Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৪-১৫৫) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৫৪-১৫৫) আয়াতদ্বয়ের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: উহুদে মুমিনের প্রশান্তি, মুনাফিকদের বিভ্রম ও আল্লাহর ক্ষমা।

﴿ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَلْ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ يُخْفُونَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللَّهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (154) إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنْكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ (155)﴾ [سورة آل عمران: 154-155].

আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদে মুমিনের প্রশান্তি, মুনফিকদের বিভ্রম ও আল্লাহর ক্ষমা।

আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ ও শব্দার্থ:
১৫৪। অতঃপর দুঃখের পওে তিনি তোমাদের উপর প্রশান্ত তন্দ্রা নাযিল করলেন, যা তোমাদের একটি দলকে ঢেকে দিল, এবং অপরদল যারা নিজেদের জান নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তারা আল্লাহ সম্পর্কে অসত্য জাহিলী ধারণা পোষণ করেছিল, তারা বলেছিল: আমাদের এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার আছে? বলো: নিশ্চয় পুরো বিষয়টি আল্লাহরই এখতিয়ারভ‚ক্ত। তারা অন্তরে এমন বিষয় লুকিয়ে রাখে, যা তারা তোমার কাছে প্রকাশ করে না। তারা বলে: যদি আমাদের এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার থাকতো, তাহলে আমাদেরকে এখানে কতল করা হতো না। বলো: যদি তোমরা তোমাদের ঘরে থাকতে, তাহলেও যাদের কতল অবধারিত হয়েছে, তারা তাদের কতল হওয়ার স্থানের দিকে বের হয়ে যেত। আর তোমাদের অন্তরে কি রয়েছে আল্লাহ যেন তা পরীক্ষা করতে পারেন, এবং যাতে পরিষ্কার করেন যা তোমাদের অন্তরে রয়েছে। আর আল্লাহ তোমাদের অন্তরের বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।
১৫৫। নিশ্চয় তোমাদের থেকে যারা দুইদল জমা হওয়ার দিনে পিছু হটেছিল, তাদেরকে শয়তান পদস্খলন করেছিল তাদের কৃতকর্মের জন্য, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল।

আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
উহুদের সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ সত্যিকারের ঈমানদারদের হৃদয়ে এক অসাধারণ শান্তি নাজিল করেছিলেন, এমন শান্তি যা ভয়কে গলিয়ে দেয়, মনকে স্থির করে, এমনকি ক্লান্ত যোদ্ধার হাতের তলোয়ার পড়ে গেলেও তন্দ্রার প্রশান্তি তাকে আবার তা তুলে নিতে শক্তি দেয়। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে আরেকদল মানুষের হৃদয় ভেঙে পড়ছিল; তারা শুধু ভাবছিল কীভাবে নিজেদের প্রাণ বাঁচানো যায়। যুদ্ধের দৃশ্য, পরাজয়ের আঘাত ও আশঙ্কা তাদের মনোবলকে ক্ষয়ে দিয়েছিল, ফলে তারা আফসোস করতে শুরু করল যে যুদ্ধের জন্য বের হওয়াই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তাদের মধ্যে আরেকদল ছিল মুনাফিক, তারা মনে মনে ধারণা করতো শুরু করলো ইসলাম টিকবে না, নবী সফল হবেন না, এবং মুসলমানদের বিজয়ের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই লুকানো জাহিলি চিন্তা মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিলেন। তারা গোপনে বলছিল: “আমাদের তো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়া হয়নি, এখতিয়ার দেওয়া হলে আমরা যুদ্ধেই আসতাম না”। আল্লাহ তায়ালা এর জবাবে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন- জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তের এখতিয়ার মানুষের হাতে নয়; কার মৃত্যু যেখানে নির্ধারিত, সে নিজেই সেখানে পৌঁছে যাবে, ঘরে থাকলেও তা এড়ানো যাবে না। সবশেষে আল্লাহ জানান, এই পুরো ঘটনাই ছিল একটি পরীক্ষা, যাতে মানুষের অন্তরের সত্য প্রকাশ পায়; কে সত্যিকারের মুমিন, আর কে ভয়, সন্দেহ ও নেফাকে ডুবে আছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ হৃদয়ের লুকানো কথা, গভীরতম বিশ্বাস বা সংশয়ের কিছুই আল্লাহর অগোচরে থাকে না।
উহুদের যুদ্ধে কিছু সাহাবি, ভয় ও দুর্বলতার কারণে লড়াই থেকে পলায়ন করেছিলেন। তাদের এই দুর্বলতার পেছনে শয়তানের প্ররোচনা ছিল, কারণ তাদের মধ্যে কিছু ছোটখাটো ভুল বা পাপ ছিল যা শয়তানকে সুযোগ দিয়েছে। তবে আল্লাহ তাদেরকে দোষী হিসেবে ধরেননি, বরং ক্ষমা করেছেন। তিনি দয়া ও মাগফিরতের মালিক, এবং যারা সত্যিকারের তওবা করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ সহনশীল; তিনি অবিলম্বে শাস্তি দেন না। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৭-৩৯৮; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/১২৮-১৩০; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৭০; আল-মুনতাখাব: ১/১১৩) ।

আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أَمَنَةً نُعَاساً﴾ ‘প্রশান্ত তন্দ্রা’, এখানে “أمنة” বলতে বোঝানো হয়েছে এমন গভীর নিরাপত্তাবোধ, যেখানে ভয় দূর হয়ে অন্তর স্থির হয়ে যায়। আর “نعاس” হলো সেই হালকা তন্দ্রা বা ঢুলুনিভাব, যা ঘুমের আগে শরীরকে ঢিলে করে দেয় এবং মনকে শান্ত করে। অর্থাৎ আল্লাহ এমন এক প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন যার দ্বারা ভয় দূর হয়ে যায়, মন শান্ত হয়, এবং শরীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে নিরাপত্তার অনুভূতি পায়। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنفُسُهُمْ﴾ “যারা নিজেদের জান নিয়েই ব্যস্ত ছিল”, অর্থাৎ- তারা শুধু নিজেদের জীবন বাঁচানো নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তাদের মনে ছিল না রাসুলুল্লাহর (সা.) কী হলো, তাঁর সাহাবিদের কী অবস্থা। ভয় ও আতঙ্কে তারা এমনভাবে নিজেদের নিয়েই মগ্ন ছিল যে অন্য কোনো বিষয় তাদের চিন্তায় আসছিল না। এই বাক্যটি সেই দুর্বলচিত্ত লোকদের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেনি এবং কেবল নিজের নিরাপত্তাকেই বড় ভেবেছিল। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ﴾ “জাহেলিয়াতি ধারণা”, আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে কয়েকটি মত পাওয়া যায়:
(ক) আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন: আয়াতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- তাক্বদীর বা ভাগ্যকে অস্বীকার করা।
(খ) উহুদের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) হত্যা হয়েছে, অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে আর সাহায্য করা হবে না এ কথা বিশ্বাস করা। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৯৬, তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿وَلِيَبْتَلِيَ اللهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ﴾ “তোমাদের অন্তর পরীক্ষা করার জন্য”, এখানে উদ্দেশ্য হলো- তাদের অন্তরে ইখলাস আছে কিনা জানার জন্য পরীক্ষা করা।
﴿وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ﴾ “যাতে বাছাই করতে পারেন তোমাদের অন্তরে কি আছে”, “তামহিস” মানে হচ্ছে পার্থক্য প্রকাশ করা বা শুদ্ধ করা। যেমন, আগুনে ধাতু গলালে খাঁটি অংশ আলাদা হয়ে যায়, তেমনি আল্লাহ পরীক্ষা ও বিপদের মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিককে আলাদা করে দেন। এতে প্রকাশ পায়- কে সত্যিকারের ঈমানদার, আর কে কেবল মুখে বিশ্বাসের দাবি করে; কে আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে, আর কে অন্তরে বিরাগ পোষণ করে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।
﴿إِنَّمَا اسْتَزَلّهُمُ الشَّيْطَانُ﴾ “শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল”, এখানে “استزلهم” মানে হলো ভুল করতে প্ররোচিত করা বা পাপে ফেলানো। এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে বোঝানো হয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধে যেসব সাহাবি ভয় ও বিভ্রান্তিতে পড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন, তা আসলে তাদের বড় কোনো কুফরি বা বিদ্বেষের কারণে ছিল না; বরং শয়তান তাদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে তাদেরকে ভুল করতে বাধ্য করেছিল। যুদ্ধ থেকে পলায়নই ছিল সেই ভুল বা “زلل”। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কারওয়ারী: ৩/১৫৪) ।

উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
উহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এই আয়াতদ্বয় নাজিল হয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাঁদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রæতি পূর্ণ করেছেন এবং প্রাথমিকভাবে তাঁদের বিজয় দান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু সাহাবির অবাধ্যতার কারণে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এরপর উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের অন্তরের গোপন ভাবনা ও কপটতা প্রকাশ করেছেন, যারা বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছিল এবং পরাজয়ের জন্য ইসলামকেই দায়ী করেছিল। এর মাধ্যমে আল্লাহ খাঁটি ও দৃঢ় ঈমানদারদেরকে ভীত মুমিন ও মুনাফিকদের থেকে পৃথক করে দিয়েছেন, যাতে সত্য ও মিথ্যা স্পষ্ট হয়ে যায়। (নাজমুদ দুরার, বাক্বায়ী: ২/১৬৯)।

১৫৪ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবন রাহওয়াইহ (র.) জুবাইর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: “উহুদের দিনে আমি নিজে এমন অবস্থায় ছিলাম, যখন ভয় আমাদেরকে প্রবলভাবে আঘাত করল। তখন আল্লাহ আমাদের ওপর নিন্দ্রা নাজিল করলেন, যা ছিল নিরাপত্তা ও প্রশান্তির নিদর্শন। আমাদের মধ্যে সবাই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আল্লাহর কসম! সেই অবস্থায় আমি যেন স্বপ্নের মতো শুনতে পেলাম ‘মু‘ত্তিব ইবন কুশাইর’ বলছে: “যদি আমাদের কোনো এখতিয়ার থাকত, তবে আমরা এখানে নিহত হতাম না”। আমি কথাটি মনে রাখলাম, এরপর আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে ১৫৪ নং আয়াত নাজিল করলেন: (আসবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/১২৯) ।

আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। উহুদের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যেখানে মুমিনদের ঈমান, ধৈর্য, আনুগত্য ও আল্লাহর উপর নির্ভরতার প্রকৃত পরীক্ষা সংঘটিত হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলমানরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, কিন্তু কিছু সাহাবির নির্দেশ অমান্য করার কারণে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। ১৫৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের শান্তনা দিয়েছেন, মুনাফিকদের অন্তর উন্মোচন করেছেন এবং তাকদির ও আল্লাহর হিকমতের গভীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। আইসার আল-তাফাসীর অনুসারে যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
(ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান, উহুদের যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের প্রতি এক বিশেষ রহমতের ইঙ্গিত দেয়। যুদ্ধের পর মুসলমানদের মনে যখন চরম ভয়, হতাশা ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাঁদের অন্তরে শান্তি নিশ্চয়তার অনুভূতি দান করেন, যা ছিল এক অলৌকিক প্রশান্তি। এই প্রশান্তির প্রকাশ ছিল- তা তন্দ্রা আকারে শুধুমাত্র ঈমানদারদের অন্তরে নাজিল হয়েছিল। এটি এমন এক নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল যে, তারা যুদ্ধের মাঠেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কারণ তাদের অন্তর আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রশান্তি হয়েছিল। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা দেখিয়ে দেন যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, আল্লাহ তাঁদের জন্য ভয়কে প্রশান্তিতে রুপান্তরিত করে দেন।
(খ) মুনাফির ও মুশরিকদের ভয় ও হতাশা, উহুদের যুদ্ধের সময় মুসলমানদের মধ্যে দুটি শ্রেণী স্পষ্ট হয়ে ওঠে- একদল দৃঢ় ঈমানদার, যাদের হৃদয়ে আল্লাহ প্রশান্তি নাযিল করেন। অন্যদিকে মুনাফিক ও দ্বিমুখী লোকেরা সেই প্রশান্তি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। আল্লাহর প্রতি আস্থা ও পরকালের বিশ্বাস না থাকার কারণে তাদের হৃদয়ে নিরাপত্তার কোন অনুভূতি ছিল না। তারা যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর সন্তুষ্টি বা ইসলামের বিজয় নিয়ে ভাবেনি, বরং কেবল নিজের প্রাণ বাঁচানোর চিন্তায় এবং যুদ্ধে আসার জাগতিক লাভ-লোকসানের হিসাব নিকাশে মগ্ন ছিল। এই মানসিক অবস্থাকেই আল্লাহ তায়ালা আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বর্ণনা করেছেন। এভাবে উহুদের ঘটনাবলির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা প্রকৃত ঈমানদার ও কপট মুনাফিকদের হৃদয়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।
(গ) জাহেলিয়াতি চিন্তা ও আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা, আয়াতের তৃতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস ও বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। তারা আল্লাহর শক্তি, হিকমত ও প্রতিশ্রæতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের মনোভাব ছিল সেই অন্ধ যুগের মানুষের মতো, যারা আল্লাহর উপর ভরসা না রেখে কেবল বস্তুগত ফলাফল ও বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করত। তারা মনে করেছিল, মুসলমানদের পরাজয়ই ইসলামের সমাপ্তি এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) দাওয়াত দাওয়াত ব্যর্থ। কিন্তু বাস্তবে, এই যুদ্ধের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের পরিশুদ্ধ করেছেন, তাদের অন্তরের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করেছেন এবং কপটদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন।
(ঘ) মোনাফেকদের গোপন কথার উন্মোচন, আয়াতের চত‚র্থাংশে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের দুইটি বড় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন:
(ক) তাদের সন্দেহ ও নিয়ন্ত্রণহীন মনোভাব, তারা বিশ্বাস করত না যে যুদ্ধে বিজয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে। তারা মনে করত, যদি নিজেদের ইচ্ছায় চলত, তবে তারা নিরাপদ থাকত। এই মনোভাবই প্রকৃত ঈমানের বিপরীত, কারণ মুমিন বিশ্বাস করে- সবকিছু আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী ঘটে।
(খ) তাদের গোপন শত্রুতা ও কপটতা, বাহ্যিকভাবে তারা মুসলমানদের সাথে ছিল, কিন্তু অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবাদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত। আল্লাহ তায়ালা এই অন্তর্নিহিত কপটতা প্রকাশ করে দিলেন, যাতে মুমিনরা বুঝে নিতে পারে কারা সত্যিকার বিশ্বস্ত এবং কারা বিশ্বাসঘাতক।
(ঙ) তাকদীরের অনিবার্যতা এবং অন্তরের পরীক্ষা, যখন মুনাফিকরা নিজেদের মধ্যে গোপনে আলোচনা করে বলল: যদি তাদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকত, তাহলে তারা এখানে নিহত হত না, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে আদেশ করলেন, যেন তিনি তাদের উত্তর দেন: যদি তারা তাদের ঘরেও থাকতো, তবুও যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত হয়ে গেছে, তারা নিজের মৃত্যুর স্থানে উপস্থিত হতো। মৃত্যু আল্লাহর লিখিত তাকদির অনুযায়ী অবধারিত, তা থেকে পালানো সম্ভব নয়। তাদের উহুদে বের হওয়াও আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ ছিল, যাতে তিনি তাদের অন্তর পরীক্ষা করেন এবং তিনি যেন অন্তরের বিশ্বাস ও কপটতাকে স্পষ্ট করে দেন, যাতে যা আগে অদৃশ্য ছিল, তা প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুমিনরা বাস্তব চিত্রটি দেখতে পান।
২। ১৫৫ নং আয়াতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
(ক) মুসলমানদের উহুদ যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালানোর রহস্য, উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলমান ও মুশরিকদের মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল, তখন যারা মুসলমানদের মধ্যে থেকে পরাজিত হয়ে পিছু হটেছিল বা নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করেছিল, আসলে শয়তানই তাদেরকে সেই ভুল ও পদস্খলনের ফাঁদে ফেলেছিল। কারণ, তাদের মধ্যে কিছু গুনাহ বা পূর্বের ত্রুটি ছিল, যার ফলে তারা শয়তানের প্ররোচনায় পড়েছিল। এতে বোঝা যায়- গুনাহ এক গুনাহের পথ খুলে দেয়, যেমন আনুগত্য আরেক আনুগত্যের পথ সুগম করে। যেমন জামাখশারী (রহ.) বলেছেন: “পাপ মানুষকে আরও পাপের দিকে টানে, আর সৎকর্ম মানুষকে আরও সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে”। এইভাবে, বিপদ, শাস্তি কিংবা পরাজয়, সবই মানুষের কর্মফলেরই ফলশ্রুতি। যেমন একটি গুনাহের শাস্তি আরেক গুনাহ বা কষ্ট হতে পারে, তেমনি একটি সৎকর্মের পুরস্কার আরেক সৎকর্মের সুযোগ হতে পারে।
(খ) শয়তানের পাতা ফাদে পতিত হওয়া মুসলমানদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা, আয়াতের দ্বিতীয়াংশে তারা যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু সময়ের জন্য ফিরে গিয়েছিল, আল্লাহ তাদের সেই কাজের জন্য আখিরাতে শাস্তি দিবেন না; বরং দুনিয়াতে তা তাদের জন্য শিক্ষা, সংশোধন ও পরিশুদ্ধির উপায় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এটি তাদের জন্য আশার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যাতে তারা হতাশায় না পড়ে এবং ভবিষ্যতে আরও দৃঢ় হয়।
(গ) ক্ষমা ও সহিষ্ণু আল্লাহর অন্যতম গুণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ﴾. “নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু”। (সূরাতু আলে-ইমরান: ১৫৫) । এই আয়াতে দুটি মহান গুণ উল্লেখ করা হয়েছে:
الغفور (ক্ষমাশীল): যিনি বান্দার গুনাহ ঢেকে দেন, ক্ষমা করেন এবং তওবার সুযোগ দেন।

الحليم (সহিষ্ণু): যিনি রাগ দমন করেন, অপরাধ সত্তে¡ও সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না, বরং সময় দেন বান্দাকে সংশোধনের জন্য। এ দুটি গুণই আল্লাহ তায়ালার “সিফাত” (গুণাবলি)-এর অংশ, যা কুরআন ও হাদীসে বারবার এসেছে। আল্লাহ তায়ালার সিফাতের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত, আশায়েরিয়্যাহ ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের আক্বীদাহ নিম্নে:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ-এর আক্বীদাহ: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ বিশ্বাস করেন আল্লাহ তায়ালার যেসব গুণ কুরআন ও সহিহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা সবই চিরন্তন, শাশ্বত, হাক্বীকী বা বাস্তব, সত্য ও প্রমাণিত। এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কারণ, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক পরিপূর্ণ গুণে গুণান্বিত এবং সকল ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র ও মুক্ত। অতএব, যেহেতু তাঁর গুণাবলি পরিপূর্ণতার গুণাবলি, তাই এটা অসম্ভব যে সেগুলো তাঁর মধ্যে পরবর্তীকালে সৃষ্টি হয়েছে বা কোনো এক সময় তিনি ওই গুণাবলিতে বঞ্চিত ছিলেন। কেননা, এমন ধারণা করা মানে আল্লাহর প্রতি ত্রুটি আরোপ করা, যা তাঁর পবিত্র সত্তার পরিপন্থী। সেগুলো সৃষ্টির গুণাবলির মতো নয়; বরং তাঁর মাহাত্ম্য অনুযায়ী অনন্য।
দলীল:
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ [سورة الشورى: ১১].
অর্থ: “তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (সূরাতু আশ-শূরা: ১১) ।
ইমাম মালিক (রহ.) থেকে একটি প্রশিদ্ধ কথা রয়েছে:
“الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة”.
অর্থ: “ইস্তিওয়া জানা, কিভাবে তা ঘটে তা অজানা, তাতে বিশ্বাস করা ফরজ, আর কিভাবে ঘটে তা নিয়ে প্রশ্ন করা বিদআত”। এই নীতি আল্লাহর অন্যান্য গুণাবলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের বিশ্বাস কোন ধরণের ব্যাখ্যা, বিকৃতি, উপমা এবং নিস্ক্রীয়করণ ছাড়া আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) যেভাবে বলেছেন, ঠিক সেভাবে বিশ্বাস করা। এক্ষেত্রে তাদের মূলনীতি হলো:
“إثباتُ ما أثبَتَه اللهُ لنَفْسِه في كتابِه، أو أثبَتَه له رسولُه صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، أو أصحابُه رَضِيَ اللهُ عنهم، مِن غيرِ تحريفٍ ولا تعطيلٍ، ومِن غيرِ تكييفٍ ولا تمثيلٍ”. (العقيدة الواسطية).
“আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে নিজের জন্য যে গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন, অথবা রাসূলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর সাহাবারা (রা.) যে গুণাবলি তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেছেন সেগুলো সাব্যস্ত করা। কিন্তু কোনো প্রকার বিকৃতি (تحريف) বা অস্বীকার (تعطيل) ছাড়াই, এবং কোনো রকম নির্দিষ্টরূপ নির্ধারণ (تكييف) বা তুলনা-সাদৃশ্য স্থাপন (تمثيل) ছাড়াই”। (আল-‘আকীদাহ আল-ওয়াসিতিয়্যাহ, ইবনু তাইমিয়্যাহ) ।
আশআরিয়াহদের (الأشاعرة) আক্বীদাহ, আশআরিয়াহ আহলুস সুন্নাহর খুব কাছাকাছি একটি মাজহাব, তবে গুণাবলির ব্যাখ্যায় তারা কিছু “তাওয়ীল” (রূপক অর্থ) ব্যবহার করেছেন।
তাদের মূলনীতি:
তারা আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিকে দুই ভাগে ভাগ করেন:
(ক) সিফাতে যাতিয়া (ذاتيّة), যেমন: জীবন (حياة), জ্ঞান (علم), শক্তি (قدرة), ইচ্ছা (إرادة), শ্রবণ (سمع), দৃষ্টি (بصر), বাক্য (كلام)। এগুলোকে চিরন্তন, শাশ্বত, হাক্বীকী বা বাস্তব, সত্য ও প্রমাণিত বলে বিশ্বাস করেন। এটি আহলুস সুন্নাহর সাথে মিল আছে।
(খ) সিফাতে ফে’লিয়া (فعلية), যেমন: ক্ষমা, রাগ, খুশি, সহিষ্ণুতা, ভালোবাসা, অসন্তোষ ইত্যাদি। এগুলোকে তারা রূপক অর্থে তাওয়ীল করেন। এখানেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সাথে বিরোধ। তাদের মতে,
আল্লাহর “غفور” মানে তিনি ক্ষমা দান করেন (يفعل المغفرة), কিন্তু “ক্ষমাশীলতা” কোনো স্থায়ী গুণ নয়, বরং তাঁর “ইরাদা (ইচ্ছা)” বা “ফে’ল (কর্ম)” থেকে প্রকাশিত হয়।
“حليم” মানে, তিনি সহিষ্ণু বা শাস্তি বিলম্বিত করেন, কিন্তু এটি কোনো আলাদা গুণ নয়; বরং তাঁর “ইরাদা” ও “কদর” এর প্রকাশ।
ইমাম আল-জুয়াইনি (ইমামুল হারামাইন) বলেন:
“الصفات التي دلّ عليها السمع، منها ما يجب إجراؤه على الحقيقة، ومنها ما يصرف إلى المجاز”.
অর্থাৎ, “শরিয়তের মাধ্যমে প্রমাণিত গুণাবলির কিছু বাস্তব অর্থে গ্রহণ করতে হয়, আর কিছু রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হয়”।
তবে আশআরীরা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মতো গুণাবলি পুরোপুরি অস্বীকার করেননি, বরং গুণ ও সত্তার মধ্যে পার্থক্য রেখে তাওয়ীল ও তানযিহ (আল্লাহকে তুলনামুক্ত রাখার প্রচেষ্টা) করেছেন।
জাহমিয়্যাহর (الجهمية) সম্প্রদায়ের আক্বীদাহ, জাহম ইবনু সফওয়ান এর অনুসারীরা আল্লাহর সব গুণাবলিই অস্বীকার (تعطيل) করেছে। তাদের মতে, “যদি আল্লাহর আলাদা গুণ থাকে, তবে তিনি এক নয়; এতে তাওহীদের ব্যাঘাত ঘটে”। তাই তারা বলেন:
“غفور” মানে- আল্লাহ কোনো বাস্তব ক্ষমাশীল নন, বরং ক্ষমা করার কাজ তাঁর সৃষ্টি।
“حليم” মানে- সহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটানো, বাস্তবে আল্লাহর কোনো ধৈর্যের গুণ নেই।
ফলাফল:
এভাবে তারা আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে তাঁকে “বোধশূন্য সত্তা”র পর্যায়ে নামিয়ে আনে। নাউযুবিল্লাহ।
আহলুস সুন্নাহর জবাব: আহলুস সুন্নাহ বলেন, আল্লাহর গুণাবলি তাঁর সত্তার পরিপূর্ণতার অংশ, গুণ অস্বীকার করা মানে আল্লাহর পরিপূর্ণতা অস্বীকার করা। দলীল:
﴿وَلِلّٰهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا﴾ (سورة الأعراف: ১৮০).
অর্থাৎ: “আল্লাহর রয়েছে সবচেয়ে সুন্দর নামসমূহ; তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো” (সূরাতু আল-আ’রাফ: ১৮০) । যদি এই নামগুলোর অর্থই বাস্তব না হয়, তাহলে এই আয়াতের কোনো অর্থ থাকত না।
অবশেষে বলা যায়, আয়াত ﴿إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ﴾ কেবল আল্লাহর রহমত ও সহিষ্ণুতার বার্তা নয়, বরং তাঁর গুণাবলির প্রতি আমাদের বিশ্বাসের দিকনির্দেশনা দেয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ বলেন: আল্লাহ সত্যিকার অর্থেই ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। আশআরিয়াহ বলেন- আল্লাহ ক্ষমা ও সহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটান, তবে রূপক অর্থে তা ব্যাখ্যা করতে হয়। এবং জাহমিয়্যাহ বলেন: আল্লাহর কোনো বাস্তব গুণ নেই; এই ব্যাখ্যা কেবল বাগ্মিতার অলঙ্কার। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালিহীনের সর্বসম্মত পথ হলো-
“نُثْبِتُ مَا أَثْبَتَهُ اللهُ لِنَفْسِهِ وَنَنْفِي عَنْهُ مَا نَفَاهُ عَنْ نَفْسِهِ”.
অর্থাৎ: “আমরা আল্লাহর নিজের জন্য যেসব গুণ প্রমাণিত করেছেন তা মেনে নিই, এবং যা অস্বীকার করেছেন তা অস্বীকার করি”।

আয়াতদ্বয় থেকে করণীয় (আমল):
(ক) বিপদের সময় ভয় ও আতঙ্ক নয়, বরং আল্লাহর স্মরণ ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা, উহুদের ময়দানে কিছু সাহাবি শত্রুর আক্রমণে আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর নাজিল করেন এক ধরনের শান্তি ও তন্দ্রা, যা তাদের অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। এতে শিক্ষা হলো- বিপদে মুমিন আতঙ্কিত নয়; বরং আল্লাহর জিকির, দো‘আ ও তাঁর উপর পূর্ণ ভরসার মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি লাভ করে।
(খ) দুঃখ ও ব্যর্থতার সময় অভিযোগ না করে আত্মসমালোচনা করা, এবং তওবা ও ইস্তেগফারে লিপ্ত থাকা। উহুদের ঘটনায় পরাজয়ের কারণ ছিল মুমিনদের কিছু ভুল ও গাফেলতি। আল্লাহ বলেন, শয়তান তাদেরকে তাদের কিছু কাজের কারণে পিছলে দিয়েছিল। অতএব, বিপদে অভিযোগ নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তওবা ও ইস্তেগফার মুমিনের কাজ।
(গ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে সর্বদা সুদৃঢ় ভালো ধারণা রাখা।
(ঘ) আত্মসমালোচনা পূর্বক গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা, যারা উহুদের ময়দানে ভুল করেছিলেন, তাদের গুনাহের কারণেই শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা শিক্ষা দিয়েছেন- গুনাহ আত্মিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে, যা শত্রুর সাহস বাড়ায়। ফলে মুমিনের উচিত আত্মসমালোচনা করে গুনাহ থেকে দূরে থাকা।
(ঙ) আল্লাহর কাছে সর্বদা তাওবা-ইস্তেগফার করা।

Leave a Reply

error: Content is protected !!