﴿لَيْسُوا سَوَاءً مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَائِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ (113) يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَأُولَئِكَ مِنَ الصَّالِحِينَ (114) وَمَا يَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ يُكْفَرُوهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ (115)﴾ [آل عمران: 113-115].
আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: ঈমানদার আহলে কিতাব: সৎকর্ম, প্রতিদান ও সম্মান
আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১১৩। আহলে কিতাবের মধ্যে একটি দল ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা অন্যদের সমান নয়। তারা রাত্রিকালে সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর আয়াতাসমূহ তিলাওয়াত করে ।
১১৪। তারা আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে এবং তারা কল্যাণকর কাজে তৎপর থাকে। মূলত তারাই নেক্কারদের অন্তর্ভূক্ত।
১১৫। আর তারা যে ভালো কাজ করে তা কখনও অস্বীকার করা হবে না। আর আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।
আায়াতাবলীর ভাবার্থ:
আহলে কিতাব সবাই সমান নয়। তাদের মধ্যে একটি দল রয়েছে যারা মোহাম্মদের (সা.) প্রতি ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন- আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম, সা’লাবাহ (রা.) প্রমুখ। তারা রাতে ইশা ও তাহাজ্জুদ সালাতে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে, তাঁর সম্মুখে বিন¤্র ও ধ্যানমগ্ন থাকে, এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ ভক্তি প্রদর্শন করে। তারা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যও প্রার্থনা করে।
এই সৎকর্মপরায়ণরা শুধু আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করে না, বরং তারা মানুষের কল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তারা সৎকর্ম প্রচার করে, অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর পথে সকলের জন্য উদাহরণ স্থাপন করে। তাদের জীবন আল্লাহর হেদায়াতের প্রতিফলন।
যে কোনো সৎকর্ম তারা সম্পন্ন করে, তা কখনো বৃথা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতিটি নেক কাজকে স্বীকৃতি দেন এবং তাদের প্রতি অনন্ত পুরস্কার নিশ্চিত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও মুত্তাকীদের প্রতি সর্বদা সদয়। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬২-৩৬৩, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪৮-৪৯, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৪, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৫) ।
আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿أُمَّةٌ قَائِمَةٌ﴾ ‘প্রতিষ্ঠিত জাতি’ আয়াতাংশের উদ্দেশ্য কী?
এ প্রসঙ্গে তাফসীরকারকদের অভিমত নিম্নরূপ:
(ক) ইবনু কুতাইবা (রহ.) বলেন: “আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবিচল থাকা একটি দল।” (গরীব আল-কোরআন: ১/৯৭)।
(খ) আবু বকর আল-জাযায়িরী (রহ.) বলেন: “ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি দল।” (আইসার আল-তাফাসীর, ১/৩৬২) ।
যদিও শব্দগতভাবে এ দুই ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, বাস্তবে তাদের মর্মগত দিক থেকে কোনো বিরোধ নেই।
﴿يَسْجُدُونَ﴾ ‘তারা সাজদা করে’ আয়াতাংশের অর্থ কী?
এ বিষয়ে তাফসীরকারকদের কাছ থেকে দুটি অভিমত পাওয়া যায়:
(ক) অধিকাংশ তাফসীরকারক বলেন, এর অর্থ হলো- তারা সালাত আদায় করে। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৩৪; আইসার আল-তাফাসীর: ১/৩৬২) ।
(খ) আবার কিছু তাফসীরকারকের মতে, আয়াতাংশটি তার বাহ্যিক অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ- তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনে সাজদায় লিপ্ত হয়। (তাফসীর আল-বায়ান ফাউন্ডেশন: ১৪৬) ।
অতএব, উভয় অর্থ গ্রহণ করলেও আয়াতের মূল উদ্দেশ্যের সাথে কোনো সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি হয় না।
﴿فَلَنْ يُكْفَرُوهُ﴾ ‘তা কখনও অস্বীকার করা হবে না’ আয়াতাংশ দ্বারা কী উদ্দেশ্য?
তাফসীরকারকদের নির্ভরযোগ্য মত হলো: এ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তাদেরকে সৎকর্মের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করা হবে না; বরং তাদের প্রতিটি সৎকর্মের পূর্ণ সাওয়াব ও প্রতিদান তাদেরকে প্রদান করা হবে। (আইসার আল-তাফাসীর, আল-জাযায়িরী: ১/৩৬২) ।
উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
এর আগে (১১-১২) আয়াতে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের নিন্দনীয় গুণাবলি, কুৎসিত কার্যকলাপ এবং তাদের মন্দ কাজের কারণে প্রাপ্য শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর উল্লেখিত আয়াতসমূহে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা সবাই একরকম নয়; বরং তাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ আছেন, যারা উত্তম চরিত্র ও সুন্দর গুণাবলিতে ভূষিত। (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৩৫) ।
(১১৩-১১৫) আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইবনু আবি হাতিম, তাবরানী ও ইবনু মুনদাহ সাহাবাদের প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন: যখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম, সা‘লাবাহ ইবনু সা‘না, উসাইদ ইবনু সা‘না, আসাদ ইবনু উবাইদ এবং তাদের সঙ্গে যারা ইয়াহুদিদের মধ্যে থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারা ঈমান আনল, সত্যকে স্বীকার করল এবং ইসলামের প্রতি আগ্রহী হলো, তখন ইয়াহুদিদের আলেম ও কাফেররা বলল: “মুহাম্মদ (সা.)-এ ঈমান এনেছে এবং তাঁকে অনুসরণ করেছে কেবল আমাদের সমাজের নিকৃষ্ট লোকেরা। যদি তারা উত্তম হতো, তবে তারা নিজেদের পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করত না।” এ প্রসঙ্গে আল্লাহ ১১৩ নাম্বার আয়াত অবতীর্ণ করলেন। (লুবাব আল-নুক‚ল: সুয়ূতী: ৬৭) ।
ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে: একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজ আদায় করতে দেরি করে ফেললেন। অতঃপর বের হয়ে মসজিদে গিয়ে দেখলেন, লোকেরা নামাজের অপেক্ষায় বসে আছে। তখন তিনি বললেন: “জেনে রেখো, এই সময়ে তোমাদের ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীরা আল্লাহকে স্মরণ করছে না”। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা (১১৩-১১৫) আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। (লুবাব আল-নুক‚ল: সুয়ূতী: ৬৭) ।
আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১১৩ ও ১১৪ নং আয়াত থেকে নিম্নের বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়:
(ক) ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো- তার দুয়ার সর্বদা সকলের জন্য উন্মুক্ত। জাতি, ধর্ম কিংবা দেশের বিভাজন সেখানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। যে-ই হোক না কেন, আন্তরিক আকাক্সক্ষায় যদি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়, তবে সে হয়ে ওঠে মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত আয়াতসমূহে আহলে কিতাবের সেইসব সৌভাগ্যবানদের সম্মানিত করেছেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করে সত্যকে বরণ করেছেন, এবং তাঁদেরকে ঘোষিত করেছেন সৎকর্মপরায়ণ হিসেবে। এ সম্পর্কে আরেকটি আয়াতে এসেছে:
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ [سورة البقرة: ৬২].
অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, আর যারা ইহুদি, খ্রিস্টান ও সাবিয়ান, এদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে প্রতিদান। আর তাদের উপর কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না” (সূরাতু আল-বাক্বারা: ৬২)।
(খ) উল্লেখিত আহলে কিতাব যে ৬টি কাজ করে আল্লাহর কাছে সম্মানিত ও সৎকর্মপরায়ণ হয়েছেন, তা হলো-
ক. সর্বক্ষেত্রে দ্বীনের উপর অটল থাকা।
খ. রাতে কোরআন তেলাওয়াত করা।
গ. রাতের শেষ ভাগে তাহজ্জুদ সালাত আদায় করা।
ঘ. আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আখেরাতের প্রতি ঈমান স্থাপন করা।
ঙ. সৎকর্মের আদেশ করা এবং অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করা।
চ. কোন ধরণের অলসতা ছাড়া আগ্রহের সাথে কল্যাণ কাজে আত্মনিয়োগ করা।
(তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪৮) ।
২। কারো হৃদয়ে এ সন্দেহের অবকাশ রাখে না যে, আহলে কিতাব পূর্বে ভিন্ন ধর্মে থাকার কারণে তাঁদের সৎকর্ম আল্লাহর দরবারে অগ্রহণযোগ্য হবে। বরং সত্য হলো- যেই হোক না কেন, যদি সে অন্য ধর্মের অন্ধকার ত্যাগ করে ইসলামের আলোয় আত্মসমর্পণ করে, এবং ইসলামী বিধানসমূহকে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, তবে তার প্রতিটি সৎকর্ম আল্লাহর নিকট মহিমান্বিতভাবে কবুল হয়। এ সত্যকে সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে কুরআনের অন্য আয়াতে:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ﴾ [سورة التوبة: ১২০].
অর্থাৎ: “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মুহসিন বান্দাদের প্রতিদান নষ্ট করেন না” (তওবাহ: ১২০) ।
৩। কুরআনে বহু জায়গায় আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কথা বলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভুল ও বিরোধিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন দেখিয়েছে- তারা ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি কেমন আচরণ করেছে। সাধারণভাবে তাঁদের মধ্যে ইসলামবিরোধী মনোভাব, ষড়যন্ত্র ও প্রতিহিংসা দেখা যেত।
ইহুদিরা প্রকাশ্যে ও গোপনে ইসলাম এবং নবী করীম (সা.)-এর শত্রুতা করেছে। তারা একজোট হয়ে ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়েছে। অন্যদিকে খ্রিস্টানরা সবাই এক রকম ছিল না। কেউ কেউ সত্যকে মেনে নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কেউ আবার দ্বিধায় ছিল, কখনো কাছাকাছি এসেছে, আবার কখনো দূরে সরে গিয়েছে। তবে তাঁদের অনেকেই ইসলামকে মানেনি, কিন্তু সরাসরি ক্ষতিও করেনি।
এই অবস্থার ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُمْ مَوَدَّةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ (৮২) وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ (৮৩)﴾ [سورة المائدة: ৮২-৮৩].
অর্থাৎ: “ঈমানদারদের প্রতি সবচেয়ে বড় শত্রু তুমি দেখতে পাবে ইহুদি ও মুশরিকদেরকে। আর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেখতে পাবে খ্রিস্টানদেরকে। কারণ, তাদের মধ্যে আছে আলেম ও সাধু-সন্ন্যাসী, এবং তারা অহংকারী নয়। যখন তারা রাসূলের কাছে কুরআন শুনে, তখন সত্যকে চিনে তাদের চোখ অশ্রæসজল হয়ে যায়। তারা বলে- হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ঈমান এনেছি, আমাদেরকে সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও” (সূরাতু আল-মায়িদাহ:৮২-৮৩) । (তাফসীর আল-কোরআন লিল কোরআন, আব্দুল কারীম আল-খাতীব: ২/৫৬০) ।
আয়াতাবলীর আমল:
(ক) একজন মুসলিমকে ‘সালিহ’ হতে হলে দ্বীনের উপর অটল থেকে রাতে কুরআন তিলাওয়াত ও তাহাজ্জুদ আদায় করা, আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা, সৎকর্মে উৎসাহ দেওয়া ও অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখা এবং অলসতা ছেড়ে দিয়ে আগ্রহভরে কল্যাণকাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
(খ) অন্তরে এ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা কারো সৎকর্ম কখনোই নষ্ট করেন না, যতক্ষণ না সে স্পষ্ট শিরক ও কুফরে নিমজ্জিত হয়।
