Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮৫-১৮৬) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মৃত্যু, প্রতিদান ও পরীক্ষা: মানব জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ (185) لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ (186)﴾ [سورة آل عمران: 185-186].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: মৃত্যু, প্রতিদান ও পরীক্ষা: মানব জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(১৮৫) প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই-ই সফল। আর দুনিয়ার জীবন তো কেবল প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী।
(১৮৬) তোমাদেরকে অবশ্যই তোমাদের সম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে পরীক্ষা করা হবে। আর তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয়ই তা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।

আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আয়াতের প্রসঙ্গ এখনো রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিদের সান্ত¡না দেওয়ার ধারায় চলছে। আগের আয়াতে ইহুদি ও মুশরিকদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি যে মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেনÑআল্লাহ তা‘আলা সে বিষয়ে তাঁকে সান্ত¡না দেন। আর এই আয়াতে রয়েছে আরও গভীর ও মহৎ সান্ত¡না।
(১৮৫) এখানে আল্লাহ ঘোষণা করছেনÑপ্রত্যেক প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে; সে যত বড় মর্যাদারই হোক বা যত সামান্যই হোক, কারও জন্যই মৃত্যু থেকে রেহাই নেই। এরপর আল্লাহ স্পষ্ট করে দেন যে, দুনিয়া প্রতিদানের জায়গা নয়; এটি কাজ করার জায়গা। তাই দুনিয়ায় অনেক সময় দেখা যায়Ñঅপরাধীরা অপরাধ করে, যালিমরা যুলুম করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কোনো শাস্তি পায় না। আবার সৎকর্মশীলরা ভালো কাজ করে, সংশোধনকারীরা সমাজের কল্যাণে কাজ করে, তবুও তারা দুনিয়ায় কাক্সিক্ষত প্রতিদান পায় না। এতে মুমিনের জন্য রয়েছে বড় সান্ত¡না; কারণ প্রকৃত বিচার ও প্রতিদান হবে আখিরাতে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য এখানে তুলে ধরা হয়েছে- দুনিয়ার জীবন তার সমস্ত জৌলুস ও আকর্ষণসহ কেবলই ক্ষণস্থায়ী ভোগবস্তু। এটি বাহ্যিক সৌন্দর্য ও চাকচিক্যে মানুষকে মোহিত করে, কিন্তু অচিরেই তা মুছে যায় ও বিলীন হয়ে যায়। আসলে এটি এক প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী।
(১৮৬) অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনরা অবশ্যই পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন- তাদের সম্পদে এবং নিজেদের জীবনে। সম্পদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা হবে অভাব-অনটন, প্রয়োজন ও আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ দায়িত্ব (যেমন যাকাত ও অন্যান্য ব্যয়) আদায়ের মাধ্যমে। নিজেদের জীবনে পরীক্ষা হবে রোগব্যাধি, মৃত্যু এবং কঠিন ইবাদত ও দায়িত্ব- যেমন জিহাদ, হজ ও রোজার মাধ্যমে।
এছাড়া তারা অবশ্যই আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কাছ থেকে কষ্টদায়ক কথা ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য শুনবে। কেউ বলবে- “আল্লাহ গরিব, আমরা ধনী।” কেউ বলবেÑ“মসীহ আল্লাহর পুত্র।” আবার কেউ বলবেÑ“লাত, উয্যা ও মানাত আল্লাহর সাথে অন্যান্য উপাস্য।” এই সব কষ্ট ও পরীক্ষার মোকাবিলায় আল্লাহ তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন- “আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে অবশ্যই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ”। অর্থাৎ, ধৈর্য ও তাকওয়া শুধু ভালো গুণ নয়; এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত দায়িত্ব। এগুলো পালন করা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২১-৪২২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৯) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿ذَائِقَةُ الْمَوْتِ﴾ “মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী”-অর্থাৎ, আত্মা তার দেহের মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; কিন্তু আত্মা নিজে ধ্বংস বা বিলীন হয় না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২০) । এই বাক্যে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষের দেহ একসময় মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু আত্মা মরে না। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আত্মা অন্য জগতে (বরযখে) অবস্থান করে এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় দেহের সঙ্গে মিলিত হবে। তাই মৃত্যু মূলত দেহের জন্য; আত্মা ধ্বংস হয় না, বরং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় স্থানান্তরিত হয়। (আল্লাহই ভালো জানেন)
﴿مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾ “প্রতারনার ভোগ-সামগ্রী”, এখানে متاع বলতে এমন বস্তু বা ভোগের উপকরণ বোঝায়, যা মানুষ সাময়িকভাবে ব্যবহার করে বা উপভোগ করে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায় বা বিলীন হয়ে যায়। আর الغرور (প্রতারণা) শব্দটি এর সাথে যুক্ত হওয়ায় বোঝানো হয়েছে যে, দুনিয়ার এই সাময়িক ভোগ-বিলাস মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করতে পারে। এই কারণেই প্রসিদ্ধ তাবেঈ মুফাসসির ক্বাতাদা (র.) বলেছেন:
“الدنيا متاعٌ متروك، يوشك أن تضمحلَّ بأهلها”.
অর্থাৎ, “দুনিয়া এমন এক ভোগ-সামগ্রী, যা একদিন অবশ্যই ছেড়ে যেতে হবে; অচিরেই তা তার অধিবাসীদেরসহ বিলীন হয়ে যাবে”। দুনিয়ার জীবন ও তার ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী এবং প্রতারণাময়। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا كَمَا يَغْمِسُ أَحَدُكُمْ أُصْبُعَهُ فِي الْيَمِّ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا فَيَنْظُرُ بِمَا تَخْرُجُ.
অর্থাৎ- “আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থান এমন, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে তার আঙুল ডুবিয়ে আবার তুলে নেয়; তারপর দেখে- তার আঙুলে কতটুকু পানি ফিরে আসে” (মুসনাদে বায্যার: ৩৪৬০) ।
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ সা.-কে সান্ত¦না দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী এই আয়াতগুলোতেও সেই সান্ত¦নার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে: আপনি তাদের যে একগুঁয়েমি, অবাধ্যতা ও বিরোধিতা দেখছেন, তা স্থায়ী নয়; বরং এরও একদিন শেষ হবে। যা আসন্ন, তা খুবই নিকটবর্তী। সুতরাং আপনি তাদের আচরণে বিরক্ত বা দুঃখিত হবেন না। কারণ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সকল কাজের যথাযথ প্রতিফল পাবে। দুনিয়ার জীবন অতি সংক্ষিপ্ত, আর কিয়ামতের দিনই হলো প্রকৃত প্রতিদানের দিন। একই সঙ্গে এই আয়াতদ্বয় মুমিনদের প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। এতে তাদের শেখানো হয়েছে- তারা যেন নিজেদেরকে সামনে আসা সম্ভাব্য কষ্ট, নির্যাতন ও নানা কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে সহ্য করার জন্য প্রস্তুত করে। যাতে হঠাৎ করে এসব বিপদ এসে উপস্থিত হলেও তারা বিচলিত না হয় এবং দৃঢ়তার সাথে তা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ মুমিন ব্যক্তি আগে থেকেই ধৈর্য ও ঈমানের শক্তিতে নিজেকে প্রস্তুত রাখে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি ঈমান থেকে বঞ্চিত, সে যখন বিপদ ও কষ্টের মুখোমুখি হয়, তখন সহজেই ভেঙে পড়ে। তার মন সংকুচিত হয়ে যায়, সে বিরক্ত ও অস্থির হয়ে ওঠে, এমনকি অনেক সময় জীবনের প্রতিও তার অনীহা তৈরি হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৯২) ।

১৮৬ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
﴿وَلَتَسْمَعُنَّ﴾ আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে- এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল এক ঘটনার প্রেক্ষিতে। তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সাথে এক ইহুদি ব্যক্তি ফিনহাস-এর তর্ক হয়। সেই ইহুদি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে বলেছিল: “আল্লাহ তো দরিদ্র, আর আমরা ধনী”। এই ধৃষ্টতাপূর্ণ কথার প্রসঙ্গেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
আরেক বর্ণনায় মুফাসসির আব্দুর রাযযাক সানআনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতটি কাব ইবনুল আশরাফ-এর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। সে ছিল একজন বিদ্বেষী ব্যক্তি, যে কবিতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সা.-কে ব্যঙ্গ করত এবং তার কবিতার দ্বারা কুরাইশরা কাফিরদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দিত। (লুবাব আল-নুকুল, সুয়ূতী: ৭৬) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
ভূমিকা: সূরাতু আলে-ইমরানের উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনদেরকে সান্ত¦না, সমবেদনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এখানে স্মরণ করানো হয়েছে যে, যারা মুসলমানদেরকে কষ্ট দিচ্ছে তারা এ দুনিয়াতে চিরস্থায়ী নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং মানুষের প্রকৃত প্রতিদান দেওয়া হবে আখিরাতে, তাই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। একই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ও মুমিনদেরকে জানানো হয়েছে যে, দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে ধন-সম্পদ, জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং বিশেষ করে আহলে কিতাব- ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এবং মুশরিকদের কাছ থেকে কষ্টদায়ক কথার সম্মুখীন হতে হবে। এ পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা হলো মুমিনের জন্য উত্তম ও দৃঢ় সংকল্পপূর্ণ পথ।

১। ১৮৫ নং আয়াত থেকে নি¤েœর বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়-
(ক) সকলকেই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহণ করতে হবে, ইমাম কুরতুবি র. তার তাফসির গ্রন্থে মৃত্যু সম্পর্কিত কিছু বিধান উল্লেখ করেছেন:
প্রথম বিধান: মৃত্যুর সময় মৃতকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালেমা শিখিয়ে দেওয়া সুন্নত, যাতে তার শেষ কথা ঈমানের সাক্ষ্য হয়। এ সময় সূরা ইয়াসীন পড়াও উত্তম। মৃত্যুর পর জীবিতদের উপর কিছু দায়িত্ব আসে, যেমন: মৃতের চোখ বন্ধ করা, সৎ লোকদেরকে মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া, দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
দ্বিতীয় বিধান: মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া শরীয়তে প্রতিষ্ঠিত বিধান। অধিকাংশ আলেমের মতে এটি সুন্নত, আবার কেউ কেউ এটিকে ওয়াজিব বলেছেন।
এটি জানাবাতের গোসলের মতোই করা হয় এবং সাধারণত তিন, পাঁচ বা সর্বোচ্চ সাতবার ধোয়া হয়।
তৃতীয় বিধান: কাফন দেওয়া ওয়াজিব। যদি মৃতের সম্পদ থাকে, তবে তা তার সম্পদ থেকেই করা হবে। কাফনের কাপড় সাদা হওয়া উত্তম।
চতূর্থ বিধান: জানাযা নিয়ে দ্রুত চলা সুন্নত। অতিরিক্ত ধীরগতিতে চলা বা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব করা অনুচিত। তবে এমন দ্রুততা নয়, যা অনুসারীদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়।
পঞ্চম বিধান: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা ওয়াজিব। তাকে মাটির মধ্যে সমাহিত করা এবং ঢেকে দেওয়া আবশ্যক। এছাড়া জানাযার নামাজ ফরজে কিফায়া, অর্থাৎ কিছু লোক আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। (তাফসির আল-কুরতুবি: ৪/২৯৯-৩০১)।
(খ) দুনিয়ার জীবন প্রতিদানের স্থান নয়; এটি কর্মের স্থান, এই পৃথিবী মূলত মানুষের জন্য পরীক্ষার ময়দান। এখানে মানুষ তার আমল, চরিত্র ও বিশ্বাসের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করে। কিন্তু সেই কাজের পূর্ণ প্রতিদান দুনিয়াতে নয়; বরং আখিরাতে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেককে তার আমলের যথাযথ প্রতিদান দেবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরাতু গাফির-এর ১৭ এবং সূরাতু আল-যালযালাহ-এর ৭-৮ নং আয়াতে কথা বলেছেন।
আয়াতের প্রথমাংশে সূক্ষ্মভাবে কবর জীবনের (বারযাখের) নেয়ামত ও শাস্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের কর্মের ভিত্তিতে তাকে সেখানে আংশিক প্রতিদান দেওয়া হয় এবং সে তার পূর্বে সম্পাদিত আমলের কিছু নমুনা আগেই পেতে শুরু করে। এ কথা বুঝা যায় আল্লাহর এই বাণী থেকে (وإنما توفون أجوركم يوم القيامة) “তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান তো কিয়ামতের দিনই দেওয়া হবে” অর্থাৎ, আমলের পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত প্রতিদান কেবল কিয়ামতের দিনই দেওয়া হবে। এর আগে যে প্রতিদান দেওয়া হয়, তা আংশিক এবং তা বারযাখের জীবনে হয়ে থাকে। (তাফসীরে সা’দী: ১/১৫৯) ।
(গ) প্রকৃত সফলতা হলো- জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ করা, মানুষ সাধারণত দুনিয়ার ধন-সম্পদ, পদ-মর্যাদা বা খ্যাতিকে সফলতা মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা হলো আখিরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জান্নাত লাভ করা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতে পারে- তাহলে দুনিয়ার সফলতাকে আমরা কীভাবে দেখবো? এর উত্তরে বলা যায়, দুনিয়াবী সফলতা- যেমন ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বড় ব্যবসায়ী হওয়া- এসব নিজে নিজে চূড়ান্ত সফলতা নয়; বরং এগুলো হলো প্রকৃত সফলতায় পৌঁছার মাধ্যম ও সিঁড়ি। এই সাফল্যগুলো তখনই অর্থবহ হয়, যখন এগুলোকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়। একজন ডাক্তার যদি তার জ্ঞান দিয়ে মানুষের সেবা করে, একজন ব্যবসায়ী যদি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে, আর একজন প্রকৌশলী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার কাজের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখে, তবে তাদের দুনিয়াবী সফলতা আখিরাতের সফলতায় রূপ নেয়। অতএব, আল্লাহর বিধান মেনে এই দুনিয়ার সিঁড়ি বেয়ে চলতে পারলে মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে এবং চিরস্থায়ী জান্নাত অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত ও পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করতে সক্ষম হয়। (আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন)
(ঘ) দুনিয়ার জীবন এক প্রতারণাময় ভোগসামগ্রী, যা দ্রুত বিলীন হয়ে যায়, পৃথিবীর আনন্দ, সম্পদ ও সৌন্দর্য মানুষের চোখে আকর্ষণীয় মনে হলেও তা স্থায়ী নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো শেষ হয়ে যায়। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে পড়ে না গিয়ে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। (আইসার আল-তাফাসির, জাযায়িরী: ১/৪২২) । একই বিষয়ে আল্লাহ আল-আনকাবুত-এর ৬৪ এবং আল-হাদীদ-এর ২০ নম্বর আয়াতে কথা বলেছেন। এ সম্পর্কে সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
“لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ، مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ” (سنن الترمذي: ২৩২০).
“যদি দুনিয়া আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমান মূল্যবান হতো, তবে তিনি কোনো কাফিরকে এ দুনিয়া থেকে এক চুমুক পানিও পান করতে দিতেন না” (সুনানে তিরমিযী: ২৩২০)।
২। শায়খ আবু যাহরাহ তার তাফসীর গ্রন্থ ‘যাহরাতুত তাফাসীর’-এ লিখেছেন- ১৮৬ নম্বর আয়াতে এমন কিছু সূক্ষ্ম বর্ণনামূলক ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে এর গভীর তাৎপর্য স্পষ্ট হয়:
প্রথমত: এখানে রাসূলুল্লাহর সা. বিরোধীদের এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বুঝায় তারা দুই শ্রেণির, এক শ্রেণি হলো আহলে কিতাব, যারা পূর্ববর্তী নবীদের উপর অবতীর্ণ কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখত; আর দ্বিতীয় শ্রেণি হলো মুশরিক, যারা কোনো কিতাব মানে না এবং কোনো হেদায়েত অনুসরণ করে না। কুরআন এই দুই শ্রেণিকে একটি বিষয়ে একত্র করেছে- তারা সবাই রাসূলুল্লাহর সা. বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতা তাদেরকে সত্য অস্বীকারে প্ররোচিত করেছে। তাদের বিরোধিতা ব্যক্তিগত ছিল না; বরং রাসূলুল্লাহ সা. যা নিয়ে এসেছেন এবং যা প্রচার করেছেন, তার প্রতিই ছিল। এখানে জ্ঞানী ও অজ্ঞ- উভয়কে একত্রে উল্লেখ করার মধ্যে একটি গভীর ইঙ্গিত রয়েছে: যখন হঠকারিতা আসে, তখন জ্ঞানী ও অজ্ঞ সমান হয়ে যায়। অজ্ঞ ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতার অন্ধকারে বিভ্রান্ত থাকে, আর জ্ঞানীর অন্তরে আল্লাহ মোহর করে দেন, ফলে উভয়েই একই অবস্থায় পতিত হয়।
দ্বিতীয়ত: এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুশরিকদের বিরোধিতার কারণ ছিল অজ্ঞতা, আর আহলে কিতাবের বিরোধিতার মূল কারণ ছিল হিংসা। তারা আল্লাহর অনুগ্রহে অন্যদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তা দেখে হিংসা করত। কারণ, তারা মনে করত- যেহেতু তাদের কাছে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাই নবুওয়াত তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কিন্তু আল্লাহ বলেন: “আল্লাহই ভালো জানেন, তিনি কোথায় তাঁর রিসালাত অর্পণ করবেন” (সূরাতু আল-আনয়াম: ১২৪) । এই ভ্রান্ত ধারণার ফলে তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ জন্ম নেয়। আর যেখানে হিংসা থাকে, সেখানে সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
তৃতীয়ত: আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কথা শুনে মুসলমানদের কষ্ট পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও কষ্টটি মূলত কথার মাধ্যমে আসে। কিন্তু সেই কথাকে ‘কষ্ট’ বলা হয়েছে, কারণ তা কষ্টের কারণ, কষ্টের বিষয়বস্তু, এমনকি নিজের মধ্যেই কষ্ট বহন করে। এজন্য কষ্টকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তা শোনার বস্তু। আর “অনেক কষ্ট” বলা হয়েছে, যাতে বোঝানো হয়, এ কষ্ট পরিমাণে, ধরনে ও প্রকৃতিতে, সব দিক থেকেই ব্যাপক ও তীব্র।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে পথনির্দেশনা দিয়েছেন যে তারা যদি আহলে কিতাব ও মুশরিকদের দ্বারা কোন প্রকার কষ্টের স্বীকার হয়, তাহলে তারা তিনটি কাজ করবে:
(ক) ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেদেরকে অস্থিরতা থেকে বিরত রাখবে,
(খ) সৎকর্মে অবিচল থাকবে, এবং
(গ) ঈমানদারদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবে। (যাহরাতুত তাফাসির: ৩/১৫৪০) ।
এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন সূরাতু আল-বাক্বারা এর ১৫৫ নম্বর আয়াতে। এ সম্পর্কে সহীহ মুসলিমে সুহাইব রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
“عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ؛ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ” (صحيح مسلم: ২৯৯৯).
অর্থাৎ: “মুমিনের অবস্থা সত্যিই আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করে, তবে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- এতে তার জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে- এতেও তার জন্য কল্যাণ হয়” (সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
১। সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ রেখে নেক আমল, তওবা ও আখিরাতের প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়া।
২। দুনিয়ার মোহ ও প্রতারণাময় ভোগ-বিলাসে বিভ্রান্ত না হয়ে জান্নাত লাভকেই জীবনের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
৩। জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষা- ধন-সম্পদ, রোগ-ব্যাধি ও কষ্টের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
৪। তাকওয়া অবলম্বন করে হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৫। মানুষের কষ্টদায়ক কথা, বিরোধিতা ও বিদ্বেষের মুখে সংযম, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্র বজায় রাখা।

Leave a Reply

error: Content is protected !!