Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াত সমূহের তাফসীর

﴿لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ (181) ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ (182) الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ عَهِدَ إِلَيْنَا أَلَّا نُؤْمِنَ لِرَسُولٍ حَتَّى يَأْتِيَنَا بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ قُلْ قَدْ جَاءَكُمْ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِي بِالْبَيِّنَاتِ وَبِالَّذِي قُلْتُمْ فَلِمَ قَتَلْتُمُوهُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (183) فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ جَاءُوا بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ وَالْكِتَابِ الْمُنِيرِ (184)﴾ [سورة آل عمران: 181-184].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: ইহুদীদের জঘন্য কুকর্মের জবাব ও রাসূলুল্লাহকে সান্তনা।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৮১। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছিল: “আল্লাহ গরিব, আর আমরা ধনী”। তারা যা বলেছে এবং যে অন্যায়ভাবে তারা নবীদের হত্যা করেছে- সবই আমরা লিখে রাখব। আর (কিয়ামতে) আমরা বলব: “জ্বালাময় আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো”।
১৮২। এটি তোমাদের নিজেদের হাতের কামাইয়ের ফল। আর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি কখনোই জুলুমকারী নন।
১৮৩। যারা বলেছিল: “আল্লাহ আমাদের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন যে, কোনো রাসূলের প্রতি আমরা ঈমান আনব না, যতক্ষণ না সে আমাদের কাছে এমন কুরবানি নিয়ে আসে যাকে আগুন এসে ভস্ম করে দিবে”। তাদের বলুন: “আমার আগেও তোমাদের কাছে বহু রাসূল স্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলেন এবং তোমরা যা দাবী করছো তা নিয়েও এসেছিলেন। তাহলে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাদের কেন হত্যা করেছিলে?”।
১৮৪। অতএব তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, যারা স্পষ্ট প্রমাণ, লিখিত কিতাব এবং উজ্জ্বল কিতাব নিয়ে এসেছিলেন।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৮১। আল্লাহ তায়ালাই আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র মালিক। সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছুর উত্তরাধিকার তাঁরই কাছে ফিরে যাবে। অথচ কিছু ইহুদি এই সত্য অস্বীকার করে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের সুরে বলেছিল যে, আল্লাহ গরিব, তাই তিনি মানুষের কাছে দান-খরচকে “ঋণ” বলে চাইছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর মর্যাদা খাটো করা এবং ঈমানদারদের দান-খরচকে তুচ্ছ করা। আসলে আল্লাহ মানুষের দানকে “ঋণ” বলেছেন সম্মান ও উৎসাহ দেওয়ার জন্য, প্রয়োজনের কারণে নয়। মানুষের দেওয়া দান-সদকা তাঁর কোনো উপকার করে না; বরং তা মানুষেরই কল্যাণে আসে এবং তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন। এই অবমাননাকর কথার কারণে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তাদের এই কুফরি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য শুনেছেন এবং তা তাদের আমলনামায় লিখে রাখা হয়েছে। যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তী বড় অপরাধ- নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করার অপরাধও লেখা আছে। এসব গুরুতর অপরাধের ফলস্বরূপ কিয়ামতের দিন তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে বলা হবে।
১৮২। এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা কোনো অবিচার বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি হবে ইহুদীদের নিজেদের কৃতকর্মেরই পরিণাম। দুনিয়ার জীবনে তাদের মুখে যে কুফরি ও অবমাননাকর কথা বলেছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে গুনাহের কাজ করেছে এবং অন্তরে যে ভ্রান্ত ও বাতিল বিশ্বাস লালন করেছে, সবকিছুই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না, বরং প্রত্যেককে তার নিজের আমলের অনুযায়ী প্রতিফল দেন। তাই শাস্তি ভোগকারীরা নিজেরাই নিজেদের জন্য সেই পরিণতি ডেকে এনেছে।
১৮৩। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সেই যুক্তি খন্ডন করছেন, যা তারা নবীদের আগমনের সময় ব্যবহার করত। তারা বলত, তারা কোনো নবীকে তখনই বিশ্বাস করবে, যখন সে আসমান থেকে আগুন নেমে কোনও কুরবানি দাহ করবে। আল্লাহ তায়ালা এখানে স্মরণ করাচ্ছেন- তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে বহু নবী এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শন ও অলৌকিক নিদর্শনসহ। তারা দেখতে পেত যে নবীরা সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত, কিন্তু তাদের অহংকার ও অমর্যাদার কারণে সেই নবীদের হত্যা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ জিজ্ঞেস করছেন- যদি তারা সত্যি ঈমানদার হত, এবং আসমান থেকে আগুন নেমে কুরবানিকে দাহ হওয়াকে নবীর সত্যতার মানদন্ড মনে করত, তাহলে তারা কেন তাদের পূর্বপুরুষদের হত্যা করেছিল।
১৮৪। আল্লাহ এখানে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦ দিচ্ছেন যে, কাফের-মুশরিক ও ইহুদি-খ্রিষ্টনরা রাসূলুল্লাহকে (সা.) মিথ্যা বলে অবজ্ঞা করলেও এটা নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক নবীকে তাদের নিজ স¤প্রদায়ের মানুষ মিথ্যাপবাদ ও বিদ্রƒপের মাধ্যমে নাকচ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে অস্বীকার করা এবং নবীদের আহ্বানকে অবমূল্যায়ন করা। কিন্তু নবীরা শুধু তাদের কথার মাধ্যমে নয়, স্পষ্ট অলৌকিক নিদর্শন, প্রমাণ এবং আসমানি গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষকে ঈমানের পথে আহ্বান করেছিল। আসমানি গ্রন্থ মানুষের জন্য আলোর মতো, যা মানুষকে অন্ধকার, বিভ্রান্তি ও ভুল থেকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই গ্রন্থগুলো স্পষ্ট, পরিষ্কার এবং সঠিক ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝাতে সক্ষম। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮৭; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৪; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮-১১৯) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿بِقُرْبَانٍ تَأْكُلُهُ النَّارُ﴾ ‘এমন কুরবানী, যাকে আগুন ভস্মীভ‚ত করে দেয়’, আয়াতাংশে কুরবান (القربان) বলতে বোঝায়- আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু বা অন্য কোনো বস্তু। পূর্ববর্তী নবীদের যুগে কুরবানের একটি বিশেষ নিদর্শন ছিল: কুরবান নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়া হতো, এরপর আকাশ থেকে এক প্রকার সাদা আগুন অবতীর্ণ হয়ে তা ভস্মীভূত করলে বুঝা যেত যে আল্লাহ তা কবুল করেছেন। আর আগুন না নামলে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে গণ্য হতো। (তাফসীর গরীব আল-কেরাআন, কাওয়ারী: ৩/১৮৩)।
﴿الْبَيِّنَات﴾ ‘স্পষ্ট প্রমাণ’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর নিদর্শন এবং নবী-রাসূলদের উপর প্রেরিত মোযেজা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।
﴿الَّذِي قُلْتُمْ﴾ ‘যা তোমরা বলছো’, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কুরবানী, কারণ ইহুদীরা এমন কুরবানীর দাবী তুলেছিল, যা আকাশ থেকে আগুন এসে শেষ করে দিবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/২৪৯) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে প্রাণ উৎসর্গে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে মুজাহিদদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট যে জান্নাতের মহান সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়ের প্রতিও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; কারণ সম্পদ হলো প্রাণেরই ঘনিষ্ঠ সহচর। এই পথে সম্পদ ব্যয়ে কৃপণতা করলে যে কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতদ্বয়ে আরও বোঝানো হয়েছে যে দুনিয়ার সম্পদ ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। যাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার আসে এবং যারা উত্তরাধিকারী হয়, উভয়ই একদিন মৃত্যুবরণ করবে; আর চিরস্থায়ী মালিকানা থাকবে একমাত্র আল্লাহরই। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে ইহুদিদের একটি বক্তব্য উল্লেখ করে তার অসারতা খন্ডন করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেওয়া হয়েছে যে তাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অস্বীকার ও মিথ্যারোপ নতুন কিছু নয়; পূর্ববর্তী নবীরাও তাদের কাছ থেকে অনুরূপ বিরোধিতা ও অস্বীকৃতির সম্মুখীন হয়েছেন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৪৫)।

১৮১ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু ইসহাক ও ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন- একদিন আবু বকর (রা.) ইহুদিদের পাঠশালায় (বায়তুল মিদরাস) প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দেখেন, কয়েকজন ইহুদি তাদের এক ব্যক্তির চারপাশে জড়ো হয়েছে, যার নাম ছিল ‘ফিনহাস’। সে আবু বকর (রা.)-কে বলল: “হে আবু বকর! আমরা আল্লাহর প্রতি মোখাপেখী নয়; বরং তিনি আমাদের প্রতি মোখাপেখী। যদি তিনি আমাদের প্রতি মুখাপেক্ষী না হতেন, তবে তোমাদের নবী আমাদের কাছ থেকে ঋণ চাইতেন না”। এ কথা শুনে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে চপেটাঘাত করেন। এরপর ‘ফিনহাস’ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বলল: হে মুহাম্মদ! দেখুন, আপনার সঙ্গী আমার সাথে কী করেছে!? রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন- হে আবু বকর! তুমি কেন এমন করলে?” তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! সে অত্যন্ত ভয়াবহ কথা বলেছে। সে দাবি করেছে- আল্লাহ দরিদ্র, আর তারা নাকি ধনী!। ফিনহাস এ কথা অস্বীকার করল। তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন।
আরেক বর্ণনায় ইবনু আবি হাতিম ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: যখন আল্লাহ তায়ালা সূরাতু আল-বাক্বারার ২৪৫নং আয়াত: “কে আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দেবে” নাযিল করলেন: তখন ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল: হে মুহাম্মদ! তোমার প্রতিপালক কি দরিদ্র হয়ে গেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের কাছে ঋণ চাইছেন?”, তখন আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াত নাযিল করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৫) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সুরাতু আলে-ইমরানের (১৮১-১৮৪) আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা ইহুদিদের কুৎসিত মানসিকতা ও ভয়ংকর অপরাধসমূহ স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। এখানে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ, নবীদের হত্যা এবং রাসূলুল্লাহকে (সা.) অস্বীকার করার ধারাবাহিক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দেন- তিনি সব কথা শোনেন, সব কাজ জানেন এবং কোনো জুলুমই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়। একই সঙ্গে এই আয়াতসমূহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেয় যে, সত্যের পথের আহ্বানকারীরা অতীতেও একই রকম অবজ্ঞা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।
১। ১৮১ এবং ১৮২ নং আয়াতদ্বয়ে চারটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইহুদীদের প্রথম হটকারিতা হলো- আল্লাহর প্রতি তাদের জঘন্য অপবাদ, এই আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের এক জঘন্য অপবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র আর আমরা ধনী”। এটি ছিল আল্লাহর শানে চরম অবমাননা ও কুফরী বাক্য। দুনিয়াবি সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে আল্লাহর গুণাবলির প্রতি অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিল। অথচ আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত গুণ সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে: তিনি কারো প্রতি মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু বিশ্বের সবকিছুই তার দিকে মুখাপেক্ষী। যেমন সূরাতু আল-ইখলাসে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ফুঠে উঠেছে।
এছাড়া সূরাতু আল-ফাতির এ এসেছে-
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ﴾ [سورة الفاطر: ১৫].
অর্থ: “হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ তো অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত” (সূরাতু আল-ফাতির: ১৫) । এবং সূরাতু মুহাম্মদ এ এসেছে-
﴿وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ﴾ [سورة محمد: ৩৮].
অর্থ: “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আর তোমরাই মুখাপেক্ষী” (সূরাতু মুহাম্মাদ: ৩৮) । হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
“يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ” (صحيح مسلم: ২৫৭৭].
অর্থ: “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, আমি যাকে খাওয়াই সে ছাড়া; অতএব আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাওয়াবো। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন সবাই একত্র হয়ে আমার নিকট কিছু চায় এবং আমি প্রত্যেককে তার চাওয়া দিয়ে দেই, তবুও তা আমার রাজত্ব থেকে সূচের ছিদ্রে প্রবেশ করা পানির সমানও কমাবে না” (সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭) ।
(খ) ইহুদীদেরকে সতর্কীকরণ- তাদের সকল কর্মকান্ড আল্লাহ তায়ালার পর্যবেক্ষণে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা ১৮১ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন- “আমরা তাদের এ কথা লিখে রাখব”। অর্থাৎ তাদের মুখের কথা, অন্তরের কুফরী মনোভাব এবং কার্যকলাপ, সবই আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত। কোনো অপবাদ, বিদ্রূপ বা অপরাধই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়। এবং অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা তাদের কথা শুনছেন। এ ছাড়াও কোরআনের বিভিন্ন জায়গাতে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। যেমন সূরাতু ক্বফ- এ বলেছেন:
﴿مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴾ [سورة ق: ١٨].
অর্থ: “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা-ই আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা লিখে রাখেন” (সূরাতু ক্বফ: ১৮) । কোরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ﴾ [سورة الملك: ١٤].
অর্থ: “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি তো অতিসূ²দর্শী, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত” (সূরাতু আল-মুলক: ১৪) । আকেটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
﴿يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ﴾ [سورة غافر: ١٩].
অর্থ: “চোখের গোপন বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তর যা গোপন করে, সবই তিনি জানেন” (সূরাতু গাফির: ১৯) ।
এ ব্যাপারে অনেক হাদীস রয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ ثُمَّ بَيَّنَ ذَلِكَ، فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، فَإِنْ هُوَ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ سَيِّئَةً وَاحِدَةً” [متفق عليه].
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সয়ং তার রব থেকে বর্ণনা করেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নেক আমল ও গুনাহ লিখে রেখেছেন। অতঃপর তিনি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো নেক কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকে একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে নেক কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা সম্পন্ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা দশগুণ থেকে শুরু করে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত, বরং তার চেয়েও বহুগুণ বাড়িয়ে লিখে দেন। আর কেউ যদি কোনো গুনাহ করার ইচ্ছা করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে সেটিকেও একটি পূর্ণ নেকি হিসেবে লিখে দেন। আর যদি সে গুনাহ করার ইচ্ছা করে এবং তা বাস্তবায়ন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তা একটি মাত্র গুনাহ হিসেবে লিখে দেন” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ” (صحيح مسلم: ২৫৬৪].
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান” (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তিনি তাদের কথাবার্তা শোনেন, তাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন এবং তাদের মুখের কথা, কাজকর্ম ও নিয়ত, সবকিছুই লিপিবদ্ধ করেন। তাদের কুফর, বিদ্রæপ ও অপরাধের কোনো কিছুই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।
(গ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ইহুদীদের হঠকারিতার জবাব ও শাস্তির ঘোষণা, ইহুদীরা আল্লাহ তায়ালার শানে কুফরিমূলক অপবাদ, বিদ্রƒপ ও অবাধ্যতার যে চরম সীমা অতিক্রম করেছিল, তার জবাবে আল্লাহ তায়ালা শুধু সতর্ক করেননি; বরং ১৮১ নং আয়াতের শেষাংশে সুস্পষ্টভাবে কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তোমরা আগুনের শাস্তি আস্বাদন কর”। এটি কোনো আবেগপ্রসূত হুমকি নয়; বরং তাদের বিশ্বাস, কথা ও কর্মের ন্যায়সংগত পরিণতির ঘোষণা, যা আখিরাতে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
(ঘ) ইহুদীরা কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার কারণ, আল্লাহ তায়ালা যখন ইহুদীদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেন, তখন তা কোনো আকস্মিক বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং আল্লাহ তায়ালা ১৮২ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন- এই শাস্তির মূল কারণ হলো তাদের নিজেদের হাতের কামাই করা কৃতকর্ম। অর্থাৎ তারা যা করেছে, তারই ন্যায্য পরিণতি হিসেবে এই শাস্তি অবধারিত হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, ইহুদীদের অপরাধ ছিল সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত এবং সীমালঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ। তাদের কৃতকর্মের মধ্যে কয়েকটি অপরাধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-
প্রথমত, নবী-রাসূলদের অন্যায়ভাবে হত্যা। আল্লাহ তায়ালা যাদের মানুষকে হেদায়েতের আলো দেখানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন, সেই নবী-রাসূলদেরকেই তারা হত্যা করেছে বা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, যেমনটি ১৮৩ নং আয়াতে দেখা যায়। এটি শুধু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তায়ালার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ। এটি ছিল ইহুদীদের অন্যতম মারাত্মক অপরাধ। তারা আল্লাহ তায়ালার শানে এমনসব কথা বলেছে, যা কেবল অবমাননাকরই নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফরিমূলক। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তারা আল্লাহর মহান গুণাবলি, বিশেষত তাঁর অমুখাপেক্ষিতা, পূর্ণতা ও একত্বকে অস্বীকার করেছে। এটি ছিল তাদের চরম ধৃষ্টতা ও অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, তারা কখনো বিদ্রƒপের সুরে বলেছিল: “আল্লাহ দরিদ্র, আর আমরা ধনী” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৮১)। আবার কখনো তারা বলেছে- “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ১৮, সূরাতু আত-তাওবাহ: ৩০)। কোরআন এ ধরনের বক্তব্যকে স্পষ্ট ভাষায় মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। এ ধরনের অপবাদ আল্লাহর সত্তা ও একত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানে এবং তাওহিদের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। এভাবে বারবার আল্লাহর শানে মিথ্যা আরোপ করে তারা শুধু মুখের গুনাহেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অন্তরের কুফরি মানসিকতা প্রকাশ করেছে। এই ধরণের অপবাদ প্রমাণ করে-তারা আল্লাহকে যথার্থভাবে চিনতে অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের জ্ঞান ও সম্পদের অহংকারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তৃতীয়ত, বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘন। ইহুদীদের সামনে সত্য যখন সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল নবী-রাসূলদের মাধ্যমে, কিতাব ও নিদর্শনের মাধ্যমে, তখনও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। সত্য তাদের অজানা ছিল না; বরং তারা তা চিনত, বুঝত এবং জানত যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু জেনেশুনে তারা সেই সত্যকে অস্বীকার করেছে, যা ছিল তাদের চরম হঠকারিতা ও বিদ্রোহী মানসিকতার প্রমাণ। তারা শুধু বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই সীমালঙ্ঘন করেনি; বরং কার্যত আল্লাহর বিধান ভেঙেছে, বারবার অঙ্গীকার ও চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার হোক কিংবা নবীদের মাধ্যমে দেওয়া নির্দেশনা, সবকিছুই তারা নিজেদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কাছে তুচ্ছ করে দিয়েছে। ফলে দ্বীনের বিধানকে অনুসরণের পরিবর্তে তারা প্রবৃত্তি, অহংকার ও দুনিয়াবি লাভকে প্রাধান্য দিয়েছে।
এই আচরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; সমস্যা ছিল হৃদয়ের রোগে, হিংসা, অহংকার ও দুনিয়ামুখিতা। এ কারণেই কোরআন তাদের সম্পর্কে বারবার উল্লেখ করেছে- তারা সত্য জানার পরও তা গোপন করত, বিকৃত করত এবং অমান্য করত। এমন ধারাবাহিক সত্য প্রত্যাখ্যান ও সীমালঙ্ঘনই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত করে তোলে।
২। ১৮৩ নম্বর আয়াতে ইহুদীদের একটি বিশেষ হঠকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে তার শক্ত জবাব দিয়েছেন এবং তাদের মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
(ক) ইহুদীদের দ্বিতীয় হঠকারিতা: মিথ্যা অজুহাত ও আকিদাগত বিকৃতি, আয়াতের প্রথমাংশে দেখা যায়- ইহুদীরা ঈমান না আনার জন্য একটি কৃত্রিম ও মনগড়া শর্ত দাঁড় করিয়েছিল। তারা আল্লাহর নামে এমন একটি অঙ্গীকারের কথা বলেছে, যার কোনো ওহিভিত্তিক প্রমাণ নেই। এটি ছিল আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ, যা কুফরি ও ধৃষ্টতার অন্তর্ভুক্ত। পূর্ববর্তী কিছু নবীর যুগে কুরবানি গ্রহণের জন্য আসমান থেকে আগুন নেমে আসা ছিল তখনকার একটি বিশেষ পদ্ধতি বা মুজিজা। কিন্তু ইহুদীরা সেই ব্যতিক্রমী ঘটনাকেই নবুয়তের সার্বজনীন শর্তে পরিণত করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সত্য গ্রহণ এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- নিদর্শন দেখানোর পরও তারা ঈমান আনেনি। এখানে স্পষ্ট হয়, তাদের সমস্যা ছিল না প্রমাণের অভাবে; বরং সমস্যা ছিল অন্তরের রোগে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করত এবং নবুয়ত যেন কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এই অহংকারে আক্রান্ত ছিল। ফলে অন্য জাতির মধ্য থেকে রাসূল আসা তারা মানতে পারেনি।
(খ) আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব- ইতিহাসের আয়নায় সত্য উন্মোচন, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের দাবির জবাবে রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেন: “বলুন, আমার আগেও তোমাদের কাছে রাসূলগণ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এবং তোমরা যে নিদর্শনের দাবী তুলছো, তা নিয়েও। তবে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে তাদেরকে হত্যা করলে কেন?”। এই প্রশ্নটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুক্তিনির্ভর। আল্লাহ তায়ালা এখানে আবেগ নয়, বরং ইতিহাসকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ইহুদীদের নিকট বহু নবী এসেছিলেন, যাঁরা সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এমনকি তারা যে নিদর্শনের দাবি করছে, সেটিও কিছু নবীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো- তারা সেই নবীদের প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁদের হত্যা করেছে অথবা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। নবী হত্যা ছিল তাদের সত্যবিমুখতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যারা সত্যকে ভালোবাসে, তারা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না।
(গ) মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা যখন বলেন- “যদি তোমরা সত্যবাদী হও”, তখন এটি কোনো সাধারণ শর্ত নয়; বরং তাদের মিথ্যা দাবি ও ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচনের এক কঠোর ঘোষণা। কারণ তারা দাবি করেছিল- নির্দিষ্ট এক নিদর্শন ছাড়া তারা কোনো রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে না। অথচ বাস্তবতা হলো, তাদের কাছে এমন বহু রাসূল এসেছিলেন, যাঁরা স্পষ্ট নিদর্শনসহ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঈমান আনার পরিবর্তে সেই নবীদের হত্যা করেছে বা হত্যার পথ প্রশস্ত করেছে। সুতরাং আল্লাহর এই শর্তমূলক বাক্যটি আসলে একটি তিরস্কার, যা প্রমাণ করে যে তাদের সমস্যা প্রমাণের অভাবে নয়, বরং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ, অহংকার ও অন্তরের বিকৃতির কারণে। কারণ প্রকৃত সত্যবাদীরা কখনো সত্যের বাহককে হত্যা করে না। আর ঈমানের নামে অজুহাত দাঁড় করিয়ে তারা নিজেদের মিথ্যাচারকেই প্রকাশ করে দিয়েছে।
৩। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সমর্থন ও সান্ত¦না দিয়েছেন। মানুষ যখন তাঁর ওপর অবিশ্বাস ও অপবাদ আরোপ করত, তখন আল্লাহ তাঁকে স্মরণ করাতেন যে এ ঘটনা নতুন নয়, বরং আগের নবীদের সাথেও এমনই ঘটেছে। ১৮৪ নং আয়াতের মাধ্যমেও তার হৃদয়ে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি যোগানো হয়েছে। নিম্নের ব্যাখ্যায় আয়াতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরব:
প্রথমত, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর ওপর আরোপিত মিথ্যাচার ও অস্বীকৃতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। সত্যের দাওয়াত সব যুগেই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে কাফিরদের পক্ষ থেকে “মিথ্যাবাদী” বলাকে নবুওয়াতের পথে অস্বাভাবিক কিছু মনে করার কারণ নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) মানসিকভাবে দৃঢ় করেন এবং তাঁর অন্তরের ভার লাঘব করেন। এ সম্পর্কে আরো অনেক আয়াত ও হাদীস এসেছে, যেমন একটি আয়তে এসেছে-
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের উপর ধৈর্য ধারণ করেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।
আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ ۚ مَا يَأْتِيهِم مِّن رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ﴾ [سورة يس: ৩০].
অর্থ: “আফসোস বান্দাদের জন্য! তাদের কাছে যখনই কোনো রাসূল এসেছে, তারা তাকে উপহাস করেছে” (সূরাতু ইয়াসিন: ৩০) । এছাড়াও সূরাতু আল-আনয়াম-এর ১১২ নং আয়াত এবং সূরাতু আল-ফোরক্বান এর ৩১ নং আয়াতে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে একটি প্রশিদ্ধ হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءً الْأَنْبِيَاءُ، ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ” (سنن الكبرى للنسائي: ৭৪৪০).
অর্থ: “মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষায় পড়েন নবীগণ; এরপর যারা তাদের ন্যায়পরায়ণতায় নিকটবর্তী” (সুনান আল-কুবরা লিন-নাসায়ী: ৭৪৪০)।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ পূর্ববর্তী রাসূলদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্ত¦না দেন। তাঁর আগেও বহু নবী এসেছেন, যাঁরা সমাজকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছিলেন; অথচ তাঁদেরকেও মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) একা নয়; বরং তিনি নবীদের সেই সম্মানিত ধারাবাহিকতার অন্তর্ভূক্ত, যাঁদের পথ কঠিন হলেও তাঁদের দাওয়াত ছিল নির্ভুল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।
তৃতীয়ত, আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে পূর্ববর্তী রাসূলগণ কেবল সাধারণ আহ্বান নিয়ে আসেননি; তাঁরা এসেছিলেন সুস্পষ্ট নিদর্শন, সহীফা এবং উজ্জ্বল আসমানী কিতাবসহ। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে প্রমাণের কোনো অভাব ছিল না। তবুও ইহুদীরা তা অস্বীকার করেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তাদের কুফর ও প্রত্যাখ্যান দাওয়াতের দুর্বলতার কারণে নয়, বরং তাদের অন্তরের অন্ধত্ব ও অহংকারের ফল।
চতুর্থত, এই আয়াত দাওয়াতের দায়িত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে। রাসূলুল্লাহর (সা.) দায়িত্ব ছিল সত্যের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া; মানুষের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা বা না করা তাঁর দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়। সুতরাং মানুষের ঈমান না আনা কোনোভাবেই নবীর দাওয়াতি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে না। এই উপলব্ধি দাওয়াতদাতার জন্য গভীর প্রশান্তি বয়ে আনে। এ সম্পর্কে কোরআনে অনেক আয়াতে এসেছে, যেমন:
﴿مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ﴾ [سورة المائدة: ৯৯].
অর্থ: “রাসূলের উপর দায়িত্ব কেবল (আল্লাহর বার্তা) পৌঁছে দেওয়া; আর তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর, আল্লাহ তা সবই জানেন” (সূরাতু আল-মায়িদাহ: ৯৯) । এছাড়াও সূরাতু আন-নাহল এর ৮২, সূরাতু ইয়সিন এর ১৭, সূরাতু আল-ক্বাসাস এর ৫৬, এবং সূরাতু আল-বাক্বারা এর ২৭২ নং আয়াতসমূহে এ সম্পর্কে আলোচন এসেছে।
বিদায়ী হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: ‘আমি কি তোমাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছাতে পেরেছি’, সকলে সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন- ‘হ্যা’, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এটি প্রমাণ করে- রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দায়িত্বের সফলতা মাপতেন বার্তা পৌঁছেছে কি না, তা দিয়ে; মানুষ মানল কি না, তা দিয়ে নয়।
পঞ্চমত, এই আয়াতের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো ধৈর্য ও অবিচলতা। সত্যের পথে চলতে গিয়ে কষ্ট, অপবাদ ও বিরোধিতা অনিবার্য। তবে এগুলোই নবীদের পথের বাস্তবতা। এই উপলব্ধি রাসূলুল্লাহকে (সা.) সবরে জামিলের পথে অটল থাকতে সহায়তা করে এবং তাঁর হৃদয়ে এই দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে যে শেষ পরিণতি সত্য ও হকের পক্ষেই থাকবে। এ সম্পর্কে অন্য একটি আয়াতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّىٰ أَتَاهُمْ نَصْرُنَا﴾ [سورة الأنعام: ৩৪].
অর্থ: “আপনার আগেও বহু রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; তারা মিথ্যার অপবাদ ও নির্যাতনের ওপর ধৈর্য ধারণ করেছে, অবশেষে তাদের কাছে আমার সাহায্য এসে পৌঁছেছে” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৩৪) ।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কোনো কটুক্তি, অপবাদ বা সন্দেহপূর্ণ কথা থেকে বিরত থেকে বিশুদ্ধ আকিদার ওপর অটল থাকা।
(খ) জুলুম, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণ থেকে নিজেকে দূরে রেখে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।
(গ) আখিরাতের জবাবদিহি ও কঠিন শাস্তির কথা স্মরণ করে নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও তওবার অভ্যাস গড়ে তুলা।
(ঘ) সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে বিরোধিতা ও কষ্ট এলে নবীদের পথ অনুসরণ করে ধৈর্য ও অবিচলতা অবলম্বন করা।
(ঙ) মানুষের প্রতিক্রিয়াকে সাফল্যের মানদন্ড না বানিয়ে দায়িত্ববোধের সঙ্গে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়াকেই নিজের সাফল্য হিসেবে গ্রহণ করা।

Leave a Reply

error: Content is protected !!