Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৫-১৬৮) আয়াতসমূহের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধ: মুমিনদের ভুল পদক্ষেপ এবং মুনাফিকদের কুটচাল।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৬৫-১৬৮) আয়াতসমূহের তাফসীর

﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (165) وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ (166) وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَاتَّبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ (167) الَّذِينَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا قُلْ فَادْرَءُوا عَنْ أَنْفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (168)﴾ [سورة آل عمران: 165-168].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: উহুদ যুদ্ধ: মুমিনদের ভুল পদক্ষেপ এবং মুনাফিকদের কুটচাল।

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৬৫। উহুদে যখন তোমরা বিপদের সম্মুখীন হলে, যদিও বদরের দিনে তোমরাই তাদের ওপর দ্বিগুণ আঘাত হেনেছিলে; তখন তোমরা প্রশ্ন করলে, “এ বিপদ এলো কোথা থেকে?” বলুন: এটা তোমাদের নিজেদেরই ভুলের কারণে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
১৬৬। দুই দল মুখোমুখি হওয়ার সেই দিনে যে বিপদ তোমাদের ওপর নেমে এসেছিল, তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই হয়েছিল, যাতে তিনি স্পষ্ট করে প্রকাশ করেন প্রকৃত মুমিনদের।
১৬৭। এবং যাতে তিনি প্রকাশ করেন মুনাফিকদেরও। আর যখন তাদেরকে বলা হয়েছিল, “এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা অন্তত প্রতিরোধে অংশ নাও,” তারা বলেছিল: “যদি আমরা জানতাম সত্যিই যুদ্ধ হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম”। সেই দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরীরই বেশি নিকটে ছিল। তারা মুখে এমন অনেক কথা বলত যা তাদের অন্তরে ছিল না, আর তারা যা গোপন করে আল্লাহ তা ভালোভাবেই জানেন।
১৬৮। যারা ঘরে বসে থেকে তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলত, “যদি তারা আমাদের কথা মেনে চলত, তাহলে নিহত হতো না”, হে নবী, আপনি বলে দিন: তোমরা সত্যবাদী হলে নিজেদেও থেকে মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে দাও তো!।

আয়াতসমূহের ভাবার্থ:
১৬৫। উহুদের ঘটনার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে তারা মুশরিকদের দ্বিগুণ ক্ষতি করেছিলে, কিন্তু উহুদের যুদ্ধে যখন নিজেরা বিপর্যয়ের মুখে পড়লো, তখন অবাক হয়ে বলতে লাগলো: “এটা কীভাবে হলো? আমরা তো মুসলমান, আমাদের মাঝে রাসুলুল্লাহ (সা.) আছেন, আর ওরা মুশরিক!”। তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, এ বিপদ তাদের নিজেদের কারণেই এসেছে; কারণ তাদের একাংশ রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় থেকে নেমে গনীমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহর সিদ্ধান্ত সর্বদা তাঁর প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তিনি যা চান তাই করেন, তাঁর ফয়সালাকে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।
১৬৬। উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ওপর যে কষ্ট নেমে এসেছিল, যেমন আহত হওয়া, শহীদ হওয়া বা যুদ্ধের পরিস্থিতি হঠাৎ বদলানো- সবই আল্লাহর নিয়তি অনুযায়ী ঘটেছিল। শুরুতে মুমিনরা শত্রুকে পরাজিত করলেও পরে কিছু ভুল ও অবাধ্যতার কারণে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এ ঘটনা আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ, যা প্রকৃত ঈমানদারকে প্রকাশ করেছিল। বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ দেখালেন কে সত্যিকারের ঈমানদার আর কে কেবল মুখে দাবি করে।
১৬৭। এ পরীক্ষার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল- মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের অন্তরের গোপন বিষয়গুলো খুলে দিলেন। যখন মুমিনরা তাদের বলেছিল: “এসো, আমাদের সঙ্গে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। না পারলে অন্ত আমাদের সংখ্যায় শক্তি যোগাও, পাশে দাঁড়িয়ে মনোবল বাড়াও”। তখন তারা হটকারিতা বশত বলেছিল: “আমরা যদি জানতাম যে তোমরা সত্যিই যুদ্ধ করবে, তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু আমরা জানতাম তোমরা যুদ্ধ করবে না!”। এই কথা প্রমাণ করে সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরের বেশি নিকটবর্তী ছিল; কারণ তারা মুখে যা বলছিল, হৃদয়ে তা ছিল না। তারা শুধু কথা দিয়ে নিজেকে মুসলমান দেখাচ্ছিল, অন্তরে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তো খুব ভালোভাবেই জানেন- তাদের বুকে কী গোপন আছে, কী তারা লুকিয়ে রাখে।
১৬৮। ঐ সকল মুনাফিক যুদ্ধের সময় ঘরে বসে ছিল, তারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত বা শহীদ মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে লাগলো- “যদি তারা আমাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যেত, তবে কখনো মারা পড়ত না”। তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিলেন: “যদি তার সত্যি কথা বলে থাকে যে যুদ্ধ এড়িয়ে চললে মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়, তাহলে তারা নিজেদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেখাক!”। অর্থাৎ, যুদ্ধ হোক বা অন্য সময়, কেউই নিজের সিদ্ধান্ত বা সতর্কতার মাধ্যমে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ীই আসে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০৭-৪০৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৪-১৫৬; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১-৭২; আল-মুনতাখাব: ১/১১৫-১১৬) ।

আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿مُصِيبَةٌ﴾ ‘বিপদ’, এখানে ‘বিপদ’ বা ‘মুসিবত’ দ্বারা উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ওপর যে কষ্ট ও হতাশা নেমে এসেছিল, তা বুঝানো হয়েছে। সেদিন মুশরিকরা মুমিনদের ওপর চড়াও হয় এবং সত্তর জন সাহাবি শহীদ হন। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৫) ।
﴿مِثْلَيْهَا﴾ ‘তার দ্বিগুণ’, আয়াতে ‘তার দ্বিগুণ’ বা مثليها বলতে বোঝানো হয়েছে যে বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সত্তর জন নিহত ও সত্তর জন বন্দী হয়েছিল, যা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষতির তুলনায় দ্বিগুণ ছিল। অর্থাৎ- উভয় ঘটনার তুলনায় কষ্ট ও ক্ষতির হিসাব আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়েছে, যাতে ইতিহাসে সত্যিকারের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৫) ।
﴿هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ﴾ ‘উহুদের বিপদ তোমাদের নিজেদের কারণে হয়েছিল’ এটা মুসলিম যোদ্ধাদের অমান্য ও পাপের হল। বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধে কিছু তিরন্দাজ বাহিনী রাসুলুল্লাহর (সা.) আদেশ অমান্য করে যুদ্ধস্থান ত্যাগ করে গনীমত সংগ্রহের জন্য ছুটে গিয়েছিল। ফলে, মুশরিকরা সুযোগ পেয়ে মুসলমানদের উপর পুণরায় আক্রমণ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০২) । এখানে আমরা দেখতে পাই- মানুষের নিজস্ব কর্ম ও অনুশাসনের ফলেই বিপদ আসে। বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই ভয়ঙ্কও হোক, মূল কারণ হলো মানুষের নিজের ভুল সিদ্ধান্ত ও অনুশাসন ভঙ্গ করা। এটি আমাদেও শেখায়- জীবনে অসুবিধা বা বিপদ প্রায়ই বাহ্যিক শক্তি নয়, বরং মানুষের নিজের চেতনা, পদক্ষেপ এবং নৈতিক দায়িত্বহীনতার ফল। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
﴿فَادْرَءُوا﴾ ‘তাহলে তোমরা ঠেকিয়ে দেখাও’, , অর্থাৎ, যদি তোমাদের দাবিই সত্য হয়, তবে মৃত্যুকে প্রতিহত করো। আরবিতে বলা হয়: “”دَرَأَ الله عنك الشَّرَّ, অর্থ: আল্লাহ তোমার থেকে অনিষ্ট দূর করুন বা ঠেকিয়ে দিন। (গরীব আল-কোরআন, ইবনু কুতাইবাহ: ১/১০৩) ।

উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে মুনাফিকরা রাসুলুল্লাহর (সা.) গনীমত আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহকে (সা.) সম্পূর্ণভাবে সেই অভিযোগ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতগুলোতে যুদ্ধের আগে ও পরে মুসলিম যোদ্ধাদের বাস্তবতা-বিরোধী ধারণা, ভুল মন্তব্য, ভুল কাজগুলো এবং মুনাফেকদের অপপ্রচারগুলোকে শিক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৪) ।

১৬৫ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আবি হাতিম, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বদরের যুদ্ধে যেসব কাজ তারা করেছিল, বিশেষ করে যুদ্ধবন্দীদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়ার কারণে উহুদের দিনে তাদেরকে সেই কাজের ফল ভোগ করতে হলো। ফলে উহুদের যুদ্ধে তাদের সত্তরজন শহীদ হন, মুসলিম যোদ্ধারা কিছুক্ষণের জন্য পিছু হটে যান, রাসূলুল্লাহর (সা.) সামনের দাঁত ভেঙে যায়, তাঁর হেলমেট মাথায় চূর্ণ হয়ে যায় এবং রক্ত তার মুখ বেয়ে পড়ে। এসবের পর আল্লাহ তায়ালা ১৬৫ নং আয়াত অবতীর্ণ করে জানিয়ে দিলেন যে এ বিপর্জয় তাদের ভুলের কারণেই হয়েছে। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ৭৩) ।
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন: এর অর্থ হলো- মুক্তিপণ গ্রহণের কারণেই এই শাস্তি এসেছে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৩) ।

আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ইমাম ওয়হাবা জুহাইলী তার তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৬৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন:
(ক) বদর ও উহুদের ফলাফলের তুলনা, আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে: বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা বিশাল বিজয় পেয়েছিল। তারা মুশরিকদের ৭০ জনকে হত্যা করে এবং ৭০ জনকে বন্দী করে, যা মূলত উহুদের তুলনায় দ্বিগুণ সাফল্য। এমনকি উহুদের যুদ্ধের শুরুতেও মুসলমানরা এগিয়ে ছিল এবং দুই দিনে প্রায় ২০ জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু শেষে উহুদে তারা পরাজিত হয় এবং ৭০ জন সাহাবি শহীদ হন। দুটি যুদ্ধের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সুতরাং বদরে মুসলমানদের মধ্যে সম্পূর্ণ আনুগত্য ও ঐক্য ছিল। উহুদে সেই স্থিরতা ছিল না। তাই দুই যুদ্ধের ফল ভিন্ন হয়েছে।
(খ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে ভুল ধারণা, আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে: উহুদের পর মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে বলেছিল: “আমরা তো আল্লাহর পথে লড়েছি! আমরা মুসলমান, আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা) আছেন, আর শত্রুরা তো মুশরিক। তাহলে কীভাবে আমরা পরাজিত হলাম?”। এই ধারণাটি ভুল ছিল। কারণ বাহ্যিক পরিচয় বা উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়- আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও নির্দেশ মানা হল প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। সুতরাং শুধু “আমরা সঠিক পথে আছি” বলা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মানার উপর শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করে।
(গ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ ছিল নিজেদের ভুল, আয়াতের তৃতীয়াংশে বলা হয়েছে: পরাজয়ের মূল কারণ ছিল তাদের নিজেদের ভুল, বিশেষ করে উহুদের তীরন্দাজদের একটি দল রাসুলুল্লাহর (সা.) সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করেছিল। ফলে শত্রুরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সুযোগ পায় এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। সুতরাং আনুগত্য ছাড়া বিজয় নেই। যারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ মেনে যুদ্ধ করে, আল্লাহ তাদের বিজয় দেন; কারণ তারা হলো “আল্লাহর দল”, আর আল্লাহর দল কখনো পরাজিত হয় না।
২। ১৬৬, ১৬৭ ও ১৬৮ নং আয়াতসমূহ থেকে নি¤েœর দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) উহুদের মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে আল্লাহর প্রজ্ঞা, উহুদের কষ্ট, আঘাত এবং সাময়িক পরাজয় ছিল আল্লাহর জ্ঞান-প্রজ্ঞা, পরিকল্পনা ও ফয়সালার অংশ, আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এ ঘটনার পেছনে আল্লাহ তায়ালার কয়েকটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল:
প্রথমত: ভুল ও অবাধ্যতার পরিণতি দেখিয়ে মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রগঠন করা।
দ্বিতীয়ত: দায়িত্বে অবহেলা বা নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা।
তৃতীয়ত: প্রকৃত মুমিনদেরকে সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
চত‚র্থত: মুনাফিকদেরকে প্রকৃত অবস্থা সকলের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া।
ফলে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের এই সাময়িক পরাজয় শুধুমাত্র ক্ষতি নয়; বরং শিক্ষা, পরিশুদ্ধি এবং পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অমূল্য উপকার বহন করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৫)।
(খ) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে মুনাফেকদের হটকারিতা, ১৬৭ ও ১৬৮ নং আয়াতে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে মুনাফেকের দুইটি হটকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
প্রথমত: যখন মুমিনরা তাদের বলেছিল: “এসো, আমাদের সঙ্গে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। না পারলে অন্তত আমাদের সংখ্যায় শক্তি যোগাও, পাশে দাঁড়িয়ে মনোবল বাড়াও”। তখন তারা হটকারিতা ও তামাশা বশত বলেছিল: “আমরা যদি জানতাম যে তোমরা সত্যিই যুদ্ধ করবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু আমরা জানতাম তোমরা যুদ্ধ করবে না!”। এই কথা প্রমাণ করে সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরের বেশি নিকটবর্তী ছিল।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এ হটকারিতার জবাবে বলেন: তারা মুখে যা বলে অন্তরে তার তিল মাত্র নেই। তারা অন্তরের কপটতাকে আড়াল করতে চাইছে, অথচ আমি আল্লাহ তাদের অন্তরের গোপন ভেদ সম্পর্কে বেশী জানি। (তাফসীর আল-মারাগী: ১২৭) ।
দ্বিতীয়ত: তারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত বা শহীদ মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে লাগলো- “যদি তারা আমাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যেত, তবে কখনো মারা পড়ত না”।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এ হটকারিতার জবাব রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন: যদি তারা সত্যি কথা বলে থাকে যে যুদ্ধ এড়িয়ে চললে মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়, তাহলে তারা নিজেদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেখাক!। মূলকথা হলো- যুদ্ধ হোক বা অন্য সময়, কেউই নিজের সিদ্ধান্ত বা সতর্কতার মাধ্যমে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ীই আসে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১২৮)।
(গ) মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ, আর নিয়তির ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বোধের পথ, ১৬৮ নং আয়াতের শেষাংশটি মানুষের সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর নিয়তির অমোঘতার গভীর দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরেছে। এটি জানিয়ে দিয়েছে যে মানব-ইচ্ছা, কৌশল বা নিরাপত্তা, কোনো কিছুই মৃত্যুর মতো নিশ্চিত বাস্তবতাকে প্রতিহত করতে পারে না। মৃত্যু এমন একটি অস্তিত্বগত সত্য, যা মানুষের সকল পরিকল্পনা অতিক্রম করে; দর্শনের ভাষায় এটি মানবজীবনের অনিবার্য বীরংঃবহঃরধষ ৎবধষরঃু। মুনাফিকদের দাবি ছিল- “যুদ্ধে না গেলে মৃত্যু হতো না”, কোরআন সেই যুক্তিকে দার্শনিকভাবে ভেঙে দিয়েছে ৎবফঁপঃরড় ধফ ধনংঁৎফঁস পদ্ধতিতে: যদি ঘরে থাকা সত্যিই মৃত্যু ঠেকাতে পারত, তবে তোমরাই মৃত্যুকে ঠেকিয়ে দেখাও! এতে প্রমাণ হয়- জীবন-মৃত্যু বাহ্যিক অবস্থানে নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে নির্ভরশীল। এই আয়াত আমাদের শেখায়: মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ, আর নিয়তির ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বোধের পথ। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
৩। উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে বুঝা যায় উহুদের যুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ স্পষ্টভাবে দুইটি সত্য উন্মোচন করেছে:
(ক) তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে, মুনাফিকরা আগে মুসলমানদের ভিড়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখত। অনেকেই ভাবত তারা সত্যিই মুসলমান। কিন্তু উহুদের মুহূর্তে, যখন মুসলমানদের সাহায্য করা জরুরি ছিল, তখন তারা পিছিয়ে গেল, অজুহাত দাঁড় করাল, ভয় দেখাল, মনোবল ভাঙল। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে গেল- তাদের অন্তর ঈমানের দিকে নয়; বরং কুফরের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। অর্থাৎ, তারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও তাদের মন-মানসিকতা, সিদ্ধান্ত, আচরণ সবকিছুই প্রমাণ করে যে তারা ঈমান থেকে অনেক দূরে। এ সম্পর্কে ১৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ﴾ [سورة آل عمران: ১৬৭].
অর্থ: “তারা সেদিন তাদের ঈমানের চেয়ে কুফরীর বেশী কাছাকাছি ছিল” (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৬৭) ।
(খ) তাদের চরিত্র ও মিথ্যাচারিতা উন্মোচিত হয়েছে, তারা মুখে বলত: “আমরা মুসলমান, তোমাদের সঙ্গে আছি”, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অবিশ্বাস ও কুফর। উহুদের মাঠে তারা একথা বলেও ফেলে, যা ১৬৮ নং আয়াতে এসেছে এভাবে: “তাদের ভাইরা যদি ঘরে বসে থাকত, তবে মারা যেত না”। এ বক্তব্যই দেখিয়ে দেয়: তারা শহীদদেরকে “ভাই” বললেও তা ছিল শুধু বংশগত বা প্রতিবেশী সম্পর্ক, ধর্মীয় নয়। তারা আল্লাহর কদর, মৃত্যুর নির্ধারিত সময়, এসব কোনো কিছুকেই মানত না। তারা মনে করত যুদ্ধের ফলাফল শুধু বাহ্যিক কারণে ঘটে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের কোনো ভূমিকা নেই। এভাবে তাদের কথায় তিনটি বড় দুর্বলতা ধরা পড়ে: এক. ঈমানের অভাব, দুই: তাকদীরের প্রতি অবিশ্বাস, এবং তিন: মিথ্যাচারে নির্লজ্জতা। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৫৮) ।

আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
(ক) দৈনন্দিন জীবনে যে কোনো সমস্যায় আত্মসমালোচনা করা এবং নিজের কর্ম সংশোধনের চেষ্টা করা।
(খ) সংকট ও কষ্টের সময় সালাত ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভরসা করা।
(গ) ইসলামি নেতৃত্ব, শিক্ষক, অভিভাবকদের আনুগত্য করা।
(ঘ) দ্বিমুখিতা, ভয়ভীতি ছড়ানো, নেতিবাচক প্রচরণা পরিহার করে সত্যবাদী ও সাহসী হওয়া।
(ঙ) জীবনের বিপদাপদে আল্লাহর ফয়সালা উত্তম, এ বিশ্বাস দৃঢ় করা এবং অভিযোগ না করা।
(চ) দ্বীনের পথে প্রয়োজনীয় ত্যাগ, সময়, শ্রম, দান, সাহস নিবেদন করা।
(ছ) কাউকে হতাশ করা, ভয় দেখানো, নেতিবাচক প্রচার, এসব থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।

Leave a Reply

error: Content is protected !!