Skip to main content

সূরাতু আলে-ইমরানের (১০-১২) আয়াতের তাফসীর, আলোচ্যবিষয়: মুসলিম জাতির শ্রেষ্ঠত্বের উৎস এবং ইহুদী সম্প্রদায়ের লঞ্চনার কারণ।

﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ (110) لَنْ يَضُرُّوكُمْ إِلَّا أَذًى وَإِنْ يُقَاتِلُوكُمْ يُوَلُّوكُمُ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنْصَرُونَ (111) ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوا إِلَّا بِحَبْلٍ مِنَ اللَّهِ وَحَبْلٍ مِنَ النَّاسِ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الْمَسْكَنَةُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (112) ﴾ [آل عمران: 110-112].

আয়াতাবলীর আলোচ্যবিষয়: মুসলিম জাতির শ্রেষ্ঠত্বের উৎস এবং ইহুদী সম্প্রদায়ের লঞ্চনার কারণ।

আয়াতাবলীর সরল অনুবাদ:
১১০। তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠতম জাতি, যাদেরকে মানবজাতির জন্যে বের করা হয়েছে, তোমরা ভালো কাজের আদেশ দিবে, মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে । আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনতো, তাহলে অবশ্যই তা তাদের জন্য উত্তম হতো । তাদের মধ্যে কিছু ঈমানদার, তবে তাদের অধিকাংশই ফাসিক।
১১১। তারা তোমাদের কোন ক্ষতি কখনও করতে পারবে না সামান্য কষ্ট দেওয়া ছাড়া, আর যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে তারা পিছু হটবে, অতঃপর তাদেরকে কোন ধরণের সাহায্য করা হবে না।
১১২। যেখানেই থাকুক না কেন তাদের উপর লাঞ্চনা অবধারিত করা হয়েছে, তবে তারা আল্লাহর প্রতিশ্রæতি থাকলে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকলে ভিন্ন কথা। আর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহর গযব নিয়ে এবং তাদের উপর দারিদ্র্য অবধারিত করা হয়েছে । এর কারণ তারা আল্লাহর আয়াতাবলীকে অস্বীকার করতো এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতো। এর কারণ হলো তারা নাফরমানী করেছে, আর তারা সীমালঙ্ঘন করেছে।

আায়াতাবলীর ভাবার্থ:
মুসলিম উম্মাহর বিশেষ মর্যাদা হলো: তারা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি যাদেরকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা নিচের চারটি বিষয় যতদিন পালন করবে, ততদিন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে:
(ক) মানুষের কল্যানে কাজ করা।
(খ) তাদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা।
(গ) তাদেরকে অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত রাখা।
(ঘ) একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা।
ইহুদি ও খ্রিস্টানরা যদি আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম ও তার ভাই এবং সালাবা ইবনু সাঈদ ও তার ভাই এর মতো সত্যিকারভাবে রাসূলুল্লাহর (সা.) রিসালাতের প্রতি ঈমান আনতো, তাহলে সেটিই তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। তবে তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু সালামদের মতো সৎ ও বিশ্বাসীর সংখা খুবই কম; তাদের বেশিরভাগই সীমা লঙ্ঘনকারী।
অতঃপর মুসলিমদেরকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, ইহুদিদের বেশীর ভাগ ফাসিক হলেও তারা মুসলমানদেরকে বড় কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের ক্ষতি সীমিত ও সাময়িক হবে। যদি তারা মুসলিমদের বিরদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করতে আসে, তবে তারা পরাজিত হবে এবং কোন সাহায্যও পাবে না। কারণ আল্লাহর সাহায্য মুসলমানদের সঙ্গে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমান, আমল এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে ঐক্য বজায় রাখবে।
ইহুদিদের উপর অপমান, লাঞ্ছনা ও নিঃস্বতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা যেখানেই থাকুক না কেন, এসব থেকে মুক্তি পাবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর সঙ্গে সৎভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলবে বা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। তাদের এই দুরবস্থার কারণ হলো:
(ক) তারা আল্লাহর বিধান অমান্য করেছে।
(খ) তারা নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে।
(গ) তারা সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহে লিপ্ত হয়েছে।
(ঘ) তারা পাপ ও অন্যের প্রতি যুলমে লিপ্ত হয়েছে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬০-৩৬১, তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪১, আল-তাফসীর আল-মুয়াস্সার: ১/৬৪, আল-মোন্তাখাব: ১/১০৪) ।

আয়াতাবলীর বিরল শব্দের ব্যাখ্যা:
﴿كُنْتُمْ﴾ ‘তোমরা ছিলে’, অধিকাংশ তাফসীরকারকদের মতে,
(ক) ‘কুনতুম’ শব্দটি দ্বারা উম্মতে মোহাম্মদী সকলকে সম্বোধন করা হয়েছে। (যাদ আল-মাসীর, ইবনু আল-জাওযী: ১/৩১৪) ।
(খ) অত্র শব্দটি আয়াতে ‘পরিপূর্ণ অর্থবোধক ক্রিয়া’ হিসেবে এসেছে, যার অর্থ সংগঠিত হওয়া ও অস্তিত্ব লাভ করা। আয়াতের অর্থ দাড়ায়, হে উম্মতে মোহাম্মদী! তোমরা সর্বোত্তম জাতি হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করেছ বা সংগঠিত হয়েছ। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৩) ।
﴿بِحَبْلٍ مِنَ اللَّهِ﴾ ‘আল্লাহ রজ্জু’, আয়াতাংশ দারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে তাফসীরকারকদের নির্ভরযোগ্য মত হলো: আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, অর্থাৎ: ইসলাম গ্রহণ করা। আয়াতের অর্থ হবে: তারা ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের উপর থেকে সকল লঞ্চনা ও অপমান দুর করা হবে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১১২) ।

﴿حَبْلٌ مِنَ النَّاسِ﴾ ‘মানুষের রজ্জু’, আয়াতাংশ দারা উদ্দেশ্য কি? এ সম্পর্কে তাফসীরকারকদের নির্ভরযোগ্য মত হলো: কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, অর্থাৎ: শান্তি চুক্তি করা। আয়াতের অর্থ হবে: তারা কোন মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হলে তাদের উপর থেকে সকল লাঞ্চনা ও অপমান দুর করা হবে। (তাফসীর গরীব আল-কোরআন, কাওয়ারী: ৩/১১২) ।

উল্লেখিত আয়াতাবলীর সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক:
প্রথমত: পূর্বের আয়াতাবলীতে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করার এবং তাঁর দ্বীনের রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিলেন এবং তারা তা পালন করল। এরপর তিনি তাদেরকে একটি সংগঠিত জামাআত গঠনের নির্দেশ দিলেন, যারা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা এটিও বাস্তবায়ন করল। অতঃপর উল্লেখিত আয়াতাবলীতে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে একটি মহান সুসংবাদ দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে “তোমরা মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছো”। সুতরাং পূর্বের আয়াতাবলীর সাথে উল্লেখিত আয়াতাবলীর সম্পর্ক স্পষ্ট। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়িরী: ১/৩৬০) ।
এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) মুমিনদেরকে তাঁদের মর্যাদা ও দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং গোটা মানবতার কল্যাণের জন্য প্রেরিত একটি উত্তম জাতি; যারা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে, অন্যায় দমন করবে এবং মানুষকে আলোর দিকে আহ্বান জানাবে।
দ্বিতীয়ত: ১০৬ নাম্বার আয়াতে কিয়ামতের দিন যাদের মুখ মলিন হবে, তাদের শাস্তির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং ১০৭ নাম্বার আয়াতে ঐ দিন যাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তাদের পুরস্কারের বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আর উল্লেখিত আয়াতাবলীতে তারা যে আমলের কারণে কিয়ামতের দিন লাঞ্চিত ও পুরস্কৃত হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং উল্লেখিত আয়াতের সাথে পূর্বের আয়াতের সম্পর্ক স্পষ্ট। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৩) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের ১১০ ও ১১১নং আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট:
ইকরিমাহ ও মুকাতিল (রহ.) বলেন: সূরা আলে ইমরানের ১১০নং আয়াত উবনু মাসউদ, উবাই ইবনু কা‘ব, মু‘আয ইবনু জাবাল এবং সালিম সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। বিস্তারিত ঘটনা হলো: ইহুদি ধর্মাবলম্বী মালিক ইবনু আস-সাইফ এবং ওহাব ইবনু ইয়াহুযা তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেছিল: “তোমরা যে দ্বীনের দিকে আমাদের ডাকছ, আমাদের ধর্ম তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমরাই তোমাদের তুলনায় উত্তম ও মর্যাদাবান”। এই অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের বক্তব্য খন্ডন করে এবং মুমিনদের মর্যাদা তুলে ধরে ১১০নং আয়াত অবতীর্ণ করেন। (আসবাবুন নুযূল, ওয়াহিদী: ১/১২১) ।
মুকাতিল (রহ.) বলেন: ইহুদিদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি, যেমন: কা‘ব, ইয়ুহান্না, নু‘মান, আবূ রাফি‘, আবু ইয়াসির এবং ইবনু সূরাইয়া আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের ওপর চরম আক্রমণ ও অপমানমূলক আচরণ করে বসে। তাঁদের ইসলাম গ্রহণকে কেন্দ্র করে তারা বিদ্বেষ প্রদর্শন করে এবং মানসিক কষ্ট দেয়। তখনই আল্লাহ তা‘আলা ১১১নং আয়াত অবতীর্ণ করেন। (আসবাবুন নুযূল, ওয়াহিদী: ১/১২২) ।

সূরাতু আলে-ইমরানের (১১০-১১২) আয়াতাবলীর শিক্ষা:
১। ১১০ নং আয়াত থেকে নিম্নের বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়:
(ক) আয়াতের প্রথমাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, উম্মতে মোহাম্মদী চারটি বিষয় পালন করলে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে:
(ক) মানুষের কল্যানে কাজ করা।
(খ) তাদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা।
(গ) তাদেরকে অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত রাখা।
(ঘ) একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান গ্রহণ করা। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৪) ।
(খ) আয়াতের দ্বিতীয় অংশে ইহুদী-খ্রিষ্টানদেরকে ইসলামের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারাও যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মোহাম্মদের (সা.) প্রতি ঈমান গ্রহণ পূর্বক উল্লেখিত সকল বিষয়গুলো মেনে চলতো, তবে তারাও আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে স্বীকৃত হতো। (আল-তাফসীর আল-কাবীর, আল-রাযী: ৮/৩২৬) ।
(গ) আয়াতের শেষাংশে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ: তাদের সকলেই কাফির এমন নয়, বরং তাদের মধ্য থেকে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মোহাম্মদের (সা.) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে খাটি ঈমানদারে পরিণত হয়েছে। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম এবং সালাবা ইবনু সাঈদ। কোনো ধর্মই এমন নেই যেখানে চরমপন্থী, মধ্যপন্থী এবং অবাধ্য-অপরাধপ্রবণ মানুষ নেই। সাধারণত কোনো ধর্মের সূচনাকালে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা হয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলে অনেকেই ফিসক ও অবাধ্যতায় জড়িয়ে পড়ে। এ প্রসংগে সূরা হাদীদে বলা হয়েছে:
﴿أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَما نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ، وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتابَ مِنْ قَبْلُ فَطالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ، فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فاسِقُونَ﴾ [سورة الحديد: ১৬].
অর্থাৎ: “মুমিনদের জন্য কি এখনও সময় হয়নি যে, তাদের অন্তরসমূহ আল্লাহর স্মরণে ও নাযিলকৃত সত্যের কারণে বিন¤্র হয়ে যাবে? আর তারা যেন তাদের মতো না হয়ে যায়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল; অতঃপর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গিয়েছিল, আর তাদের অনেকেই ছিল অবাধ্য” (সূরাতু আল-হাদীদ: ১৬) । (তাফসীর আল-মারাগী: ৪/৩১) ।
উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তায়ালার বাণী অনুযায়ী কোন একটি জাতি শ্রেষ্ঠ হওয়ার মূল মানদন্ড হলো চারটি: মানুষের কল্যাণে কাজ করা, তাদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা, অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত রাখা এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান স্থাপন করা। অতএব যে জাতি এই চারটি বিষয়কে মেনে নিবে, তারা শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। (তাফসীর আল-মুনীর, জুহাইলী: ৪/৪৪) ।
২। ১১১নং আয়াত ও ১১২নং আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তাআলা মুসলিম জাতিকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তারা পূর্বোক্ত চারটি গুণে গুণান্বিত হয়, তবে তারা শ্রেষ্ঠ জাতি হওয়ার পাশাপাশি আরও চারটি বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ হবে:
(ক) ইয়াহূদীরা সামান্য কষ্ট দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
(খ) মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে তারা পরাজিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাবে।
(গ) কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের উপর তারা কখনো স্থায়ী বিজয় অর্জন করতে পারবে না।
(ঘ) ইহুদীরা আল্লাহর সাথে সৎভাবে সম্পর্ক গড়ে না তোললে এবং কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ না হলে কিয়ামত পর্যন্ত তারা লাঞ্চিত হবে। (আইসার আল-তাফাসীর, জাযায়েরী: ১/৩৬০) ।
আল্লাহ তায়ালার চৌদ্দশত বছর পূর্বের ভবিষ্যতবাণী যুগে যুগে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ইহুদী জাতির ষড়যন্ত্র ও অপকর্মের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। ইসরাঈল পৃথিবীর একমাত্র ইহুদী রাষ্ট্র। ইউরোপ থেকে বহিষ্কৃত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদী নিধনযজ্ঞের পর তারা ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে ইউরোপ থেকে পালিয়ে ফিলিস্তিনে ঠাই নেয়। সেখানে নানা অপকর্ম ও মুসলিম ফিলিস্তিনিদের প্রতি যুলম ও অকৃতজ্ঞতার দরুন তারা আজ সারা পৃথিবীর কাছে লাঞ্চিত ও ঘৃণিত জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
৩। ১১২নং আয়াতের শেষাংশে ইহুদিদের অপমান, লাঞ্ছনা ও নিঃস্বতায় পতিত হওয়ার চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:
(ক) আল্লাহর বিধান অমান্য করা।
(খ) নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা।
(গ) সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহে লিপ্ত হওয়া।
(ঘ) পাপ ও মানুষের প্রতি যুলুম করা। (আইসার আল-তাফাসীর: ১/৩৬১) ।

আয়াতাবলীর আমল:
(ক) মুসলিম জাতি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অটুট রাখতে চাইলে কর্তব্য হলো- মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা, কল্যাণকর কাজে মানুষকে আহ্বান করা, অকল্যাণকর কার্য থেকে নিবৃত করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অকৃত্রিম ঈমানের মজবুত দুর্গ গড়ে তোলা।
(খ) দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে ইসলামবিরোধী শক্তি যতই প্রয়াস চালাক না কেন, তারা মুসলিম জাতির কোনো মৌলিক ক্ষতি করতে সক্ষম নয়; তাদের সাধ্য কেবল অস্থায়ী ও সামান্য জাগতিক বিপত্তি সৃষ্টি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
(গ) ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য করণীয় হলো- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা, অথবা মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। অন্যথায়, তারা কিয়ামত পর্যন্ত মানবসমাজে অপমান ও ঘৃণার বোঝা বয়ে বেড়াতে বাধ্য হবে।

Leave a Reply

error: Content is protected !!