতা তা-ই অন্ধকারে হারায়; একজন আত্মাকে শুদ্ধ করে উচ্চতায় পৌঁছায়, অন্যজন অপরাধের ভারে নিজেই নিজেকে নীচে নামিয়ে দেয়। দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি সুবিচারের এক অনন্ত নিয়ম, মানুষ যে বীজ বপন করে, সে তারই ফল ভোগ করে; আর সেই ফলাফলেই নির্ধারিত হয় তার ভাগ্য, তার গন্তব্য, তার সত্যিকারের পরিচয়।
সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা মানুষের জন্য যেমন রয়েছে শান্তির প্রতিশ্রæতি, তেমনি অপরাধ ও অবাধ্যতার পথে অটল মানুষের পরিণতি ভয়াবহই হতে বাধ্য। তাই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন: “তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর সেটিই নিকৃষ্টতম আবাস”। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তোষকে নিজের ভাগ্য বানায়, সে শেষ পর্যন্ত এমন এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, যা ভয়াবহ, অপমানজনক এবং যার শোকাবহ ভার বহন করার শক্তি কারো নেই। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২১) । এর অনুরূপ অন্যান্য আয়াতেও আল্লাহ বলেছেন:
﴿أَفَمَنْ كانَ مُؤْمِناً كَمَنْ كانَ فاسِقاً لا يَسْتَوُونَ﴾ [سورة السجدة: ১৮].
অর্থ: “যে মুমিন, সে কি সেই ব্যক্তির মতো যে ফাসিক? তারা কখনোই সমান নয়” (সূরাতু আস-সাজদাহ: ১৮) । আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ، أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ﴾ [سورة ص: ২৮].
অর্থ: “আমরা কি সৎকর্মশীলদেরকে পৃথিবীতে ফেতনা ছড়ানো লোকদের মতো করে রাখবো? কিংবা মুত্তাকীদেরকে পাপীদের মতো গণ্য করবো?” (সূরাতু স্বাদ: ২৮) ।

৩। ১৬৩ নং আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে,
(ক) মানুষ আল্লাহর কাছে সমমর্যাদার নয়, মানুষ আল্লাহর কাছে একরূপ নয়; তারা যেন এক সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপ, যাদের অবস্থান উচ্চতর বা নিম্নতর হয় তাদের অন্দর, কর্ম ও নৈতিক অভিযাত্রার ওপর ভিত্তি করে। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসরণ করে আলো-ভরা পথ ধরে এগিয়ে যায়, আর কেউ নিজের বিপথগামিতায় আল্লাহর ক্রোধকে আহ্বান করে অন্ধকারের দিকে নামতে থাকে। কিয়ামতের দিনে যখন প্রত্যেক মানুষ উন্মুক্ত প্রান্তরের মতো প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে, তখন কোনো অন্তরে লুকানো সত্য আর আড়াল থাকবে না। সেদিন গম্ভীর মহিমায় ধ্বনিত হবে ঘোষণা: “আজ কার হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা? একমাত্র আল্লাহর, যিনি এক ও পরাক্রমশালী”। সার্বিক সত্য হলো- মানুষ যেমন দুনিয়ায় জ্ঞান, চরিত্র, নৈতিকতা এবং আত্মশুদ্ধির পথে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে বিচরণ করে, তেমনি তাদের পরিণতির রূপও আল্লাহর কাছে স্তর-স্তরে বিন্যস্ত। এই স্তরগুলো কোনো কৃত্রিম বিচার নয়; বরং আত্মার স্বাভাবিক গতি, যারা সৎকর্মে নিজেকে উন্নত করে, তাদের আত্মা আলোয় ভরপুর উচ্চ স্তরে উঠে যায়, আর যারা অসৎকর্মে নিমজ্জিত হয়, তাদের আত্মা তলিয়ে যায় নিকৃষ্ট গভীরতায়। সর্বোচ্চ মর্যাদা ‘রফীকুল আ’লা’ থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিচের স্তর, সবই মানব-আত্মার নৈতিক যাত্রাপথের স্বাভাবিক পরিণতি, যা আল্লাহর ন্যায়পরায়ণ বিধানকে মহিমায় উজ্জ্বল করে তোলে।
(খ) আল্লাহ তাদের কাজকর্ম গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন, মানুষের কোনো আমলই তাঁর নিকট গোপন থাকে না। মানুষের প্রতিটি কাজ আত্মাকে হয় পবিত্রতার দিকে নিয়ে যায়, নয়তো অন্ধকারের দিকে টেনে নামায়। যে আত্মা সৎকর্মে নিজেকে শুদ্ধ করে, সে সফলতার শিখরে ওঠে; আর যে আত্মা পাপাচারে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে, সে পতনের অতল আঁধারে তলিয়ে যায়, যেমন বলা হয়েছে: “নিশ্চয় সফল হলো সে, যে আত্মাকে পবিত্র করে; আর ব্যর্থ হলো সে, যে তাকে কলুষিত করে”। আত্মার এসব উচ্চ-নীচ স্তর কেবল সেই মহাসত্তাই জানেন, যিনি প্রতিটি বিষয়ের জ্ঞান দিয়ে পরিবেষ্টিত। কারণ তিনিই দেখেন মানুষের কাজের অন্তরস্থ প্রভাব, আত্মায় তার সূ² কম্পন, এবং হৃদয়ের গভীরে দোলা দেওয়া অদৃশ্য চিন্তা-ভাবনার ঢেউ। মানুষের বাহ্যিক আচরণ হোক বা অন্তরের নিঃশব্দ আন্দোলন, সবকিছুই তাঁর কাছে স্পষ্ট, আর সেই জ্ঞানই নির্ধারণ করে মানুষের চূড়ান্ত সৌভাগ্য কিংবা চূড়ান্ত পতন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২২) ।
৪। ১৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা দুইটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন:
(ক) রাসূলুল্লাহর (সা.) মতো উচ্চ মানের মহামানবকে গনিমতের মাল আত্মসাৎ এর সন্দেহ পোষণ সমিচীন নয়, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর যে বিরাট অনুগ্রহ দান করেছেন, তা হলো- তাদের মধ্য থেকেই এক মহান রসূলকে পাঠানো। তিনি এমন ব্যক্তি, যাকে তারা জন্ম থেকে চিনেছে, যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল স্বচ্ছ, সত্যবাদী, আমানতদার ও দুনিয়ার প্রতি বিমুখ। এমন এক ব্যক্তির উপর বিশ্বাস না রাখার কোনো কারণই নেই। আল্লাহ তাকে চারটি মহৎ দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন, প্রত্যেকটি দায়িত্বই মানুষের জন্য এক অতুলনীয় দয়া।
প্রথমত, তিনি তাদেরই মধ্য থেকে আগত; আরবরা তাঁর ভাষা, আচার, পরিবেশ সবই জানত। ফলে তাঁর দাওয়াত বুঝতে, গ্রহণ করতে এবং তাঁর সততা প্রত্যক্ষ করতে তারা ছিল সবচেয়ে যোগ্য। এ ছিল তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদা। আবু তালিব রাসূলুল্লাহর (সা.) চরিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন: কুরাইশের কোনো যুবকই তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না, তাঁর ভেতর এমন মহত্ত¡ লুকিয়ে আছে যা ভবিষ্যতে উদ্ভাসিত হবেই।
দ্বিতীয়ত, তিনি আল্লাহর আয়াতসমূহ মানুষের কাছে পাঠ করেন, যা আসমান-জমিন, দিন-রাত, সূর্য-চাঁদ, পাহাড়-প্রান্তর সব কিছুকে ইশারায় রূপ দেয়; মানুষের দৃষ্টি খুলে দেয় সৃষ্টিজগতের গভীর সত্যের দিকে। এ আয়াতগুলোতে আছে তাওহীদের আলোকরেখা এবং হৃদয়কে জাগ্রত করার শক্তি।
তৃতীয়ত, তিনি মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব সমাজ যেখানে ছিল ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কার, মূর্তিপূজা, অযৌক্তিক ভয় ও বিভ্রান্তির শৃঙ্খল, রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই অচলায়তন ভেঙে দেন। তিনি শিখালেন- কার্যকারণ সম্পর্কের পেছনে লুকানো শক্তি কোনো মূর্তি বা তারা নয়; একমাত্র আল্লাহই সবকিছুর নিয়ন্তা। মানুষকে কল্পনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সত্যের স্বাধীনতায় পৌঁছে দিলেন।
চতুর্থত, তিনি শিক্ষা দিলেন কিতাব ও হিকমাহ। কিতাবের শিক্ষা তাদেরকে অক্ষরজ্ঞানহীনতা থেকে মুক্ত করে জ্ঞানের দিগন্ত পৌঁছে দিল। ওহি লেখার জন্য লেখক নিযুক্ত হল, চিঠির মাধ্যমে রাজারাজড়াদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানানো হলো; এভাবেই আরবরা জ্ঞান-সভ্যতার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠল। আর হিকমাহ তাদের বুঝাল বিষয়াদির গভীরতা, শারিয়তের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা, বিচারের সৌন্দর্য ও যুক্তির আলো, যা তাদেরকে ন্যায়, সত্য ও প্রমাণের পথে প্রশিক্ষিত করল। সব মিলিয়ে কিতাবের শিক্ষা হলো শরীয়তের বহিরাবরণ বোঝা, আর হিকমাহর শিক্ষা হলো তার অন্তরস্থ রহস্য, উদ্দেশ্য ও কল্যাণ আবিষ্কার করা।
(খ) যে নবীর দাওয়াতের বরকতে তারা বহু বছরের গোমরাহী, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের জীবন থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক পথে ফিরে এসেছে, সেই নবী সম্পর্কে খিয়ানত বা অসততার ধারণা করা মোটেও যুক্তিসংগত নয়। যিনি তাদের চরিত্র গঠন করেছেন, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শিখিয়েছেন, তাওহীদের আলো দেখিয়েছেন, তাঁর উপর খিয়ানের অভিযোগ আরোপ করা মানেই নিজের উপকারকে না চিনতে পারা। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ মনে করিয়ে দেন যে, নবী আসার আগে তারা ছিল স্পষ্ট ভ্রান্তিতে, বিভ্রান্ত ও অন্ধকারের মধ্যে ডুবে থাকা মানুষের মতো। তারা জানত না সঠিক পথ কি, সত্য জ্ঞান কী, বা কোনটি প্রকৃত উপাস্য। সেই কঠিন অন্ধকারে আল্লাহ তাদের জন্য আলো পাঠালেন, এই আলোই হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর আনা হেদায়াত। ফলে এই নবুয়ত ছিল তাদের জন্য এক বিশাল দয়া, অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে সত্যের আলোয় পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য নেয়ামত। (তাফসীর আল-মারাগী: ১২২-১২৪) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) অন্যের আমানত, দায়িত্ব ও বিশ্বাস সঠিকভাবে রক্ষা করা এবং কোনো প্রতারণা না করা।
(খ) প্রতিটি কাজে আল্লাহকে রাজি করানোর উদ্দেশ্যে চলা এবং গুনাহের বিষয়ে সতর্ক থাকা।
(গ) ইবাদত, নেক আমল ও ভালো চরিত্রের মাধ্যমে জান্নাতে উঁচু দরজা লাভে চেষ্টা করা।
(ঘ) রাসূলুল্লাহর (সা.) শিক্ষা ও আচরণকে নিজের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবে অনুসরণ করা।
(ঙ) অহংকার, রাগ, হিংসা, কুসংস্কার ও ভুল বিশ্বাস দূর করে হৃদয়কে পরিষ্কার রাখা।
(চ) কোরআনের নির্দেশনা ও নবীর বাণী জেনে সেগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগানো।
(ছ) হেদায়াত পাওয়ার জন্য আল্লাহর প্রতি অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও সে অনুযায়ী জীবন গঠন করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৯-১৬০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: সাহাবাদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) আচরণ: কোমলতা, ক্ষমাশীলতা ও বিজয়ের অনুপ্রেণা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৯-১৬০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর

﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (159) إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ (160)﴾ [سورة آل عمران: 159-160].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: সাহাবাদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) আচরণ: কোমলতা, ক্ষমাশীলতা ও বিজয়ের অনুপ্রেণা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১৫৯। অতঃপর আল্লাহর রহমতেই তুমি তাদের প্রতি কোমল হয়েছ। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের এবং কঠিন হৃদয়ের হতে, তবে তারা তোমার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর, তাদের জন্য আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা কর, এবং কাজ-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। এরপর যখন সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।
১৬০। যদি আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না। আর যদি তিনি তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন, তবে তাঁর পরে এমন কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করতে পারে? অতএব, মুমিনদের জন্য আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শ নেতৃত্বের এক অপূর্ব চিত্র তুলে ধরেছেন। আল্লাহর বিশেষ রহমতের ফলে তিনি তাঁর সাহাবিদের প্রতি অত্যন্ত কোমল, দয়ালু ও সহনশীল ছিলেন; যদি তিনি কঠোর ও রূঢ় আচরণ করতেন, তাহলে সাহাবিরা তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। বিশেষত উহুদ যুদ্ধে সাহাবীরা যে ভুল করেছিলেন, আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিলেন তাদেরকে কঠোরভাবে ধরতে নয়, বরং ক্ষমা করতে এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে। একই সঙ্গে যে বিষয়গুলোতে পরামর্শ প্রয়োজন, সেগুলোতে তিনি তাদের সাথে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তারপর দ্বিধাহীনভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করে তা বাস্তবায়ন করবেন; কারণ আল্লাহ তাদেরকেই ভালোবাসেন, যারা কাজের প্রচেষ্টা করে এবং পরিণাম সম্পূর্ণভাবে তাঁর হাতে সোপর্দ করে দেয়।
পরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা একটি চিরন্তন সত্য ঘোষণা করেছেন, যা প্রত্যেক মুমিনের জানা ও অনুসরণ করা জরুরি, সেটি হলো জয়-পরাজয় সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতেই। তিনি যদি কারও সহায় হন, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারে না; আর তিনি যদি কাউকে পরিত্যাগ করে সাহায্য বন্ধ করে দেন, তাহলে কারও পক্ষেই তাকে সাহায্য করে বিজয় প্রদান করা সম্ভব নয়। অতএব বিজয় কামনা মানে কেবল আল্লাহরই সাহায্য প্রার্থনা করা এবং সেই সাহায্যের উপযোগী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা, তাঁর আদেশ মানা ও তাঁর পথে অটল থাকা। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় দূর করার পথ হলো তাঁর আনুগত্য, নিষ্ঠা, এবং পূর্ণ ভরসা বা তাওয়াক্কুল। এ কারণেই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে: “মুমিনদের উচিত আল্লাহর উপরই ভরসা করা”, অর্থাৎ যে কোনো কাজে প্রচেষ্টার পর চূড়ান্ত নির্ভরতা শুধুই আল্লাহর উপর স্থাপন করা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৪২-১৪৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১; আল-মুনতাখাব: ১/১১৪) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿وَشَاوِرْهُمْ﴾ ‘এবং তাদের সাথে পরামর্শ কর’, এখানে ﴿شَاوِرْ﴾ শব্দটি আরবী আদেশ সূচক শব্দ, যা “مُشَاوَرَةُ” মাসদার থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো- পরামর্শ করা। আরবি ভাষায় “مشاورة” (পরামর্শ) শব্দের মূল অর্থের মধ্যে রয়েছে কোনো মূল্যবান জিনিস বের করে আনা। যেমন বলা হয়: “شُرْتُ الْعَسَلَ”, অর্থাৎ মৌচাক থেকে যতœসহকারে মধু সংগ্রহ করা। এর দ্বারা বোঝানো হয়, মানুষের মতামত গ্রহণ করাও ঠিক সেই মূল্যবান মধু আহরণের মতো; পরামর্শে বিভিন্ন মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থেকে সবচেয়ে ভালো এবং কল্যাণকর সিদ্ধান্ত বের করে নেওয়া হয়। তাই “مُشَاوَرَةُ” শব্দটি সুন্দরভাবে ইঙ্গিত করে যে, পরামর্শ মানে হলো সবার মূল্যবান মতামত থেকে সেরা সিদ্ধান্ত সংগ্রহ করা। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১১) । ইবন আতিয়্যাহ (র.) বলেন: পরামর্শ নেওয়া শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি এবং দৃঢ় বিধানসমূহের অংশ। যে ব্যক্তিকে জ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ লোকদের সাথে পরামর্শ করে না, তাকে নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াই উচিত। বলা হয়ে থাকে: “যে পরামর্শ নেয়, সে কখনো অনুতপ্ত হয় না; আর যে নিজের মতামতেই মুগ্ধ থাকে, সে পথভ্রষ্ট হয়”। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ما ندم من استشار، ولا خاب من استخار، ولا عال من اقتصد”.
অর্থ: “যে পরামর্শ নেয়, সে অনুতপ্ত হয় না; যে ইস্তিখারা করে, সে ব্যর্থ হয় না; আর যে অপচয় থেকে বিরত থাকে, সে অভাবে পড়ে না”। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২) ।
﴿فِي الْأَمْرِ﴾ ‘সকল বিষয়ে’, “الأمر” শব্দের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের সামগ্রিক নেতৃত্ব ও পরিচালনা। অর্থাৎ যুদ্ধ কিংবা শান্তি, যে পরিস্থিতিই হোক, মুসলিম সমাজকে কোন নীতি অনুসরণ করতে হবে, কীভাবে নিরাপত্তা, ভয়ভীতি বা সংকট মোকাবিলা করতে হবে, এবং দুনিয়ার সার্বিক কল্যাণের জন্য কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, সবই এ শব্দের অন্তর্ভূক্ত। সহজভাবে, “الأمر” বলতে দুনিয়াবি স্বার্থ ও জনকল্যাণের লক্ষ্যে উম্মতের পূর্ণাঙ্গ নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনাকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১১) ।
﴿فَتَوَكَّلْ﴾ ‘অতঃপর তাওয়াক্কুল কর’, “التوكل” (তাওয়াক্কুল) শব্দটি ইসলামী আধ্যাত্মিকতার একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, যার মধ্যে ব্যক্তির স্বীয় সীমাবদ্ধতা ও অক্ষমতার স্বীকৃতি নিহিত আছে। ভাষাতাত্তি¡কভাবে এতে দুটি দিক স্পষ্ট:
(ক) إظهار العجز- নিজের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ততা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা।
(খ) الاعتماد على غيرك والاكتفاء به- নিজের সক্ষমতার বাইরে যে শক্তি ও সাহায্যের প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণভাবে অন্যের (আল্লাহর) ওপর অর্পণ করা। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায় যে তাওয়াক্কুল কোনো নিষ্ক্রিয় বা অলস নির্ভরতা নয়; বরং তা সচেতনভাবে আত্মসমর্পণ এবং ঈমান-ভিত্তিক আস্থা। ব্যক্তির দায়িত্ব পালন ও কারণ গ্রহণের পর ফলাফলের ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর উপর নির্ভর করা তাওয়াক্কুলের মূল ভিত্তি। এখানে মানব-অক্ষমতা ও আল্লাহর সর্বক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তি, দৃঢ়তা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়। সুতরাং, তাওয়াক্কুল এমন এক অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি, যা মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা চিনতে শেখায় এবং জীবনের বাস্তব কর্মকান্ডে আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভর করার শক্তি প্রদান করে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১১) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আগের আয়াতগুলোতে উহুদে মুসলমানদের ভুলের পর আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করেছেন এবং মুনাফিকদের কথায় প্রভাবিত না হতে সতর্ক করেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) ক্ষমাশীলতার নির্দেশনা দিয়েছেন। যদিও এই ঘটনার ফলে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তবুও আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহাবিদের প্রতি কোমলতা, সহনশীলতা ও দয়ার আচরণ দেখানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাদের সাথে ন¤্রভাবে কথা বলবেন, সুন্দর আচরণ করবেন, এমনকি ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও তাদের সাথে পরামর্শ করবেন, যা তার চরিত্র ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৩৯) ।

আয়তদ্বয়ের শিক্ষা:
১। ১৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করেছেন:
প্রথমতঃ একজন যোগ্য নেতার তিনটি বৈশিষ্ট্য-
(ক) কোমলতা, দয়াদ্রতা ও মানবিক আচরণ, আয়াতের প্রথমাংশ থেকে বুঝা যায় একজন নেতার প্রথম ও অপরিহার্য গুণ হলো অন্তরের কোমলতা। নেতৃত্বের মূল শক্তি মানুষের হৃদয় জয় করা; আর হৃদয় জয় হয় আচরণের সৌন্দর্যে, কঠোরতা দিয়ে নয়। আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে: যদি আপনি রূঢ়, কঠোর ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তবে মানুষ আপনার চারপাশ থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত। এর দ্বারা বুঝা যায়, নেতৃত্বের সফলতা ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের উপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সহনশীলতা, বিনয়, নরম ভাষা, এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক আচরণের উপর। একজন নেতার উচিত মানুষের ভুলত্রুটিকে বোঝা, তাদের পরিস্থিতি উপলব্ধি করা এবং তাদের সাথে এমনভাবে আচরণ করা যাতে মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত ও মূল্যায়িত বোধ করে। এ ধরনের কোমল নেতৃত্ব মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত করে, সম্মান ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে, এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যকে দৃঢ় করে। এমনকি কঠিন পরিস্থিতেও অনুসারীদের প্রতি কোমল হতে হবে। যেমন: উহুদ যুদ্ধে যারা ভুল করেছিল তাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) কোমল আচরণ দেখিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে কোমলতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সংকট-পরবর্তী পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত উপাদান। ফলে দেখা যায়, কোমলতা নেতৃত্বের আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কুরআনিক ভিত্তি। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ﴾ [سورة التوبة: ১২৮].
অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছে, যিনি তোমাদের মধ্য থেকে; তিনি তোমাদের কষ্ট ও দুঃখ দেখে মন খারাপ করেন, তোমাদের কল্যাণে আন্তরিক, এবং বিশ্বাসীদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়” (সূরাতু আত-তাওবা: ১২৮) ।
(খ) ক্ষমাশীলতা, দোয়ার মনোভাব ও অনুসারীদের কল্যাণকামী দৃষ্টি, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে একজন নেতার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে: ক্ষমা করা এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করা। নেতা যখন নিজের অধীনস্থদের ভুল মাফ করেন, তখন এটি কেবল মানবিক সৌজন্য নয়; বরং এটি দলগত ঐক্য, সহযোগিতা এবং পরস্পর আস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করে। ভুল করলে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া নেতৃত্বের পরিপক্বতার পরিচয়। পাশাপাশি, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ থেকে বুঝা যায় একজন নেতার মন কেমন হওয়া উচিত, অনুসারীদের শুধু দুনিয়ার জন্য নয়, আখিরাতের সফলতার জন্যও তিনি প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। নেতা তার দলের ভুল ক্ষমা করবেন, তাদের উন্নতির জন্য দোয়া করবেন, এবং তাদের কল্যাণকে নিজের ব্যক্তিগত মান-সম্মানের চাইতেও বড় মনে করবেন। এ ধরনের নেতাই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পায়। যেমন: উহুদ-পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলাভঙ্গকারী সাহাবাদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) ক্ষমা ও দোয়া সমাজে পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং মনোবল পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
(গ) পরামর্শনির্ভর নেতৃত্ব ও দলগত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া, আয়াতের শেষাংশে পরামর্শ ভিত্তিক কাজ করার নির্দেশ একটি গভীর নীতির প্রতিষ্ঠা করেছে, আর তা হলো- সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ। পরামর্শনির্ভর নেতৃত্ব এমন একটি পদ্ধতি যা দলের সদস্যদের মূল্যায়ন করে, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায়, এবং সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এমনকি রাসুলুল্লাহর (সা.) মতো সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, যিনি ওহীর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত ছিলেন, তাকেও বলা হয়েছে: মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করতে। এটি দেখায় যে মানুষের মতামত গ্রহণ করা নেতৃত্বের জন্য কতটা জরুরি। পরামর্শ দলকে ঐক্যবদ্ধ করে, অনুসারীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে, এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বাড়ায়। পরামর্শ গ্রহণের পর যখন নেতা সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন সিদ্ধান্তে দৃঢ় হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। এতে নেতৃত্বে দৃঢ়তা ও ঈমানি শক্তি উভয়ই বিদ্যমান থাকে, যা যেকোনো সঙ্কটে নেতা ও দলকে সঠিক পথে স্থির রাখে। পরমর্শের গুরুত্ব সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ﴾ [سورة الشورى: ৩৮].
অর্থ: “তাদের কাজ-কর্মের মধ্যে তারা পরামর্শ ও আলোচনা করবে” (সূরাতু আশ-শুরা: ৩৮)।
দ্বিতীয়তঃ মাজলিসে শুরার সদস্যপদ নির্ধারনে করণীয়-
আয়াতে বর্ণিত ত্রিস্তরীয় ক্রমটি নববী নেতৃত্বের একটি সুচিন্তিত ও গভীর মনস্তাত্তি¡ক নীতির প্রতিফলন। প্রথম পর্যায়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সাহাবিদের প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষমা ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করা হয়, যা সামাজিক-নেতৃত্বমূলক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি মৌলিক ভিত্তি। উহুদের ঘটনাকে ঘিরে তাদের অবাধ্যতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই নেতার সাথে তার অনুসারীর সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছিল। ব্যক্তিগত ক্ষমা সেই সম্পর্ককে পুনরায় স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাকে সাহাবিদের পক্ষে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এই ধাপটি নির্দেশ করে যে তাদের ভুল কেবল সামাজিক-নেতৃত্বগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ধর্মীয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা.) এই ক্ষমাপ্রার্থণা সাহাবিদের আত্মিক পরিশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্বাসনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়, যা তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। এর ফলে তারা অপরাধবোধ, সংকোচ ও মনস্তাত্তি¡ক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়। তৃতীয় পর্যায়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) তাদের শূরায় অংশগ্রহণের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত আহ্বান করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এখানে স্পষ্ট হয় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারিত্ব শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং তা এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন করে যারা মানসিকভাবে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং ঈমানি দায়িত্ববোধে দৃঢ়। তাই ক্ষমা (সামাজিক পুনর্গঠন) এবং ইস্তিগফার (আধ্যাত্মিক পুনর্গঠন) এই দুই স্তরের পরেই তারা সম্পূর্ণভাবে পরামর্শদানে উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
এই তিন পর্যায়ের বিন্যাস নববী নেতৃত্বের এক অনন্য দ্রষ্টান্ত, যেখানে মনস্তত্ত¡, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রশাসনিক প্রজ্ঞা- তিনটি স্তরই একে অপরকে সমর্থন করে। এটি ইঙ্গিত করে যে, কার্যকর নেতৃত্ব প্রথমে অনুসারীদের হৃদয়কে শান্ত করে, তারপর তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, এরপর তাদের চিন্তার শক্তিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগায়।
২। পরামর্শের বহু উপকারিতা রয়েছে; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতা হলো:
(ক) এটি মানুষের বুদ্ধি, উপলব্ধি এবং সমাজের প্রতি আন্তরিকতার মাত্রা প্রকাশ করে।
(খ) মানুষের ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা থেকে সবচেয়ে সঠিক ও ফলদায়ক মত বের করা যায়।
(গ) মতামত পর্যালোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
(ঘ) এটি মানুষের হৃদয় একত্রিত করে এবং লক্ষ্য অর্জনে সমন্বয় ও সহায়তা করে; (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৪) ।
৩। ১৬০ নং আয়াতে দুইটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছেঃ
(ক) জয়-পরাজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, কুরআন যখন ঘোষণা করে- বিজয় ও পরাজয় আল্লাহর হাতেই, এটি কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়; বরং ইসলামী বিশ্বদৃষ্টির একটি মৌলিক তাত্তি¡ক ভিত্তি। আল্লাহর সাহায্য ও বঞ্চনা মানুষের বাহ্যিক শক্তি, সেনাশক্তি, সংখ্যা বা কৌশলকে অতিক্রম করে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। কারণ, ব্যবস্থা অবশ্যই গুরুত্বপূর্র্ণ, কিন্তু চ‚ড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর। ইসলামী ইতিহাসে বদর, খন্দক ও হুনাইন প্রতিটি ঘটনার ফলাফল এই ঐশী নীতির বাস্তব প্রমাণ। বদরে কম সংখ্যা ও কম সম্পদ নিয়ে বিজয়, আর হুনাইনে অধিক সংখ্যায় সাময়িক বিপর্যয়। উভয়ই মুমিন সমাজকে শিক্ষা দেয় যে মানুষের প্রচেষ্টা মাধ্যম হলেও ফলাফলের মালিক আল্লাহ। একটি জাতির নৈতিকতা, আনুগত্য, ঈমানি দৃঢ়তা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কই আল্লাহর সাহায্য বা বঞ্চনার প্রধান নির্ধারক; বাহ্যিক শক্তি বা আয়োজন শুধুই উপকরণ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২) ।
(খ) বিজয়ের জন্য একমাত্র আল্লাহর উপরই তাওয়াক্কুল করতে হবে, যেহেতু বিজয় আল্লাহর হাতে, তাই বিজয় অর্জনের জন্য কুরআন যে তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দেয় তা দুইটি স্তরে কাজ করে: (ক) সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ ও কার্যকর পরিকল্পনা করা, এবং (খ) ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা। এটি কারণ গ্রহণে সর্বোচ্চ যত্ন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র আল্লাহ। রাসূলুল্লাহর (সা.) নেতৃত্বে দেখা যায়- যুদ্ধেও গোয়েন্দা তৎপরতা, সৈন্যবিন্যাস, কৌশল নির্বাচন সবই ছিল পরিপূর্ণ প্রস্তুতির নির্দেশনা; কিন্তু ফলাফলের ব্যাখ্যা সবসময় আল্লাহর সাহায্যের সাথে সম্পর্কিত। এই তাওয়াক্কুল মুমিনকে মানসিক দৃঢ়তা দেয়; সে হতাশ হয় না, অহংকারেও পড়ে না। মনস্তত্ত¡ ও নেতৃত্বতত্তে¡র গবেষণায়ও দেখা যায় যে নেতা উচ্চতর শক্তির উপর ভরসা রাখে, তার সিদ্ধান্তে স্থিরতা ও সংকটে ধৈর্য থাকে। কুরআনিক তাওয়াক্কুল এই স্থিরতাকে ঈমানের শক্তিতে রূপান্তর করে এবং এবং বিজয়কে শুধুমাত্র সামরিক অর্জন নয়, বরং নৈতিক-আধ্যাত্মিক সফলতার ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
আল্লাহর পথে দ্বায়িত্বশীল ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিম্নের কাজগুলো করবে:
(ক) অধীনস্থদের প্রতি সদয় ও কোমল-হৃদয় আচরণ করবে।
(খ) শূরা নীতির আলোকে পরামর্শভিত্তিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
(গ) সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখে তা বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে।
(ঘ) বিজয়-পরাজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, এই বিশ্বাস রেখে সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৬-১৫৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মুনাফিকতার বিভ্রান্তি থেকে সতর্কতা ও জিহাদের প্রেরণা।

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৬-১৫৮) আয়াতসমূহের তাফসীর,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ كَفَرُوا وَقَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُوا غُزًّى لَوْ كَانُوا عِنْدَنَا مَا مَاتُوا وَمَا قُتِلُوا لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (156) وَلَئِنْ قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ (157) وَلَئِنْ مُتُّمْ أَوْ قُتِلْتُمْ لَإِلَى اللَّهِ تُحْشَرُونَ (158)﴾ [سورة آل عمران: 156-158].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: মুনাফিকতার বিভ্রান্তি থেকে সতর্কতা ও জিহাদের প্রেরণা।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:

১৫৬। হে মুমিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না—যারা কুফরি করে এবং নিজেদের ভাইদের সম্পর্কে বলে: তারা যখন ভূ-ভাগে সফরে বের হয় বা যুদ্ধের ময়দানে যায়, তখন বলে—“যদি তারা আমাদের সাথেই থাকত, তবে তারা মরত না, নিহতও হত না।” আল্লাহ এসব কথাকে তাদের অন্তরে গভীর আক্ষেপে রূপান্তরিত করেন। আর আল্লাহই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। তোমরা যা কিছু করো—আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।

১৫৭। আর তোমরা যদি আল্লাহর পথে নিহত হও, অথবা যুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ কর—তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে মাগফিরাত ও রহমত তোমরা পাবে, তা দুনিয়াবাসীদের সকল সঞ্চয়ের চেয়েও উত্তম।

১৫৮। আর তোমরা স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করো বা যুদ্ধক্ষেত্রে শহিদ হও—যেভাবেই তোমাদের মৃত্যু হোক না কেন—অবশেষে তোমাদের সবাইকেই আল্লাহর কাছেই একত্রিত করা হবে।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করেছেন- তারা যেন কাফির ও মুনাফিকদের মতো না হয়। কারণ তারা তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলে: “যদি তারা জীবিকার সন্ধানে বের না হতো, বা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে না যেত, আর আমাদের সঙ্গেই থাকত, তাহলে তারা মারা যেত না বা নিহত হতো না”। তাদের এই কথাগুলো তাদের নিজস্ব অন্তরে আরও কষ্ট, দুঃখ ও গভীর আফসোস বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মুমিনরা জানে- সবকিছুই আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ী ঘটে। তাই আল্লাহ তাদের হৃদয়কে স্থিরতা দেন, হিদায়াত দেন, ধৈর্য দান করেন এবং তাদের কষ্টকে হালকা করে দেন। আল্লাহ যাকে জীবিত রাখতে চান, সে সফরে থাকুক বা যুদ্ধে, তবুও জীবিতই থাকবে। আর যার নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়েছে, সে ঘরে থাকুক বা বাইওে, তার মৃত্যু ঘটবেই। আর মানুষ যা কিছু করে, আল্লাহ তা দেখেন এবং সে অনুযায়ী প্রতিদান দিবেন।
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সুসংবাদ দিচ্ছেন- যদি তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গিয়ে নিহত হয় বা যুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং বিশেষ রহমত দান করবেন। এর ফলস্বরূপ তারা চিরসুখের জান্নাত লাভ করবে। আর এই পুরস্কার দুনিয়ার সব সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের চেয়ে বহুগুণ উত্তম।
আর যে ব্যক্তির দুনিয়ার নির্ধারিত আয়ু শেষ হয়ে যায়, সে বিছানায় স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করুক, কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হোক, শেষ পর্যন্ত সবাইকেই আল্লাহর উপস্থিতিতে ফিওে যেতে হবে। আর তখন তিনি প্রত্যেককে তাদের আমল অনুযায়ী প্রতিদান দিবেন। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৭-৪০০-৪০১; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৩৫-১৩৬; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭০-৭১; আল-মুনতাখাব: ১/১১৩-১১৪) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿كَالَّذِينَ كَفَرُوا﴾ ‘কাফেরদের মত’, এখানে কাফের দ্বারা আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার সকল সহচর মোনাফেকদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৩৪) ।
﴿لإِخْوَانِهِمْ﴾ “তাদের ভাইদেরকে”, এখানে ‘ভাই’ বলতে শুধু রক্তের সম্পর্কের ভাইদেরকে বোঝানো হয়নি; বরং আকীদা ও মতাদর্শের সঙ্গীদেরকেও বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ- তারা নিজেদের রক্তের সম্পর্কের ভাই এবং মুনাফিক সাথী-সহচরদের সম্পর্কে এ কথা বলত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯, তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১০৭) ।
﴿غزّى﴾ ‘যোদ্ধা’, শব্দটি আরবী বহুবচনের রুপ, এক বচনে হলো- ‘গাযী’। এর অর্থ হলো- যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধাগণ। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১০৭) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করেছেন সেই শয়তানি কুমন্ত্রণা থকে, যা উহুদের যুদ্ধে সাময়িক পরাজয়ের মূল কারণ হয়েছিল। আর এখানে আল্লাহ আবার সতর্ক করছেন আরেকটি ভয়াবহ ফেতনা থেকে, তা হলো- মুনাফিকদের কুমন্ত্রণার ফাঁদে পড়ে যাওয়ার বিপদ। এ মুনাফিকরা আসলে শয়তানেরই সাহায্যকারী ও সহযোগী; তারা শয়তানের মতোই মানুষের মনে সন্দেহ, দুর্বলতা ও ভয় ঢুকিয়ে দেয়। তাই আল্লাহ মুমিনদের সতর্ক করছেন- তারা যেন মোনাফেকদের কথায় প্রভাবিত না হয় এবং তাদের প্রতারণায় বিভ্রান্ত না হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৩৫) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। উহুদের ঘটনার পর নাজিল হওয়া এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরকে দৃঢ় করা, ভুল সংশোধন করা এবং ঈমানী জীবনে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য গভীর প্রজ্ঞাময় বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে মুনাফিকদের কুমতলব, তাদের মানসিক যুদ্ধ, হতাশা ছড়ানো বক্তব্য এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা মুসলমানদের মাঝে দ্বিধা সৃষ্টি করেছিল। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সামনে তিনটি মূল দিক উন্মোচন করেছেন:
(ক) মুমিনদের প্রতি সতর্কবাণী, প্রথম আয়াতে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে- তারা যেন কাফের ও মুনাফিকদের আচরণ ও কথাবার্তার মতো না হয়। তারা বিপদের সময় আল্লাহর সিদ্ধান্তকে সন্দেহ করে, হতাশা ছড়ায় এবং নিয়তির উপর আপত্তি তোলে। উহুদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিকরা যে নেতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়েছিল, আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তার অনুকরণ থেকে বারণ করেছেন। এ সতর্কতার উদ্দেশ্য হলো- ঈমানকে দুর্বল করে এমন মানসিকতা থেকে মুমিনকে দূরে রাখা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সন্তুষ্টি বজায় রাখা।
(খ) মুমিনদের প্রতি আল্লাহর প্রতিশ্রæতি, দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সামনে সুখবর তুলে ধরেছেন যে, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীর জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহান রহমত, যা দুনিয়ার সমস্ত ভোগ-বিলাস ও লালসা থেকে অনেক গুণ উত্তম। আল্লাহর পথে কষ্ট, ধৈর্য, আঘাত, ত্যাগ- সবই গুনাহ মাফের উপায় এবং জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। এই প্রতিশ্রæতির মাধ্যমে মুমিনকে জানানো হয়েছে যে প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার সাময়িক আনন্দে নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য, ক্ষমা ও জান্নাতের পুরস্কারে।
(গ) আমল ও জিহাদের প্রতি উৎসাহ, সর্বশেষ আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, সকল সৃষ্টিই অবশেষে আল্লাহর নিকটেই ফিরে যাবে, এবং প্রত্যেকে তার কর্মফল পাবে- ভালো হলে ভালো, মন্দ হলে মন্দ। কারও হাতে প্রকৃত লাভ বা ক্ষতি নেই; উপকার ও ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই দীন প্রতিষ্ঠার পথে কাজ করা, ত্যাগ করা ও সংগ্রামে অবিচল থাকা মুমিনের অপরিহার্য দায়িত্ব। এই স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরে আত্মত্যাগ, সাহস, জিহাদের চেতনা এবং সক্রিয় আমলের প্রেরণা জাগিয়ে দেন, যাতে তারা দুনিয়ার ভয়, লোভ বা হতাশা দ্বারা প্রভাবিত না হয়।
এ আয়াতগুলো কেবল ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ নয়; বরং প্রতিটি যুগের মুমিনের জন্য দিকনির্দেশনার চিরন্তন উৎস, যা দুর্যোগ, সংগ্রাম ও পরীক্ষার মুহূর্তে ঈমানকে সুদৃঢ় করে, আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা জাগায় এবং দীন প্রতিষ্ঠার পথে অবিচল রাখে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৩৭) ।
২। আয়াতে মুনাফিকদেরকে “কাফের” বলে সম্বোধন করা হয়েছে, কারণ এমন কথা ও মনোভাব একজন সত্যিকারের মুমিনের পক্ষে শোভন নয়; বরং এটি কাফেরের বৈশিষ্ট্য। কারণ হলো- যে ব্যক্তি মারা গেছে বা শহীদ হয়েছে, তার ব্যাপার আল্লাহ তায়ালা চ‚ড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন; বিষয়টি শেষ হয়ে গেছে। এখন বসে বসে বলা: “যদি এমন হতো… যদি ওরকম হতো…”, এগুলো নিছক অর্থহীন কথাবার্তা। কেননা আল্লাহ যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন, মানুষ সে সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে পারে না। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে আফসোস করে বদলানো যায় না। তাই এ ধরনের ‘হত যদি’ কথার মাধ্যমে অনুতাপ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো লাভ হয় না। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো- তার বুদ্ধি সুস্থ, ভাবনা পরিষ্কার এবং ঈমান দৃঢ়। সে জানে, যা ঘটেছে আল্লাহর ফয়সালায় ঘটেছে; এতে কোনো ভুল নেই, বরং অসংখ্য হিকমত লুকিয়ে আছে। তাই সে বাস্তবতাকে মেনে নেয়, আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে এবং ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। এ ধরনের সঠিক মানসিকতা তাকে দুর্বল করে না; বরং শক্তিশালী করে, দৃঢ় করে এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বাড়িয়ে দেয়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১০৮) ।
৩। ১৫৬ নং আয়াত থেকে বুঝা যায় মিথ্যা আশা দেখানো বা ভুল ধারণা মানুষকে দুর্বল করে দেয় এবং গভীর অনুতাপে ডুবায়। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৫৩)। মানুষের চিন্তা-চেতনা দুই স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে: বাস্তবতা (জবধষরঃু) এবং অর্থবোধ (গবধহরহম)। মিথ্যা আশা বা ভুল ধারণা এই দুটি স্তম্ভের উপরই আঘাত হানে। মিথ্যা আশা ও ভুল ধারণা মানুষের মনস্তত্তকে কীভাবে দুর্বল করে- এটি দার্শনিকভাবে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। মানুষের মানসিক শক্তি মূলত বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার উপর নির্ভর করে। যখন কেউ বাস্তব সত্যের বদলে মিথ্যা আশা বা ভুল ধারণাকে ভিত্তি করে জীবনকে সাজাতে থাকে, তখন তার চিন্তার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ সে কল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, যার বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল থাকে না। এর ফলে যে কোনো সামান্য বিপর্যয়ও তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। দর্শনের ভাষায় একে বলা হয় পড়মহরঃরাব ফরংংড়হধহপব অর্থাৎ মানুষের মনের ভিতর কল্পনা ও বাস্তবতার সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়, যা ধীরে ধীরে তাকে আভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় নিমজ্জিত করে। (ঋবংঃরহমবৎ, অ ঞযবড়ৎু ড়ভ ঈড়মহরঃরাব উরংংড়হধহপব, ১৯৫৭) । এ সম্পর্কে কোরআনের আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ﴾ [سورة البقرة: ২১৬].
অর্থাৎ: “হতে পারে, তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে, তোমরা কোনো জিনিসকে ভালোবাস, অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২১৬) ।

আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) কথায় এবং কাজে কাফের-মুশরিক ও মোনাফেকদের অনুসরণ না করা।
(খ) আল্লাহর পথে কষ্ট, ধৈর্য, আঘাত এবং ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে জান্নাত লাভের চেষ্টা করা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৪-১৫৫) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর

By দৈনিক তাফসীর No Comments

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৪-১৫৫) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদে মুমিনের প্রশান্তি, মুনাফিকদের বিভ্রম ও আল্লাহর ক্ষমা।

﴿ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَلْ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ يُخْفُونَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللَّهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (154) إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنْكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ (155)﴾ [سورة آل عمران: 154-155].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদে মুমিনের প্রশান্তি, মুনফিকদের বিভ্রম ও আল্লাহর ক্ষমা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ ও শব্দার্থ:
১৫৪। অতঃপর দুঃখের পওে তিনি তোমাদের উপর প্রশান্ত তন্দ্রা নাযিল করলেন, যা তোমাদের একটি দলকে ঢেকে দিল, এবং অপরদল যারা নিজেদের জান নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তারা আল্লাহ সম্পর্কে অসত্য জাহিলী ধারণা পোষণ করেছিল, তারা বলেছিল: আমাদের এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার আছে? বলো: নিশ্চয় পুরো বিষয়টি আল্লাহরই এখতিয়ারভ‚ক্ত। তারা অন্তরে এমন বিষয় লুকিয়ে রাখে, যা তারা তোমার কাছে প্রকাশ করে না। তারা বলে: যদি আমাদের এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার থাকতো, তাহলে আমাদেরকে এখানে কতল করা হতো না। বলো: যদি তোমরা তোমাদের ঘরে থাকতে, তাহলেও যাদের কতল অবধারিত হয়েছে, তারা তাদের কতল হওয়ার স্থানের দিকে বের হয়ে যেত। আর তোমাদের অন্তরে কি রয়েছে আল্লাহ যেন তা পরীক্ষা করতে পারেন, এবং যাতে পরিষ্কার করেন যা তোমাদের অন্তরে রয়েছে। আর আল্লাহ তোমাদের অন্তরের বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।
১৫৫। নিশ্চয় তোমাদের থেকে যারা দুইদল জমা হওয়ার দিনে পিছু হটেছিল, তাদেরকে শয়তান পদস্খলন করেছিল তাদের কৃতকর্মের জন্য, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল।

আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
উহুদের সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ সত্যিকারের ঈমানদারদের হৃদয়ে এক অসাধারণ শান্তি নাজিল করেছিলেন, এমন শান্তি যা ভয়কে গলিয়ে দেয়, মনকে স্থির করে, এমনকি ক্লান্ত যোদ্ধার হাতের তলোয়ার পড়ে গেলেও তন্দ্রার প্রশান্তি তাকে আবার তা তুলে নিতে শক্তি দেয়। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে আরেকদল মানুষের হৃদয় ভেঙে পড়ছিল; তারা শুধু ভাবছিল কীভাবে নিজেদের প্রাণ বাঁচানো যায়। যুদ্ধের দৃশ্য, পরাজয়ের আঘাত ও আশঙ্কা তাদের মনোবলকে ক্ষয়ে দিয়েছিল, ফলে তারা আফসোস করতে শুরু করল যে যুদ্ধের জন্য বের হওয়াই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তাদের মধ্যে আরেকদল ছিল মুনাফিক, তারা মনে মনে ধারণা করতো শুরু করলো ইসলাম টিকবে না, নবী সফল হবেন না, এবং মুসলমানদের বিজয়ের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই লুকানো জাহিলি চিন্তা মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিলেন। তারা গোপনে বলছিল: “আমাদের তো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়া হয়নি, এখতিয়ার দেওয়া হলে আমরা যুদ্ধেই আসতাম না”। আল্লাহ তায়ালা এর জবাবে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন- জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তের এখতিয়ার মানুষের হাতে নয়; কার মৃত্যু যেখানে নির্ধারিত, সে নিজেই সেখানে পৌঁছে যাবে, ঘরে থাকলেও তা এড়ানো যাবে না। সবশেষে আল্লাহ জানান, এই পুরো ঘটনাই ছিল একটি পরীক্ষা, যাতে মানুষের অন্তরের সত্য প্রকাশ পায়; কে সত্যিকারের মুমিন, আর কে ভয়, সন্দেহ ও নেফাকে ডুবে আছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ হৃদয়ের লুকানো কথা, গভীরতম বিশ্বাস বা সংশয়ের কিছুই আল্লাহর অগোচরে থাকে না।
উহুদের যুদ্ধে কিছু সাহাবি, ভয় ও দুর্বলতার কারণে লড়াই থেকে পলায়ন করেছিলেন। তাদের এই দুর্বলতার পেছনে শয়তানের প্ররোচনা ছিল, কারণ তাদের মধ্যে কিছু ছোটখাটো ভুল বা পাপ ছিল যা শয়তানকে সুযোগ দিয়েছে। তবে আল্লাহ তাদেরকে দোষী হিসেবে ধরেননি, বরং ক্ষমা করেছেন। তিনি দয়া ও মাগফিরতের মালিক, এবং যারা সত্যিকারের তওবা করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ সহনশীল; তিনি অবিলম্বে শাস্তি দেন না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৭-৩৯৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২৮-১৩০; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭০; আল-মুনতাখাব: ১/১১৩) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَمَنَةً نُعَاساً﴾ ‘প্রশান্ত তন্দ্রা’, এখানে “أمنة” বলতে বোঝানো হয়েছে এমন গভীর নিরাপত্তাবোধ, যেখানে ভয় দূর হয়ে অন্তর স্থির হয়ে যায়। আর “نعاس” হলো সেই হালকা তন্দ্রা বা ঢুলুনিভাব, যা ঘুমের আগে শরীরকে ঢিলে করে দেয় এবং মনকে শান্ত করে। অর্থাৎ আল্লাহ এমন এক প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন যার দ্বারা ভয় দূর হয়ে যায়, মন শান্ত হয়, এবং শরীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে নিরাপত্তার অনুভূতি পায়। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنفُسُهُمْ﴾ “যারা নিজেদের জান নিয়েই ব্যস্ত ছিল”, অর্থাৎ- তারা শুধু নিজেদের জীবন বাঁচানো নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তাদের মনে ছিল না রাসুলুল্লাহর (সা.) কী হলো, তাঁর সাহাবিদের কী অবস্থা। ভয় ও আতঙ্কে তারা এমনভাবে নিজেদের নিয়েই মগ্ন ছিল যে অন্য কোনো বিষয় তাদের চিন্তায় আসছিল না। এই বাক্যটি সেই দুর্বলচিত্ত লোকদের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেনি এবং কেবল নিজের নিরাপত্তাকেই বড় ভেবেছিল। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ﴾ “জাহেলিয়াতি ধারণা”, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে কয়েকটি মত পাওয়া যায়:
(ক) আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন: আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- তাক্বদীর বা ভাগ্যকে অস্বীকার করা।
(খ) উহুদের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) হত্যা হয়েছে, অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে আর সাহায্য করা হবে না এ কথা বিশ্বাস করা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৬, তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿وَلِيَبْتَلِيَ اللهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ﴾ “তোমাদের অন্তর পরীক্ষা করার জন্য”, এখানে উদ্দেশ্য হলো- তাদের অন্তরে ইখলাস আছে কিনা জানার জন্য পরীক্ষা করা।
﴿وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ﴾ “যাতে বাছাই করতে পারেন তোমাদের অন্তরে কি আছে”, “তামহিস” মানে হচ্ছে পার্থক্য প্রকাশ করা বা শুদ্ধ করা। যেমন, আগুনে ধাতু গলালে খাঁটি অংশ আলাদা হয়ে যায়, তেমনি আল্লাহ পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিককে আলাদা করে দেন। এতে প্রকাশ পায়- কে সত্যিকারের ঈমানদার, আর কে কেবল মুখে বিশ্বাসের দাবি করে; কে আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে, আর কে অন্তরে বিরাগ পোষণ করে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿إِنَّمَا اسْتَزَلّهُمُ الشَّيْطَانُ﴾ “শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল”, এখানে “استزلهم” মানে হলো ভুল করতে প্ররোচিত করা বা পাপে ফেলানো। এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে বোঝানো হয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যেসব সাহাবি ভয় ও বিভ্রান্তিতে পড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন, তা আসলে তাদের বড় কোনো কুফরি বা বিদ্বেষের কারণে ছিল না; বরং শয়তান তাদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে তাদেরকে ভুল করতে বাধ্য করেছিল। যুদ্ধ থেকে পলায়নই ছিল সেই ভুল বা “زلل”। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এই আয়াতদ্বয় নাজিল হয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাঁদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রæতি পূর্ণ করেছেন এবং প্রাথমিকভাবে তাঁদের বিজয় দান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু সাহাবির অবাধ্যতার কারণে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এরপর উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের অন্তরের গোপন ভাবনা ও কপটতা প্রকাশ করেছেন, যারা বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছিল এবং পরাজয়ের জন্য ইসলামকেই দায়ী করেছিল। এর মাধ্যমে আল্লাহ খাঁটি ও দৃঢ় ঈমানদারদেরকে ভীত মুমিন ও মুনাফিকদের থেকে পৃথক করে দিয়েছেন, যাতে সত্য ও মিথ্যা স্পষ্ট হয়ে যায়। (নাজমুদ দুরার, বাক্বায়ী: ২/১৬৯)।

১৫৪ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবন রাহওয়াইহ (র.) জুবাইর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: “উহুদের দিনে আমি নিজে এমন অবস্থায় ছিলাম, যখন ভয় আমাদেরকে প্রবলভাবে আঘাত করল। তখন আল্লাহ আমাদের ওপর নিন্দ্রা নাজিল করলেন, যা ছিল নিরাপত্তা ও প্রশান্তির নিদর্শন। আমাদের মধ্যে সবাই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আল্লাহর কসম! সেই অবস্থায় আমি যেন স্বপ্নের মতো শুনতে পেলাম ‘মু‘ত্তিব ইবন কুশাইর’ বলছে: “যদি আমাদের কোনো এখতিয়ার থাকত, তবে আমরা এখানে নিহত হতাম না”। আমি কথাটি মনে রাখলাম, এরপর আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে ১৫৪ নং আয়াত নাজিল করলেন: (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। উহুদের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যেখানে মুমিনদের ঈমান, ধৈর্য, আনুগত্য ও আল্লাহর উপর নির্ভরতার প্রকৃত পরীক্ষা সংঘটিত হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলমানরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, কিন্তু কিছু সাহাবির নির্দেশ অমান্য করার কারণে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। ১৫৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের শান্তনা দিয়েছেন, মুনাফিকদের অন্তর উন্মোচন করেছেন এবং তাকদির ও আল্লাহর হিকমতের গভীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। আইসার আল-তাফাসীর অনুসারে যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
(ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান, উহুদের যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের প্রতি এক বিশেষ রহমতের ইঙ্গিত দেয়। যুদ্ধের পর মুসলমানদের মনে যখন চরম ভয়, হতাশা ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাঁদের অন্তরে শান্তি নিশ্চয়তার অনুভূতি দান করেন, যা ছিল এক অলৌকিক প্রশান্তি। এই প্রশান্তির প্রকাশ ছিল- তা তন্দ্রা আকারে শুধুমাত্র ঈমানদারদের অন্তরে নাজিল হয়েছিল। এটি এমন এক নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল যে, তারা যুদ্ধের মাঠেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কারণ তাদের অন্তর আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রশান্তি হয়েছিল। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা দেখিয়ে দেন যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, আল্লাহ তাঁদের জন্য ভয়কে প্রশান্তিতে রুপান্তরিত করে দেন।
(খ) মুনাফির ও মুশরিকদের ভয় ও হতাশা, উহুদের যুদ্ধের সময় মুসলমানদের মধ্যে দুটি শ্রেণী স্পষ্ট হয়ে ওঠে- একদল দৃঢ় ঈমানদার, যাদের হৃদয়ে আল্লাহ প্রশান্তি নাযিল করেন। অন্যদিকে মুনাফিক ও দ্বিমুখী লোকেরা সেই প্রশান্তি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। আল্লাহর প্রতি আস্থা ও পরকালের বিশ্বাস না থাকার কারণে তাদের হৃদয়ে নিরাপত্তার কোন অনুভূতি ছিল না। তারা যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর সন্তুষ্টি বা ইসলামের বিজয় নিয়ে ভাবেনি, বরং কেবল নিজের প্রাণ বাঁচানোর চিন্তায় এবং যুদ্ধে আসার জাগতিক লাভ-লোকসানের হিসাব নিকাশে মগ্ন ছিল। এই মানসিক অবস্থাকেই আল্লাহ তায়ালা আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বর্ণনা করেছেন। এভাবে উহুদের ঘটনাবলির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা প্রকৃত ঈমানদার ও কপট মুনাফিকদের হৃদয়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।
(গ) জাহেলিয়াতি চিন্তা ও আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা, আয়াতের তৃতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস ও বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। তারা আল্লাহর শক্তি, হিকমত ও প্রতিশ্রæতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের মনোভাব ছিল সেই অন্ধ যুগের মানুষের মতো, যারা আল্লাহর উপর ভরসা না রেখে কেবল বস্তুগত ফলাফল ও বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করত। তারা মনে করেছিল, মুসলমানদের পরাজয়ই ইসলামের সমাপ্তি এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) দাওয়াত দাওয়াত ব্যর্থ। কিন্তু বাস্তবে, এই যুদ্ধের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের পরিশুদ্ধ করেছেন, তাদের অন্তরের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করেছেন এবং কপটদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন।
(ঘ) মোনাফেকদের গোপন কথার উন্মোচন, আয়াতের চত‚র্থাংশে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের দুইটি বড় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন:
(ক) তাদের সন্দেহ ও নিয়ন্ত্রণহীন মনোভাব, তারা বিশ্বাস করত না যে যুদ্ধে বিজয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে। তারা মনে করত, যদি নিজেদের ইচ্ছায় চলত, তবে তারা নিরাপদ থাকত। এই মনোভাবই প্রকৃত ঈমানের বিপরীত, কারণ মুমিন বিশ্বাস করে- সবকিছু আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী ঘটে।
(খ) তাদের গোপন শত্রুতা ও কপটতা, বাহ্যিকভাবে তারা মুসলমানদের সাথে ছিল, কিন্তু অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবাদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত। আল্লাহ তায়ালা এই অন্তর্নিহিত কপটতা প্রকাশ করে দিলেন, যাতে মুমিনরা বুঝে নিতে পারে কারা সত্যিকার বিশ্বস্ত এবং কারা বিশ্বাসঘাতক।
(ঙ) তাকদীরের অনিবার্যতা এবং অন্তরের পরীক্ষা, যখন মুনাফিকরা নিজেদের মধ্যে গোপনে আলোচনা করে বলল: যদি তাদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকত, তাহলে তারা এখানে নিহত হত না, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে আদেশ করলেন, যেন তিনি তাদের উত্তর দেন: যদি তারা তাদের ঘরেও থাকতো, তবুও যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত হয়ে গেছে, তারা নিজের মৃত্যুর স্থানে উপস্থিত হতো। মৃত্যু আল্লাহর লিখিত তাকদির অনুযায়ী অবধারিত, তা থেকে পালানো সম্ভব নয়। তাদের উহুদে বের হওয়াও আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ ছিল, যাতে তিনি তাদের অন্তর পরীক্ষা করেন এবং তিনি যেন অন্তরের বিশ্বাস ও কপটতাকে স্পষ্ট করে দেন, যাতে যা আগে অদৃশ্য ছিল, তা প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুমিনরা বাস্তব চিত্রটি দেখতে পান।
২। ১৫৫ নং আয়াতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) মুসলমানদের উহুদ যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালানোর রহস্য, উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলমান ও মুশরিকদের মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল, তখন যারা মুসলমানদের মধ্যে থেকে পরাজিত হয়ে পিছু হটেছিল বা নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করেছিল, আসলে শয়তানই তাদেরকে সেই ভুল ও পদস্খলনের ফাঁদে ফেলেছিল। কারণ, তাদের মধ্যে কিছু গুনাহ বা পূর্বের ত্রুটি ছিল, যার ফলে তারা শয়তানের প্ররোচনায় পড়েছিল। এতে বোঝা যায়- গুনাহ এক গুনাহের পথ খুলে দেয়, যেমন আনুগত্য আরেক আনুগত্যের পথ সুগম করে। যেমন জামাখশারী (রহ.) বলেছেন: “পাপ মানুষকে আরও পাপের দিকে টানে, আর সৎকর্ম মানুষকে আরও সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে”। এইভাবে, বিপদ, শাস্তি কিংবা পরাজয়, সবই মানুষের কর্মফলেরই ফলশ্রুতি। যেমন একটি গুনাহের শাস্তি আরেক গুনাহ বা কষ্ট হতে পারে, তেমনি একটি সৎকর্মের পুরস্কার আরেক সৎকর্মের সুযোগ হতে পারে।
(খ) শয়তানের পাতা ফাদে পতিত হওয়া মুসলমানদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে তারা যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু সময়ের জন্য ফিরে গিয়েছিল, আল্লাহ তাদের সেই কাজের জন্য আখিরাতে শাস্তি দিবেন না; বরং দুনিয়াতে তা তাদের জন্য শিক্ষা, সংশোধন ও পরিশুদ্ধির উপায় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এটি তাদের জন্য আশার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যাতে তারা হতাশায় না পড়ে এবং ভবিষ্যতে আরও দৃঢ় হয়।
(গ) ক্ষমা ও সহিষ্ণু আল্লাহর অন্যতম গুণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ﴾. “নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু”। (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৫৫) । এই আয়াতে দুটি মহান গুণ উল্লেখ করা হয়েছে:
الغفور (ক্ষমাশীল): যিনি বান্দার গুনাহ ঢেকে দেন, ক্ষমা করেন এবং তওবার সুযোগ দেন।

الحليم (সহিষ্ণু): যিনি রাগ দমন করেন, অপরাধ সত্তে¡ও সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না, বরং সময় দেন বান্দাকে সংশোধনের জন্য। এ দুটি গুণই আল্লাহ তায়ালার “সিফাত” (গুণাবলি)-এর অংশ, যা কুরআন ও হাদীসে বারবার এসেছে। আল্লাহ তায়ালার সিফাতের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত, আশায়েরিয়্যাহ ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের আক্বীদাহ নিম্নে:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ-এর আক্বীদাহ: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ বিশ্বাস করেন আল্লাহ তায়ালার যেসব গুণ কুরআন ও সহিহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা সবই চিরন্তন, শাশ্বত, হাক্বীকী বা বাস্তব, সত্য ও প্রমাণিত। এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কারণ, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক পরিপূর্ণ গুণে গুণান্বিত এবং সকল ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র ও মুক্ত। অতএব, যেহেতু তাঁর গুণাবলি পরিপূর্ণতার গুণাবলি, তাই এটা অসম্ভব যে সেগুলো তাঁর মধ্যে পরবর্তীকালে সৃষ্টি হয়েছে বা কোনো এক সময় তিনি ওই গুণাবলিতে বঞ্চিত ছিলেন। কেননা, এমন ধারণা করা মানে আল্লাহর প্রতি ত্রুটি আরোপ করা, যা তাঁর পবিত্র সত্তার পরিপন্থী। সেগুলো সৃষ্টির গুণাবলির মতো নয়; বরং তাঁর মাহাত্ম্য অনুযায়ী অনন্য।
দলীল:
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ [سورة الشورى: ১১].
অর্থ: “তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (সূরাতু আশ-শূরা: ১১) ।
ইমাম মালিক (রহ.) থেকে একটি প্রশিদ্ধ কথা রয়েছে:
“الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة”.
অর্থ: “ইস্তিওয়া জানা, কিভাবে তা ঘটে তা অজানা, তাতে বিশ্বাস করা ফরজ, আর কিভাবে ঘটে তা নিয়ে প্রশ্ন করা বিদআত”। এই নীতি আল্লাহর অন্যান্য গুণাবলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের বিশ্বাস কোন ধরণের ব্যাখ্যা, বিকৃতি, উপমা এবং নিস্ক্রীয়করণ ছাড়া আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) যেভাবে বলেছেন, ঠিক সেভাবে বিশ্বাস করা। এক্ষেত্রে তাদের মূলনীতি হলো:
“إثباتُ ما أثبَتَه اللهُ لنَفْسِه في كتابِه، أو أثبَتَه له رسولُه صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، أو أصحابُه رَضِيَ اللهُ عنهم، مِن غيرِ تحريفٍ ولا تعطيلٍ، ومِن غيرِ تكييفٍ ولا تمثيلٍ”. (العقيدة الواسطية).
“আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে নিজের জন্য যে গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন, অথবা রাসূলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর সাহাবারা (রা.) যে গুণাবলি তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেছেন সেগুলো সাব্যস্ত করা। কিন্তু কোনো প্রকার বিকৃতি (تحريف) বা অস্বীকার (تعطيل) ছাড়াই, এবং কোনো রকম নির্দিষ্টরূপ নির্ধারণ (تكييف) বা তুলনা-সাদৃশ্য স্থাপন (تمثيل) ছাড়াই”। (আল-‘আকীদাহ আল-ওয়াসিতিয়্যাহ, ইবনু তাইমিয়্যাহ) ।
আশআরিয়াহদের (الأشاعرة) আক্বীদাহ, আশআরিয়াহ আহলুস সুন্নাহর খুব কাছাকাছি একটি মাজহাব, তবে গুণাবলির ব্যাখ্যায় তারা কিছু “তাওয়ীল” (রূপক অর্থ) ব্যবহার করেছেন।
তাদের মূলনীতি:
তারা আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিকে দুই ভাগে ভাগ করেন:
(ক) সিফাতে যাতিয়া (ذاتيّة), যেমন: জীবন (حياة), জ্ঞান (علم), শক্তি (قدرة), ইচ্ছা (إرادة), শ্রবণ (سمع), দৃষ্টি (بصر), বাক্য (كلام)। এগুলোকে চিরন্তন, শাশ্বত, হাক্বীকী বা বাস্তব, সত্য ও প্রমাণিত বলে বিশ্বাস করেন। এটি আহলুস সুন্নাহর সাথে মিল আছে।
(খ) সিফাতে ফে’লিয়া (فعلية), যেমন: ক্ষমা, রাগ, খুশি, সহিষ্ণুতা, ভালোবাসা, অসন্তোষ ইত্যাদি। এগুলোকে তারা রূপক অর্থে তাওয়ীল করেন। এখানেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সাথে বিরোধ। তাদের মতে,
আল্লাহর “غفور” মানে তিনি ক্ষমা দান করেন (يفعل المغفرة), কিন্তু “ক্ষমাশীলতা” কোনো স্থায়ী গুণ নয়, বরং তাঁর “ইরাদা (ইচ্ছা)” বা “ফে’ল (কর্ম)” থেকে প্রকাশিত হয়।
“حليم” মানে, তিনি সহিষ্ণু বা শাস্তি বিলম্বিত করেন, কিন্তু এটি কোনো আলাদা গুণ নয়; বরং তাঁর “ইরাদা” ও “কদর” এর প্রকাশ।
ইমাম আল-জুয়াইনি (ইমামুল হারামাইন) বলেন:
“الصفات التي دلّ عليها السمع، منها ما يجب إجراؤه على الحقيقة، ومنها ما يصرف إلى المجاز”.
অর্থাৎ, “শরিয়তের মাধ্যমে প্রমাণিত গুণাবলির কিছু বাস্তব অর্থে গ্রহণ করতে হয়, আর কিছু রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হয়”।
তবে আশআরীরা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মতো গুণাবলি পুরোপুরি অস্বীকার করেননি, বরং গুণ ও সত্তার মধ্যে পার্থক্য রেখে তাওয়ীল ও তানযিহ (আল্লাহকে তুলনামুক্ত রাখার প্রচেষ্টা) করেছেন।
জাহমিয়্যাহর (الجهمية) সম্প্রদায়ের আক্বীদাহ, জাহম ইবনু সফওয়ান এর অনুসারীরা আল্লাহর সব গুণাবলিই অস্বীকার (تعطيل) করেছে। তাদের মতে, “যদি আল্লাহর আলাদা গুণ থাকে, তবে তিনি এক নয়; এতে তাওহীদের ব্যাঘাত ঘটে”। তাই তারা বলেন:
“غفور” মানে- আল্লাহ কোনো বাস্তব ক্ষমাশীল নন, বরং ক্ষমা করার কাজ তাঁর সৃষ্টি।
“حليم” মানে- সহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটানো, বাস্তবে আল্লাহর কোনো ধৈর্যের গুণ নেই।
ফলাফল:
এভাবে তারা আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে তাঁকে “বোধশূন্য সত্তা”র পর্যায়ে নামিয়ে আনে। নাউযুবিল্লাহ।
আহলুস সুন্নাহর জবাব: আহলুস সুন্নাহ বলেন, আল্লাহর গুণাবলি তাঁর সত্তার পরিপূর্ণতার অংশ, গুণ অস্বীকার করা মানে আল্লাহর পরিপূর্ণতা অস্বীকার করা। দলীল:
﴿وَلِلّٰهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا﴾ (سورة الأعراف: ১৮০).
অর্থাৎ: “আল্লাহর রয়েছে সবচেয়ে সুন্দর নামসমূহ; তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো” (সূরাতু আল-আ’রাফ: ১৮০) । যদি এই নামগুলোর অর্থই বাস্তব না হয়, তাহলে এই আয়াতের কোনো অর্থ থাকত না।
অবশেষে বলা যায়, আয়াত ﴿إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ﴾ কেবল আল্লাহর রহমত ও সহিষ্ণুতার বার্তা নয়, বরং তাঁর গুণাবলির প্রতি আমাদের বিশ্বাসের দিকনির্দেশনা দেয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ বলেন: আল্লাহ সত্যিকার অর্থেই ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। আশআরিয়াহ বলেন- আল্লাহ ক্ষমা ও সহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটান, তবে রূপক অর্থে তা ব্যাখ্যা করতে হয়। এবং জাহমিয়্যাহ বলেন: আল্লাহর কোনো বাস্তব গুণ নেই; এই ব্যাখ্যা কেবল বাগ্মিতার অলঙ্কার। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালিহীনের সর্বসম্মত পথ হলো-
“نُثْبِتُ مَا أَثْبَتَهُ اللهُ لِنَفْسِهِ وَنَنْفِي عَنْهُ مَا نَفَاهُ عَنْ نَفْسِهِ”.
অর্থাৎ: “আমরা আল্লাহর নিজের জন্য যেসব গুণ প্রমাণিত করেছেন তা মেনে নিই, এবং যা অস্বীকার করেছেন তা অস্বীকার করি”।

আয়াতদ্বয় থেকে করণীয় (আমল):
(ক) বিপদের সময় ভয় ও আতঙ্ক নয়, বরং আল্লাহর স্মরণ ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা, উহুদের ময়দানে কিছু সাহাবি শত্রুর আক্রমণে আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর নাজিল করেন এক ধরনের শান্তি ও তন্দ্রা, যা তাদের অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। এতে শিক্ষা হলো- বিপদে মুমিন আতঙ্কিত নয়; বরং আল্লাহর জিকির, দো‘আ ও তাঁর উপর পূর্ণ ভরসার মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি লাভ করে।
(খ) দুঃখ ও ব্যর্থতার সময় অভিযোগ না করে আত্মসমালোচনা করা, এবং তওবা ও ইস্তেগফারে লিপ্ত থাকা। উহুদের ঘটনায় পরাজয়ের কারণ ছিল মুমিনদের কিছু ভুল ও গাফেলতি। আল্লাহ বলেন, শয়তান তাদেরকে তাদের কিছু কাজের কারণে পিছলে দিয়েছিল। অতএব, বিপদে অভিযোগ নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তওবা ও ইস্তেগফার মুমিনের কাজ।
(গ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে সর্বদা সুদৃঢ় ভালো ধারণা রাখা।
(ঘ) আত্মসমালোচনা পূর্বক গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা, যারা উহুদের ময়দানে ভুল করেছিলেন, তাদের গুনাহের কারণেই শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা শিক্ষা দিয়েছেন- গুনাহ আত্মিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে, যা শত্রুর সাহস বাড়ায়। ফলে মুমিনের উচিত আত্মসমালোচনা করে গুনাহ থেকে দূরে থাকা।
(ঙ) আল্লাহর কাছে সর্বদা তাওবা-ইস্তেগফার করা।

error: Content is protected !!