Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭২-১৭৫) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: বিপদের পরেও অটুট ঈমান, অদম্য সাহস এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৭২-১৭৫) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ (172) الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (173) فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ (174) إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (175)﴾ [سورة آل عمران: 172-175].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: বিপদের পরেও অটুট ঈমান, অদম্য সাহস এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৭২। যারা উহুদে আঘাতের পরও আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার, বিশেষ করে যারা তাদের মধ্যে সৎকর্ম করেছে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে।
১৭৩। যাদেরকে লোকেরা বলেছিল: “নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে লোকেরা জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তাদেরকে ভয় করো”, তাতে তাদের ঈমান দুর্বল হয়নি; বরং তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলল: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই উত্তম হেফাজতকারী”।
১৭৪। অতঃপর তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছে। তাদের কোনো ক্ষতি স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
১৭৫। এটি শয়তানের কৌশল যে সে তার বন্ধুদেরকে ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; বরং আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়ে থাকো।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
এ আলোচনার ধারাবাহিকতা এখনো উহুদ যুদ্ধ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে চলছে। নিচের চারটি আয়াতই সেই মুমিনদের সম্পর্কে, যারা শনিবার উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল এবং রবিবার আবু সুফিয়ানকে অনুসরণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)।
১৭২। যারা উহুদ যুদ্ধে আহত ও ক্লান্ত অবস্থাতেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে মুশরিকদের পিছু ধরে ‘হামরাউল আসাদ’-এর দিকে রওনা হয়েছিল, তারা নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রয়াস ব্যয় করেছিল এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশনা পূর্ণভাবে মেনে চলেছিল। তাদের মধ্যে যারা উত্তম আমল করেছে ও আল্লাহকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহামূল্যবান প্রতিদান।
১৭৩। তাদের মধ্যেই সেই মানুষরা রয়েছে যারা শত্রুদের ভয় দেখানোর চেষ্টা সত্তে¡ও দমে যায়নি। আব্দুল কায়েস গোত্রের কিছু লোক এসে বলেছিল, “আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা তোমাদের বিরুদ্ধে আবার সম্পূর্ণ পস্তুত; তাই তাদের ভয় করো, কারণ তোমাদের শক্তি তাদের মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত নয়”। কিন্তু এই ভীতি তাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করল এবং তারা আল্লাহর প্রতিশ্রæতিতে আরও বিশ্বাসী হলো। এতে তারা মোটেও নিরুৎসাহিত হয়নি; বরং অটল সংকল্প নিয়ে আল্লাহ যেদিকে ইচ্ছা করেছেন, সেদিকেই অগ্রসর হয়ে বলেছিল: “আমাদের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট, আর তিনি-ই সেরা অভিভাবক ও রক্ষাকারী”।
১৭৪। তারা ‘হামরাউল আসাদ’ থেকে আল্লাহ প্রদত্ত বিশাল প্রতিদান ও উচ্চ মর্যাদার নিয়ামত নিয়ে নিরাপদে মদিনায় ফিরে এলো; কারণ আবু সুফিয়ান তার দলবল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা তাদের ঈমান ও দৃঢ়তাকে আরও গভীর করল, আল্লাহর শত্রুদের দুর্বল করল এবং কোনো ক্ষতি বা আঘাত ছাড়াই তারা শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে এল। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য বজায় রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করল। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, দয়াশীল ও তাঁর উদারতার এই অনুগ্রহ সকলের জন্য বিস্তৃত।
১৭৫। আল্লাহ তাআলা বিশ্বাসীদের সচেতন করছেন যে, আব্দুল কায়েস গেত্রের যে সকল লোক তোমাদের শত্রুদের দ্বারা ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল, যাতে তোমরা তাদের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাক, তারা কেবল শয়তানের সহযোগী, যারা নিজের অনুসারীদের দুর্বল করার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকারের ঈমানদাররা তাদের মতো নয়। তাই মুমিনরা শত্রুর ভয় দেখানো নিয়ে চিন্তা না করে কেবল আল্লাহকে ভয় করবে, যদি তারা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে ঈমানের দায়িত্ব পালন করে থাকে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১১-৪১২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৭-১৬৮; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭২-৭৩; আল-মুনতাখাব: ১/১১৭) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ﴾ ‘তাদেরকে যখম স্পর্শ করার পর’, আয়াতাংশে যখম দ্বারা উহুদ যুদ্ধে প্রাপ্ত আঘাতকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩০) ।
﴿الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ﴾ ‘মানুষরা যাদেরকে বলেছিল: মানুষরা তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে”, আয়াতাংশে প্রথম ‘মানুষর’ দ্বারা আব্দে কায়েস গোত্রের লোকজনকে বোঝানো হয়েছে, যারা আবু সুফিয়ান থেকে টাকা খেয়ে তার পক্ষ হয়ে মুসলমানদেরকে ভয় দেখিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ‘মানুষরা’ দ্বারা আবু সুফিয়ান ও তার দলবলকে বোঝানো হয়েছে, যারা উহুদ যুদ্ধের পরে মক্কায় ফেরার পথে মুসলমানদের সমূলে শেষ করে দেওয়ার জন্য পূণরায় জড়ো হতে চেয়েছিল। কিন্তু অবশেষে তারা ভয়ে পালিয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১১) ।
﴿فَانْقَلَبُوا﴾ ‘অতঃপর তারা ফিরে এসেছে’, অর্থাৎ- মুসলমানরা ‘হামরাউল আসাদ’ থেকে ‘মদীনায়’ ফিরে এসেছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪১০) ।
﴿بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ﴾ ‘আল্লাহর নেয়ামত এবং অনুগ্রহ’, এখানে ‘নেয়ামত’ বলতে বোঝানো হয়েছে- উহুদ যুদ্ধের পর আহত ও ক্লান্ত থাকা সত্তে¡ও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশে সাড়া দিয়ে ‘হামরাউল আসাদ’ এর দিকে যাত্রা করা সাহাবিদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। সেই অনুগ্রহ ছিল- তাদের নিরাপদ রাখা, তাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করা, এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি তাদের আনুগত্য অটুট রাখা। অর্থাৎ, তারা দুনিয়াবি কষ্টের মাঝেও ঈমান, সাহস ও আনুগত্যের ওপর স্থির থাকতে সক্ষম হয়েছে, এটাই তাদের জন্য ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। আর ‘ফজল’ বা অনুগ্রহ বলতে বোঝানো হয়েছে সেই অভিযানে বের হওয়ার ফলে তারা পথে যে বাণিজ্যিক লাভ বা সম্পদের উপকার পেয়েছিল, সেটিও ছিল আল্লাহর অতিরিক্ত অনুগ্রহ। অর্থাৎ, শুধু আধ্যাত্মিক পুরস্কারই নয়, অর্জিত হয়েছে দুনিয়াবি কল্যাণও। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩১) ।
﴿الشَّيْطَانُ﴾ ‘শয়তান’, এখানে ‘শয়তান’ বলতে শয়তানে জিন নয়, বরং শয়তান স্বভাবের মানুষ, বিশেষভাবে নাঈম ইবন মাসউদ, যে চতুরতার সাথে মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে তাদের মনোবল ভাঙতে চেয়েছিল। সে মুশরিকদের পক্ষে কাজ করে মুসলমানদের মনে ভয় সঞ্চার করছিল, যাতে তারা মনে করে যে, শত্রুরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের মোকাবিলা করা অসম্ভব। আল্লাহ তা’আলা এ আয়াতে মুমিনদেরকে আশ্বস্ত করেছেন- মুশরিকদের পক্ষে যারা ভয় দেখায় তারা শুধু শয়তানের সহযোগী; তাদের ভয় মানুষের মন দুর্বল করার কৌশল মাত্র। মুমিনদের উচিত নয় তাদের ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া, বরং আল্লাহকেই ভয় করা উচিত, যদি তারা সত্যিই ঈমানদার হয়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১৩১) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এই আয়াতগুলো আগের প্রসঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদ ও গাজীদের মর্যাদা, তাদের আখেরাতের জীবন্ত অবস্থা এবং মহান পুরস্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আর বর্তমান আয়াতগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে সেই সাহাবা সম্পর্কে, যারা উহুদের কঠিন বিপর্যয়, আঘাত ও আহত অবস্থার মধ্য দিয়েও রাসূলুল্লাহর (সা.) আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছিল। তারা ঈমানকে অটুট রেখে, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে এবং অদম্য সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের সাথে ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে তাদের উচ্চ মর্যাদা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং তাদের জন্য নির্ধারিত মহান প্রতিদানের কথা তুলে ধরেছেন।

আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
প্রথম ঘটনা- হামরাউল আসাদ অভিযানের ইতিহাস:
উহুদ যুদ্ধ থেকে আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা যখন ফিরে গেল এবং ‘রওহা’ নামক স্থানে (যা মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি অবস্থিত) পৌঁছাল, তখন তারা অনুতপ্ত হলো এবং ভাবতে লাগল- আমরা কেন মুমিনদের পুরোপুরি শেষ করে আসলাম না? তাই তারা আবার মদিনার দিকে ফিরে এসে অবশিষ্ট মুসলমানদের ধ্বংস করার ইচ্ছা করল। এই খবর রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে পৌঁছালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শত্রুদের মনে ভয় সৃষ্টি করবেন এবং তাঁর ও সাহাবিদের শক্তি তাদের সামনে প্রদর্শন করবেন। তাই তিনি সাহাবিদেরকে আহ্বান করলেন এবং বললেন: গতকাল যারা উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল, শুধু তারাই আমার সাথে বের হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে বের হলেন এবং ‘হামরাউল আসাদ’-এর কাছে পৌঁছালেন, যা মদিনা থেকে আট মাইল দূরে অবস্থিত। সেই সময় সাহাবিদের দেহে ছিল যুদ্ধের ক্ষত ও ব্যথা; তবুও তারা নিজেদের ওপর জোর করে দাঁড়ালেন, যাতে সওয়াব ও পুরস্কার লাভে পিছিয়ে না পড়েন।
অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদের অন্তরে ভয় ঢেলে দিলেন। তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গ্রæতগতিতে মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। এই ঘটনার পর উক্ত আয়াত নাজিল হয়। এ অভিযানের নামই হলো ‘গযওয়াতু হামরাউল আসাদ’, যা উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী ও সংশ্লিষ্ট একটি অভিযান হিসেবে গণ্য করা হয়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬২-১৬৩) ।

দ্বিতীয় ঘটনা- ছোট বদর অভিযানের ইতিহাস:
আবু সুফিয়ান উহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে যাওয়ার সময় বলেছিল: হে মুহাম্মদ! চাইলে আমাদের সাক্ষাতের স্থান হোক আগামী বছরের বদরের মেলা। রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: এটা আমাদের ও তোমাদের মাঝে নির্ধারিত রইল, ইনশাআল্লাহ। পরের বছর নির্ধারিত সময় এলে আবু সুফিয়ান মক্কার লোকদের নিয়ে রওনা হলো এবং ‘মাররে জাহরান’ এর পাশের ‘মজন্নাহ’ এলাকায় পৌঁছল। কিন্তু আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। ফলে তার মনে যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ার চিন্তা উদয় হলো।
এ সময় সে ‘উমরা’ করতে আসা ‘নুয়াইম ইবন মাসউদ’-এর সঙ্গে দেখা করল। আবু সুফিয়ান তাকে বলল: আমি মুহাম্মদ ও তার সাহাবিদের সাথে বদরের মৌসুমে সাক্ষাতের প্রতিশ্রæতি দিয়েছি। কিন্তু এ বছর খুবই খরা, গাছ-গাছালির কোনো খাবার নেই, দুগ্ধও কম। এই অবস্থায় যুদ্ধ করা আমাদের জন্য উপযোগী নয়। আমার ইচ্ছা হয়েছে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু আমি চাই না যে মুহাম্মদ বের হয়ে আসুক আর আমি না যাই, এতে তাদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। তুমি শহরে গিয়ে তাদের মন ভেঙে দাও। এটা করতে পারলে আমি তোমাকে দশ উট দেব, যা ‘সুহাইল ইবন আমর’-এর কাছে জমা থাকবে।
নুয়াইম মদিনায় গিয়ে দেখল মুসলিমরা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন সে তাদের বলল: এটা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। তারা গত বছর তোমাদের ঘরের কাছে এসে তোমাদের ক্ষতি করতে পারেনি, আর এখন তোমরা নিজে থেকেই তাদের দিকে যাচ্ছো? তারা মেলায় তোমাদের বিরুদ্ধে বিপুল বাহিনী জড়ো করেছে। আল্লাহর কসম! কেউই তাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। তার কথায় কিছু মুসলিমের মনে ভীতি সৃষ্টি হলো। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “যার হাতে আমার প্রাণ, আমি অবশ্যই বের হব, একা হলেও”।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সত্তর জন সাহাবিকে নিয়ে ‘বদর সুগরা’ (বদরুল মাওয়ািদ)-এর জন্য রওনা হলেন। তাঁরা সেখানে আটদিন অবস্থান করলেন এবং আবু সুফিয়ানের অপেক্ষা করলেন। কিন্তু কেউই আসেনি, কারণ আবু সুফিয়ান তার দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কায় ফিরে গিয়েছিল। মক্কার লোকেরা তাদেরকে উপহাস করে বলত: “তোমরা তো শুধু সাওইক (পোড়া গমের খাবার) খেতে বের হয়েছিলে”। তাই তারা পরিচিত হলো “জাইশুস-সাওইক” বা ‘সাওইক বাহিনী’ নামে। অন্যদিকে মুসলিমরা বদরের বাজারে পৌঁছে ব্যবসা-বাণিজ্য করলেন, চামড়া ও কিশমিশ বেচাকেনা করলেন এবং এক দিরহামে দুই দিরহাম লাভও করলেন। পরে তারা নিরাপদে ও সম্পূর্ণ সুস্থভাবে মদিনায় ফিরে এলেন, লাভবান ও সম্মানিত অবস্থায়। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৬৩-১৬৪) ।

১৭২ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু জারির আত-তাবারী (র.) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন: উহুদ যুদ্ধের দিনে যা ঘটেছিল তার পর আল্লাহ তাআলা আবু সুফিয়ানের হৃদয়ে ভয় নিক্ষেপ করেন। ফলে সে মক্কার দিকে ফিরে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আবু সুফিয়ান তোমাদের কিছুটা ক্ষতি করেছে, কিন্তু সে ফিরে গেছে, আর আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন”। উহুদের যুদ্ধ হয়েছিল শাওয়াল মাসে। আর ব্যবসায়ীরা সাধারণত জিলক্বদ মাসে মদিনায় আসত এবং ‘বদর সুগরা’ বা ‘ছোট বদর’ নামক স্থানে অবস্থান করত। উহুদের ঘটনার পর যখন তারা মদিনায় আসে, তখন মুসলমানরা আঘাতপ্রাপ্ত ও ক্লান্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকজনকে আহ্বান করলেন তার সঙ্গে বের হওয়ার জন্য। এ সময় কিছু মানুষরুপী শয়তান তার সহযোগীদের ভয় দেখাতে লাগল এবং বলল: “মানুষ তোমাদের বিরুদ্ধে বড় বাহিনী জড়ো করেছে”। এতে অনেকেই রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে যেতে দ্বিধা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আমি অবশ্যই রওনা হব, কেউ না গেলেও আমি একাই যাব”।
অবশেষে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, যুবাইর, সাদ, তলহা, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, হুযাইফাহ ইবন ইয়ামান এবং আবু উবাইদাহ (রাঃ) সহ প্রায় সত্তরজন সাহাবি তাঁর সঙ্গে বের হলেন। তারা আবু সুফিয়ানের পিছু নিলেন এবং সফরা নামক জায়গা পর্যন্ত পৌঁছালেন। তখন আল্লাহ ১৭২ নং আয়াত নাযিল করেন।
তাবারানী একটি সহীহ সনদে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন- উহুদ থেকে ফিরে মুশরিকরা একে অপরকে বলল: “তোমরা না মুহাম্মদকে হত্যা করতে পেরেছ, না তার সঙ্গীদের নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছ। তোমরা খুবই খারাপ কাজ করেছ! চল ফিরে গিয়ে তাদেরকে শেষ করে আসি!”। এ কথা রাসূলুল্লাহর (সা.) কানে পৌঁছলে তিনি মুসলমানদের আহ্বান করলেন। সাহাবিরা প্রস্তুত হলেন এবং ‘হামরাউল আসাদ’ বা ‘আবি উতবা’ কূপ পর্যন্ত গেলেন। তখনই ১৭২ নং আয়াত নাযিল হয়েছে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৪) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৭২ নং আয়াত থেকে বুঝা যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপুরস্কার প্রাপ্তির জন্য বান্দাকে তিনটি শর্ত পূর্ণ করতে হবে:
(ক) বিপদ ও যন্ত্রণার মধ্যেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশকে মান্য করে তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া, যেমন উহুদ যুদ্ধে সাহাবারা আহত, গুরুতর জখমপ্রাপ্ত, ক্লান্ত ও ব্যথায় জর্জরিত হওয়ার পরেও রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করেননি। উহুদ যুদ্ধের পরপরই যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) শত্রুদের ধাওয়া করার জন্য ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানের ডাক দেন, তখন তারা নিজেদের কষ্ট, রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে আবার জিহাদের জন্য বের হয়েছিলেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭১) ।
(খ) ত্যাগের পরে সৎআমলের উপর অটুট থাকা, কারণ আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে: “যারা আন্তরিকতার সাথে ভালোকাজ করেছে”।
(গ) ত্যাগের পরে তাক্বওয়া ভিত্তিক জীবন গঠনে সচেতন থাকা, কারণ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: “এবং যারা আল্লাহভীতি অবলম্বন করেছে”।
আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে মহাপুরস্কারের জন্য প্রথম শর্তটিই যথেষ্ঠ নয়, বরং তার সাথে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শর্ত থাকা অপরিহার্য।
২। ১৭৩ নং আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে,
(ক) প্রকৃত মুমিন কখনো কাপুরুষ হয় না, কারণ কাপুরুষতা ঈমানের সঙ্গে একসাথে থাকতে পারে না। এর মূল কারণ হলো- মৃত্যুর ভয় ও দুনিয়ার জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। আর এগুলো একজন সত্যিকারের মুমিনের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাহাবায়ে কেরাম এই বিশ্বাসের বাস্তব উদাহরণ ছিলেন। তারা কষ্ট, বিপদ ও শত্রুর ভয়কে উপেক্ষা করে আল্লাহর পথে অগ্রসর হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ তায়ালা কোরআনে তাদের প্রশংসা করেছেন।
(খ) বিপদের মুখে প্রকৃত মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি পায়, এজন্য আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে: ‘এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়’। এ সম্পর্কে সূরাতু আল-আহযাবের একটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزابَ قالُوا: هذا ما وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، وَما زادَهُمْ إِلَّا إِيماناً وَتَسْلِيماً﴾ [سورة الأحزاب: ২২].
অর্থ: “মুমিনরা যখন সম্মিলিত শত্রুবাহিনী (আহযাব) দেখল, তখন তারা বলল: ‘এটাই তো সেই বিষয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদেরকে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সত্য বলেছেন’। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্য আরও বেড়ে গেল” (সূরাতু আল-আহযাব: ২২) ।
(খ) বিপদকালে পড়ার জন্য মুমিনকে একটি দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, দোয়াটি হলো-
“حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ”.
অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতইনা উত্তম কর্মবিধায়ক”, যা আয়াতের শেষাংশে উল্লেখিত হয়েছে।
হযরত ইবরাহীমকে (আ.) যখন আগুনে নিক্ষেপ করার প্রস্তুতি চ‚ড়ান্ত করা হলো, তখন তিনি জানতেন যে মানবিক দিক থেকে আর কোনো পথ খোলা নেই। চারপাশে মানুষ, কাঠের বিশাল স্তুপ ও জ্বলন্ত আগুন- সবকিছুই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি কারো কাছে সাহায্য চাননি; বরং সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে সমর্পণ করেন। এবং তাঁর মুখে যে শেষ দোয়াটি উচ্চারিত হয়েছিল-“হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। সহীহ আল-বুখারীর একটি হাদীসে এসেছে:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: “كَانَ آخِرَ قَوْلِ إِبْرَاهِيمَ حِينَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ: حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الوَكِيلُ” (صحح البخاري: ৪৫৬৪).
অর্থ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: ইব্রাহীম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মুহুর্তে সর্বশেষ কথা ছিল: “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। (সহীহ আল-বুখারী: ৪৫৬৪) ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কঠিন সময় পাড় করতেন, তখন এ দোয়াটি পাঠ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে:
أن النبي -صلعم- كان إذا اشتد غمّه، مسح بيده على رأسه ولحيته، ثم تنفس الصّعداء، وقال: حسبي الله ونعم الوكيل”.
অর্থ: “যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) দুশ্চিন্ত খুব বেড়ে যেত, তখন তিনি নিজের মাথা ও দাড়িতে হাত বুলাতেন, তারপর গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেন এবং বলতেন: ‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক”। (আল-দুররু আল-মানছুর, সুয়ূতী: ২/৩৯০) ।
সাহাবায়ে কেরামকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিপদের সময়ে এ দোয়াটি পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إذا وقعتم فى الأمر العظيم فقولوا: حسبنا الله ونعم الوكيل” (تفسير ابن كثير).
অর্থ: যখন তোমরা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হবে, তখন পড়বে- “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল” (ইবনু কাছীর) ।
শেষের দুইটি হাদীস নিয়ে কথা থাকলেও, বিপদে উক্ত দোয়া পড়া কোরআন দ্বারা সাব্যস্ত হওয়ার কারণে হাদীস যয়ীফ হওয়ার প্রভাব এর আমলে পড়বে না।
(গ) ঈমানদারের ঈমান বাড়ে এবং কমে, আল্লাহ তায়ালার বাণী- “মানুষের কথাবার্তা ও হুমকি তাদের ঈমানকে কমায়নি; বরং তা তাদের ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে”। অর্থাৎ- তা তাদের দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি করেছে, হৃদয়ে আরও দৃঢ় ইয়াকিন সৃষ্টি করেছে, এবং তাদের মধ্যে সাহস, শক্তি ও আত্মবিশ্বাস এবং প্রস্তুতি গড়ে তুলেছে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, নেক আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়।
আলেমগণ ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস বিষয়ে বলেন: ঈমানের মূল ভিত্তি ও প্রকৃত সত্তা, অর্থাৎ অন্তরের বিশ্বাস (তাসদীক) যখন একবার স্থির হয়ে যায়, তখন তার মাঝে মূলত বৃদ্ধি বা ঘাটতি আসে না; আর যখন তা চলে যায়, তখন ঈমানের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তবে বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটে ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে, মূল সত্তার মধ্যে নয়।
তবে অধিকাংশ আলেমের মত হলো: ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায় মানুষের আমলের দিক থেকে, অর্থাৎ ঈমান থেকে যে কাজগুলো জন্ম নেয়, সেসব কাজের মাধ্যমে ঈমান শক্তিশালী বা দুর্বল হয়। এর দলীল হিসেবে সুনানে তিরমিযীর হাদিসে এসেছে:
“الإيمان بضع وسبعون بابا، فأعلاها قول: لا إله إلا الله، وأدناها إماطة الأذى عن الطريق، والحياء شعبة من الإيمان” (سنن الترمذي).
অর্থ: “ঈমানের অনেকগুলো শাখা আছে, সবচেয়ে উঁচু হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলা, আর সবচেয়ে নিচের স্তর হলো- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, এবং লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা”। এই বর্ণনায় ঈমানের “শাখা” থাকার কথাই প্রমাণ করে যে ঈমানের মধ্যে বৃদ্ধি ও স্তরভেদ রয়েছে। এছাড়াও সূরাতু আল-আনফাল এর দ্বিতীয় আয়াতে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: প্রকৃত ঈমানদার কোরআন তেলাওয়াত করলে বা শুনলে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।
৩। ১৭৪ নং আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়- সাহাবাগণ যখন নিজেদের সব বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন এবং সম্পূর্ণ অন্তর দিয়ে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করলেন, তখন আল্লাহ তাদের বিশেষ অনুগ্রহে ভূষিত করেন। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে চার ধরনের প্রতিদান দিলেন:
(ক) নেয়ামত, অর্থাৎ মানসিক শান্তি, অন্তরের প্রশান্তি, সাহস এবং ঈমানের দৃঢ়তা। তারা ভয় বা আতঙ্ক নিয়ে ফিরে আসেনি, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের মানসিক শক্তি লাভ করেছিল।
(খ) ফযল বা অনুগ্রহ, নেয়ামতের চেয়েও বেশি কল্যাণ ও অতিরিক্ত অনুগ্রহ। অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে শুধু নিরাপদই রাখেননি, বরং মর্যাদা ও সওয়াবের দিক থেকেও অনেক উঁচু স্তর দান করেছেন এবং অর্থনীতিতে সাবলম্ভী দান করেছেন।
(গ) সকল অকল্যাণ থেকে হেফাজত, আল্লাহ তাদেরকে শত্রুদের ষড়যন্ত্র, হামলা ও ক্ষতি থেকেও নিরাপদ রেখেছেন। তারা বড় বিপদের আশঙ্কা নিয়ে বের হয়েছিল, কিন্তু কোনো ক্ষতি ছাড়াই ফিরে এসেছিল।
(ঘ) আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালনা, আল্লাহ তাদের অন্তরকে এমন পথে পরিচালিত করলেন, যা তাঁর সন্তুষ্টির কারণ হয়। এর ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর তাকদীর ও ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৭২) ।
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি বিপদের সময় নিজের শক্তির ওপর নয়, বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে, তখন আল্লাহ শুধু তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন না; বরং তার অন্তরে শান্তি দেন, মর্যাদা বাড়ান এবং নিজের সন্তুষ্টি দান করেন।
৪। ১৭৫ নং আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে-
(ক) ইসলাম বিরোধী কুচক্রী মহলকে শয়তান আখ্যা দেওয়া হয়েছে, আয়াতের প্রথমাংশে এসেছে যে, আব্দুল কায়েস গেত্রের কিছু লোক মুশরিকদের থেকে ঘুষের বিনিময়ে মুসলমানদেরকে তাদের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করেছিল, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শয়তান আখ্যা দিয়েছেন। সূরাতু আন-নাস এবং সূরাতু আল-মুজাদালাহ এর ১৯ নং আয়াতেও ইসলাম বিদ্বেষী কুচক্রী মহলকে শয়তান বলা হয়েছে।
(খ) একজন মুমিনের অন্তরে ভয়ের কেন্দ্র হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, একজন মুমিনের অন্তরে ভয়ের মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, কারণ তিনিই সর্বক্ষমতাবান এবং সব কিছুর পরিণতির মালিক। বাহ্যিক শক্তি, শত্রু বা কঠিন পরিস্থিতির ভয় যদি মানুষের অন্তরে এমনভাবে স্থান করে নেয় যে তা তাকে সত্যের পথে অটল থাকতে বাধা দেয়, তবে তা প্রকৃত তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী হয়ে যায়। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি দুনিয়ার ভয়কে নিজের ঈমানের ওপর প্রভাব ফেলতে দেয় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখে এবং তাঁর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রেখে সাহস ও ধৈর্যের সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে।
(গ) শয়তান ঈমানদারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, সে তাদের সহযোগীদের- বিশেষ করে মুনাফিকদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়, যাতে তারা দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় হতে না পারে।

আয়াতসমূহের করণীয় (আমল):
(ক) কষ্ট, ভয় বা ক্ষতির পরও আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মানতে প্রস্তুত থাকা এবং কঠিন অবস্থাতেও দ্বীনের পথ থেকে পিছিয়ে না আসা।
(খ) সমস্যা ও বিপদের সময় বারবার অন্তর থেকে নি¤েœর দোয়া পাঠ করা:
“حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ”.
অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতইনা উত্তম কর্মবিধায়ক”।
(গ) মানুষের ভয় বা হুমকিকে ঈমান দুর্বল হওয়ার কারণ না বানিয়ে, বরং এটাকে আল্লাহর দিকে আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
(ঘ) মানুষ বা শত্রুর ভয় নয়, বরং আল্লাহকে ভয় করাকে জীবনের মূলনীতি বানানো।
(ঙ) গুজব, আতঙ্ক, হুমকি ও মিথ্যা খবর দ্বারা যেন মনোবল ভেঙে না পড়ে, বরং এসবকে শয়তানের কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে দৃঢ় থাকা।

Leave a Reply

error: Content is protected !!