সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর
﴿مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ (179) وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (180)﴾ [سورة آل عمران: 179-180].
আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: ঈমানের মানদন্ড: পরীক্ষা, তাক্বওয়া এবং আমানত।
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
(১৭৯) আল্লাহ মুমিনদেরকে যে অবস্থায় তারা আছে, সে অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না, যতক্ষণ না তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে অপবিত্রকে পবিত্র থেকে পৃথক করে দেন। আর আল্লাহ তোমাদেরকে গায়েবের বিষয় জানিয়ে দেন না; তবে তিনি তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান, তাকে বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আনো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
(১৮০) আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ দিয়েছেন, তা নিয়ে কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য ভালো; বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণকর। তারা যে বিষয়ে কৃপণতা করেছে, কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলায় বেড়ি হিসেবে পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।
আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
১৭৯। আল্লাহ তায়ালা কখনোই মুমিনদেরকে এভাবে ছেড়ে দেবেন না যে, তাদের মধ্যে প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিক একাকার অবস্থায় থেকে যাবে; যতক্ষণ না তিনি প্রকৃত মুমিনকে মুনাফিক থেকে স্পষ্ট করে দেন। আর আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞার অংশ নয় যে, তিনি মুমিনদেরকে গায়েবের জ্ঞান জানিয়ে দেবেন, যার মাধ্যমে তারা প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিককে চিনে নিবে; বরং তিনি পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমেই তাদের পার্থক্য প্রকাশ করেন। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করেন এবং ওহির মাধ্যমে তাকে গায়েবের কিছু জ্ঞান দান করেন। অতএব তাদের উচিৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আর যদি তারা সত্যিকার ঈমান স্থাপন করে এবং আনুগত্যের মাধ্যমে তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তবে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য রয়েছে মহান প্রতিদান।
১৮০। যারা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ থেকে যে সম্পদ তাদের দান করেছেন, তাতে কৃপণতা করে এবং ফরজ কর্তব্য ও কল্যাণের পথে তা ব্যয় করে না, তারা যেন মনে না করে যে এই কৃপণতা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং এটি তাদের জন্য এক ভয়াবহ অকল্যাণকর, যার পরিণতি অত্যন্ত মন্দ। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে:
(ক) দুনিয়াতে কৃপণতার কারণে লাঞ্ছনা ও অপমান তাদের ভোগ করতে হয় এবং তার নেতিবাচক প্রভাব মানুষের আত্মার ওপর পড়ে।
(খ) আল্লাহ তাআলা আখিরাতে সেই সম্পদের মাধ্যমেই তাদের শাস্তি দিবেন যে সম্পদকে তিনি তাদের গলায় আগুনের বেড়ি বানিয়ে দিবেন, অথবা তা বিষধর সাপে রুপান্তরিত হয়ে তাদেরকে পেঁচিয়ে ধরবে। সে সাপ তার মালিককে বলবে: “আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন”, যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে যে কৃপণতায় কল্যাণ আছে, তার উচিত এ ধারণা ত্যাগ করা এবং বুঝে নেওয়া যে প্রকৃত কল্যাণ রয়েছে ব্যয় করার মধ্যেই, কৃপণতার মধ্যে নয়। আর যে সম্পদ সে কৃপণতা করে জমা রাখে, তা সহ জগতের সবকিছুই আসলে আল্লাহরই সম্পদ; শেষ পর্যন্ত আল্লাহই তার উত্তরাধিকারী হবেন। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৫-৪১৬; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৮০; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৮) ।
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ﴾ ‘যতক্ষণ না তিনি অপবিত্র থেকে পবিত্রকে আলাদা করেন’, এ আয়াতাংশে ‘অপবিত্র’ দ্বারা কাফের-মুনাফিককে বুঝানো হয়েছে এবং ‘পবিত্র’ দ্বারা মুমিনকে বুঝানো হয়েছে। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবা: ১/১০৩) । অর্থাৎ- বাহ্যিকভাবে সবাই এক কাতারে থাকলেও, সময়ের পরীক্ষায় অন্তরের অবস্থা প্রকাশ পায়। বিপদ, জিহাদ, ত্যাগ ও আনুগত্যের মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে যায়- কে আল্লাহর জন্য দৃঢ়, আর কে স্বার্থের অনুসারী। এভাবেই আল্লাহ মুমিনদেরকে অপবিত্র দল থেকে আলাদা করে নেন এবং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
﴿سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ﴾ ‘যে সম্পদের ব্যাপারে তারা কৃপণতা করেছে, তাদের গলায় তা বেড়ি হিসেবে পরানো হবে’, অর্থাৎ দুনিয়াতে যে সম্পদ তারা আঁকড়ে ধরে রেখেছিল এবং আল্লাহর নির্ধারিত পথে ব্যয় করেনি, সেই সম্পদই আখেরাতে শাস্তির রূপ ধারণ করবে। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন- এই ‘বেড়ি’ বা (طَوْق) বাস্তবও হতে পারে, আবার শাস্তির ভয়াবহতার রূপকও হতে পারে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বোঝা যায়- এটি বাস্তব শাস্তি হিসেবেই সংঘটিত হবে। অর্থাৎ কৃপণতার দ্বারা জমাকৃত সম্পদকে আল্লাহ আগুনের বেড়ি বা ভয়ংকর সাপের রূপে পরিণত করবেন। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَن آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ له مَالُهُ يَومَ القِيَامَةِ شُجَاعًا أقْرَعَ له زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَومَ القِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بلِهْزِمَتَيْهِ – يَعْنِي بشِدْقَيْهِ – ثُمَّ يقولُ أنَا مَالُكَ أنَا كَنْزُكَ، ثُمَّ تَلَا: ﴿لَا يَحْسِبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ﴾ الآيَةَ”.
অর্থ: “যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সেই সম্পদকে একটি বিষধর টাকওয়ালা সাপের রূপ দেওয়া হবে, যার মাথায় দুটি কালো দাগ থাকবে। কিয়ামতের দিন সেই সাপটিকে তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সে সাপ তার দুই চোয়াল দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে বলবে: ‘আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন’। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: ﴿لَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ﴾ “যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য কল্যাণকর”। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৮০)।
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৬-১৭৮) আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা কুফরির পথে দ্রæত অগ্রসরমান লোকদের আচরণ ও তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৭৯ নং আয়াতে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, মুমিনদেরকে তিনি এমন অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না যেখানে খাঁটি মুমিন ও মুনাফিক একাকার হয়ে থাকবে; বরং পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমে অপবিত্র ও পবিত্রকে পৃথক করে দেবেন। আর ১৮০ নং আয়াতে সেই অন্তরের কলুষতার একটি বাস্তব নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে- আল্লাহর দানকৃত সম্পদে কৃপণতা করা ও যাকাত আদায় না করা, যা ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ এবং যার পরিণতি আখেরাতে কঠিন শাস্তি। এভাবে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সমস্যার উল্লেখ, পরবর্তী আয়াতগুলোতে তার ব্যাখ্যা ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট ও অর্থবহ ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছে। (আল্লাহই ভালো জানেন)।
১৭৯ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
সুদ্দী (রহ.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মতকে তাদের অবয়বসহ আমার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেমন আদমের (আ.) সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে আমি জেনে গেছি, কে আমার প্রতি ঈমান আনবে আর কে কুফরি করবে”। এই কথা মুনাফিকদের কাছে পৌঁছলে তারা বিদ্রæপ করে বলল: “মুহাম্মদ দাবি করে যে, সে জানে কে তার ওপর ঈমান আনবে আর কে কুফরি করবে, অথচ আমরা তার সাথেই আছি, কিন্তু সে আমাদের চিনতে পারছে না!”। তখন আল্লাহ তাআলা ১৭৯ নং আয়াত নাজিল করেন।
কালবী (রহ.) বলেন: কুরাইশরা বলেছিল: “হে মুহাম্মদ! তুমি দাবি কর যে, যারা তোমার বিরোধিতা করে তারা জাহান্নামে যাবে এবং আল্লাহ তাদের ওপর অসন্তুষ্ট, আর যারা তোমার দ্বীন অনুসরণ করে তারা জান্নাতি এবং আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাহলে আমাদের বলে দাও কে তোমার ওপর ঈমান আনবে আর কে আনবে না”। এরপর আল্লাহ তাআলা ১৭৯ নং আয়াত অবতীর্ণ করেন।
আবু আলিয়া (রহ.) বলেন: “মুমিনরা চেয়েছিল, যেন তাদের এমন কোনো নিদর্শন দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিককে পৃথক করা যায়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন। (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহিদী: ৭৫/৭৬, আল-তাফসীর আল-কাবীর: ৪/২৮৮) ।
আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
সূরাতু আলে ইমরানের (১৭৯-১৮০) আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা ঈমান ও কুফরের প্রকৃত পার্থক্য, গায়েবী জ্ঞানের সীমা এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর পরীক্ষা ও দয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। এ আয়াতদ্বয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহ মুমিন ও মুনাফিককে আলাদা করে প্রকাশ করার জন্য মানুষকে পরীক্ষার মধ্যে রাখেন এবং গায়েবের পূর্ণ জ্ঞান কেবলমাত্র তাঁরই অধিকার। একই সঙ্গে এতে দুনিয়ার সম্পদ ও আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত নিয়ে অহংকার না করে কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধের সাথে ব্যবহার করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
১। ১৭৯ নং আয়াত থেকে চারটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়-
(ক) মানুষকে তাকলীফ বা দায়িত্ব আরোপের উদ্দেশ্য হলো সত্যিকারের মুমিনকে আলাদা করা, আল্লাহ তায়ালা মানুষের উপর বিভিন্ন ফরজ ও দায়িত্ব আরোপ করেছেন যেমন নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ এবং জিহাদ। এই তাকলীফ কেবল বাহ্যিক বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং অন্তরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের একটি মাধ্যম। ১৭৯ নং আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি মুমিনদের এমন অবস্থায় ছেড়ে দিবেন না যেখানে প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিক একাকার হয়ে থাকবে। বরং পরীক্ষা, বিপদ এবং দায়িত্ব পালন বা ত্যাগের মাধ্যমে আলাদা করা হবে, যা দেখাবে কে সত্যিকারের ঈমানদার এবং সৎকর্মশীল, আর কে বাহ্যিকভাবে নামধারী ঈমানদার। সুতরাং তাকলীফ বা দায়িত্ব আরোপ মানব চরিত্র ও নৈতিক অবস্থার একটি পরীক্ষা, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক পরিচয় প্রকাশ করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) । এ ছাড়াও অন্য আরেকটি আয়াতে আরো স্পষ্টভাবে এসেছে-
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ – وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾ [سورة العنكبوت: ২-৩].
অর্থ: “মানুষ কি মনে করে যে তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? নিশ্চয়ই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি, যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে প্রকাশ করেন এবং মিথ্যাবাদীদেরকে প্রকাশ করেন” (সূরাতু আল-আনকাবুত: ২-৩) । একই কথা বলা হয়েছে- সূরাতু আল-বাক্বারার ২১৪, সূরাতু আলে-ইমরানের ১৪২ এবং সূরাতু মোহাম্মদের ৩১ নং আয়াতসমূহে।
(খ) গায়েবী জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা, আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি নির্দেশ করে যে, গায়েবের জ্ঞান কেবল আল্লাহর অধিকার, এবং মানুষ তা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে জানে না। তবে আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞার অনুযায়ী কিছু অংশ তাঁর রাসূলদের জানাতে পারেন, যা উম্মতকে সঠিক পথ প্রদর্শন ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। এটি মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা ও আধ্যাত্মিক পরীক্ষা নির্দেশ করে। মানুষের বোধ ও জ্ঞান সীমিত; তাই তারা ভবিষ্যত ও অন্তরের জটিলতায় পূর্ণভাবে ধারণা রাখতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, স্বাধীন চিন্তা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আল্লাহ তায়ালা যে অংশ জানাতে চান, তা মানুষের নৈতিক এবং আত্মিক উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) । এ সম্পর্কে সূরাতু আল-আনয়ামে বলা হয়েছে-
﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ﴾ [سورة الأنعام: ৫৯].
অর্থ: “গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে; তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না” (সূরাতু আল-আনয়াম: ৫৯) । এ ছাড়াও কোরআনের আরো অনেক আয়াতে এ সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে- রাসূলুল্লাহ (সা.) কি গায়েব জানতেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে ওলামায়ে কেরাম বলেন: এ কথা বলা যাবে না যে রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবের বিষয়ে সর্বজ্ঞ; বরং তিনি গায়েব সম্পর্কে ততটুকুই জানতেন, যতটুকু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿عَالِمُ الْغَيْبِ فَلا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً – إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُول﴾ [سورة الجـن:২৬-২৭].
অর্থ: “তিনি গায়েবের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গায়েব কাউকে প্রকাশ করেন না, তবে যাকে তিনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করেন তাকে ছাড়া” (সূরাতু জিন: ২৬-২৭)। অতএব গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্দিষ্ট। যেমন আল্লাহ বলেন-
﴿قُلْ لا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ﴾ [سورة النمل:৬৫].
অর্থ: “বলুন, আসমান ও জমিনে যারা আছে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কেউই গায়েব জানে না; আর তারা জানেও না কখন তাদের পুনরুত্থান করা হবে” (সূরাতু নামল: ৬৫)।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবের কোনো বিষয়ই জানতেন না, আল্লাহ যা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন ও অবহিত করেছেন তা ছাড়া। (ইসলাম ওয়েব, ইবনু বা’য) । রাসূলুল্লাহ (সা.) যে গায়ব জানেন না, এ বিষয়ে কোরআনে তার নিজের স্বীকারোক্তি রয়েছে-
﴿قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ ۚ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ﴾ [سورة الأعراف: ১৮৮].
অর্থ: “বলুন, আমি নিজের জন্যও কোনো উপকার বা ক্ষতির মালিক নই, আল্লাহ যা চান তা ছাড়া। আর যদি আমি গায়েব জানতাম, তবে অবশ্যই আমি প্রচুর কল্যাণ অর্জন করতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা সেই সব মানুষের জন্য যারা ঈমান আনে” (সূরাতু আল-আ‘রাফ: ১৮৮)।
সমাজে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, অনেক ওলামায়ে কেরাম যখন কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে ব্যর্থ অথবা অজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তখন তারা বলে থাকেন: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন”। এ কথাটি শুনতে সঠিক মনে হলেও উল্লেখিত ব্যাখ্যার আলোকে এ কথাটি সঠিক নয়, কারণ অদৃশ্য বিষয় সহ সবকিছুর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর রয়েছে। সুতরাং না জানার অপারগতা প্রকাশের সময় বিষয়টিকে শুধু আল্লাহর দিকেই সোপর্দ করতে হবে।
অতএব, সঠিক এবং নির্ভুল বক্তব্য হবে: “আল্লাহই ভালো জানেন”। এই বাক্যটি আল্লাহর সর্বজ্ঞতা ও পূর্ণ জ্ঞানকে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়াও, এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে আমাদের সকল প্রশ্ন এবং সন্দেহের চূড়ান্ত নির্ভরযোগ্য উৎস শুধুমাত্র আল্লাহ, নবী-রাসূলরা শুধু আল্লাহর শিক্ষা ও নির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। (ইবনু বা’য পেইজ থেকে) ।
(গ) চিরস্থায়ী সফলতার মূল ভিত্তি ঈমান ও তাকওয়া, আয়াতের তৃতীয়াংশ নির্দেশ করে যে, জান্নাত অর্জনের মূল ভিত্তি হলো- ঈমান ও তাকওয়া, অর্থাৎ অন্তরের বিশ্বাস, আল্লাহভীতি, সতর্কতা এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলার মানুষিকতা। এটি মূল্যবোধ ও নৈতিক ক্রমের তত্ত¡ প্রতিফলিত করে, চ‚ড়ান্ত ফলাফল কেবল বাহ্যিক ক্ষমতা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে না। প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের অন্তরের বিশুদ্ধতা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং নৈতিক সচেতনতার ভিত্তিতে। তাই জান্নাতের অর্জন হলো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীর ফসল, যা মানুষের চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও আত্মিক পরিশীলনাকে মূল্যায়ন করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) ।
(ঘ) আল্লাহর খবর রাখার বিষয়টি জ্ঞানত্ত¡ (ঊঢ়রংঃবসড়ষড়মু), সত্তাতত্ত¡ (ঙহঃড়ষড়মু) এবং নৈতিক দর্শন (গড়ৎধষ চযরষড়ংড়ঢ়যু) এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে একত্রে স্পর্শ করে:
প্রথমত, জ্ঞানতত্তে¡র দিক থেকে ‘খবীর’ শব্দটি কেবল বাহ্যিক কাজের জ্ঞান নয়, বরং কাজের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য, নিয়ত, প্রেরণা ও পরিণতি পর্যন্ত বিস্তৃত সর্বজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। মানুষের জ্ঞান আংশিক ও সীমাবদ্ধ; সে শুধু দৃশ্যমান আচরণ বিচার করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী ও গভীর, যেখানে কর্মের দৃশ্য-অদৃশ্য, প্রকাশ-গোপন সবই অন্তর্ভুক্ত। এতে বোঝা যায়, বাস্তবতার পূর্ণ জ্ঞান কেবল ঐশী জ্ঞানের মধ্যেই সম্পূর্ণতা লাভ করে। সূরাতু আল-মুলক এর ১৪ এবং সূরাতু আল-গাফির এর ১৯ নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
দ্বিতীয়ত, সত্তাতত্তে¡র আলোকে এই আয়াত মানুষের অস্তিত্বকে নৈতিকভাবে অর্থবহ সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের প্রতিটি কর্ম শুধু একটি শারীরিক ঘটনা নয়; বরং তা অস্তিত্বের স্তরে একটি নৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে, যা আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ, মানুষের কাজ নিঃশেষ হয়ে যায় না; বরং তা সত্তাগতভাবে মূল্যায়িত হয়। সূরাতু আল-কাহফ এর ৪৯ এবং সূরাতু যিলযাল এর (৭-৮) নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
তৃতীয়ত, নৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে আয়াতাংশটি নৈতিক জবাবদিহিতার (গড়ৎধষ অপপড়ঁহঃধনরষরঃু) ভিত্তি স্থাপন করে। যেহেতু আল্লাহ সব কাজ সম্পর্কে অবগত, তাই নৈতিকতা এখানে আপেক্ষিক নয়; বরং এক সর্বজ্ঞ নৈতিক কর্তৃত্বের সাথে সংযুক্ত। মানুষ সমাজ বা আইনের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু ঐশী জ্ঞান থেকে পালানোর কোনো অস্তিত্বগত সুযোগ নেই। এতে মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতার দিকে ধাবিত হয়। সূরাতু আস-সাফফাত এর ২৪ এবং সূরাতু ইসরা এর ৩৬ নং আয়াত এ কথার দলীল বহণ করে।
(ঙ) গায়েবী বিষয়ে অযথা ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা-ই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। উল্লেখিত আয়াত থেকে জানা যায়, কাফেররা অদৃশ্য বিষয় নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করত, যার পেছনে হিদায়াত গ্রহণের আগ্রহ ছিল না; বরং উদ্দেশ্য ছিল তর্ক, উপহাস ও রাসূলুল্লাহকে (সা.) বিরক্ত করা। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, গায়েবী বিষয়ের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র তাঁরই কাছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ থেকে কিছু জানেন না; বরং আল্লাহ যতটুকু ওহীর মাধ্যমে তাঁকে জানিয়েছেন, ততটুকুই তিনি মানুষকে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং মানুষের করণীয় হলো- গায়েবের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে সময় নষ্ট না করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু জানিয়েছেন, তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করা এবং তাতে ঈমান আনা। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৪/২৯০) ।
২। ১৮০ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়-
(ক) সম্পদের ব্যাপারে কৃপণতা করা কৃপণ ব্যক্তির জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়, যদিও কৃপণরা মনে করে এতে তাদের উপকার হচ্ছে। বাস্তবে কৃপণতা মানুষের অন্তরকে সংকীর্ণ করে, সমাজে ঘৃণার জন্ম দেয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। দুনিয়াতে কৃপণ ব্যক্তি সম্মান হারায় এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়। অতএব কৃপণতা কোনো উপকার নয়; বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে কৃপণের জন্য ক্ষতিকর।
(খ) যাকে আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দিয়েছেন অথচ সে সেই সম্পদের মধ্যে আল্লাহ নির্ধারিত হক আদায় করেনি, তাকে কিয়ামতের দিন সেই সম্পদের মাধ্যমেই শাস্তি দেওয়া হবে। কুরআনের আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, কৃপণরা যে সম্পদ জমা করে রেখেছে, তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বা আগুনের হার হিসেবে পরিণত হবে। এটি প্রমাণ করে যে সম্পদ আমানত, আর সেই আমানতের হক আদায় না করলে তা শাস্তিে কারণ হবে।
(গ) আসমান-যমীন এবং তাতে বিরজমান সকল সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তায়ালা। ১৮০ নং আয়াতের আলোকে প্রতিয়মান হয় যে, আসমান ও যমীন এবং তাতে বিদ্যমান সমস্ত সম্পদের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। মানুষ যে সম্পদকে নিজের বলে ধারণ করে, তা বাস্তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি অস্থায়ী আমানত মাত্র। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা ঘাষণা করেন- “আল্লাহরই জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের মীরাস”, অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সব সম্পদ তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, মানুষের মালিকানা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর মালিকানা চিরস্থায়ী। তাই সম্পদের ব্যাপারে কৃপণতা করা বা আল্লাহর নির্ধারিত হক আদায় না করা চরম ভ্রান্তি; কারণ যে সম্পদ নিয়ে মানুষ অহংকার করে, তা একদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে এবং সেই সম্পদের ব্যবহারের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই আয়াত মুমিনকে সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল, আমানতদার ও আল্লাহভীরু করে তোলে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত মালিকের নির্দেশ অমান্য করে কোনো সম্পদই কল্যাণের কারণ হতে পারে না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৭) ।
আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) পরীক্ষা ও বিপদে ধৈর্য ধারণ করা, কারণ এর মাধ্যমে প্রকৃত মুমিনকে প্রকাশ করা হয়।
(খ) ঈমান ও তাকওয়াকে দৃঢ় করা, কারণ চিরস্থায়ী সফলতা এর উপরই নির্ভরশীল।
(গ) গায়েবী বিষয়ে আল্লাহর হিকমতের উপর ভরসা রাখা, এবং অজানা বিষয়ে “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন” এর পরিবর্তে “আল্লাহই ভালো জানেন” বলা।
(ঘ) সম্পদের মধ্যে আল্লাহর নির্ধারিত হক যথাযথভাবে আদায় করা।
(ঙ) কৃপণতা ও লোভ পরিহার করে দানশীলতা অবলম্বন করা, কারণ কৃপণতা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের জন্য জন্য ক্ষতিকর।
(চ) আখিরাতে জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে জীবন পরিচালনা করা, কারণ প্রত্যেক আমলের হিসাব আল্লাহ নেবেন।
