Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৪৯-১৫১) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: কাফেরদের আনুগত্য নয়, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাই মূল শক্তি।

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ (149) بَلِ اللَّهُ مَوْلَاكُمْ وَهُوَ خَيْرُ النَّاصِرِينَ (150) سَنُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ بِمَا أَشْرَكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَمَأْوَاهُمُ النَّارُ وَبِئْسَ مَثْوَى الظَّالِمِينَ (151)﴾ [سورة آل عمران: 149-151].

আলোচ্যবিষয়: কাফেরদের আনুগত্য নয়, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাই মূল শক্তি।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৪৯। হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা কাফেরদের অনুগত হও, তাহলে তারা তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিবে তোমাদের পূর্বাবস্থায়; ফলে তোমরা হয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্তপড়বে।
১৫০। বরং আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক, এবং তিনিই উত্তম সাহায্যকারী।
১৫১। অচিরেই আমি কাফেরদের ক্বলবে আতঙ্ক ঢেলে দিবো, আল্লাহর সাথে,তাদের শরীক করার কারণে যে বিষয়ে তিনি কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আর তাদের আশ্রয়স্থল হলো জাহান্নাম, এবং যালিমদের আবাসস্থল কতইনা নিকৃষ্ট।

আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
উহুদের যুদ্ধ ছিল ঈমান ও কুফরের চ‚ড়ান্ত পরীক্ষার ময়দান। যখন মুসলমানরা সাময়িক বিপর্যয়ে পতিত হলো, তখন মুনাফিকদের অন্তরে রোগ প্রকাশ পেল। তারা বিদ্রƒপভরে বলল: “ফিরে যাও তোমাদের পুরনো ধর্মে, যদি মুহাম্মদ (সা.) সত্য নবী হতেন, তবে নিহত হতেন না”। এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উদ্দেশে দৃপ্ত আহ্বান জানালেন- অবিশ্বাসীদের কথায় বা প্রস্তাবে যেন তারা প্রতারিত না হয়; তাদের উপদেশের মুখোশে লুকিয়ে থাকে ধোঁকা ও ঈমানহানির বিষ। মুমিনের মর্যাদা কাফেরের অনুসরণে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশে দৃঢ় থাকার মধ্যেই তার প্রকৃত সাফল্য।
এরপর আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মনে দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করলেন- যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকারী ও সহায়ক, তিনি ছাড়া আর কেউ তাদের জন্য আশ্রয় নয়। সুতরাং কাফেরদের বন্ধুত্ব বা সাহায্যের আশায় তারা যেন নিজেদেরকে ছোট না করে। বিজয়ের পথ তাদের আনুগত্যে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্যে নিহিত। কারণ আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী, আর তাঁর সাহায্যই মুমিনের প্রকৃত শক্তি ও সম্মানের উৎস।
যখন মুমিনরা আল্লাহর আদেশ মেনে কাফেরদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকল, তখন আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সাথে কাফেরদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করার প্রতিশ্রæতি দিলেন। তাদের হৃদয়ে এমন ভীতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হবে যে, তারা মুমিনদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হারাবে। এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয়ের দুয়ার খুলে যাবে। কারণ তারা আল্লাহর সঙ্গে এমন উপাস্যদের শরিক করেছে, যাদের উপাসনার কোনো প্রমাণ বা অনুমতি আল্লাহ দেননি। আর এই শিরকই তাদের ভয়াবহ পরিণতি নির্ধারণ করেছে। তারা অন্যায় ও কুফরে লিপ্ত থাকার কারণে জাহান্নামের অধিবাসী হবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৮৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২০-১২১; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৯; আল-মুনতাখাব: ১/১১১-১১২) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿الَّذِينَ كَفَرُوا﴾ ‘যারা কুফরী করেছে’, আয়াতাংশ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এ বিষয়ে তাফসীরকারকদের কয়েকটি মত পাওয়া যায়:
(ক) “যারা কুফরি করেছে” বলতে আরবের মুশরিকদের বোঝানো হয়েছে। যেমন- আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা।
(খ) এর দ্বারা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বোঝানো হয়েছে।
(গ) আলী (রা.) বলেন- “যারা কুফরী করেছে” দ্বারা মোনাফেকদেরকে বুঝানো হয়েছে। উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় দেখে তারা বলেছিল: “তোমরা ফিরে যাও পিতৃপুরুষদের ধর্মে”। তারা মুসলমানদের ঈমান থেকে ফিরিয়ে কুফরিতে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৯) ।
﴿الرُّعْبَ﴾ ‘আতঙ্ক’, “রু‘ব” বলতে এমন তীব্র ও গভীর ভয়কে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের পুরো হৃদয়কে গ্রাস করে ফেলে। উহুদের যুদ্ধ শেষে মুশরিকরা যখন মক্কার দিকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তারা আবার ফিরে এসে মুসলমানদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের হৃদয়ে এমন প্রবল ভয় ঢেলে দিলেন যে তারা আতঙ্ক এবং ভয়ে আর ফিরতে সাহস পেল না। এই ভয় ও ভীরুতার মূল কারণ ছিল তাদের শিরক ও আল্লাহর নাফরমানি। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৯) ।
﴿مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا﴾ “এমন সব বিশ্বাস, কাজ বা কথাবার্তা, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল, প্রমাণ বা অনুমতি নাজিল করেননি”। এখানে “সুলতান” বলতে বোঝানো হয়েছে শক্তিশালী যুক্তি, স্পষ্ট প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য দলিল। আর হুজ্জত বা প্রমাণকে “সুলতান” বলা হয়; কারণ সত্য দলিলের এমন শক্তি থাকে, যা মিথ্যা, ভ্রান্ত চিন্তা ও বাতিল মতামতকে প্রতিহত করে দুর্বল করে দেয়। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৫১) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আয়াতগুলো উহুদের যুদ্ধের ঘটনাবলী থেকে পাওয়া নসিহত ও শিক্ষা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করছে। পূর্বের আয়াত তথা (১৪৬-১৪৮) আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা আগের যুগের সেই মানুষদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দেন, যারা নবীদের সাহায্য করেছিল, সত্যের জন্য দৃঢ় ছিল এবং ঈমানের পথে অবিচল ছিল। আর উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা ঐ সকল ইহুদী-খ্রিস্টান, মুশরিক ও মুনাফিকদের আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন, যারা সবাই মিলিত হয়ে ইসলামের দাওয়াহকে প্রতিহত করার চেষ্টা করত এবং যুদ্ধের কঠিন সময়ে মুমিনদের মনোবল ভেঙে দিতে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা দিত। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৯৫)।

১৪৯ ও ১৫১ আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
হযরত আলী (রা.) বলেন: ১৪৯ নং আয়াত নাজিল হয়েছে মুনাফিকদের সেই কথার প্রসঙ্গে, যখন উহুদের পরাজয়ের মুহূর্তে তারা মুমিনদের বলেছিল: “তোমরা ফিরে যাও তোমাদের ভাইদের কাছে, তাদের ধর্মে ঢুকে পড়ো”। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।
হাসান বসরি (র.) বলেন: এর অর্থ- তোমরা যদি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পরামর্শ গ্রহণ করো এবং তাদের কথা শুনো, তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ তারা মুসলমানদের পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করত, দীনের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করত এবং বলত: “যদি মুহাম্মদ সত্য নবী হতেন, তবে তিনি কেন পরাজিত হলেন? কেন তাঁর এবং তাঁর সাহাবীদের এমন অবস্থা হলো? তিনি তো অন্য সাধারণ মানুষের মতোই কখনো জেতেন, কখনো হারেন”।
আর সুদ্দি (র.) বলেন: এর অর্থ- তোমরা যদি আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ো, তাদের কাছে নিরাপত্তা চাও, তবে তারা তোমাদের আবার আগের ধর্মে ফিরিয়ে দেবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১১৯) ।
১৫১ নং আয়াত অবতীর্ণ হওয়া প্রসঙ্গে ইমাম সুদ্দি (র.) বর্ণনা করেছেন: উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের পর আবু সুফিয়ান এবং তার মুশরিক সঙ্গীরা মক্কার দিকে ফিরছিলেন। পথে তারা কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর হঠাৎ অনুশোচনায় ভুগল এবং বলল: “বিপদ! আমরা কী করেছি! আমরা তাদের হত্যা করেছি; এখন তো শুধু কিছু ছোট দল ছাড়া কেউ বেঁচে নেই। ফিরে যাই এবং সব শেষ করি”। তাদের লক্ষ্য ছিল বেঁচে থাকা মুসলিমদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে এমন প্রবল ভয় সৃষ্টি করলেন যে, তারা যা পরিকল্পনা করেছিল তা আর করতে সাহস পেল না এবং ফিরে গেল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৪৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে সতর্ক করেছেন, তারা যদি কাফের, মুশরিক ও ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে পরামর্শদাতা বানিয়ে তাদের পরামর্শকে গ্রহণ করে, তাহলে তাদের জন্য দুইটি ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে:
(ক) তারাও কাফের-মুশরিকদের মতো কাফের হয়ে যাবে, এর অর্থ হলো, যদি কোনো মুসলমান কাফের ও মুশরিকদের পরামর্শ, চিন্তা, জীবনদর্শন ও পথনির্দেশ গ্রহণ করতে থাকে, তবে ধীরে ধীরে তার ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সে তাদের মতোই কুফর ও ভ্রান্তির পথে চলে যেতে পারে। প্রথমে আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে, পরে আমলে দুর্বলতা দেখা দেয়, আর একসময় বিশ্বাসের ভিতই নড়ে যেতে পারে। তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ ও নবীর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, শত্রুর পরামর্শ থেকে দূরে থাকা এবং নিজের বিশ্বাস, পরিচয় ও মর্যাদা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা।
(খ) দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দুনিয়ায় কাফেরদের কর্তৃত্বের কাছে তাদের ক্ষমতা লোপ পাবে, তাদের অনুগত হয়ে থাকবে, অপমান ও পরাজয়ের সম্মুখীন হবে, এবং পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া শান্তি, ক্ষমতা ও স্থিতি হারাবে। আল্লাহ তায়ালা সত্যিকারের মুমিনদের ক্ষেত্রে বলেছেন:
﴿وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضى لَهُمْ، وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْناً﴾ [سورة النور: ৫৫].
অর্থ: “আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস ও সৎকর্ম করবে, তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করবে যেমন পূর্ববর্তী জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এবং তাদের জন্য তাদের ধর্মকে দৃঢ় করবে যা তিনি তাদের জন্য প্রণীত করেছিলেন। এবং তাদের ভয় কাটিয়ে নিরাপত্তা দিবেন” (সূরাতু আন-নূর: ৫৫) ।
এবং আখেরাতে চিরকালীন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৯৬)।
উহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা যখন সাময়িকভাবে পরাজিত হয়, তখন কিছু মুনাফিক তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে মুমিনদের পরামর্শ দেয় মক্কার মুশরিকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এবং তাদের কথায় চলার। এ ধরনের পরামর্শের উদ্দেশ্য ছিল মুমিনদের ঈমান দুর্বল করা, তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং ইসলামের ওপর আঘাত করা। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সতর্ক করেন এবং নির্দেশ দেন যে, কখনোই কাফেরদের পরামর্শ গ্রহণ করবে না। কারণ তারা সর্বদা শত্রুতা, প্রতারণা ও বিদ্বেষে মিশ্রিত থাকে, এবং তাদের পরামর্শ অনুসরণ করলে মুমিনরা সহজেই বিপদে পড়বে। বর্তমান বিশ্বে অনেক মুসলিম সম্প্রদায় পশ্চিমা শক্তি ও কাফির সম্প্রদায়ের প্রভাব ও পরামর্শ অনুসরণ করছে। এর ফলে তারা আত্মনির্ভরতা হারিয়েছে, নিজেদের জাতীয় ও ধর্মীয় মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছে, এবং মেরুদন্ডহীন ভীরু জাতিতে পরিণত হয়েছে। উহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটের মতোই, আজকের পরিস্থিতিতেও এই ধরনের পরামর্শ মুমিনদের জন্য আত্মনাশকর ও বিপজ্জনক। আয়াতটি আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, এ ধরনের শত্রুর প্ররোচনা কেবল দুনিয়ায় ক্ষতি ঘটায় না; বরং আখেরাতে শাস্তি আরও ভয়ানক হবে। কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করে যে, যারা ঈমান থেকে পিছু হটে, শিরক বা কুফরের দলে ফিরবে, তাদের জন্য জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি রয়েছে । (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
২। ১৫০ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন- বিজয় অর্জন করতে হলে তারা যেন কাফেরদের সহায়তা বা পরামর্শের দিকে না তাকিয়ে শুধু আল্লাহকেই অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করে। উহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা যখন সাময়িকভাবে পরাজিত হলো, তখন মুনাফিকরা এবং কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ তাদেরকে নানা দিকে প্রলুব্ধ করতে শুরু করে। কেউ বলল: মক্কার মুশরিকদের সহায়তা নাও; কেউ বলল: মুনাফিকদের দলে এসে নিরাপত্তা খুঁজো। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে মুমিনদের নিষেধ করলেন- তারা যেন আবু সুফিয়ান ও তার মুশরিক দলের দিকে না তাকায়, কিংবা আব্দুল্লাহ ইবন উবাই-এর মতো মুনাফিকদের কাছ থেকেও কোনো নির্দেশ বা সুরক্ষা না চায় এবং তাদের প্ররোচনা, পরামর্শ ও কুমন্ত্রণা যেন উপেক্ষা করে; কারণ তাদের পক্ষে কখনোই মুসলমানদের সাহায্য করা সম্ভব নয়। সত্যিকারের সাহায্য, বিজয় এবং সুরক্ষা শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তিনিই মুমিনদের শক্তি দেন, সমর্থন দেন এবং তাঁর প্রতিশ্রæত সাহায্যের মাধ্যমে বিজয় দান করেন। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
﴿فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلاكُمْ نِعْمَ الْمَوْلى وَنِعْمَ النَّصِيرُ﴾ [سورة الأنفال: ৪০].
অর্থ: “জেনে রাখো আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক। তিনি কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী!” (সূরাতু আল-আনফাল: ৪০) ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহর চিরন্তন নিয়ম হলো তিনি সৎ, ঈমানদার এবং যারা সম্পূর্ণভাবে তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করে, তাদেরকে বিজয় দান করেন। আর কাফের, অত্যাচারী ও দ্বিমুখী লোকদেরকে পরিত্যাগ করেন। আল্লাহ আরো বলেন-
﴿أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كانَ عاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ دَمَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلِلْكافِرِينَ أَمْثالُها، ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ مَوْلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَأَنَّ الْكافِرِينَ لا مَوْلى لَهُمْ﴾ [سورة محمد: ১০].
অর্থ: “তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে দেখে না, তাদের আগের জাতিদের অবস্থা কী হয়েছিল? আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেছিলেন, এবং কাফেরদের জন্যও তেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে। কারণ আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, আর কাফেরদের কোনো অভিভাবক নেই” (সূরাতু মোহাম্মদ: ১০) ।
এই শিক্ষাটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়- মুমিনদের শক্তি, নিরাপত্তা ও বিজয় কোনো বাহ্যিক শক্তি বা শত্রুর সঙ্গে আপস করে আসে না। এটি আসে আল্লাহর উপর নির্ভরতা, তাঁর বিধান পালন এবং তাঁর প্রতিশ্রুত সাহায্যের মাধ্যমে। তাই যে কোনো মুসলিম দল, আন্দোলন বা নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো-
(ক) বিজয় শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
(খ) ইসলামবিদ্বেষী শক্তির কাঁধে ভর করে কোনোদিন ইসলামের বিজয় সম্ভব নয়।
(গ) আল্লাহর বিধানকে কাটছাঁট করে বা শত্রুর নির্দেশনায় চলে ইতিহাসে মুসলিম জাতি কোন দিন বিজয়ী হয়নি। সুতরাং, মুসলিম উম্মাহর করণীয়- আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা, তাঁর বিধানকে বাস্তবায়ন করা, এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর সহায়তা বা পরামর্শ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা।
৩। ১৫১ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) সত্যিকারের মুমিন হলেন এমন একজন যার ঈমান গভীর ও স্থির, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি দৃঢ় আশাবাদী এবং আল্লাহর শক্তি ও সাহায্যের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল; এ কারণেই তার মনোবল অটল, সংকল্প সাহসী এবং সিদ্ধান্ত দৃঢ় থাকে; যদি কাউকে কাফেরদের কথায় ভীত সন্ত্রস্ত দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে তার ঈমান কেবল নামমাত্র বা উত্তরাধিকারসূত্রে, আসল ঈমান নয়। অন্যদিকে মুশরিকদের অন্তর স্বভাবতই অস্থির ও ভীত, কুফর তাদের অন্তরে কখনো স্থায়ী নিরাপত্তা বা আত্মবিশ্বাস বোনা করে না; তারা অন্ধভাবে পুরনো প্রথা ও গোষ্ঠীপরায়ণতা অনুসরণ করে, যা তাদের সত্য দেখায়না। উদাহরণস্বরূপ উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের পরে মুশরিকরা মুসলিমদের দুর্বল দেখেও দ্বিতীয়বার আক্রমণে আগাতে পারেনি; কারণ তাদের অন্তরে সন্দেহ ও ভয় বাসা বেঁধেছিল।
(খ) মুশরিকরা আল্লাহর সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করেছে, যার জন্য আল্লাহ কখনো কোনো প্রমাণ, দলিল বা অনুমতি দেননি। শিরকের পক্ষে কোনো সত্যিকারের যুক্তি বা আসমানী সমর্থন নেই। তারা কেবল পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ করেছে, মূর্তিকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দিয়েছে, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং লোককথাকে ভিত্তিহীনভাবে দলিল মনে করেছে। এ কারণে এগুলো মানুষকে কোনো শক্তি বা নিরাপত্তা দিতে পারে না; বরং শিরক মানুষের অন্তরকে দুর্বল, অস্থির এবং ভীতু করে তোলে। তাই এই আয়াত মুমিনদের শিক্ষা দেয় শিরক কখনো সত্য, শক্তি বা নিরাপত্তার উৎস হতে পারে না; প্রকৃত অভিভাবক ও সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ।
(গ) মুশরিকদের আবাসস্থল জাহান্নাম; কারণ তারা আল্লাহকে না মানা, সত্য অস্বীকার করা, নবীদের প্রতিরোধ করা, এবং মানুষের ওপর জুলুম করার মাধ্যমে নিজেদের প্রতি সর্বোচ্চ অন্যায় করেছে। “মসওয়া” শব্দটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বোঝায়, অর্থাৎ তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। জাহান্নাম হবে তাদের স্থায়ী নিবাস, আর সেটি কতই না ভয়াবহ বাসস্থান!।

আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) মুমিনদের উচিত কাফের-মুশরিক ও ইহুদী-খ্রিস্টানদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা।
(খ) বিজয় অর্জনের জন্য মুসলিম উম্মাহর একমাত্র ভরসা হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলা।
(গ) মুশরিকদের বাহ্যিকভাবে যতই দৃঢ় বা সাহসী মনে হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তর ভয় ও অস্থিরতায় ভরা, এটি মুমিনদের মনে রাখতে হবে।

Leave a Reply

error: Content is protected !!