সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৯-১৬০) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর
﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (159) إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ (160)﴾ [سورة آل عمران: 159-160].
আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: সাহাবাদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) আচরণ: কোমলতা, ক্ষমাশীলতা ও বিজয়ের অনুপ্রেণা।
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১৫৯। অতঃপর আল্লাহর রহমতেই তুমি তাদের প্রতি কোমল হয়েছ। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের এবং কঠিন হৃদয়ের হতে, তবে তারা তোমার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর, তাদের জন্য আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা কর, এবং কাজ-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। এরপর যখন সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।
১৬০। যদি আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না। আর যদি তিনি তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন, তবে তাঁর পরে এমন কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করতে পারে? অতএব, মুমিনদের জন্য আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।
আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শ নেতৃত্বের এক অপূর্ব চিত্র তুলে ধরেছেন। আল্লাহর বিশেষ রহমতের ফলে তিনি তাঁর সাহাবিদের প্রতি অত্যন্ত কোমল, দয়ালু ও সহনশীল ছিলেন; যদি তিনি কঠোর ও রূঢ় আচরণ করতেন, তাহলে সাহাবিরা তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। বিশেষত উহুদ যুদ্ধে সাহাবীরা যে ভুল করেছিলেন, আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা.) নির্দেশ দিলেন তাদেরকে কঠোরভাবে ধরতে নয়, বরং ক্ষমা করতে এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে। একই সঙ্গে যে বিষয়গুলোতে পরামর্শ প্রয়োজন, সেগুলোতে তিনি তাদের সাথে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তারপর দ্বিধাহীনভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করে তা বাস্তবায়ন করবেন; কারণ আল্লাহ তাদেরকেই ভালোবাসেন, যারা কাজের প্রচেষ্টা করে এবং পরিণাম সম্পূর্ণভাবে তাঁর হাতে সোপর্দ করে দেয়।
পরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা একটি চিরন্তন সত্য ঘোষণা করেছেন, যা প্রত্যেক মুমিনের জানা ও অনুসরণ করা জরুরি, সেটি হলো জয়-পরাজয় সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতেই। তিনি যদি কারও সহায় হন, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারে না; আর তিনি যদি কাউকে পরিত্যাগ করে সাহায্য বন্ধ করে দেন, তাহলে কারও পক্ষেই তাকে সাহায্য করে বিজয় প্রদান করা সম্ভব নয়। অতএব বিজয় কামনা মানে কেবল আল্লাহরই সাহায্য প্রার্থনা করা এবং সেই সাহায্যের উপযোগী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা, তাঁর আদেশ মানা ও তাঁর পথে অটল থাকা। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় দূর করার পথ হলো তাঁর আনুগত্য, নিষ্ঠা, এবং পূর্ণ ভরসা বা তাওয়াক্কুল। এ কারণেই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে: “মুমিনদের উচিত আল্লাহর উপরই ভরসা করা”, অর্থাৎ যে কোনো কাজে প্রচেষ্টার পর চূড়ান্ত নির্ভরতা শুধুই আল্লাহর উপর স্থাপন করা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৪২-১৪৩; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭১; আল-মুনতাখাব: ১/১১৪) ।
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿وَشَاوِرْهُمْ﴾ ‘এবং তাদের সাথে পরামর্শ কর’, এখানে ﴿شَاوِرْ﴾ শব্দটি আরবী আদেশ সূচক শব্দ, যা “مُشَاوَرَةُ” মাসদার থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো- পরামর্শ করা। আরবি ভাষায় “مشاورة” (পরামর্শ) শব্দের মূল অর্থের মধ্যে রয়েছে কোনো মূল্যবান জিনিস বের করে আনা। যেমন বলা হয়: “شُرْتُ الْعَسَلَ”, অর্থাৎ মৌচাক থেকে যতœসহকারে মধু সংগ্রহ করা। এর দ্বারা বোঝানো হয়, মানুষের মতামত গ্রহণ করাও ঠিক সেই মূল্যবান মধু আহরণের মতো; পরামর্শে বিভিন্ন মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থেকে সবচেয়ে ভালো এবং কল্যাণকর সিদ্ধান্ত বের করে নেওয়া হয়। তাই “مُشَاوَرَةُ” শব্দটি সুন্দরভাবে ইঙ্গিত করে যে, পরামর্শ মানে হলো সবার মূল্যবান মতামত থেকে সেরা সিদ্ধান্ত সংগ্রহ করা। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১১) । ইবন আতিয়্যাহ (র.) বলেন: পরামর্শ নেওয়া শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি এবং দৃঢ় বিধানসমূহের অংশ। যে ব্যক্তিকে জ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ লোকদের সাথে পরামর্শ করে না, তাকে নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াই উচিত। বলা হয়ে থাকে: “যে পরামর্শ নেয়, সে কখনো অনুতপ্ত হয় না; আর যে নিজের মতামতেই মুগ্ধ থাকে, সে পথভ্রষ্ট হয়”। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ما ندم من استشار، ولا خاب من استخار، ولا عال من اقتصد”.
অর্থ: “যে পরামর্শ নেয়, সে অনুতপ্ত হয় না; যে ইস্তিখারা করে, সে ব্যর্থ হয় না; আর যে অপচয় থেকে বিরত থাকে, সে অভাবে পড়ে না”। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২) ।
﴿فِي الْأَمْرِ﴾ ‘সকল বিষয়ে’, “الأمر” শব্দের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের সামগ্রিক নেতৃত্ব ও পরিচালনা। অর্থাৎ যুদ্ধ কিংবা শান্তি, যে পরিস্থিতিই হোক, মুসলিম সমাজকে কোন নীতি অনুসরণ করতে হবে, কীভাবে নিরাপত্তা, ভয়ভীতি বা সংকট মোকাবিলা করতে হবে, এবং দুনিয়ার সার্বিক কল্যাণের জন্য কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, সবই এ শব্দের অন্তর্ভূক্ত। সহজভাবে, “الأمر” বলতে দুনিয়াবি স্বার্থ ও জনকল্যাণের লক্ষ্যে উম্মতের পূর্ণাঙ্গ নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনাকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১১) ।
﴿فَتَوَكَّلْ﴾ ‘অতঃপর তাওয়াক্কুল কর’, “التوكل” (তাওয়াক্কুল) শব্দটি ইসলামী আধ্যাত্মিকতার একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, যার মধ্যে ব্যক্তির স্বীয় সীমাবদ্ধতা ও অক্ষমতার স্বীকৃতি নিহিত আছে। ভাষাতাত্তি¡কভাবে এতে দুটি দিক স্পষ্ট:
(ক) إظهار العجز- নিজের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ততা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা।
(খ) الاعتماد على غيرك والاكتفاء به- নিজের সক্ষমতার বাইরে যে শক্তি ও সাহায্যের প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণভাবে অন্যের (আল্লাহর) ওপর অর্পণ করা। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায় যে তাওয়াক্কুল কোনো নিষ্ক্রিয় বা অলস নির্ভরতা নয়; বরং তা সচেতনভাবে আত্মসমর্পণ এবং ঈমান-ভিত্তিক আস্থা। ব্যক্তির দায়িত্ব পালন ও কারণ গ্রহণের পর ফলাফলের ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর উপর নির্ভর করা তাওয়াক্কুলের মূল ভিত্তি। এখানে মানব-অক্ষমতা ও আল্লাহর সর্বক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তি, দৃঢ়তা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়। সুতরাং, তাওয়াক্কুল এমন এক অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি, যা মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা চিনতে শেখায় এবং জীবনের বাস্তব কর্মকান্ডে আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভর করার শক্তি প্রদান করে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১১) ।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
আগের আয়াতগুলোতে উহুদে মুসলমানদের ভুলের পর আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করেছেন এবং মুনাফিকদের কথায় প্রভাবিত না হতে সতর্ক করেছেন। আর উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা.) ক্ষমাশীলতার নির্দেশনা দিয়েছেন। যদিও এই ঘটনার ফলে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তবুও আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহাবিদের প্রতি কোমলতা, সহনশীলতা ও দয়ার আচরণ দেখানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাদের সাথে ন¤্রভাবে কথা বলবেন, সুন্দর আচরণ করবেন, এমনকি ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও তাদের সাথে পরামর্শ করবেন, যা তার চরিত্র ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১৩৯) ।
আয়তদ্বয়ের শিক্ষা:
১। ১৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করেছেন:
প্রথমতঃ একজন যোগ্য নেতার তিনটি বৈশিষ্ট্য-
(ক) কোমলতা, দয়াদ্রতা ও মানবিক আচরণ, আয়াতের প্রথমাংশ থেকে বুঝা যায় একজন নেতার প্রথম ও অপরিহার্য গুণ হলো অন্তরের কোমলতা। নেতৃত্বের মূল শক্তি মানুষের হৃদয় জয় করা; আর হৃদয় জয় হয় আচরণের সৌন্দর্যে, কঠোরতা দিয়ে নয়। আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে: যদি আপনি রূঢ়, কঠোর ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তবে মানুষ আপনার চারপাশ থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত। এর দ্বারা বুঝা যায়, নেতৃত্বের সফলতা ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের উপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সহনশীলতা, বিনয়, নরম ভাষা, এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক আচরণের উপর। একজন নেতার উচিত মানুষের ভুলত্রুটিকে বোঝা, তাদের পরিস্থিতি উপলব্ধি করা এবং তাদের সাথে এমনভাবে আচরণ করা যাতে মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত ও মূল্যায়িত বোধ করে। এ ধরনের কোমল নেতৃত্ব মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত করে, সম্মান ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে, এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যকে দৃঢ় করে। এমনকি কঠিন পরিস্থিতেও অনুসারীদের প্রতি কোমল হতে হবে। যেমন: উহুদ যুদ্ধে যারা ভুল করেছিল তাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) কোমল আচরণ দেখিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে কোমলতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সংকট-পরবর্তী পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত উপাদান। ফলে দেখা যায়, কোমলতা নেতৃত্বের আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কুরআনিক ভিত্তি। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ﴾ [سورة التوبة: ১২৮].
অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছে, যিনি তোমাদের মধ্য থেকে; তিনি তোমাদের কষ্ট ও দুঃখ দেখে মন খারাপ করেন, তোমাদের কল্যাণে আন্তরিক, এবং বিশ্বাসীদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়” (সূরাতু আত-তাওবা: ১২৮) ।
(খ) ক্ষমাশীলতা, দোয়ার মনোভাব ও অনুসারীদের কল্যাণকামী দৃষ্টি, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে একজন নেতার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে: ক্ষমা করা এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করা। নেতা যখন নিজের অধীনস্থদের ভুল মাফ করেন, তখন এটি কেবল মানবিক সৌজন্য নয়; বরং এটি দলগত ঐক্য, সহযোগিতা এবং পরস্পর আস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করে। ভুল করলে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া নেতৃত্বের পরিপক্বতার পরিচয়। পাশাপাশি, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ থেকে বুঝা যায় একজন নেতার মন কেমন হওয়া উচিত, অনুসারীদের শুধু দুনিয়ার জন্য নয়, আখিরাতের সফলতার জন্যও তিনি প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। নেতা তার দলের ভুল ক্ষমা করবেন, তাদের উন্নতির জন্য দোয়া করবেন, এবং তাদের কল্যাণকে নিজের ব্যক্তিগত মান-সম্মানের চাইতেও বড় মনে করবেন। এ ধরনের নেতাই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পায়। যেমন: উহুদ-পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলাভঙ্গকারী সাহাবাদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) ক্ষমা ও দোয়া সমাজে পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং মনোবল পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
(গ) পরামর্শনির্ভর নেতৃত্ব ও দলগত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া, আয়াতের শেষাংশে পরামর্শ ভিত্তিক কাজ করার নির্দেশ একটি গভীর নীতির প্রতিষ্ঠা করেছে, আর তা হলো- সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ। পরামর্শনির্ভর নেতৃত্ব এমন একটি পদ্ধতি যা দলের সদস্যদের মূল্যায়ন করে, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায়, এবং সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এমনকি রাসুলুল্লাহর (সা.) মতো সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, যিনি ওহীর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত ছিলেন, তাকেও বলা হয়েছে: মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করতে। এটি দেখায় যে মানুষের মতামত গ্রহণ করা নেতৃত্বের জন্য কতটা জরুরি। পরামর্শ দলকে ঐক্যবদ্ধ করে, অনুসারীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে, এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বাড়ায়। পরামর্শ গ্রহণের পর যখন নেতা সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন সিদ্ধান্তে দৃঢ় হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। এতে নেতৃত্বে দৃঢ়তা ও ঈমানি শক্তি উভয়ই বিদ্যমান থাকে, যা যেকোনো সঙ্কটে নেতা ও দলকে সঠিক পথে স্থির রাখে। পরমর্শের গুরুত্ব সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ﴾ [سورة الشورى: ৩৮].
অর্থ: “তাদের কাজ-কর্মের মধ্যে তারা পরামর্শ ও আলোচনা করবে” (সূরাতু আশ-শুরা: ৩৮)।
দ্বিতীয়তঃ মাজলিসে শুরার সদস্যপদ নির্ধারনে করণীয়-
আয়াতে বর্ণিত ত্রিস্তরীয় ক্রমটি নববী নেতৃত্বের একটি সুচিন্তিত ও গভীর মনস্তাত্তি¡ক নীতির প্রতিফলন। প্রথম পর্যায়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) সাহাবিদের প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষমা ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করা হয়, যা সামাজিক-নেতৃত্বমূলক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি মৌলিক ভিত্তি। উহুদের ঘটনাকে ঘিরে তাদের অবাধ্যতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই নেতার সাথে তার অনুসারীর সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছিল। ব্যক্তিগত ক্ষমা সেই সম্পর্ককে পুনরায় স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাকে সাহাবিদের পক্ষে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এই ধাপটি নির্দেশ করে যে তাদের ভুল কেবল সামাজিক-নেতৃত্বগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ধর্মীয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা.) এই ক্ষমাপ্রার্থণা সাহাবিদের আত্মিক পরিশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্বাসনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়, যা তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। এর ফলে তারা অপরাধবোধ, সংকোচ ও মনস্তাত্তি¡ক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়। তৃতীয় পর্যায়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) তাদের শূরায় অংশগ্রহণের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত আহ্বান করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এখানে স্পষ্ট হয় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারিত্ব শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং তা এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন করে যারা মানসিকভাবে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং ঈমানি দায়িত্ববোধে দৃঢ়। তাই ক্ষমা (সামাজিক পুনর্গঠন) এবং ইস্তিগফার (আধ্যাত্মিক পুনর্গঠন) এই দুই স্তরের পরেই তারা সম্পূর্ণভাবে পরামর্শদানে উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
এই তিন পর্যায়ের বিন্যাস নববী নেতৃত্বের এক অনন্য দ্রষ্টান্ত, যেখানে মনস্তত্ত¡, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রশাসনিক প্রজ্ঞা- তিনটি স্তরই একে অপরকে সমর্থন করে। এটি ইঙ্গিত করে যে, কার্যকর নেতৃত্ব প্রথমে অনুসারীদের হৃদয়কে শান্ত করে, তারপর তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, এরপর তাদের চিন্তার শক্তিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগায়।
২। পরামর্শের বহু উপকারিতা রয়েছে; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতা হলো:
(ক) এটি মানুষের বুদ্ধি, উপলব্ধি এবং সমাজের প্রতি আন্তরিকতার মাত্রা প্রকাশ করে।
(খ) মানুষের ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা থেকে সবচেয়ে সঠিক ও ফলদায়ক মত বের করা যায়।
(গ) মতামত পর্যালোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
(ঘ) এটি মানুষের হৃদয় একত্রিত করে এবং লক্ষ্য অর্জনে সমন্বয় ও সহায়তা করে; (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/১১৪) ।
৩। ১৬০ নং আয়াতে দুইটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছেঃ
(ক) জয়-পরাজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, কুরআন যখন ঘোষণা করে- বিজয় ও পরাজয় আল্লাহর হাতেই, এটি কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়; বরং ইসলামী বিশ্বদৃষ্টির একটি মৌলিক তাত্তি¡ক ভিত্তি। আল্লাহর সাহায্য ও বঞ্চনা মানুষের বাহ্যিক শক্তি, সেনাশক্তি, সংখ্যা বা কৌশলকে অতিক্রম করে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। কারণ, ব্যবস্থা অবশ্যই গুরুত্বপূর্র্ণ, কিন্তু চ‚ড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর। ইসলামী ইতিহাসে বদর, খন্দক ও হুনাইন প্রতিটি ঘটনার ফলাফল এই ঐশী নীতির বাস্তব প্রমাণ। বদরে কম সংখ্যা ও কম সম্পদ নিয়ে বিজয়, আর হুনাইনে অধিক সংখ্যায় সাময়িক বিপর্যয়। উভয়ই মুমিন সমাজকে শিক্ষা দেয় যে মানুষের প্রচেষ্টা মাধ্যম হলেও ফলাফলের মালিক আল্লাহ। একটি জাতির নৈতিকতা, আনুগত্য, ঈমানি দৃঢ়তা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কই আল্লাহর সাহায্য বা বঞ্চনার প্রধান নির্ধারক; বাহ্যিক শক্তি বা আয়োজন শুধুই উপকরণ। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২) ।
(খ) বিজয়ের জন্য একমাত্র আল্লাহর উপরই তাওয়াক্কুল করতে হবে, যেহেতু বিজয় আল্লাহর হাতে, তাই বিজয় অর্জনের জন্য কুরআন যে তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দেয় তা দুইটি স্তরে কাজ করে: (ক) সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ ও কার্যকর পরিকল্পনা করা, এবং (খ) ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা। এটি কারণ গ্রহণে সর্বোচ্চ যত্ন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র আল্লাহ। রাসূলুল্লাহর (সা.) নেতৃত্বে দেখা যায়- যুদ্ধেও গোয়েন্দা তৎপরতা, সৈন্যবিন্যাস, কৌশল নির্বাচন সবই ছিল পরিপূর্ণ প্রস্তুতির নির্দেশনা; কিন্তু ফলাফলের ব্যাখ্যা সবসময় আল্লাহর সাহায্যের সাথে সম্পর্কিত। এই তাওয়াক্কুল মুমিনকে মানসিক দৃঢ়তা দেয়; সে হতাশ হয় না, অহংকারেও পড়ে না। মনস্তত্ত¡ ও নেতৃত্বতত্তে¡র গবেষণায়ও দেখা যায় যে নেতা উচ্চতর শক্তির উপর ভরসা রাখে, তার সিদ্ধান্তে স্থিরতা ও সংকটে ধৈর্য থাকে। কুরআনিক তাওয়াক্কুল এই স্থিরতাকে ঈমানের শক্তিতে রূপান্তর করে এবং এবং বিজয়কে শুধুমাত্র সামরিক অর্জন নয়, বরং নৈতিক-আধ্যাত্মিক সফলতার ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৪০২) ।
আয়াতদ্বয়ের করণীয় (আমল):
আল্লাহর পথে দ্বায়িত্বশীল ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিম্নের কাজগুলো করবে:
(ক) অধীনস্থদের প্রতি সদয় ও কোমল-হৃদয় আচরণ করবে।
(খ) শূরা নীতির আলোকে পরামর্শভিত্তিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
(গ) সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখে তা বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে।
(ঘ) বিজয়-পরাজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, এই বিশ্বাস রেখে সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
