﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ (161) أَفَمَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَ اللَّهِ كَمَنْ بَاءَ بِسَخَطٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (162) هُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ (163) لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (164)﴾ [سورة آل عمران: 161-164].
আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: গনীমত বন্টনে রাসূলুল্লাহর (সা.) ন্যায়পরায়ণতা ও উম্মাহ সংস্কারের দায়িত্ব।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬১। কোনো নবীর পক্ষে গনীমত আত্মসাৎ করা কখনোই শোভন নয়। আর যে এটি করবে, সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে ঠিক সেই আত্মসাৎকৃত বস্তু নিয়ে। অতঃপর প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী পুরোপুরি প্রতিফল দেওয়া হবে, এবং তাদের প্রতি সামান্যও যুলম করা হবে না।
১৬২। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অনুসরণ কওে, সে কি তার সমান হতে পারে যে আল্লাহর গজবের পাত্র হয়ে ফিরে আসে? আর যার আশ্রয় জাহান্নাম, সেটি তো কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!
১৬৩। তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদার বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করবে, এবং আল্লাহ তাদের প্রতিটি কাজই পরিপূর্ণভাবে দেখেন।
১৬৪। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি মহান অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন; যিনি তাদের কাছে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে আত্মশুদ্ধি করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাহ; অথচ এর পূর্বে তারা ছিল একেবারে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে।
আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
কোনো নবী-রাসূলের পক্ষে তার উম্মাহর সঙ্গে সামান্যতম বিশ্বাসঘাতকতা করা কখনোই সম্ভব নয়; কারণ তিনি আল্লাহর নিযুক্ত প্রতিনিধি, আমানতের সর্বোচ্চ বাহক। গনীমতের মাল তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তিনি শুধু সেটুকুই গ্রহণ করেন, এর বাইরে কিছু নেওয়া তাঁর মহিমান্বিত চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ যে ব্যক্তি গোপনে এ ধরনের আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের বিশাল ময়দানে সে নিজেই সেই চুরি করা সম্পদ কাঁধে নিয়ে উপস্থিত হবে, মানুষের সামনে তার লজ্জা, অপরাধ ও অপমান যেন প্রকাশ্য সাক্ষ্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই দিন আর কোনো অজুহাত কাজ দেবে না; প্রত্যেকে তার কর্মের পূর্ণ প্রতিফল পাবে, সততার বিনিময়ে সম্মান ও পুরস্কার, আর বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে নিন্দা ও শাস্তি। আর আল্লাহ কারো উপর বিন্দুমাত্রও অবিচার করবেন না।
আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণকারী ব্যক্তির মর্যাদা সেই ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে না, যে পাপাচারে নিমগ্ন থেকে প্রভুর অসন্তোষ ডাকতে থাকে, এটি কোরআনের মূল্যবোধভিত্তিক নৈতিক বিচারধারার একটি মৌলিক নীতি। কারণ প্রথমজনের জীবন পরিচালিত হয় ইখলাস, তাকওয়া, আনুগত্য ও আখিরাতমুখী উদ্দেশ্যের দ্বারা, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য, সাফল্য ও পরকালীন মর্যাদার উপযুক্ত করে তোলে। বিপরীতে, যে ব্যক্তি গুনাহ ও অবাধ্যতার পথে অটল থাকে, সে কেবল নৈতিক ও আত্মিক পতনেই নিমজ্জিত হয় না, বরং পরিণামে জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে, যা কোরআনের দৃষ্টিতে চ‚ড়ান্ত শাস্তি ও নিকৃষ্টতম পরিণতি। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টিমুখী ও আল্লাহ-অসন্তুষ্টিমুখী জীবনধারার তুলনা কেবল আচরণভিত্তিক নয়; বরং উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ, নৈতিক দর্শন এবং চূড়ান্ত পরিণামের একটি সামগ্রিক দ্বৈততা নির্দেশ করে।
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য করে তাঁর বিধান অনুসরণ করে, তারা সকলেই জান্নাতের অধিবাসী হলেও তাদের মর্যাদা ও অবস্থান সমান নয়; কারণ তাদের ইখলাস, ত্যাগ, আনুগত্য ও আমলের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। অনুরূপভাবে, যারা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে অবাধ্যতার পথে অগ্রসর হয়, তারাও জাহান্নামের অধিবাসী হলেও তাদের শাস্তির স্তর ও তীব্রতা একরূপ নয়; কারো পাপ ব্যক্তিগত সীমায় আবদ্ধ, আবার কারো পাপ মানবসমাজে বিস্তৃত ফেতনা ও অন্যায়ের রূপে ছড়িয়ে পড়ে। তাই জান্নাতের সমৃদ্ধ স্তরসমূহ যেমন পুরস্কারের বৈচিত্র্য নির্দেশ করে, জাহান্নামের গভীর স্তরসমূহ তেমনি শাস্তির ন্যায্যতা ও অপরাধের আনুপাতিকতা প্রমাণ করে। অতএব, আল্লাহর রিজামুখী ও অসন্তুষ্টিমুখী দুই পথ কখনো সমপর্যায়ভুক্ত হতে পারে না; উদ্দেশ্য, কর্ম, নৈতিকতা ও চূড়ান্ত পরিণতি- প্রতিটি মাত্রাতেই তারা বিপরীত। আর আল্লাহ তাঁদের প্রতিটি কাজ গভীরভাবে দেখে থাকেন; দৃশ্যমান কিংবা অন্তরনিহিত কোনো আমলই তাঁর জ্ঞান থেকে আড়াল থাকে না, ফলে তাঁর বিচার সর্বদা পরিপূর্ণ ন্যায় ও প্রজ্ঞার উপর প্রতিষ্ঠিত।
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রতি এক অনুপম অনুগ্রহ করেছেন; তিনি তাদের মধ্য থেকেই এমন এক রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি বংশপরিচয়, ভাষা ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় তাদের অন্তর্ভূক্ত; ফলে তাঁর দাওয়াত ছিল সাধারণ নয়, বরং হৃদয়গম্য ও বাস্তবতা সংশ্লিষ্ট। তিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে সত্যের পরিচয় তুলে ধরেন, শিরক, জাহেলিয়াত ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকার থেকে তাদের অন্তরকে পবিত্র করেন, এবং তাদের কোরআনের মর্মবাণী ও সুন্নাহর পদ্ধতিগত জ্ঞান শিক্ষা দেন; এভাবে তিনি শুধু ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করেননি, বরং জ্ঞানের কাঠামো, নৈতিক চরিত্র ও সভ্যতাগত চেতনা গঠনের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ উম্মাহ নির্মাণ করেছেন। অথচ এই বার্তার পূর্বে তারাই ছিল বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও সামাজিক পশ্চাদপদতার গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত; যেখানে ধর্মবোধ বিবর্জিত, নৈতিক আদর্শ অস্পষ্ট ও মানবিক মূল্যবোধ প্রায় অনুপস্থিত ছিল। সুতরাং নবুওয়াতের এই দান কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৪২-১৪৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১; আল-মুনতাখাব: ১/১১৫) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَنْ يَغُلَّ﴾ ‘আত্মসাৎ করা’, আয়াতাংশটি আরবী শব্দ, যা ‘আল-গুলুল’ থেকে উৎকলিত হয়েছে। এর অর্থ হলো- গনীমত থেকে আত্মসাৎ করা মাল। এ সম্পর্কে একটি হাদীসে এসেছে:
لا تُقْبَلُ صَلاةٌ بغيرِ طُهُورٍ ولا صَدَقَةٌ مِن غُلُولٍ.
অর্থ: “পবিত্রতা ছাড়া সালাত কবুল করা হয় না এবং গনীমত থেকে আত্মসাৎ করা সম্পদের সদাকা কবুল করা হয় না” (সহীহ মুসলিম: ২২৪) । অনুরুপভাবে আয়াতে বলা হয়েছে: কোনো নবীর পক্ষে গনীমতের মাল আত্মসাৎ করা শোভন নয়। আর যে ব্যক্তি খিয়ানত করবে, কিয়ামতের দিন সে যা আত্মসাৎ করেছিল তা-ই বহন করে নিয়ে আসবে। এ কথার অর্থ হলো রাসুলুল্লাহর (সা.) উক্তি: যে ব্যক্তি ভেড়া, গরু, কাপড় বা অন্য যে কোনো কিছু গোপনে আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সে সেটাই নিজের কাঁধে বহন করে হাজির হবে। (গরীবুল কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১০২) ।
﴿رِضْوَانَ اللهِ﴾ ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি’, আয়াতে ‘মুসাব্বাব’ বা অর্জিত বিষয় উল্লেখ করে ‘সাবাব’ যার কারণে অর্জিত হয় উদ্দেশ্য করা হয়েছে। যেমন: ঈমান, সততা, নৈতিকতা এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ইত্যাদি। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৬২) ।
﴿دَرَجَاتٌ﴾ ‘বহুবিধ মর্যাদা’, আয়াতাংশে বুঝানো হয়েছে যে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য করে তাঁর বিধান অনুসরণ করে, তারা সকলেই জান্নাতের অধিবাসী হলেও তাদের মর্যাদা ও অবস্থান সমান নয়; কারণ তাদের ইখলাস, ত্যাগ, আনুগত্য ও আমলের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। তাই জান্নাতের সমৃদ্ধ স্তরসমূহ পুরস্কারের বৈচিত্র্য নির্দেশ করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৪৬) । এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে আটটি দরজা রেখেছেন।
﴿وَيُزَكِّيهِمْ﴾ ‘তিনি তাদেরকে পবিত্র করবেন’, তাদের কি এবং কার থেকে পবিত্র করবেন? তাফসীরকারকগণ বলেন: তাদের অন্তরকে শিরক, বিদয়াত ও কুচরিত্র থেকে পবিত্র করবেন। অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে মুমিনদের অন্তরকে শিরক, বিদয়াত, কুচরিত্র ইত্যাদির কলুষিতা থেকে পবিত্র করবেন। (আল-তাফসীর আল-মোয়াস্সার: ১/৭১) ।
﴿الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ﴾ ‘কিতাব এবং হিকমাহ’, আয়াতে ‘কিতাব’ দ্বারা কোরআন এবং ‘হিকমাহ’ দ্বারা সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে। (আল-তাফসীর আল-মোয়াস্সার: ১/৭১) ।
﴿مِنْ قَبْلُ﴾ ‘ইতঃপূর্বে’, আয়াতে ‘ইতঃপূর্বে’ দ্বারা রাসূলুল্লাহর (সা.) আগমণের পূর্বের সময়কে বুঝানো হয়েছে। (আল-তাফসীর আল-মোয়াস্সার: ১/৭১) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জিহাদের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং তাঁর পথে আত্মনিয়োগকারী যোদ্ধাদের মর্যাদা ও পরিণাম তুলে ধরেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতগুলোতে তিনি জিহাদের বিধানগুলো ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হলো- ‘গুলুল’ বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদে অবৈধ দখল থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ শুধুমাত্র আল্লাহর বিধি ও শরিয়াতের সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে; তা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা বা অন্যায়ভাবে দখল করা যাবে না। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৯) ।
১৬১ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন: আয়াতটি নাজিল হয়েছিল একটি লাল ফিতা প্রসঙ্গে। বিস্তারিত ঘটনা হলো- ফিতাটি বদর যুদ্ধের দিন হারিয়ে গিয়েছিল। কিছু লোক ভেবেছিল হয়তো রাসূলুল্লাহ (সা.) তা নিয়েছেন। তখন আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন, যা নবীর পবিত্র ও ন্যায়পরায়ণ চরিত্রকে নির্দেশ করে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৩) ।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৬১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি বিষয় আলোচনা করেছেন:
(ক) নবীদের চরিত্রে খেয়ানতের অবকাশ নেই, কোনো নবীর পক্ষে খেয়ানত করা সমীচীন নয়। বিশ্বাসঘাতকতা, লুটের মাল থেকে গোপনে কিছু নেওয়া বা ধোঁকা দেওয়ার মতো নীচ ও লোভনীয় কাজ নবীদের স্বভাব, চরিত্র ও দায়িত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তাঁদের এমন সকল হীনতার কাজ থেকে পবিত্র ও নিরাপদ রেখেছেন। কারণ নবুওত মানবসম্মানের সর্বোচ্চ মর্যাদা, যেখানে নৈতিক উৎকর্ষ, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। তাই এ উচ্চ মর্যাদাধারী ব্যক্তির পক্ষে এমন কোনো কাজ কল্পনাও করা যায় না যা চরিত্রহীনতা, স্বার্থপরতা বা পদমর্যাদার অবমাননার পরিচয় বহন করে। সারকথা হলো- নবীদের চরিত্রে খেয়ানতের অবকাশ নেই; তারা মানবতার জন্য আমানতদারিত্বের সর্বোচ্চ আদর্শ। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৯) ।
(খ) খেয়ানতকারী কিয়ামতের দিন খেয়ানতের বোঝা বহণ করে উঠবে, যে ব্যক্তি খেয়ানত করবে, কিয়ামতের দিন সে যে জিনিসে খেয়ানত করেছে ঠিক সেটাই নিজের কাঁধে বহন করে হাজির হবে। অর্থাৎ দুনিয়ায় যে সম্পদ, মাল বা আমানত সে বেআইনিভাবে নিজের জন্য নিয়ে নিয়েছে, পরকালে সেই জিনিসই তার অপরাধের প্রকাশ্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে এবং তা তার লজ্জা, ভয়াবহতা ও শাস্তি বাড়িয়ে দেবে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: কেউ যেন কিয়ামতের দিন তার কাধে উট, ঘোড়া, মূল্যবান কাপড়, বা স্বর্ণ-রুপার বোঝা নিয়ে না আসে এবং সাহায্য প্রার্থনা না করে, কারণ সেই দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) তার পক্ষ্যে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না; যে ব্যাপারে দুনিয়াতেই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৯) ।
(গ) কোন ধরণের যুলম ছাড়া খেয়ানতের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে, আয়াতের শেষাংশে খেয়ানতের ভয়াবহতাকে গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে: খেয়ানতকারী যখন কিয়ামতের দিন তার আত্মসাৎ করা সম্পদ নিজের সামনে প্রতিয়মান দেখবে এবং তা বহন অবস্থায় উপস্থিত হবে, তখন তাকে তার সেই অপরাধের বিনিময়ে সম্পূর্ণ শাস্তি প্রদান করা হবে; তার কর্মের হিসাব থেকে কিছুই কমিয়ে দেওয়া হবে না, আবার বাড়িয়ে অন্যায়ও করা হবে না। এ সম্পর্কে কোরআনের আরেক আয়াতে এসেছে:
﴿وَوُضِعَ الْكِتابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ، وَيَقُولُونَ يا وَيْلَتَنا مالِ هذَا الْكِتابِ لا يُغادِرُ صَغِيرَةً وَلا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصاها؟ وَوَجَدُوا ما عَمِلُوا حاضِراً وَلا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَداً﴾ [سورة الكهف: ৪৯].
অর্থ: “কিয়ামতের দিন কর্মের দলিল বা আমলনামা সামনে রাখা হবে, তখন অপরাধীরা আতঙ্কে কাঁপতে থাকবে এবং বলবে, “হায় আফসোস! এই কিতাব তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; সবই গুনে রেখেছে!” তখন তারা নিজেদের সকল আমল স্পষ্ট অবস্থায় দেখতে পাবে, এবং আল্লাহ কারও প্রতি এক বিন্দুও যুলম করবেন না” (সূরাতু আল-কাহ্ফ: ৪৯) । (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২০) ।
(ঘ) গনীমতের মাল খেয়ানত করার হুকুম, উল্লেখিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের আগে নিজের জন্য গোপনে আত্মসাৎ করা ইসলামের দৃষ্টিতে কবীরা বা বড় গুনাহের অন্তর্ভূক্ত। তাই কেউ যদি গনীমত থেকে চুরি বা আত্মসাৎ করে, তা দেখা মাত্রই তার সম্পর্কে জানানো কর্তব্য; কারণ এই খবর প্রকাশের ফলে যতো ঝুঁকি বা অস্বস্তি কল্পনা করা হয়, তা জনকল্যাণের তুলনায় নগণ্য। যদি গনীমত থেকে খেয়ানতকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে জিহাদের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যাবে এবং লোকেরা আল্লাহর জন্য নয়, বরং সম্পদ লুটের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে অন্যদের দায়িত্ব হলো খেয়ানতকারীকে জানিয়ে দেওয়া, আর শাসকের দায়িত্ব হলো শরীয়ত অনুযায়ী সে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কতিপয় ফকীহ বলেন: খেয়ানতকারী ব্যক্তির সামগ্রী পুড়িয়ে ফেলা যেতে পারে; তবে তার অস্ত্র এতে অন্তর্ভূক্ত নয়। একইভাবে, শাসক চাইলে তাকে গনীমত বণ্টন থেকে বঞ্চিত করতেও পারেন। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু উসাইমিন: ২৫/৩৭৫-৩৭৬) ।
২। ১৬২ নং আয়াত থেকে প্রতিয়মান হয় যে, অবাধ্য ও আনুগত্যশীল মানুষের পরিণতি কখনো সমান হতে পারে না, এ কথা শুধু ধর্মীয় সত্যের প্রতিধ্বনি নয়, এটি ন্যায়ের শাশ্বত দর্শনও। মানুষের প্রতিটি কাজ যেন অদৃশ্য এক ছায়া, যা তার পিছু পিছু চলে এবং শেষ পর্যন্ত নিজ রূপেই তার সামনে উদ্ভাসিত হয়। পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক মানুষ তার কর্মের পূর্ণ প্রতিদান পাবে; আর অত্র আয়াতে এই নীতিটি যেন আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, সৎ ও অসৎ পথ কখনোই একই গন্তব্যে পৌঁছায় না। আনুগত্য যে আলো বেছে নেয়, অবাধ্যতা তা-ই অন্ধকারে হারায়; একজন আত্মাকে শুদ্ধ করে উচ্চতায় পৌঁছায়, অন্যজন অপরাধের ভারে নিজেই নিজেকে নীচে নামিয়ে দেয়। দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি সুবিচারের এক অনন্ত নিয়ম, মানুষ যে বীজ বপন করে, সে তারই ফল ভোগ করে; আর সেই ফলাফলেই নির্ধারিত হয় তার ভাগ্য, তার গন্তব্য, তার সত্যিকারের পরিচয়।
সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা মানুষের জন্য যেমন রয়েছে শান্তির প্রতিশ্রæতি, তেমনি অপরাধ ও অবাধ্যতার পথে অটল মানুষের পরিণতি ভয়াবহই হতে বাধ্য। তাই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন: “তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর সেটিই নিকৃষ্টতম আবাস”। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তোষকে নিজের ভাগ্য বানায়, সে শেষ পর্যন্ত এমন এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, যা ভয়াবহ, অপমানজনক এবং যার শোকাবহ ভার বহন করার শক্তি কারো নেই। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২১) । এর অনুরূপ অন্যান্য আয়াতেও আল্লাহ বলেছেন:
﴿أَفَمَنْ كانَ مُؤْمِناً كَمَنْ كانَ فاسِقاً لا يَسْتَوُونَ﴾ [سورة السجدة: ১৮].
অর্থ: “যে মুমিন, সে কি সেই ব্যক্তির মতো যে ফাসিক? তারা কখনোই সমান নয়” (সূরাতু আস-সাজদাহ: ১৮) । আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ، أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ﴾ [سورة ص: ২৮].
অর্থ: “আমরা কি সৎকর্মশীলদেরকে পৃথিবীতে ফেতনা ছড়ানো লোকদের মতো করে রাখবো? কিংবা মুত্তাকীদেরকে পাপীদের মতো গণ্য করবো?” (সূরাতু স্বাদ: ২৮) ।
৩। ১৬৩ নং আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে,
(ক) মানুষ আল্লাহর কাছে সমমর্যাদার নয়, মানুষ আল্লাহর কাছে একরূপ নয়; তারা যেন এক সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপ, যাদের অবস্থান উচ্চতর বা নিম্নতর হয় তাদের অন্দর, কর্ম ও নৈতিক অভিযাত্রার ওপর ভিত্তি করে। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসরণ করে আলো-ভরা পথ ধরে এগিয়ে যায়, আর কেউ নিজের বিপথগামিতায় আল্লাহর ক্রোধকে আহ্বান করে অন্ধকারের দিকে নামতে থাকে। কিয়ামতের দিনে যখন প্রত্যেক মানুষ উন্মুক্ত প্রান্তরের মতো প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে, তখন কোনো অন্তরে লুকানো সত্য আর আড়াল থাকবে না। সেদিন গম্ভীর মহিমায় ধ্বনিত হবে ঘোষণা: “আজ কার হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা? একমাত্র আল্লাহর, যিনি এক ও পরাক্রমশালী”। সার্বিক সত্য হলো- মানুষ যেমন দুনিয়ায় জ্ঞান, চরিত্র, নৈতিকতা এবং আত্মশুদ্ধির পথে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে বিচরণ করে, তেমনি তাদের পরিণতির রূপও আল্লাহর কাছে স্তর-স্তরে বিন্যস্ত। এই স্তরগুলো কোনো কৃত্রিম বিচার নয়; বরং আত্মার স্বাভাবিক গতি, যারা সৎকর্মে নিজেকে উন্নত করে, তাদের আত্মা আলোয় ভরপুর উচ্চ স্তরে উঠে যায়, আর যারা অসৎকর্মে নিমজ্জিত হয়, তাদের আত্মা তলিয়ে যায় নিকৃষ্ট গভীরতায়। সর্বোচ্চ মর্যাদা ‘রফীকুল আ’লা’ থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিচের স্তর, সবই মানব-আত্মার নৈতিক যাত্রাপথের স্বাভাবিক পরিণতি, যা আল্লাহর ন্যায়পরায়ণ বিধানকে মহিমায় উজ্জ্বল করে তোলে।
(খ) আল্লাহ তাদের কাজকর্ম গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন, মানুষের কোনো আমলই তাঁর নিকট গোপন থাকে না। মানুষের প্রতিটি কাজ আত্মাকে হয় পবিত্রতার দিকে নিয়ে যায়, নয়তো অন্ধকারের দিকে টেনে নামায়। যে আত্মা সৎকর্মে নিজেকে শুদ্ধ করে, সে সফলতার শিখরে ওঠে; আর যে আত্মা পাপাচারে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে, সে পতনের অতল আঁধারে তলিয়ে যায়, যেমন বলা হয়েছে: “নিশ্চয় সফল হলো সে, যে আত্মাকে পবিত্র করে; আর ব্যর্থ হলো সে, যে তাকে কলুষিত করে”। আত্মার এসব উচ্চ-নীচ স্তর কেবল সেই মহাসত্তাই জানেন, যিনি প্রতিটি বিষয়ের জ্ঞান দিয়ে পরিবেষ্টিত। কারণ তিনিই দেখেন মানুষের কাজের অন্তরস্থ প্রভাব, আত্মায় তার সূ² কম্পন, এবং হৃদয়ের গভীরে দোলা দেওয়া অদৃশ্য চিন্তা-ভাবনার ঢেউ। মানুষের বাহ্যিক আচরণ হোক বা অন্তরের নিঃশব্দ আন্দোলন, সবকিছুই তাঁর কাছে স্পষ্ট, আর সেই জ্ঞানই নির্ধারণ করে মানুষের চূড়ান্ত সৌভাগ্য কিংবা চূড়ান্ত পতন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২২) ।
৪। ১৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা দুইটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন:
(ক) রাসূলুল্লাহর (সা.) মতো উচ্চ মানের মহামানবকে গনিমতের মাল আত্মসাৎ এর সন্দেহ পোষণ সমিচীন নয়, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর যে বিরাট অনুগ্রহ দান করেছেন, তা হলো- তাদের মধ্য থেকেই এক মহান রসূলকে পাঠানো। তিনি এমন ব্যক্তি, যাকে তারা জন্ম থেকে চিনেছে, যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল স্বচ্ছ, সত্যবাদী, আমানতদার ও দুনিয়ার প্রতি বিমুখ। এমন এক ব্যক্তির উপর বিশ্বাস না রাখার কোনো কারণই নেই। আল্লাহ তাকে চারটি মহৎ দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন, প্রত্যেকটি দায়িত্বই মানুষের জন্য এক অতুলনীয় দয়া।
প্রথমত, তিনি তাদেরই মধ্য থেকে আগত; আরবরা তাঁর ভাষা, আচার, পরিবেশ সবই জানত। ফলে তাঁর দাওয়াত বুঝতে, গ্রহণ করতে এবং তাঁর সততা প্রত্যক্ষ করতে তারা ছিল সবচেয়ে যোগ্য। এ ছিল তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদা। আবু তালিব রাসূলুল্লাহর (সা.) চরিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন: কুরাইশের কোনো যুবকই তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না, তাঁর ভেতর এমন মহত্ত¡ লুকিয়ে আছে যা ভবিষ্যতে উদ্ভাসিত হবেই।
দ্বিতীয়ত, তিনি আল্লাহর আয়াতসমূহ মানুষের কাছে পাঠ করেন, যা আসমান-জমিন, দিন-রাত, সূর্য-চাঁদ, পাহাড়-প্রান্তর সব কিছুকে ইশারায় রূপ দেয়; মানুষের দৃষ্টি খুলে দেয় সৃষ্টিজগতের গভীর সত্যের দিকে। এ আয়াতগুলোতে আছে তাওহীদের আলোকরেখা এবং হৃদয়কে জাগ্রত করার শক্তি।
তৃতীয়ত, তিনি মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব সমাজ যেখানে ছিল ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কার, মূর্তিপূজা, অযৌক্তিক ভয় ও বিভ্রান্তির শৃঙ্খল, রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই অচলায়তন ভেঙে দেন। তিনি শিখালেন- কার্যকারণ সম্পর্কের পেছনে লুকানো শক্তি কোনো মূর্তি বা তারা নয়; একমাত্র আল্লাহই সবকিছুর নিয়ন্তা। মানুষকে কল্পনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সত্যের স্বাধীনতায় পৌঁছে দিলেন।
চতুর্থত, তিনি শিক্ষা দিলেন কিতাব ও হিকমাহ। কিতাবের শিক্ষা তাদেরকে অক্ষরজ্ঞানহীনতা থেকে মুক্ত করে জ্ঞানের দিগন্ত পৌঁছে দিল। ওহি লেখার জন্য লেখক নিযুক্ত হল, চিঠির মাধ্যমে রাজারাজড়াদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানানো হলো; এভাবেই আরবরা জ্ঞান-সভ্যতার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠল। আর হিকমাহ তাদের বুঝাল বিষয়াদির গভীরতা, শারিয়তের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা, বিচারের সৌন্দর্য ও যুক্তির আলো, যা তাদেরকে ন্যায়, সত্য ও প্রমাণের পথে প্রশিক্ষিত করল। সব মিলিয়ে কিতাবের শিক্ষা হলো শরীয়তের বহিরাবরণ বোঝা, আর হিকমাহর শিক্ষা হলো তার অন্তরস্থ রহস্য, উদ্দেশ্য ও কল্যাণ আবিষ্কার করা।
(খ) যে নবীর দাওয়াতের বরকতে তারা বহু বছরের গোমরাহী, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের জীবন থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক পথে ফিরে এসেছে, সেই নবী সম্পর্কে খিয়ানত বা অসততার ধারণা করা মোটেও যুক্তিসংগত নয়। যিনি তাদের চরিত্র গঠন করেছেন, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শিখিয়েছেন, তাওহীদের আলো দেখিয়েছেন, তাঁর উপর খিয়ানের অভিযোগ আরোপ করা মানেই নিজের উপকারকে না চিনতে পারা। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ মনে করিয়ে দেন যে, নবী আসার আগে তারা ছিল স্পষ্ট ভ্রান্তিতে, বিভ্রান্ত ও অন্ধকারের মধ্যে ডুবে থাকা মানুষের মতো। তারা জানত না সঠিক পথ কি, সত্য জ্ঞান কী, বা কোনটি প্রকৃত উপাস্য। সেই কঠিন অন্ধকারে আল্লাহ তাদের জন্য আলো পাঠালেন, এই আলোই হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর আনা হেদায়াত। ফলে এই নবুয়ত ছিল তাদের জন্য এক বিশাল দয়া, অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে সত্যের আলোয় পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য নেয়ামত। (তাফসীর আল-মারাগী: ১২২-১২৪) ।
আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) অন্যের আমানত, দায়িত্ব ও বিশ্বাস সঠিকভাবে রক্ষা করা এবং কোনো প্রতারণা না করা।
(খ) প্রতিটি কাজে আল্লাহকে রাজি করানোর উদ্দেশ্যে চলা এবং গুনাহের বিষয়ে সতর্ক থাকা।
(গ) ইবাদত, নেক আমল ও ভালো চরিত্রের মাধ্যমে জান্নাতে উঁচু দরজা লাভে চেষ্টা করা।
(ঘ) রাসূলুল্লাহর (সা.) শিক্ষা ও আচরণকে নিজের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবে অনুসরণ করা।
(ঙ) অহংকার, রাগ, হিংসা, কুসংস্কার ও ভুল বিশ্বাস দূর করে হৃদয়কে পরিষ্কার রাখা।
(চ) কোরআনের নির্দেশনা ও নবীর বাণী জেনে সেগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগানো।
(ছ) হেদায়াত পাওয়ার জন্য আল্লাহর প্রতি অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও সে অনুযায়ী জীবন গঠন করা।
