﴿وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُمْ بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُمْ مِنْ بَعْدِ مَا أَرَاكُمْ مَا تُحِبُّونَ مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنْكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ (152) إِذْ تُصْعِدُونَ وَلَا تَلْوُونَ عَلَى أَحَدٍ وَالرَّسُولُ يَدْعُوكُمْ فِي أُخْرَاكُمْ فَأَثَابَكُمْ غَمًّا بِغَمٍّ لِكَيْلَا تَحْزَنُوا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا مَا أَصَابَكُمْ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ (153)﴾ [سورة آل عمران: 152-153].
আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা: আনুগত্য, ধৈর্য, আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা।
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১৫২। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের সাথে তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছিলেন, যখন তোমরা তাদেরকে তাঁর নির্দেশে হত্যা করেছিলে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়েছিলে এবং রাসূলুল্লাহর নির্দেশকে ঘিরে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলে এবং তোমাদেরকে বিজয় দেখানোর পরে তোমরা অবাধ্য হলে, যা তোমরা ভালোবাসতে। তোমাদের মধ্যে কেউ চেয়েছিলে দুনিয়া এবং তোমাদের কেউ চেয়েছিলে আখেরাত। অতঃপর তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন, তবুও কিন্তু তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন; বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল।
১৫৩। (স্মরণ করো) যখন তোমরা পাহাড়ের উপর দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলে এবং কারো প্রতি ফিরে দেখছিলে না, আর রাসূলুল্লাহ তোমাদেরকে পিছন থেকে ডাকছিলে, ফলে তিনি তোমাদেরকে দিলেন দুঃখের উপর দুঃখ, যাতে তোমরা তোমাদের হারের কারণে দুঃখিত না হও এবং তোমাদের আপদের কারণে দুঃখিত না হও; আর যা তোমরা করছো তা সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত আছেন ।
আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের যে বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন, তা শুরুতেই বাস্তবায়িত হয়েছিল। আল্লাহর অনুমতিতে তারা শত্রুসেনাকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছিল। কিন্তু পরে তারা দুর্বলতা প্রদর্শন করল, মনোবল হারালো এবং পরস্পরের মধ্যে মতভেদে জড়িয়ে পড়ল-নির্ধারিত অবস্থানে অটল থাকবে, না কি গনিমত সংগ্রহে অগ্রসর হবে। এ বিভ্রান্তির ফলে তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) কঠোর নির্দেশ অমান্য করল যে, “কোনো অবস্থাতেই নিজ নিজ স্থান ত্যাগ করা যাবে না”। এরই পরিণতিতে প্রত্যক্ষ বিজয় দেখে নেওয়ার পরও তারা পরাজয়ের মুখোমুখি হলো। তখন পরিষ্কার হয়ে গেল- তাদের একাংশ দুনিয়ার গনিমতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, আর অপরাংশ পরকালীন প্রতিদান কামনা করেছিল। এরপর আল্লাহ তাদেরকে শত্রুর মোকাবিলা থেকে ফিরিয়ে দিলেন, যেন তিনি তাদের পরীক্ষা নিতে পারেন। তাদের অনুতাপ ও তওবা তিনি অবগত আছেন, এবং তিনি তাদের ক্ষমাও করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অশেষ অনুগ্রহশীল।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সেই বিস্ময়কর ও ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, যখন তারা শত্রুভীতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটে উঠছিল এবং পিছনে ফিরে তাকানোর অবকাশও ছিল না। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) তখনো অবিচলভাবে ময়দানে অবস্থান করে পেছন থেকে ডাক দিচ্ছিলেন- “হে আল্লাহর বান্দারা, আমার দিকে ফিরে আসো”। কিন্তু আতঙ্কে তারা তাঁর আহ্বান শুনতেও পারেনি, তাঁর দিকে তাকাতেও সক্ষম হয়নি। এর ফলস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর দুঃখ, কষ্ট ও গভীর বিষাদের বোঝা নাজিল করলেন, যাতে তারা হারানো বিজয়, গনিমত কিংবা পরাজয়ের আঘাতকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত হতাশায় না ভোগে। আর তাদের সকল কার্যকলাপ সম্পর্কে আল্লাহ সবটুকুই অবগত, তাঁর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৩-৩৯৫; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২৬-১২৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৯; আল-মুনতাখাব: ১/১১২) ।
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿وَعْدَهُ﴾ ‘তাঁর প্রতিশ্রæতি’, অর্থাৎ, তিনি তাঁর রাসূলের (সা.) মাধ্যমে যে প্রতিশ্রæতি মুসলমানদেরক দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেছেন, যেমন তিনি তীরন্দাজদের বলেছিলেন: “তোমরা নিজেদের স্থানে অটল থাকো; তোমরা অবস্থান ধরে রাখলে আমরা বিজয়ী হব” (সহীহ আল-বুখারী: ৩০৩৯), (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৫২) । আল্লাহ তায়ালা সেই প্রতিশ্রতিই বাস্তবায়ন করেছিলেন। যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানরা স্পষ্টভাবে জয়ের মুখ দেখতে পেয়েছিল। কারণ তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মেনেছিল এবং নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছিল। অর্থাৎ, আল্লাহর সাহায্য তাদের সঙ্গে ছিল যতক্ষণ তারা আনুগত্য ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিল।
﴿إِذْ تَحُسُّونَهُمْ بِإِذْنِهِ﴾ “যখন তোমরা আল্লাহর অনুমতিতে তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করছিলে”, এখানে تحسّونهم শব্দটি শত্রুকে নির্মূল, নিধন ও শক্তিহীন করে দেওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আরবিতে বলা হয় “سنةٌ حسوس” অর্থাৎ এমন এক ভয়াবহ বছর যা সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে। তেমনি “جرادٌ محسوس” বলতে বোঝায় এমন পঙ্গপাল যা শীতের তীব্রতায় বা বরফে সম্পূর্ণভাবে মারা গেছে। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০১) । এ উভয় উদাহরণ থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আয়াতে ব্যবহৃত تحسّونهم শব্দটি পূর্ণ দমন ও সর্বাত্মক ধ্বংস বোঝাতে এসেছে, অর্থাৎ মুসলমানরা শত্রুকে এমনভাবে আঘাত করছিল যে তারা টিকে থাকার শক্তিই হারিয়ে ফেলছিল।
﴿وَتَنَازَعْتُمْ فِي الأَمْر﴾ “তোমরা সেই বিষয়ে পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে পড়লে”, অর্থাৎ, উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে স্থানে তোমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই অবস্থানে থাকবে কি না এ নিয়ে তোমরা নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি করেছিলে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৫২) ।
﴿مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيا﴾ “তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চাইছিল”, এরা সেই তীরন্দাজরা, যারা উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে স্থানে তাদের অবস্থান করতে বলেছিলেন, সেই স্থান ছেড়ে গনিমত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিচে নেমে গিয়েছিল। (তাফসীল আল-মারাগী: ১/১০১) ।
﴿وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ﴾ “আর তোমাদের মধ্যে কেউ আখিরাত কামনা করছিল”, এরা সেই সাহাবীগণ, যারা আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থানে অটল ছিলেন। শুরুতে তীরন্দাজদের সংখ্যা ছিল প্রায় পঞ্চাশ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় দশজন তাঁর সঙ্গে স্থির থেকেছিলেন। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গেও প্রায় ত্রিশজন সাহাবী শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে ময়দানে অবিচল ছিলেন। (তাফসীল আল-মারাগী: ১/১০১) ।
﴿إِذْ تُصْعِدُونَ﴾ “যখন তোমরা উচু স্থানে উঠেছিলে”, আয়াতে বোঝানো হচ্ছে, মুসলমানরা যুদ্ধে পরাজয়ের ভয় বা ভীতির কারণে দ্রæত পাহাড় বা উঁচু স্থানে উঠেছিল। এখানে أصعد শব্দের ব্যবহার নির্দেশ করছে ‘দ্রæত উচ্চ স্থানে ওঠা’ বা ‘পরাজয়ের চাপ থেকে দূরে সরে যাওয়া’। এটি এমন একটি পরিস্থিতি বোঝাচ্ছে যখন তারা শত্রুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। সংক্ষেপে, এটি মুসলিমদের সেই মুহূর্তের দুর্বলতা ও অস্থিরতা প্রদর্শন করছে, যখন তারা আল্লাহর প্রতি স্থির বিশ্বাস না রাখার কারণে আত্মনিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০১) ।
﴿فَأَثابَكُمْ غَمًّا بِغَمٍّ﴾ “আল্লাহ তাদেরকে এক ধরনের দুঃখের সঙ্গে আরেক ধরনের দুঃখ প্রদান করলেন”, এখানে প্রথম দুঃখ দ্বারা বোঝাচ্ছে শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাপ্ত ক্ষতি, যেমন আহত হওয়া বা প্রাণহানি। আর দ্বিতীয় দুঃখ দ্বারা বোঝাচ্ছে সেই খবর যে রাসূলুল্লাহ (সা.) আহত বা নিহত হয়েছেন, যা তাদের প্রথম দুঃখের ভাবকে বিস্মৃত বা আরও জটিল করে তোলে। সংক্ষেপে, এটি মুসলিমদের জন্য এক দুঃখের ক্রমকে প্রকাশ করছে, যা তাদের পরীক্ষার অংশ ছিল এবং আল্লাহর বিচক্ষণ পরিচালনার মাধ্যমে তাদের মনোবল ও ধৈর্যের পরীক্ষা করা হয়েছিল। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০১) ।
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের ঘটনার প্রেক্ষাপটেই এই আয়াতদ্বয়। আল্লাহ তায়ালা পূর্বের আয়াতে বিশ্বাসীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তারা কখনো কাফেরদের কাওয়াশ বা পরামর্শের প্রতি আনুগত্য করবে না। পাশাপাশি, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন যে তিনি কাফেরদের হৃদয়ে ভয় সৃষ্টি করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হলো: আবু সফিয়ান মক্কা থেকে মদীনায় আক্রমণ করতে চাইলেও তার ও তার অনুসারীদের হৃদয়ে ভয় নেমে আসায় তারা মক্কায় ফিরে গেল। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুসলমানরা হামরার আসল স্থান থেকে ফিরে আসলেও আবু সফিয়ান ও তার বাহিনী তাদের সামনে আসেনি। আর উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ মুসলমানদেরকে স্মরণ করাচ্ছেন যে তিনি তাদের প্রতিশ্রæতি পূর্ণ করেছেন এবং তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছেন। (আইসার আল-তাফাসীর, আবু বকর আল-জাযায়েরী: ৩৯৩) ।
১৫২ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
মুহাম্মদ ইবন কাব আল-কুরযী বর্ণনা করেছেন, উহুদ যুদ্ধে হারের পর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ফিরলেন, তখন কিছু সাহাবী বললেন: “আমাদের কী হয়েছে? আল্লাহ আমাদের বিজয় প্রদানের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন”। এ সময় আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করে তাদের স্মরণ করালেন যে তিনি তাঁর প্রতিশ্রæতি সত্যি করেছেন।
এই আয়াত বিশেষভাবে তীরন্দাজদের জন্য প্রযোজ্য, যারা উহুদ যুদ্ধে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করেছিল এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে আচরণ করেছিল। এছাড়া, আয়াতের শেষে আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে জানালেন যে, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়ার লাভের জন্য কাজ করতে চায়, আবার কেউ আখিরাতের প্রতিদান কামনা করে। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।
আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। ১৫২ নং আয়াত থেকে চারটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) উহুদ যুদ্ধে আল্লাহর প্রতিশ্রæত বিজয়ের আলো দেখতে না দেখতেই নিভে গেল, আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের প্রতিশ্রæতি পূর্ণ করেছিলেন। যুদ্ধের প্রথম ভাগে মুসলমানরা আল্লাহর ইচ্ছায় শত্রুকে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল এবং বিজয় নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই তিনটি কারণে বিজয় থেমে গিয়ে পরাজয় নেমে এসেছিল:
(ক) মুসলিম বাহিনীর কিছু অংশ মনোবল হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
(খ) তাদের কিছু অংশ শত্রæ বাহিনীকে ভয় পেয়েছিল।
(গ) তিরন্দাজদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ নিয়ে মতবিরোধ করেছিল।
(খ) ভীত মুসলিম বাহিনীর প্রতি ভৎসনা প্রকাশ, আয়াতে যে ভঙ্গিতে কথা বলা হয়েছে, তাতে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের প্রতি একটি তিরস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কারণ যুদ্ধের প্রথম অংশে তারা স্পষ্টভাবে বিজয়ের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিল, শত্রু পিছু হটছিল, মুসলমানরা শক্তিশালী অবস্থানে ছিল, এবং বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় তাদের উচিত ছিল দৃঢ়ভাবে স্থির থাকা, রাসূলুল্লাহর (সা.) আদেশ মানা এবং নিজেদের দায়িত্বে অটল থাকা। কিন্তু তারা গনিমতের প্রলোভনে পড়ে স্থিরতা হারিয়ে ফেলেছিল এবং নির্দেশ অমান্য করেছিল। তারা কেমন যেন বিজয় স্বচক্ষে দেখেও তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
(গ) রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ পালনে মতবিরোধের কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) উহুদ যুদ্ধে তিরন্দাজদেরকে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ঐ স্থান ত্যাগ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু যখন তারা মুসলমানদের বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত দেখছিলেন, তখন দুইটি কারণে তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছিল:
(ক) একদল বিজয় নিশ্চিত মনে করে গনীমত সংগ্রহকে প্রধান্য দিয়ে স্থান ত্যাগ করছিল।
(খ) আরেক দল রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মান্য করাকে প্রধান্য দিয়ে অবস্থান করছিল।
(ঘ) মুসলিম বাহিনীকে ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রদানের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করা, আল্লাহ তায়ালা জানান- তিনি তাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন পরীক্ষাস্বরূপ, ঈমান যাচাই করার জন্য। অবশেষে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেছেন, কারণ তারা অনুতপ্ত হয়েছিল। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল; সামান্য সংখ্যায় থাকলেও তিনি তাদের ধ্বংস করেননি, বরং শিক্ষা ও তওবার সুযোগ দিয়েছেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২৭-১২৮) ।
২। ১৫৩ নং আয়াতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়-
(ক) প্রচন্ড আতঙ্কের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে কাফেরদের থেকে রক্ষা করা একটি অনুগ্রহ, উহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা ভয় ও আতঙ্কে পিছু হটে পাহাড়ের দিকে দৌড়াচ্ছিল। আতঙ্ক এতটাই প্রবল ছিল যে তারা কাউকে পিছনে ফিরে দেখছিল না। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ডাকছিলেন: “হে আল্লাহর বান্দারা, আমার দিকে ফিরে আসো! আমি আল্লাহর রাসূল। যে ফিরে আসবে, তার জন্য জান্নাত”। এ অবস্থায় তাদেরকে কাফেরদের হাত থেকে রক্ষা করা তাদের প্রতি একটি বড় অনুগ্রহ ছিল।
(খ) উহুদে যুদ্ধসৃংখলা ভঙ্গকারীদের জন্য আল্লাহর পরীক্ষা ছিল দ্বিমাত্রিক, আল্লাহ তায়ালা দুই ধরণের দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে পরীক্ষা করেছেন:
(ক) ভয়, পরাজয়, গনিমত হারানো, এবং বহু সাহাবীর শাহাদাত বরণ।
(খ) রাসূলুল্লাহর (সা.) আহত হওয়া ওর বিপদের মুখে পড়া, যা তাদের মনে সবচেয়ে গভীর আঘাত হানে।
সয়ং আল্লাহ তায়ালা এই পরীক্ষার দুইটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছেন:
(ক) মুসলমানরা হারানো গনিমত বা যুদ্ধক্ষতির জন্য অতিরিক্ত দুঃখ না করে, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
(খ) যে আঘাত, কষ্ট ও আতঙ্ক তারা পেয়েছে সেগুলো নিয়ে ভেঙ্গে না পড়ে, বরং নতুন শক্তি সঞ্চয় করবে। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৩৯২) । এর বেশী অতীত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হতে থাকলে তাদের মর্যাদা ও মনোবল বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আয়াতদ্বয় থেকে করণীয় (আমল):
(ক) আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য পোষণ করা, মুমিনের প্রথম দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অবিচলভাবে মানা।
(খ) ধৈর্য, স্থিরতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, পরিস্থিতি কঠিন হোক বা বিজয়ের লক্ষণ স্পষ্ট হোক, মুমিনকে ভয়-চাপ-উত্তেজনায় বিচলিত না হয়ে দায়িত্বস্থানে দৃঢ় থেকে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
(গ) দুনিয়ার লোভ থেকে বিরত থাকা, উহুদের শিক্ষায় স্পষ্ট- দুনিয়ার লোভ যেন কখনোই আনুগত্য ও ঈমানদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
(ঘ) পরীক্ষায় ধৈর্য ও ইতিবাচক শিক্ষা নেওয়া, বিপদ ও পরাজয় মুমিনের জন্য হতাশার কারণ নয়; বরং তাকে সংশোধন, আত্মসমালোচনা এবং শক্তিশালী হওয়ার শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা।
(ঙ) আন্তরিক তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর উপর ভরসা, ভুল হলে তৎক্ষণাৎ তওবা করে আল্লাহর দয়া ও সাহায্যের উপর ভরসা রেখে মনোবল অটুট রাখাই মুমিনের প্রকৃত শক্তি।
