Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১৩৭-১৪১) আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: চিরন্তন নিয়ম থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহবান।

﴿قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ (137) هَذَا بَيَانٌ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِلْمُتَّقِينَ (138) وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (139) إِنْ يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ (140) وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِينَ (141)﴾ [سورة آل عمران: 137-141].

আয়াতসমূহের আলোচ্যবিষয়: চিরন্তন নিয়ম থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহবান।
আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
১৩৭। তোমাদের পূর্বে অনেক ঘটনা অতিবাহিত হয়েছে, সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো মিথ্যাবাদীদের পরিণতি কেমন ছিল।
১৩৮। এটা মানবজাতির জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়েত এবং উপদেশ মোত্তাকীদের জন্য।
১৩৯। আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না; আর তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো।
১৪০। যদি উহুদের যুদ্ধে কোন আঘাত তোমাদের লেগে থাকে, তবে অবশ্যই ঐ কওমকে বদর যুদ্ধে অনুরুপ আঘাত স্পর্শ করেছে, ঐ দিনগুলো যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করে থাকি, এবং যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে জানতে পারেন, এবং তোমাদের একদলকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন; আর আল্লাহ যালেমদেরকে ভালোবাসেন না।
১৪১। আর যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন এবং কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ণ করতে পারেন।
আায়াতসমূহের ভাবার্থ:
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের পূর্বে বহু জাতির ইতিহাস অতিক্রান্ত হয়েছে, যেমন নূহ (আঃ)-এর জাতি, আদ, সামূদ ও অন্যান্য সম্প্রদায়। তাদের প্রতিও আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তারা সেই রাসূলদের অস্বীকার করেছিল। ফলে আল্লাহর সুন্নাহ (নির্ধারিত নীতি) তাদের ওপর কার্যকর হয়, তিনি মিথ্যাবাদীদের ধ্বংস করেন এবং মুমিনদের রক্ষা করেন, যদিও মুমিনরা তাদের হাতে কিছু কষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেছিল।
আজও সেই একই আল্লাহর নীতি বহাল থাকবে, তিনিই মুসলমানদেরকে রক্ষা করবেন, বিজয় দান করবেন, আর তাদের শত্রুদের ধ্বংস করবেন। যদি এ বিষয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকে, তবে সে যেন পৃথিবীতে ভ্রমণ করে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর নিদর্শন দেখে আসে, তারা কী ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল তা নিজ চোখে দেখবে।
এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন: এই আয়াতগুলো মানুষদের জন্য এক স্পষ্ট ব্যাখ্যা, যাতে তারা হক ও বাতিল, হিদায়াত ও গোমরাহির পার্থক্য বুঝতে পারে। এগুলো হিদায়াত ও উপদেশ, যা মোত্তাকীদের অন্তর স্পর্শ করে, কেননা তাদের ঈমান ও তাকওয়ার কারণে তারা শিক্ষা গ্রহণে প্রস্তুত থাকে। ফলে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে সফলতা অর্জন করে।
এর পরে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে শান্তনা দিয়েছেন, উহুদের যুদ্ধে আকস্মিক ও ক্ষাণিক পরাজয়ের কারণে তারা যেন দুর্বল ও দুঃখিত না হয়, বরং তারাই শ্রেষ্ঠ ও বিজয়ী। অর্থাৎ, মুমিনরা যেন জিহাদ ও কর্ম থেকে বিমুখ না হয়, শহীদ ও আহতদের কারণে শোকাহত হয়ে বসে না থাকে। কারণ তারাই প্রকৃত বিজয়ী, অতীতে যেমন ছিলে, ভবিষ্যতেও তেমনই হবে, যদি তারা ঈমান ও তাকওয়ায় দৃঢ় থাকে।
জেনে রেখো, যদি মুমিনরা উহুদের যুদ্ধে কষ্ট পায়, আহত হয় বা শহীদ হয়, তবে তাদের শত্রুরাও বদরের যুদ্ধে একই কষ্ট ভোগ করেছে। যুদ্ধের স্বভাবই হলো- একদিন এক পক্ষের জন্য, আরেকদিন তাদের বিরুদ্ধে। এটি আল্লাহর এক নির্ধারিত নিয়ম (সুন্নাহ)। এ কথাই আল্লাহ বলেন: “আমি এই দিনগুলো মানুষদের মাঝে অদলবদল করি”।
মুমিনদেরকে শান্তনা প্রদান শেষে আল্লাহ তায়ালা উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়ীক পরাজয়ের কয়েকটি উদ্দেশ্য ও রহস্য প্রকাশ করেন।
(ক) এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকৃত মুমিনদের ঈমান প্রকাশ করার মাধ্যমে মুনাফিকদেরকে উলঙ্গ করে ফেলা। যেমন দেখা গেল, মুনাফিকরা তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সলুলের নেতৃত্বে যুদ্ধের আগেই ফিরে যায়, আর প্রকৃত মুমিনরা দৃঢ়ভাবে থেকে যায় এবং যুদ্ধ করে।
(খ) কিছু মুমিনকে শাহাদাতের মর্যাদা লাভে ধন্য করা। যেমন উহুদের যুদ্ধে তাদের মধ্য থেকে শহীদদের বেছে নেন, প্রায় সত্তরজন সাহাবি শহীদ হন, যাদের মধ্যে চারজন ছিলেন মুহাজির, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা.) চাচা হযরত হামযা (রা:) ও মুসআব ইবনু উমায়র (রা:); বাকিরা ছিলেন আনসার।
(গ) মুমিনদেরকে পরিশুদ্ধ করা ও কাফিরদেরকে ধ্বংস করা, উহুদের যুদ্ধে সাময়িক পরাজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ মুমিনদের গুনাহ মাফ করেন ও তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কুফরীদের ধ্বংস করেন ও তাদের অস্তিত্ব মুছে দেন।
এই শিক্ষা মুমিনদের জন্য পরবর্তীতে মহাসৌভাগ্য বয়ে আনে, এরপর তারা আর কখনও রাসূলুল্লাহর (সা.) আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। ফলস্বরূপ, একের পর এক বিজয় লাভ করে তারা আরব উপদ্বীপ থেকে কুফর ও অবিশ্বাসের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৮২-৩৮৩; তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৯৯-১০১; আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৭-৬৮; আল-মুনতাখাব: ১/১০৯-১১০) ।
আয়াতসমূহের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿سُنَنٌ﴾ ‘সুনান’, আরবী “সুন্নাহ” শব্দের বহুবচন হলো “সুনান”। এর অর্থ হচ্ছে- কোনো ব্যক্তি বা সমাজের জীবনধারা, আচরণ বা চলার পদ্ধতি; যেভাবে তারা কাজ করে, চিন্তা করে এবং জীবন পরিচালনা করে। “আল্লাহর সুনান” বলতে বোঝায়- সৃষ্টিজগতে আল্লাহ তায়ালা যে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম স্থির করেছেন, তা-ই তাঁর সুনান। এই নিয়ম অনুযায়ী তিনি মানুষকে পরীক্ষা করেন, সৎকর্মশীলদের সাহায্য ও সফলতা দান করেন, আর অন্যায়কারীদের শাস্তি প্রদান করেন। আল্লাহর এই নিয়ম বা আইন কখনো পরিবর্তন হয় না। ইতিহাসের ধারায় দেখা যায়, যে জাতি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছে, তারা সফলতা অর্জন করেছে; আর যারা অবিচার, মিথ্যাচার ও অবাধ্যতার পথে চলেছে, তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৩৭) ।
﴿نُدَاوِلُهَا﴾ ‘আমি তার পালাবদল করি’, আরবী শব্দটি المداولة থেকে এসছে, যার অর্থ হলো- কোনো জিনিস এক ব্যক্তি বা দলের কাছ থেকে অন্যের কাছে স্থানান্তরিত হওয়া। এর ব্যাখ্যা হলো- দুনিয়ার দিন ও সময় এক অবস্থায় স্থির থাকে না; এটি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে ঘুরে বেড়ায়। কখনো জয়-পরাজয়ের পালা এক দলের পক্ষে যায়, আবার অন্য সময়ে তা অন্য দলের পক্ষে আসে। যেমন- বদর যুদ্ধের দিনে আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেছিলেন। তারা কোরায়শদের মধ্যে সত্তরজনকে হত্যা করে এবং আরও সত্তরজনকে বন্দি করেছিল। কিন্তু উহুদ যুদ্ধে পরিস্থিতি পাল্টে যায়; সেখানে মুশরিকরা কিছু সময়ের জন্য প্রাধান্য লাভ করে, মুসলমানদের মধ্যে সত্তরজন আহত হন এবং পঁচাত্তরজন শাহাদত বরণ করেন। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১৪০) ।
এ থেকেই বোঝা যায়, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পৃথিবীতে সাফল্য ও পরাজয় একে অপরের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে, যেন মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে, ধৈর্য ও ঈমানে দৃঢ় থাকে, এবং পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়। (আল্লাহই ভালো জানেন)
উল্লেখিত আয়াতসমূহের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
পূর্বের আয়াতগুলোতে উহুদের ঘটনার কথা এবং তার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর তাদেরকে বদরের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে অল্পসংখ্যক ও স্বল্প অস্ত্র-শস্ত্র থাকা সত্তে¡ও আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেছিলেন। আর এই আয়াতগুলো এবং পরবর্তী অংশে আল্লাহ তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সৃষ্টি জগতে প্রচলিত নিয়ম ও বিধান (সুন্নাতুল্লাহ)-এর কথা, যারা এই নিয়ম অনুসরণ করে, তারা সফলতা ও সুখ লাভ করে; আর যারা তা থেকে বিচ্যুত হয়, তারা পথভ্রষ্ট হয় এবং শেষপরিণতিতে ধ্বংস ও হতাশার মুখে পড়ে। সত্যের উপর মিথ্যার প্রাথমিক প্রভাব বা আধিপত্য যতই প্রবল মনে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয়ী হবে, এ প্রতিশ্রæতি আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মাধ্যমে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন: “আর অবশ্যই আমাদের এই বাণী আমাদের প্রেরিত বান্দাদের জন্য পূর্বেই নির্ধারিত হয়ে গেছে, নিশ্চয়ই তারাই বিজয়ী হবে, আর নিশ্চয়ই আমাদের সৈন্যরাই বিজয়ী” (সূরাতু আস-সাফফাত ৩৭: ১৭১-১৭৩) । এবং আরও বলেন: “আমি জিকর (তাওরাত)-এর পর যাবুরে লিখে দিয়েছি যে, পৃথিবী আমার সৎকর্মশীল বান্দারাই উত্তরাধিকারী হবে” (সূরাতু আল-আম্বিয়া ২১: ১০৫) ।
সূরাতু আলে-ইমরানের ১৩৯ ও ১৪০ নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবারা পরাজিত হয়ে পিছু হটেছিলেন। তারা সেই অবস্থায় থাকতেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (তখনও মুসলমান হননি) মুশরিকদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) দোয়া করলেন:
“اللهم لا يعلونّ علينا، اللهم لا قوّة لنا إلا بك، اللهم ليس يعبدك بهذه البلدة غير هؤلاء النّفر”.
“হে আল্লাহ! তারা যেন আমাদের ওপর প্রাধান্য না পায়। হে আল্লাহ! আমাদের কোনো শক্তি নেই তোমার সাহায্য ছাড়া। হে আল্লাহ! এই শহরে তোমার ইবাদত করছে শুধু এই অল্পসংখ্যক লোকেরা”। এরপর আল্লাহ তায়ালা ১৩৯ নং আয়াত নাজিল করেন।
রাশিদ ইবনু সা‘দ বলেন, উহুদের যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছিলেন। সেই সময় নারীরা তাদের নিহত স্বামী বা পুত্রদের লাশ দেখে আহাজারি করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: أهكذا يفعل برسولك؟ “এভাবেই কি তোমার রাসুলের সঙ্গে আচরণ করা হয়, হে আল্লাহ?” এ কথার পর আল্লাহ তায়ালা ১৪০ নং আয়াত অবতীর্ণ করে রাসূলুল্লাহকে (সা.) শান্তনা প্রদান করেন। (আসাবাব আল-নুযূল, ওয়াহেদী: ১/২৫০) ।
ইকরিমা (র.) বলেন, যখন উহুদের যুদ্ধের খবর বিলম্বে পৌঁছায়, তখন নারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়লেন খবর জানার জন্য। তারা দেখতে পেলেন, দুই ব্যক্তি একটি উটের পিঠে চড়ে আসছেন। এক নারী তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “রাসুলুল্লাহর (সা.) কী অবস্থা?” তারা বললেন, “তিনি জীবিত আছেন”। তখন নারীটি বললেন, “তাহলে আমি কিছু পরোয়া করি না, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে শহীদ বেছে নিন”। এরপর আল্লাহ তায়ালা ঐ নারীর কথারই প্রতিফলন হিসেবে ১৪০ নং আয়াতের শেষাংশ “আর আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে শহীদ বেছে নেবেন” অবতীর্ণ করেন। (লুবাব আল-নুক‚ল, সুয়ূতী: ১/৭১) ।
আয়াতসমূহের শিক্ষা:
১। ১৩৭ নং আয়াত থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সুস্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়-
(ক) অতীত ইতিহাসে অস্বীকারকারীদের কঠিন পরিণতির বর্ণনা, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকারকারী ও সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের ওপর বহুবার শাস্তি প্রয়োগ করেছেন। যেমন কওমে নূহ (আ.), আদ, সামূদ, লূত ও ফেরাউনের জাতি নিজেদের অবাধ্যতা ও অহংকারের কারণে আল্লাহর কঠোর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
(খ) মানবজাতিকে অতীত ধ্বংসস্তুপ পরিদর্শনের প্রতি উৎসাহ প্রদান, আয়াত মানুষকে আহ্বান জানায়, যালেম ও মিথ্যাবাদীদের প্রতি আল্লাহর শাস্তির নিদর্শনসমূহ পরিদর্শন করে শিক্ষা গ্রহণ করতে। ইতিহাসের সেই ধ্বংসস্তুপগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের পরিণতি কখনোই মঙ্গলজনক হয় না।
(গ) অবিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলোর ভয়াবহ পরিণতির কারণ অনুসন্ধান, আয়াতটি আরও উৎসাহিত করে অনুসন্ধান করতে, যালেম ও অবিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলো কোন কারণেই বা এমন ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল; যেন মানুষ তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, অন্যায়ের পথ ত্যাগ করে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসে। (আল্লাহই ভালো জানেন) ।
২। ১৩৮ নং আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল-কোরআনে অতীত জাতিসমূহের ভয়াবহ পরিণতির ঘটনাবলি তিনটি উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে:
(ক) পরবর্তী প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা ও সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য,
(খ) তাদেরকে সত্য ও সৎপথের দিশা প্রদানের জন্য, এবং
(গ) মোত্তাকীদের হৃদয়ে উপদেশ ও অনুপ্রেরণা জাগ্রত করার জন্য।
এ সম্পর্কে সূরাতু আল-বাক্বারার ১৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ﴾ [سورة البقرة: ১৮৫].
অর্থ: “রমাযান মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, হেদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ১৮৫) ।
৩। ১৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানবজীবনের সফলতা ও মর্যাদার মূল ভিত্তি হিসেবে ঈমানকে শর্তারোপ করেছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়:
(ক) মানুষ তখনই জীবনে প্রকৃত শক্তি ও সাহস অর্জন করতে পারে, যখন তার অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা থাকে। ঈমানই মানুষকে দুঃসময়ে অবিচল রাখে এবং হতাশার পরিবর্তে আশা ও আত্মবিশ্বাস জোগায়।
(খ) যাদের অন্তরে ঈমান জাগ্রত থাকে, তারা দুশ্চিন্তা, ভয় ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে; কারণ তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস কওে যে, সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে। এই বিশ্বাস তাদের অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা এনে দেয়।
(গ) সর্বশেষে, প্রকৃত ঈমানদাররাই পৃথিবীতে মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে।
অতএব, জীবনের শক্তি, প্রশান্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব এই তিনটি মহামূল্যবান বিষয় অর্জনের মূলে নিহিত রয়েছে দৃঢ় ও খাঁটি ঈমান।
৪। ১৪০ ও ১৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতে তাঁর নির্ধারিত চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় নিয়মের গভীর চারটি রহস্য উন্মোচন করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থায় তাঁর প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচার প্রতিফলিত করেছেন। সেগুলো হলো:
(ক) মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমাজজীবনে ভারসাম্য ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে কেউ স্থায়ীভাবে বিজয়ী বা পরাজিত না থাকে, বরং উত্থান-পতনের মাধ্যমে জীবন ও ইতিহাসে শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
(খ) পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত ঈমানদারদেরকে কপট ও ভন্ডদের থেকে পৃথক করা, যেন স্পষ্ট হয় কারা আল্লাহর পথে দৃঢ় ও অবিচল, আর কারা সামান্য বিপদে বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়।
(গ) সংগ্রাম ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আল্লাহর পথে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদেরকে বের করে আনা, যাতে তাদের মাধ্যমে ঈমান, সাহস ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
(ঘ) কাফেরদের ধ্বংস সাধন করে ঈমানদারদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী করা, যাতে সত্য ও ন্যায়ের পতাকা বিশ্বময় সমুন্নত থাকে।
অতএব, এই আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বুঝিয়ে দিয়েছেন, দুনিয়ার ঘটনা ও পরিবর্তন কেবল কাকতালীয় নয়; বরং প্রতিটি উত্থান-পতনের পেছনে রয়েছে এক মহান উদ্দেশ্য, যা মানুষের শিক্ষা, পরীক্ষার মাপকাঠি ও ঈমানের পরিশুদ্ধতার প্রক্রিয়া।
আয়াতসমূহ থেকে করণীয় (আমল):
(ক) অতীতের মিথ্যাবাদী জাতিগুলোর পতনের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ পরিদর্শন করে তাদের পরিণতি থেকে গভীর শিক্ষা ও সতর্কতা গ্রহণ করা।
(খ) কোরআনের উপদেশ ও হিদায়াত থেকে উপকৃত হতে হলে অন্তরে আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করা এবং তাকওয়ার মাধ্যমে হৃদয়কে ন¤্র ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
(গ) আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত চিরন্তন অপরিবর্তনীয় নিয়মকে আন্তরিকভাবে মেনে নিয়ে ঈমানকে পরিশুদ্ধ ও দৃঢ় করা, যেন জীবনে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা যায়।

Leave a Reply

error: Content is protected !!