﴿وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَوِّئُ الْمُؤْمِنِينَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (121) إِذْ هَمَّتْ طَائِفَتَانِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلَا وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ (122)﴾ [سورة آل عمران: 121-122]
আয়াতদ্বয়ের আলোচ্যবিষয়: উহুদের যুদ্ধ: মুসলিম সেনাদলের সুসংগঠিত কৌশল।
আয়াতদ্বয়ের সরল অনুবাদ:
১২১। আর স্মরণ কর, যখন তুমি সকালে তোমার পরিবার-পরিজন থেকে বের হয়ে মুমিনদেরকে কিতালের স্থানসমূহে বিন্যস্ত করেছিলে; আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
১২২। যখন তোমাদের মধ্য থেকে দুইটি দল পিছু হটার ইচ্ছা পোষণ করেছিলো, অথচ আল্লাহ তাদের উভয়ের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিৎ।
আায়াতদ্বয়ের ভাবার্থ:
১২১ নং আয়াতে উহুদের যুদ্ধের প্রস্তুতির দৃশ্য উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা থেকে বের হয়ে সাহাবাদেরকে উহুদের পাদদেশে বিভিন্ন স্থানে বসাচ্ছিলেন, কোথায় কে থাকবে, কিভাবে যুদ্ধের কৌশল সাজাতে হবে তা নির্ধারণ করছিলেন। এতে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত কৌশলী ও সুসংগঠিত ছিলেন। এখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতিটি কথা ও কাজ শুনছেন এবং জানছেন। অর্থাৎ, তার পরিকল্পনা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়, বরং এটি আল্লাহরই নির্দেশনা অনুযায়ী হচ্ছে।
অহুদ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বমুহুর্তে আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় মুহূর্তের জন্য ভীত হয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরে দৃঢ়তা দান করেন, ফলে তারা স্থির থাকে। কখনো কখনো ঈমানদারদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু যদি তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে আল্লাহ তাদের দৃঢ়তা ও সাহস দান করেন। তাই প্রকৃত ঈমানদারের উচিত সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৭২,৩৭৩,৩৭৫, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৭০-৭৪, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৫-৬৬, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৬-১০৮)।
আয়াতদ্বয়ের বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿إِذْ غَدَوْتَ﴾ ‘যখন তুমি বের হয়েছিলে’, এ আয়াতাংশে ব্যবহৃত ‘গদাওতা’ শব্দটি আরবি ‘গুদওয়াতুন’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো ভোরবেলা বা প্রত্যুষকাল। আরবরা ফজরের সালাত আদায় থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যবর্তী সময়কে ‘গুদওয়াতুন’ বলে অভিহিত করত। (লিসানুল আরব, ইবনু মানযূর: ১৫/১১৬) । অধিকাংশ মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যখন তিনি শনিবারের প্রভাতে মদীনা থেকে বের হয়ে ‘উহুদ’ প্রান্তরে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা শুধু একটি ঘটনাকে স্মরণ করাননি, বরং ভোরবেলার পবিত্রতা, সতেজতা ও প্রস্তুতির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। কারণ প্রত্যুষকাল হচ্ছে কর্মশীলতা ও দৃঢ় সংকল্পের সময়, যখন মুমিনরা ইবাদতে সঞ্জীবিত হয়ে নতুন দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, ‘উহুদ’ যুদ্ধটি পরবর্তী বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, রাযী: ৮/৩৪৫)। এভাবে সকালবেলার সময়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে আয়াতটি মুমিনদের মনে করিয়ে দেয় েেয, সংগ্রাম ও পরীক্ষার ময়দানে নামতে হলে শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি এবং ঈমানি দৃঢ়তা দুটোই অপরিহার্য।
﴿هَمَّتْ﴾ ‘ইচ্ছাপোষণ করেছিল’, যদিও শব্দটির মূল অর্থ কেবল ‘ইচ্ছা করা’, এখানে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তারা মনে মনে যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে মদীনায় ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিল এবং তাদের মন সে দিকেই প্রবণ হয়েছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।
﴿طَائِفَتَانِ﴾ ‘দুইটি পক্ষ’, আয়াতটি বিশেষভাবে উল্লেখ করছে আনসারদের দুটি প্রধান গোত্রকে: বনু সালামা এবং বনু হারিসা। এটি শুধু নাম উল্লেখ নয়, বরং সেই সময়ের সামাজিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটকে চিত্রিত করছে, যেখানে এই দুই গোত্র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের সেবায় অবদান রেখেছিল। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬৯) ।
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ের সাথে পূর্বের আয়াতসমূহের সম্পর্ক:
যখন পূর্বের আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কুচক্রী ও দুষ্টচিন্তাাপোষণকারী লোকদের অন্তরঙ্গ বন্ধু না বানানোর জন্য সতর্ক করলেন, তখন উল্লেখিত আয়াতসমূহে একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরলেন যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা থেকে। দুইটি দলের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, কাপুরুষতা ও দুর্বলতায় তারা ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। এর মূল কারণ ছিল মুনাফিকদের কুমন্ত্রণায় তাদের দুর্বল হয়ে পড়া, যাদের নেতা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৬৫) ।
উহুদ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ঘটনা:
বদরের যুদ্ধে পরাজয়ের পর কুরাইশরা প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। বয়স্করা শহরে থেকে যুদ্ধ করার পরামর্শ দিলেও যুবকেরা ময়দানে বের হওয়ার পক্ষে মত দেয়। নবীজি অবশেষে ময়দানে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং এক হাজার সাহাবি নিয়ে উহুদের পাদদেশে শিবির স্থাপন করেন।
পঞ্চাশ জন তীরন্দাজকে পাহাড়ের ঢালে বসিয়ে তিনি কঠোরভাবে নির্দেশ দেন যুদ্ধে জয় বা পরাজয় যাই হোক, স্থান ত্যাগ করবে না। প্রথমে মুসলমানরা জয়লাভ করতে থাকে, কিন্তু তীরন্দাজদের একটি দল নির্দেশ অমান্য করে গনিমতের জন্য নেমে যায়। এ সুযোগে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে আক্রমণ করেন। পরিস্থিতি পাল্টে যায়, অনেক সাহাবি শহীদ হন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও আহত হন, দাঁত ভেঙে যায়। অবশেষে আল্লাহ মুসলমানদের রক্ষা করেন, তবে এ যুদ্ধ থেকে তারা বড় শিক্ষা লাভ করে:
– রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশ অমান্য করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
– আল্লাহর সাহায্য আসে শুধুমাত্র ধৈর্য ও আনুগত্যের মাধ্যমে।
– পরাজয় মানেই ঈমানের পরাজয় নয়, বরং তা আত্মশুদ্ধি ও ধৈর্যের পরীক্ষা।
– উহুদের যুদ্ধ মুসলিম সমাজকে দৃঢ় করেছিল এবং ভবিষ্যতের জন্য মহান শিক্ষার উৎস হয়েছিল।
আয়াতদ্বয়ের শিক্ষা:
১। এই আয়াতগুলো উহুদের ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে, যার কাহিনী সীরাত ও ইতিহাসে সুপরিচিত। এ আয়াতগুলো এখানে উল্লেখ করার হিকমত হলো-
(ক) আল্লাহ তায়ালার সাধারণ নিয়ম হলো- মুমিনরা যদি যদি ধৈর্য ধরে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তবে তিনি তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং শত্রুদের কুটচাল ব্যর্থ করে দেবেন। তাই আল্লাহ তায়ালা এই নীতির উদাহরণ হিসেবে বদর ও উহুদের কাহিনী তুলে ধরেছেন। বদরে মুমিনরা ধৈর্যশীল ও মুত্তাকি হওয়ায় তারা বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু উহুদে তাদের কিছু লোক তাকওয়ার শর্ত ভঙ্গ করায় শত্রুরা কিছু সময়ের জন্য প্রাধান্য লাভ করেছিল।
(খ) আল্লাহ তায়ালা চান তাঁর বান্দারা যখন কোনো অপ্রিয় ঘটনায় বিপদগ্রস্ত হয়, তখন তারা পূর্ববর্তী প্রিয় অনুগ্রহগুলো স্মরণ করলে দুঃখ-কষ্ট হালকা মনে হবে এবং তারা আল্লাহর মহান নিয়ামতের জন্য শোকর আদায় করবে। কারণ, অপ্রিয় ঘটনাগুলো আসলে তাদের মঙ্গলের জন্যই, এবং প্রাপ্ত অনুগ্রহের তুলনায় তা খুবই সামান্য। (তাফসীর সা’দী: ১/১৪৫) । এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন আল্লাহ্ তাঁর বাণীতে:
﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَـذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِير﴾ [سورة آل عمران:১৬৫].
“তোমাদের যখন একটি বিপদ এসে পড়ল, যার দ্বিগুণ তোমরা (শত্রুদের ওপর) আরোপ করেছিলে, তখন তোমরা বললে: ‘এটা কোথা থেকে এলো?’ বলে দাও: ‘এটা তোমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে এসেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান”। (সূরাতু আলে ইমরান: আয়াত: ১৬৫)।
২। ১২১ নং আয়াত থেকে পরিলক্ষিত হয় যে,
(ক) ইসলামের শিক্ষা হলো- নেতৃত্ব কোনো ভোগ-বিলাসের আসন নয়; বরং এটি একটি বিশাল আমানত ও দায়িত্ব। একজন প্রকৃত নেতা কখনো শুধু আদেশ দিয়ে বসে থাকেন না। তিনি নিজেই সামনে থেকে কাজের ভার নেন, কষ্ট সহ্য করেন, আর অধীনস্থদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি উহুদ, বদর কিংবা খন্দকের মতো যুদ্ধে শুধু পরামর্শদাতা হয়ে থাকেননি; বরং সাহাবাদের সাথে নিজেই ময়দানে নেমেছেন, কষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামও তাই নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে, উম্মাহর মাঝে দাঁড়িয়ে।
আমাদের সমাজে আজও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতৃবৃন্দকে দেখা যায় এই মহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে। তারা মাঠে কর্মীদের সাথে কাজ করেন, তাদের সাহস জোগান, পথ দেখান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু দরবার-ভিত্তিক সুফীবাদী দল কিংবা অনৈসলামী রাজনৈতিক দলে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। সেখানে সাধারণ কর্মীরা রোদ-বৃষ্টিতে মাঠে খেটে যাচ্ছেন, আর নেতৃবৃন্দ প্রাসাদের ভেতর বিলাসী জীবনে ডুবে আছেন। এটি ইসলামের নেতৃত্ব নয়। ইসলামের প্রকৃত নেতৃত্ব হলো নবী ও সাহাবাদের নেতৃত্ব, যেখানে নেতা আর কর্মীর মাঝে কোনো বিভাজন নেই, পার্থক্য কেবল দায়িত্বের, মর্যাদার নয়।
আল্লাহ যেন আমাদের সমাজে এমন নেতৃত্ব দান করেন যারা সত্যিকার অর্থে উম্মাহকে সামনে থেকে নিয়ে চলবে, ইসলামের পতাকাকে উঁচুতে উড়াবে, আর জনগণের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে থাকবে।
(খ) ১২১ নং আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা হলেন সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞ, যিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সবকিছুই জানেন। মানুষের দেহগত কাজ, মুখের কথা, এমনকি অন্তরের গভীরতম চিন্তা-ভাবনা, সন্দেহ, ঈমান ও কপটতাও তাঁর কাছে গোপন নয়। এ সম্পর্কে কোরআনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যেমন আয়াতুল কুরসীতে বলা হয়েছে:
﴿يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ﴾ [سورة البقرة: ২৫৫].
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই তিনি জানেন যা তাদের সামনে রয়েছে এবং যা তাদের আড়ালে রয়েছে” (সূরাতু আল-বাক্বারাহ: ২৫৫) ।
এ কারণেই অন্তরের ঈমানকে দৃঢ় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিকভাবে কেউ বড় আলেম, দাঈ বা বড় নেতা হিসেবে পরিচিত হতে পারে, কিন্তু যদি অন্তরে দ্বিধা, ভন্ডামি বা দুর্বলতা থাকে, আল্লাহ তা জানেন এবং এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই দেহে একটি টুকরো মাংস আছে, যদি তা ঠিক থাকে তবে সমগ্র দেহ ঠিক থাকে, আর যদি তা নষ্ট হয় তবে সমগ্র দেহ নষ্ট হয়। জেনে রাখ, সেটি হলো অন্তর” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
৩। ১২২ নং আয়াত থেকে তিনটি বিষয় প্রতিফলিত হয়:
(ক) মুমিনের দুর্বলতা ও দ্বিধা পরিত্যাজ্য, এ বিষয়টি কোরআন ও হাদীসের আলোকে মুমিনের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলামে মুমিনের জন্য দুর্বলতা (অসাহস, অলসতা, হতাশা) গ্রহণযোগ্য নয়, যা অত্র আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অন্য এক আয়াতে বলেছেন:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৩৯].
অর্থাৎ: “তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মুমিন হও” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৩৯) । এখানে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের শক্তি, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিয়েছেন। দুর্বলচিত্ততা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ، خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ، وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجَزْ، وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: “قَدَّرَ اللهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ”، فَإِنَّ “لَوْ” تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ” (صحيح مسلم: ২৬৬৪).
অর্থাৎ: “শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার জন্য উপকারী, তার প্রতি তুমি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং দুর্বল হয়ো না। আর যদি কোনো বিপদ তোমাকে আঘাত করে, তবে বলো না: ‘যদি আমি এমন করতাম, তবে এমন হতো, এমন হতো।’ বরং বলো: ‘আল্লাহর তাকদীর, তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন।’ কারণ, ‘যদি’ বলা শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪) । অর্থাৎ, মুমিনকে সব সময় দৃঢ়চিত্ত হতে হবে, সাহসী হতে হবে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুরুপভাবে মুমিন জীবনে দ্বিধা পরিত্যাজ্য, মুমিন যখন দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তখন সে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখতে পারে না এবং কর্মে দৃঢ় হতে ব্যর্থ হয়। দ্বিধা শয়তানের একটি কৌশল, যা মানুষকে সৎকাজ থেকে বিরত রাখে। এ সম্পর্কে কোরআন কারীমে এসেছে:
﴿وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৫৯].
অর্থাৎ: “আর তুমি তাদের কাজে পরামর্শ গ্রহণ করো; অতঃপর যখন তুমি সংকল্পবদ্ধ হও, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদেরকে ভালোবাসেন” (সূরাতু আলে ইমরান: ১৫৯) । অর্থাৎ, মুমিন যখন কোনো ভালো কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তখন দ্বিধা না করে দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।
(খ) আল্লাহ যাদের অভিভাবক হন তাদেরকে দুর্বলতা ও দ্বিধা থেকে মুক্তি দেন, যা অত্র আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অন্য একটি আয়াতে বলেছেন:
﴿اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ﴾ [سورة البقرة: ২৫৭].
“আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ২৫৭) । অর্থাৎ, যখন আল্লাহ কারো অভিভাবক হন, তখন তিনি তার অন্তরকে ঈমান, হিদায়াত ও সাহসে ভরে দেন। শয়তানের পক্ষ থেকে যে ভয়, সন্দেহ, দ্বিধা, হতাশা আসে, আল্লাহ তা দূর করে দেন।
দুর্বলতা আসে তখন, যখন মানুষ ভাবে সে একা, সে অক্ষম। কিন্তু আল্লাহ যখন তার অভিভাবক, তখন মুমিন বুঝে যায় সে একা নয়, মহান রব তার সঙ্গে আছেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই; এ কারণে সে দুর্বল হয় না। কোরআনে এসেছে:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [سورة آل عمران: ১৩৯].
“তোমরা দুর্বল হয়ো না, শোক করো না, আর যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে তোমরাই উচ্চতর” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৯) ।
অপরদিকে দ্বিধা আসে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও ভয়ের কারণে। কিন্তু আল্লাহর ওলিদের জন্য প্রতিশ্রæতি প্রদান করা হয়েছে:
﴿إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ [سورة الأحقاف: ১৩].
“নিশ্চয়ই, যারা বলে: ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর সে কথায় অটল থাকে, তাদের উপর কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না” (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬:১৩) । এখানে স্পষ্ট, আল্লাহর অভিভাবকত্ব দ্বিধা-ভয়কে দূর করে দেয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إنَّ اللَّهَ إذا أحَبَّ عَبْدًا دَعا جِبْرِيلَ فقالَ: إنِّي أُحِبُّ فُلانًا فأحِبَّهُ، قالَ: فيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنادِي في السَّماءِ فيَقولُ: إنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلانًا فأحِبُّوهُ، فيُحِبُّهُ أهْلُ السَّماءِ، قالَ ثُمَّ يُوضَعُ له القَبُولُ في الأرْضِ..”ِ. (رواه البخاري ومسلم في صحيحيهما).
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে ডাকেন এবং বলেন: “আমি অমুককে ভালোবাসি, সুতরাং তুমি-ও তাকে ভালোবাসো”। তখন জিবরাঈলও তাকে ভালোবাসেন। এরপর জিবরাঈল আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করেন: “আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো”। ফলে আকাশবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে থাকে। তারপর পৃথিবীতে তার জন্য মানুষের অন্তরে গ্রহণযোগ্যতা (ভালোবাসা) সৃষ্টি করে দেওয়া হয়” (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম) ।
সুতরাং যাদের আল্লাহ অভিভাবক হন, আল্লাহ তাদেরকে অন্তরের ভয়, দুর্বলতা ও দ্বিধা থেকে মুক্ত করেন। তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে সাহসী হয়, পরীক্ষায় ধৈর্য ধরে, এবং সত্যের পথে অটল থাকে।
(গ) আয়াতের শেষাংশ থেকে বুঝা যায়, সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য, আল্লাহর ওপর ভরসা করা (তাওয়াক্কুল) হলো ঈমানের মূল ভিত্তি ও মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। মুমিন ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, কারণ সে জানে আল্লাহ ছাড়া কারো হাতে প্রকৃত ক্ষতি বা উপকার নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ [سورة الطلاق: ৩].
“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট” (সূরাতু আত-তালাক: ৩) ।
অতএব, আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা মুমিনের পরিচয়, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ أَنَّكُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا” (رواه الترمذي وابن ماجة).
“যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথার্থ ভরসা করতে, তবে তোমাদেরকে তিনি এমনভাবে রিযিক দিতেন যেভাবে তিনি পাখিদের রিযিক দেন। তারা সকালবেলায় খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) । এ হাদিসে স্পষ্ট বোঝা যায়, তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং চেষ্টা করা এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
এখন একটি প্রশ্ন হতে পারে, তাওয়াক্কুল মুমিনের জীবনে কী প্রভাব ফেলে?
কোরআন-হাদীসের আলোকে এ প্রশ্নের উত্তর হলো-
(ক) আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, সে জানে, আল্লাহর সাহায্য থাকলে কেউ তাকে পরাজিত করতে পারবে না।
(খ) মানসিক প্রশান্তি আনে, বিপদে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ে না, বরং অন্তরে শান্তিঅনুভব করে।
(গ) নেতৃত্বের গুণ তৈরি করে, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করার শক্তি তাকে দৃঢ় নেতা বানায়।
(ঘ) পাপ থেকে দূরে রাখে, কারণ রিজিক, মান-মর্যাদা বা নিরাপত্তা কেবল আল্লাহর হাতে, এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায়ের পথে যেতে দেয় না।
(ঙ) সাহসী করে তোলে: মুমিন জানে, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তাই সে সঠিক পথে চলতে এবং সত্য কথা বলতে ভয় পায় না।
আয়াতদ্বয়ের আমল:
(ক) দৈনন্দিন কাজ, শিক্ষা, দাওয়াত কিংবা জিহাদ, সবকিছুতেই সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি নেওয়া।
(খ) নেতাকে তার দায়িত্বের স্থানে সক্রিয় থাকা এবং অধীনস্থদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।
(গ) বিপদের সময় সাহস ও দৃঢ়তা অর্জন করা এবং আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশা করা।
(ঘ) সকল কাজে প্রস্তুতি শেষে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা।
