﴿وَلا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسارِعُونَ فِي الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئاً يُرِيدُ اللَّهُ أَلاَّ يَجْعَلَ لَهُمْ حَظًّا فِي الْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذابٌ عَظِيمٌ (176) إِنَّ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْكُفْرَ بِالْإِيْمانِ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئاً وَلَهُمْ عَذابٌ أَلِيمٌ (177) وَلا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّما نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّما نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدادُوا إِثْماً وَلَهُمْ عَذابٌ مُهِينٌ (178)﴾ [سورة آل عمران: 176-177].
আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: উহুদের পর রাসূলুল্লাহকে (সা.) আল্লাহ কর্তৃক সান্তনা প্রদান।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৭৬। যারা দ্রুত কুফরের পথে ধাবিত হয়, তাদের কারণে আপনি হতাশ বা দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। তারা কখনও আল্লাহকে ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ চান না যে তারা আখেরাতে কোনো অংশ লাভ করুক, আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
১৭৭। যারা ঈমানকে বিক্রি করে কুফর গ্রহণ করে, তারা কখনও আল্লাহকে কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
১৭৮। কাফেরেরা যেন ভুল ধারণা না করে যে, আল্লাহ তাদের অবকাশ দিচ্ছেন এবং এটি তাদের জন্য কল্যাণ। বরং আল্লাহ তাদের অবকাশ দেন, যাতে তারা আরও পাপে ডুবে যায়। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্চনাদায়ক ও অপমানজনক আযাব।
আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৭৬। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সান্তনা দিয়ে বলেন: কাফিররা জেদ ও ভ্রান্তির পথে যতই এগিয়ে যাক না কেন, এতে আপনার মন যেন দুঃখিত না হয়। তাদের এসব আচরণ আপনার কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম নয়; বরং তারাই বঞ্চিত হয় ঈমানের মাধুর্য ও আখিরাতের মহাপুরস্কার থেকে। আল্লাহ চান- যেহেতু তারা সত্যের আহ্বান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাই আখিরাতে তাদের জন্য কোনো পুরস্কার থাকবে না। আর পরিণতিতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠোর শাস্তি।
১৭৭। যারা ঈমান ছেড়ে কুফরকে বেছে নিয়েছে, তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারে না; কারণ মানুষের অবিশ্বাস আল্লাহর মহিমাকে ছুঁতে পারে না। আসলে তারা ক্ষতি করে নিজেদেরই সত্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে, অন্তরের প্রশান্তি হারিয়ে এবং আখিরাতের মুক্তি নষ্ট করে। দুনিয়ায় তারা হয়তো নিজেদের পথকে সফল ভেবে আনন্দিত থাকে, কিন্তু পরিণামে তাদের জন্য অপেক্ষা করে এমন শাস্তি, যার যন্ত্রণা কল্পনার অতীত। আল্লাহর পথ ত্যাগ করে তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে।
১৭৮। অবিশ্বাসীরা যেন কখনোই ভুল ধারণায় না পড়ে- যখন আল্লাহ তাদেরকে দীর্ঘ আয়ু দেন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস উপভোগের সুযোগ দেন এবং তাদের পাপ-অপরাধের কারণে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না, তখন যেন তারা না ভাবে যে এটি তাদের জন্য কোনো সম্মান বা কল্যাণ। বাস্তবে তা মোটেও কল্যাণ নয়, বরং আল্লাহ তাদের শাস্তি বিলম্বিত করছেন একটি গভীর উদ্দেশ্যে; যাতে এই অবকাশের সময় তারা আরও বেশি অন্যায়, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনে ডুবে যায়, ফলে তাদের অপরাধের বোঝা ভারী হয়। পরিণামে আখিরাতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এমন কঠিন শাস্তি, যা শুধু কষ্টদায়কই নয়, বরং অপমানজনক ও লাঞ্ছনাপূর্ণ হবে, যেন তাদের দুনিয়ার সমস্ত অহংকার ও উচ্ছৃঙ্খলতা ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। সুতরাং কাফিরদের জন্য দুনিয়ায় সুযোগ পাওয়া কোনো মর্যাদা নয়; বরং তা তাদের জন্য শাস্তির আগাম ভূমিকা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৭-৭৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৭-১১৮) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿نُمْلِي لَهُمْ﴾ ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দেই’, এ আয়াতাংশে আল্লাহ তায়ালার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় কাফির, অবাধ্য ও পাপাচারীদেরকে তাদের অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না। বরং তাদেরকে সময় দেন, তাদের পাপের পরিসর বাড়তে দেন, তাদের চক্রান্ত অব্যাহত রাখতে সুযোগ দেন এবং দুনিয়ার কিছু ভোগ-বিলাসও উপভোগ করতে দেন। বাহ্যত এগুলো সফলতা বা সুযোগ মনে হলেও বাস্তবে তা একটি কঠোর পরীক্ষা; কারণ এই অবকাশই তাদের ভবিষ্যতের শাস্তি আরও ভারী ও নিশ্চিত করার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। সূরাতু মারইয়ামে এ শব্দটির অর্থ আরও পরিষ্কারভাবে এসেছে:
﴿وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا﴾ [سورة مريم: ৪৬].
অর্থাৎ- “কিছু সময়ের জন্য আমাকে ছেড়ে দাও” (সূরাতু মারইয়াম: ৪৬) । এভাবে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের যে সময় বৃদ্ধি করেন, তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের চূড়ান্ত পরিণতিকে আরও ন্যায্য, সুস্পষ্ট এবং কঠিন করে তোলার জন্যই এ অবকাশ দেওয়া হয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০৩) ।
﴿اشْتَرَوُا الْكُفْرَ بِالْإِيْمانِ﴾ ‘তারা কুফরীকে ঈমানের বিনিময়ে ক্রয় করেছে’, আয়াতাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- তারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরিকে বেছে নিল। যেমন একজন ক্রেতা কোনো পণ্য কেনার সময় মূল্য দিয়ে বিনিময় করে, ঠিক তেমনভাবেই তারা সত্য ঈমানকে ত্যাগ করে তার বদলে কুফরিকে গ্রহণ করল। সুতরাং এখানে “কেনা” শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বোঝায়: সচেতনভাবে, জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তারা কুফরিকে নিজেদের জন্য লাভজনক মনে করে গ্রহণ করল; যদিও বাস্তবে এটি তাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৫) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে অন্যান্য আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের সাময়িক জয় এবং মুসলমানদের ওপর নেমে আসা বিপুল কষ্টকে পুঁজি করে মুনাফিকরা তাদের স্বভাবসিদ্ধ সুযোগসন্ধানী চরিত্র প্রকাশ করে। তারা বলতে শুরু করল: “যদি মুহাম্মাদ সত্যিকারের নবি হতেন, তাহলে তিনি পরাজিত হতেন না, আহত হতেন না; বরং তিনি শুধু রাজত্বের লোভে এগোচ্ছেন; কখনো জয় পান, আবার কখনো হারেন”। এভাবে তারা কুফরিকে সমর্থন দিল আর মুমিনদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করল, যেন তারা জিহাদ থেকে বিরত থাকে। এই অপপ্রচার ও বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা রাসূলুল্লাহর (সা.) হৃদয়ে বেদনা সৃষ্টি করল। কিন্তু তখন আল্লাহ তায়ালা সান্তনা হিসেবে এসব আয়াত নাজিল করলেন, যা রাসূলুল্লাহর মন থেকে দুঃখ ও কষ্ট দূর করে দিল, যেমন আগেও তিনি সান্তনা দিয়েছেন যখন কাফিররা ঈমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত, কুরআনের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ ছড়াত বা স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা.) মর্যাদার বিরুদ্ধে কথা বলত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূলকে আগে এভাবেও বলেছিলেন:
﴿وَلَا يَحْزُنكَ قَوْلُهُمْ إِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا﴾ [سورة يونس: ৬৫].
অর্থ- “তাদের কথায় আপনি দুঃখিত হবেন না; সমস্ত মর্যাদা তো আল্লাহর নিকটই” (সূরাতু ইউনুস: ৬৫) । আরেক জায়গায় বলেছিলেন:
﴿فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَـٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا﴾ [سورة الكهف: ৬].
অর্থ: “হয়তো আপনি দুঃখে নিজের জীবনই নষ্ট করে ফেলবেন, যদি তারা এ কুরআনে ঈমান না আনে” (সূরাতু আল-কাহ্ফ: ৬) ।
এভাবে আসমানী সান্তনা রাসূলুল্লাহকে (সা.) দৃঢ়তা ফিরিয়ে দিল, মন থেকে দুঃখ দূর করল এবং বুঝিয়ে দিল মুনাফিকদের ফোঁড়ন কিংবা কাফিরদের বিদ্বেষ আল্লাহর পরিকল্পনা ও নবীর সত্যতার ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে না। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭৬)।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭৬-১৭৮) আয়াতগুলো উহুদ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হয়ে মুমিনদের অন্তরে দৃঢ়তা ও প্রশান্তি সঞ্চার করে। এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা একদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামকে কাফেরদের শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র দেখে হতাশ না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যদিকে অবিশ্বাসীদের প্রকৃত অবস্থান ও পরিণতি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। এখানে ঈমান ত্যাগের ভয়াবহতা, কাফেরদেরকে আল্লাহর অবকাশের বাস্তব অর্থ এবং অহংকারীদের চ‚ড়ান্ত শাস্তির চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই আয়াতগুলো মুমিনদের জন্য একদিকে সান্তনা, অন্যদিকে গভীর সতর্কবার্তা এবং সর্বোপরি ঈমানকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার এক সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
১। ১৭৬ নং আয়াত থেকে দুইটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা যায়:
(ক) উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের কর্মকান্ডে রাসূলুল্লাহকে মানসিক প্রশান্তি প্রদান, আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সকল মুসলিমদেরকে আশ্বস্ত করেছেন। উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের শত্রুতার কারণে যদি কেউ দুঃখিত বা হতাশ হয়, তাহলে এটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। কারণ কাফেররা আল্লাহর পরিকল্পনা বা শক্তিকে কোনোভাবেই ক্ষতি করতে পারবে না। এ সম্পর্কে অন্য আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا﴾ [سورة النساء: ৭৬].
অর্থ: “শয়তানের চক্রান্ত বড়ই দুর্বল” (সূরাতু আন-নিসা: ৭৬) । এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ولو اجتَمَعوا على أن يضرُّوكَ بشَيءٍ لم يَضرُّوكَ إلَّا بشيءٍ قد كتبَهُ اللَّهُ عليكَ” (سنن الترمذي: ২৫১৬).
অর্থ: “আর যদি তারা সবাই একত্রিত হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবুও তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, সেটুকু ছাড়া যা আল্লাহ তোমার জন্য পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন” (সুনান আল-তিরমিযী: ২৫১৬)। মুসলিমদের উচিত এই শিক্ষা গ্রহণ করা যে, জীবন বা যেকোনো প্রতিকূলতা আমাদের বিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারবে না, যদি আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি এবং ধৈর্যশীল থাকি।
(খ) পার্থিব জীবনের ক্ষণিক আনন্দ উপভোগ ছাড়া কাফেরদের জন্য আখরাতে কোনো অংশ নেই, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে অবিশ্বাসীরা আখেরাতে কোনো অংশ লাভ করতে পারবে না। তারা শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণিক আনন্দ উপভোগ করতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী সাফল্য বা শান্তি পাবে না। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ﴾ [سورة هود: ১৬].
অর্থ: “তাদের জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই” (সূরাতু হুদ: ১৬) । এটি মুসলিমদেরকে শক্তি দেয় যে, কাফেরদের কর্মকান্ডের জন্য কখনো মনোবল হারানো উচিত নয়। আখেরাতের প্রকৃত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এবং যারা অবিশ্বাসে তাড়াহুড়া করে চলে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তি নিশ্চিত। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪)।
২। ১৭৭ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় প্রতিফলিত হয়:
(ক) ঈমান ত্যাগ করে কুফরের পথে ফিরে যাওয়ার ভয়াবহতা, আয়াতটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যারা একবার ঈমান আনে কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করে কুফরের পথে ফিরে যায়। তাদের আচরণকে আল্লাহ খুবই গুরুতর মনে করেন। তারা ঈমানকে ত্যাগ করে কুফরের সঙ্গে বিনিময় করে এবং সত্যপথের পরিবর্তে ভ্রান্ত পথ গ্রহণ করে। এটি শুধুই তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং আখেরাতেও তাদের জন্য কঠিন ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং ঈমানকে কখনো হালকা ভাবে নেওয়া বা তুচ্ছভাবে ত্যাগ করা ঠিক নয়।
(খ) মুরতাদরা আল্লাহকে ক্ষতি করতে পারবে না, আয়াতে বলা হয়েছে, “لَنْ يَضُرُّوا اللهَ شَيْئاً”, অর্থাৎ এই ধরনের অবিশ্বাসীরা আল্লাহকে কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের অবিশ্বাস, প্রতারণা বা বিদ্বেষ আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে। মুসলিমদের জন্য এর অর্থ হলো, আমাদের জীবনের কোনো প্রতিকূলতা বা শত্রুদের শত্রুতার কারণে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং যিনি ইচ্ছা করেন, তিনি তার সৃষ্টির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
(গ) মুরতাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা, আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, এই ধরনের মানুষদের জন্য “عَذَابٌ أَلِيمٌ”, অর্থাৎ কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্ধারিত। এখানে ‘আলিম’ বোঝায় এমন শাস্তি, যা সবচেয়ে তীব্র বেধনাদায়ক। এটি তাদের অবিশ্বাস এবং ঈমানের সঙ্গে প্রতারণার প্রতিফলন। সুতরাং ঈমান ত্যাগ করে কুফর গ্রহণ করা শুধু দুনিয়ার জীবনের জন্যই বিপদজনক নয়, বরং আখেরাতেও চরম শাস্তি নিয়ে আসে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১৪)। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে-
﴿وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ﴾ [سورة البقرة: ২১৭].
অর্থ: “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন থেকে ফিরে যায়, অতঃপর সে কুফর অবস্থায় মারা যায়, তাদের সব আমলই নষ্ট হয়ে যাবে” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২১৭) । আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“مَن بدَّلَ دينَه فاقتُلوهُ” (صحيح البخاري: ৩০১৭).
অর্থ: “যে দ¦ীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো” (সহীহ আল-বুখারী: ৩০১৭) । সুতরাং উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস পর্যালোচনা করে মুরতাদের জন্য তিনটি শাস্তি পাই: (ক) তাদের জন্য জাহান্নামের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে, (খ) তাদের সকল সৎআমল নষ্ট হয়ে যাবে, এবং (গ) তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।
৩। ১৭৮ নং আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে,
(ক) পার্থিব জীবনে কাফেরদের অবকাশ দেওয়া তাদের জন্য কল্যাণকর নয়, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। কাফের সহ সাধারণ মানুষের ধারণা যে, আল্লাহ তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন, জীবন দীর্ঘ করছেন এবং দ্রæত শাস্তি দিচ্ছেন না, এটা বুঝি তাদের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতের প্রথমাংশে স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি মোটেও তাদের জন্য ভালো নয়, বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণ ও ধ্বংসের কারণ। দুনিয়ায় শাস্তি বিলম্বিত হওয়া কখনোই আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়।
(খ) কাফেরদেরকে দুনিয়াতে অবকাশের প্রকৃত উদ্দেশ্য- তাদের গুনাহ বৃদ্ধি করা, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে আল্লাহ বলেন: “আমি তাদেরকে সময় দেই এজন্য নয় যে তারা ভালো হয়ে যাবে, বরং এজন্য যে তারা আরও বেশি গুনাহে লিপ্ত হবে”। যত দিন তাদের জীবন দীর্ঘ হচ্ছে, তত দিন তারা নতুন নতুন পাপ অর্জন করছে। ফলে তাদের অপরাধের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। এই অবকাশ শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংসকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
(গ) কাফেরদের দীর্ঘ জীবন ও বড় শাস্তির সম্পর্ক, এই আয়াতের শেষাংশ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা জানা যায়- যত বেশি সময় তারা কুফর ও অবাধ্যতায় কাটায়, তত বড় হয় তাদের শাস্তির কারণ। জীবনের প্রতিটি দিন যদি গুনাহে ভরে যায়, তাহলে সেই দীর্ঘ জীবন তাদের জন্য রহমত নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। শেষপর্যন্ত তারা এমন ধ্বংসে নিপতিত হবে, যার তুলনা নেই। এই শাস্তি শুধু কষ্টদায়কই নয়, বরং চরম লাঞ্ছনাকর। কারণ দুনিয়ায় তারা অহংকার করত, নিজেদের বড় মনে করত, মানুষকে তুচ্ছ করত এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করত। তাই আল্লাহর ন্যায়বিচারের দাবি অনুযায়ী তাদের শাস্তিও হবে এমন, যা তাদের অহংকার চূর্ণ করবে এবং তাদেরকে অপমানিত করবে।
আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) শত্রুর বিরোধিতা, কষ্ট, ষড়যন্ত্র বা সাময়িক ক্ষতি দেখে হতাশ না হওয়া; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং ধৈর্য অবলম্বন করা।
(খ) ঈমানকে আগলে রাখা, সন্দেহ, চাপ বা লোভের কারণে ঈমান ত্যাগ না করা এবং দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা।
(গ) দুনিয়ায় সময় পাওয়া, জীবন দীর্ঘ হওয়া বা শাস্তি বিলম্বিত হওয়াকে নিরাপত্তা মনে না করে, তার মাধ্যমে তাওবা, সংশোধন ও নেক আমলে ফিরে আসা।
