Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯০-১৯৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: প্রকৃত জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার।

﴿إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ (190) الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (191) رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (192) رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ (193) رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ (194) فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَأُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأُوذُوا فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُوا وَقُتِلُوا لَأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ثَوَابًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ (195)﴾ [سورة آل عمران: 190-195).

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: প্রকৃত জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৯০। নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে বুদ্ধিমানদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।
১৯১। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে। তারা বলে, “হে আমাদের রব, আপনি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। অতএব আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
১৯২। “হে আমাদের রব, আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, অবশ্যই তাকে অপমানিত করবেন। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।”
১৯৩। “হে আমাদের রব, আমরা এক আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডাকছিলেন যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো।’ তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন, আমাদের পাপগুলো মোচন করুন এবং আমাদের নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দিন।”
১৯৪। “হে আমাদের রব, আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি আমাদের দিয়েছেন, তা আমাদের দান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।”
১৯৫। তখন তাদের রব তাদের দোয়ার জবাব দিলেন, “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কর্ম নষ্ট করব না, সে পুরুষ হোক বা নারী; তোমরা একে অপরেরই অংশ। অতঃপর যারা হিজরত করেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, আমার পথে কষ্ট পেয়েছে, যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে—আমি অবশ্যই তাদের গুনাহসমূহ মুছে দেব এবং তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান। আর উত্তম প্রতিদান তো আল্লাহর কাছেই রয়েছে।”

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামনে তাঁর সৃষ্টিজগতের কিছু নিদর্শন তুলে ধরেছেন। এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়- আল্লাহ তা’আলা কারও মুখাপেক্ষী নন, বরং সব সৃষ্টি তাঁরই মুখাপেক্ষী। তিনিই সবকিছুর ¯্রষ্টা, পালনকর্তা ও নিয়ন্ত্রক। মানুষের জীবন, জীবিকা এবং সব বিষয় তাঁরই অধীনে। তিনি ছাড়া আর কোনো রব নেই, আর তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো উপাস্যও নেই। তবে এসব সত্য কেবল সুস্থ বিবেক ও পরিষ্কার অন্তরের মানুষই উপলব্ধি করতে পারে। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা বলেন, আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ, বিশাল আকাশ, বিস্তৃত পৃথিবী, রাতের অন্ধকার, দিনের আলো, কখনো দিন বড়, কখনো রাত বড়- এসবই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে আল্লাহই সর্বশক্তিমান। এগুলো আরও বোঝায়, মানুষ কত অসহায় আর কত বেশি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। এই কথাই ১৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে।
এরপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ সেই জ্ঞানী মানুষের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
(ক) তারা সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে- দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে। অর্থাৎ, শুধু সালাতে নয়; বরং জীবনের সব সময়েই তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে থাকে।
(খ) তারা আকাশ-যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। কী সুন্দরভাবে সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, কী নিখুঁত নিয়মে চলছে, কত অগণিত সৃষ্টি এতে ছড়িয়ে আছে, এসব ভেবে তারা মুগ্ধ হয়ে যায়। তখন তাদের মুখ থেকে বের হয়ে আসে- “হে আমাদের রব, আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি”। অর্থাৎ, এই বিশাল জগত কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে আছে মহান প্রজ্ঞা ও গভীর উদ্দেশ্য। আল্লাহ কখনো খেলাচ্ছলে কিছু করেন না। তাই তারা বলে, “আপনি পবিত্র”। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি সব ধরনের ত্রুটি, অনর্থক কাজ ও উদ্দেশ্যহীনতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
(গ) প্রকৃত জ্ঞানী বুঝতে পারে, আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যারা তা করবে, তারা জান্নাতে সম্মান পাবে। আর যারা অবাধ্য হবে, তারা শাস্তির মুখোমুখি হবে। এ কারণেই তারা দোয়া করে- “হে আমাদের রব, যাকে আপনি জাহান্নামে দেবেন, সে অবশ্যই অপমানিত হবে। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না”। এরপর তারা বলে, “হে আমাদের রব, আমরা একজন আহ্বানকারীর ডাক শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো’। তাই আমরা ঈমান এনেছি”। এই আহ্বানকারী হলেন ‘কোরআন’ এবং মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.)।
(ঘ) একজন প্রকৃত জ্ঞানী হেদায়েত, পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে। ঈমান আনার পর তারা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস প্রার্থনা করে। তারা বলে, “হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহ মাফ করুন, আমাদের পাপগুলো দূর করুন এবং আমাদের নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দিন”। এরপর তারা আরও প্রার্থনা করে- “হে আমাদের রব, আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন। কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না”। অর্থাৎ, একজন জ্ঞানী দুনিয়াতে আল্লাহর সাহায্য ও সফলতা চায়, আর আখিরাতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি কামনা করে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের দোয়ার এভাবে জবাব দেন- “আমি তোমাদের কারও কাজ নষ্ট করব না, সে পুরুষ হোক বা নারী”। অর্থাৎ, আল্লাহ সবার আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন। তাঁর কাছে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো অন্যায় পার্থক্য নেই।
(ঙ) জ্ঞানীদের পাঁচ নম্বর বৈশিষ্ট্য হলো- তারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করে।
যে সকল জ্ঞানী ও গবেষক উল্লেখিত পাঁচটি গুণে গুণান্বিত হবে আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্য দুইটি মহাপুরস্কার রেখেছেন: (ক) আল্লাহ তা’আলা তাদের কৃত সৎকর্ম নষ্ট করবেন না, (খ) তাদের জীবনের ভুল-ত্রুটি ও পাপসমূহ মুছে দিবেন এবং (গ) তাদেরকে মহামূল্যবান জান্নাত দান করবেন।
১৯৫ নম্বর আয়াতের শেষভাগে আল্লাহ তা’আলা বিশেষভাবে সেই সকল জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেন, যারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণ আর গবেষণার ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আল্লাহর পথে ঘরবাড়ি ছেড়েছে, কষ্ট সহ্য করেছে, নির্যাতিত হয়েছে, যুদ্ধ করেছে এবং শহীদ হয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হলো- তিনি তাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে দামী পুরস্কার। তাই মানুষের উচিত সবসময় আল্লাহর কাছেই আশা রাখা, তার কাছেই চাওয়া। কারণ তিনিই সবচেয়ে দয়ালু এবং অনুগ্রহশীল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৬-৪২৭; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২০৭-২০৯; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৫-৭৬; আল-মুনতাখাব: ১/১২০-১২২) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أُولِي الأَلْبَابِ﴾ ‘জ্ঞানী বা আকলমান’, আয়াতাংশে ‘উলুল আলবাব’ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এ সম্পর্কে আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) বলেন: ‘উলুল আলবাব’ বলতে তাদেরকে বোঝায়- যাদের সুস্থ ও পরিপক্ব বুদ্ধি আছে; যে বুদ্ধি দিয়ে তারা বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে এবং প্রমাণ থেকে সত্যকে চিনে নিতে পারে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪২৫)। অর্থাৎ, ‘উলুল আলবাব’ সেই মানুষ, যারা দেখে শিক্ষা নেয়, চিন্তা করে সত্যে পৌঁছে, প্রমাণ থেকে আল্লাহর মহিমা চিনে নেয় এবং সবশেষে এর মাধ্যমে হেদায়েতকে গ্রহণ করে। যা উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়।
কুরআনে “উলুল আলবাব” শব্দটি ১৬ জায়গায় এসেছে। এটি কোথায় কী অর্থে এসেছে তার বর্ণনা নিচে কয়েকটি আয়াতের সহজ ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরা হলো-
(ক) ইসলামে ‘কিসাস’ বিধানের হিকমাত ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা বুঝতে পারে, আল্লাহ তা’আলা সূরাতু আল-বাক্বারা-এর ১৭৯ নম্বর আয়াতে কিসাসের বিধান বর্ণনা করে বলেছেন: এতে ‘উলুল আলবাব’-এর জন্য জীবন আছে। অর্থাৎ, গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় ন্যায়বিচার সমাজে নিরাপত্তা আনে। শুধু বাহ্যিক শাস্তি নয়, এর পেছনের হিকমতও তারা বুঝতে পারে। (তাফসীর আল-তবারী: ৩/৩৮৩) ।
(খ) আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান থেকে কেবল বুদ্ধিমানরাই শিক্ষা গ্রহণ করে, সূরাতু আল-বাক্বারা-এর ২৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আল্লাহ যাকে চান হিকমত বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন, আর যাকে হিকমত দেওয়া হয় তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়। আর ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা এ হিকমাত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে”। এখানে ‘উলুল আলবাব’দেরকে বলা হয়েছে: তারা আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। (তাফসীর আল-তবারী: ৫/৫৮০) ।
(গ) আকাশ-যমীনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের পরিবর্তনে উলুল আলবাবের জন্য নিদর্শন আছে, উল্লেখিত আয়াতসমূহে তথা সূরাতু আলে-ইমরান-এর (১৯০-১৯১) এ বলা হয়েছে, আকাশ-যমীনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। এবং তারা দুইটি কাজ করে: (ক) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং (খ) সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করে।
(ঘ) নবীদের ঘটনাবলীতে উলুল আলবাবের জন্য শিক্ষা রয়েছে, অর্থাৎ- তারা শুধু গল্প শোনে না; বরং ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়। (সূরাতু ইউসুফ: ১১১) ।
(ঙ) ‘উলুল আলবাব’ বা জ্ঞানীরা সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে। যেমন সূরাতু রা’দ-এর ১৯ নম্বর আয়াতে এসেছে- “যে জানে রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সত্য, সে কি অন্ধের মতো হতে পারে?”। এখানে বলা হয়েছে: উলুল আলবাব হলো তারা, যারা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে।
(চ) ‘উলুল আলবাব’ বা বুদ্ধিমানরা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তারপর উত্তম কথাটি অনুসরণ করে। সূরাতু আল-যুমার-এর ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾.
অর্থ: “যারা মন দিয়ে কথা শুনে অতঃপর তা ভালভাবে অনুসরণ করে, তাদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দান করেন, এবং তারাই বুদ্ধিমান”। এখানে খুব সুন্দর একটি অর্থ পাওয়া যায়:
‘উলুল আলবাব’ বা জ্ঞানী মানে শুধু বেশি জানা নয়; বরং সত্য কথা শুনে তা গ্রহণ করা।
﴿آيَات﴾ “সুস্পষ্ট নিদর্শন”, আয়াতাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে আবু বকর আল-জাযায়েরী (র.) বলেন: এর দ্বারা আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব, ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং রহমতের সুস্পষ্ট প্রমাণকে বুঝানো হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর: ১/৪২৫)। অর্থাৎ- আকাশ, পৃথিবী, দিন-রাতের পালাবদল, বৃষ্টি, জীবজন্তু ও মানবসৃষ্টি, এসবই এমন সুস্পষ্ট নিদর্শন, যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষ আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব, অসীম ক্ষমতা, পরিপূর্ণ জ্ঞান, সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা ও অবারিত রহমত উপলব্ধি করতে পারে। যেমন: এত সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল সৃষ্টি কখনোই নিজে নিজে অস্তিত্বে আসতে পারে না; এর পেছনে একজন মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে, এটাই আল্লাহর অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যিনি আকাশম-লী, পৃথিবী এবং অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন, এটা আল্লাহর ক্ষমতার প্রমান। সৃষ্টির প্রতিটি জিনিসে যে নিখুঁত সামঞ্জস্য দেখা যায়, তা আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান ও হিকমতের প্রমাণ। অনুরুপভাবে বৃষ্টি, খাদ্য ও জীবনধারণের উপকরণ, এসব আল্লাহর অসীম রহমতের প্রমাণ।
﴿يَذْكُرُونَ اللَّهَ﴾ “তারা আল্লাহকে স্মরণ করে”, এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের দুটি মত রয়েছে:
(ক) এখানে উদ্দেশ্য হলো- মানুষ যেন সর্বদা তার রবের স্মরণে থাকে। কারণ মানুষের অবস্থা মূলত এই তিনটির বাইরে নয়, দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায়। সুতরাং যখন আল্লাহ তাদেরকে এই সব অবস্থায় স্মরণকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তখন তা প্রমাণ করে যে তারা সর্বদা যিকিরে অবিচল থাকে, কখনোই এতে শৈথিল্য করে না।
(খ) এখানে “যিকির” দ্বারা সালাত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তারা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে; যদি দাঁড়িয়ে আদায় করতে অক্ষম হয়, তবে বসে; আর যদি বসেও অক্ষম হয়, তবে শুয়ে। অর্থাৎ তারা কোনো অবস্থাতেই সালাত পরিত্যাগ করে না।
ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযী প্রথম মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহর যিকিরের ফযিলত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَرْتَعَ فِي رِيَاضِ الْجَنَّةِ فَلْيُكْثِرْ ذِكْرَ اللَّهِ”.
অর্থ: “যে ব্যক্তি জান্নাতের উদ্যানসমূহে বিচরণ করতে ভালোবাসে, সে যেন বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করে”। (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ: ৩৫০৬৯) । (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৫৯-৪৬০) ।
﴿مُنَادِيًا﴾ “আহ্বানকারী”, আয়াতাংশ দ্বারা দুইটি উদ্দেশ্য হতে পারে: (ক) মোহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং (খ) আল-কুরআনুল কারীম। অধিকাংশ তাফসীরকারকগণ প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন। তবে ফখরুদ্দীন রাযী (র.) দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, কারণ সকল মানুষ দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহর দেখা পায়নি, কিন্তু কুরআনের দেখা পাবে। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৯/৪৬৬) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো মূলত সূরাটির উপসংহার। কাফির, মুনাফিক এবং মুমিনদের মধ্যকার গাফিল ও ত্রুটিকারীদের সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের উত্থাপিত সন্দেহ-আপত্তির জবাব দেওয়ার পর, উল্লেখিত আয়াতগুলোর মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি এমন বিষয়গুলোর দিকে ফেরানো হয়েছে, যা আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একাত্ববাদ, তাঁর মহিমা ও মহান গৌরব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/২০৬) ।

১৯০ এবং ১৯৫ নম্বর আয়াতদ্বয় অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, কোরাইশ বংশের লোকেরা ইহুদীদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, মূসা (আ.) তোমাদের কাছে কী কী নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন? তারা বলল: লাঠি এবং এমন উজ্জ্বল হাত, যা দর্শকদের কাছে স্পষ্ট শুভ্র হয়ে উঠত।
তারপর তারা খ্রিষ্টানদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ঈসা (আ.) কেমন ছিলেন? তারা বলল, তিনি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতেন এবং মৃতকে জীবিত করতেন।
অতঃপর তারা মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল, হে মোহাম্মদ তুমি তোমার রবের কাছে দোয়া কর যেন তিনি আমাদের জন্য সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে পরিণত করে দেন। তখন তিনি তাঁর রবের কাছে দোয়া করলেন। এরপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা ১৯০ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ করলেন। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৭) ।
উম্মু সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), হিজরতের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের উল্লেখ আমি শুনি নাই। তখন আল্লাহ তা’আলা ১৯৫ নম্বর আয়াত নাযিল করে জানিয়ে জানিয়ে দিলেন নারী-পুরুষের কোন বৈসম্য নেই। (লুবাব আল-নুকূল, সুয়ূতী: ১/৭৮)।

আয়াতসমূহের ফযিলত:
এই আয়াতগুলোর ফযিলত সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো- আতা (রা.) বলেন: আমি, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার এবং ওবাইদ ইবনু উমাইর একসঙ্গে আয়েশার (রা.) কাছে গেলাম। আমরা তাঁর কাছে প্রবেশ করলাম, আর আমাদের ও তাঁর মাঝে একটি পর্দা ছিল। তিনি বললেন: “হে উবাইদ, তুমি আমাদের কাছে আস না কেন?”
তিনি বললেন, “কবির উক্তি আছে- মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ করো, তাহলে ভালোবাসা বাড়ে”।
তখন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার বললেন: “আমাদের বলুন তো, আপনি রাসূলুল্লাহর (সা.) কোন বিষয়টি সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দেখেছেন?” তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “তাঁর প্রতিটি কাজই ছিল আশ্চর্যজনক। এক রাতে তিনি আমার কাছে এলেন, এমনকি তাঁর শরীর আমার শরীর স্পর্শ করল। তারপর তিনি বললেন: “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি আমার মহান রবের ইবাদত করি”। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আপনার সান্নিধ্য আমার খুব প্রিয়, আর এটাও আমার প্রিয় যে আপনি আপনার রবের ইবাদত করুন। এরপর তিনি পানির পাত্রের কাছে গেলেন, ওযু করলেন; বেশি পানি ঢাললেন না। তারপর নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি এত কাঁদলেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তারপর সিজদায় গেলেন, সেখানেও এত কাঁদলেন যে মাটি ভিজে গেল। এরপর কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন, তবুও কাঁদতে থাকলেন।
এমতাবস্থায় বিলাল (রা.) ফজরের নামাজের জন্য তাঁকে ডাকতে এলেন। তিনি বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কাঁদছেন কেন? অথচ আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “হে বিলাল, আমি কেন কাঁদব না? আজ রাতে আমার ওপর এই আয়াতগুলো (সূরাতু আলে-ইমরানের ১৯০-১৯৫) নাযিল হয়েছে। এরপর তিনি বলেন: “ধ্বংস তার জন্য, যে এ আয়াতগুলো পড়ে কিন্তু এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না”।
আউযায়ী (র.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “এই আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনার পরিপূর্ণতা কী?” তিনি বলেছিলেন: “মানুষ যেন এ আয়াতগুলো পাঠ করে, আর পাঠ করার সময় তাদের অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করে”। (তাফসীরে ইবনু কাসীর: ১/৪৪০) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান শব্দটি যেমন অত্যন্ত মূল্যবান, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি দামি হলো সেই ব্যক্তি, যিনি প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান। কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় বুদ্ধিমানদের গভীর প্রশংসা করা হয়েছে, কারণ প্রকৃত বুদ্ধিমানরা শুধু জ্ঞান অর্জন করেন না, সেই জ্ঞানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। বিশেষ করে, সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯০-১৯৫) আয়াতগুলোতে প্রকৃত বুদ্ধিমানদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বর্ণনা করা হয়েছে:
(ক) একজন প্রকৃত জ্ঞানী সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে- দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে।
(খ) তারা আকাশ-যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।
(গ) প্রকৃত জ্ঞানী বুঝতে পারে, আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
(ঘ) তারা হেদায়েত, পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে।
(ঙ) তারা শুধু জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণার ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করে।
২। ১৯৫ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশে আধুনিক যুগে যারা মনে করে ইসলাম নারীদেরকে যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেনি, তাদের জবাব দিয়েছে:
প্রথমত: তারা বলে, ইসলাম নারীকে ঘরের ভিতরে আবদ্ধ রেখেছে, তাদেরকে কাজের স্বাধীনতা দেয়নি। তাদের জবাব হলো- ইসলাম নারীকে পুরুষের অনুসারী বা ছায়া হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সামনে স্বাধীন নৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; তার ঈমান, আমল, ত্যাগ, ধৈর্য, শিক্ষা, সন্তান লালন-পালন, সমাজগঠন- সবকিছুরই পূর্ণ মূল্য আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। আধুনিক যুগে মানুষ সাধারণত কাজের বাহ্যিক দৃশ্যমানতাকে মূল্যায়নের মাপকাঠি বানায়, কিন্তু এই আয়াত শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি লিঙ্গ নয়, বরং ঈমান, ইখলাস ও সৎকর্ম। চাই সে সৎকর্ম দৃশ্যমান হোক বা চোখের আড়ালে হোক। আধুনিক বিশ্বে সাধারণত সমাজ বলতে সেই ক্ষেত্রকেই বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যা চোখে পড়ে: কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান, বাজার, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি। কিন্তু এই দৃশ্যমান জগতের পেছনে নীরবে কাজ করে আরেকটি গভীর ও মৌলিক জগৎ- পরিবার। এই পরিবারই মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে একটি শিশু কথা বলতে শেখে, আদব শেখে, দায়িত্ববোধ শেখে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখে, মানুষ হয়ে উঠতে শেখে। আর এই নির্মাণের কেন্দ্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাকেন মা। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; একটি প্রজন্মের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর। অথচ আধুনিক আলোচনায় অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি করা হয় যেন ঘরের ভেতরের এই অবদান কোনো “বাস্তব কাজ” নয়, যেন মূল্যবান কেবল সেই শ্রমই, যার বিনিময়ে দৃশ্যমান অর্থ, পদ বা সামাজিক পরিচিতি পাওয়া যায়।
এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি হয়। কারণ যে মা বছরের পর বছর একটি শিশুকে এমনভাবে গড়ে তুললেন, যাতে সে ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, আলেম, উদ্যোক্তা বা সমাজনেতা হতে পারে, বাস্তবে তিনি সমাজ নির্মাণের একেবারে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। কিন্তু সমাজ প্রায়ই ফলটিকে দেখে, শিকড়টিকে দেখে না। দৃশ্যমান সাফল্যকে প্রশংসা করা হয়, অথচ সেই সাফল্যের পেছনের নীরব ত্যাগ প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। ইসলাম এই অদৃশ্য অবদানকে অদৃশ্য মনে করেনি। তাই আল্লাহ বলেন- “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কোনো কাজ নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী”। অর্থাৎ কাজের মূল্য নির্ধারণে বাহ্যিক দৃশ্যমানতা নয়, বরং নিয়ত, দায়িত্বপালন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা শ্রমই আসল। একজন নারী যদি পরিবারকে সৎভাবে গড়ে তোলেন, সন্তানকে দ্বীন, চরিত্র ও মানবিকতার শিক্ষা দেন, এ কাজ আল্লাহর কাছে এমনই মূল্যবান, যেমন সমাজের প্রকাশ্য ময়দানে সম্পাদিত কোনো বড় দায়িত্ব।
এ কারণে ইসলামে নারী-পুরুষকে একই রকম দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, কারণ তাদের অঙ্গন, সামর্থ্য, প্রাকৃতিক প্রবণতা ও সামাজিক প্রয়োজন সবক্ষেত্রে এক নয়। কিন্তু এখান থেকে অন্যায় বৈষম্যের ধারণা টানা ভুল। ইসলাম দায়িত্বের ক্ষেত্র ভিন্ন হতে পারে বলে স্বীকার করেছে, কিন্তু মর্যাদা ও প্রতিদানে কাউকে কম মনে করেনি। আধুনিক যুগে অনেক সময় নারী-অধিকারের ভাষ্য এমনভাবে দাঁড়ায় যে, ঘরের ভেতরের দায়িত্ব যেন অবমূল্যায়িত হয়, আর ঘরের বাইরে দৃশ্যমান উপস্থিতিকেই একমাত্র মুক্তি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এ জন্য নারীকে অধিকার প্রদানের নামে ঘরের বাইরে আনা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো- যে সমাজ পরিবারকে দুর্বল করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে।
সুতরাং উল্লেখিত আয়াতগুলোর শিক্ষা হচ্ছে- ইসলাম নারীকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে অদৃশ্য সত্তা বানায়নি, আবার সমাজের প্রদর্শনীর বস্তু হিসেবেও দেখেনি। বরং নারী-পুরুষ উভয়কেই এমন মর্যাদা দিয়েছে, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে আল্লাহর কাছে পূর্ণ স্বীকৃতি ও প্রতিদানের অধিকারী। মানুষের চোখ অনেক সময় শুধু প্রকাশ্য কাজ দেখে; কিন্তু আল্লাহ অন্তর, নিয়ত এবং নীরব ত্যাগও দেখেন; এবং কোনো আন্তরিক শ্রমই তাঁর কাছে হারিয়ে যায় না। ইমাম তবারী (র.) বলেন: আয়াতাংশের অর্থ হলো- “আমি তোমাদের কোনো কর্মীর কর্ম বাতিল করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী” (তাফসীর আল-তবারী: ৭/৪৮৬)। স্পষ্ট বার্তা এসেছে সূরাতু আত-তাওবাহ এর ৭১ নম্বর আয়াতে:
﴿وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِناتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِياءُ بَعْضٍ﴾.
অর্থাৎ: “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী- তারা একে অপরের অভিভাবক, সহায়ক ও সহযোগী”। তাই যারা বলে ইসলাম নারীকে অধিকার দেয়নি, এই আয়াত তাদের জন্য স্পষ্ট জবাব বহন করে।
এছাড়াও কোরআন-হাদীস ও সীরা গ্রন্থ থেকে স্পষ্ট হয়ে যে ইসলাম নারীকে ঘরের বাইরে যেতে বাধা দেয়নি। পর্দার বিধান রক্ষা করে ঘরের বাইরের যে কোন কাজে অংশ নেয়ার অধিকার ইসলাম তাকে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: তাদের দাবী উত্তারাধীকার সম্পত্তিতেও ইসলাম নারীর অধিকার নষ্ট করেছে। উল্লেখিত আয়াতাংশে ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোন ক্ষেত্রেই ইসলাম নারীর অধিকারকে নষ্ট করেনি, নারী-পুরুষ ঊভয়কে যথার্থ অধিকার দিয়েছে। আসুন এখন বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখি, কোরআনের আলোকে একটি সহজ হিসাব দেখলে বোঝা যায়- ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীকে বঞ্চিত করেনি; বরং নির্দিষ্ট অংশ নিশ্চিত করেছে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা সম্পত্তি রেখে মারা গেলেন। তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে আছেন এক ছেলে ও এক মেয়ে। কুরআনের বিধান অনুযায়ী, ছেলের অংশ হবে দুই মেয়ের সমান। অর্থাৎ মোট অংশ ধরা হবে ৩ ভাগ ছেলে পাবে ২ ভাগ, মেয়ে পাবে ১ ভাগ। তাহলে ১২ লাখ টাকা ভাগ ৩ = প্রতি ভাগ ৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে ছেলে পাবে ৮ লাখ টাকা, আর মেয়ে পাবে ৪ লাখ টাকা। এখানে অনেকে শুধু সংখ্যার পার্থক্যটি দেখেন, কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থার পূর্ণ চিত্রটি দেখেন না। ছেলেকে ভবিষ্যতে মহর দিতে হবে, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বহন করতে হবে, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে; কিন্তু মেয়ের ওপর এমন বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব নেই। সে যে ৪ লাখ টাকা পাবে, তা তার ব্যক্তিগত সম্পদ, স্বামী, ভাই, বাবা বা সন্তানের জন্য তা খরচ করা তার ওপর ফরজ নয়। অর্থাৎ বাহ্যিক অঙ্কে ছেলের অংশ বেশি হলেও, ব্যয়ের দায়ও তার ওপর বেশি; আর মেয়ের অংশ কম হলেও তা তার জন্য সংরক্ষিত অধিকার। এভাবে ইসলাম কেবল সংখ্যাগত সমতা নয়, বরং দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই বলা সঠিক নয় যে ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার থেকে ঠকিয়েছে; বরং এমন এক সমাজে, যেখানে বহু স্থানে নারীকে উত্তরাধিকার থেকেই বঞ্চিত করা হতো, ইসলাম তার নির্ধারিত অংশকে আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আরেকটি উদাহরণ নিন। ধরুন, একজন ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা রেখে ইন্তেকাল করলেন। ওয়ারিশ হিসেবে আছেন স্ত্রী, বাবা, মা, এক ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী বণ্টনে স্ত্রীর অংশ ১ লাখ ৫০ হাজার, বাবার ২ লাখ, মায়ের ২ লাখ। অবশিষ্ট ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ছেলে পায় প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা, আর মেয়ে পায় প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। বাহ্যিকভাবে এখানে মনে হতে পারে ছেলে বেশি পেল। কিন্তু এখন পরের বাস্তব চিত্রটি দেখুন। ধরা যাক, ছেলে বিয়ের সময় ১ লাখ টাকা মহর দিল, বছরে ন্যূনতম ১ লাখ টাকা করে স্ত্রী-সন্তানের প্রয়োজনীয় ভরণপোষণে খরচ করল, মাত্র দুই বছরেই আরও ২ লাখ টাকা ব্যয় হলো। অর্থাৎ তার ৪ লাখ ৩৩ হাজার থেকে মোটামুটি ৩ লাখ টাকা দায়িত্ব পালনে চলে গেল। হাতে অবশিষ্ট থাকল প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে মেয়ে যে ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা পেল, সেই সম্পদের ওপর তার নিজের কোনো বাধ্যতামূলক পারিবারিক ব্যয় নেই; স্বামী, সন্তান, ভাই বা বাবা, কারও জন্য তা খরচ করা তার ওপর ফরজ নয়। ফলে তার পুরো অংশটিই তার ব্যক্তিগত মালিকানায় থেকে যেতে পারে। এখানেই ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ন্যায়বিচারটি স্পষ্ট হয়। শুধু “কে বেশি পেল” তা দেখলে ছবির অর্ধেক দেখা হয়; কিন্তু “কে কত দায়িত্ব বহন করবে” তা যোগ করলে বোঝা যায়, ইসলাম কেবল সংখ্যার হিসাব করেনি, বরং দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যও বিবেচনায় নিয়েছে। এ কারণেই কুরআন উত্তরাধিকারকে নিছক গাণিতিক সমতা নয়, বরং সুবিচারভিত্তিক বণ্টন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। ১৯৫ নম্বর আয়াতের শেষাংশে, যে সকল জ্ঞানীদের মধ্যে উল্লেখিত পাঁচটি গুণ পাওয়া যাবে, তাদের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে:
(ক) আল্লাহ তা’আলা তাদের কৃত সৎআমল নষ্ট করবেন না।
(খ) আল্লাহ তা’আলা তাদের গুনাহ মাফ করবেন।
(গ) তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত।
৪। সূরাতু আলে-ইমরানের (১৯১-১৯৫) নম্বর আয়াতের আলোকে আল্লাহর কাছে দোয়ার মধ্যে কয়েকটি মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার শিক্ষা পাওয়া যায়। এই আয়াতগুলোতে মুমিনদের দোয়া শুধু চাওয়া নয়; বরং চিন্তা, ঈমান, আত্মসমর্পণ, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আখিরাতের সফলতার পূর্ণ আবেদন। একটি দোয়ায় অন্তর্ভূক্ত বিষয়গুলো নি¤œরুপ:
(ক) আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা স্বীকার করা, ১৯১ নম্বর আয়াতে তারা বলে: “সুবহানাকা” “আপনি পবিত্র”। অর্থাৎ দোয়ার শুরুতে আল্লাহর তাসবীহ, মহিমা ও পরিপূর্ণতা স্বীকার করা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব।
(খ) জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাওয়া, “ফাকিনা আযাবান-নার”, “আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন”। এ থেকে বোঝা যায়, দোয়ার একটি প্রধান বিষয় হওয়া উচিত আখিরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা।
(গ) লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে মুক্তি কামনা, ১৯২ নম্বর আয়াতে জাহান্নামে প্রবেশকে চরম অপমান বলা হয়েছে। অতএব দোয়ায় শুধু কষ্ট দূর করার আবেদন নয়, বরং আল্লাহর কাছে সম্মানজনক পরিণতি চাওয়াও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
(ঘ) ঈমানের উপর অটল থাকার স্বীকারোক্তি, ১৯৩ নম্বর আয়াতে তারা বলে: “আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি এবং ঈমান এনেছি”। দোয়ার মধ্যে নিজের ঈমানের অঙ্গীকার ও হিদায়াতের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।
(ঙ) গুনাহ মাফ ও ত্রুটি মোচনের আবেদন, এই আয়াতে তিনটি বড় আবেদন আছে- “আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন”, “আমাদের পাপ মোচন করুন” এবং “নেককারদের সাথে মৃত্যু দিন”। এখানে দোয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মশুদ্ধি ও উত্তম পরিণতির আবেদন।
(চ) আল্লাহর প্রতিশ্রুত কল্যাণ প্রার্থনা, ১৯৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আপনার রাসূলদের মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন”। অর্থাৎ দোয়ার মধ্যে জান্নাত, রহমত, মাগফিরাত ও আল্লাহর ওয়াদাকৃত কল্যাণ চাওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
(ছ) কিয়ামতের দিনের সফলতা কামনা, “কিয়ামতের দিন আমাদের অপমানিত করবেন না”। এ থেকে বোঝা যায়, মুমিনের দোয়া দুনিয়াবিমুখ নয়; তবে তার কেন্দ্রবিন্দু আখিরাত।
(জ) নেক আমল কবুল হওয়ার আশা, ১৯৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ উত্তর দেন যে, তিনি কারও আমল নষ্ট করেন না। অতএব দোয়ার মধ্যে নিজের আমল কবুল হওয়ার আবেদন ও আশা থাকা উচিত। এক কথায়, এই আয়াতগুলো শেখায়- মুমিনের দোয়া শুধু দুনিয়ার প্রয়োজনে নয়; বরং ঈমান, ক্ষমা, হিদায়াত ও আখিরাতের সফলতাকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত।
৫। প্রচলিত ধারায় জ্ঞানী বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়, যার তথ্যভা-ার সমৃদ্ধ, বিশ্লেষণক্ষমতা প্রবল, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা উচ্চ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কখনো কখনো এমন প্রবণতাও দেখা যায় যে, কিছু মানুষের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, কিংবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে হালকা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে পারাকেও এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধুনিকতা বা কৃতিত্ব বলে মনে করা হয়। কিন্তু কুরআনের আলোকে জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যার চিন্তা তাকে ¯্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়, যার জ্ঞান তাকে বিনয়ী করে, এবং যার উপলব্ধি তাকে দোয়ার দরজায় দাঁড় করায়। ইমাম বাগভী (র.) বলেন:
“مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا أَيْ عَبَثًا لَا لِحِكْمَةٍ”.
অর্থ: “আপনি এসব অনর্থক বা হিকমতহীনভাবে সৃষ্টি করেননি”। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানী সৃষ্টিকে দেখে শুধু বাহ্যিক রূপ বা বেজ্ঞানিক তথ্যেই থেমে থাকে না; বরং এর পেছনে আল্লাহর হিকমত, কুদরত ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করে। তাই তাদের চিন্তার শেষ কথা হয়-
“رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ”.
এখানেই প্রচলিত জ্ঞানী ও কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানীর মৌলিক পার্থক্য। প্রচলিত জ্ঞান তথ্য বাড়ায়, আর কুরআনী জ্ঞান ঈমান, তাসবীহ, বিনয় ও আখিরাত-সচেতনতা বাড়ায়।
আজকের বাস্তবতায় মানুষের তথ্য বেড়েছে, বিশ্লেষণ বেড়েছে, কিন্তু তাফাক্কুর, আত্মসমালোচনা ও আল্লহভীতি অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে; ফলে অনেক শিক্ষিত মানুষও কুরআনের ভাষায় প্রকৃত “উলুল আলবাব” হয়ে উঠতে পারে না। এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, জ্ঞান তখনই সত্যিকার জ্ঞান হয় যখন তা যিকিরের সঙ্গে যুক্ত হয়, চিন্তাকে হিদায়াতে রূপ দেয়, গুনাহের জন্য ইস্তিগফারে উদ্বুদ্ধ করে এবং মানুষকে এই দোয়ায় পৌঁছে দেয়- অতএব আমাদের গুনাসমূহকে ক্ষমা করে দাও। অতএব আমাদের করণীয় হলো শুধু তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানকে তাফাক্কুরে, তাফাক্কুরকে যিকিরে, যিকিরকে আমলে এবং আমলকে আখিরাতমুখী দোয়ায় রূপান্তর করা; কারণ কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞানী সেই নয়, যে অনেক জানে, বরং সেই, যে সঠিকভাবে দেখে, গভীরভাবে চিন্তা করে, আল্লাহকে চিনে এবং সেই জ্ঞানকে জীবনের পথনির্দেশে পরিণত করে। (আল্লাহই ভালো জানেন)।
৬। উল্লেখিত আয়াতসমূহ আমাদেরকে তিনটি বিষয়ে বার্তা দিয়েছে:
(ক) প্রকৃত জ্ঞানীর পরিচয় প্রদান করেছে।
(খ) আল্লাহর কাছে দোয়া করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।
(গ) নারী-পুরুষের প্রকৃতি, আকৃতি ও অঙ্গন আলাদা হলেও তারা একে অপরের সহযোগী।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) একজন প্রকৃত জ্ঞানীর উচিৎ সর্বাবস্থায় দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে- জীবনের সব অবস্থায় অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে সচল রাখা। শুধু সালাতের ভেতর নয়; কাজের ফাঁকে, চলার পথে, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করা।
(খ) আকাশ, জমিন, রাত-দিনের পরিবর্তন, জীবন ও প্রকৃতির শৃঙ্খলা দেখে আল্লাহর কুদরত, হিকমত ও রহমত উপলব্ধি করার অভ্যাস গড়ে তোলা; শুধু দেখা নয়, দেখে শিক্ষা নেওয়া।
(গ) গুনাহ মাফ, অন্তরের শুদ্ধি, হিদায়াতে অটল থাকা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং নেককারদের সঙ্গ কামনা, এসবকে নিজের নিয়মিত দোয়ার অংশ করা।
(ঘ) শুধু তথ্য অর্জন নয়; যা জানা হয় তা জীবনচর্চায় প্রয়োগ করা, সত্যকে গ্রহণ করা, ভুল থেকে ফিরে আসা, প্রয়োজনে আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করা, এবং নিজের দায়িত্বের জায়গায় আমানতদার থাকা।

Leave a Reply

error: Content is protected !!